Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১০

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১০

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১০
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎বিকেলটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসছে।
‎জানালার বাইরে আকাশে সূর্যের রঙ বদলে গেছে। হালকা সোনালি আলো মিশে যাচ্ছে ফ্যাকাশে নীলের সাথে। দূরের গাছগুলো একদম স্থির। বাতাসও যেন থেমে গেছে কোথাও। মাঝে মাঝে শুধু পর্দাটা খুব আস্তে নড়ে উঠছে।
‎ঘরজুড়ে অদ্ভুত শান্তি। কিন্তু সেই শান্তির ভেতরেই বসে আছে মুগ্ধা— একেবারে স্তব্ধ হয়ে।
‎তার সামনে খোলা খাতা। হাতে ধরা কলম। তবু কিছুই লিখছে না সে।

‎মুগ্ধা ধীরে চোখ বন্ধ করল।
‎বুকের ভেতর কেমন ভারী হয়ে আছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট লাগছে হালকা। সে কখনো ভাবেনি— ইখতিয়ারের জীবনে তার আগে কেউ ছিল।
‎কখনো কল্পনাও করেনি।
‎লোকটাকে এতটাই দূরের, নিয়ন্ত্রিত, অনুভূতি লুকিয়ে রাখা মানুষ মনে হয় যে তাকে ঘিরে প্রেম, চিঠি, ভালোবাসা— এসব কিছু যেন মানায় না।
‎তবু ছিল। কেউ একজন তাকে “প্রিয়তম” বলে লিখেছিল। কেউ একজন তার নীরবতাকে ভালোবেসেছিল।
‎এই চিন্তাটাই মুগ্ধার বুকের ভেতর কেমন ধারালো কিছুর মতো বিঁধতে লাগল। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। পা দুটো কেমন দুর্বল লাগছে।
‎হাঁটতে হাঁটতে বিছানার কাছে গিয়ে বসে পড়ল ধপ করে। মাথাটা ভার লাগছে।
‎জানালা দিয়ে আসা শেষ বিকেলের আলো এসে পড়েছে তার মুখে। চোখের নিচে ছায়া পড়েছে হালকা। খোলা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গাল ছুঁয়ে আছে।
‎মুগ্ধা দুই হাঁটু বুকের কাছে টেনে নিল। তারপর ফাঁকা চোখে তাকিয়ে রইল সামনের দিকে।
‎কেন এত খারাপ লাগছে? সে তো ইখতিয়ারকে ভালোবাসে বলেও কখনো নিজের কাছে স্বীকার করেনি পুরোপুরি।

‎তবু বুকের ভেতর এই চাপা কষ্ট কেন? মুগ্ধা ঠোঁট কামড়ে ধরল। হয়তো কারণ— ইখতিয়ারকে সে অদ্ভুতভাবে নিজের ভেবেছে।
‎চুপচাপ মানুষটা। কম কথা বলে। কিন্তু দিনের শেষে তার কাছেই তো ফিরে আসে। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে নিঃশব্দে তাকায়।
‎এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোর মাঝেই কখন যে সে মানুষটাকে নিজের ভেবে ফেলেছে— মুগ্ধা নিজেও বুঝতে পারেনি।
‎আর আজ হঠাৎ মনে হচ্ছে, সে ইখতিয়ারের জীবনের প্রথম কেউ না। একেবারেই কেউ রা।
‎এই অনুভূতিটা কেমন যেন বুক চেপে ধরছে।
‎মুগ্ধার চোখ জ্বালা করতে শুরু করল।
‎সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল। কান্না আসছে।
‎হঠাৎ করেই।
‎কাঁদবে কেন সে? চিঠিটা তো পুরোনো। হয়তো অনেক আগের। হয়তো ইখতিয়ার কিছুই অনুভব করত না মেয়েটার জন্য।
‎তবু…
‎চিঠিটা এখনো ফেলে দেয়নি কেন? কেনই বা জমিয়ে রেখেছে? কেন? তবে কি এইজন্যই তার সাথে এত দূরত্ব? এইজন্যই..

