নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৩
রূপন্তী সরকার
নিঝুম রাত। চারপাশের সবকিছু একদম নিস্তব্ধ, নিশ্চুপ। ঘড়ির কাঁটায় সময় এখন ভোর চারটে বেজে পনেরো মিনিট। পুরো রায়ান কুঞ্জ তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
এসি-র কনকনে ঠান্ডা বাতাসে ঘরের পরিবেশটা আরও থমথমে হয়ে আছে। বিছানার এক কোণায় ইয়াশফা ঋষভের ঠিক পাশটাতে একদম নিষ্পাপ বিড়ালের বাচ্চার মতো গুটিসুটি মেরে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ওর মুখে কোনো ভয়ের ছাপ নেই, যেন কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনাটি ওর অবচেতন মন থেকে একদম মুছে গেছে। ও নিশ্চিতে ঘুমাচ্ছে
কিন্তু ঋষভের দুচোখে এক ফোঁটাও ঘুম নেই। ও চিত হয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে, আর ওর মাথার ভেতরে এক ভয়ঙ্কর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তীব্র একটা ক্ষোভ আর অস্থিরতা ওকে ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। ও কিছুতেই মাথা ঠান্ডা করতে পারছে না। নিজের মনের ভেতর একনাগাড়ে একই প্রশ্ন হাতুড়ির মতো বাড়ি মারছে কে চুমু খেলো ইয়াশফাকে? কার এত বড় সাহস যে এই রায়ান কুঞ্জে, ঋষভ রায়ান চৌধুরীর বউয়ের ঘরের বিছানায় ঢুকে ওর বিবাহিত বউয়ের গায়ে এভাবে হাত দেওয়ার দুঃসাহস দেখায়?
কে সেই জানোয়ারের বাচ্চা? যার দাঁতের লালচে দাগ এখনো ইয়াশফার ফরসা পেটের চামড়ায় স্পষ্ট হয়ে আছে?ভাবতে ভাবতে ঋষভের কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঠান্ডা ঘাম ঝরে পড়লো। রাগে ওর পুরো শরীরের রক্ত যেন রি রি করে ফুটছে। ও বিছানায় উঠে বসলো। অন্ধকার ঘরের আবছা আলোয় ও নিজের দুই হাত মুঠো করে ধরলো। হুট করেই ওর জট পাকানো মাথায় একটা তীব্র চিন্তার আলো খেলে গেল। ও মনে মনে ভাবলো,করিডোরে তো একটা হাই-ডেফিনিশন নাইট ভিশন (CCTV) ক্যামেরা লাগানো আছে! রাতে কেউ যদি ইয়াশের ঘরে ঢুকে থাকে, তবে ক্যামেরার চোখ এড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ও আর এক সেকেন্ডও দেরি করলো না। চট করে ঘুম থেকে উঠে দাঁড়ালো ও। বিছানা ছাড়ার আগে ও কয়েক মুহূর্তের জন্য গভীর ঘুমে মগ্ন ইয়াশফার মায়াবী মুখটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটা কতটা অবুঝ আর ছটফটে, অথচ ওর অজান্তেই রাতে ঘরের ভেতর কী এক নোংরা খেলা হয়ে গেল! ঋষভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত সাবধানে, একদম নিঃশব্দে পা টিপে টিপে খাট থেকে নেমে এলো, যাতে সামান্য শব্দেও ইয়াশফার ঘুম না ভেঙে যায়।
ও ঘরের কোণার টেবিল থেকে ল্যাপটপটা বের করলো। ল্যাপটপ অন হতেই স্ক্রিনের নীলচে আলোটা ওর অন্ধকার মুখে এসে পড়লো, যা ওর চোখ দুটোকে আরও হিংস্র আর লালচে দেখাচ্ছিল। ঋষভের কাছে এই বাড়ির মেইন সিকিউরিটি সার্ভারের স্পেশাল এক্সেস আছে। ও অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সার্ভারে ঢুকে আজ রাতের করিডোরের ফুটেজটা বের করলো। ও টাইমলাইন সেট করলো রাত ১টা থেকে ভোর ৩টা বেজে ৩০ মিনিট পর্যন্ত।
এই দীর্ঘ সময়টার মধ্যে করিডোর দিয়ে কারা কারা যাতায়াত করেছে, ও খুব নিখুঁতভাবে সেটা স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে দেখতে লাগলো।
