Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৫

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৫

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৫
জাবিন ফোরকান

তিন মাস আগে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যবসায়িক গ্রুপ রেমান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের তরফ থেকে তাদের নতুন কোম্পানি ভবন এবং বেশকিছু কোয়ার্টার নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। সেই প্রজেক্ট হাতে নিয়েই ইংল্যান্ড থেকে জেসন পাড়ি জমিয়েছে বাংলাদেশে। এক্ষেত্রে সবথেকে বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তার কোম্পানি, তাছাড়া বিদেশী। বাংলাদেশের মানুষ আবার নিজের দেশের থেকে অন্য দেশের কাজের উপর বেশি ভরসা করে এটা বৈদেশিক মহলে প্রচলিত ধারণা।
রেমান গ্রুপের বিশাল কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করতেই একদম নিচের সারির দিকে নিজের এদেশী ব্যবসায়ী বন্ধু রফিক জিলানীকে নজরে এলো জেসনের। সে সেদিকেই এগিয়ে গেলো। বিস্তৃত রুমটা প্রথম দেখায় মিটিং হল কম, সংসদ কক্ষ বেশি মনে হয়। সারি সারি লম্বা টেবিল এবং চেয়ার সংযুক্ত প্রতি সিঁড়ির ধাপে। সেসব দেখতে দেখতে জেসন পৌঁছে গেলো। রফিকের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে তার পাশেই বসল।

“কষ্ট করে না এলেও চলতো। টেন্ডারটা আমরাই পাচ্ছি যেহেতু!”
জেসন ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতে পারে। তার বক্তব্য শুনে মৃদু হাসলো রফিক।
“সেটা সত্যি কথা। তবে, ফর্মালিটিস তো করতেই হয়। তাছাড়া, ওরা বলেছে আজই ফাইনাল টেন্ডার ঘোষণা করে সাইন করিয়ে নেবে। সেক্ষেত্রে মালিক পক্ষের উপস্থিতি প্রয়োজন।”
ইতোমধ্যে টেন্ডার জমা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং মালিক পক্ষের প্রধানগণ উপস্থিত হতে শুরু করেছে। সকলেই কনফারেন্স রুমের চারপাশে বসলো। সামনের প্রশস্ত ডায়াসের উপর উঠে এলো পরিপাটি শাড়ী পরনে এক তরুণী। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে সে ঘোষণা করলো,
“আসসালামু আলাইকুম। আমি তাহমিনা সুলতানা, ম্যানেজার ফ্রম হ্যান্ডলিং ডিপার্টমেন্ট অব রেমান গ্রুপ। আপনাদের সকলকে স্বাগতম জানাচ্ছি আমাদের টেন্ডার ফাইনাল আলোচনায়। প্রথমেই আমি ধন্যবাদ জানাতে চাইবো আমাদের প্রজেক্টের জন্য টেন্ডার জমা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: জিলানী এল টি ডি, এস কে এম গ্রুপ, ব্লু আইস ফ্রম ইংল্যান্ড, আর বি জি ফ্রান্স, হাওলাদার কর্প, হুসেইন গ্রুপ….”
শেষ নামটায় রফিক চমকে উঠলো। জেসন খেয়াল করলো আশেপাশের ব্যবসায়ীদের মাঝেও খানিক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেললো রফিক। জেসনের কৌতূহলী চেহারার দিকে চেয়ে বললো,

