Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৮

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৮

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৮
জাবিন ফোরকান

সাবিন অত্যন্ত সাবধানে রেজর দিয়ে জায়দানের মুখ শেভ করে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেই নার্সের সহায়তায় তার শরীর মুছে নতুন পোশাক পরিয়ে দিয়েছে সাবিন। নিয়ম করে একদিন বাদে বাদেই কাজটা করে সে। এছাড়া সপ্তাহে দুবার স্পেশালিস্ট আসেন, ফিজিওথেরাপি দিতে। নার্স দুজন ২৪ ঘণ্টা পালা করে জায়দানের সঙ্গে থাকে। হাত পায়ের জয়েন্ট যেন বসে না যায় এজন্য নিয়মিত তার শরীর ম্যাসাজ করতে হয়। সঙ্গে নিয়মমাফিক ডাক্তারের চেকআপ তো আছেই। কখনো এই ট্রিটমেন্ট, কখনো সেই ট্রিটমেন্ট। সব মিলিয়ে বছরের পর বছর ধরে একই রুটিনে সাবিনের হাঁপিয়ে ওঠার কথা। কিন্তু জায়দানের কেয়ারটেকার হিসাবে থাকা নার্স দুজন কোনোদিন তার মুখে সামান্য বিরক্তির ভাঁজ অবধি দেখেনি। অন্য অনেক ঘরেই পেশেন্টের জন্য কাজ করা হয়েছে তাদের। একটা না একটা সময় গিয়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও পরিবারের লোকদের ভ্রুকুটি মেলে রোগীদের। কারণ, তারা তখন পরিবারের উপর বোঝা। এই প্রথম তারা একদম বিনা বিরক্তিতে কাউকে এভাবে পরিজনের সেবা করে যেতে দেখছে বছর বছর যাবৎ। বাবা, মা হলে একটা কথা। তারা সন্তানকে কোনো অবস্থাতেই নাকি ফেলতে পারেনা। কিন্তু সাবিন জায়দানের স্ত্রী। সেই হিসাবে নিজের স্বামীর সম্পূর্ণ দায়িত্ব এভাবে কাঁধে তুলে নিয়ে সে কিভাবে নিঃসংকোচে, বিনা ক্লান্তিতে সবকিছু করে যায় সেটা নার্সদের কাছেও এক প্রকার বিস্ময়।

শেভ করা শেষ হয়ে গেলে সাবিন আস্তে করে জায়দানের পাশে বসে ভেজা কাপড় দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিতে লাগলো। তার সেবা করার সময় সে হাজার রকম কথা বলতেই থাকে। যেন জায়দান অচেতন কেউ নয়, সবকিছুই শুনতে পায়। আজও সাবিন সারাদিনের গল্প জমিয়ে বসেছে।
“জানো, কি হয়েছে? ঐযে হান্নানের বাচ্চাটা আছে না? একেবারে মারা খেয়ে বসে আছে!”
মুচকি মুচকি হাসলো সাবিন। এবার শুকনো কাপড় দিয়ে জায়দানের ফ্যাকাশে মুখটা মুছতে মুছতে জানালো,
“আমার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতে গিয়েছিল। ও জানেনা, কোর্ট কাচারি আমার নিত্যদিনের বিচরণশালা। একেবারে সাক্ষী, সিসিটিভি ফুটেজ সমেত ধরিয়ে দিয়েছি। মামলা দেবে? দিক দেখি। ওকে আমি ভাতে মারবো, পানিতে মারবো। ও ভেবেছে কি? সাবিন হুসেইনের সঙ্গে পাঙ্গা নিয়ে আরামসে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে?”

