রাগে অনুরাগে পর্ব ১৫ (২)
সুহাসিনি ফাতেহা
“এই মেয়ে! দেখি প্রশ্ন সরাও!”
তিতলি পেপারস ঘুরে রেখেছে প্রশ্ন দিয়ে। যাতে ফারাজ না দেখে। একটু লেখে আবার সেগুলো ঘুরে পেলতেছে। ব্যাটা কি বুঝতে পারছে না সে থাকায় তিতলির লিখতে অসুবিধা হচ্ছে। পারফিউমের সুগন্ধি ঘ্রাণ ভেসে আসছে নাকে। তাকে ঘায়েল করতে চাইছে? করুক! তিতলি ঘায়েল হবে না। লিখতে গিয়ে ভালোই বুঝতে পেরেছে ভাল্লুক তার দিকে তাকিয়ে আছে। এখন যদি সে উত্তর না দিয়ে চুপচাপ থাকে বড্ড বেয়াদবি হয়ে যাবে। হলে প্রিন্সিপাল স্যার আছে। তাকে খুব ভালো জানে। সেও খুব সম্মান করে। তা না হলে এই ব্যাটার কথার উত্তর দেওয়ার প্রশ্নই উঠে না । না চাইতেও মেয়েটা দ্বিধান্বিত হয়ে চোখ উপরে তুলে ভীষন ভদ্রতায় বলল,
“জ্বি স্যার আমাকে বলছেন?”
—- বলে সাথে সাথেই চোখ নামিয়ে নিলো। ভাবখানা এমন যেন আজ প্রথম সে ফারাজের সাথে কথা বলছে। চোখে চোখ পড়ার আগেই মেয়েটা চোখ নামিয়ে নিলো।
ফারাজ ভ্রু কুঁচাকালো তৎক্ষণাৎ! রাগে শরীর রি রি করে উঠলো। কই অন্যসময় কতবার কত প্রশ্ন করছে কোনো উত্তর দেয় নি। এখন কেন উত্তর দিলো সে কি বুঝে না! যেখানে সে সবাইকে ভদ্রতা শিখায় সেখানে এই বেয়াদব মেয়ে তাকে ভদ্রতা শিখায়? বিড়বিড় করে যুবক আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাড়িয়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
সপ্তদশী হতবিহ্বল,স্তব্ধ, বিস্মিত চোখে চেয়ে রইলো। ইগনোর করলো তাকে? সে নিজেই তো ইগনোর করে এখন তাকে পাল্টা ইগনোর ফিরিয়ে দিলো? সিয়ামের খোঁচাখোঁচি আবার শুরু হলো। কলম দিয়ে খোঁচা মেরে আস্তে করে বলল,
“কিরে ভুটকি স্যার তোকে ইগনোর করে চলে গেলো। এটা কি শুভ লক্ষণ নাকি অশুভ?”
তিতলি বিরক্ত হয়ে সিয়ামের হাতে চিমটি কেটে বলল,
“আর একবার খোঁচা দিবি সোজা স্যার কে বলবো।” বলে আবার লেখায় মন দিলো।
পরিক্ষা শেষে তিতলি নিধির সাথে ক্যান্টিনে বসে আছে।
নিধি হতাশ গলায় বলল,
“পরিক্ষার হলে বুঝা যায় কে আপন আর কে পর। নাদিয়ার মতো হিংসুক আমি জীবনেও দেখি নাই। ক্লাসে বান্ধুবি বান্ধুবি করে কান পচায় ফেলে। আমি ৩ নাম্বারে কি হবে জিজ্ঞেস করছিলাম। বলতেই বললো আমি পারি না। অথচ দেখলাম তখন ৩ নাম্বার লিখে । স্বার্থপর! ”
তিতলি ভাবছে অন্যকিছু। সে আপাতত এসে নেই। কল্পনার জগতে ডুবে আছে।
দুঃখ করতে করতে বলল,
“আমার মনে হয় আর ভাল্লুক স্যারের সাথে হানিমুনে যাওয়া হবে না রে। কত রকম চেষ্টা করলাম এখনো মন পাইলাম না। আজকে উল্টো আমারে ইগনোর করে চলে গেলো।”—- বলতে বলতে নাক টানলো মেয়েটা।
“আহারে আমার বান্ধুবি টা কষ্ট পাইস না ! স্যার তো তোকে কখনো ওই নজরে দেখে না। ”
“আমি স্যারকে ফেইক আইডি থেকে আবার মেসেজ দিবো।”
“তোর ইচ্ছে আমি এসবে নাই!”
