Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৬

উন্মাদনা পর্ব ৬

উন্মাদনা পর্ব ৬
কায়নাত খান কবিতা

__আসবার কালে আসলাম একা, যাইবার কালে যাবো একা, মাঝে মাঝে মনরে বলি চক্ষু মেইলা কী দেখলা… আর কী দেখলাম..আনন্দী বান্দীর বাচ্চারে দেখলাম।”
মনের সুখে গান গাইতে গিয়ে ও আনন্দীর নামে খিস্তি করতে থাকে অভী।যেন এই একটা নাম তার জীবনে অভিশাপের মতো জড়িয়ে রয়েছে। চোখ বন্ধ করলে ও তাকে দেখতে পায়। জেগে থাকলে ও তাকে দেখতে পায়।না চাইলে ও মন তাকে নিয়েই কল্পনা জল্পনা করতে থাকে।
একটু আগে ও আনন্দীদের বাড়িতে বাওয়াল করে এসেছে অভী। তবু ও যেন তার মনই ভরছে না। আনন্দী যত কাঁদে অভী ততই খুশি হয়। কিন্তু তার কাঁদার পরিমাণ প্রতিবারের মতোই নিছুক মিথ্যা অভিনয় লাগে তার কাছে।যেন প্রতিটি চোখের পানি কেবল সস্তা সিম্পেথি পাওয়ার জন্য অভিনয়।
বেশ বিরক্ত নিয়ে অভী উঠে বসে। তারপর হাতের ইশারা করে কবিকে ডাকে।

___এই কবি?”
ডাক পড়তেই কোমর বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে আধুনিক নায়িকাদের মতো হেঁটে অভীর সামনে এসে দাঁড়ায় কবি, __ভাই!’
__একটা গান গা তো, মুড ঠিক করতে হইবো!’’
অভীর আদেশ মতো কবি হারমোনিয়াম নিয়ে সকলের সামনে বসে পরে। কারণ হারমনিয়াম ছাড়া তার গলায় গান ওঠে না। তার রংঢং দেখে উপস্থিত সকলে মোটামুটি বিরক্ত হয়,সব থেকে বেশি বিরক্ত হয় স্মার্ট নোবেল।অভীর সাঙ্গপাঙ্গোর মাঝে এই দু-জনই রয়েছে যাদের নিজেদের মধ্যে কখনো জমে না। যেন তারা একজন আরেকজনের সতীন। তবে স্বামী ছাড়া।
কবির রংঢং দেখে নোবেল মোটামুটি বিরক্ত হয়ে তাকে বলে,__কীরে মাইগ্গা কত সময় লাগে তোর?”
স্মার্ট নোবেলের কথা শুনে কিছুটা রেগে যায় কবি।তার চালচলন, কথা বলার ধরণ হয়তো মেয়েদের মতো।কিন্তু বাস্তবে তো সে নিজেকে একজন বলিষ্ঠবান পুরুষ হিসেবেই দাবি করে। তাই কেউ তাকে মাইগ্গা, মহিলা আক্তার পুরুষ বললেই অতিমাত্রায় রেগে যায়।

___উফ! ছেলেটা এতো জাওড়া..। নাম তার নোবেল কিন্তু গান আমাকে গাইতে হয়।”
__ভাই ওরে কিন্তু আমি…!”
অভী বেশ বিরক্তি নিয়ে দু-জনের দিকে তাকায়।স্মার্ট নোবেল চুপ হয়ে মাথা চুলকতে থাকে। আর কবি নোবেলকে ইশারায় গালমন্দ করতে থাকে।
__জলদি গা..!”
__ওকে ভাই! তাহলে আমি শুরু করছি তাহলে।’
কবি নিজের লম্বা চুল গুলো কানের পিঠে ঢুকিয়ে গাইতে শুরু করে… কচু বনে হেগে গেছে কালো কুকুরে..কচু বনে হেগে গেছে কালো কুকুরে..নগের মা..!”
কবির সম্পূর্ণ গান শেষ হওয়ার আগেই হাতে থাকা সিগারটি মাটিতে ফেলে দেয় অভী। আনন্দীদের বাড়ি থেকে বাওয়াল করে এসেছে নিজের মুড ঠিক করতে চেয়েছিল সে। কিন্তু এ কবি সেটা ও হতে দিলো না।
__এই শফিক।’
__জ্বী ভাই?’
__ওরে মাইরা ওর গু বাইর কর তো। শালা পুরা মুডের গু করে দিলো।’

