সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩১
জাবিন ফোরকান
“সবাই প্রজেক্ট জমা দিয়েছ?”
“ইয়েস, প্রফেসর।”
সমস্বরে উত্তর ভেসে এলো। জায়দান শিক্ষার্থীদের দিকে চেয়ে হালকা মাথা দুলিয়ে টেবিলের উপর স্তূপ হয়ে থাকা অ্যাসাইনমেন্ট পেপারগুলো একে একে গোছাতে লাগলো। শিক্ষার্থীরা নিজেদের ব্যাগ গুছিয়ে তাকে সালাম দিয়ে দিয়ে বেরোচ্ছে। টেবিলের সামনে এসে থামলো সি আর নিরুপমা।
“প্রফেসর?”
“হুম? কিছু বলবে? কোনো প্রবলেম পেয়েছ আজকের লেসনে?”
মাথা নাড়ল নিরুপমা। খানিক ইতস্তত করে শেষমেষ জিজ্ঞেস করল,
“আপনি ঠিক আছেন? আপনাকে খানিক অসুস্থ দেখাচ্ছে।”
জায়দান থামলো। চশমার আড়ালে বাদামী চোখজোড়া মেলে দেখল মেয়েটি চেয়ে আছে তার হাতের ব্যান্ডেজের দিকে। প্রথমটায় জবাব দিতে ইচ্ছা হলনা। তবে পরবর্তীতে কি মনে করে সে জানালো,
“তেমন কিছু নয়। ছোট্ট একটা অ্যাকসিডেন্ট। আই অ্যাম ফাইন, থ্যাংকস ফর আস্কিং।”
“প্রফেসর, আমি সাহায্য করি?”
একজন ছেলে এগিয়ে এলো। স্তূপ করে রাখা অ্যাসাইনমেন্ট পেপারগুলোর দিকে ইঙ্গিত করল, যা পরিষ্কারভাবে জায়দানের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব না। নিঃশব্দে সম্মতি জানালো সে। ছেলেটি এবং নিরুপমা, দুজন মিলে অ্যাসাইনমেন্ট পেপারগুলো ভাগাভাগি করে নিয়ে জায়দানের পিছন পিছন এগোলো। অফিসে সবকিছু পৌঁছে দিয়ে দুজন বিদায় নিতেই জায়দান নিজের চেয়ারে বসলো। মোবাইল ফোন বের করে সেলফি ক্যামেরায় নিজের চেহারা দেখলো। খানিকটা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। কোনোপ্রকার পরিবর্তন এলোনা অভিব্যক্তিতে তার। ফোন বন্ধ করে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে চেয়ারে হেলান দিল সে। মাথায় হাতের উল্টোপিঠ ঠেকিয়ে বেশ খানিকক্ষণ চুপটি করে চোখ বুঁজে বসে রইলো।
ভার্সিটির সকল লেকচার এবং রিসার্চ ওয়ার্ক শেষে জায়দান যখন বেরোলো তখন বিকাল। সাধারণত রাত হয়ে গেলেও আজ সে খানিকটা তাড়াতাড়ি সব কাজ শেষ করেছে। নিজের বাইকে চেপে বসে চাবি ঘুরিয়ে ইঞ্জিন চালু করল সে। অতঃপর বাইক ছুটিয়ে চলল রাজধানীর সড়কপথ ধরে। একটি সুপারশপ আউটলেটের সামনে থেমে বেশকিছু দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্রের বাজার করলো। অতঃপর আবার ফিরে এলো বাইকে। হেলমেট মাথায় চড়িয়ে এগিয়ে চলল নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
জায়দানের গন্তব্যের সমাপ্তি ঘটলো আগারগাঁওয়ের নিকটবর্তী এক আবাসিক এলাকায়। দশ তলা, বারো তলা, পনেরো তলা অবধি বিল্ডিংয়ে বোঝাই চারপাশ। প্রশস্ত গলির ভেতর দিয়ে একটি দশ তলা ভবনের সামনে এসে থামলো জায়দানের বাইক। ইঞ্জিন বন্ধ করে হেলমেট খুলে ধীরেসুস্থে সে নামলো। ফরমাল প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে একবার চারপাশ পরখ করে দেখলো। অতঃপর কিনে আনা জিনিসগুলোর প্যাকেট হাতে নিয়ে গেটের ভেতর এগোলো।
“আসসালামু আলাইকুম, সাহেব।”
“ওয়ালাইকুমুস সালাম।”
দারোয়ানের সালামের জবাব দিয়ে এলিভেটরের দিকে এগোলো জায়দান। ভেতরে ঢুকে সাত তলার বোতাম চাপলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলো। ফ্ল্যাট সেভেন সি এর সামনে গিয়ে সে আলতো করে দরজায় নক করল। মিনিটখানেকের মাথায় দরজা খুলে গেলো। দেখা দিলো এক রমণীর সতর্ক মুখ। জায়দানকে দেখে সতর্কতা শান্তিতে রূপ নিলো। দরজা খুলে দিলো সে,
“ভালো আছেন, ভাইয়া? আসুন, ভেতরে আসুন।”
“আলহামদুলিল্লাহ। তোমার কি খবর, মীরা?”
