Home নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৮

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৮

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৮
নাজনীন নেছা নাবিলা

মিহালের চওড়া বুকের ওপর মুখ গুজে কাঁদতে কাঁদতে নীলা কখন যে ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছে ঘুমিয়ে পড়েছে, তা সে নিজেও টের পায়নি। এক বুক আতঙ্ক আর অভিমান উজার করে দিয়ে বেচারি অবশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে এক পরম শান্তিতে। এক অদ্ভুত নিয়তির পরিহাস বটে। কদিন আগেই মিহালকে দিয়ে সে যে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিয়েছিল, সেখানে স্পষ্টাক্ষরে লেখা ছিল, তাকে ছোঁয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ আজ নিজের অজান্তেই, নিজের মনের তীব্র আকুতিতেই সে বারবার মিহালের নিবিড় স্পর্শে চলে আসছে, তার বাহুডোরে খুঁজে নিচ্ছে এক নিরাপদ আশ্রয়।
আর মিহাল? সে নিজের সমস্ত জগত ভুলে তার এই ক্লান্ত নীলাঞ্জনাকে বুকের মাঝে আগলে ধরে নিথর হয়ে বসে আছে। সে খুব ভালো করেই জানে, দুনিয়ার সামনে তার এই মেয়েটা নিজেকে যতই শক্ত, জেদি আর স্বাবলম্বী হিসেবে প্রকাশ করুক না কেন, ভেতরের অতীত জীবনের সেই গভীর ক্ষত আর ট্রমাগুলো তাকে এখনো কতটা নির্মমভাবে কষ্ট দেয়। একটা দীর্ঘশ্বাস মিহালের বুক চিরে বেরিয়ে এসে ঘরের নৈশব্দ্যে মিলিয়ে গেল। সে নীলার ঘুমন্ত ও মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক ভীষণ প্রতিজ্ঞা করল,ৎএখন থেকে তাকেই তার নীলাঞ্জনাকে পৃথিবীর সবচাইতে বেশি ভালোবাসতে হবে। এত বেশি ভালোবাসায় তাকে জড়িয়ে রাখতে হবে, যেন অতীতের সব ট্রমা, সব হারানোর ভয় এই ভালোবাসার বন্যায় চিরতরে ভেসে যায়। তাকে এই লড়াইয়ে জিততেই হবে, নিজের নীলাঞ্জনাকে আবার মুক্ত পাখির মতো হাসাতেই হবে। মিহাল গভীর মায়ায় নিজের বুকের ওপর ঘুমন্ত নীলার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে এক পুরোনো জমানো কথা ভেসে উঠতেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠল। মিহাল নিজের অজান্তেই একা একাই খুব মৃদু স্বরে বিড়বিড় করতে লাগল,

“নীলাঞ্জনা, এত তাড়াতাড়ি কি কাউকে এতখানি ভালোবাসা যায়? তোমাকে যখন প্রথমবার দেখেছিলাম, তখন তুমি একদম ছোট, অবুঝ এক শিশু। তখন আর যাই হোক, তোমাকে ওই অর্থে ভালোবাসা তো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। আর আমার নিজের বয়সই বা তখন কত ছিল মাত্র বছর দশেকের মতোন। আর তোমাকে প্রথমবার কোলে নিতেই তুমি যে কাজটা করেছিলে থাক, এখন আর সেই কথা বলে তোমাকে লজ্জা দেব না।”
মিহাল কথাগুলো বলে একা একাই মুচকি হাসলো।

