রাগে অনুরাগে পর্ব ১৬
সুহাসিনি ফাতেহা
তুষার তিতলির কথা না শুনে ফারাজের দিকে এগিয়ে গেলো। ছেলেটা সবসময় ফারাজকে দেখলেই এগিয়ে গিয়ে বড় ভাইয়ের মতো সম্মান করে। তাই আজও ভদ্রতায় জিজ্ঞেস করলো,
“ফারাজ ভাই কেমন আছেন?”
ফারাজ খান বাইকে বসেছে সবে। এখনই স্টার্ট দিতো। তুষার কে সে আগেই লক্ষ্য করেছিল।
পাশ ফিরে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ভালো তুমি কেমন আছো?”
আলহামদুলিল্লাহ ভালো! বাড়ি চলে যাচ্ছেন নাকি?
“হুমম!”
তিতলি গেইটের মধ্যস্থে দাড়িয়ে আছে মুখ ফিরিয়ে। সে কত করে ভাইকে বলল বাড়ি চলো বাড়ি চলো। কিন্তু তার ভাই তার কথা শুনলো না। ভাল্লুকের সাথে কথা বলতে গেলো। আসলে কেউ তাকে বুঝে না। ভাবলেশহীন হয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে তখনি কানে বাইকের হর্ণ এলো কানে। ভয়ে সে সাইড করে দাড়িয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। ফারাজ বিরক্তির রেশ ধরে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। আজকে যদি ল্যাবে যেত এমন ভদ্রতা শিখাতো যে জীবনে আর ফারাজ খান নামটা ভুলতো না। এবারের মতো বেঁচে গেলো। ভেবে যুবক বাইক স্টার্ট দিয়েই তিতলির সামনে দিয়েই চলে যাচ্ছে। তিতলি চোরা চোখে তাকালো। মুখখানা সে কি গম্ভীর মুখ! এই গম্ভীর মুখ দেখলেই তিতলির প্রেম প্রেম পায়।
ইচ্ছে করে….”
“এভাবে হা করে কি দেখছিস?”
“নায়ক!”
“কিহহহ!”
“কিছুনা কিছুনা ভাইয়া!”
“আমি তোর ভাই না আমি নিধি। তুই না স্যারকে ইগনোর করস তাহলে তাকায় ছিলি কেন?”
“উনি কি দেখছে নাকি?”
তুই যখন মাঝখানে দাড়িয়ে ছিলি স্যার কি রেগে গিয়েছে আমি তো ভয় পেয়েছিলাম।
তুষার আসায় ওদের কথার সমাপ্তি ঘটে। বাইকে উঠে নিধির থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়।
টানা তেরোটা পরিক্ষার পর আজ অবশেষে পরিক্ষার ইতি ঘটেছে। দিনগুলো অনেক ব্যস্ততায় কেটেছে। এখন মনে হচ্ছে একটা যুদ্ধ শেষ করে মাঠ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে তিতলি। ফারাজকে ইগনোর করা এখনো থামেনি। আড়ালে আবড়ালে তাকালেও সামনে একদম ভদ্র। ইগনোর করায় লোকটা জব্দ হচ্ছে। কালকে আবার কলেজ থেকে বার্ষিক বনভোজনে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু তার বাবা কি তাকে যেতে দিবে?
তিতলি গোসল করে দাদির রুমের দিকে গেলো। তার দাদা নাকি স্কুলের টিচার ছিলো। দাদির সাথে কিভাবে প্রেম হয়ছে সেটা জানতে পারলে মন্দ হয় না। দাদির রুমের দরজায় এসে দেখলো দাদি বিছানায় বসে আছে।
ফরিদা বানু তিতলিকে দেখেই বলল,
কিরে!
তোমার কাছেই আসছিলাম দাদু।
কিছু কইবি নে?
আজকে তোমার সাথে একটু গল্প করবো দাদু!
ফরিদা বানু খুশি হয়ে বললেন,
আয়!
তিতলি দরজাটা ঠেলে দিয়ে বিছানায় বসে সোজা মেইন কথায় আসলো!
