Home নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৯

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৯

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৯
নাজনীন নেছা নাবিলা

নীলার শাশুড়ি মিনা মির্জা রান্নাঘরে ঢুকেই ভ্রু কুঁচকে বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“এখানে কী করছ?”
নীলা নিজের ভেতরের সমস্ত লজ্জা আর জড়তা আড়াল করে অত্যন্ত নরম ও বিনীত গলায় বলল,
“রান্না করতে এসেছি।”
মিনা মির্জা এইবার মুখে কৃত্রিম রাগ আর গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে বেশ কড়া গলায় বললেন,
“এইটা কি তোমার বাবার ঘর?”
নীলা ওনার এমন আকস্মিক প্রশ্নে আরও বেশি সংকুচিত হয়ে মাথা নিচু করে খুব ছোট করে বলল,
“না।”
মিনা মির্জা তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

“আমারও বাবার ঘর না। তাই যার বাবার ঘর সে রান্না করবে। তুমি এখান থেকে যাও তো!”
ঠিক সেই মুহূর্তেই কোনো একটা দরকারে রান্নাঘরের দরজার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছিল মিহাল। মায়ের মুখ থেকে এমন রসাত্মক ও অপ্রত্যাশিত যুক্তি শোনার পর মিহাল আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে নিজের কপালে হাত দিয়ে এক চরম নাটকীয় ভঙ্গিতে মুখ বাঁকিয়ে রিয়েকশন দিল,
“ফাআ্য্য্য্য্যহ!!”
নীলা আর তার ফুফু দুজন মিলেই এক সাথে খিলখিল করে হেসে উঠল। রান্নাঘরের সেই গমগমে নীরবতা ভেঙে প্রিয় দুই নারীর ঠোঁটে এমন চিলতে হাসি দেখে মিহালের প্রাণ যেন এক নিমেষে জুড়িয়ে গেল। তার সমস্ত ক্লান্তি ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। সে-ও নিজের ঠোঁটের কোণে এক মিষ্টি মুচকি হাসি ফুটিয়ে বেশ দায়িত্বশীল গলায় বলল,
“তোমরা দুজন গিয়ে বসার ঘরে গল্প করো। আজকে দুপুরের সমস্ত রান্নার দায়িত্ব আমার।”
নীলা মিহালের মুখে এমন কথা শুনে কিছুটা অবাক হলো। সে নিজের কণ্ঠস্বরে সামান্য সন্দেহের আভাস ফুটিয়ে তুলে চোখ বাঁকিয়ে বলল,
“আপনি রান্না করলে সেটা আদেও খাওয়ার যোগ্য হবে তো? নাকি আজকে দুপুরে আমাদের সবাইকে না খেয়েই থাকতে হবে?”

নীলার এমন সোজাসাপটা খোঁচা শুনে মিনা মির্জা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলেন না, তিনি শব্দ করে হেসে দিলেন। মিহাল নিজের দুই হাতের শার্টের হাতা নিখুঁতভাবে ফোল্ড করতে করতে সম্পূর্ণ রূপে রান্নাঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। মুখে তার আত্মবিশ্বাসী বাঁকা হাসি। সে নীলার একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,
“ইউনিভার্সিটিতে কিন্তু সেদিন আমার হাতের রান্নাই খেয়েছিলে তুমি। তাই তোমার আর যাই হোক, আমার রান্নার হাত নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকা উচিত না।”
মিহালের এই আকস্মিক ও বিস্ফোরক সত্যটি শোনা মাত্রই নীলার চোখ একদম কপালে উঠে গেল। স্মৃতির পাতাগুলো এক লহমায় ওলটপালট হয়ে গেল তার মনের ভেতর। তার মানে সেদিন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে মিহাল যে তার ক্লাসের সবাইকে অত বড় একটা ট্রিট দিয়েছিল, আর ঠিক সময়ে খাবার কম পড়ে গিয়েছিল বলে নীলাকে আলাদা একটা টিফিন বক্স বাড়িয়ে দিয়েছিল যেখানে অসাধারণ স্বাদের ঘরের রান্না ছিল, সেই রান্না অন্য কেউ করেনি, সেই রান্না মিহাল নিজের হাতে করেছিল। আর এই পুরো বিষয়টাই ছিল মিহালের একটা নিখুঁত প্রি-প্ল্যান। নিজের অজান্তেই মিহাল তাকে কতটা আগে থেকে আগলে রাখছে আর যত্ন করছে, তা ভেবে নীলা এই মুহূর্তে মিহালের চোখের দিকে তাকিয়ে কী বলবে তার কোনো উপযুক্ত ভাষাই খুঁজে পেল না। সে একদম বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
এবং মিনা মির্জা ছেলের কান ধরে টেনে বললেন,

