Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৫)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৫)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৫)
রুপান্জলি

১৭ – ০৪- ২০২৭
ব্রেকিং নিউজ
কমলাপুরগামী আন্তঃনগর ট্রেন ‘অন্তঃকরণ’ ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। মাঝপথে ট্রেনটির চারটি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে লাইনচ্যুত হয়ে উল্টে যায়। প্রাথমিকভাবে বহু হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। দুর্ঘটনার কারণ এখনো জানা যায়নি।

— সংবাদ ডেস্ক (সময় টিভি প্রতিবেদন)
বিয়ের সকল কাজ আপাতত স্থগিত রেখে আরশাদ জামান মাত্রই ঘরে এলেন। মেয়েটা কতদূর কী পৌঁছাল, একটা কল দিয়ে খোঁজ নেওয়া উচিত। অগত্যা ভেজা হাতটা বিছানার ওপর রাখা তোয়ালে দিয়ে মুছে ওয়ারড্রোবের ওপর রাখা ফোনটা হাতে নিলেন। স্ক্রিন অন করতেই ইনবক্সে আসা সদ্য মেসেজটা দেখে কেমন থমকে গেলেন। দ্রুত গতিতে মেসেজটিতে ক্লিক করতেই একজন অতীব সুন্দরী রমণী এই কথাখানা আওড়ে গেলেন। বর্তমানে ভিডিওতে ট্রেনের বগিগুলোর ধ্বংসাবশেষ দেখানো হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা জোরদার উদ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পাথর বনে গেলেন মানুষটা। চোখ জ্বালা করে পানি জমল, হাত ফসকে মোবাইলখানা ছিটকে পড়ল মেঝেতে। মানসপটে ভেসে উঠল গত রাতের এক টুকরো দৃশ্য—
রাত ২টা ৪৩ মিনিট।

মাত্রই গরু কেটে বাড়িতে ঢুকলেন আরশাদ জামান। আপাতত কয়েকজন পুরুষ, তিনি আর সুহাসিনী ব্যতীত বাকি সবাই ঘুমে কাদা। লোকে বলে, মেয়ের বিয়েতে নাকি বাবা দু’চোখের পাতা এক করারও সময় পান না। আজ ছোট মেয়েকে বিয়ে দিতে গিয়ে বুঝতে পারলেন, কথাটা সত্যি। হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই আকস্মিক বুকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল একটা নাজুক, ছোটখাটো বাচ্চা। আরশাদ জামানের আরও একটা জান্নাত, তার ছোট মেয়ে। মেয়েটা কেমন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। আরশাদ জামান মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে মলিন হাসলেন।
— কী হয়েছে আমার ছোট মায়ের? কাল চলে যাবে বলে মন খারাপ? পাপ্পার দিকে তাকাও তো, তাকাও।
বলেই মেয়েকে টেনে সোজা করে দাঁড় করালেন। রাত্রি এখনো সমানে ফোঁপাচ্ছে। আরশাদ জামান মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। রাত্রি কান্নার তোড়ে কিছু বলতে পারছে না। শুধু শাড়ির আঁচলের নিচে থাকা ছোট্ট ডায়েরিটা বের করে বাবার দিকে এগিয়ে দিল।
আরশাদ জামান সেটা নিয়ে একে একে প্রতিটি লাইন পড়ে আবারও মলিন হাসলেন।
— আমি এসব জানি মা। অর্পণ বলেছে আমাকে।
রাত্রি যেন বড়ই আশ্চর্য হলো — অর্পণ এসব জানত?

আরশাদ জামান চোখের ইশারায় সায় জানিয়ে বললেন— হুম। অনেক আগেই সন্দেহ করেছিল। যখন করেছিল, তখনই ব্যাপারটা আমাকে জানিয়েছিল। আমি পরামর্শ হিসেবে বলেছিলাম, এসব নিয়ে অনুসন্ধান না করতে। এতে তোমাদের মধ্যেকার সম্পর্কটার সৌন্দর্য হারাবে। কিন্তু মাস ছয়েক আগে অনাহিতা কল করে অর্পণকে সবটা জানাল। তখনই জানতে পারলাম সবটা।(দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,)
যাই হোক, এসব নিয়ে ভেবো না। কাল বিয়েটা করে নাও। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।
রাত্রি দু’হাতে চোখ-মুখ মুছে বার কয়েক নাক টানল। বড় বড় কয়েকটা নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে ঠিক করতে চাইল। — কী ঠিক হবে পাপ্পা? ঠিক হওয়ার মতো কিছুই দেখছি না আমি। তুমি জানো আমাদের তিনজনের ভবিষ্যৎ কী? আমার বিয়ের পর পল্লবের কী অবস্থা হবে? পল্লবের ভালোবাসার গভীরতা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই তোমার। ও আমার জন্য এতটা তড়পায় যে সারা রাত চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে। রোজ আমাদের ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। ধীরে ধীরে নিজেকে শেষ করার রাস্তা খুঁজে চলেছে। আর আমার প্রতি করা ওর যত্নগুলো… ওর মতো করে কেউ আমায় আগলে রাখতে পারেনি, পাপ্পা। মায়ের পর পল্লব আমার নির্ভরতার আরও একটা জায়গা। বিপদ-আপদ হলে আমি পল্লব ছাড়া কিছুই বুঝি না। কিন্তু আফসোস, এতকিছুর পরেও আমি পল্লবকে বেছে নিতে পারব না। কারণ আমি অরুণকে ভালোবাসি। ভালোবাসা আর নির্ভরতার মাঝে চরম ফারাক, পাপ্পা। আমি পল্লবের ভালোবাসাকে সম্মান করতে পারব, কিন্তু গ্রহণ করাটা অসম্ভব।

আরশাদ জামান মেয়েকে টেনে বিছানায় বসালেন, নিজেও বসলেন পাশে। রাত্রি বাবার কাঁধে মাথা রাখল। পাশে বসা মানুষটা বাবা হিসেবে যতটা উত্তম, বন্ধু হিসেবে তার থেকেও শতগুণ উত্তম। তাই তো এই আঁধার পথে দিশাহীন রাত তার বাবার শরণাপন্ন হয়েছে। আরশাদ জামান মেয়ের কাঁধ পেঁচিয়ে মাথাটা বাহুডোরে রেখে শুধালেন— এখন তুমি কী চাচ্ছো মা?
রাত্রি ফের ফুপিয়ে উঠল। যে সবার মতো শক্ত নয়,, চেয়েও হতে পারে না — আমার একটু স্বস্তির প্রয়োজন, পাপ্পা। কথায় আছে না, “;সুখের চেয়ে স্বস্তি ভালো”” আমি সুখ বিসর্জন দিয়ে স্বস্তিটাকে বেছে নিতে চাই। যেন জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেকে অকৃতজ্ঞ মনে না হয়।আগামীকাল পল্লবকে কষ্টে রেখে আমার পক্ষে বিয়েটা করা সম্ভব না। আবার অরুণকে সামনে রেখে বিয়েতে মানাও করতে পারব না। সো, আই নিড আ ব্রেক। আমাকে এমন কোনো জায়গায় পাঠিয়ে দাও, যেখানে গেলে ওরা আমাকে খুঁজে পাবে না, আর না ধারণা করতে পারবে আমি ওখানে আছি।
এরপর যখন দুজনেই আমাকে ভুলে নিজেদের জীবন সাজিয়ে নেবে, তখন আমি আবারও ফিরে আসব। ততদিন তোমরা একটু শূন্য থাকো। পঞ্চমূর্তি ফাঁকা থাকুক। যেদিন আমি ফিরব, সেই মিলন বড় মধুর হবে, দেখো।