“ভালো।”
ফ্ল্যাটের ভেতরে পা রাখলো জায়দান। মীরা দ্রুতই দরজা আটকে দিলো। সামনের কফি টেবিলের উপর নিজের সঙ্গে আনা প্যাকেটগুলো জায়দান রেখে দিয়ে চেয়ারে বসলো। মীরা ভেতরের রুমে গায়েব হয়ে গেলো। পরক্ষণেই ফিরে এলো এক গ্লাস লেবুর শরবত হাতে।
“নিন। চিনি দেইনি।”
“থ্যাঙ্কস।”
জায়দান গ্লাসটি গ্রহণ করে চুমুক দিলো। মীরা বিপরীত দিকের চেয়ারে বসে টেবিলে ছড়িয়ে রাখা জিনিসগুলো দেখলো। ফলমূল, স্ন্যাক্স জাতীয় খাবার এবং প্রসাধনীর বেশকিছু জিনিসপাতি। অন্য প্যাকেটে আছে প্যাকেটজাত শাকসবজি, চাল, ডাল এবং অন্যান্য। বিব্রতবোধ করলো মীরা।
“আপনি এতকিছু এনেছেন কেন? আমি মাত্র গতকালই অনেক কিছু বাজার করে এনেছি।”
“ব্যাপার না। এখন না লাগলেও পরবর্তীতে লাগতে পারে।”
“লাগলে আমি নিয়ে আসতে পারতাম।”
“আমি জানি তুমি নিয়ে আসতে পারতে। কিন্তু আমি নিজে নিয়ে এসে খানিকটা সাচ্ছন্দ্যবোধ করছি। এটাকে কি অপরাধ ধরবে তুমি?”
মীরা দ্রুত মাথা নাড়লো,
“আরে, না না ভাইয়া! কি সব বলছেন আপনি? আমি শুধু…”
নিজের কোলের দিকে তাকাল সে। ওড়নার খুঁট দুই আঙ্গুলে পেঁচিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আপনি আমার জন্য অনেক করেছেন। নিজেকে আর ঋণী করতে চাইছিনা।”
নিজের অতীতের দিনগুলোর কথা স্মরণ করলো মীরার। সাবিনের কাছ থেকে দূরে সরে সে প্রথমটায় উঠেছিল এক প্রাইভেট লেডিস হোস্টেলে। কিন্তু হাতে তখন বিশেষ উপার্জনও ছিলোনা, নিজের জমানো টাকাগুলো বাদে। অতঃপর সে গ্রামের বাড়িতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়। বাবা-মা হীন হয়ে চাচার বাড়িতে বেড়ে ওঠা স্থানটাই তার গ্রামের বাড়ি। পৌঁছেও গিয়েছিল সে। গিয়ে মাত্র দেখে চাচাতো বোনের বিয়ের উদযাপনে ব্যস্ত পরিবার। মীরাকে কোনোদিনও সঠিকভাবে গ্রহন করে নিতে শেখেনি কেউই। এবারেও নেয়নি। হুট করে ঢাকা থেকে গ্রামে চলে যাওয়ায় নানান প্রকার কথাবার্তা আরম্ভ হয়। শুধু ঘুরতে গিয়েছে, এই বিষয়টা যেন কারোরই হজম হচ্ছিলো না। উপরন্তু বিয়েবাড়ি। নানান জায়গার নানান রকম মানুষ। বলা বাহুল্য মাত্র দুইদিনের মাথায় মীরাকে বাড়ির বউ করার প্রস্তাব দেয় প্রতিবেশীদের একজন। ছেলে তার ৩৫ বছর বয়সী প্রবাসী, আগের বউ ক্যা*ন্সারে বাপের বাড়িতে ধুঁকে ধুঁকে মরেছে এক সপ্তাহও হয়নি। তাদের বউ চাই, সঙ্গে চাই ছেলে সন্তান জন্ম দেয়ার একটা মেশিন। মীরার চাচী উঠে পড়ে লাগেন। এর চাইতে ভালো কোনো সম্বন্ধ নাকি মীরা পাবেনা। শহরের বড় ভার্সিটিতে পড়ে কি ছিঁড়বে জীবনে? দিনশেষে রান্নাঘরের খুন্তিই ঠেলতে হবে। এতিম মেয়েকে কেই বা ঘরে তুলবে? মীরার বুঝতে বাকি থাকেনি, এর জন্য তার চাচার পরিবারকে বেশ মোটা অংকের উপহার প্রদানের ওয়াদা করা হয়েছিল। এক দন্ড থাকেনি সেখানে মীরা আর। ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এসেছে।