“হয়ে গেলো! তোমার টেন্ডার গেলো বোধ হয় হাত থেকে!”
“কেনো কেনো?”
“হুসেইন গ্রুপ টেন্ডার দিয়েছে, তার মানে আমরা খতম।”
“হুসেইন গ্রুপের নাম তো আমি আগে শুনিনি। পাওয়ারফুল হলে জানার কথা।”
জেসন সন্দেহ প্রকাশ করলো। তাতে রফিক হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে খানিক হেলান দিয়ে বসে জানালো,
“নতুন মোড়কে পুরাতন আতঙ্ক। অনেক কন্ট্রোভার্শিয়াল। নিউ পাওয়ার।”
“তাহলে তাকে এত গোণায় ধরার কি আছে? আমি নিশ্চিত, আমার চাইতে কেউ এত কম বাজেটের টেন্ডার দেয়নি।”
খানিক ভাব দেখালো জেসন। নিজের গলায় বাঁধা টাইটা টেনে ঢিলে করে আয়েশী ভঙ্গিতে বসলো। রফিক সুস্থির দেখে বললো,
“তুমি হুসেইন গ্রুপের নতুন সি ই ও কে চেনোনা।”
“আমার যাকে তাকে চেনার সময় নেই।”
“সিংহের মুখ থেকে হয়ত খাবার ছিনিয়ে আনা সম্ভব, কিন্তু সাবিন হুসেইনের কাছ থেকে টেন্ডার ছিনিয়ে আনা অসম্ভব।”

এবার খানিকটা নড়েচড়ে বসে ভ্রু তুললো জেসন।
“কিঃ! একটা মেয়ে মানুষের এত ক্ষমতা?”
“মেয়ে মানুষ? ওই নামে কেউ তাকে ডাকে না এখানে।”
“তবে কি ডাকে?”
“স্যাভেজ সাবিন—দ্যা বর্বর ব্যবসায়ী।”
জেসন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলো তার পাশে বসে থাকা বাংলাদেশী ব্যবসায়ী বন্ধুটির দিকে। এই দেশে টেন্ডার দিতে এসে এমন মুসিবতে পড়া যায় তার ধারণায় ছিলোনা। সে তো ভেবেছিল তৃতীয় বিশ্বের দেশ, প্রতিযোগিতা কম! জেসনের অবিশ্বাস এবং বিস্ময় মাখা চেহারা দেখে বাঁকা হেসে রফিক জিলানী জানালো,
“শি ইয দ্যা ইয়াঙ্গেস্ট মিলিয়নিয়ার অব বাংলাদেশ ইন প্রেজেন্ট টাইম।”
ঝুঁকে এসে জেসনকে ফিসফিস করে সাবধান করলো সে,
“একটুখানি এদিক ওদিক করো, ছিঁড়ে খেয়ে উচ্ছিষ্টটুকু ছেড়ে দেবে বাকিদের জন্য উদাহরণ হিসাবে!”
মাইক্রোফোনে কথা বলতে থাকা তাহমিনার গলাটা এবার চড়া হলো,

“আমি খুবই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে জানাচ্ছি যে রেমান গ্রুপের বোর্ড অফ ডিরেক্টরস আমাদের আসন্ন প্রজেক্টের জন্য যে প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার গ্রহণ করেছে, সেটি হলো হুসেইন গ্রুপ। কংগ্র্যাচুলেশন্স!”
উৎসাহ এবং হতাশার এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো চারিদিকে। তবে কোথাও হুসেইন গ্রুপের কাউকে দেখা গেলোনা। ঠিক সেই মুহূর্তেই কনফারেন্স রুমের দরজাটা হাট করে খুলে গেলো। ভেতরে প্রবেশ করলো এক রমণী। কালো ফরমাল শার্ট এবং প্যান্ট পরনে, কোমরের দিকটায় শার্ট ইন করে রাখা। গলায় ঝুলছে একটা সাদা কালো চেক টাই। মাথার কালো চুলগুলো আলগা খোঁপা করে বাঁধা। চোখে ব্ল্যাক শেডের সানগ্লাস। ইঞ্চিকয়েক উঁচু সোলের হিল শুজ পায়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে সে। তার পিছনে হিজাব এবং ম্যাক্সি ড্রেস পরিহিত আরেক রমণী, অন্য পাশে রূপোলী চুলের বয়স্ক এক স্যুট পরিহিত ভদ্রলোক।