‎বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষণ।
‎শেখ বাড়ির নিচতলাটা এখন নরম হলুদ আলোয় ভরে আছে। বাইরে আকাশ গাঢ় নীল হয়ে এসেছে। দূরে মসজিদ থেকে এশার আজানের শেষ সুর ভেসে আসছে। গরম এখনো পুরোপুরি কমেনি, তবু সন্ধ্যার বাতাসে দিনের চেয়ে একটু স্বস্তি আছে।
‎ড্রয়িংরুমে আজ যথারীতি ছোটখাটো ভিড়।
‎টিভিতে সিরিয়াল চলছে।
‎শব্দ মাঝেমধ্যে একটু জোরে উঠছে, আবার কমছে। রাফেয়া বেগম আর ইন্তিয়া বেগম মন দিয়ে দেখছেন। মাঝেমধ্যে চরিত্রগুলোর উপর বিরক্তিও প্রকাশ করছেন।
‎“এই মাইয়াডা আবার মিথ্যা কইতেছে দেখছো?”
‎“আমি প্রথম থেইকাই বুঝছিলাম।”

‎দু’জনের কথায় পাশ থেকে ইসরাফিল হাসছে।
‎ইসরায়েল শেখ একপাশে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। নাকের নিচে চশমা নামানো। মাঝে মাঝে কাগজ ভাঁজ করে গম্ভীর মুখে খবর পড়ছেন, আবার টিভির শব্দে বিরক্ত হয়ে তাকাচ্ছেন।
‎ইশতিয়াক আর ইসরাফিল সোফার অন্যপাশে বসে আড্ডা দিচ্ছে। কোনো একটা ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে তর্ক করছে দু’জন।
‎রহিমা একটু দূরে বসে তসবিহ পড়ছে। ঠোঁট নড়ছে ধীরে ধীরে। চোখ নিচু।
‎আর সবার মাঝখানে বসে আছে মুগ্ধা। একেবারে চুপচাপ। আজ সে অস্বাভাবিক রকমের শান্ত।
‎সাদা-নীল জামা পরে আছে। চুল আলগাভাবে বাঁধা। মুখে কোনো সাজ নেই। চোখদুটোও কেমন নিস্তেজ লাগছে।
‎সে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে কিছুই দেখছে না।
‎তার মাথার ভেতর এখনো ঘুরছে সেই হলুদ খাম। সাদা কাগজ। আর চারটা লাইন।

‎মুগ্ধার বুকের ভেতরটা আবার কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।
‎সে অজান্তেই গভীর শ্বাস নিল।
‎ঠিক তখনই ইশতিয়াক তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। বলল,
‎“এই মুগ্ধা।”
‎কোনো উত্তর নেই।
‎“ওই।”
‎তবু না। ইশতিয়াক নাটকীয়ভাবে সামনে ঝুঁকল।
“মরে গেছিস নাকি?”
‎ইসরাফিল হেসে ফেলল। মুগ্ধা শুধু একবার তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিল।
‎কোনো ঝাড়ি না। কোনো পাল্টা কথা না।
‎ইশতিয়াক থমকে গেল।

‎“আরে?”
‎সে আরও কাছে সরে এলো।
‎“তুই ঠিক আছিস?”
‎মুগ্ধা ছোট্ট করে মাথা নাড়ল।
‎ “হুম।”
‎“হুম মানে? তুই এত চুপ ক্যান?”
‎আবারও কোনো জবাব নেই। ইশতিয়াক এবার ইসরাফিলের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল, “দেখছো? ভূতে ধরছে।”
‎ইসরাফিল হাসল। ইশতিয়াক আবার বলল,
‎“আজকে তো পুরো ইখতিয়ার ভাইয়ের মহিলা ভার্সন লাগতেছে।”
‎কথাটা শুনে সাধারণত মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে কিছু একটা বলত। আজ বলল না। শুধু চুপ করে বসে রইল।
‎ইশতিয়াক এবার সত্যিই অবাক হলো।
‎সে হাত বাড়িয়ে মুগ্ধার মাথায় আলতো চাপড় দিল। “এই, পেত্নী।”
‎মুগ্ধা ধীরে তার হাত সরিয়ে দিল।

