সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৬০
জাবিন ফোরকান
কেবিনটি অত্যন্ত শান্ত। কড়া ওষুধের ঘ্রাণ বাতাসে। নীরবতা ভাঙছে মেডিক্যাল মেশিনগুলোর মৃদু আওয়াজ। খোলা জানালা বেয়ে তাজা বায়ু প্রবেশ করছে, সঙ্গে এক আরামদায়ক রোদের উষ্ণতা। জানালার কাছেই বসে আছেন জেসমিন। চেয়ারে দুই পা তুলে দিয়ে হাঁটুর উপর শক্ত একটা বই রেখে তাতে কিছু একটা লিখছেন তিনি। মোটা একটা হলুদাভ পৃষ্ঠা। তার কলমের আঁচড়ে ধীরে ধীরে কালো অক্ষর ফুটে উঠছে পৃষ্ঠার বুকজুড়ে।
রোদের আলো জেসমিনের গায়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। অনন্য সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। বয়সটা ষাটের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। চুলের ফাঁকে রূপালী পরত পড়েছে। তবুও বদলায়নি উষ্ণ চাহুনি আর তাতে থাকা একরাশ মায়ারা। তার শিয়রেই পরম এক শান্তির ঘুম ঘুমিয়ে আছে সন্তান। যেকোনো সাধারণ সময় হলে হয়ত সে দীর্ঘক্ষণ নিজের মায়ের মুখপানে চেয়ে রইতো। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত মা নামক মানুষটার মাঝে জড়ানো সকল মায়া।
আজ একটি বিশেষ স্মৃতির কথা ভীষণভাবে মনে পড়ছে জেসমিনের। জায়দানের বয়স তখন কত যেন? ১৫ নাকি ১৬? সঠিক মনে নেই।
ছোট ছেলে আয়দানের আবদারে মাঝরাতে ছেলের শখের চিকেন কাবাব তৈরি করছেন জেসমিন। মাংস এবং মশলা মেশানো মন্ড হাতে চেপে সুন্দর গোল গোল করে হালকা তেলে ভেজে নিচ্ছেন। দারুণ সুঘ্রাণে সমস্ত রান্নাঘর ম ম করছে। আজ আলাদাই এক খুশি তিনি। কারণ আয়দান সমস্ত স্কুলে বেস্ট অ্যাথলেট পুরষ্কার পেয়েছে। তাই কনিষ্ঠের যেকোনো আবদার শিরোধার্য। সময় ব্যাপার না। একমনে গুণগুণ করতে করতে জেসমিন কাজ করছিলেন। ঠিক এমন সময়েই মৃদু পদধ্বনি কানে গেলো তার।
কিচেনে প্রবেশ করলো কিশোর জায়দান। চোখে চশমা, ভ্রুর মাঝে হালকা চিন্তার ভাঁজ। পড়াশোনা করছিলো, স্পষ্ট। তার রুমের আলো ভোরের আগে নিভতে দেখা যায় বেশ কম। এস এস সি আসন্ন। হাতে একটি খালি বোতল। পানি ফুরিয়ে গিয়েছে, সেটাই নিতে এসেছে। কিচেনে ঢুকে জেসমিনকে দেখে খানিকটা অবাক হলো জায়দান। সে বোধ হয় কিছু বলতে চাইলো, তবে জেসমিনকে এত উৎসাহী হয়ে কাজ করতে দেখে শেষমেষ কোনো মন্তব্য করলোনা। চুপচাপ ফ্রিজ খুলে খানিকটা ঠান্ডা পানি এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি মিলিয়ে নিলো। জেসমিন কাবাব ভাজতে ভাজতে ছেলের প্রতিটা কাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে গেলেন। কেন, নিজেও জানেন না। তার হঠাৎ করেই মনে হলো, আজ কতদিন পর জায়দানকে তিনি এক দন্ড ভালো করে দেখলেন! ছেলে ভালোই লম্বা হয়েছে। ছয় ফুটের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে প্রায় উচ্চতা। বাহুতে জেগে উঠেছে শক্তিশালী শিরা উপশিরা। কিশোর থেকে ধীরে ধীরে পুরুষ ভাবটা জেগে উঠছে তার মাঝে। আসলেই, বহুদিন পরই দেখছেন জেসমিন তাকে। নাহলে তার মনে এখনো একটা বাচ্চার মুখ ভেসে আসছে। জায়দান কবে এত বড় হয়ে গেলো?