“এটা কে?”
না পারতে জিজ্ঞেস করলো জেসন। নারী ব্যবসায়ী দেখেছে সে প্রচুর, বহু কাজও করেছে। কিন্তু আত্মবিশ্বাসী দৃঢ় পদক্ষেপে নীরব প্রভাব নিয়ে এগিয়ে আসা রমণী তাকে একইসঙ্গে মুগ্ধ করছে আবার অস্বস্তিতে ফেলছে। রফিক ফিসফিস করে জবাব দিলো,
“দ্যাটস হার, সাবিন হুসেইন।”
নিষ্পলক চেয়ে রইলো জেসন। রমণী যখন সিঁড়ি বেয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে গেলো, একটি মন মাতানো সুবাস তার নাকে এসে ঠেকলো। ক্ষমতা এবং গৌরবের সুবাস। এক মুহূর্তের জন্যও সে রমণীর উপর থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারলোনা।

ডায়াসের কাছাকাছি এসে থামলো সাবিন। সে কিছু বললোনা। নিজের হিজাবের পিনটা একটু সমস্যা করছে দেখে সেটা চাপ দিয়ে ঠিকঠাক করে নিয়ে এগোলো মীরা। গলা খাঁকারি দিয়ে তাহমিনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দুঃখিত। আমাদের আসতে খানিকটা দেরী হয়ে গেলো। বুঝতেই পারছেন, বিজনেস সিজন আর ব্যস্ত দিনকাল।”
“না। ঠিক আছে। তেমন একটা দেরী হয়নি। আমরা মাত্রই ঘোষণা…”
“সাইনিং করে নেই? কুশলাদি নাহয় মিস্টার রেমানের সঙ্গেই বিনিময় করা যাবে?”
তাহমিনা কথা শেষ করার আগেই সাবিন নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাড়া দিলো। মুহূর্তেই মাথা নাড়লো সকলে। তাহমিনা নিজেই ডায়াস থেকে নেমে বাকি কর্মকর্তাদের সাথে সাবিনকে সিঁড়ি বেয়ে নিয়ে যেতে লাগলো বাইরের দিকে। তারা যখন কনফারেন্স রুম থেকে বেরোচ্ছে তখন ভেতরে অবস্থিত প্রত্যেকটি দৃষ্টি আটকে রইলো সাবিনের অবয়বের উপর।

সাবিনকে সি ই ওর কেবিনের বদলে টুয়েলভ ফ্লোরের বিশেষ টেরেসে নিয়ে যাওয়া হলো প্রাইভেট এলিভেটরে। কাঁচের দেয়ালে ঘেরা চারপাশ। সেখান থেকে বাইরের ঢাকা শহরটা একদম স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। আভিজাত্যের ছোঁয়া প্রতি পরতে পরতে। সাবিন সুস্থির এগিয়ে গেলো, দৃষ্টি সামনে রেখে। মসৃণ মেঝের মাঝ বরাবর নরম গদির আরামদায়ক সোফা। মাঝখানে কফি টেবিল। ওপাশের একটি সিংহাসন সদৃশ সোফায় বসে আছে এক রমণী। ধবধবে সাদা স্যুট এবং ওভারকোট পরনে। তার দীঘল রেশমি চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে সোফার গদির উপর ছড়িয়ে পড়েছে। সেই চুলের রং মূলত কালো হলেও মাঝে মাঝে হালকা রূপালী রেখা। কালার করিয়েছে স্পষ্ট। সাবিনকে দেখে সুদর্শনা নিজের হাতের ফাইল থেকে দৃষ্টি সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো। বিস্তৃত হেসে নিজের একটি হাত বাড়িয়ে ধরলো করমর্দনের উদ্দেশ্যে।
“হ্যালো, সাবিন হুসেইন।”
সাবিন তার হাতটা ধরলো। সামান্য দুলিয়ে বললো,
“হ্যালো, চারুলতা রেমান।”
“প্লীজ। বসুন।”