ফুটেজ প্লে হতেই ও দেখলো রাত ১১টা বেজে ৩০ মিনিটে জ্যোতি আর রুহি ইয়াশফার রুমে ঢুকেছিল। এর কিছুক্ষণ পর ঋষভ নিজে সেই ঘরে প্রবেশ করে এবং ম্যাওয়ের অসুস্থতার কারণে ইয়াশফাকে শান্ত করে হসপিটালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। এরপর করিডোর পুরো ফাঁকা, সুনসান। টাইমলাইন আরও সামনে এগোতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠলো রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিটের দৃশ্য। ঋষভ দেখলো, ও নিজে ইয়াশফাকে কোলে নিয়ে হসপিটাল থেকে ফিরে ধীরপায়ে ওর ঘরে রেখে এলো। তারপর ও ইয়াশফাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজে ফ্রেশ হওয়ার জন্য নিজের রুমে চলে যায়।
ঋষভ ল্যাপটপের টাইম কাউন্টারটার দিকে চোখ রাখলো। ২টা ১৫ মিনিটের পর থেকে পরবর্তী প্রায় এক ঘণ্টা করিডোরে আর কোনো লিভিং অবজেক্ট বা মানুষের যাতায়াত দেখা গেল না। চারপাশ একদম ফাঁকা। ঋষভ এবার একটু বিরক্ত হয়ে এবং গভীর মনোযোগ দিয়ে রাত ৩টা থেকে ৩টা বেজে ৩০ মিনিটের ফুটেজটা ফাস্ট ফরওয়ার্ড করে চেক করতে লাগলো। প্রথম কয়েক মিনিট সবকিছু একদম স্বাভাবিক আর শান্ত ছিল।
কিন্তু ঠিক রাত ৩টা বেজে ১২ মিনিটে গিয়ে স্ক্রিনের দৃশ্যটা আচমকা বদলে গেল!
ঋষভ দেখলো, ঠিক ওই সেকেন্ডে করিডোরের মেইন হোয়াইট লাইটগুলো দপ করে এক পলকের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। আর ঠিক তার পর মুহূর্তেই ইমার্জেন্সি ড্রিম লাইটগুলো জ্বলে উঠলো, যা পুরো করিডোরটাকে একটা নীল রঙে ঢেকে দিল।
আর ঠিক সেই হাড়হিম করা নীল আলোর মাঝেই একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটলো।
করিডোরের একদম শেষ মাথার অন্ধকার কোণ থেকে একটা কুচকুচে কালো অবয়ব বা ছায়া ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো। ছায়াটা কোনো সাধারণ মানুষের মতো সোজা হয়ে হেঁটে আসছিল না। ওটা কেমন যেন অদ্ভুত কায়দায় দেয়াল ঘেঁষে লেপ্টে লেপ্টে এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে ইয়াশফার বন্ধ দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। ওটার নড়াচড়ার ধরণ কোনো সুস্থ মানুষের মতো ছিলই না! ছায়াটা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, তারপর লক করা দরজাটা নিঃশব্দে খুলে ওটার ভেতরে ঢুকে গেল!
এই দৃশ্য দেখা মাত্রই ঋষভের হাতের তালু ঘামতে শুরু করলো, এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ইয়াশফা রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে গেলো ঋষভের রুমে, তারপর আর ইয়াশফার রুম থেকে কেউ বের হলো না,
ঋষভের শক্ত হাত দুটো হুট করেই তীব্র আতঙ্কে আর রাগে কাঁপতে লাগলো। ওর বুকের ভেতরটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। ও নিজের পুরো জীবনে এমন অদ্ভুত আর গা শিউরে ওঠা দৃশ্য কখনো দেখেনি। ও ল্যাপটপের মাউসটা চেপে ধরে ভিডিওটা পজ করলো এবং ওই কালো অবয়বটার ওপর সর্বোচ্চ জুম ইন করলো। ও দেখতে চাইলো এই ছায়াটা আসলে কার? ওটার মুখাবয়ব বা শরীরের গড়ন কেমন?
কিন্তু ও যতবারই জুম করলো, স্ক্রিনের পিক্সেল ফেটে ওটা একটা ধোঁয়াটে কালো কুয়াশার মতো দেখাতে লাগলো। ওটার অবয়ব দেখে বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় নেই যে ওটা কোনো চেনা মানুষ, নাকি অন্য কিছু। মানুষের মতোই লাগছে কিন্তু ও বুঝতে পারছে ওইটা আসলে কি ছিলো।
তীব্র এক মানসিক চাপ, ব্যর্থতা আর রাগে ঋষভের মাথার সব কটা রগ যেন একসাথে চিড়বিড় করে ছিঁড়ে যেতে চাইলো। ও আর নিজের ভেতরের এই ভয়ঙ্কর ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। ও নিজের ডান হাতটা শক্ত মুষ্টিবদ্ধ করে ঠাস করে চলন্ত ল্যাপটপের স্ক্রিনের ওপর সজোরে একটা বাড়ি দিল!