আরশাদ জামানের মন সায় দিল না — এভাবে হুটহাট সিদ্ধান্ত নিতে হয় না মা। রিল্যাক্স হও। পাপ্পা আছি তো। পাপ্পার ওপর ভরসা রাখো। পাপ্পা ধীরে ধীরে সবটা ঠিক করে দেবে।
রাত্রির কেন যেন বাবার কথাটা মনপূত হলো না। পাপ্পা কেন তাকে বুঝতে পারছেন না? হয়তো পল্লব রাত্রির প্রেমিক নয়, কিন্তু পল্লব রাতের বন্ধু। সেই বন্ধু, যার সঙ্গে গোটা একটা রাত বন্ধ দরজার পেছনে থাকলেও নিজেকে নিয়ে ভয় হবে না। সেই বন্ধু, যে থাকলে বাবা-মায়ের শূন্যতা অনুভব করার সময়টুকুও সে পাবে না। আর এমন এক বন্ধু, যে তার জন্য বরাবর নিজেকে বিসর্জন দিয়ে এসেছে। আগে বিষয়গুলো আলাদা ছিল। পল্লবের অনুভূতি সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না তার। এখন তো সব জানে। সব জানার পরেও সে পল্লবের সামনে অরুণের সঙ্গে কীভাবে ঘর-সংসার করবে? এতগুলো দিন তো পাশাপাশি ছিল মাত্র, বিয়ের পর আরও কাছাকাছি থাকবে। পল্লব যদি এসব মানতে না পেরে নিজের সঙ্গে খারাপ কিছু করে ফেলে? তাহলে নিজেকে কীভাবে ক্ষমা করবে রাত? কিছুতেই পারবে না। ভেবেই পাপ্পার দিকে তাকাল রাত্রি। চোখে চোখ রেখে শুধাল—

— আমার জায়গায় যদি অর্পনা হতো, মানা করতে পারতে? অর্পনার মতো না হই, একটুখানি হলেও কি মেয়ের জায়গাটা নিতে পারিনি আমি?
আরশাদ জামানের মুখাবয়ব কেমন স্থির দেখাল। কিছুক্ষণ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কিছু একটা হিসাব কষলেন। পরক্ষণেই আবারও রাত্রির দিকে নজর স্থির রেখে শুধালেন— আর ইউ শিউর? এই সিদ্ধান্তের জন্য ভবিষ্যতে পস্তাবে না তো?
রাত্রি দুদিকে মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝাল।আরশাদ জামান উঠে দাঁড়ালেন।রাত্রি আলগোছে উঠে দাঁড়িয়ে পাপ্পার বাহু ধরে তাতে মাথা রেখে বলল—
— আমি দুঃখিত, পাপ্পা। এভাবে বলতে চাইনি। কিন্তু আমি নিরুপায়। আমার যে আর কোনো পথ নেই।
আরশাদ জামান এমন একজন বাবা, তিনি কখনো মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করবেন না। অর্পনা চেয়েছিল বলেই দ্বীপকে মেনে নিয়েছিলেন তিনি। এখন যদি অর্পনা একবার বলে সে দ্বীপকে ছেড়ে চলে আসবে, কিংবা দ্বীপ অর্পনাকে সামান্য অপমানও করে, তাহলে মেয়েকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বাড়িতে এনে রাখবেন তিনি। মেয়েরা তার কাছে বোঝা নয়, বরং সম্পদ। মেয়েরা যখন যেখানে কমফোর্ট ফিল করবে, সেখানেই নিয়ে যাবেন তিনি। অগত্যা ছোট মেয়ের উদ্দেশ্যে মুচকি হেসে বললেন—

— ইটস ওকে। আমি কিছু মনে করিনি। যাও, রেডি হয়ে নাও। চট্টগ্রামে আমার একজন ফ্রেন্ড আছে। তার বাড়িতে কয়েকটা মাস থাকবে। এর মধ্যে যা করার আমি করে নেব।
রাত্রি মাথা ঝাঁকিয়ে রুমে চলে গেল। ফিরে এলো নীল শাড়ি গায়ে জড়িয়ে। হাতে ডায়েরি আর কাপড় রাখার ছোট্ট ব্যাগ। তেমন কেউ জেগে না থাকায় মেয়েকে নিয়ে সহজেই বের হতে পারলেন আরশাদ জামান। পরক্ষণেই পার্কিং লট থেকে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন কমলাপুর রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে। ভাগ্য সহায় ছিল। বিদায় তখনও একটা টিকিট বাকি ছিল, যা সুহাসিনী রাত নামক রমণীর নামে লেখা হলো।
মেয়েকে ট্রেনে তুলে দেওয়ার সময় আরশাদ জামান আরও একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, রাত তার সিদ্ধান্তে অটল কিনা। মেয়েটা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানিয়ে তাকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরেছিল।
শেষবার! তবে কি এটাই শেষ সাক্ষাৎ ছিল আরশাদ জামান আর তার ছোট মেয়ের? আরশাদ জামানের ভাবনার মাঝেই হাত মুছতে মুছতে ঘরে এলেন সুহাসিনী। আরশাদ জামানকে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে সরু চোখে তাকালেন। পরক্ষণেই নিচে ফোন পড়ে থাকতে দেখে একটু ঝুঁকে সেটি তুলে স্বামীর দিকে এগিয়ে দিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন — কিছু হয়েছে? এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন যে?
আরশাদ জামান ঘুরে দাঁড়িয়ে অকস্মাৎ সুহাসিনীকে টেনে দুহাতে জড়িয়ে নিলেন নিজের সঙ্গে। থমকে গেলেন রমণী। সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া কিশোরীর ন্যায় লজ্জা পেলেন বোধহয়। তবে চোখ তুলে যখন আরশাদ জামানের চোখে চোখ রাখতেই সেই চোখে অনুতাপের রেশ দেখে কেমন বোকা বনে গেলেন।
মুহূর্তেই চোখেমুখে ফুটে উঠল হাজারো প্রশ্নের ঝড়।
আরশাদ জামান আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন নিজের স্ত্রীকে। মাথায় থুতনি ঠেকিয়ে কাতর কণ্ঠে আওড়ালেন—

— আই অ্যাম সরি, সুহাসিনী… আই অ্যাম সো সরি।
আরশাদ জামান অত্যন্ত শক্ত ধাঁচের মানুষ। কষ্টরা খুব একটা কাবু করতে পারে না তাকে। শুধু অর্পনার বেলাতেই মানুষটা চরম ভঙ্গুর।তবে কি অর্পনার কিছু হয়েছে?কিন্তু মেয়েটা তো পাশের রুমেই ঘুমাচ্ছে। একটু আগেও দেখে এসেছেন তিনি।তবে কি এমন কিছু হয়েছে, যা তিনি জানেন না?সুহাসিনী কিছুটা জোর খাটিয়েই আরশাদ জামানের কাছ থেকে অল্প বিস্তর দূরে সরে গেলেন। বাহুতে ভরসার হাত রেখে বিচলিত কণ্ঠে বললেন—
— কী হয়েছে আপনার? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কিসের জন্য সরি বলছেন? বলুন।
আরশাদ জামানের সুঠাম দেহখানি কেমন থরথর করে কাঁপছে। তিনি আলগোছে সুহাসিনীকে আরও কিছুটা দূরে সরিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে রইলেন সুহাসিনী। কী মনে করে যেন স্বামীর পিছু পিছু গেলেন তিনিও।বসার ঘরে পৌঁছাতেই বিনা অনুমতিতে স্বামীর হাত টেনে ধরলেন।
— কী হয়েছে বলে যান। না বললে কোথাও যেতে দেব না।
আরশাদ জামান ফিরে তাকালেন না। তাকালেই যে ধরা পড়ে যাবেন তিনি।এই মুহূর্তে সুহাসিনীকে কিছুই জানতে দেওয়া ঠিক হবে না। সে যদি এই মুহূর্তে জানতে পারে তার বেঁচে থাকার একমাত্র উৎস…আর ভাবতে পারলেন না তিনি। মনে মনে বারবার আওড়াচ্ছেন””” আমার মেয়ের কিছু হয়নি। ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট হলেই সবাই মরে যায় না। হয়তো আহত হয়েছে। আমি গেলেই ও ঠিক হয়ে যাবে।””‘
আরশাদ জামান জোরপূর্বক হাত ছাড়িয়ে আবারও হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। চিন্তিত সুহাসিনী দুপা পিছিয়ে গিয়ে সোফায় বসে পড়লেন। কী হয়েছে উনার? এমন দেখাচ্ছে কেন? কারোর বিপদ-আপদ হলো না তো?