তিতলি আর একমূর্হত দেরি করলো না। এপ্রোনের প্যাকেট থেকে মোবাইল বের করে ফেইক আইডি তে ডুকলো। ফারাজের আইডিতে মেসেজ দিলো—-
“কেমন আছেন আমার আলু-পটলের বাপ? আপনার এই সুন্দরী কিউট বউটাকে কি ভুলে গেলেন নাকি? ”
“আল্লাহ তুুই এটা কি মেসেজ দিলি? স্যার যদি এবার সত্যি তোকে হাতেনাতে ধরতে পারে নিশ্চিত এক থাপ্পড়ে সুইজারল্যান্ড পাঠায় দিবে।”
“জীবনেও জানবে না এটা যে আমি। ”
তখন সেখানে প্রিমা এলো। ওর হল অন্য ক্লাসে পড়ছে। এসেই তিতলিকে বলল,
“এই তিতলি ফারাজ স্যার তোকে ডাকছে! ”
তিতলি চেয়ার থেকে হুড়মুড়িয়ে উঠলো। মুখবয়বে অবিশ্বাস নিয়ে মেয়েটা বলল,
“কিহহহহ!”
নিধি কানে হাত দিয়ে বলল,
“আহ আস্তে বল কান পচে গেলো।”
“আমাকে কেন ডাকছে? কি কাজ?”
প্রিমা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
“আমাকে এত কিছু বলছে? বললো আপনাদের ইয়ারের তিতলিকে আমি ডাকছি বলেন গিয়ে।”
তিতলি কিছুতেই যাবে না। এখন মেসেজ দিলো আবার এখন তাকে ডাকছে? আর সে তো স্যারকে ইগনোর করে। এখন গেলে নিশ্চয় ইগনোর কে অপমান করা হবে। তিতলি ইগনোর কে অপমান করতে পারবে না। ডাকলে ডাকুক, সে যাবে না।
তার সহজ সরল স্বীকারোক্তি,
“আমি যাবো না।”
“আর্জেন্ট কথা বলবে তোর সাথে। ”
“আমার উনার সাথে কোনো কথা নাই।”— এর মাঝে তিতলির ফোন বেজে উঠলো—- মেয়েটা হচকচিয়ে উঠলো। কে কল দিলো ভেবেভেবে দেখলো তুষার কল করেছে
তিতলি ফোন রিসিভ করলো।
“হ্যালো ভাইয়া….”
“পরিক্ষা শেষ হয়ছে নে? ”
“একটু আগে শেষ হয়ছে!”
“সব ঠিকঠাক পাড়ছিস তো?”
“১০০ তে ২০০ পাবো ভাইয়া। ”
“সেটা রেজাল্ট দিলেই বুঝা যাবে।”
“গেইটে দাড়া আমি এখন নিতে আসবো।”
“আর ১০ মিনিট পরে আসিও ভাইয়া।”
“ওকে!”
তিতলি ভাইয়ের সাথে কথা বলে কল কেটে দিলো।
নিধি ভয় পেয়ে বলল,
“আমার মন হয় স্যার জানতে পেরেছে মেসেজ দেওয়া মেয়েটা তুই তাই ডাকছে।”
প্রিমা বলল,
“আমি তো দেখলাম স্যার পেপারনিয়ে অফিসে যাচ্ছে। তখন আমাকে কথাটা বলল।”
“তাহলে মেসেজ এখনো দেখে নি।”
তিতলি বড্ড ঘ্যাড়ত্যাড়া। সে যাবে না মানে যায় নি। বন্ধুবান্ধুব সহ সবাই গেইটে চলে এসেছে।
ফারাজ ল্যাবে বসে সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছে বেয়াদব মেয়েটার জন্য। পৌনেরো মিনিট পেরিয়ে গেলো এখনো আসলো না। টিচার ডাকছে কথা শুনছে না। তাকে ইগনোর ! এই মেয়েকে সামনে পেলে ইগনোরের ক, খ, গ, ঘ, ঙ সব এক এক করে বুঝাবে? নিজে নিজে বলে উঠে,
“বেয়াদবি করার জন্য পরিক্ষায় ফেল করিয়ে দিলে কেমন হয়?” বেয়াদব!”