উপস্থিত সকলে মুখ টিপে টিপে হাসতে থাকে।
অভীর রাগের পারদ মোটামুটি সকলের জানা। এবং সাথে তার মাথা ঠান্ডা করার মেডিসিন ও। নোবেল সাথে সাথে পকেট থেকে একটা বি’ড়ি বের করে ধরিয়ে অভীর সামনে ধরে। যার ফলে অভী রাগারাগি বন্ধ করে বি’ড়িটি নিয়ে টানতে থাকে। কবি পাশ থেকে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে। আর একটু হলে তার অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল।
অভী যখন তার দলবল নিয়ে গ্যারেজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ১৩ বছর বয়সী ছোটু চা নিয়ে আসে। তাকে দেখে কানকাটা রমজান এগিয়ে যায়। সচারাচর রাতের বেলা অভী চা খায় না। তাহলে চা কেন নিয়ে এলো অসময়ে?

__কীরে ছুইটক্কা! তুই এহানে কী করস?”
__ দাদা সাহেব অভী ভাইরে ডাকছে। কইছে ঘুম না ভাঙ্গলে চা খাওয়াইতে। তাই চা নিয়া হাজির হইছি।
দাদা সাহেবের নাম শুনে অভী সোজ হয়ে দাড়িয়ে পরে।ফেন বের চেক করে দেখে ৮ টা মিসড কল। ফোন সাইলেন্ট থাকার ফলে ফোনের আওয়াজ তার কান অব্দি পৌঁছায়নি। অভী বরাবরের মতোই সামনের দুটো বোতাম না লাগিয়ে শার্ট পরে বেরিয়ে যেতে থাকে। সাথে তার সাঙ্গপাঙ্গরা। দাদা সাহেব কখনো এ অসময়ে ডাকে না। আজ যেহেতু ডেকেছেন নিশ্চয়ই ঝামেলা হয়েছে।
অভীর বাসা থেকে কয়েক হাত দূরেই দাদা সাহেবের আস্তানা। মাঝে শুধু একটি ময়লা পানির ছোটো পুকুর রয়েছে। তার সাথে ছোটো ছোটো গাছ পালা। অভীর বাড়ির ছাদ থেকেই আস্তাটি ভালো ভাবে দেখা যায়। দাদা সাহেবের ইচ্ছেতেই অভী সেখানে রয়েছে। যেন সব সময় তার কাছাকাছি থাকতে পারে।

‘আস্তানা’
আস্তানায় এসেই অভী দেখে দাদা সাহেব সোফাতে বেশ চিন্তামগ্ন অবস্থায় বসে রয়েছেন। সাথে নব নির্বাচিত এমপি। তার দলের লোকেরা। এবং জেলা পরিষদ। অভী ভিতরে আসতেই দাদা সাহেব হাতের ইশারা করে কাছে ডাকে।
_ আদাব দাদাসাহেব।’
__ আয় অভী। পাশে বস।’
অভী গিয়ে দাদা সাহেবের পাশে বসে পরে। ৪৫ বছর বয়সী দাদাসাহেব এখন ও ঠিক তার মতোই যুবক। বয়সের ভার তেমন একটা তার চেহারায় ফুটে ওঠেনি।
___বাপ একটা মানুষ কখন বড় হয় জানো?’
অভী মাথা নেড়ে না বোঝায়। অর্থাৎ সে জানে না।দাদা সাহেব অভীর মাথায় হাত রাখেন।
__যখন তার হাত র:ক্তে রাঙ্গা হয়।’
দাদা সাহেবের কথা শুনে অভী চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এ নিয়ে কয়েকবার দাদাসাহেব এই ধরনের কথা বলেছে তাকে। এবং কেন বলেছে সেটা ও সে জানে।
__ এই লাইনে যদি মানুষ না মা’রো। বড় হতে পারবা না বাবা।’
__দাদা সাহেব, আমি মানুষ খু:ন করতে পারবো না।’
_আমি তোমারে জোর করমু না অভীচাঁদ। তুমি হইলা আমার চাঁদ। তোমারে আমি জোড় করুম না। মাগার তুমি যেমন ড্রা’’গ স্পালাই কর। তেমন যদি দুই চারটা।’
__না দাদা সাহেব। আমি সবই করতে পারমু। কিন্তু মানুষ খু’ন। সম্ভব না।’
__ঠিক আছে চাঁদ। তুমি সময় নাও।’
__তাইলে আমি উঠি দাদা সাহেব। ‘
__আইচ্ছা। যাও।’
আস্তানা থেকে সোজা বেরিয়ে চলে যায় অভী। অভীর হাজারটা খারাপ কাজের মাঝে একটা কাজই ভালো সে কখনো খু:ন খারাবি করেনি। তার দ্বারা কেউ ম:রেনি। অভী মানুষ পিটিয়েছে, রক্তাক্ত রয়েছে। তবে খু’ন করেনি। এটা তার দ্বারা হয়নি কখনো।
__অভী তো রাজি না দাদা সাহেব।’
__অভী আমার জানের টুকরা। ওই যেটা করবো না। তো করবো না। কথা শেষ। আমার ব্যবসা, আমার কালো টাকার মেশিন অভী।আমার চাঁদ। ওরে কেউ কিছু কইলে খবর আছে নেতা।’
নেতা আফজাল হোসেন চুপচাপ বসে থাকে। এসেছিলেন তো অভীর নানে বিচার দিতে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না।দাদা সাহেবের আন্ডারওয়ার্ল্ডের পাওয়ার বার বার তাকে বাঁচিয়ে নেয়। আনন্দীর বাবা আফজাল হোসেনকে দিয়ে অভীর একটা বন্দবস্ত করতে চেয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু দাদা সাহেবের জন্য তা আর হলো না।এবার ও অভী বেঁচে গেলো।