সকাল সাতটা ৪৫ মিনিট।
বিয়ের আমেজে ভরপুর পাঁচতলার বিল্ডিংটা। একে একে সবাই ঘুম থেকে উঠে হৈচৈয়ে মেতেছে। ইরা সোফায় বসে বসে পরশীর হাতের মেহেদী তুলে দিচ্ছে, মেধা আরণ্যককে সিদ্ধ ডিম খাওয়াচ্ছে, আরাফাত টি-টেবিলে বসে আরণ্যকের সাথে খেলছে। অনাহিতা মনমরা হয়ে বসে আছে, অহমিকা আর আরিব এখনো ঘুমে। বসার ঘরে অনেক মহিলাই মেঝেতে বসে কাজ করছেন।অর্পনা ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বের হলো। তার কপালে তিনটে ভাঁজ। কাল রাতে মেধা, পরশী, ইরাদ, অনাহিতা, অহমিকা, সবাই তার রুমেই ঘুমিয়েছিল। ফলস্বরূপ মির্জা সাহেবকে মির্জা বাড়িতে ফিরে যেতে হয়েছিল। সে নিয়ে মির্জা সাহেব রেগে-মেগে একাকার। তিনি পৃথিবীর সব কাজ পারেন, শুধু বউ ছাড়া ঘুমাতে পারেন না। অর্পনার বুকে মুখ না গুঁজলে উনার চোখের পাতায় ঘুম নামে না। এই লোকের এরকম বউপ্রীতি নিয়ে মোটামুটি আকারের বিরক্ত অর্পনা। তবুও একটার পর একটা কল দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মহাশয়ের কল ধরার নাম নেই। অর্পনা যখন পায়চারি করতে ব্যস্ত, তখনই ওর পেছনে এসে দাঁড়ালেন সুহাসিনী। কেমন হাঁসফাঁস করে শুধালেন— আম্মু, ফ্রি আছো?
অতিব পছন্দের রমণীর কণ্ঠস্বর কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই পেছন ফিরে তাকালো অর্পনা। সুহাসিনীর স্নিগ্ধ মুখখানি দেখলে অর্পনার মনটা অকারণেই ভালো হয়ে যায়। সে ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল—

— একটু ব্যস্ত, কিন্তু আপনি বলুন। কিছু হয়েছে?
প্রশ্রয় পেয়ে আরও দু’কদম এগিয়ে গেলেন তিনি। অর্পনার মুখোমুখি হয়ে বললেন— পুরো বাড়িজুড়ে রাতকে খুঁজে পাচ্ছি না। ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। তুমি কিছু জানো? ও কি পার্লারে চলে গিয়েছে? পার্লারে একটা কল দেবে?
সুহাসিনীর এহেন কথায় ভ্রু কুঁচকে নিল অর্পনা। ফোনের সাইড বাটনে ক্লিক করে দেখল, আটটা বাজতে আরও ১২ মিনিট বাকি। এত সকাল সকাল তো পার্লারই খোলে না, তাহলে রাত্রি পার্লারে যাবে কী করে? কথা তো ছিল সকালে নাস্তা করে, গোসল শেষে নয়টার দিকে পার্লারে যাওয়ার। তবুও সন্দেহবশত পার্লারে কল করল অর্পনা। ওপাশ থেকে পার্লারিস্ট জানালেন, রাত্রি পার্লারে যায়নি। অর্পনার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। ততক্ষণে পল্লব বাড়িতে ঢুকেছে। ছেলেটার অবস্থা বেশ শোচনীয়। আজ সে না চাইলেও সবার কাছে ধরা পড়বে নিশ্চিত। সারা রাত কান্না করে চোখ-মুখের যা-তা অবস্থা করে রেখেছে। অর্পনা দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেল সেদিকে। বিচলিত কণ্ঠে শুধাল—

— দোস্ত, রাত কোথায়? তুই মানে… তোর সাথে ওর কথা হয়েছে?
পল্লব মাথা ঝাঁকিয়ে ‘না’ করল। তবে মুখে কিছুই বলল না। রাত্রিকে পাওয়া যাচ্ছে না শুনে হলরুমে শোরগোল পড়ে গেল। একেকজন একেক কথা বলছে। দুই তলার এক ভাড়াটিয়া বিষয়টাকে তিল থেকে তাল বানাতে ব্যস্ত। মহিলাটির বলা কথাগুলো ইরাদের মাথায় রাগ তুলে দিল। সে স্বভাবতই বেশ রাগী। ইদানীং নিজের দুরবস্থার জন্য নিজেকে শান্ত রাখার প্রয়াস চালালেও মহিলাটির উদ্ভট কথার বিপরীতে চুপ থাকতে পারল না। মুখে যা আসল, সেও তাই-ই বলে দিল। তবে কেউ ওকে থামানোর প্রয়াস করল না। উল্টো অর্পনাও দু’কথা শুনিয়ে দিল। এই শোরগোলের মাঝেই বাইরে থেকে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ ধেয়ে এলো। সাথে সাথে সুহাসিনীর ভেতরটা কেমন ধপ করে উঠল। তখন লোকটা এভাবে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেল, এখন আবার মেয়েটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এখন আবার বাড়ির সামনে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ। কারোর কোনো ক্ষতি হলো না তো? আর ভাবতে পারলেন না রমণী। তৎক্ষণাৎ ছুটে গেলেন লিফটের দিকে। কৌতূহলবশত অনেকেই ছুটে গেল সেদিকে। কেউ কেউ সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে হাঁটা দিল।অর্পনা তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে। পল্লব কেমন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দুই বন্ধুকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকাল ইরাদ। সহসা দুজনের হাত টেনে ধরে সেও ছুটে গেল লিফটের দিকে।গুনে গুনে দুই মিনিটের মাথায় লিফট এসে তিন তলায় থামল। সাথে সাথে ওদের নিয়ে লিফটে উঠে পড়ল ইরাদ।