নীলার যখন দীর্ঘক্ষণ পর ঘুম ভাঙল, সে অত্যন্ত অলস ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে তার চোখের ভারী পাতা দুটো মেলল। তার মাথাটা এতক্ষণ মিহালের চওড়া বুকের ওপর এক পরম শান্তিতে ন্যস্ত ছিল। চোখ মেলার সাথে সাথেই সে যখন খুব আলতো করে নিজের মাথাটা ওপরের দিকে তুলতে চাইল, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি সর্বপ্রথম গিয়ে থমকে গেল মিহালের উন্মুক্ত গলার ওপর। মিহালের গলার সেই পুরুষালি গঠন আর দৃশ্যপট দেখা মাত্রই নীলার নিজের বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল, তার গলাটা এক নিমেষেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ঘুমের অবশিষ্টাংশটুকু এক পলকেই তার চোখ থেকে বহুদূরে মিলিয়ে গেল। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল মিহাল যতবার ধীরলয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে কিংবা গলার ঢোক গিলছে, ততবারই তার কণ্ঠনালীটা এক চমৎকার ছন্দে ওঠানামা করছে। এই অদ্ভুত দৃশ্যটা নীলার চোখে এতটাই আকর্ষণীয় আর সম্মোহনী ঠেকল যে, সেখান থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়াটা তার কাছে এক অসম্ভব দায় মনে হলো। এক অজানা, অলৌকিক ঘোরের অতল গহীনে যেন তলিয়ে যেতে লাগল সে।

এই মুহূর্তে নিজের চারপাশের বাস্তব অবস্থান, তাদের অতীত ট্রমা, কিংবা মিহালের সাথে তার মধ্যকার বর্তমান চুক্তিবদ্ধ সম্পর্কের টানাপোড়েন সব কিছু এক লহমায় তার মন থেকে কর্পূরের মতো উবে গেল। লজ্জা আর সমস্ত জড়তা ভুলে গিয়ে সে এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতায় নিজের ডান হাতটি ধীরে ধীরে বাড়িয়ে দিতে লাগল মিহালের সেই কণ্ঠনালীর দিকে। এতক্ষণ ধরে তার যে নরম হাতটি মিহালের বুকের ওপর নিথর হয়ে পড়ে ছিল, তা এখন মখমলের মতো স্লাইড করে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে অগ্রসর হতে লাগল। নীলার হাতের সেই আলতো ও ওমভরা ছোঁয়া চামড়ায় লাগতেই মিহাল নিজের পুরো শরীরের ভেতর এক তীব্র, মধুর শিহরণ অনুভব করল। সে খুব স্পষ্ট বুঝতে পারল যে নীলা জাগ্রত হয়েছে এবং তার হাত এখন এক নিষিদ্ধ অধিকার নিয়ে তার গলার দিকে এগিয়ে আসছে। মিহাল নিজে থেকে কোনো বাধা দিল না, মুখে কোনো একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। সে কেবল পরম তৃপ্তিতে নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে নীলার সেই কাঙ্ক্ষিত স্পর্শটুকু নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে অনুভব করতে লাগল।

নীলার কাঁপতে থাকা নরম আঙুলগুলো অবশেষে মিহালের কণ্ঠনালীর ঠিক কাছাকাছি গিয়ে থমকে দাঁড়াল। সে অত্যন্ত ধীরলয়ে, পরম আবেশে মিহালের কণ্ঠনালীর সেই পুরুষালি উঁচু অংশটুকু নিজের আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে স্পর্শ করতে লাগল। সেই স্পর্শে এক তীব্র মোহময় আচ্ছন্নতা নেমে এলো ঘরের মাঝে। নীলার বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত তোলপাড়। তার ভীষণ ইচ্ছে করছিল ওই মসৃণ উঁচু অংশটায় নিজের ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে দিতে। এক অজানা তৃষ্ণায় সে নিজের জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট দুটো আলতো করে ভিজিয়ে নিল। মিহাল এতক্ষণ নীলাকে খুব আলতোভাবে নিজের বাহুডোরে আগলে রাখলেও, এই জাদুকরী স্পর্শে আচমকাই তার হাতের বাঁধন শক্ত হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় নীলাকে নিজের শরীরের সাথে একদম নিবিড়ভাবে মিশিয়ে নিল। নীলার তপ্ত ও দ্রুত নিঃশ্বাস তখন মিহালের গলার চামড়ায় আছড়ে পড়ছে।