রুমে থাকা নার্স এমন সময় রুম থেকে চলে গেলো। বাকি সময়টা সাবিন নিজেই নিজের স্বামীকে সামলাতে পারবে। জায়দানের ফতুয়ার বোতাম লাগিয়ে দিয়ে সাবিন যুক্ত করলো,
“এদিক দিয়ে লাভটা আমারই হয়েছে। কয়েক মাস যাবৎ কোনো নিউজে ছিলাম না। এখন আবার নিউজে চলে এসেছি। সেল বাড়ছে তরতর করে। এইতো, আগামী মাসে খুলনায় স্যাভেজ সাবিন—পিৎজা স্টেশনের আউটলেট খুলবো। এই নিয়ে একটা ছোট্ট ক্যাফে থেকে মোট ছয়টা আউটলেট হলো আমার।”
কথা বলতে বলতে হঠাৎ থমকে পড়লো সাবিন। গভীর দৃষ্টিতে তাকালো জায়দানের বদ্ধ চোখের পাতায়। কোনো নড়চড় নেই। শুধু স্থিরভাবে বুক ওঠানামা করছে।
“তুমি কবে চোখ খুলবে প্রিয়তম? কবে ফিরে আসবে? কবে প্রাণভরে দেখবে তোমার ওয়াইফের গড়া সাম্রাজ্যটুকু? এভাবে দূরে পরে আছো, তোমার কি একটুও কষ্ট হয়না? মনে পড়েনা আমায়? তুমি জানো? তোমার রাজকন্যা তোমার অপেক্ষায় পথচেয়ে বসে আছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে সে ছুটে এসে প্রথমে দেখে, তোমার ঘুম ভেঙেছে কিনা। আমাদের রাজকন্যা কি এভাবেই প্রতিদিন আশাহত হতে থাকবে? তুমি কি ফিরে আসবে না? ওকে কোলে নিয়ে চুমু খাবে না?”

ঝুঁকে এলো সাবিন। চোখ বুঁজে স্বামীর ঠান্ডা কপালে নিজের কপাল ঠেকালো। জায়দানের শরীরজুড়ে ঔষধ এবং সোপ পারফিউমের মিশ্র সুঘ্রাণ। প্রাণভরে সেই সুবাসটুকু গ্রহণ করলো সে। ফিসফিস করে বলল,
“তুমি বলেছিলে নতুনভাবে জীবনটা সাজিয়ে নিতে। একা না থাকতে। একা জীবন চলা নাকি কঠিন। তোমাকে ছাড়া আমি প্রায় চারটা বছর পার করে দিলাম। কিভাবে নতুন কাউকে বরণ করতাম আমি?”
চোখ মেলে তাকালো সাবিন। তার নয়নজুড়ে টলটলে অশ্রু দানা বাঁধলো। জায়দানের স্থির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিশিয়ে দীর্ঘ এক আদরের চুমু এঁকে সাবিন বললো,
“তুমি নামক সমুদ্রের বুকে আমি এক নোঙর ফেলা মাঝি। অচেনা তরীকে কীভাবে কাছে ভিড়তে দিই?”
জায়দানের গালে গাল মিশিয়ে বালিশে মাথা রেখে চুপটি করে পরে থাকলো সাবিন। কতক্ষণ বলতে পারবেনা।

“মাম্মাম?”
ডাকটা কানে আসতেই সম্বিৎ ফিরে পেলো সাবিন। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলো নিজের পুতুল টুকটুকিকে নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে জারিন। নিদ্রা জড়ানো চোখ। ঘুম থেকে উঠে এসেছে স্পষ্ট।
“আপ্পা আল তোমাল সাতে গুমাই?”
মেয়ের আবদারে হাত বাড়িয়ে তাকে আমন্ত্রণ জানালো সাবিন। জারিন ছুটে এসে বিছানায় উঠলো। তাকে সন্তপর্নে জায়দানের পাশে শুইয়ে দিলো সাবিন। সঙ্গে সঙ্গে পাশ ফিরে পিতার দুই গালে দুটো চুমু খেয়ে জারিন বলে উঠলো,
“আপ্পা আমি গুমাই, তুমিও গুমাও। গুত নাইত, আপ্পা।”
একপাশে শুয়ে মেয়ে এবং স্বামী উভয়ের শরীরে স্নেহের হাত বোলাতে বোলাতে সাবিন একটা ঘুম পাড়ানি গান ধরলো। জারিনের ঘুমাতে সময় লাগলোনা। অথচ সাবিন আজ দুই চোখের পাতা এক করতে পারলোনা। তার একটা অসমাপ্ত কাজ বাকি আছে।