সারি সারি বিল্ডিংয়ের মধ্যে দিয়ে চিকন সড়কে ঠিক পাঁচতলা ফ্ল্যাটটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাম্বুলেন্স। সেখান থেকে ভঙ্গুর পায়ে বেরিয়ে এলেন আরশাদ জামান, এরপর দ্বীপ, তারপর বিহান। দুজনের মুখই অসম্ভব গম্ভীর, তবে আরশাদ জামানের দেহে যেন প্রাণ নেই। তিনজন নেমে আসতেই অ্যাম্বুলেন্স থেকে স্ট্রেচারে করে একটা সাদা কাপড়ে মোড়ানো দেহ নামানো হলো। লোকগুলোর কী যে তাড়া! দ্রুতই লাশ রেখে তাদেরকে আবার ঘটনাস্থলে ফিরতে হবে। ওখানে আরও ২৫-৩০টি লাশ রয়েছে। এখনো সবার পরিচয়পত্র হাতে পাওয়া যায়নি। সেসব পাওয়া গেলে আরও লাশ পরিচয়মাফিক বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে। এতে অবশ্য মোটা অঙ্কের আয় হবে তাদের। দুনিয়া যেদিকে যায়, সেদিকেই টাকার খেলা। টাকার কাছে সব মাফ। লাশ নামাতে দেখে সবাই কেমন একে অপরের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছে—কী হয়েছে? এভাবে কাকে আনা হয়েছে? কিন্তু কেউই সেই প্রশ্নটুকু করতে পারছে না। সুহাসিনী ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন সিঁড়ির কাছে। তার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে অনাহিতা, অহমিকা, পরশী, মেধা। কিছুটা দূরে আরণ্যককে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরাফাত।

অনাহিতার চোখেমুখে কেমন ভয় স্পষ্ট। সে ভীত নজরে পল্লবের দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটার ঘন ভ্রুতে কেমন ভাঁজ। সে সরু চোখে কাপড়ে মোড়ানো লাশটার দিকে চেয়ে আছে। হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে এটা কে হতে পারে। যুবক কি আদৌ জানে? তার চাঁদ এখন তার মন আর আকাশ ব্যতীত কোথাও নেই? যুবক কি জানে, যেই ভালোবাসার ডোরে সে চাঁদকে অন্তরে বেঁধেছিল, সেই ভালোবাসা তার চাঁদের জন্য শুভকর ছিল না? নাহ! কিছুই জানে না যুবকটি।অর্পনা ইরাদের হাত ছেড়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। ভিড় ঠেলে পাপ্পার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কাঁপা কণ্ঠে শুধাল— এ… এটা কে, পাপ্পা? কাকে এনেছো এভাবে?
আরশাদ জামান উত্তর করতে পারলেন না। ঝরঝর করে কেঁদে দিলেন শুধু। উনার কান্নায় সবাই কেমন বিচলিত হয়ে পড়ল। যেন চোখকে প্রস্তুত করছে এমন কিছু দেখার জন্য, যা হওয়া উচিত ছিল না। আজকের আকাশটা বেশ মেঘলা। সকাল থেকেই বৃষ্টি হবে হবে ভাব। এখন মনে হচ্ছে ঝড় এলেও আসতে পারে।
হঠাৎই খুব জোরে বাতাস প্রবাহিত হলো। বাতাসের তোড় এতোটাই প্রখর যে প্রতিটি মানুষের পোশাক উড়িয়ে দিতে সক্ষম। সেই বাতাসের প্রবল ধাক্কায় লাশের গা থেকে সাদা কাপড়খানি উড়ে গেল।
সাথে সাথে ভেসে উঠল চাঁদের ফ্যাকাশে মুখখানি।

মুখটা কেমন সাদা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। কপাল আর ঠোঁটে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট।
ইরাদ আকস্মিক ” রাত! ” বলে চিৎকার করে ধুলোমাখা রাস্তায় বসে পড়ল। তৎক্ষণাৎ অর্পনা জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় ঢলে পড়তে নিল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বীপ বোধহয় প্রস্তুতই ছিল এর জন্য। সহসাই বুকের সাথে আগলে নিল তার সন্তানের মাকে। ভিড়ের মাঝে রাতের ফ্যাকাশে মুখখানি দেখার সৌভাগ্য হলো না সুহাসিনীর। তবে ইরাদের মুখে মেয়ের নাম শুনেই আন্দাজ করে নিলেন অনেক কিছুই। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন রমণী। ধপ করে বসে পড়লেন সিঁড়ির গোড়ায়। মেধা তড়িঘড়ি করে বসে পড়লেন সুহাসিনীর পাশে। দুহাতে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার প্রয়াস চালালেন এক মাকে। তবে মা কি শান্ত হয়? সন্তানের দুঃখে তার চেয়েও অধিক দুঃখ পাওয়া মাতা সন্তানের মৃত্যু কীভাবে মেনে নেবে? মেধা নিজেও তো মা। ওই তো আরণ্যকটা, সামান্য ক্ষুধায় কান্নাকাটি করলেই তার বুকে কেমন চিনচিনে ব্যথা হয়। তাহলে সন্তানের মৃত্যুতে সুহাসিনীর মনের হাল ঠিক কতটা ভয়াবহ হতে পারে? সহসাই জ্ঞান হারালেন সুহাসিনী। মুহূর্তেই চারদিকে কান্নার রোল পড়ে গেল। কাঁদলেন কিছুক্ষণ আগে রাত্রির নামে নিন্দা করা মহিলাটাও। তবে সেই কান্নারা ওয়াসিম জায়িন নামক যুবকটিকে ছুঁতে পারল না। সে কেমন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার প্রলয়ঙ্কারীর দিকে। যে তার কিশোর বয়সটাকে ভালোবাসার দাবানলে জ্বালিয়ে দিয়েছিল, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করেছিল তার অন্তরটাকে। পল্লব ডান হাতখানা উঁচিয়ে বুকের বাম পাশে অনবরত ডলতে লাগল। তখনই অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে একটা কালো মার্সিডিজ এসে দাঁড়াল। সেখান থেকে ছুটে এলো প্রলয়ঙ্কারীর প্রেমিক পুরুষ। ভিড় পেরিয়ে ছুটে এসে হামলে পড়ল সুহাসিনী রাত নামক রমণীর উপর।
ঢেকে রাখা সাদা কাপড়খানি টেনে সরিয়ে কাঁপা হাতে মেয়েটার গাল ছুঁল। তাতে চাপড় মারতে মারতে অবুঝের ন্যায় ডাকতে লাগল—

— এই রাত! এই! তু… তুই… আমাদের না আজ বিয়ে? এই, তুই এখানে এভাবে শুয়ে আছিস কেন? বল না!
রাত! তোর তো বউ সাজার কথা ছিল, তাই না?
এসব কী পরেছিস? এসব খোল। চল, পার্লারে যাবি চল। মম! ওর লেহেঙ্গাটা পার্লারে পাঠিয়েছ তো? পাঠিয়েছে! চল, চল উঠ! উঠ না… উঠ. ড্যাড! উঠছে না ও। ইরাদ, কিছু বল। তোর বান্ধবী এমন করছে কেন? তাকা! এই চোখ খোল! তাকানা! ও প্রিয়া… আমার প্রেয়সী… আমার ভালোবাসা! আমার সাথে কী নাটক শুরু করেছিস তুই?চল না রাত, উঠ না…
(এই পর্যায়ে ছেলেটা কেমন কাতর হয়ে উঠল।) শুনো না রাত, এসব নাটক বাদ দাও। তোমাকে সাজতে হবে না। আমার সাজগোজ করা বউ চাই না। চলো, আমরা এখনই বিয়েটা করে নেই। উঠো, আসো
বলতে বলতে রাত্রিকে তুলতে নিতেই ওর দ্বিখণ্ডিত দেহখানি দেখে কেঁপে উঠলো অরুন, হুঁশ হারিয়ে ঢলে পড়লো রাত্রির মৃত দেহের উপর। আজীবন দম্ভ নিয়ে থাকা রমণীর ছেলের এই বেহাল অবস্থা দেখে ছুটে এলেন, ঝাঁপটে ধরলেন ছেলেকে, টেনে-টুনে বুকে জড়িয়ে নিয়ে নিজেও ফুঁপিয়ে উঠলেন। ইরাদটা কাঁদতে কাঁদতে রাত্রির পায়ের কাছে শুয়ে পড়লো, দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো দুটো পা। বিড়বিড় করে শুধু “রাত… রাত…” বলে ডাকতে লাগলো।