পানি নেয়া হয়ে গেলে জায়দান উল্টো ঘুরে বেরোনোর জন্য এগোলো। তবে মাঝপথে থমকে একদম নরম সুরে বললো,
“তোমার প্রেশারের সমস্যা আছে, আম্মু। ডাক্তার রাত জাগতে বারণ করেছিলেন গতবার। বেশিক্ষণ জেগে থেকো না, তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যেও।”
এটুকুই। জেসমিনের জবাবের অপেক্ষা সে করলোনা। কারণ, জবাব আসেনা। কিংবা তার কথাগুলো আদতে কখনো শোনাই হয়না। জায়দান এবারেও তেমন কোনো আশাই করলোনা। চুপচাপ এগোলো বাইরের দিকে। হঠাৎ করেই কেমন যেন লাগলো জেসমিনের। বুকের ভেতর যেন অদ্ভূত এক বেদনাদায়ক টান অনুভব করলেন তিনি। এক হাতে খুন্তি চেপে ধরলেন। তারপর বিশেষ কিছু বিবেচনা না করেই বলে উঠলেন,
“দাঁড়াও।”
জায়দান প্রথমটায় বুঝতে পারলোনা তাকেই বলা হয়েছে। তাই জেসমিন এবার খানিক উচ্চ কন্ঠে বললেন,
“দাঁড়াতে বলেছি জায়দান।”
সঙ্গে সঙ্গে নিজের স্থানে জমে গেলো জায়দান। ঘুরে তাকালো। তার বাদামী নয়নজোড়া প্রসারিত হলো বিস্ময়ে। জেসমিন বুঝলেন না, এতটা অবাক হওয়ার কি আছে? মা কি ছেলের সঙ্গে কথা বলতে পারেনা? নাকি তিনি বছর পেরিয়ে এই ছেলের সঙ্গে কথা বলছেন বলে এমন প্রতিক্রিয়া? ঠাওর হলোনা তার।
“এদিকে এসো।”
কাছে ডাকতেই জায়দান নীরবে জেসমিনের পাশে এসে দাঁড়ালো। তখনো এক হাত মতন দূরত্ব সে বজায় রেখেছে, সাবধানতা বশত। নিজের মাকে এত ভয় পাওয়ার কি আছে? এবারেও বুঝলেন না জেসমিন। মাথায় কেমন চাপ লাগলো। আচ্ছা, তিনি কি স্মৃতি ভুলে যেতে শুরু করেছেন? আশ্চর্য্য! ব্যাপারটাকে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে তিনি প্লেট থেকে একটি কাবাব তুলে নিয়ে জায়দানের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। হতভম্ব হয়ে সেটা হাতে নিলো তার বড় ছেলে। ফ্যালফ্যাল করে আহাম্মকের মতন চেয়ে রইলো। যেন এটা খাওয়ার জিনিস, সেটা সে জানেনা। তাই খাবে না মাথায় দেবে বুঝতে পারছেনা।
“লবণ আর মশলা সব ঠিকঠাক হয়েছে কিনা টেস্ট করে দেখো।”
“সরি?”