“ও আচ্ছা এই কারণেই সেইদিন নিজ হাতে রান্না করলি। এত বললাম আমি রান্না করে দেই আমার কথা শুনলি না। উল্টো কেয়ার দেখানোর নাটক করে বললি, “না মা,তুমি বিশ্রাম নাও। সারাদিনই তো কত কিছু করো আমাদের জন্য। এখন আমাকে আমার টা করতে দাও।” আমি কত খুশি হয়ে রান্না ঘর থেকে চলে এলাম। অথচ আসল খবর তো এখন পেলাম। সেদিন আমার কথা ভেবে তুই রান্না করিস নি বরং মেয়ে পটানোর ধান্দায় ছিল বেয়াদব।”
নীলার সামনে নিজের এই অতি গোপন পরিকল্পনাটির কথা বলতে গিয়ে যে স্বয়ং মায়ের কাছেই এমনভাবে ধরা পড়ে যেতে হবে, তা যদি মিহাল আগে জানত তবে সে কোনোদিনই আজ নিচে নেমে আসত না। আর যদি কোনো দরকারে নিচে আসতও, তবে নিজের মুখ একদম সেলাই করে আসত। কিন্তু এখন তো তীরের বেগে তির ধনুক থেকে বের হয়েই গেছে, সে নিজেই নিজের ফাঁদে এসে পড়েছে। এই মুহূর্তে আর আফসোস করে কোনো লাভ নেই, আপাতত মা এবং বউ দুজনকেই একসাথে সামাল দিতে হবে। তাই সে নিজের সবটুকু জড়তা আড়াল করে একটা বোকা বোকা হাসি হেসে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে মা! আগে শুধু তোমার একার চিন্তা করতাম, আর এখন তুমি এবং আমার বউ দুজনকেই সমানভাবে চিন্তা করব। এখন তোমরা দুজন এখান থেকে যাও তো দেখি! আমাকে রান্নার মাঝে একদম বিরক্ত করবে না। আমার অনেক কাজ আছে। যাও, যাও!”

কথাগুলো বলতে বলতেই সে দ্রুত পায়ে মায়ের কাছে এগিয়ে এলো। তারপর পরম মায়ায় ওনার কাঁধে হাত দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে রান্নাঘরের বাইরের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। আর রান্নাঘরের চৌকাঠ পার করে দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, সে ওনার গালে এক গভীর ভালোবাসার চুমু খেল। মিনা মির্জা ছেলের এমন আদুরে কাণ্ড দেখে মুচকি হাসলেন এবং ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়ালেন। নীলা তখনো রান্নাঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। সে-ও নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিটিমিটি হাসি ফুটিয়ে যেই না রান্নাঘর থেকে বের হতে যাবে, ঠিক তখনই মিহাল এক অলৌকিক চপলতায় তার একদম কাছে চলে এলো। নীলা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, মিহাল তার সেই নরম ও তুলতুলে গালে এক ঝটকায় একটা গভীর ও উষ্ণ চুমু এঁকে দিল। আচমকা এমন ভালোবাসার ছোঁয়ায় নীলা সঙ্গে সঙ্গে এক জায়গায় স্থির হয়ে গেল। নিজের অজান্তেই তার একটি হাত গালে চলে গেল, আর চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠল। নীলাকে এভাবে পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিহাল তার চোখের দিকে তাকিয়ে এক মায়াবী ও দুষ্টুমিভরা স্বরে বলল, “এভাবে যদি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকো, তবে কিন্তু আরও অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে নীলাঞ্জনা। আর ভুলে যেও না, আজকের এই সবকিছুর শুরুটা কিন্তু উপরে তুমি নিজেই করেছিলে।”