ঢাকায় ফিরে যখন কি করবে না করবে দিশাহীন সে, তখনি হঠাৎ মনে পড়ে সেদিন হাসপাতালে জায়দানের দেয়া কার্ডের কথা। লোকটাকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ তার কাছে ছিলোনা। অথচ তাকে অল্প খানিক যতটুকু দেখেছে, তাতে ঠিক হেলাফেলাও করতে পারছিল না। সাবিনের কাছে ফিরবে কি না ভাবতে ভাবতে অবচেতন মনে সে শেষমেষ জায়দানের সঙ্গে যোগাযোগ করেই ফেলে। অতঃপর তার স্থান হয় এই নতুন ঠিকানায়। বিল্ডিংয়ের মালিক জায়দান আরেফিনের বন্ধু হয় খুব সম্ভবত। বাসা ভাড়া যা হওয়ার কথা, তার চাইতে অনেক কমই নেয়া হচ্ছে। উপরন্তু সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা তো আছেই। মীরা তাই জায়দানের কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ। প্রতি সপ্তাহে একবার এই লোক তাকে দেখতে আসে। তাকে রীতিমত অনুরোধই করেছে সে, যেন সাবিনকে কখনো তার ঠিকানা না জানায়। যতদিন না মীরা নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারছে, ততদিন অতীত জীবনে ফেরার তাড়া নেই তার মাঝে।
জায়দান লেবুর শরবত শেষ করে সোজা হয়ে বসল। চশমা খুলে নিলো এক হাতে। পকেট থেকে সিনথেটিক রুমাল বের করে লেন্স মুছতে মুছতে বলল,
“তুমি যদি ভেবে থাকো এসবকিছু আমার ঋণ কিংবা দান, তাহলে ভুল ভাবছো।”
চোখ তুলে জায়দানকে দেখলো মীরা। হাতের চশমা মোছা শেষ করে সেটি চোখে লাগিয়ে জানাল,
“মানুষ যখন কারো কাছ থেকে কিছু ফেরত দেয়ার প্রতিজ্ঞায় গ্রহণ করে, তাকে ঋণ বলে। আর কোনো মানুষ যখন অন্য কারো উপর দয়া করে বিনা ফেরতের আসায় কিছু প্রদান করে, তাকে দান বলে। তুমি না আমার কাছে কিছু চেয়েছ, আমি না তোমার প্রতি দয়া বোধ করছি। আমি স্রেফ একজন মানুষ হিসাবে আমার কর্তব্য পালন করছি আমার নিজের বিবেকের শান্তির জন্য। তাই ঋণ দানের কাতারে সেসব না ফেলাই উত্তম।”
নির্বাক মীরা চেয়ে রইলো জায়দানের পানে। তার অন্তরজুড়ে অসামান্য এক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হলো। ওই বাদামী চোখজোড়া তাকে সবসময় বিশেষ একজনের কথা মনে করিয়ে দেয়। বর্তমানে যার মুখটা মনে হলেও ঘৃণা এবং ব্যথায় অন্তর কুঁচকে আসে মীরার। সে আজ হতবাক হয়ে উপলব্ধি করল, এক উদরে জন্ম নেয়া দুই সন্তানের মাঝে কতটা ভিন্নতা থাকতে পারে! পুরুষের স্পর্শের প্রতি একটা মারাত্মক ভয় জন্মেছে মীরার। বাইরে গেলে বাজারে, দোকানে বারংবার মনে হয় যেন আশেপাশের পুরুষেরা তাকে দৃষ্টি দিয়েই হজম করে ফেলছে। যদিও মীরা জানে, তারা সেভাবে তাকিয়ে নেই। তবুও।
অথচ এই লোকটা যখন আসে, তখন তেমন কোনো বোধই হয়না। সে বরাবর মীরার কাছ থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে চলে। বেশিরভাগ সময়ই চোখ থাকে ভিন্ন দিকে। অস্বস্তিবোধ দূরে থাক, বরং নিরাপদ মনে হয় মীরার নিজেকে। সাবিন আর জায়দানের মাঝে ঠিক কি এমন হয়েছিল যাতে আজ দুজন ভিন্ন পথের পথিক? এই রহস্য মনে করে তাই আজও মীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“সাবিন কেমন আছে?”