ঘণ্টাখানেক বাদে বিছানা ছেড়ে সাবিন উঠে পড়লো। প্রাণভরে খানিক দেখলো, কি সুন্দর করে জায়দানের গা ঘেঁষে গুটিশুটি দিয়ে ঘুমিয়েছে জারিন। সাবিন জায়দানের একটি হাত তুলে সাবধানে ছোট্ট মেয়ের শরীরে জড়িয়ে দিলো। জগতের সবথেকে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে জারিন। পিতা এবং সন্তান একে অপরের মোহনীয় আলিঙ্গনে।
কিছুক্ষণের জন্য বাইরে গেলো সাবিন। পুনরায় ফিরে এলো একটি বড় স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ভর্তি জুস এবং ডায়েরী হাতে। নিঃশব্দে হেঁটে বিছানার একপাশের টেবিলে চেয়ার টেনে বসলো সে। টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে দিলো। পিছনে ঘুমের জগতে বিচরণ করছে বিশাল পৃথিবীর বুকে তার এক টুকরো ছোট্ট পরিবার।
ডায়েরী খুললো সাবিন। অন্তিম কিছু পাতা সম্পূর্ণ করা বাকি আছে তার। আজ সেই বিশেষ দিন। যেদিন সব হিসাবের খাতা খোলা হবে। দীর্ঘ এক চুমুক জুস পান করে বুঝি শক্তি সঞ্চয় করলো সে, তার জীবনের সবথেকে যন্ত্রণাদায়ক দিনগুলোর সম্পর্কে লিখতে। অবশেষে কলম তুলে নিলো সে। মাঝরাতে যখন গোটা শহর এক ঘুমন্তপুরী, তখন সাবিনের ডায়েরীতে একটু একটু করে রচিত হতে লাগলো এক বিরহের আখ্যান।

আমার সামনে পৃথিবীর আর কোনো অস্তিত্ব নেই। যেন জীবন্ত কবর দিয়ে দিয়েছে কেউ আমায়। জায়দানের নিথর বুকের মাঝে মাথা গুঁজে পরে আছি। প্রাণপণে শুধু একটিই প্রার্থনা করে যাচ্ছি। খোদা যেন সহায় হয়। আমার স্বামীর সাথে সাথে আমার প্রাণপাখিটাও যেন নিজের কাছে নিয়ে যায়।
পিছনে গাড়ির দরজা খোলার শব্দ হলো। এরপরেই ভারী পদধ্বনি এবং হাসির মিশ্র আওয়াজ কানে গেলো আমার। অথচ একচুল নড়তে পারলাম না। জায়দানের বুক থেকে সরতেই পারছিনা আমি। নীরবে ফুঁপিয়ে চলেছি। হঠাৎ করেই নিজের মাথার পিছন দিকটায় তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করলাম। কেউ আমার চুলের গোছা খামচে ধরে একটা হ্যাঁচকা টানে আমাকে জায়দানের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিলো। ঝাপসা দৃষ্টিতে স্বামীর রক্তাক্ত শরীরটাকে শুধু দেখেই গেলাম। আমার হাত পা সম্পূর্ণ অসাড়। বিন্দুমাত্র প্রতিহত করার শক্তিটুকুও নেই। আমাকে নিয়ে থামিয়ে রাখা গাড়ির টায়ারের কাছে আছড়ে ফেলা হলো। ওঠার চেষ্টাটুকু অবধি করলাম না। ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ফেলতে ফেলতে সড়কের ধারের আধো আলো ছায়ায় দেখলাম চিরায়ত সেই মুখটা।

দন্ডায়মান আহান হুসেইন।
চেহারায় অনেকখানি বদল এসেছে। আগের চাইতেও অধিকতর হিংস্র অভিব্যক্তি চোখেমুখে। কেমন যেন রক্তপিপাসু এক দৃষ্টি। ঠোঁটে ঝুলছে অশুভ এক তীর্যক হাসি। সে একা নয়। গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো তাকবীর হুসেইন, আমার চাচা স্বয়ং।
দু দুটো দানবের সামনে সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়লেও বিন্দুমাত্র অনুভূতি হলোনা ভেতরটায়। শুধু নিষ্পলক তাকিয়ে রইলাম। যেন এক পুতুলমাত্র। যার কোনকিছুতেই আর কিছু যায় আসেনা।
হাতে আয়েশী ভঙ্গিতে একটা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে তাকবীর চাচা বিরস দৃষ্টিতে সড়কে পড়ে থাকা জায়দানকে দেখলেন। তারপর গুরুগম্ভীর এক মন্তব্য ছুঁড়লেন,
“সদ্য ডানা গজানো পাখি বেশি উড়তে চাইলে পরিণতি এমনটাই হয়।”
টায়ারের কাছে থাকা আমার দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিজের একটি পা বাড়িয়ে আমার হাতের আঙুলগুলো সড়কের শক্ত পিচের মাঝে চেপে ধরলেন তিনি নিজের বুটজুতো দিয়ে। সমস্ত শরীর ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো আমার।