মিহালের মুখে সেই ঘরের স্পর্শের ইঙ্গিতপূর্ণ কথাটি শোনা মাত্রই নীলার লজ্জায় গা রিমিঝিমি করে উঠল। সে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না। এক পরম লজ্জার সাগরে ডুবে সে এক দৌড়ে রান্নাঘর থেকে সোজা বাইরের দিকে চলে এলো।
মিহাল রান্নাঘরে শব্দ করে হেসে উঠল এবং সেই আনন্দ নিয়েই রান্নায় মন দিল।
ওদিকে নীলা এক ছুটে ড্রয়িংরুমে গিয়ে সোফায় বসা ফুফুর গায়ের সাথে ঘেঁষে ওনার কাঁধে মাথা রাখল। মিনা মির্জা মুচকি হেসে পরম স্নেহে নীলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। ঠিক তখনই নীলার ফোনটা বেজে উঠল। বাংলাদেশ থেকে তার মা ভিডিও কল দিয়েছেন। ফুফুর কাঁধে মাথা রেখেই নীলা ফোনটা ধরতেই স্ক্রিনে মায়ের মুখ ভেসে উঠল। ওনাকে ঘিরে বসে আছেন নীলার জেঠী, চাচী এবং ছোট সদস্য ইবাদ। নীলাকে ওপাশে ফুফুর কাঁধে ওভাবে মাথা রাখতে দেখে বাড়ির মহিলারা বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। কারণ বাংলাদেশে থাকতেও নীলা ঠিক এইভাবেই সবার কাঁধে মাথা রাখত। সবাই বুঝতে পারলেন, তাদের মেয়েটি অবশেষে জীবনের সত্যিকারের সুখ খুঁজে পেয়েছে। ওদিকে এক কোণে, সবার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল আরশি। স্ক্রিনে নীলার সুখী মুখটা দেখে তার নিজের ঠোঁটের কোণে এক তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল, তার ভাগ্যে কেন এমন সুখ নেই? বিয়ের আগে মা-বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, আর বিয়ের পর মির্জা বাড়িতে এসে না পায় মানুষের শ্রদ্ধা, না পায় নিজের স্বামীর ন্যূনতম ভালোবাসা। ঠিক তখনই তার মনে পড়ে গেল নীলার বলা সেই পুরোনো কথাটি, “প্রকৃতির প্রতিশোধ খুব ভয়ঙ্কর আরশি, এটা মানুষকে একদম ধ্বংস করে দেয়।” অতীতের সেই অমোঘ সত্যটি নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে আরশি এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ আর নীলার এই সুখ দেখে তার মনের ভেতর কোনো হিংসা হলো না। বরং নিজের কৃতকর্ম আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভাগ্যের জন্য এক চরম আফসোস হতে লাগল।

মিহাল বেশ নিখুঁতভাবে নিজের মতো করে রান্না শেষ করল। রান্নার হাত তার বরাবরই ভালো। আজকের দুপুরের মেন্যুতে সে রেখেছে গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, মুচমুচে আলু ভাজি, ডিম ভুনা আর ঘন ডাল। তার মন বলছিল নীলার এই দেশি খাবারগুলোই বেশি ভালো লাগবে, তাই পরম মায়ার সাথে সে এগুলোই রাঁধল। তবে নিজের জন্য সে তৈরি করল চিকেন সালাদ আর ভেজিটেবল স্যুপ, কারণ ডায়েটের কারণে রিচ ফুড তার একদমই সইবে না। সব শেষ করে তার মনে হলো একটা ডেজার্ট বানানো দরকার। কী বানাবে তা নিয়ে যখন সে কিছুটা দ্বিধায়, ঠিক তখনই ফলের ডালিতে লাল টুকটুকে চেরি দেখে তার মাথায় এলো চেরি ক্লাফউটি (Cherry Clafoutis) বানানোর আইডিয়া। যেই ভাবা, সেই কাজ সে দ্রুত প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী টেবিলের ওপর এনে সাজিয়ে রাখল। ওদিকে নীলা এতক্ষণ ড্রয়িংরুমে বসে কথা বললেও তার মনে হলো, মিহাল একা একা এত কিছু করছে, তাকে একটু সাহায্য করা উচিত। সে নিজের মোবাইল ফোনটি ফুফুর হাতে দিয়ে ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে এলো। ভেতরে এসে সে দেখল মিহাল ড্রয়ার থেকে গভীর মনোযোগে কী যেন বের করছে । নীলা আলতো পায়ে কিচেন কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল, যেখানে দুপুরের খাবারগুলো সাজিয়ে রাখা আছে। ঢাকনা তুলে নিজের সব পছন্দের দেশি খাবার এক সাথে দেখে তো তার জিভে জল চলে এলো, মনে মনে সে ভীষণ খুশিও হলো।ৎসে ঘুরে দেখল মিহাল তখন বেসিনে চেরি ধুতে ভীষণ ব্যস্ত । নীলা গুটি গুটি পায়ে মিহালের ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল এবং নরম গলায় বলল,
“আমিও হেল্প করতে চাই আপনাকে।”