মেঘলা আকাশে এবার বৃষ্টির আবির্ভাব ঘটলো। টুপটাপ করে বৃষ্টি পড়ছে। তীব্র বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছে আশপাশের সবকিছু। বৃষ্টির তোপ বাড়তেই আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা নিজেদের ঘরে ফিরে গেলো। বাইরে পড়ে রইলো শুধু রাতের আপনজনেরা। আরশাদ জামান এবার নিজেও ধপ করে বসে পড়লেন আধভেজা রাস্তায়। বৃষ্টির ফোঁটা অর্পনার শরীর ছুঁতেই হুঁশ ফিরে পেলো মেয়েটা। দ্বীপকে ঠেলে সরিয়ে ছুটে এলো রাত্রির নিকট। পুরো পাঁচ মাস সন্তানের চিন্তায় ধীরে ধীরে চলাচল করা রমণী বেখেয়ালেই বসে পড়লো রাত্রির পাশে। অসাবধানতায় পেটে বোধহয় ব্যথা পেলো কিছুটা, তবে সেসবের দিকে কোনো মনোযোগ নেই তার। তীব্র রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপে বধনখানিতে সজোরে চড় বসালো। গলার কাছের নীল ব্লাউজটা টেনে ধরে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো—
“এই বেইমানের বাচ্চা, উঠ! জবাব দে। কী কথা দিয়েছিলি? কী কথা ছিল? কথা ছিল না যা খুশি হয়ে যাক, ছেড়ে যাওয়ার অপশন নেই? তুই জানতিস না অর্পনার নিজের বলতে কেউ নেই? এই নিমকহারামের বাচ্চা, উঠ! উঠ, নাহলে তোকে আবার মেরে ফেলবো আমি। তোকে এই কারণে বোন বানিয়েছিলাম? যখন বানিয়েছি তখন কেন বললি না তুইও আমাকে ছেড়ে যাবি? আমি কি এতোই খারাপ? আমার আপন হয়ে থাকা যায় না? তোরা আমার সাথে এমন করিস কেন? রাতরে… ও রাত! ওঠ বোন। সব মেনে নিয়েছি—নিজের বোন, বাপ, মা সবার মৃত্যু মেনে নিয়েছি। কিন্তু তুই! তোর বেলায় আমি কাতর, নির্বোধ, দুর্বল। বিশ্বাস কর…”

কথার মাঝেই কেমন স্থির হয়ে গেলো অর্পনা। তার চোখে এক বিন্দু পানিও নেই, চোখ জ্বলছেও না। সে শুধু এক দৃষ্টিতে রাত্রির দিকে তাকিয়ে। অনেকটা সময় নিয়ে মেয়েটা কী যেন ভাবলো, হিসাব-নিকাশ করে হঠাৎ হেসে উঠলো—উন্মাদের মতো। পিচঢালা রাস্তায় হাত দিয়ে আঘাত করতে করতে চেঁচিয়ে উঠলো—
“আমাকে পোড়ানোর জন্য তোদের এতো আয়োজন, তাই না? অর্পনাকে শূন্য করে দেওয়া খুব সহজ? আমি তোকে কোনোদিন ক্ষমা করবো না। পারুর মতো তুইও বেইমান। তোদের মতো বোন আমার লাগবে না। ফা*ক অফ! আই অলসু ফা*ক মাই ফা*কিং সিস্টার।”
বিগত কয়েক মাসে অর্পনার এসব পাগলামি নিজেকে আঘাত করা, কাটা-ছেঁড়া, কমে এসেছিল। বিশেষ করে গর্ভে সন্তান আসার পর থেকে অর্পনা কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে, যেন বেবি হওয়ার পর নিজের প্রতি হওয়া হিংস্র রূপ দেখে বেবি কোনো আতঙ্কে না থাকে। কিন্তু আজ বোধহয় রাতের মৃত্যুতে সব শেষ হতে চললো।

অর্পনাকে এভাবে আঘাত করতে দেখে ছুটে এলো দ্বীপ। দু’হাতে ঝাঁপটে ধরে শান্ত করার চেষ্টা চালালো। কিন্তু অর্পনার ম্যাসোকিস্ট রূপ বড্ড ভয়ানক। যখন সে নিজেকে দোষারোপ করে আঘাত করতে থাকে, তখন সে নিজের মধ্যে থাকে না। শরীরে কেমন অদ্ভুত শক্তির জোয়ার বয়ে যায়। একদিক থেকে আটকালে অন্য দিক থেকে নিজেকে আঘাত করে। তবে দ্বীপ তো অর্পনার স্বামী, সর্বসময়ের সঙ্গী। মানব খুব ভালো করেই জানে অর্পনাকে কীভাবে আয়ত্তে আনতে হয়। অগত্যা সে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরলো অর্পনার দুটো হাত। বাধা পেয়ে মুচড়ামুচড়ি করতে লাগলো অর্পনা। ছাড়া না পেয়ে মুখ নামিয়ে নিজের হাতের বাহুতে কামড় বসালো। দ্বীপ এবার এক হাতে ওকে সম্পূর্ণরূপে নিজের সাথে আটকে, অন্য হাতে জোরপূর্বক বাহু থেকে মুখ সরিয়ে নিজের মুখের বরাবর আনলো। অর্পনা সাপের ন্যায় ফোঁসফোঁস করছে, চোখে আগুন, সকল বিদ্বেষ নিজের প্রতি। দ্বীপ অর্পনার মাথাটা শক্ত করে ধরে হিম-ধরানো কণ্ঠে ডাকলো—
“ভেলোরা! লুক অ্যাট মাই আইজ। শান্ত হও, ধীরে ধীরে নিশ্বাস নাও… শান্ত, শান্ত।”

দ্বীপের হিম-ধরানো কণ্ঠে না চাইলেও তাকাতে বাধ্য হলো অর্পনা। চোখে চোখ পড়তেই কেমন স্থির হয়ে গেলো। সময় নিলো দ্বীপ। অর্পনার নিশ্বাসের গতি কিছুটা স্বাভাবিক হতেই দ্বীপ ধীরে ধীরে ডান হাতটা অর্পনার কানের পেছনে নিয়ে লতিরে সজোরে চাপ প্রয়োগ করলো। সাথে সাথে হুঁশ হারিয়ে ঢলে পড়লো অর্পনা। দ্বীপ ওকে পাজাকোলা করে ফ্ল্যাটের দিকে রওনা দিলো। বৃষ্টির পানিতে আবারও জ্ঞান ফিরে এলে মেয়েটাকে সামলানো যাবে না। নিজের ক্ষতি করতে গিয়ে যদি বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তখন অর্পনাকে বাঁচিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। যেহেতু অর্পনা বাচ্চা ব্যতীত আর কাউকেই নিজের মনে করে না, সেহেতু অর্পনার জন্য এই বাচ্চাটা বড্ড গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, তার বাচ্চা ব্যতীত সবাই তাকে প্রয়োজনের খাতিরে জীবনে রেখেছে, এমনকি দ্বীপ ও। দ্বীপ এখন আর এসব নিয়ে কষ্ট পায় না। দুটো বছরেও যখন নিজেকে আপন প্রমাণ করতে পারেনি, বাকি জীবনটা না হয় এভাবেই যাক। কিছু তো করার নেই। অর্পনা মানসিকভাবে অসুস্থ, মনে যা ঠিক করে নেয় তাই-ই সঠিক মনে করে।