মুখ ফস্কে বলে ফেললো জায়দান। পরক্ষণেই মুখে হাত চাপা দিয়ে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে মায়ের দিকে চেয়ে রইলো। জেসমিন ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করলেন।
“বিষ মেশাইনি। বিশ্বাস না হলে খেতে হবে না…”
কথাটা জেসমিনের শেষ করতে দেরি কিন্তু জায়দানের সম্পূর্ণ কাবাবটা মুখে পুরে দিতে দেরি হলোনা। যেন সে নিজের জননীকে ঠিক কতখানি বিশ্বাস করে সেটাই প্রমাণ করতে চায়। জেসমিন ভ্রু উঁচু করে খানিকটা বিস্ময় নিয়েই সন্তানকে দেখলেন। জায়দান বেশ সময় নিয়ে ভালোমত চিবিয়ে পরখ করে শেষমেষ জানালো,
“অসম্ভব মজা হয়েছে, আম্মু। তোমার হাতে জাদু আছে।”
গর্বিত অনুভব করলেন জেসমিন বেশ। বুক ফুলিয়ে আবারও কাবাব বানানোয় মনোযোগ দিলেন।
“থ্যাংকস।”
জায়দান সাথে সাথে চলে গেলোনা। খানিকটা সময় দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে জেসমিনের কাজ দেখলো। যেন এখানেই সে নিজের বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে চায়। অদ্ভূত একটা শান্তি পাচ্ছে সে চিত্তে, জেসমিনের হঠাৎ এমন সহজ ব্যাপারে।
“আয়দান অনেক ভালো করেছে। হি ডিজার্ভস দিস ট্রিট। আমি ওকে আগামীকাল সকালে কংগ্র্যাটস বলবো।”
অতি সূক্ষ্ম এক হাসি ঠোঁটে মেখে বললো জায়দান। এতটা নরম দৃষ্টিতে জননীকে দেখছে সে জেসমিনের অন্তর বুঝি মোমের মতন গলে যাচ্ছে ওই দৃষ্টির মায়ায়।
“আমি যাচ্ছি আম্মু, আমার ফিজিক্সের কিছু পড়া বাকি আছে। গুডনাইট।”
জায়দান দ্বিতীয় দফায় যাওয়ার উদ্যোগ নিলো। ঠিক তখন কি যেন একটা ভাবলেন জেসমিন।
“এক মিনিট।”
বলে তিনি একটা প্লেট তুলে নিলেন। সেখানে মাত্র ভাঁজা বেশ কয়েকটা কাবাব রাখলেন। তারপর ফ্রিজ খুলে টমেটো সস, মেয়োনিজের বোতল এবং চীজ নিয়ে এলেন। তিনটা মিশ্রণ একটি বাটিতে ঢেলে দারুণ একটা ডিপিং সস তৈরি করলেন। এটা তার দুই ছেলেই সমানতালে পছন্দ করে। তবে জায়দানকে কোনোদিন বানিয়ে দেয়া হয়েছে কিনা মনে পড়ছেনা। সসের বাটিটা প্লেটের এক কোণায় রেখে সবশেষে ছোট্ট একটা মিল্কশেকের ক্যান দিয়ে জায়দানের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন তিনি।
“এটা নিয়ে যাও। ঠান্ডা হওয়ার আগেই খেয়ে নিও।”
জায়দান স্থির চেয়ে রইলো প্লেটের দিকে। তার বাদামী নয়নজুড়ে এমন এক গভীর দৃষ্টি ফুটলো, যে জেসমিন অবধি অবাক হয়ে গেলেন। স্পষ্টত দেখলেন তিনি, জায়দানের চোখের মণিজোড়া সামান্য কেঁপে উঠলো, তারপরই চোখের কোণে টলটলে স্রোতের মতন তরলের উদ্ভব হলো। ঠিকমত দেখতে পারলেন না তিনি, এর আগেই দৃষ্টি লুকিয়ে ফেললো জায়দান দ্রুত। জেসমিনের হাত থেকে প্লেটটা নিলো সে, ছেলের হাতের আঙুলের ছোঁয়া লাগলো তার হাতে। কেন কেঁপে উঠলেন তিনি, জানেন না। জায়দান ছোঁয়াটুকু অস্বীকার করলো না। বরং মায়ের হাতটা নিজের তালুতে তুলে নিয়ে ঝুঁকে তার আঙুলের মাঝে নরমভাবে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো।
“থ্যাংক ইউ, আম্মু।”
কম্পিত কন্ঠে ফিসফিস করলো জায়দান। মুখ তুলে যখন সে জেসমিনের দিকে তাকালো, তখন তার ঠোঁটজুড়ে অভূতপূর্ব এক মায়াবী হাসির ধারা খেলা করছে। বেশিক্ষণ দাঁড়ালো না সে, দ্রুতই চলে গেলো। কিচেনে একলা দাঁড়িয়ে জেসমিন ছেলের চলে যাওয়ার পথপানে তাকিয়ে রইলেন নিষ্পলক হয়ে। নিজের হাতটা অজান্তেই বুকে চেপে ধরে ভাবলেন, এত সামান্য কারণেও কেউ এতটা খুশি হতে পারে?