অবশেষে দীর্ঘ ইতস্তত মনোভাব ঝেড়ে মীরা প্রশ্নটা করেই ফেলল। জায়দান খানিকটা সময় নিশ্চুপ বসে থাকল। তার ভাবুক দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত রুমের জানালার দিকে। কিছু সময় পর সে উত্তর করল,
“আমি ওকে ভালো থাকতে দেইনি।”
মীরার ভ্রু উঁচু হলো বিস্ময়ে। জায়দান হঠাৎ নিজেকে দোষারোপ করে কথা বলছে কেন বুঝতে পারলনা সে।
“কিছু হয়েছে নাকি?”
উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল মীরা। জায়দান ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেললো।
“আমি যবে থেকে ওর জীবনে এসেছি, তবে থেকেই কিছু না কিছু তো হয়েই আসছে। নতুন করে বলার আর কিছুই নেই।”
মীরা খানিক সময় চুপ করে জায়দানকে পর্যবেক্ষণ করল। সাবিনের কথা বলার সময় তার সদা পাথুরে মুখজুড়ে যে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে, তা আজ ধরতে পারল সে।
“আপনাকে একটা কথা বলি? কিছু মনে করবেন না।”
মীরা বলতেই জায়দান অবশেষে তার দিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকাল।
“আপনার কথা শুনে মনে হয়, আপনি সাবিনকে খুব ভালোবাসেন, এখনো।”
জমে গেল জায়দান।
ভালোবাসা?
উপলদ্ধিটি নিয়ে কি করা উচিত জায়দান টের পেলনা। সে শুধু নিষ্পলক চেয়ে রইল মীরার দিকে। রমণী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দূর আকাশে ছুটে যাচ্ছে একজোড়া কাক। দেখতে হয়ত বিশ্রী প্রাণী, মানুষের মতে। কিন্তু মীরার চোখে তাদের চেয়ে সুন্দর বস্তু এই মুহূর্তে দুটো নেই।
“আমার এই ছোট্ট জীবনে এতিম হওয়ার দরুণ আমি অনেক কিছু দেখেছি। কারণ আমাকে জাগতিক পঙ্কিলতা থেকে আগলে রাখার কেউ ছিলনা। অনেক ধরনের বোকামিও করেছি। যা আমায় নিত্য নতুন শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু আমি আপনার এবং সাবিনের মতন মানুষকে দেখিনি কখনো। যারা এতটাই বোকা যে নিজেদের স্পষ্ট অনুভূতি থাকা সত্ত্বেও নিজেদের কাছে সেসব স্বীকার করতে নারাজ।”
নিঃশব্দ রইল জায়দান। মীরার প্রতিটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল।
“সাবিন আমাকে বারবার ভালোবাসার কথা জিজ্ঞেস করত। জিজ্ঞেস করত মায়ার কথা। ও জানতে চাইত, বুঝতে চাইত। আমি তখন বুঝতে পারিনি, তবে আজ জানি, ওর প্রতিটি প্রশ্ন, প্রতিটি কৌতূহল, প্রতিটি আগ্রহ জুড়ে শুধু আপনিই ছিলেন। মেয়েটা নিজেও হয়ত বুঝত না সে আপনাকে কত করে চায়! একটু মাথা গরম কিনা! কিন্তু জায়দান, আপনি তো বোঝদার। আপনি কেন ওকে ছেড়ে দিলেন এই পঙ্কিল দুনিয়ার মাঝে একলা?”