মিহাল মুখে কোনো জবাব দিল না। সে কেবল ঠোঁটের কোণে তার বাঁকা হাসিটি ফুটিয়ে হুট করে নীলার দিকে ঘুরল। নীলা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, মিহাল নীলার কোমর দুহাতে চেপে ধরে এক ঝটকায় তাকে উঁচিয়ে কিচেন কাউন্টারের ওপর বসিয়ে দিল। আচমকা শূন্যে ভেসে ওঠায় নীলা ভয়ে আর চমকে নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। মিহাল নীলার এই লাজুক কাণ্ড দেখে মুচকি হাসল। সে নীলার মুখের একদম কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
“হেল্প করতে চাও? তাহলে লক্ষ্মী মেয়ের মতো এখানে চুপচাপ বসে থাকো । আমি ডেজার্ট বানাচ্ছি। তোমার মতো সুইটিপাইকে সামনে রেখে যেকোনো সুইট জিনিস বানালে, সেটার টেস্ট এমনিতে অনেক বেশি ভালো হবে।”
মিহালের মুখে এমন প্রকাশ্য ফ্লার্ট শুনে নীলা লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল এই লোকটা ইদানীং তাকে বড্ড বেশি জ্বালাতে শুরু করেছে। সে লজ্জায় আর কোনো পাল্টা কথা না বলে চুপচাপ মুখ নিচু করে রইল, আর মিহাল ও নিজের মতো করে ডেজার্ট বানানোর কাজে মগ্ন হয়ে গেল। নীলা একমনে মিহালের দিকে তাকিয়ে রইল।

পুরুষ মানুষটি প্রতিটি কাজ কতটা সুন্দর আর নিখুঁতভাবে গুছিয়ে করছে, তা ভাবতেই ও অবাক হচ্ছিল। নীলা দেখল, মিহাল প্রথমে ওভেনটি ১৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে প্রি-হিট করতে দিল এবং একটি বেকিং ডিশে মাখন ভালো করে মাখিয়ে রাখল। ঠিক তখনই মিহালের একটি কাণ্ড নীলাকে বেশ চমকে দিল। মাখন মাখানোর মাঝেই মিহাল খুব যত্ন করে চামচে একটুখানি মাখন তুলে ওর মুখের সামনে ধরল, আর নীলাও কোনো দ্বিধা না করে তা মুখে পুরে নিল। এরপর মিহাল বেকিং ডিশের নিচে বিচি ছাড়ানো লাল চেরিগুলো একে একে সমানভাবে বিছিয়ে দিতে লাগল। এবারও সে নিজের হাত বাড়িয়ে কয়েকটি চেরি নীলার মুখের সামনে ধরল। ঠিক তখনই নীলার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। সে চেরিটা মুখে নেওয়ার ছলে মিহালের আঙুলটি নিজের মুখের ভেতর নিয়ে বেশ শক্ত করে একটা কামড় বসিয়ে দিল। নীলা ভেবেছিল মিহাল হয়তো ব্যথায় চিৎকার করে উঠবে, কিন্তু সে তা না করে উল্টো নিজের সেই কামড় খাওয়া আঙুলটি ঠোঁটের কাছে এনে পরম মায়ায় একটা চুমু খেল। যেখানে একটু আগেই নীলার ঠোঁট আর দাঁতের স্পর্শ লেগে ছিল। মিহালের এমন কাণ্ডে নীলা চরম লজ্জা পেয়ে ঝট করে নিজের মুখ নামিয়ে নিল। মিহাল এবার মিষ্টি হেসে ডেজার্টের ব্যাটার তৈরি করার প্রস্তুতি নিতে লাগল। সে যখন মিক্সিং বোলটি টেনে নিয়ে ময়দা দেওয়ার জন্য এগোচ্ছিল, তখন নীলা নিজেকে সামলে নিয়ে উৎসাহী গলায় বলল,