ল্যাপটপের স্ক্রিনটা সামান্য কেঁপে উঠলো, আর ঋষভ অন্ধকার ঘরের মাঝে এক বাঘের মতো হিংস্র চোখে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো।
একটু পর ও ল্যাপটপটা বন্ধ করে ধীরপায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। ওর মাথার ভেতরের ঝড়টা তখনো থামেনি, কিন্তু বিছানায় ছটফট করতে থাকা ইয়াশফাকে দেখে ওর বুকের ভেতরের রাগটা কিছুটা কমলো।
ও বিছানায় উঠে ইয়াশফার একদম কাছে গেল। তারপর কোনো কিছু না ভেবেই হুট করে নিজের মুখটা গুঁজে দিল ইয়াশফার গলার নরম ভাঁজে। সেখানে নিজের ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া দিতেই ইয়াশফা ঘুমের ঘোরেই একটু শিউরে উঠে ঋষভকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঋষভও সব চিন্তা একপাশে সরিয়ে রেখে ওকে বুকে চেপে ধরে একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
সকাল বেলা…
জানালার ভারী পর্দা গলে তখন দুপুরের চড়া রোদ ঘরের ভেতর এসে পড়েছে। ঋষভ আচমকা চোখ মেলে তাকিয়েই ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল ইয়াশফা রুমে নেই, ও অনেক আগেই উঠে নিচে চলে গেছে। ও চট করে টেবিলের ওপর থাকা ঘড়িটার দিকে তাকাতেই ওর চোখ একদম চড়কগাছ! ঘড়িতে তখন বেলা ১২টা বেজে পার হয়ে গেছে!
“শিট! এত দেরি হয়ে গেল ঘুম থেকে উঠতে?!”
ঋষভ নিজের কপালে হাত দিল। আজ ওর একটা বড় মিটিং ছিল। ও হন্তদন্ত হয়ে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে লক স্ক্রিন অন করতেই দেখতে পেলো স্ক্রিন জুড়ে জ্বলজ্বল করছে অফিসের সেক্রেটারি আর ক্লায়েন্টদের করা ৫০টিরও বেশি মিসড কল! ঋষভ আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে ঝড়ের গতিতে ওয়াশরুমে ঢুকে কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে, একটা সাধারণ টি-শার্ট গলিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।কিন্তু নিচে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই ঋষভ একদম আকাশ থেকে পড়লো! ও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। রায়ান কুঞ্জের শান্ত থমথমে ড্রয়িংরুমটা আজ যেন একটা ফুটবল স্টেডিয়ামে পরিণত হয়েছে!
ও অবাক হয়ে দেখল, রিদ গায়ে চড়িয়েছে টকটকে হলুদ রঙের ব্রাজিলের জার্সি! শুধু রিদ একাই নয়, ওর মুখোমুখি চেয়ারে বসে থাকা ইয়াশফাও একটা পুচকে সাইজের ব্রাজিলের জার্সি পরে পা দোলাচ্ছে। এদিকে মিহি আর জ্যোতি দুজনই আবার গায়ে জড়িয়েছে আকাশী-সাদা রঙের আর্জেন্টিনার জার্সি!
শুধু তাই নয়, মুগ্ধ, রুহি আর শুভ্র সবাই ব্রাজিলের জার্সি পরে এক লাইনে বসে আছে, আর অদ্রীত একা আর্জেন্টিনার জার্সি পরে মিহিদের দলে যোগ দিয়েছে। এক মাত্র রাহা বাদে, বাড়ির আর সবাই কোনো না কোনো দলের জার্সি পরে একদম সেই মেজাজে বসে আছে!
ঋষভের হঠাৎ মনে পড়ল ও তো ভুলেই গিয়েছিল যে আজ থেকেই ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে! আর এই রায়ান কুঞ্জের ফুটবল যুদ্ধ মানেই তো এক মহা তাণ্ডব। ঋষভ নিজে আবার কট্টর আর্জেন্টিনার সমর্থক। ও আড়চোখে চেয়ে দেখল, রিদ আজ সাতসকালে উঠে পুরো রায়ান কুঞ্জের ছাদে মস্ত বড় একটা ব্রাজিলের পতাকা টাঙিয়ে দিয়ে এসেছে!
ঋষভকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেই রিদ নিজের ব্রাজিলের জার্সিটা একটু টেনে টেনে বুক ফুলিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল, “ওই যে! আইসা গেছে আমাদের আর্জেন্টিনার আফা! এতক্ষণে ওনার ঘুম ভাঙল!”
বাবার মুখে এমন খোঁচা আর ড্রয়িংরুমের এই হল্লা দেখে ঋষভের এমনিতেই অফিসের মিটিং মিস হওয়ার মেজাজটা আরও তিরিক্ষি হয়ে গেল। ও চোখ-মুখ শক্ত করে রেগে গিয়ে বলল, “পাপা! এইসব ফালতু জিনিস কিন্তু আমি একদম পছন্দ করি না!”
রিদ ওনার কফির মগে একটা চুমুক দিয়ে শান্ত সুরে বলল, “কেন? কী পছন্দ করো তুমি শুনি?”
বাপ-বেটার এই কথার মাঝখানে মুগ্ধ সোফা থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁত বের করে ফোড়ন কেটে বলল, “আরে কাকাই, তুমি বোঝো না কেন? আমাদের ভাইয়া তো আর আমাদের মতো জার্সি পরবে না। ভাইয়া মনে হয় থ্রি-পিস পরতে পছন্দ করে!”
মুগ্ধর কথা শোনা মাত্রই পুরো ড্রয়িংরুমে হাসির রোল পড়ে গেল! শুভ্র, রুহি আর ইয়াশফাও হো হো করে হেসে উঠল। ইয়াশফা তো হেসেই খুন, ও মনে মনে বলল, “ঠিকই কইছে মুগ্ধ ভাইয়া, এই শয়তানকে থ্রি-পিসেই বেশি মানাইবো!”
কিন্তু এই হাসাহাসি দেখে আর্জেন্টিনা দলের লিডার মিহি আর ডেপুটি লিডার জ্যোতি একদম ক্ষেপে লাল হয়ে গেল। নিজেদের দলের সমর্থক ঋষভকে এভাবে অপমান করা হচ্ছে দেখে মিহি নিজের হাতের বেলনটা উঁচিয়ে একদম তেড়ে গেল মুগ্ধর দিকে। ও চোখ কটমট করে বলল, ” 7up খাস লজ্জা করে না? আবার বড়ো বড়ো কথা বলিস? পাঠা একটা”
মিহি মুগ্ধকে ধমকাতেই রিদ আবার নিজের দলের ছোট সদস্যকে বাঁচাতে মাঝখানে ঢাল হয়ে দাঁড়াল। ও মিহির দিকে তাকিয়ে একদম সোজা-সরল মুখে বলল,
“লে বাবা! এত গরমের মধ্যে মানুষ তো 7up-ই খাবে! ঠান্ডা ঠান্ডা 7up খাওয়া তো স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, এতে এত বড় বড় কথা বলার কী হলো? আজব তো!”
রিদের কাউন্টার শুনে শুভ্র আর মুগ্ধ হাই-ফাই করল, আর মিহি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঋষভকে বলল, “দেখছিস ঋশ? তোর বাপের মুখে কত কথা! আজ আর্জেন্টিনা জিতলে এই বুড়োকে আমি ঘর থেকে বের করে দেব!”