“এবার কোথায় তোর অহংকার, কোথায় দেমাগ? হুমকি দিবি না? প্রেস কনফারেন্স ডাকবি না? ডাক না। ডেকে বল কিভাবে মশার মতন এক চুটকিতে পিষে শেষ করে দিয়েছি তোদের।”
অসামান্য যন্ত্রণায় থরথর করে শরীর কাঁপতে লাগলেও একটা টু শব্দ বেরোলো না আমার মুখ থেকে। আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আমার ঘাড় খামচে ধরলেন তাকবীর চাচা। তার হাতের নখ গেঁথে গেলো আমার ত্বকে। সিগারেটের তামাটে ধোঁয়া আমার মুখ বরাবর ছুঁড়ে দিয়ে কর্কশ হাসলেন তিনি।
“তোর উপর দয়া করেছিলাম। হাজার হোক, রক্ত তো। কিন্তু তোর জাতটাই বেশ্যার জাত। তোর বাপ, তোর মা, তোর জন্ম সবটাই বেজাত।”

হিসিয়ে উঠলেন তিনি। বছর বছরের জমা ক্ষোভ উপচে দিলেন আমার মাঝে।
“তোর বাপ একটা আস্ত কুলাঙ্গার। একটু পয়সার স্বাদ পেয়েছে কি পায়নি, অমনি ধরাকে সরা জ্ঞান করা শুরু করে দিয়েছিল। ওর বড় ভাই ছিলাম আমি! আমার হক ছিল সবকিছুর উপর! অথচ তাকদীর আমার কাছ থেকে সব কেড়ে নিলো। সব! আমার নাম, আমার পরিচয়, আমার মর্যাদা, আমার পরিবার এমনকি আমার পছন্দের নারীটাকেও। কেনো? কেনো সবকিছু শুধু ওর হবে? আমার কেন হবেনা? আমি কম শ্রম দিয়েছি? রাতের ঘুম হারাম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তাকদীরের পাশে থাকিনি? ওকে সফলতার শিখরে নিয়ে তুলিনি? তাহলে দিনশেষে কেনো ও বস হলো আর আমি চাকর?”
“বস হতে মেরুদন্ড আর যোগ্যতা লাগে। যেটা আপনার নেই, তাকবীর হুসেইন!”
আমি খেঁকিয়ে উঠতেই আমার মাথাটা ধরে গাড়ির বনেটের সঙ্গে বাড়ি দিলেন তাকবীর চাচা। সঙ্গে সঙ্গে মুখের ভেতর র*ক্তের নোনতা স্বাদ পেলাম।
“হুসেইন সাম্রাজ্য শুধু আমার! এই সাম্রাজ্যের প্রত্যেকটা ইট আমার নিদারুণ শ্রমে গড়া! হুসেইনদের দৌলত, মর্যাদা, সম্মান সবকিছুর হক শুধুমাত্র এবং একমাত্র তাকবীর হুসেইনের। শুনে রাখ বেশ্যার মেয়ে, ওই পতিতার কুঠিই তোর শেষ ঠিকানা! ঠিক যেমন করে তোর কুলাঙ্গার বাপের কাছ থেকে তার জীবন আর সম্পদ কেড়ে নিয়েছি, ঠিক তেমন করেই আজ তোর সবকিছু কেড়ে নেবো। তাকবীর হুসেইন জানে কিভাবে নিজের হক কেড়ে নিতে হয়!”