সেই উষ্ণতার ছোঁয়া পেয়ে মিহাল আরও জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল, যার ফলে তার কণ্ঠনালীটা আরও তীব্রভাবে ওঠানামা করতে শুরু করল। ঠিক সেই মুহূর্তে নীলার মনের ভেতরের সমস্ত বাঁধ যেন এক লহমায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে নিজের ভালো-মন্দ বিচার করার হিতাহিত জ্ঞান পুরোপুরি হারিয়ে ফেলল। এক পরম অবাধ্য ঘোরের টানে সে মিহালের সেই চঞ্চল কণ্ঠনালীর ওপর নিজের ভেজা ঠোঁট দুটো আলতো করে ছুঁইয়ে দিল। নীলার এই অভাবনীয় ও তীব্র সংবেদনশীল স্পর্শ পাওয়া মাত্রই মিহালের পুরো শরীর এক অলৌকিক শিহরণে কেঁপে উঠল। পরম আবেশ, তীব্র ভালো লাগা আর এক অনাবিল সুখে সে নিজের চোখ দুটো একদম খিঁচে বন্ধ করে ফেলল এবং মাথাটা কিছুটা বাঁকিয়ে ঘাড় পেছনের দিকে নিয়ে গেল। মিহালের এই অবচেতন আত্মসমর্পণ যেন নীলার ভেতরের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে আরও বাড়িয়ে দিল, তার জন্য পথটা আরও সহজ করে তুলল। নীলা সোফার কুশন ছেড়ে সরাসরি মিহালের প্রশস্ত কোলের ওপর উঠে বসল। সে মিহালের শার্টের কলারটা নিজের এক হাত দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরে, পরম শান্তিতে ও অবারিত অধিকারে মিহালের গলার চারপাশে একের পর এক গভীর চুমু আঁকতে লাগল। মিহালও তার এই অবাধ্য নীলাঞ্জনাকে বিন্দুমাত্র থামানোর চেষ্টা করল না। বরং নিজের সমস্ত সত্তা উজার করে দিয়ে জীবনের এই পরম আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটিকে প্রতিটি কোষে কোষে অনুভব করতে লাগল। মিহালের তখন এমন এক অবস্থা, যেন এই তীব্র সুখের আতিশয্যে তার নিজের জান চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ঠিক তখনই, ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে দেয়াল ঘড়িটা টং টং শব্দে ১২টার কাঁটায় এসে পৌঁছানোর সংকেত দিতে শুরু করল। ঘড়ির সেই আকস্মিক ও গম্ভীর যান্ত্রিক শব্দেই যেন এক ঝটকায় তাদের দুজনের মনের সব মোহময় ঘোর কেটে গেল, ফিরে এলো দীর্ঘক্ষণ হারিয়ে যাওয়া হুশ। নীলা আচমকা চমকে উঠে নিজেকে থামিয়ে দিল। সে ঝট করে সোজা হয়ে বসে নিজের বর্তমান অবস্থানটা বোঝার চেষ্টা করল। আর তা করতেই লজ্জায় আর চরম সংকোচে তার পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে এলো। সে আবিষ্কার করল সে এই মুহূর্তে মিহালের কোলের ওপর সম্পূর্ণ আসীন হয়ে আছে, মিহালের একটি শক্ত হাত তার কোমর জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত শক্ত করে চেপে রেখেছে, আর তার নিজের একটি হাত এখনো জড়িয়ে আছে মিহালের ঘাড়ের সাথে।

নীলা অত্যন্ত ধীরলয়ে নিজের নত মুখটি ওপরের দিকে তুলল। সে দেখল, মিহাল তখনো ঘাড় পেছনের দিকে হেলিয়ে দিয়ে বুক ফুলিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। নিজের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পাগলামি দেখে নীলার লজ্জায় যেন মাথা কাটা যাওয়ার উপক্রম হলো। একী সর্বনাশা কাণ্ড ঘটিয়ে বসল সে! এখন সে কোন মুখে মিহালের দিকে তাকাবে? কী করেই বা নিজের এই মুখ তাকে দেখাবে? এখানে এভাবে আর এক মুহূর্ত বসে থাকা কোনোভাবেই চলবে না। এই ভেবে সে অত্যন্ত সন্তর্পণে মিহালের কোল থেকে নিচে নেমে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। ঠিক তখনই মিহাল আচমকা সোজা হয়ে বসল। নীলাকে কোল থেকে নেমে যাওয়ার সুযোগ না দিয়ে, সে ওর কোমরে জড়িয়ে থাকা নিজের হাতের বাঁধনটি আরও কয়েক গুণ গাঢ় আর শক্ত করে তুলল। মিহালের সেই আকস্মিক ও দৃঢ় স্পর্শে নীলা পুরো শরীর দিয়ে কেঁপে উঠল। মিহাল নীলার কোমরটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে তাকে একদম নিজের তপ্ত শরীরের সাথে নিবিড়ভাবে মিশিয়ে নিল। দুজনের শরীরের প্রতিটা অংশ তখন একে অপরকে খুব তীব্রভাবে স্পর্শ করছে। মিহাল নিজের মুখটা একদম নীলার ওষ্ঠাধরের কাছাকাছি নিয়ে এসে, এক গভীর ও মায়াবী স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,