বাস্তবে ফিরে এলেন জেসমিন। চোখ পিটপিট করে বিছানায় নিশ্চল শুয়ে থাকা নিজের বড় সন্তানের দিকে তাকালেন। বুকের ভেতর যে উথাল পাথাল মাতম বয়ে গেলো, তা অবরুদ্ধ করার উপায় জানা নেই তার। কত শত মুহূর্ত তিনি ভুলে গিয়েছেন! কত সুন্দর মুহূর্ত চাইলেই মস্তিষ্ক হাতড়ে বের করা যায়, অথচ তিনি আগ্রহ করেননি। বুঝেও বুঝতে চাননি কোনোদিন তিনি। তার মস্তিষ্কে কঠিন বাস্তবতার এক ধূসর প্রলেপ পড়েছিল। জাফর নামক মানুষটাকে কোনোদিন এতটা ভালোবেসেছিলেন তিনি? যার বলি হতে হয়েছে তার আপন সন্তানকেই? উঁহু, এই দায় শুধুমাত্র জাফরের নয়। তার নিজেরও। লিখা শেষ করে পৃষ্ঠাটা ভাঁজ করে বিছানার পাশের টেবিলে রাখলেন জেসমিন। পরক্ষণে ঝুঁকে এলেন। জায়দানের ফ্যাকাশে প্রাণহীন মুখটা দেখলেন মন ভরে। যতক্ষণ সম্ভব। এই স্মৃতিটুকু নিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন, যতটুকু বাকি আছে এই জীবন।
“তোমার ক্ষমার যোগ্য নই আমি, তবুও দুহাত বাড়িয়ে আমার আদর চেয়েছিলে তুমি। আজ আমি আদরের আঁচল পেতে দাঁড়িয়েছি, অথচ সেই আঁচলে মোড়াতে নেই একটা তুমি। আব্বু আমার, আম্মু তোমায় ভালোবাসি।”
জায়দানের কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিলেন জেসমিন। তার বদ্ধ চোখের পাতা বেয়ে উষ্ণ অশ্রুবিন্দু টপটপ করে গড়ালো। মৃদু বাতাস ঝাঁপটা দিয়ে গেলো। তিনি খেয়াল করলেন না, তার সন্তানের বাম হাতের একটি আঙুল হঠাৎ নড়ে ওঠার দৃশ্যখানি।
কোর্ট থেকে সরাসরি হাসপাতালে চলে এলাম আমি। কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। বুকের ভেতর ভারী একটা চাপ জেঁকে বসেছে। মীরা, মিসির কারো দিকেই ভালো করে চোখ তুলে দেখতে পারছিনা। নিজেকে বিরাট অপরাধী মনে হচ্ছে। কোনো আফসোস নেই আমার, আছে শুধু অপরাধবোধ। তাইতো ছুটে এসেছি এখানে, আমার একমাত্র ভরসার নিরাপদ আশ্রয়ের কাছে। সে হয়ত চেতনাহীন, তবে এই বিক্ষিপ্ত মনকে শান্ত করতে তার হৃদযন্ত্রের স্পন্দনটুকুই যথেষ্ট।
জায়দানের ট্রান্সপ্ল্যান্ট সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। অদ্ভূত হলেও সত্য, তার ডোনার হয়েছেন স্বয়ং জেসমিন। এ যেন নিজের সন্তানকে দ্বিতীয় জন্মদান। জেসমিনের হঠাৎ পরিবর্তন চোখে পড়ার মতন। তবে কেউই এই নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামানোর পর্যায়ে ছিলাম না। জায়দানের পুরাতন বোন ম্যারো কেমোর মাধ্যমে ধ্বংস করে তাতে জেসমিনের থেকে সংগ্রহ করা স্টেম সেল বসানো হয়েছে। ওইরকম একটা জরুরি মুহূর্ত, যেখানে জেসমিন ছিলেন হাফ ম্যাচ আর সার্জারি ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ, সেরকম হিসাবে সফল হওয়ার আশা করাটাই ছিলো বোকামি। তবে ডাক্তাররা সফল হয়েছেন। এটাকে ঠিক কেমন সফল হওয়া বলে জানা নেই আমার। ট্রান্সপ্ল্যান্ট এর পর জায়দান বেশ কিছুদিন ডিপ কোমায় ছিলো। ধীরে ধীরে তার শরীর মানিয়ে নিয়েছে নতুন কোষের সঙ্গে। তবে তার চেতনা আর ফিরে আসেনি। ডিপ কোমা কাটিয়ে সে এম সি এস পর্যায়ে প্রবেশ করছে, এমনটাই ধারণা করতে পারছেন ডাক্তাররা। সে আদৌ সম্পূর্ণভাবে কোনোদিন চেতনা ফিরে পাবে কিনা, সেটা অনিশ্চিত।