সাবিন এবং মীরা বসলো। সাবিনের সঙ্গে আসা কোম্পানির ম্যানেজার আবু কাশিম ভিন্ন একটি সোফায় বসলেন অন্যদের সাথে। একজন স্টাফ এসে কফি এবং নাস্তা পরিবেশন করে গেলো টেবিলে। সাবিন কিছুই ছুঁয়ে দেখলো না। মীরা অবশ্য কফি নিলো। অন্যপাশে বসা রেমান কন্যা চারুলতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সাবিনকে দেখে বললো,
“আপনার সম্পর্কে যেমন শুনেছি, তার চাইতে আপনি অনেকটাই আলাদা।”
বাঁকা হাসলো সাবিন। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে নিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে শুধালো,
“কেমন আমি?”
“ডেয়ারিং অ্যান্ড ডেঞ্জারাস। লাইক গ্যাসোলিন।”
পাল্টা তীর্যক হেসে হাতের ফাইলটা এগিয়ে দিলো চারুলতা। সাবিন সেটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে চুক্তিপত্র দেখতে লাগলো অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে। চারুলতা নিজের সোফায় হেলান দিয়ে বললো,
“একদম শেষ সময়ে প্ল্যান পরিবর্তনের জন্য দুঃখিত। ভাইয়াকে আজ সকালেই অতি জরুরীভাবে দেশের বাইরে যেতে হয়েছে। তাই ডিরেক্টর বোর্ডের হেড হিসাবে আমিই কিছুদিন কোম্পানি সামলাচ্ছি।”
সাবিন কোনো উত্তর করলনা। ফাইলটা ভালোমত দেখা হয়ে গেলে সে কলম তুলে নিলো সাইন করার জন্য। চারুলতা নিজের কফির মগে চুমুক দিয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে তাকে।
“কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করি?”
“করুন।”

দৃষ্টি কাগজের দিকে রেখেই অনুমতি দিলো সাবিন। কফিতে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে চারুলতা বললো,
“টেন্ডার আপনিই পাবেন সেটা আপনি জানতেন। তবে একটা জিনিস আমাকে খটকায় ফেলে দিচ্ছে। আপনার টেন্ডারের বাজেট কিন্তু বাকি সকল টেন্ডারের থেকে সবথেকে বেশি ছিলো! এরপরেও ভাইয়া আপনাকেই কেন ফাইনাল করলো করলো বলুন তো?”
সাবিনের কলম থামলো ক্ষণিকের জন্য। পরমুহুর্তেই সে সম্পূর্ণ সাইন করে ফাইলটা চারুলতার দিকে ঠেলে দিয়ে খানিকটা হেসে বললো,
“এই কারণেই আপনি হেড অব ডিরেক্টরস, আর উনি সি ই ও।”
চারুলতা অতি ক্ষীণ একটা হাসি নিয়ে চেয়ে রইলো সাবিনের দিকে। পরক্ষণেই দুই আঙ্গুল কপালে ঠেকিয়ে ছোট্ট একটা স্যালুটের ভঙ্গি করে ফিরিয়ে নিলো ফাইলটা।