‎“বিরক্ত করিস না।”
‎গলায় শক্তি নেই। ইশতিয়াকের মুখের হাসিটা একটু মিলিয়ে গেল। সে এবার খুঁটিয়ে তাকাল মুগ্ধার দিকে। চোখ লালচে। মুখ ফ্যাকাশে। ঠোঁট শুকনো।
‎কিছু একটা হয়েছে।
‎“কি হইছে তোর?”
‎মুগ্ধা মাথা নাড়ল।
‎“কিছু না।”
‎“মিথ্যা বলিস না।”
‎সে আরও নিচু স্বরে বলল,
‎“ভাইয়া কিছু বলছে?”
‎ইখতিয়ারের নাম শুনতেই মুগ্ধার বুক ধক করে উঠল। সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল।
‎“না।”
‎ইশতিয়াক এবার পুরো সিরিয়াস হয়ে গেল।
‎“তাহলে মন খারাপ ক্যান?”
‎মুগ্ধা ঠোঁট কামড়ে ধরল। সে জানে না কি বলবে।

‎ঘরের ভেতর টিভির শব্দ চলছে। রাফেয়া বেগম মাঝেমধ্যে সিরিয়ালের চরিত্র নিয়ে মন্তব্য করছেন। ইসরায়েল শেখ কাগজ উল্টাচ্ছেন। সবকিছু স্বাভাবিক।
‎শুধু মুগ্ধার ভেতরটাই অদ্ভুত ভারী হয়ে আছে।
‎ইশতিয়াক এবার মজা করার ভঙ্গিতে বলল, “আচ্ছা বুঝছি। পড়ালেখার টেনশনে ব্রেন নষ্ট।”
‎মুগ্ধা হালকা হাসারও চেষ্টা করল না। ইসরাফিল উঠে একটা কাজে গেছেন। ইশতিয়াক আর মুগ্ধা বসা। এইবার সত্যিই ইশতিয়াক চিন্তিত হয়ে গেল।
‎সে নিচু স্বরে বলল,
‎“বইন, সত্যি বল। কি হইছে?”
‎মুগ্ধা ধীরে মাথা নাড়ল।
‎“কিছু হয় নাই।”
‎তার গলাটা কেমন ভাঙা ভাঙা শোনাল।
‎রহিমা এতক্ষণ চুপচাপ তসবিহ পড়ছিল। এবার চোখ তুলে তাকাল একবার। খুব সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করছিল মুগ্ধাকে। মেয়েটার মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।
‎কিন্তু হাতে তসবিহ থাকায় কিছু বলল না। শুধু একবার নাক সিটকে আবার চোখ নামিয়ে নিল।
‎ইশতিয়াক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুগ্ধা বলতে চাচ্ছে না যখন থাক। কিছু জিনিস ব্যাক্তিগত হয়।

‎ড্রয়িংরুমের দেয়ালে ঝোলানো গোল ঘড়িটার কাঁটা ধীরে ধীরে আটটার দিকে এগোচ্ছে।
‎ঘরের ভেতর এখনো সেই সন্ধ্যার আবহ রয়ে গেছে। টিভির আলো মাঝে মাঝে পুরো রুমটাকে নীলচে করে তুলছে। সিলিং ফ্যান ঘুরছে একটানা শব্দে। বাইরে রাত আরও ঘন হয়েছে।
‎টিং টং।
‎কলিং বেলের শব্দে সবাই একটু নড়েচড়ে তাকাল।
‎রাফেয়া বেগম বললেন,
‎ “ইখতিয়ার আইছে মনে হয়।”
‎সাধারণত এই সময়টায় মুগ্ধাই আগে উঠে যায় দরজা খুলতে। কখনো পানি এগিয়ে দেয়, কখনো ব্যাগ নিয়ে রাখে। আজ সে উঠল না। একটুও না।
‎চুপচাপ বসে রইল আগের মতো।
‎ইশতিয়াক ভ্রু কুঁচকে একবার তাকাল ওর দিকে।
‎তারপর নিজেই উঠে গেল দরজার দিকে।
‎দরজা খুলতেই বাইরের হালকা গরম বাতাস ঢুকে এলো ভেতরে।
‎ইখতিয়ার দাঁড়িয়ে আছে।
‎হালকা নীল শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চুল এলোমেলো হয়ে গেছে সামান্য। মুখে ক্লান্তি স্পষ্ট।
‎তবু চোখদুটো বরাবরের মতো শান্ত।