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল জায়দান। ভ্রুজোড়া সামান্য কুঁচকে এসেছে তার। কন্ঠ পরিষ্কার করলো সে,
“মীরা? আমার যাওয়া উচিত এখন।”
সামান্য হাসলো মীরা, তীর্যক হাসি। ফিরে তাকিয়ে মাথা দুলিয়ে বলল,
“পালিয়ে যাচ্ছেন? অবশ্যই। আমি আপনাকে আটকানোর কেউ হইনা বিধায় আটকালাম না। তবে একটা কথা মাথায় রাখবেন। জগতের কাছ থেকে পালিয়ে বাঁচা সম্ভব, কিন্তু নিজের কাছ থেকে পালানো অসম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, আমাকেই দেখে নিন।”
স্থির চেয়ে রইল জায়দান, একদৃষ্টে, নিষ্পলক। ওই বাদামী দৃষ্টিমাঝে বুঝি অব্যক্ত কোনো অনুভব ভাসলো। মীরা বুঝে ওঠার আগেই সে উল্টো ঘুরে গেল। দরজার দিকে এগোলো। বাইরে পা রাখার আগে এক মুহুর্ত থামলো জায়দান। তার প্রশান্ত, ভারী কন্ঠজুড়ে ধ্বনিত হলো,
“সমাপ্তির ওপাড়ে সূচনা আমার বুকের মরুভূমির মাঝে ধূসর মরীচিকা।”
এটুকুই। আর দাঁড়ালনা জায়দান। বেরিয়ে গেলো বাইরে।
দুইদিন হয়েছে আমি সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে আম্মুর সাথে থাকছি।
আজ সকাল থেকে আকাশে বেশ খানিকটা রোদ উঠেছে। শীতের শেষদিকের রোদ বড্ড নরম। সেই রোদে বারান্দায় বসে আমার মাথার চুলে তেল দিয়ে দিচ্ছেন সাবিনা।
“চুলের যে বাহার করছো তুমি আম্মা! ব্যবসা করো, ভালো কথা, কিন্তু নিজের যত্ন নিতে ভুইলা গেলে হবে?”
চোখ বুঁজে তার কথা শুনতে শুনতে মৃদু হেসে শুনে যাচ্ছি সব। মায়েরা বোধ হয় এমনি হয়। আদর দিয়ে বকাঝকা করতে পারেন। আমার চুল টেনে টেনে সুন্দর মতন তেলতেলে পরিপাটি খোঁপা বেঁধে দিয়ে তিনি আমার কপালে একটা গাঢ় চুমু দিয়ে বললেন,
“এত তাড়াতাড়ি চইলা না গেলে হয়না আম্মা? আরেকটা দিন থাইকা যাও আম্মুর কাছে?”
উল্টো ঘুরে সাবিনাকে জড়িয়ে ধরে তার ঘাড়ে মাথা গুঁজলাম।
“আমি তো তোমার কাছে আজীবন থেকে যেতে চাই আম্মু। কিন্তু ক্যাফে এতদিন বন্ধ রাখা তো যায়না, বলো?”
“তাও ঠিক, তাও ঠিক। আমার আম্মার মাথায় তো অনেক বড় দায়িত্ব। আচ্ছা আম্মা, তুমি আইসো আবার। কেমন? আর শুনো।”
আমার মুখ দুহাতে আলতোভাবে চেপে নিজের চোখের সঙ্গে দৃষ্টি মেলালেন সাবিনা। দৃঢ় গলায় বললেন,
“যে যাই বলুক, তুমি সবসময় আমার কথা মনে রাখবা। তোমার আব্বু অনেক ভালো একজন পুরুষ, ওনার মতন পুরুষ আমি আমার হাফ সেঞ্চুরির জীবনে দেখিনাই। ওনার ইজ্জতের মায়া ছিলো, তার থেইকাও বেশি ছিলো তোমার আর আমার পরোয়া। উনি জীবনে অনেক ভুল করছেন, এইটা যেমন ঠিক, তেমন এইটাও ঠিক যে উনি আমার আর তোমার জীবনের সব। কারো কথায় কখনো ভুইলো না আম্মা। আর….”