আমাকে ধাক্কা দিয়ে সড়কে ফেলে উঠে গেলেন তাকবীর। দুই হাতের আঙুল তুলে এতক্ষণ যাবৎ রীতিমত ফুঁসতে থাকা ছেলের দিকে ইশারা করলেন। অস্বচ্ছ দৃষ্টিতে দেখলাম আহান এগিয়ে এলো, বিস্তৃত হেসে। হাতের মাঝে নিজের প্যান্টের বেল্ট খুলে নিয়েছে সে। সেটা পাকাতে পাকাতে জন্তুর ভঙ্গিতে এগোলো বান্দা।
“বংশের বাতি নিভিয়ে দিলেই ভেবেছিস তোর আর আমার হিসাব মিটে যাবে? আমাদের অনেক পুরাতন হিসাব বাকি আছে, বেবিগার্ল। আমার ওটা নেই তো কি হয়েছে? তোর মতন বেশ্যাকে ভোগ করতে আহানের কোনো বংশ দণ্ডের দরকার পড়েনা।”
আমার কাছাকাছি এসে হাতের বেল্ট দিয়ে সহসাই গায়ে আ*ঘাত করে বসলো আহান। সমস্ত শরীরে বেদনা খেলে গেলো। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরলাম। গুঙিয়ে উঠলাম তীব্র যন্ত্রণায়।
“স্ক্রিম বেবিগার্ল, স্ক্রিম লাউডার! লেম্মি হেয়ার হাউ মাচ আই মেইক ইউ ফিল গুউউড!”
একের পর এক বেল্টের আঘাতে জর্জরিত হতে লাগলো আমার শরীর। একটা সময় আর চিৎকার করার সামর্থ্যও রইলোনা। নেতিয়ে গিয়েছি সম্পূর্ণ। কোনকিছুতেই আর কিছু আসে যায়না এখন আমার। চোখ দুটো বুঁজতে পারলেই যেন শান্তি। গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ানো তাকবীর ছেলেকে তাড়া দিলেন হঠাৎ।
“ব্যাটা, জলদি কর। তোর জন্য সারা রাত রাস্তা খালি পড়ে থাকবে নাকি?”
বাঁকা হাসলো আহান। নিজের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে জন্মদাতাকে সে জানালো,
“রাস্তা ভর্তি হয়ে গেলেও সমস্যা নেই। বাঙ্গুদের হ্যাডম কোথায়? আস্তাগফিরুল্লাহ জপতে জপতে সবাই ভিডিও করবে ঠিকই, এগিয়ে আর আসবে না। ভালোই হবে, দর্শক পেলে আমার ভালো ফিল আসে।”
আমার একটা পা ধরে রাস্তায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলো আহান। খিলখিল করে হাসতে হাসতে বললো,
“এবার তোকে কে বাঁচাবে, বেবিগার্ল? তোর ব্যক্তিগত খাম্বাটাকে তো স্বর্গে পাঠিয়ে দিয়েছি। ওখান থেকে কি হাত বাড়ানো যায়?”

আমাকে নিয়ে একদম জায়দানের নিথর শরীরের পাশে ফেললো আহান। হাঁপাচ্ছি ভীষণ। পরনের শুভ্র জামা র*ক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে আমার। পিঠের নিচে জায়দানের শরীর থেকে গড়ানো জমাট বাঁধা থকথকে র*ক্তের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি স্পষ্ট। আহানকে দেখলাম, সম্পূর্ণ শার্ট খুলে ফেলেছে সে। প্যান্টের জিপার টেনে নামিয়ে ঠোঁট চেটে অশালীন এক ভঙ্গি করলো সে। তারপর নিথর জায়দানের দিকে তাকিয়ে জিভ দাঁতে ঠেকিয়ে চুক চুক শব্দ করলো।

“আহারে। খুব শখ ছিলো এটাকে বেঁধে রেখে দর্শক বানিয়ে এটার সামনেই তোকে খাবো। তা আর হলো কই? কবুতরের কলিজা ওর। এক বাড়িতেই শেষ। ব্যাপার না। লা*শের পাশে শরীর ভোগের একটা আলাদাই মজা আছে। তাও যদি হয় স্বামীর লা*শ, তাহলে তো কথাই নেই। সত্যি করে বল তো, এই বান্দরটা তোকে কতবার খেয়েছে? ধলা মুরগির শরীরে ওর কি শক্তি আছে? তোকে সুখ দিতে পেরেছে? শালা!”
জায়দানের পেট বরাবর লাথি হাকালো আহান। আমার স্বামীর নিস্তেজ শরীরটা সামান্য কেঁপে উঠেই আবারো স্থির হয়ে গেলো। এতক্ষণ যাবৎ নিজের মাঝে শুধু শূন্যতা টের পেয়েছি। এতকিছু শুনেছি, এত বিশ্রী ব্যবহার দেখেছি, অথচ একটুও রাগ হয়নি, না তো লেগেছে দুঃখ। নিঃশব্দে প্রাণপাখিটা বেরিয়ে যাক এটাই কামনা করেছি। কিন্তু যে মুহূর্তে আহানকে অত্যন্ত অবহেলায় জায়দানকে লাথি মারতে দেখলাম, ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার মাথার ভেতরের একটা তার শক্ত ক্রোধের টানে ছিঁড়ে গেলো, আজীবনের জন্য!
আহান আমার কাছে এলো। হাঁটু ভেঙে ঝুঁকে পড়ল আমার উপর সম্পূর্ণ। তাকবীর চাচা দূরে দাঁড়িয়ে যেন আকাশের তারা গুনছেন আর ঘড়ির দিকে চেয়ে ছেলেকে তাড়া দিচ্ছেন। আমার পরনের র*ক্ত আর ঘামে ভেজা জামাটা টেনে খুলতে খুলতে আমার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিলো আহান।
“বেবিগার্ল, আই ফাইনালি হ্যাভ ইউ! তুই যদি প্রথমবারেই আমার কাছে চলে আসতি, তাহলে এতকিছু হতো না। আমার অন্ধকার মহলের রাজরানী করে রাখতাম তোকে। রাতের পর রাত শুধু সুখ দিতাম, জ্বালাময়ী সুখ। গয়না গাটি, টাকায় মুড়িয়ে রাখতাম তোকে। কিন্তু তোর আমাকে সহ্য হলনা। তোর সহ্য হলো একটা নাখাস্তা শিক্ষিত পণ্ডিতকে!”