রেগেগেমেগে তৎক্ষণাৎ ল্যাব থেকে বেরিয়ে যায়।
করিডোর থেকে গেইট সোজাসোজি হওয়ায় স্পষ্ট দেখা যায়। ফারাজ ওখানে দাড়িয়ে দেখলো, সিয়াম তিতলির কাঁধে হাত দিয়ে দাড়িয়ে আছে। তিতলিও হেসে হেসে কথা বলছে! এই দৃশ্য ফারাজের মেজাজ বিগড়ে দিলো। তাকে ইগনোর করে এখানে হাসাহাসি হচ্ছে?
যুবক শক্ত মেজাজে দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ালো,
“আমিও দেখবো আপনি আর কতদূর দৌড়াতে পারেন। আপনি যদি আমার সন্দেহ করা মানুষটা হন! আই সোয়্যার, প্রান নিয়ে বাঁচতে পারবেন না। ”
তুষার বাইক নিয়ে গেইট এসে থামলো। সিয়াম সাথে সাথেই তিতলির কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে ফেলল। তিতলি কনুই দিয়ে তুষারের পেটে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“দূর হ রানুমন্ডল কোথাকার! ”
“ভুটকি! বেশি করবি তোর ভাইকে তোর কথা বিচার দিবো।”
“না না প্লিজ বিচার দিস না। আর এসব বলবো না তোকে। ”
তার ভেতর তুষার বাইক রেখে ভেতরে আসলো।
নিধির সাথে চোখাচোখি হতেই নিধি সালাম দিলো,
“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া!”
“ওয়ালাইকুমুস সালাম। পরিক্ষা কেমন হয়ছে তোমার?”
“ভালো। ”
তুষার আর কিছু বলল না।
তিতলি ঘুরে করিডোরের দিকে তাকালো। কোথাও ফারাজ নেই। আজকে কয়দিন সে ভালো করে ভাল্লুকের দিকে তাকায় না কিন্তু মোবাইলে ঠিকই তাকিয়ে থাকে। ইগনোর করতে পেরে মেয়েটার ভালোই লাগছে। ওই সময় তাকে ইগনোর করছে এখন সে ইগনোর করছে সুধে আসলে তুলে নিলো।
“ভাইয়া চলো? ”
“কিছু খাবি নে?”
“আইসক্রিম নাও!”
তুষার পাশের দোকান থেকে চারটা ক্রোন আইসক্রিম নিয়ে একটা তিতলি কে দিলো বাকি তিনটা সিয়াম নিধি প্রিমাকে দিলো।
সিয়াম হেসে বলল,
“ট্রিট নাকি ভাইয়া?”
“তোমরা যদি ভাবো ট্রিট তবে ট্রিট” — বলে আড়চোখে নিধির দিকে তাকালো তুষার। আইসক্রিম খাওয়ায় ব্যস্ত। ফের চোখ ফিরিয়ে নিলো।
রাগে অনুরাগে পর্ব ১৫
তিতলি আইসক্রিমে দু কামড় বসাতেই ফারাজকে বাইক নিয়ে বের হতে দেখলো। ভয় পেলো মেয়েটা। ভাইকে যদি বলে দেয় তোমার বোন টিচারদের কথা শুনে না। বেয়াদবি করে! তাহলে তো ভাই অনেক বকবে। তিতলি ভাইকে আস্তে করে বললো,
“আ..আমারা চলে যায় চলো ভাইয়া।”