সুহাসিনীর জ্ঞান ফিরতেই পাগলামি শুরু করে দিলেন। সবাই চেয়েও আটকে রাখতে পারছে না। তিনি ছুটে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখে-মুখে চুমু খেলেন, সারা শরীরে হাত বুলাতে বুলাতে কাটা জায়গাটায় গিয়ে থামলেন। এখনো রক্ত ঝরছে জায়গাটা থেকে।আরশাদ জামান মেয়ের পোস্টমর্টেম করতে দিবেন না বলে টাকা-পয়সা দিয়ে সেই অবস্থাতেই নিয়ে এসেছেন। আইনি লোক হওয়ায় কেউ কোনো জোর করতে পারেনি। সুহাসিনী মেয়ের ক্ষত জায়গাটা ছুঁয়ে দিলেন, রক্তে মাখামাখি হয়ে গেলো হাত দু’খানা। তিনি সেই রক্তের দিকে তাকিয়ে বড্ড অভিমানী স্বরে বললেন—
“ও আল্লাহ! আমি কি ওকে এভাবে ভাগ ভাগ করে জন্ম দিয়েছিলাম? দেওয়ার বেলায় তো তুমি এভাবে দাওনি, তাহলে আজ নেওয়ার বেলায় এমনটা কেন করলে? এভাবে যদি নিয়েই যাবে, তাহলে কেন দিয়েছিলে? আমার তো বিয়েও হয়নি তখন, একটা সংসারও হলো না, তার মধ্যেই তুমি এমন পরিস্থিতি তৈরি করলে যে এই মেয়েকে আমার পেটে ধরতেই হলো। আমি ধরেছি, ভালোবাসা, সংসার, সুখ, সব ত্যাগ করেছি। একলা হাতে বড় করেছি। আর সেই বড় করার প্রতিদান এই? আমি এখন কার মুখ চেয়ে বাঁচবো? আমার তো কেউ রইলো না। জীবনে তো কম পরীক্ষা নাওনি। কি হতো একটু রহম করলে? খুব ক্ষতি হতো কি?”

আরশাদ জামান এই পর্যায়ে বসা থেকে উঠে এলেন, আবারও বসে পড়লেন সুহাসিনীর পাশে। টেনে বুকে জড়িয়ে নিলেন। স্বামী নামক আশ্রয়ে ঠাঁই পেয়ে জোরে ফুঁপিয়ে উঠলেন রমণী। রাতকে দেখিয়ে বললেন—
“আমার মেয়ে! আল্লাহকে বলুন না আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে, ওকে ছাড়া আমি কিভাবে বাঁচবো? আল্লাহ! দয়া করুন, ফিরিয়ে দিন।”
বলতে বলতে আবারও জ্ঞান হারালেন রমণী। আরশাদ জামান আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন স্ত্রীকে। এই পর্যায়ে রাত্রির মুখটা একটু উজ্জ্বল হলো কি? হয়েছে বোধহয়। বেঁচে থাকলে হয়তো সে বলতো—
“মাম্মা, আমি আসার বেলায় তোমার ভালোবাসা, তোমার মেহমাদকে কেড়ে নিয়েছিলাম। আজ যাওয়ার বেলায় আরশাদ জামানকে দিয়ে যাচ্ছি। আরশাদ জামান কিন্তু মেহমাদের চেয়েও শতগুণ যোগ্য, তুমি ঠকে যাওনি।”

সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম হতে বর্ণিত—
“তোমরা জানাযা দ্রুত নিয়ে যাও। যদি সে নেককার হয়, তবে তাকে কল্যাণের দিকে এগিয়ে দিচ্ছ। আর যদি তা না হয়, তবে তোমরা তোমাদের কাঁধ থেকে একটি অনিষ্টকে দ্রুত নামিয়ে রাখছ।”
ইসলাম তো বলে খালাস, কিন্তু মানব মন তো মানে না। ইসলাম যদি এতটাই সুনিপুণ হবে, তাহলে মহান আল্লাহ তায়ালা কেন মানব শরীরে হৃদয় দিলেন? কেন ব্যথা দিলেন? মানুষ কেন আপনজন হারানোর ব্যথায় দগ্ধ হয়? কেন পাথরে পরিণত হয়, আর কবরে সায়িত করার বেলায় কেন শরীরের প্রতিটি অংশ ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে চায়? এর কোনো উত্তর কি কারও কাছে আছে? নাকি আল্লাহ তায়ালাকে প্রশ্ন করার হিম্মত কারও আছে? প্রতিটি মুসলিম মানব-মানবী মহান আল্লাহ তাআলার দাসত্ব স্বীকার করতে বাধ্য। অগত্যা ইসলামের বিধি-বিধানকে মান্য করে জোহরের নামাজের পর ২টা ৩০ মিনিট নাগাদ রমনার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রাত্রির জানাজা পড়ানো হবে। এরপর সেখান থেকে সোজা আজিমপুর কবরস্থানে পৌঁছে সেখানেই সায়িত করা হবে রাত্রিকে।

বর্তমানে চারজন মহিলা মিলে পর্দা টানিয়ে গোসল করাচ্ছে দ্বিখণ্ডিত দেহখানি। সেই পর্দার বাইরে চুপচাপ বসে আছে রাতের প্রেমিক অরুন আজওয়াদ। ছেলেটা জ্ঞান ফেরার পর কেমন পাথর হয়ে গিয়েছে, আবারও বাকশক্তি হারিয়ে বোবা হয়েছে সে। পাঁচতলা ফ্ল্যাটটির নিচের সিঁড়ির কোণে চুপচাপ বসে আছে ইরাদ। কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙে গেছে মেয়েটার। কণ্ঠ ফেটে শব্দ আসে ঠিকই, তবে তা উচ্চারিত হয় না। তার থেকে কিছুটা দূরে এখনো কেদে কেঁদে ভাসাচ্ছেন সুহাসিনী
। যে নারী নিজের ভালোবাসা, সংসার, স্বপ্ন সব মাটি করে নিজের পুরো জীবনটাই দিয়েছিলেন নিজ গর্ভে ধারণ করা অন্যের সন্তানকে। তিনতলায় ক্ষণে ক্ষণে তাণ্ডব চালাচ্ছে অর্পনা। ইতিমধ্যে ঘরের প্রতিটি আসবাব তার ক্ষোভের শিকার হয়েছে। এত ব্যথা, এত শূন্যতা সামলাতে সামলাতে সে উন্মাদ হয়ে উঠেছে আজ। ওয়াসিম জায়িনকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সে একবারের জন্যও তার প্রলয়ঙ্করীর কাছে যায়নি, ছুঁয়েও দেখেনি, একটি বাক্যও উচ্চারণ করেনি। এই যে বেলা গড়িয়ে দুপুর পেরিয়ে যাচ্ছে কোথায় সে? কেন আসেনি? প্রলয়ঙ্করীকে কি একবারও শেষবারের মতো দেখা যাবে না? পাগল ছাগল কিংবা নাদান বলে ডাকবে না? হয়তো সে রাতের প্রেমিক কিংবা বন্ধু নয়, অপ্রেমিক তো? অপ্রেমিক হিসেবে একটাবার দেখা দেওয়া উচিত ছিল না? এক ফোঁটা চোখের পানি অন্তত ডিজার্ভ করে রমণী। বেঁচে থাকতে তো কখনোই ভালোবাসা প্রকাশ করেনি, চলে যাওয়ার পরেও কি এক বিন্দু ভালোবাসা প্রকাশ করা যেত না? কথা বলা যেত না? বলা যেত না “নাদানের বাচ্চা, তোকে আমি ভালোবাসি”? একবার কি নিজ মুখে “চাঁদ” বলে ডাকা যেত না? অথচ রাতের অপ্রেমিকের দেখা নেই। আজ রাতের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কথা ছিল বিরাট সমাগমের। বাড়িতে ইমাম আসবেন, রাত বউ সাজবে, অরুন বর বেশে আসবে, তারপর কবুল বলে শ্বশুরবাড়ি রওনা হবে নতুন বউ বেশে থাকা রমণী।