“ক্যান আই কিস ইউ? অন ইউর ফোরহেড, অন ইউর চীকস, অন ইউর আইজ অ্যান্ড অন ইউর লিপস।”
মিহালের মুখ থেকে এমন সরাসরি ও আকুল অনুমতি প্রার্থনা শুনে নীলার বুকটা ধক করে উঠল, তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস এক লহমায় মারাত্মক ভারী হয়ে এলো। এই মুহূর্তে কিছু বলার কিংবা কোনো প্রকার প্রতিরোধ করার ন্যূনতম শক্তিটুকুও সে নিজের ভেতরে খুঁজে পেল না। সে না পারছিল মিহালের এই তীব্র টান থেকে নিজেকে সরিয়ে আনতে, আর না পারছিল মুখে কোনো জবাব দিতে। এক অদ্ভুত মাদকতা, তীব্র জড়তা আর লাজুক এক অনুভূতির মেঘ যেন তাকে চারপাশ থেকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। নীলার কোনো উত্তর না পেয়ে মিহাল আবার ওর চোখের দিকে গভীর বিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে বলল,
“ট্রাস্ট মি, আই উইল বি জেন্টল। আই নো ইটস ইয়োর ফার্স্ট কিস অ্যান্ড অলসো মাইন। সো, লেটস মেক দিস মেমোরেবল।”

মিহালের এই সুন্দর প্রতিশ্রুতি শুনে নীলা আরও জোরে জোরে, ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে লাগল। তার বুকের ভেতরের ধুকধুকানি তখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। নীলাকে এভাবে সম্পূর্ণ নীরব ও নিশ্চল থাকতে দেখে মিহাল নিজের ভেতরের অবাধ্য উত্তেজনাকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে অত্যন্ত নরম গলায় আবার বলল,
“তোমার এই নীরবতাকে আমি আমার কাঙ্ক্ষিত উত্তর হিসেবে ধরে নিলাম, নীলাঞ্জনা।”
নীলা এবারও মুখে কোনো শব্দ উচ্চারণ করল না। সে কোনো প্রতিবাদ না করে, এক অদ্ভুত সমর্পণের টানে নিজের চোখ দুটো পরম শক্তিতে বন্ধ করে ফেলল। হয়তো সে নিজেকে মনে মনে পুরোপুরি প্রস্তুত করে নিচ্ছে। কিন্তু মিহাল পরবর্তী মুহূর্তে যা করল, তা নীলার সমস্ত ভাবনার সম্পূর্ণ বাইরে ছিল। মিহাল নিজেকে সামলে নিয়ে অত্যন্ত ধীরলয়ে, পরম পবিত্রতায় নীলার অনাবৃত কপালে নিজের ওষ্ঠাধর ছুঁইয়ে দিল। এক দীর্ঘ, গভীর ভালোবাসার স্পর্শ এঁকে দিল সে। তারপর ওখানেই থেমে গিয়ে নীলার কপালে নিজের কপালটা ঠেকিয়ে রাখল। মিহালের তপ্ত ও ভারী শ্বাস তখন নীলার মুখে এসে আছড়ে পড়ছে। সে নিজের ভেতরের অবদমিত আকাঙ্ক্ষাকে অনেক কষ্টে দমন করে, ভাঙা ও গভীর স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,