শুধুমাত্র স্টেম সেল দেয়ার কারণে জেসমিনের তেমন একটা ক্ষতি হয়নি। অপারেশনের পর বেশ কিছুদিন হাসপাতালে থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়েছেন তিনি। সেই কয়েকদিনে গোটা আরেফিন পরিবারটা ভেঙেচুরে চুরমার হয়ে গিয়েছে।
আয়দানই একমাত্র নয় যে আজকে কারাগারে গেলো। এই তালিকায় আছেন আমার শ্বশুড়, জাফর আরেফিনও! তিনি কীভাবে এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছালেন? সেটা আমার নিকটও এক প্রকার বিস্ময়ের ব্যাপার ছিলো। আমাদের উপর আহান আর তাকবীর চাচার হামলার পরপর একসঙ্গে দুটো মামলা নিয়ে এগিয়েছি আমি। একটায় আয়দানের পক্ষে ডিফেন্স হয়ে লড়তে হয়েছে, আরেকটায় আমার নিহত চাচার বিরুদ্ধে আমার ড্যাডের সম্পত্তি দখল সংক্রান্ত বিষয়ে বাদী হতে হয়েছে। অমন একটা জটিল সময়ে হয়ত এতকিছু করা হতনা। হয়েছে শুধুমাত্র আমার শ্বশুড়ের কারণেই। আজও স্পষ্ট মনে আছে আমার। সেদিন জায়দানের ট্রান্সপ্ল্যান্ট হচ্ছিল। হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে ভীষণ চিন্তিত হয়ে বসেছিলাম আমরা সকলে। তখনি আমাকে একদম অপ্রত্যাশিত একটি প্রশ্ন করে বসেন জাফর।
“তুমি জানো কেনো আমি জায়দানের সঙ্গে তোমার বিয়ে দিতে রাজী হয়েছিলাম?”
ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছিলাম আমি। চিন্তায় থরথর করে কাঁপছিলো আমার গোটা শরীর। এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের মানেটা বুঝতে পারিনি তখন। জাফর নিজে থেকেই জবাব দিয়েছিলেন,
“কারণ আমি চেয়েছিলাম তোমার বাবার সকল সম্পত্তি আমার ছেলে পাক।”
আশেপাশে মিসির ছিলো, মীরা ছিলো, এমনকি ছিলো আরওয়াও যে খবর শুনে মিসিরের সঙ্গে এসেছিলো। অথচ জাফর সেদিন কারোর পরোয়া করেননি।
“তুমি তোমার বাবার একমাত্র মেয়ে। স্বাভাবিকভাবে সম্পত্তি তোমার হতো। তোমার হওয়া মানে আমার ছেলের হওয়া। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি তাকদীর এমন অকালে চলে যাবে, আর তার মৃত্যুটা স্বাভাবিক মৃত্যু হবেনা। তুমি শুনেছ নিশ্চয়ই, হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল তাকদীরের। সেটা অনেকখানি বানোয়াট। দীর্ঘদিন ধরে তোমার বাবার ব্রেইন ওয়াশ করেছে তাকবীর। হার্ট অ্যাটাক তার দীর্ঘমেয়াদী ওষুধের ভুল ডোজের কারণ। পোস্ট মর্টেম তো হয়নি, তোমরা সকলে ভেবেছিলে অকাল অন্তর্ধান।”
আমার মনে হচ্ছিলো, যেকোনো মুহূর্তে জ্ঞান হারাতে পারি আমি।
“আপনি…জানতেন আব্বু?”
“জানতাম। আমি সবকিছু জানতাম। জেনেছি, তাকদীরের মৃত্যুর পর। তবে আমার মুখ বন্ধ রাখার একটা দারুণ উপায় বের করেছিল তোমার তাকবীর চাচা। তুমি হয়ত জানোনা, তোমার বাবার যে সম্পত্তি তাকবীর নিজের দখলে নিয়েছে, তার এক তৃতীয়াংশ বর্তমানে আমার নামে!”