আজ সবই হলো, সমাগম হলো, তাকে সাজানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে, শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর জন্য খাটিয়া আনা হয়েছে, বাঁশ কাটা হচ্ছে নিরাপত্তার জন্য। অরুন আজওয়াদও এসেছে, আসন পেতে বসে আছে ধুলো-মাখা মাটিতে। কিছুক্ষণ বাদে ইমাম সাহেবও আসবেন, অনেক দোয়া পড়বেন, কিন্তু কবুল বলবে না কেউ। আপন বাড়ি যাওয়া হবে ঠিকই, কিন্তু বিয়ে হবে না কারও।
রাত্রির গোসল শেষে খাটিয়ায় শোয়ানো হলো। কিছুক্ষণ বাদেই নামাজ পড়ে ফিরে এলো সবাই। আদেশ করা হলো, আপনজনেরা যেন শেষবারের মতো দেখে নেয় রাতকে। অগত্যা সবাইকে একে একে রাত্রির খাটিয়ার কাছে আনা হলো। পাড়া-প্রতিবেশীর অনেকেই দেখলেন মেয়েটাকে, তবে অর্পনাকে আনার সাহস করতে পারছে না দ্বীপ। নামাজে যাওয়ার আগে ঘুমের ইনজেকশন পুশ করে গিয়েছে। এখন ডেকে তোলাও সম্ভব না, আর তুললেও কিছু ঠিক থাকবে না। অগত্যা অর্পনাকে দেখানো হলো না। অরুনের বাবা অরুনকে টেনে-টুনে নিয়ে গেলেন। বলিষ্ঠ অরুনের পাথুরে রূপের সাথে সহজে পেরে উঠলেন না তিনি, তবুও বহু কষ্টে নিয়ে গেলেন। ছেলেটা কেমন বোকার মতো তাকিয়ে আছে তার প্রেয়সীর পানে। যেন বুঝতেই পারছে না এটা কে, চিনতেও পারছে না।

,, রাতের খাটিয়ার প্রথম পায় বহন করলেো তার বাবা, সাথেরটা দ্বীপ, পিছনের দুটো বিহান আর আরাফাত। যাকে রাত্রি ক্ষণিকের জন্য ভাই হিসেবে পেয়েছিল।
এতক্ষণ চুপচাপ থাকলেও এই পর্যায়ে উন্মাদ হয়ে উঠলো অরুন। রাতকে কাঁধে তুলতেই ছুটে গিয়ে সবাইকে ধাক্কা দিতে দিতে “আআআ… আআআ” শব্দ করে কাঁদতে লাগলো। রাত্রির খাটিয়া কাঁধে নিয়ে এখানকার প্রতিটি মানুষ ভঙ্গুর। কেঁদেছে দ্বীপ, বিহান, আরাফাতও। এই বিদ্বস্ততায় অরুনের শক্ত পোক্ত ধাক্কার একপর্যায়ে খেই হারিয়ে বসলো আরশাদ জামান। খাটিয়া পড়ে যেতে নিলেও সামলে নিলেন।অরুন ফের দ্বীপকে ধাক্কা বসাতে নিলে এক হাতে খাটিয়ার পায়া সামলে, অন্য হাতে অরুনকে জড়িয়ে ধরলো দ্বীপ। অরুন একজন ভঙ্গুর বাবার সাথে পেরে উঠলেও শক্ত-পোক্ত দ্বীপ মির্জার সাথে পেরে উঠলো না। অরুনের পাগলামি, এই কাতর দৃষ্টি, বড্ড চেনা দ্বীপের। এই একই জায়গায় একসময় সেও ছিল। এই যন্ত্রণাটা প্রকাশ করার মতো ভাষা তার জানা নেই। দ্বীপ আর কিছুই ভাবতে পারলো না। পারুর কথা মনে আসতেই বুকের ভেতর চাপা কান্না জমে উঠলো, তবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে বড্ড পারদর্শী দ্বীপ। ঘাড় বাকিয়ে আহাদের দিকে তাকাতেই আহাদ ছুটে এসে অরুনকে টেনে-টুনে দূরে সরানোর চেষ্টা চালালো।

“ভালোবাসার মানুষ খুব ভাগ্যবান হলে নাকি ভালোবাসার মানুষের জানাজা পায়” অথচ রাত্রির দুজন ভালোবাসার মানুষ থাকা সত্ত্বেও কারোর জানাজা পেলো না। অরুনটা পাগলামি করতে করতে আবারও জ্ঞান হারালো। দ্বীপের নির্দেশে এবার আর জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করলো না কেউ। জ্ঞান ফিরলে রাতকে সুষ্ঠুভাবে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। অগত্যা অরুনের অচেতন দেহটা আগলে নিলো দুজন গার্ড। অরুনকে জোরপূর্বক আটকানো গেলেও আটকানো গেল না রাত্রির মা নামক মানুষটাকে। রমণী কোন ফাঁকে ছুটে গেলেন মেয়ের খাটিয়ার পিছু পিছু কেউ টের পেলো না। সুহাসিনী খালি পায়ে ছুটতে ছুটতে একপর্যায়ে পিচঢালা রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। হাত বাড়িয়ে বারবার মেয়ের নাম ধরে ডাকলেন, কিন্তু কেউ ফিরে তাকালো না। যে চলেই যাবে, তাকে ক্ষণিকের জন্য আটকে রেখে কী হবে? সুহাসিনীর পিছু পিছু ছুটে গিয়েছিল অনেক মহিলারা। মেধা, পরশী ছুটে গিয়ে আগলে নিলো সুহাসিনীকে, টেনে তুলে বুকে জড়িয়ে নিলো মেধা। এসব নিরব দর্শক হয়ে দেখছে পল্লবের মা। উনার চোখেও পানি, ছেলের চিন্তায় তিনি প্রায় ভেঙে পড়ছেন। মেয়েটাকে আনার পর সেই ঝড়ের সময় ছেলেটা বেরিয়ে গিয়েছে আর ফিরেনি। কোথায় গেছে কে জানে? ফোনেও তো পাওয়া যাচ্ছে না।
ওদিকে অনাহিতর অবস্থা খুব খারাপ, প্রেশার ফল করেছে চারবার। তিনি কী করবেন বুঝতে পারছেন না।
ছেলেটা না হয় রাত্রিকে ভালোবাসে, কিন্তু অনাহিতার কী হলো? সে কেন বারবার মূর্ছা যাচ্ছে? আর রাত্রির সাথেই বা এমনটা কী করে হলো? মেয়েটা চট্টগ্রামের ট্রেনে কেন উঠলো? কোথায় যেতে চেয়েছিলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কারও জানা নেই।