মুখ তুলে আমার থুতনি চেপে ধরে আমার কান কামড়ে ধরে আহান জড়ানো গলায় বললো,
“আমি চ্যালেঞ্জ জিতে গেলাম আজ। কি বলেছিলি যেন তুই? পৃথিবীর সব নারীকে ভোগ করতে পারলেও আমি কোনোদিন তোর শরীর পাবো না? ওয়েল, আহান নেভার লুজেজ, বেবিগার্ল!”
আহানের একটি হাত আমার গলা ঠেসে ধরে রাখলো, অন্য হাতটি আমার পেট বেয়ে নেমে গেলো আরও নিচের দিকে। উরুর মাঝে স্পর্শ ছুঁয়ে দিলো গভীরভাবে। ঘৃণায় সমস্ত শরীর শিরশির করে উঠলো আমার। ছলছলে চোখে তাকালাম ঠিক পাশেই নিথর হয়ে পড়ে থাকা জায়দানের দিকে। আমার স্বামী, আমার ভালোবাসা, আমার জীবন, আমার গোটা জগৎ! সবকিছুকে ধ্বংস করে দিয়েছে এই জাত! এই কুলাঙ্গারের জাত! আমার এখন কিচ্ছু আসে যায়না, সত্যিই আর কিচ্ছু যায় আসেনা!
আমার অসহায়ত্ব দারুণ উপভোগ করতে করতে নিজের প্যান্টের পকেট থেকে একটা লম্বা নলের পি*স্তল বের করলো আহান। তীর্যক হেসে জানালো,
“অটোমেটেড পি*স্তল, এক ট্রি*গারে আঠারোটা বু*লেট বেরোয়। তোর বান্দরটাকে শেষ করতে শুধু তিনটা লেগেছে। বাকিটা তোকে শেষ করবে।”

পি*স্তলটা আমার উরুর মাঝখানে নিয়ে গেলো সে। উন্মাদের ন্যায় হাসতে হাসতে বললো,
“চিন্তা করিস না বেবিগার্ল, আমার ওটা নেই তো কি হয়েছে? আমার অ*স্ত্র তো আছে! এই অ*স্ত্র তোকে এমন সুখ দেবে যা তুই জীবনেও কল্পনা করিসনি বেবিগার্ল, জীবনেও না। উফ্ফ! তোকে ছুঁয়ে দেয়ায় যে কি শান্তি, কি আরাম, আহহ!”
আহান ক্ষণিকের জন্য নিজের চোখ বুঁজে ফেললো। ওটুকুই সময় পেলাম আমি। নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই আমার। জানিও না কি করছি আমি। হাতড়ে কাছে পেলাম জায়দানের ভাঙা হেলমেটটা। ওটাই তুলে আহানের মাথা বরাবর আছড়ে ফেললাম আমি। ভয়ংকর পুরুষালী চিৎকারে কেঁপে উঠলো চারপাশ। আমার মাঝে ন্যায়, অন্যায়, মানবিকতা কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। জানোয়ারে পরিণত হয়ে গিয়েছি গোটা।
আহান সামান্য একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়তেই দুই উরুর মাঝে থাকা পি*স্তলটা চেপে ধরে গড়িয়ে গেলাম।
অবস্থা হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে টের পেয়েই তাকবীর সিগারেট ফেলে সহসাই ছুটে এলেন। তার কাছেও একটা পি*স্তল আছে। সেটা বের করতে করতে চিৎকার করে উঠলেন তিনি,
“খানকি মা….!”