‎“কি রে?”
‎ইশতিয়াক পাশে সরে দাঁড়াল।
‎ইখতিয়ার ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
‎“ট্রাফিক ছিল।”
‎তারপর খুব স্বাভাবিকভাবেই চোখ গেল। ড্রয়িংরুমের দিকে। মুগ্ধা বসে আছে। কিন্তু আজ কিছু একটা আলাদা।
‎মেয়েটা সাধারণত তাকে দেখলেই তাকায়। মুখে ছোট্ট হাসি আসে। কিছু না কিছু বলে। আজ কিছুই না। সে চুপচাপ বসে আছে।
‎ইখতিয়ারের ভ্রু খুব সামান্য কুঁচকে গেল। ইশতিয়াক দরজা লাগিয়ে নিচু গলায় বলল, “ভাই…”
‎“হুম?”
‎“মুগ্ধার সাথে কোনো ঝামেলা হইছে?”
‎ইখতিয়ার তাকাল তার দিকে।

‎“না।”
‎ছোট্ট উত্তর।
‎“শিওর?”
‎“হুম।”
‎ইশতিয়াক একটু দ্বিধায় পড়ল।
‎“তাহলে এমন চুপ ক্যান?”
‎ইখতিয়ার এবার আবার মুগ্ধার দিকে তাকাল।
‎মেয়েটা মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখদুটো কেমন ফাঁকা লাগছে দূর থেকেও।
‎তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হলো।
‎আজ সকালে তো ঠিকই ছিল।
‎সে ধীরে বলল,
‎ “জানি না।”
‎তার গলায় চিন্তার খুব হালকা ছাপ ছিল।
‎ইশতিয়াক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‎“সন্ধ্যা থেইকা এমন।”
‎ইখতিয়ার আর কিছু বলল না।
‎শুধু ধীরে ধীরে ড্রয়িংরুমের ভেতরে এগিয়ে এলো।
‎রাফেয়া বেগম বললেন,

‎“হাতমুখ ধুয়ে খাইতে বসো বাবা।”
‎“জি।”
‎ইখতিয়ার মাথা নাড়ল। তারপর আবার একবার তাকাল মুগ্ধার দিকে।
‎এইবার মুগ্ধাও তাকাল না। এক সেকেন্ডের জন্যও না।
‎ইখতিয়ার ধীরে শ্বাস নিয়ে বলল,
‎ “আমি উপরে যাচ্ছি।”
‎কথাটা সবাইকে উদ্দেশ্য করেই বলা।
‎তারপর ধীরে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।
‎যাওয়ার আগে আরেকবার তাকাল মুগ্ধার দিকে।
‎এইবারও মুগ্ধা সরাসরি তাকাল না।
‎তবু তাকাল।

‎সময় বহমান। সন্ধ্যা হয়ে রাত গভীর হয়। ঘরের ঘড়ির কাঁটা এগারোটার দিকে দাঁড়িয়েছে।
‎মুগ্ধা ধীরে ধীরে ইখতিয়ারের ঘরে প্রবেশ করল। বাইরের হাওয়া জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকছে, পাতলা সাদা পর্দা হালকা দুলছে। বাতাসে হালকা গরম আর এক ধরনের গভীর শীতলতা মিশে আছে।
‎ ঘরের অন্য প্রান্তে, ইখতিয়ার বিছানায় ল্যাপটপ খুলে বসেছে। চোখগুলো পুরো মনোযোগ দিয়ে স্ক্রিনের দিকে, আঙুলগুলো দ্রুত কীবোর্ডে ছুটছে। চোখে-মুখে স্থির এক অভিব্যক্তি, কিন্তু মনের মধ্যে হয়তো অন্য কোন ভাঁজ আছে, যা কেউ সহজে পড়তে পারবে না।
‎মুগ্ধা তার নিজের পড়ার টেবিলে বসে গেছে। খাতা খুলে পড়া শুরু করেছে। কলম হাতে, কিন্তু লেখা হচ্ছে না। চোখ মাঝে মাঝে উঠানো স্ক্রিনের দিকে, আবার ফিরে আসে খাতায়। নিঃশব্দতা ঘরের চারপাশে কেঁপে পড়ছে।