সাবিনা স্পষ্ট খানিক ইতস্তত করলেন। অতঃপর ঝুঁকে এসে আমার কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে জানালেন,
“তুমি যাই করো না কেন, যার বিরুদ্ধেই লড়াইয়ে নামো না কেন, একটা কথা জাইনা রাইখো, তোমার আম্মু তোমার পাশে আছে। তোমার আব্বুও আমাদের দেখতেসে বুঝলা? উনিও আমাদের সাথেই আছে।”
“তুমি ড্যাডকে অনেক ভালোবাসো, তাইনা আম্মু?”
সাবিনা মুচকি হাসলেন,
“স্বামী রে ভালোবাসে না কোন মাইয়া? শুধু সমাজ জানেনা উনি আমার স্বামী হয়। তাতে কি? আমি তো জানি!”
“তাহলে ড্যাড কোনোদিন তোমাকে এই নরক থেকে নিয়ে যায়নি কেন?”
এমন ভঙ্গিতে সাবিনা আমায় দেখলেন যেন আমি কোনো অবুঝ শিশু। ঝুঁকে আমার দুই গালে দুটো স্নেহের চুমু এঁকে তিনি বললেন,
“সেইটা তুমি বড় হইলেই বুইঝা যাবা।”
হা করে চেয়ে থাকলাম। আর কত বড় হওয়ার দরকার? যেন আমার চোখেমুখে লেগে থাকা প্রশ্নটি সাবিনা পড়তে পারলেন, তাই খিলখিল করে হেসে ফেললেন,
“মায়ের কাছে সন্তান আজীবন ছোটই থাকে, আমার আম্মা!”
অত্যন্ত আদরমাখা দৃষ্টিতে আমায় দেখে তিনি বললেন,
“সবসময় এমনই থাইকো আম্মা, কেমন? কারো জন্য নিজের মাথা নামাইয়ো না। তোমার আব্বু কোনোদিন নিজের উঁচু মাথা নিচু হইতে দেয়নাই, স্মরণে রাইখো।”
সাবিনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন বাইরের দুনিয়ায় পদার্পণ করলাম, তখন আমার মন ভীষণ ফুরফুরে। এক আরামদায়ক উষ্ণতায় ঘেরা যেন সমস্ত অস্তিত্ব। ঠোঁটে সামান্য পরিতৃপ্তির হাসি।
কার্ডিগানের পকেটে দুহাত গুঁজে ধীরে ধীরে সড়ক বেয়ে এগোলাম। আজ কেন যেন গাড়ি নিতে ইচ্ছা হচ্ছেনা। লোকালেও ঠেলাঠেলি করে ওঠার মনোভাব নেই। বরং হাঁটতে ভালো লাগছে। আশেপাশে দেখতে দেখতে এগোচ্ছি। মাথায় তখন সেজে চলেছে নতুন এক পরিকল্পনা। এটি আমার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে নয়। বরং সম্পূর্ণই ভিন্ন একটি বিষয়ে।
বড় চাচা আর ওনার গুষ্টিকে আমি এত শান্তি দেব নাকি? বহু বছর শান্তিতে থেকেছে। এবার তার আর তার কুলাঙ্গার সন্তানের জীবনে আগুন ধরানোর পালা আমার।
“সাবিন?”
ডাকটা শুনেই আমার সমস্ত শরীর জ্বলে উঠল। পিছনে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই। তবুও অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে ফিরে দেখলাম। অদূরে দাঁড়িয়ে আয়দান।
পরনে একটা ফ্লানেল শার্ট এবং জিন্স। আমার দিকে চেয়ে আছে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। যেন আমি তার সম্বন্ধী লাগি! শয়তানের বাচ্চা একটা!
আয়দান এগিয়ে এলো কয়েক পা।
“সাবিন আমার…”
“ম্যানহোলের ঢাকনা কোথাকার!”
বিদ্যুৎ গতিতে পা থেকে জুতো খুলে বের করে সজোরে ছুঁড়ে দিলাম। আয়দান বোধ হয় এমন প্রতিক্রিয়া আন্দাজ করেছিল। ঝপাৎ করে উবু হয়ে বসে পড়ল সে। জুতাটা তার মাথার চুল স্পর্শ করে উড়ে গিয়ে পড়ল অপর প্রান্তে। সাপের মতন হিসিয়ে উঠে দ্বিতীয় জুতাটাও খুলে ফেললাম।
“আরে উত্তেজিত সজারুর বাচ্চা! আমার কথাটা আগে শোন একটু…!”
“গন্ডারের অওলাদ!”