আচ্ছা দাদু দাদাভাই তো তোমার স্কুলের টিচার ছিলো তাই না। তোমাদের বিয়ে কিভাবে হয়ছে?
ফরিদা বানু এখনো স্বামীকে অনেক ভালোবাসেন। স্বামী মারা গেছে আজ চারবছর। অথচ এখনো সে স্মৃতি বুকে জড়িয়ে বেঁচে আছেন। নাতিনের মতলব সুবিধার লাগছে না ওনার কাছে।
তাও তিনি হেসে বললেন,
আমি যহন কেলাস সেভেনে পড়ি তহন তোর দাদা আমগো স্কুলের মাস্টার ছিলেন। আমি কহনো তোর দাদারে ওই নজরে দেহি নাই তোর দাদা ও দেহে নাই।
তাহলে তোমাদের বিয়ে কিভাবে হয়ছে?
বিয়া সাদি তো আল্লাহর হাতে। আমি যহন কেলাস এইটে পড়ি তহন তোর দাদার বাড়ি থেইকা বিয়ার সমন্ধ আইছিলো।
তিতলি নড়চড়ে উঠে উজ্জল চোখে বলল,
তারপর কি হলো?
আমার বাপেরা পোলা ভালো দেখে আর না করেনি।
তিতলির চিত্ত প্রফুল্ল,
আমার মনে হয় কি জানো দাদাভাই তোমাকে আগে থেকেই পছন্দ করতো। তাই বিয়ের প্রস্তাব দিছে।
পরে শুনইছি তোর দাদার কাছ থেইকা।
তিতলি ভাবুক হয়ে পড়লো। মনে মনে ভাবলো দাদাভাই তো দাদুকে কে পছন্দ করতো! হাসিখুশি রোমান্টিক মানুষ ছিলো। আর ওই ভাল্লুক টা তো তাকে সহ্যই করতে পারে না। একটা আস্ত বিগড়ে লোক। সারাদিন শুধু বেয়াদব! বেয়াদব!
ফরিদা বানু আবার বললেন,
এই কথা তুই এহন কি মনে কইরা কইলি?
তিতলি মাথা নিচু করে লজ্জা পাওয়ার ভান করে বলল,
এমনি দাদু আমি তাহলে যায়। বলে তিতলি চলে গেলো।
ফারাজ খান আজ বেশকিছু দিন পর ফেসবুকে ঢুকেছেন। সেদিন যে প্রোফাইল পিক চেঞ্জ করছিলো আর ডুকা হয় নি। লেকচার, খাতা, মিটিং–টাইমিং পায় নি। ঢুকতেই নিউজফিডে প্রথম পোস্টটাই চোখ আটকে গেলো।
“শাহ সিমেন্ট দিয়ে মন শক্ত করছি এবার আসিও মন ভাঙাতে, গোলামের পুত!”
যুবক কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে । ভ্রুযুগল কুঁচকে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
এটা কেমন পোস্ট! গোলামের পুত কারে বলতেছে মেয়েটা? তিন-চারটা থাপ্পড় দিয়ে সব দাঁত পেলে দিতে পারলে মনটা শান্ত হতো।
আজকাল বেয়াদব মেয়েটা ফারাজ খানকে ভীষন জ্বালায়। কোনো কথা শুনে না, ডাকলে আসে না,চোখ তুলে তাকায় না। মনে হয় ইচ্ছে করে তার কথার অবাধ্য হয়। ওই মেয়েটা তাকে এত তীব্রভাবে নিজের দিকে টানছে! ওই মেয়ে কথা বলছে না দেখে সে কেন আগ বাড়িয়ে কথা বলতে যাচ্ছে? এমন অদ্ভুত অনুভূতি হওয়ার আসল মানে কি? এ কারণে ফারাজের নিজের উপর রাগ হয়। ফারাজের ভাবনার ভেতরেই ফারাজ খানের মা ফারিন বেগম রুমে ঢুকলেন। হাতে কয়েকটা ছবি।
ফারাজের পাশে বসে বসেই ভদ্র মহিলা বললেন,
এগুলো দেখ কোনটা পছন্দ হয়!