রেমান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের কোম্পানি ভবন থেকে যখন সাবিন এবং বাকিরা বেরোলো তখন দুপুর। মীরা চোখে হাত দিয়ে রোদ আড়াল করে পার্কিং লট ধরে হাঁটতে হাঁটতে সাবিনকে জিজ্ঞেস করলো,
“ওই চারুলতা ম্যামের মতন আমারও একই প্রশ্ন। টেন্ডার বেশি দেয়া সত্ত্বেও আমাদের নির্বাচন করার লজিকটা বুঝলাম না। আগেরগুলো আমরা টেন্ডার কম রেখে বহু যুদ্ধ করেই পেয়েছিলাম।”
পাশাপাশি প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সাবিন একগাল হাসলো। উত্তর করলোনা। উত্তর এলো আবু কাশিমের তরফ থেকে।
“সাবিন ম্যামের ব্র্যান্ড ভ্যালু কত জানো না?”
মীরা থমকে গিয়ে তাকালো আবু কাশিমের দিকে। তিনি অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে মাথা দুলিয়ে বললেন,
“প্রথমত আমাদের টেন্ডার বেশি এমনি এমনি হয়নি। আমরা সবকিছু বেস্ট কোয়ালিটির হিসাব করেছি। উপরন্তু, ইকবাল আর্কিটেকচারাল ফার্ম আমাদের কোম্পানির সঙ্গে কোলাবে আছে। একটা জিনিসের মার্কেটিংয়ের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন খরচ হয়। কিন্তু সাবিন হুসেইন নিজেই একটা ব্র্যান্ড এবং দেশজুড়ে কন্ট্রোভার্শিয়াল কারণে ভাইরাল। হুসেইন গ্রুপ রেমান গ্রুপের প্রজেক্ট হাতে নিলে এমনিতেই সেটার প্রচার হবে। রেমান গ্রুপের মিলিয়নের এডভার্টাইজিং ফ্রি অব কস্ট। এক্ষেত্রে আমাদের কোম্পানি হচ্ছে ক্লাসের সেই ওয়ান পিস অবাধ্য ছেলের মতন যে উশৃঙ্খল, বেয়াদব হলেও রেজাল্ট কার্ডে সবসময় প্রথম! রেমান গ্রুপের সি ই ও ইয ভেরি ইন্টেলিজেন্ট।”

মাথা দোলালো মীরা। এবার বুঝেছে সে। সাবিনের ব্যক্তিগত সহকারী হওয়ার খুব বেশিদিন হয়নি তার, ব্যবসায়িক ব্যাপারগুলো এখনো শিখছে সে। নিজের সহকারী এবং ম্যানেজার কথা বলতে বলতে সাবিন খানিকটা এগিয়ে গিয়েছে। তবে পার্কিং লটের ভেতরে প্রাইভেট গ্যারেজে থাকা একটা বস্তু হঠাৎ করেই নজর কাড়লো তার। থমকে গেলো পদক্ষেপ। সানগ্লাস খুলে সে তাকালো নিগূঢ় দৃষ্টিতে। মীরা তাকে হঠাৎ থেমে যেতে দেখে পাশে এসে দাঁড়ালো। সাবিনের দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাকাতেই দেখতে পেলো গ্যারেজের ভেতরে একটি কালো রোলস্ রয়েস গাড়ি রাখা। হালকা আলোর প্রতিফলনে চকচক করছে ধাতব জান্তব। বনেটের উপরে মূর্তির মতন লোগো এক অনন্য আভিজাত্যের প্রতীক। সাবিনকে একনাগাড়ে চেয়ে থাকতে দেখে মীরা জিজ্ঞেস করলো,
“কি দেখছিস?”
“আভিজাত্যের সিংহাসনকে।”
“রোলস্ রয়েস চাস? সেটা আমাদের বাজেটের বাইরে।”
মীরার কথা শুনে মুচকি হেসে সানগ্লাসটা পুনরায় চোখে পরে সাবিন বলে উঠলো,
“ব্যাপার না। একদিন আমারও হবে। অর্জন করে নেবো।”