‘শেখ_বাড়ি’
__আনন্দীর এইচএসসি হতে কতদিন বাকি রাবেয়া?’
__তা হবে মোটামুটি ১.৫ মাস। কেন বলো তো?’’
__আমার এখান থেকে চলে যাবো!”
__কীভাবে?”
__সেটা আমি বুঝবো। কিন্তু এই ছেলের হাতে নিজের মেয়েকে মরতে দেবো না।’
__আমি বলি কী। আমরা মিডিয়ার কোনো উচ্চ..!”
__কাজ হবে না। নেটে তো দিয়েছিলাম। দেখেছিলে তো কী হয়েছে। এই কৃষ্ণ দাসের হাত যতদিন অভীর মাথায় রয়েছে। প্রশাসন ওর কিছু করবে না। বরং আমাদের মর’তে হবে।”
স্বামীর কথা শুনে বেশ জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নিতে থাকেন রাবেয়া শেখ। আনন্দীর করা একটি ভুলের জন্য অভী চলে যায় আন্ডারওয়ার্ল্ডে। এবং তাদের জীবনে শুরু হয় উল্টোগুনতি। পুলিশে মামলা করে ও কোনো লাভ হয়নি। অভী বার বার ছাড়া পেয়ে যায়। তার কারণ হচ্ছে কৃষ্ণ দাস। আন্ডারওয়ার্ল্ডের বেতাল বাদশা। যার ওঠাবসা দেশের বড় বড় মন্ত্রীদের সাথে।তাদের পাওয়ারের যথাযথ ব্যবহার করে কৃষ্ণ দাস।যার ফলে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে নিজের রেকেট চালাচ্ছে সে। এখন তার সব থেকে বড় তুরুপের তাশ অভী। যাকে ঘিরে তার যত সব জল্পনা কল্পনা।

__নিজের রুমে চুপচাপ বসে থাকে আনন্দী। একটু আগে অভী তাদের বাসায় চালায় ভাঙচুর। মোটামুটি বেশ ক্ষতি হয় তাদের। কিন্তু কী আর করার। পুলিশ তো কেস নেবে। তার ওপরে আনন্দী এমন কিছু করেছিল যার ফলে ইন্টারনেটে ও কিছু পোস্ট করতে পারে না। এসব কিছুর শুরুই হয়েছিল এখান থেকে। তার করা একটি ভুলের মাসুল এভাবে দিতে হচ্ছে তাদের।

উন্মাদনা পর্ব ৫

নিজের পূরোনো অতীত নিয়ে যখন ঘাটাঘাটি করতে ব্যস্ত আনন্দী। ঠিক তখনই তার ফোনে নোটিফিকেশন আসে। ফোন হাতে নিয়ে বেশ বড় নিঃশ্বাস ফেলে আনন্দী। কারণ টেক্সটটা অভীর।
what’s app অপেন করে অভীর টেক্সট দেখে আনন্দী।
__বান্দীর বাচ্চা, কাল ঠিক সময়ে থাপ্প’ড় খাইতে চইলা আসিস।”

উন্মাদনা পর্ব ৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here