এটুকুই করতে পারলেন তিনি। আমার মাঝে কি ভর করল নিজেও জানিনা আমি। পি*স্তলটা তা*ক করে ট্রিগার টেনে দিলাম। এক চাপে পরপর কয়েকটি বু*লেট ছুটে গেলো তাকবীরের দিকে। নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় পশ্চাৎ বেগের কারণে তখনি পি*স্তলসহ মাটির একপাশে ছিটকে পড়ে গেলাম আমি। তবে বু*লেটের নিশানাভেদ হয়েছে। তাকবীরের বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে সেসব। ছিটকে উঠলো র*ক্ত। কয়েক সেকেন্ড বি*স্ফারিত চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন তাকবীর চাচা। যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারলেন না, আমি সত্যিই এত বড় কাজটা করতে পেরেছি! কয়েক সেকেন্ড বাদেই তার শরীরটা ধপাস করে উল্টে পরে গেলো রাস্তার মাঝে। তাজা র*ক্তে সিক্ত হয়ে উঠলো চারপাশ।
“না! ড্যাড!”

হুংকার দিয়ে লাফিয়ে উঠলো আহান। ছুটে গেলো নিজের পিতার কাছে। আঁকড়ে ধরলো নিস্তেজ শরীরটাকে।
“ড্যাড! ড্যাড, কথা বলো! সাবিনের বাচ্চা! কি করেছিস তুই? বেশ্যা মাগী!”
টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালাম আমি। আমার চোখে এখনো ভাসছে দৃশ্যটি। জায়দানকে অতি ঘৃণা এবং অবহেলায় লাথি মারছে আহান। ওই একটা দৃশ্যই যথেষ্ট। চোখের সামনে ভেসে উঠল আমার ড্যাডের মুখটা। যার ভালোবাসা হয়ত জটিল ছিলো, তবে ছিলোনা কোনো খাদ। বলি হতে হয়েছে তাকে নিজের পরিবারের কাছেই। কারণ—সম্পদ। ক্ষমা? রক্ষা? উঁহু, আমার চাই হুসেইনদের ধ্বংস! শুধুমাত্র ধ্বংস!
ঘড়ঘড় করে উঠলো আমার কন্ঠস্বর, সমস্ত নিস্তব্ধ জগৎজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো,
“র*ক্তের বিনিময়ে র*ক্ত, কলিজার বিনিময়ে কলিজা আর জানের বদলে জান! তোর জান চাই, আমার!”
আহান আমার হঠাৎ পরিবর্তনে বেশ ভরকে গেলো। বিশেষ করে পিতার লা*শ তার ভেতরের সমস্ত অহংবোধকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে সহসাই। হাতের ভরে পেছাতে পেছাতে একেবারে গাড়ির টায়ারে গিয়ে ঘেঁষেছে সে। সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে তার। সামনে দন্ডায়মান এক অশরীরী। অশুভ ছায়ামূর্তি যেন স্বয়ং মৃত্যুদূত। তার কুচকুচে কালো চোখ দুটো যেন আলো আঁধারির মাঝে টকটকে হয়ে জ্বলছে। ওই জ্বলনে শুধুই র*ক্তের নেশা! চিনতে বেশ বেগ পোহাতে হলো বুঝি আহানের। এটাই তার সেই বেয়াদব চাচাতো বোনটি? যে এককালে তার ভালোবাসায় রীতিমত উন্মাদ ছিল? আজ সে তার প্রাণটা কেড়ে নিতেও এক দন্ড দ্বিধা করবেনা?