টুকটুকিকে নিয়ে পায়চারি করতে করতে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে জারিন। যদিও সে এখনো ঘড়ির সময় পড়তে শিখেনি, তবে দিনের বেলা কাটাগুলো ঠিক কোন অবস্থানে কত কোণে বেঁকে থাকলে তার মায়ের আসার সময় হয় সেটি সে ভালোভাবেই বুঝতে পারে। কিভাবে পারে, জানেনা। বয়সের হিসাবটা মাত্র তিন হলেও তার মস্তিষ্ক অতীব ক্ষুরধার। এর মধ্যেই বাংলা এবং ইংরেজী বর্ণমালার অনেকগুলো অক্ষর চিনে ফেলেছে সে। কোথাও লিখা থাকলে বুঝে ফেলে। তবে কথার উচ্চারণ সুস্পষ্ট হয়নি। অনেকটাই জড়িয়ে যায়।
পায়চারি থামিয়ে জারিন গোলাপের মতন লালচে নরম ছোট্ট ঠোঁটজোড়া ফুলিয়ে টুকটুকিকে বললো,
“মাম্মাম কি আতবে না? জা-ইন হাঙগি! কুদা লেগেশে তো!”
টুকটুকি জারিনের খরগোশের আদলে তৈরি পুতুলের নাম। পুতুলটা সে সবসময় নিজের সাথে রেখে অভ্যস্থ। ছোট ছোট পা ফেলে এবার থপথপ করে হাঁটতে লাগলো জারিন। ঠোঁটজোড়া ফুলতে ফুলতে বলের মতন হয়ে গেছে তার, চকচকে বাদামী চোখজুড়ে অসীম অভিমান জমতে শুরু করেছে।
ঠিক তখনি বাংলোবাড়ির মূল দরজা খোলার শব্দ হলো। টুকটুকিকে বুকে চেপে উত্তেজিত হয়ে গুটিগুটি পায়ে ছুটে গেলো জারিন।

“মাম্মাম!”
ভেতরে প্রবেশ করলো সাবিন এবং মীরা। ছোট্ট জারিনকে ছুটে আসতে দেখে মীরা দুহাত মেলে ধরে বসে পড়লো নিচে,
“হেই সুইটহার্ট!”
কিন্তু সাবিন মুহূর্তেই তাকে আটকে ফেললো।
“তোকে কতবার না বলেছি, বাইরে থেকে এসে সরাসরি আমার মেয়েকে ধরবি না? যা, আগে ফ্রেশ হ।”
“ধুরু শালী। সবকিছুতে সমস্যা করিস তুই!”
গজগজ করতে করতে কাচুমাচু মুখে সিঁড়ি বেয়ে বাড়ির দুই তলায় উঠে গেলো। সাবিন দ্রুত হেঁটে চললো কিচেনে। জারিন তার পিছু নিলো।
“মাম্মাম, মাম্মাম! তুমি মীলা কালামুনিকে জাইনকে দততে দাওনা কেনো?”
মেয়ের কথায় মুচকি হাসলো সাবিন। নিজের শার্টের হাতা গুটিয়ে কিচেনের সিংকে ভালোমত সাবান দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিতে নিতে বললো,
“মীলা না, মীরা। আর জা-ইন না, তোমার নাম জারিন সোনা। মাম্মাম আর খালামণি তো বাইরে থেকে আসি, অনেক জীবাণু থাকে আমাদের হাতে। ইউ নো, জার্মস?”

“জার্মি জার্মি!”
“হ্যাঁ। জার্মি জার্মি তোমার মধ্যে ঢুকে গেলে? তোমার অসুখ করবে। আমার বেবিটাকে আমি কিভাবে অসুখে দেখবো,হুম?”
“অতুক অবেনা! জা-ইন জার্মি জার্মিকে দিসুম দিসুম কলে দেবে!”
ছোট্ট দুখানা হাত মুঠো করে ঘুষির ভঙ্গি করলো জারিন। তাতে হেসে ফেলল সাবিন। মেয়ের মায়াবী মুখ খানির চিত্রে তার চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে উঠল। হাত ধোয়া শেষে তোয়ালেতে মুছে নিয়ে দ্রুত হাঁটু মুড়ে মেয়ের সামনে বসে সাবিন তার ছোট্ট শরীরটাকে নিজের বুকে তুলে আগলে নিলো। অসংখ্য ছোট ছোট চুমুতে ভরিয়ে দিলো জারিনের গোলগাল মুখটা। তারপর ফোলা গালে আলতো কামড় দিয়ে বললো,
“মাই বেবি, মাই হার্ট, মাই প্রিন্সেস!”
মায়ের ভীষণ আদরের বিপরীতে খিলখিল করে হেসে উঠলো জারিন। তার হাসির সুমধুর ধ্বনি প্রতিফলিত হলো বাড়িটার প্রতিটি দেয়ালে দেয়ালে।
“মাম্মাম এখন খাবে আর তোমাকে খাইয়ে দিবে, হুম? তারপর তুমি কিন্তু একদম লক্ষ্মী মেয়েটি হয়ে চুপটি করে ঘুমিয়ে যাবে। ঠিক আছে?”