‎ইখতিয়ার খেয়াল করল মুগ্ধার উপস্থিতি। তাকালো সেদিকে। ধীরে ধীরে বলল,
‎“কিছু হয়েছে তোমার?”
‎মুগ্ধা চোখ নামিয়ে রাখল। কোনো উত্তর নেই। শুধু নিঃশব্দ। ল্যাম্পের আলো তার মুখের রেখা তুলে ধরছে—চোখে ভেজা, ঠোঁট হালকা কেঁচকানো, অদ্ভুত এক স্তব্ধতা।
‎“কি হলো? ঝিমা কিছু বলেছে?”
‎মুগ্ধা কেবল মাথা নেড়ে না বোঝাল।
‎“আজ আপনার টেবিলে একটা হলুদ খাম পেয়েছিলাম”
‎ভাঙা ভাঙা গলায় বলল মুগ্ধা।
‎ইখতিয়ারের বুক ধ্বক করে উঠল। মুগ্ধার দিকে তাকালো সে। ল্যাপটপ বন্ধ করে জিজ্ঞেস করল
‎“তুমি পড়েছো ওটা?”
‎“হুম”

‎ টেবিলের উপর পড়ে আছে সেই হলুদ খাম।
‎ইখতিয়ার কয়েক সেকেন্ড খামটার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে চোখ তুলল মুগ্ধার দিকে। উত্তেজিত হয়ে উঠল যেন সে। উন্মাদ মতো লাগল ইখতিয়ারকে।
‎“আমার জিনিসে হাত দিছো?”
‎গলাটা নিচু। শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত স্বরেই চাপা রাগ স্পষ্ট।
‎মুগ্ধার বুক কেঁপে উঠল।
‎“আমি ইচ্ছা করে করি নাই। কলম নিতে গিয়ে—”
‎“তাই বইয়ের নিচে রাখা খামও খুলে ফেললা?”
‎মুগ্ধা চুপ করে গেল। তারপর খুব আস্তে বলল,
‎“ও কে?”
‎ইখতিয়ার কিছুক্ষণ উত্তর দিল না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।

‎“পুরোনো পরিচিত।”
‎“শুধু পরিচিত মানুষকে কেউ ‘প্রিয়তম’ লিখে?”
‎এইবার ইখতিয়ারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
‎“সব প্রশ্নের উত্তর তোমারে দিতে হবে?”
‎মুগ্ধার চোখ ভিজে উঠল।
‎“আমার জানার অধিকার নাই?”
‎“অধিকার আছে। কিন্তু সীমাও আছে।”
‎কথাটা শুনে মুগ্ধার বুক মোচড় দিয়ে উঠল।
‎সে কাঁপা গলায় বলল,
‎“তাহলে চিঠিটা এত যত্ন করে রেখে দিছেন কেন?”
‎ইখতিয়ার ধীরে শ্বাস ফেলল। তার ধৈর্য শেষের দিকে।
‎“কারণ সবকিছু ফেলে দিতে হয় না।”
‎“আপনি কি ওরে ভালোবাসতেন?”

‎প্রশ্নটা বের হওয়ার সাথে সাথে ঘরটা আরও ভারী হয়ে গেল। ইখতিয়ার এবার সরাসরি তাকাল মুগ্ধার দিকে। চোখদুটো ঠান্ডা। যেন সে ঘোরের মধ্যে আছে। শান্ত ছেলেটার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। বলল,
‎“উত্তর দিতে বাধ্য নই।”
‎মুগ্ধার গাল বেয়ে পানি নেমে এলো।
‎”ওর জন্যই কি আমার থেকে দূরে থাকা, ও কষ্ট পাবে বলেই কি আমাকে ভালোবাসতে পারলেন না?”
‎ইখতিয়খর জবাব দিলো না। তবে ইখতিয়ার বিরক্ত মুখে ড্রয়ার খুলে মেডিসিন বের করল। তারপর খুব কঠিন গলায় বলল,

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৯

‎“অন্যের ব্যক্তিগত জিনিস ঘাঁটাঘাঁটি করার আগে ভদ্রতা শিখো।”
‎কথাটা বলেই মেডিসিন হাতে নিয়ে সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
‎ছাদের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে মুগ্ধা চমকে উঠল হালকা। তারপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
‎চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগলো অনবরত। এতো কঠিন ভাবে ইখতিয়ার কখনো কথা বলেনি ওর সাথে। মুগ্ধা পাশ থেকে কাগজ কলম নিলো। গোটা গোটা অক্ষরে লিখল,
‎” আমি কারো অবহেলায় থাকিনা ইখতিয়ার। আমি শৈথিল্যের নই। তবে দুঃখ হলো, আমি ভালোবাসলাম, আর তুমি সেটা দূর্বলতা ভাবলে ইখতিয়ার?”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১১