এবার জুতাটা গিয়ে পড়ল আয়দানের মুখ বরাবর। ছিটকে গেল সে, ধপাস করে বসে পড়ল ফুটপাথের উপর। প্রচন্ড জোরে হুংকার দিয়ে উঠল,
“বেয়াদব ছেড়ি! তোকে!”
জুতাটা তুলে পাল্টা ছুঁড়ে মারতে গিয়েও ছুঁড়লোনা আয়দান। শুধু অগ্নিদৃষ্টিতে চেয়ে রইল। পরক্ষণে জুতা ফেলে দুহাতে চুল আঁকড়ে ধরে কি যেন বিড়বিড় করল। বোধ হয় রাগ ঠান্ডা করার মন্ত্র! কে জানে!
“মহা মাননীয়া সাবিন হুসেইন, দয়া করে আমার কথাটা একটু শোনার কৃপা করবেন, প্লীজ?”
থ হয়ে আয়দানের দিকে চেয়ে থাকলাম। এই ছেলে কি বলছে এসব? আসলেই আয়দান তো? আয়দান আমার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলো। রীতিমত শান্ত গলায়ই জিজ্ঞেস করল,
“মীরা কোথায়?”
অবাক কিংবা রাগান্বিত হওয়ার সুযোগই পেলনা। এর আগেই ইঞ্জিনের শব্দ কানে গেল আমার। একদম পাশ ঘেঁষে এসে থামলো একটি বাইক। একমাত্র চাহুনিতেও ঠাওর করতে কিছুই বাকি রইলনা আমার। আয়দানও বেশ বিস্মিত হয়ে তাকালো। হেলমেট খুলতেই দৃশ্যমান হলো আমাদের উভয়ের অতি পরিচিত মুখখানি।
জায়দান।
বাইক থেকে পা নামিয়ে দাঁড়াল সে। পরনে আজ স্যুট নেই। লেদার জ্যাকেট এবং কালো জিন্স। পায়ে ভারী কালো কেডস। চশমাটা চোখে দিয়ে সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল আয়দানের দিকে।
“ওয়াও! তুমি মানুষের বডিগার্ডগিরি শুরু করলে কবে থেকে?”
আয়দান দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল। জায়দান কোনো জবাব দিলোনা। ধীরপায়ে ফুটপাথে উঠে এলো। শীতল দৃষ্টি মেলে নিরীক্ষণ করল সবকিছু। প্রথমে আয়দান, পরক্ষণে দেখল আমায়। অতঃপর তার দৃষ্টি পড়ল আমার খালি পায়ের দিকে। জুতোর একটা অদূরে পড়ে আছে। আরেকটা আয়দান একটু আগে তুলে কোথায় যে ফেলেছে এখন চোখে পড়ছেনা।
একদম নিঃশব্দে জায়দান আমার কাছে এলো। যথারীতি কোনো শব্দ ব্যয় করলনা। ঝুঁকে নিজের কেডস দুটো খুলে নিলো। মোজা পরে আছে সে ভেতরে। অত্যন্ত লম্বা হওয়ার দরুণ জুতো খুলে ফেলা সত্ত্বেও তাকে এই মুহূর্তে ভীষণ উঁচু দেখাচ্ছে। কেডস দুটো আমার পায়ের সামনে এগিয়ে দিয়ে জায়দান একদম শান্ত, নরম গলায় বলল,
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩০
“এই দুটো পড়ে নাও, পায়ে ঠান্ডা লাগবে।”
আমি এবং আয়দান দুজনই শুধু হতবাক হয়ে চেয়ে আছি লক্ষ্য করে জায়দান উবু হয়ে বসে নিজেই আমার পা দুটো একটা একটা করে নিজের কেডসে ঢুকিয়ে দিলো। পায়ের সাইজ ভিন্ন হওয়ায় জুতো জোড়া আমার পায়ে ভীষণ বড় হলেও মুহূর্তেই উষ্ণতায় মুড়িয়ে ফেললো। এতক্ষণ ফুটপাথ বেয়ে যে ঠান্ডাটা শরীরে ঢুকছিল, সেটা এখন আর লাগছেনা। উঠে দাঁড়ালো জায়দান। ঘুরল আয়দানের দিকে।
“জুতোর বাড়ি খাওয়ার পরেও শিক্ষা না হলে বলতেই হচ্ছে, আপনার পিঠের চামড়া বড়ই মোটা, মিস্টার আয়দান আরেফিন।”