দ্বীপ জোহান মির্জার শালিকা, আরশাদ জামানের ছোট মেয়ে হওয়ার দরুন জানাজায় বেশ মানুষ হলো। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সম্পূর্ণ ভরে গিয়ে উদ্যানের আশেপাশেও ঠাঁই নিলো অনেকেই। ইমাম সাহেব খুবই সুনিপুণভাবে জানাজা পড়ালেন। সবশেষে নিয়মমাফিক রাত্রির দ্বিখণ্ডিত দেহখানি কবরে সমাহিত করার নির্দেশ দেওয়া হলো। আরশাদ জামান এগিয়ে এসে খাটিয়ার পাশে বসলেন। ধীরে ধীরে রাত্রির মুখ থেকে সাদা কাফনের কাপড়খানা সরিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন অনেকটা সময়। মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন—

“আমার ক্ষণিকের জান্নাত! আমাকে ক্ষমা করো মা। তোমার জেদকে প্রশ্রয় না দিলে আজ তোমার খাটিয়া আমার কাঁধে উঠতো না। তুমি বলেছিলে আমাদের পরবর্তী সাক্ষাৎ বড্ড মধুর হবে। তাই হবে মা, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ চাইলে আমরা আবার মিলিত হবো। আখিরাতে জান্নাত লাভ করে সবাই একসাথে থাকবো। আর তখন আমার মেয়েকে আমি কারও কাছে দেবো না। কাউকে ভালোবাসার সুযোগও দেবো না। আমি আমার মেয়েকে এমনভাবে লুকিয়ে রাখবো, যেন ওয়াসিম জায়িন কিংবা অরুন আজওয়াদ তো দূর, একটা পাতি প্রজাপতিও আমার মেয়ের দিকে নজর দিতে না পারে।”

ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না, আসার কথাও না। আরশাদ জামান কাফনের কাপড়টা আগের মতো ঠিক করে দিতে চেয়েও দিলেন না। কী ভেবে যেন আবারও ঝুঁকে গেলেন। মেয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে আযাব নিবারণের দোয়া, দরুদ, পাঁচ কালিমা, তওবা পাঠ করলেন। বাচ্চারা পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগে একজন বাবা যেভাবে বইয়ের উত্তরগুলো বারবার রিভিশন করায়, ঠিক তেমনি আরশাদ জামান মেয়ের কানের কাছে বারবার মুনকার-নাকিরের প্রশ্নগুলোর উত্তর আওড়ালেন। তিনি জানেন তাঁর মেয়েটা বেঁচে নেই, কিছুই শুনতে পারছে না, কিছুই বুঝতে পারছে না। তবুও অকারণেই এমন করলেন। সবশেষে গগনবিদারী কান্নায় ভেঙে পড়লেন শক্তপোক্ত মানুষটি। কে বলবে এই মেয়েটা তাঁর নয়? মানুষটা বরাবরই অন্যের সন্তানকে নিজের ভেবে এসেছেন। হয়তো রক্তের কোনো যোগসূত্র নেই, কিন্তু আত্মার টানে তিনি বড্ড কাতর। আরশাদ জামানকে এভাবে কাঁদতে দেখে এগিয়ে গেলো দ্বীপ। টেনে তুলে দূরে সরিয়ে আনলো। এই প্রথমবার দ্বীপ স্বেচ্ছায় শ্বশুরকে জড়িয়ে ধরলো। নানান বাক্য আওড়িয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলো। কিছুটা শান্ত হয়ে আসতেই আরশাদ জামানকে ছেড়ে বিহানকে নিয়ে কবরে নামলো দ্বীপ। এই পর্যায়ে আরাফাতও এগিয়ে এলো। আরশাদ জামান ও আরাফাত সযত্নে রাত্রির দেহখানি নামিয়ে দিলেন কবরে। বিহান ও দ্বীপ ধীরে ধীরে ধরে নামিয়ে ডান কাতে কিবলামুখী করে শুইয়ে দিলো। চারজনই ধীর কণ্ঠে আওড়ালো—

“বিসমিল্লাহি ওয়া আলা সুন্নাতি রাসূলিল্লাহ।”
রাত ৯ টা ২৩ মিনিট,,
,,,, অর্পনার অবস্থা বেশ বেগতিক,, কোনো ভাবেই শান্ত করা যাচ্ছে না বিদায় বাড়িতে ডক্টর নিয়ে এসেছিলো বিহান,, এখন ড্রপ করতে যাবার বেলায় হুট করেই মাঝরাস্তায় মানুষের ভীর দেখে বিরক্তিতে কপাল গুটিয়ে নিলো। ভীরটা বোধয় সদ্যই তৈরি হয়েছে, তাই এখনো জ্যাম তৈরি হয়নি। এমনি মন মেজাজ খারাপ তার উপর রাস্তা ঘাটে এই উটকো ঝামেলা। বিহান বিরক্তিকর নিশ্বাস ফেলে হর্ন বাজালো কিন্তু কারোর কোনো ভাবাবেগ হলো না। বিহান এবার মুখে মাক্স পরে নেমে এলো, ঐতিমধ্যে অনেক গাড়ি ই এসে জমা হয়েছে সেথায়। রাগে ফোস ফোস করতে করতে ভীর ভাট্টার কাছে এসে কর্কষ স্বরে আওড়ালো — হুয়াট্স হ্যাপেন্ড? এখানে সার্কাস হচ্ছে? এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে গাড়ি আকাশপথে নিয়ে যাবো?

,,, ততোক্ষণে পিছনে বসা তিনজন গার্ড নেমে এসে বিহানের পিছনে দাড়ালো। বিহানের কর্কশ ধ্বনিকে খুব একটা পাত্তা দিলো না কেউ। মুখে মাক্স থাকার কারনে চিনতেও পারলো না তাকে। ভীর করে দাড়িয়ে থাকা একজন লোক বিহানের চেয়েও অধিক কর্কশ ধ্বনিতে বললো — এনে সার্কাস হবো কেন? দেখবার পারচো না এইখানে একটা পোলা পইরা আচে? কোনসোম থাইক্কা বির বির কইরা খালি “”চাঁদ চাঁদ”” কইরা যাইতাচে।
,,, লোকটার কথার পাছে আরেকজন বললো — প্রেমিকায় ছাইড়া গেছে মনে হয়। সকাল থাইকা শাহাবুদ্দিনের ডেড়ায় গোগ্রাসে ম*দ গিলছে। খাইতে খাইতে বমি করছে এগারোবার,, তার পরেও খায়। দেহেন ওভার লোড হইছেনি। কয়দিন আগে চান মিঞা বউ মাইরা টেহা আইন্না শাহাবুদ্দিনের ঘরে ওভারলোড হইয়া মরলো। এও মরবো, দেহেন মরছেনি।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৪)

,,, “” চাঁদ ” কথাটি শুনে আৎকে উঠলো বিহান। এই নামে তো পল্লব রাত্রিকে ডাকে। সকাল থেকেই পল্লবকে পাওয়া যাচ্ছে না,, রাত্রিকে সায়িত করার পর অর্পনা, সুহাসিনী, ইরাদকে সামলাতে সামলাতে পল্লবকে খোজা হয়নি। ওদিকে অরুনের অবস্থা বড্ডো করুন,, রাত্রিকে নেওয়ার বেলায় যে জ্ঞান হাড়িয়েছে সেই জ্ঞান আর ফিরেনি। অবস্থা সূচনীয় দেখে তাকে হসপিটালিস্ট করা হয়েছে। বিহান ভীর বাট্টা পেড়িয়ে পরে থাকা ছেলেটির পাশে বসে পরলো। ছেলেটি উপুর হয়ে পরে আছে। বিহান টেনে তুলতেই মুখটা দেখে আৎকে উঠলো। এখানেও বমি করেছে ছেলেটা,, এই পর্যায়ে বিষয়টা বমিতেই আটকে থাকেনি বরং রক্ত বমি করেছে।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৬)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here