পুরো ড্রয়িংরুম তখন ফুটবল যুদ্ধের চরম হাসিখুশি আর ফানি আমেজে মেতে উঠল,
ঋষভ ড্রয়িংরুমের একটা বড় সোফায় এসে ধপাস করে বসল। অফিসের মিটিং মিস হওয়ার মেজাজ খারাপটা ওর মুখে তখন স্পষ্ট। ও বসামাত্রই ওর ঠিক এক পাশে রিদ এসে বেশ আয়েশ করে বসল। ওর ব্রাজিলের জার্সিটা দেখে ঋষভের বিরক্তি যেন আরও এক কাঠি চড়ে গেল।
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের ওপাশ থেকে একদম লাফাতে লাফাতে ধেয়ে আসল ইয়াশফা। ওর পরনে সেই পুচকে সাইজের ব্রাজিলের জার্সি। ও এসে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ধপ করে রিদের পাশে বসে গেল। ও বসল রিদের পাশে ঠিকই, কিন্তু ওর জ্বলন্ত চোখ দুটো রাখল ঋষভের দিকে। ও এক গাল ত্যাঁদড়মি মাখা হাসি দিয়ে ঋষভকে স্পষ্ট শুনিয়ে শুনিয়ে হাততালি দিয়ে ছড়া কেটে বলে উঠল
“আর্জেন্টিনা ছিড়া ত্যানা চোরের নাম ম্যারাডোনা, ডিব্বারে কয় ডাব্বা জার্মানি তোগো আব্বা”
ইয়াশফার মুখে এই মারাত্মক ছড়া শোনা মাত্রই রিদ তো হাসতে হাসতে একবারে শেষ! ওর আনন্দ আর ধরে না। রিদ মহা আহ্লাদে ইয়াশফাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “এই তো! এই না হলে রিদের এটাম বোম? ফাটিয়ে দিচ্ছো, আমি তোমাকে আমার মতো বিশ্বসেরা রোস্টার বানাবো।”
ঋষভ এবার সত্যি সত্যিই রেগে গেল। ওর আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে এমন ফালতু ছড়া ও একদম সহ্য করতে পারল না। ও নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে কটমট চাউনিতে তাকাল ইয়াশফার দিকে। এই মেয়েটা দিন দিন বড্ড বেশি পাকনা আর বিচ্ছু হয়ে যাচ্ছে। ও নিজের চড়া গলায় এক ধমক দিয়ে বলল,
“থাপ্পড় চিনিস বেয়াদব? এসব উল্টাপাল্টা কথা কে শিখিয়েছে তোকে? খেলার কিছু বুঝিস?”
ইয়াশফা একটুও পাত্তা দিলো না ওর কথা ও উল্টো নিজের হাত দুটো কোমরে গুঁজে একদম বুক ফুলিয়ে বলল, “আমি খেলার সব কিছু বুঝি, আর আমাদের ৫ টা কাপ আছে আপনাদের মতো থ্রি পিস পরে ঘুরি না।”
নিজের বউয়ের মুখে এমন মোক্ষম জবাব শুনে রিদ তো খুশিতে একদম বাঘের মতো গর্জে উঠল। ও আবারো ইয়াশফাকে বাহবা দিয়ে বলল, “উফফস উফফস সেই সেই, তুমি আসলেই এটাম বোম, সেই দিচ্ছো, এভাবেই দাও পাবলিক তোমার পাশে আছে।”
ঋষভের এবার চরম রাগ লাগছে। এই বাপ আর বউ মিলে ড্রয়িংরুমে কী তামাশা শুরু করেছে এসব? ও ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে ওকে রাগিয়ে দেওয়ার জন্য ওর সেই ঐতিহাসিক দুর্বল জায়গায় আঘাত করে বলল, “7up।”
ঋষভ ভেবেছিল এইবার হয়তো মেয়েটা দমে যাবে। কিন্তু ইয়াশফা তো চোখের পলকে পালটা কামড় দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
“জার্মানি তোর বাপ।”
এই অভাবনীয় কাউন্টার শুনে ঋষভ থমকে গেল! ও পুরো চুপ হয়ে গেল, ওর মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দই বের হলো না। ও অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল এই বাচ্চা মেয়েটার দিকে। ও মনে মনে ভাবল এই মেয়ে এত বিচ্ছু কেন ও আল্লাহ?! আসলেই ছোট মরিচের ঝাল অনেক বেশি!
এদিকে ইয়াশফার এই জার্মানি তোর বাপ ডায়ালগ শুনে রিদ একটু চিন্তিত হয়ে পড়ল। ওনার নিজের পিতৃত্ব নিয়ে যেন কেমন একটা খটকা লেগে গেল। ওনার মুখটা একটু আমতা আমতা হয়ে গেল। ও একটু চিন্তিত হয়ে বলে উঠল,
“হোপ এটাম বোম ওর বাপ জার্মানি হতে যাবে কেন ওর বাপ তো আমি, থাকগা তুমি যেহেতু বলেছো তাহলে ঠিকই বলেছো, আলাবু এটাম বোম।”
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩২
শ্বশুরের এমন বোকা বনে যাওয়া আর কথা শুনে ইয়াশফা হেসেই খুন। ও আহ্লাদে রিদের একদম কাছাকাছি গিয়ে ওর একটা গাল টেনে দিয়ে আদুরে গলায় বলল, “আলাবু টু বাবা”
বাপ আর বউয়ের এই অদ্ভুত ব্রাজিলের কোলাবরেশন কাণ্ড দেখে ঋষভ কপালে হাত দিয়ে সোফায় হেলান দিল। ও মনে মনে ভাবল, এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা জিতুক আর না জিতুক, এই বাড়িতে থাকলে ওর নিজের হার্ট অ্যাটাক হওয়া একদম নিশ্চিত!