“ইয়ে ন্যাপি ন্যাপি!”
সাবিন প্লেটে খাবার বেড়ে নিলো। ইতোমধ্যে সে জারিনকে নিজে নিজে খাবার খাওয়া শিখাচ্ছে। তবে আজ আলাদাভাবে দিতে ইচ্ছা হলোনা। সে নিজের ভাতের সঙ্গে মেয়ের জন্যও কিছুটা খাবার বেড়ে নিলো। তাকে খাবার নিতে দেখে কিচেন কাউন্টারের দেয়ালে চাপড় দিতে দিতে জারিন আবদার করলো,
“জা-ইন একানে কাবে না।”
সাবিন মেয়েকে শুধরে দিতে চাইলো,
“জারিন।”
“জা-ইন!”
“না মামণি। বলো, জা…”
“জা…”
“রিন!”
“রিন!”
“ভেরি গুড! জারিন!”
“বেলি গুদ! জা- ইন!”
হেসে ফেললো সাবিন এবার। মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,
“ওকে ওকে। আমরা পরে আবার প্র্যাকটিস করবো। চলো, কোথায় বসে খাবে তুমি?”
“জা-ইন আপ্পার কাতে কাবে!”
সাবিনের চেহারায় টলটলে এক অভিব্যক্তি খেলে গেলো। মেয়ের ছোট্ট একটি হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বললো,

“ঠিক আছে। চলো তার কাছে।”
এক হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে অপর বাহুর মাঝে মেয়েকে কোলে তুলে দুই তলায় উঠে গেলো সাবিন। মীরার ঘর এবং লম্বা একটা করিডোর পেরিয়ে এসে অবশেষে সে সফেদরঙা একটা দরজার সামনে থামলো। জারিন নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে ঠেলে দিলো দরজাটা। উন্মুক্ত হলো পথ। সাবিন ধীরপায়ে প্রবেশ করলো ভেতরে।
কক্ষজুড়ে ওষুধের কড়া ঘ্রাণ। একদম ছিমছাম আবহ। সাদা এবং ধূসরের মিশেল চারিপাশে। হালদা পর্দাগুলো দুলছে বাতাসে। স্নিগ্ধ সূর্যরশ্মি ভেতরে ঢুকে স্বর্ণালী মোহে রাঙিয়ে তুলেছে চারপাশ। একপাশে নার্সিং কর্নারে দাঁড়িয়ে থাকা একজন নার্স সিরিঞ্জ মুছে পরিষ্কার করে রাখছে। সাবিনকে লক্ষ্য করে সে হালকা মাথা নাড়ল,