“আমি হেল্প করছি।”
কথাটি বলেই নীলা যেই না ময়দার প্যাকেটটি হাতে নিয়ে একটু ঝাঁকুনি দিয়ে ছেঁড়ার জন্য জোরে টান দিল, অমনি পুরো প্যাকেট থেকে ছিটকে সমস্ত ময়দা বাতাসে উড়ে গেল। এক মুহূর্তের মধ্যে পুরো রান্নাঘর আর তাদের দুজনের শরীর ধবধবে সাদা ময়দায় মাখামাখি হয়ে গেল। দুজনেই এখন ময়দার ভূত সেজে একে অপরের দিকে তাকিয়ে বোকা বনে দাঁড়িয়ে আছে। আসলে মিহাল কাজের সুবিধার জন্য ময়দার প্যাকেটটি আগেই সামান্য খুলে রেখেছিল, কিন্তু নীলা কাজটা এত হুট করে আর তাড়াহুড়ো করে করে ফেলল যে মিহাল তাকে সতর্ক করার ন্যূনতম সুযোগটুকুও পেল না। আর তার ফলেই ঘটে গেল এই তুলকালাম কাণ্ড। তারপর আর কী, নিজেদের এমন অদ্ভুত রূপ দেখে দুজনেই একসঙ্গে শব্দ করে হেসে উঠল। মিহাল আলতো পায়ে এগিয়ে এসে কিচেন কাউন্টারে বসা নীলার দুই পায়ের মাঝে এসে দাঁড়াল। মিহাল এতটা কাছে আসতেই নীলার বুকের ভেতর হার্টবিট অনেক বেড়ে গেল। মিহাল অত্যন্ত যত্ন নিয়ে নিজের হাত দিয়ে নীলার শরীর এবং চুল থেকে জমে থাকা ময়দাগুলো আলতো করে সরিয়ে দিতে লাগল। ময়দা পরিষ্কার করার ছলে সে মাঝে মাঝে নীলার মায়াবী চেহারায় আলতো করে ফুঁ দিচ্ছিল। নীলার আজকাল মিহালের এই নিবিড় স্পর্শ পেতে কিংবা তার কাছ থেকে এমন অবারিত যত্ন নিতে বেশ ভালোই লাগে। তাই তো সে কোনো বাধা না দিয়ে, এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে চোখ বন্ধ করে এই সুন্দর অনুভূতিটা নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে অনুভব করতে লাগল। ময়দা পরিষ্কার করা শেষে মিহাল নীলার কোমর দুহাতে আলতো করে ধরে আবার তাকে কিচেন কাউন্টার থেকে নিচে নামিয়ে দিল। তারপর নীলার চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“যান, আপনি এবার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমার ডেজার্টের কাজ প্রায় শেষ, আমি এই চেরি ক্লাফউটি ওভেনে বসিয়ে দিয়ে বাকি কিচেনটা ক্লিন করে আসছি।”

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৮

নীলা আর কোনো পাল্টা কথা বলল না, কিংবা নতুন করে সাহায্য করার কোনো ইচ্ছাও প্রকাশ করল না। একবার সাহায্য করতে গিয়ে যে তুলকালাম কাণ্ড সে ঘটিয়েছে, তারপর মিহালকে সাহায্য চাওয়ার মতো মুখ তার আর ছিল না। তাই সে আর এক মুহূর্তও রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে না থেকে, এক দৌড়ে নিজের রুমের দিকে যেতে লাগল। তার মনের ভেতর তখন একটাই ভয় যখন-তখন যদি তার ফুফু রান্নাঘরে চলে আসেন। ভাগ্যিস ভালো যে তার ফুফু ওপাশে মায়ের সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে নিজের বেডরুমে চলে গিয়েছিলেন। নয়তো ড্রয়িংরুমে ফুফু থাকলে, ময়দায় মাখামাখি হওয়া এই ভূতুড়ে অবস্থায় সে ওনার সামনে দিয়ে কীভাবে যে নিজের ঘরে যেত, তা ভেবেই ও শিউরে উঠল।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here