“পারমিশন নেওয়ার দরকার ছিল নীলাঞ্জনা, তাই নিলাম। তবে বাকি হিসেবগুলো পরবর্তীতে সুদে-আসলে মিটিয়ে নেব। এখন আপাতত নিজেকে এইটুকুর মাঝেই কন্ট্রোল করলাম।”
মিহালের এই অপ্রত্যাশিত ও জেন্টল আচরণে নীলা তীব্র এক লজ্জার সাগরে ডুবে গেল। সে এবারও চোখ খুলল না, বরং নিজের সমস্ত শক্তি এক করে মিহালের চওড়া বুকে একটা জোরে ধাক্কা দিল। সেই আকস্মিক ধাক্কায় মিহালের হাতের শিথিল বাঁধন থেকে নিজেকে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে সে কোল থেকে নিচে নেমে পড়ল। লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখটা আড়াল করতে সে আর এক সেকেন্ডও সেখানে না দাঁড়িয়ে, রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে এক ছুটে দৌড় দিল। ওদিকে নীলার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ও জোরালো ধাক্কায় ভারসাম্য হারিয়ে মিহাল সোজা বিছানার ওপর চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে গভীর ও জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল, আর তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে এক অনাবিল, বিজয়ের চওড়া হাসি ছড়িয়ে পড়ল পুরো মুখে। সে ছাদের দিকে তাকিয়ে আপন মনেই হাসতে লাগল।

অবশেষে… অবশেষে সব চুক্তি আর দেয়াল ভেঙে সে তার হৃদয়ের রানী, তার আদরের নীলাঞ্জনাকে নিজের করে সামান্য হলেও স্পর্শ করতে পেরেছে। এই আনন্দ যেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম প্রাপ্তি।
নীলা এক ছুটে রুম থেকে বের হয়ে দরজার ঠিক পাশের দেয়ালটায় নিজের পিঠ ঠেকিয়ে দিল। সে তখনো হাপাতে হাপাতে অত্যন্ত জোরে জোরে ও ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। তার বুকের ভেতরের ধুকধুকানিটা এত তীব্র যে মনে হচ্ছে দেয়ালটাও বুঝি কেঁপে উঠছে। ওহ খোদা, কী করল সে একটু আগে। মিহালের সাথে নিজের সেই অবাধ্য পাগলামির কথা ভাবতেই তার ইচ্ছে করছিল যদি সম্ভব হতো, তবে এই মুহূর্তেই এক দৌড়ে সুদূর বাংলাদেশে নিজের চেনা গণ্ডিতে ফিরে যেত।

এত নির্লজ্জ, এত অবাধ্য সে কবে থেকে হলো? নিজের এই আকস্মিক রূপের কথা যতবার মনে পড়ছে, লজ্জায় আর সংকোচে তার পুরো মায়াবী মুখশ্রী বারবার বদলে যাচ্ছে, গাল দুটো রাঙা হয়ে উঠছে। নিজের মনের এই তীব্র ব্যাকুলতা আর লাজ-শরমের মোহময় জগত থেকে নিজেকে যেকোনো উপায়ে বের করার জন্য সে একটা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। এভাবে ঘরে বসে থাকলে অনর্থক ভাবনাগুলো তাকে আরও বেশি গ্রাস করবে। তাই সে ভাবল, এখনই নিচে গিয়ে দুপুরের রান্নাবান্নার কাজে হাত দেওয়া দরকার

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৭

। নিজেকে কোনো একটা কাজে ব্যস্ত রাখতে পারলে অন্তত মিহালের চুমুর ঘোর থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। যেই ভাবা, ঠিক সেই কাজ। নীলা নিজের গায়ের ওড়নাটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ধীর পায়ে নিচে নেমে গেল এবং সোজা গিয়ে রান্নাঘরে প্রবেশ করল। চুলোর পাশে গিয়ে সে যখন রান্নার গোছগাছ করতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই দরজায় শাড়ির খসর-খসর আওয়াজ তুলে তার ফুফুও রান্নাঘরে এসে ঢুকলেন। ফুফুকে হঠাৎ সেখানে আসতে দেখে নীলা নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here