“হ্যালো ম্যাম।”
এটুকু বলেই সে নিজের কাজে মনোযোগ দিলো। রুমের একদম মাঝ বরাবর একটি বিশেষ বিছানা। রিমোটের সাহায্যে কন্ট্রোল করে মাথা, পা যেকোনো কিছু উঁচুনিচু করা যায়। সেই বিছানায় নরম ম্যাট্রেসের উপর শুয়ে আছে সাবিনের গোটা পৃথিবী।
জায়দান আরেফিন।
এক সময়কার তুখোড় বুদ্ধিমান প্রফেসরের খুব কম অংশই অবশিষ্ট আছে। ফিনফিনে পাতলা শরীর, তাতে নরম কাপড়ের পোশাক জড়ানো। লম্বাটে শরীরখানি পাথরের মূর্তির মতন শুয়ে আছে। ফ্যাকাশে শরীরে ত্বক, পাতলা মাথার চুল। ওই বাদামী মনকাড়া চোখজোড়া আজ কতদিন যাবৎ বুঁজে আছে! কতদিন সাবিন দেখেনা ওই চোখের মাতোয়ারা দৃষ্টি, শোনেনা ওই কণ্ঠের মধুর ধ্বনি! আজ সে শুধুই এক ভাস্কর্যমাত্র, সাবিনের নতুন বাড়ির একটি ঘর দখল করে নিঃশব্দে থাকে সে।
সাবিন ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো বিছানার কাছে। অতীব সাবধানে। জায়দানের নাকের সঙ্গে যুক্ত ন্যাসাল ক্যানোলা। বিছানার পাশেই একটি স্ট্যান্ডে স্বচ্ছ ফিডিং ব্যাগ ঝুলছে, সেটার পুষ্টিবর্ধক তরল সরু পাইপ বেয়ে প্রবাহিত হয়ে চলে গিয়েছে জায়দানের পেটের দিকে, যেখানে সংযুক্ত পি ই জি টিউব। বিছানার অন্যপাশে ছোট একটা পোর্টেবল ভাইটাল মনিটর, সেখানে পালস রেট প্রদর্শিত হচ্ছে। সমস্ত কক্ষই স্নিগ্ধতায় ঘেরা। অথচ ভেতরে উপস্থিত সহস্র রকমের মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি যেন এক আলাদাই মাতম সৃষ্টি করছে।
সাবিনের কোল থেকে রেলিং টপকে আস্তে করে বিছানায় নামলো জারিন। সাবিন রেলিংটা নিচে নামিয়ে নিজে এক কোণায় বসে মেয়েকে বললো,

“সাবধানে সোনা।”
জারিন একদম ধীরে গিয়ে জায়দানের শরীরে সামান্য হেলান দিয়ে ছোট্ট দুই পা ছড়িয়ে বসলো। সাবিন অপলক চোখে দেখলো দৃশ্যটা। জারিনের ছোট্ট অবয়ব নিজের পিতার সঙ্গে ঘেঁষে রয়েছে, কতটা মায়া তাতে! কব্জিতে সরু দুটো স্বর্ণের চুড়ি জড়ানো জারিনের। মসৃণ কালো লম্বা চুলে ঢাকা দুই কানেও পিচ্চি দুটো স্বর্ণের রিং। সেগুলো জ্বলজ্বল করে উঠল যখন সে নিজের একটা ছোট্ট বেবি ফ্যাটে ফোলা নরম হাত তুলে জায়দানের সরু ফিনফিনে হাতের তর্জনী শক্তভাবে মুঠো পাকিয়ে ধরলো।
“আপ্পা আমি কাই। তুমিও কাও!”

কোনো প্রতিক্রিয়া হলোনা। ওই একই হার্টবিট, একই মেডিক্যাল যন্ত্রপাতির ফস ফস শব্দ। ফিডিং টিউবের টিক টিক আওয়াজ।
“আপ্পা খাচ্ছে মামণি, আপ্পা খাচ্ছে।”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৪

একপাশের ফিডিং টিউবের দিকে ইঙ্গিত করে দেখালো সাবিন। পরমুহুর্তে ভাতের গ্রাস মাখিয়ে মেয়ের মুখে তুলে। জায়দানের গা ঘেঁষে বসে টুকটুকিকে নিয়ে খেলতে খেলতে খেতে লাগলো জারিন। সাবিন ছলছলে দৃষ্টিতে দৃশ্যটা দেখলো। নিজের মুখে গ্রাস তোলার আগে সে ঝুঁকে নিথর, নিশ্চল জায়দানের ঠান্ডা কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করে বললো,
“আই মিস ইউ, মাই লাভ। আই মিস ইউ সো মাচ!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here