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এটা নতুন কিছু না। কয়দিন পরপর শুরু হয়। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। কোনো ছবি হাতে না নিয়েই ফারাজ বললো,
তোমাকে আমি কতবার বলছি এসব চিন্তা ভাবনা বাদ দাও। আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।
আগে একবার দেখ!
না আম্মু!
ফারিন বেগম জোর করে ফারাজের হাতে ছবি গুলো দিয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
এই বছর শেষ হওয়ার আগেই তোর বিয়ে হওয়া চাই। যদি কাউকে পছন্দ থাকে, তাকে বিয়ে করে নিয়ে আয় তারপর ও বিয়ে কর!
ফারাজ ছবি গুলো পুনরায় মাকে দিয়ে দিলো।
এর মাঝে ফারাজের বাবা আফজাল খান ও আসতে আসতে বললেন,
তোর মা ঠিকই বলছে বিয়ে কর! মরার আগে নাতি নাতনির মুখ দেখা।
ফারাজ বিরক্তির রেশ ধরেই বলল,
আমি এখন বিয়ে করবো না ড্যাড। আমাকে সময় দাও।
চব্বিশ বছর বয়সে আমি তোর মারে বিয়ে করে তোদেরও সামলাইছি। তুই কি করলি? সারাদিন কলেজ থেকে আসবি যাবি এটা কি মগের মুল্লুক নাকি?
ফারাজ শেষমেষ বিরক্ত হয়ে উঠে বেলকনিতে চলে গেলো।
তিতলি সন্ধ্যা থেকে বাবার আশেপাশে ঘুরছে। কাল কলেজ থেকে বনভোজনে নন্দন পার্ক, আশুলিয়াতে নিয়ে যাওয়া হবে। তিতলির অনেক শখ ওখানে যাওয়ার। যেভাবেই হোক বাবাকে রাজি করাতেই হবে।
তৌসিফ শেখ ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে চা খাচ্ছেন। তখনই তিতলি বাবার পাশে বসলো। তৌসিফ শেখ মেয়ের দিকে তাকালেন। মুখ দেখেই বুঝে গেলেন মেয়ে কিছু বলবে। তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
কিছু বলবা আম্মু!
জ্বি আব্বু! বলে কিছুক্ষণ ভাবলো কিভাবে বলবে যাতে তার বাবা রাজি হয়। পরপর বলল,
আমাদের কলেজ থেকে বনভোজনে নন্দন পার্ক আশুলিয়াতে ঘুরতে নিয়ে যাবে।
তো কি হয়ছে?
আমি যেতে চাই!
আলেয়া শেখ পাশ থেকে এই কথা শুনে বললেন,
যাওয়া লাগবে না।
সবাই যাবে তো আম্মু। আমি তো একা না নিধি সিয়াম প্রিমা ওরা সবাই যাবে।
আলেয়া শেখ মেয়ের উপর রাগ দেখিয়ে বললেন,
ওরা সবাই তোর মতো না।
তিতলি কেঁদে দিবে এমন ভাব। বাবাও কিছু বলছে না মনে হয় যেতে দিবে না। কাঁদো কাঁদো মুখে বলল,
আব্বু তুমি কিছু বলো!
তৌসিফ শেখ স্ত্রীর হাতে কাপ দিয়ে বললেন,
কোনদিন নিয়ে যাবে?
কাল!
তৌসিফ শেখ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
তুষার যেতে পারবে?
জানি না আব্বু!
তুষার যেতে পারলে যাবা। না হলে যাওয়ার দরকার নেই আম্মু।
আচ্ছা আব্বু! বাবাকে তো একটু হলেও রাজি করাতে পেরেছে মনে হয়। এবার তার ভাই কি রাজি হবে? তার ভাইও তো ওই ভাল্লুকের মতো ধমকায়!
রুমে এসে নিধিকে ফোন করে বলল,
বেস্টু রে আমি তো মনে হয় যেতে পারবো।
সত্যি! আঙ্কেল রাজি হয়েছে?