“সা…সাবিন…আমার কথা শোন…”
তীর্যক এক হাসি ফুটলো আমার ঠোঁটজুড়ে। র*ক্তে রঞ্জিত হাতে পি*স্তলখানি তুলে তাক করলাম,
“আমি শোকের মাতম তুলে বিচারহীনতার দেশে ন্যায়বিচার ভিক্ষা করা অসহায় নারী নই।”
নিশানা করলাম কপাল বরাবর, একটুও এদিক সেদিক হবেনা, আমার হাসি ছাপিয়ে গেলো সমস্ত ধরিত্রীকে,
“আমি জানোয়ার! আমি চাইনা বিচার, আমি চাই কুলাঙ্গারের হাহাকার!”
“সাবিন এখনো সময় আছে আমরা পালিয়ে…”
“শুয়ারের বাচ্চা! আমার স্বামীর গায়ে একটা টোকার দাম আমি তুলবো তোর জীবন দিয়ে, মাদারফাকার!”
“সা…আহহহহহহ!”
একইসঙ্গে ঘটলো তিনটি ঘটনা। অদূর থেকে একটি গাড়ি ছুটে আসার আওয়াজ, তীব্র হর্ন। আহানের ভয়ংকর চিৎকার। আমার হাতের পি*স্তল থেকে বেরোনো মুহুর্মুহু বু*লেটধ্বনি।
পাগল হয়ে গিয়েছি আমি। মাথায় কিছুই নেই। শুধুই ক্রোধ, আগ্নেয়গিরি, উন্মাদ আত্মা। আহানের র*ক্তা*ক্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খেয়ালই করলাম না কখন একটি গাড়ি এসে থামলো ঠিক পাশেই। ভেতর থেকে লাফিয়ে নামলো অপ্রত্যাশিত এক পুরুষ।
আয়দান আরেফিন। অস্বচ্ছ দৃষ্টিতে হাঁপাতে হাঁপাতে তাকালাম তার দিকে। নির্বাক চেয়ে আছে বান্দা। প্রসারিত দৃষ্টি মেলে ধ্বংসযজ্ঞ দেখছে।

“কি করেছিস তুই, সাবিন?”
ফিসফিস করে করা প্রশ্নটা আহাম্মকি শোনালো আমার কাছে। অট্টহাসি হেসে উঠলাম। হাতের পি*স্তল নামিয়ে নিলাম, হাসতে হাসতে আমার মাথা পিছনে ঝুলে পড়লো, শরীর টলে উঠলো। দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে হাসতে হাসতে চিৎকার করতে লাগলাম,
“আমি মুক্ত! ড্যাড, জায়দান, আমি আজ মুক্ত! আমি আসছি, আমি তোমাদের কাছে আসছি! আমায় স্বাগতম জানানোর ব্যবস্থা করো তোমরা!”
আমার কন্ঠস্বর ছাপিয়ে গেলো পুলিশের গাড়ির সাইরেনের আওয়াজ। আয়দান একা আসেনি। তার খানিকটা পিছনেই পুলিশের ইউনিটের বেশ কয়েকটা গাড়ি এগিয়ে আসছিল। বান্দা দ্রুত একবার সড়কের প্রান্তে উপস্থিত হওয়া গাড়িগুলো দেখলো। পরক্ষণেই আমার দিকে তাকালো। বুঝতেও পারলাম না, এরপর ঠিক কি হলো।

আয়দান দৌঁড়ে এলো আমার কাছে। আমার হাত থেকে পি*স্তলটা ছিনিয়ে নিয়ে নিজের হাতের মাঝে চেপে ফেললো। জোর করে হাতের মাঝে নাড়াচাড়া করতে লাগলো জিনিসটা, প্রথমে হাসতে হাসতেই উন্মাদের মতন চেয়ে রইলাম। বুঝলাম না, এই ছেলে কি করতে চাইছে। যতক্ষণে বুঝলাম সে আমার ফিঙ্গারপ্রিন্টের উপর নিজের ফিঙ্গারপ্রিন্ট বসাচ্ছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। পুলিশের গাড়ি সামনে আসার সাথে সাথে পি*স্তল তুলে ইতোমধ্যে লা*শে পরিণত হওয়া আহান এবং তাকবীরের শরীরে অন্তিম কয়েকটি বু*লেট ছুঁড়লো সে।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৭ (২)

“আয়দান!”
তীক্ষ্ণ একটা পরিচিত কণ্ঠের চিৎকার ভেসে এলো। পুলিশের গাড়ি পুরোপুরি থামার আগেই ভেতর থেকে লাফিয়ে নেমে আসতে দেখলাম মিসিরকে। ছুটে এলো সে। পিছনে নেওয়াজ। গাড়ির সাইরেনের লাল নীল বাতির মাঝে আমি হতভম্ব হয়ে শুধু দেখে গেলাম। নেওয়াজের করে ওঠা গ্রেফতারি গর্জন। পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে এলো, আয়দানকে দুইপাশ থেকে আঁকড়ে ধরে গাড়ির বনেটের উপর আছড়ে ফেলে তার হাত দুটো পিছমোড়া করে বেঁধে ফেললো। আয়দান একটুও বাঁধা দিলোনা। তার গভীর বাদামী দৃষ্টি তখনো আপতিত সড়কে নিথর হয়ে পড়ে থাকা বড় ভাইয়ের র*ক্তা*ক্ত শরীরের দিকে।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here