আব্বু বলছে যদি ভাইয়া যায় তাহলে যেতে দিবে!
নিধি- শুধু তো কলেজের স্টুডেন্টদের নিয়ে যাবে!
তিতলি- ভাইয়া তো আগে সেই কলেজেরই স্টুডেন্ট ছিলো।
নিধি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
আগে ছিলো এখন তো নেই!
এখন রাখ ভাইকে রাজি করাতে হবে। বলে তিতলি ফোন কেটে দিলো।
রাতে তুষারকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করিয়েছে তিতলি। সারারাত ঘুম না গিয়ে কেমন শাড়ি পড়ে যাবে কিভাবে সাজবে আরো কত কি ভেবেছে। সকাল ৭:০০ বাজতেই ঘুম থেকে উঠে গেলো।ওয়াশরুমে গিয়ে সকাল সকাল গোসল করে নিলো। তখনি দরজার বাহিরে তুষার ডেকে বলল,
বেশি খুশি হইস না আমি যাচ্ছি না।
ভাইয়ের কথা শুনে তিতলি মুহূর্তেই মন খারাপ করে ফেললো। তাহলে রাতভর জেগে থেকে এত সকাল করে সে গোসল করলো কেন? দরজা খোলে দিয়ে বলল,
তুমি রাতে বলছো যাবে এখন আবার যাবে না বলছো কেন ভাইয়া?
তুষার বোনের কর্মকান্ড দেখে গম্ভীর মুখে হেসে পেলে। ঠোঁঠ কামড়ে হাসি চাপিয়ে বলল,
১০:৩০ এ বাস ছাড়বে। আমি ফারাজ ভাইয়ের সাথে কথা বলেছি। যদি একটু দেরি হয় তাহলে তোর আর যাওয়া হবে না।
তিতলি ভাবে তার ভাই আসলে তার সাথে ছিট করে। নাস্তা করে তিতলি মায়ের থেকে শাড়ি পড়ে আসলো। সেদিন আয়েশার বিয়েতেও মা পড়িয়ে দিয়েছে। সে পারেনা। শাড়ি পড়ে সুন্দর করে সেজে রেডি হয়ে সবার থেকে বিদায় নিয়ে ভাইয়ের সাথে বেরিয়ে পড়লো।
নিধিরা আগে থেকেই গেইটে দাড়িয়ে ছিলো। তিতলি যেতেই নিধি তিতলিকে দেখে হেসে বলল,
মাশআল্লাহ আগুন সুন্দরী লাগছে তোকে! বলে নিধি আড়চোখে তুষারের দিকে তাকালো। লোকটা দেখার আগেই চোখ নামিয়ে ফেলল।
সিয়াম মুখ ভেঙচি কেটে বলল,
পেত্নীর মতো লাগে!
তিতলি রেগে বলল,
তোকে হেজনের মতো লাগে!
ওরা ভেতরে যেতেই রুবায়েদ স্যার তিতলি কে তাড়াহুড়ো করে ডেকে কিছু ফাইল দিয়ে বলল,
এই ফাইল গুলো আমার অফিস টেবিলে রেখে আসো।
জ্বি স্যার!
রাগে অনুরাগে পর্ব ১৫
তিতলি একটা মুচকি হাসি দিলো। রুবায়েদ স্যার তিতলিকে খুব ভালো জানে। তাই না করতে পারেনি।
তিতলি ফাইল গুলো নিয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য কয়েক সিঁড়ি উঠতেই আচমকা কারো শক্তপোক্ত পিঠে ধাক্কা খায়। ঠোঁঠ টা গেলো গেলো ভেবে চোখ তুলে তাকাতেই কারো ধবধবে সাদা শার্টের পিছনে নিজের দুই ঠোঁঠের টকটকে লাল লিটিস্টিকের দাগ দেখে চমকে উঠে রমনী । মনে মনে নিজে নিজেই বলে উঠে,
তিতলিরে বাঁচতে হলে এক্ষুনি দৌড়ে পালা।