এরপর আর কিছু বলার ছিলো না আমার, শুধু করার ছিলো। মামলা দায়ের হলো, তাতে সাক্ষীও হলেন জাফর স্বয়ং। সঙ্গে ছিলেন ড্যাডের পুরাতন সহকারী আবু কাশিম। বড় বড় দুই সাক্ষী এবং স্পষ্ট জালিয়াতির প্রমাণের কারণে শুনানি একটানা হচ্ছে। জায়দান আর আমার উপর যেদিন হামলা হয়েছিল, সেদিন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল আমার স্বামী। সে আঁচ করতে পেরেছিল যখন একটা গাড়ি আমাদের অনুসরণ করছিল। আগেভাগেই মিসিরকে সেই সম্পর্কে টেক্সট দিয়ে রেখেছিল সে। তাই ওই রাতে অত দ্রুত মিসির এবং আয়দান ঘটনাস্থলে পুলিশ নিয়ে পৌঁছাতে পেরেছিল। তাছাড়া জায়দান আরেকটি অভাবনীয় কাজ করেছে। তার মোবাইলে একটি নিজস্ব নির্মিত সফটওয়্যার ছিলো, যা দূর্দান্তভাবে ভয়েস রেকর্ড করতে সক্ষম যতক্ষণ পাওয়ার থাকে। আমি জানিনা সে কখন কি করেছে। তবে, যখন তার কাছ থেকে জিনিসপত্রগুলো বের করা হয়, তখন তার ফোনে আগে থেকেই সেদিন রাতের ঘটনার ভয়েস রেকর্ডিং ছিলো, যেখানে স্পষ্টত আহান এবং আমার চাচার স্বীকারোক্তি এবং হুমকিমূলক কথাবার্তাগুলো রেকর্ড হয়ে ছিলো। ব্যাপারটা মিসিরকে আগে থেকেই বুঝিয়ে রেখেছিল সে, পরে কাজে লাগতে পারে ভেবে। তাই মামলায় আমার বিরাট সুবিধা হয়েছে। তাছাড়া তাকবীর চাচার পরিবারে আছেন শুধু চাচী, তার এমন কোনো ক্ষমতা নেই যে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সক্রিয়ভাবে লড়াই করবেন। এই মামলার রায় হয়ত এক বছরের মাথায়ই চলে আসবে। তবে রায় যেমনি আসুক, সত্য গোপন করে ইচ্ছাকৃতভাবে ভোগদখলের জন্য জাফর আরেফিন যে দীর্ঘ সময়ের জন্য আইনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে যাচ্ছেন, এটা স্পষ্ট। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন? তো কি হয়েছে? আমার লোকটার উপর একটুও মায়া নেই!
ভাবনায় ডুবে ছিলাম আমি। তাই খেয়াল করিনি কখন জায়দানের কেবিনের সামনে এসে পড়েছি। সামনে তাকাতেই অদ্ভূত একটা দৃশ্য দেখলাম। কেবিনের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন জেসমিন। আমি নিজের স্থানে থমকে পড়লাম। অনেক কিছুই বদলেছে, তবে বদলায়নি আমার সঙ্গে আমার শ্বাশুড়ির সম্পর্কটা। আমি কোনোদিন তাকে নিজের ছেলের কাছে থাকতে বাঁধা দেইনি। সন্তানকে তিনিই বাঁচিয়েছেন। তার মানে এই নয় যে আমি বছর বছরের অত্যাচার ভুলে যাবো! তাই আমাদের সম্পর্কটা এখন বেশ জটিল। আগে তাও সরাসরি শত্রুতা দেখানো হতো। তবে এখন শুধু নীরব শীতল দৃষ্টি বিনিময়।
প্রতিবারের মতো জেসমিনকে এড়িয়ে আমি কেবিনে ঢুকতে যাচ্ছিলাম। তবে পারলাম না। তিনি আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। খানিকটা অবাক হয়ে চেয়ে দেখলাম, একদৃষ্টে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি।
“কিছু বলবেন?”
আমার প্রশ্নে বুঝি সম্বিৎ ফিরে পেলেন জেসমিন। মাথা ঝাঁকিয়ে শেষমেষ উত্তর করলেন।
“হ্যাঁ। আমার ছেলেটাকে সারাটা জীবন আগলে রেখো।”
অদ্ভূত কথাটি শুনে ভ্রু উঁচু হলো আমার। হঠাৎ করে এমনভাবে কথা বলছেন কেনো জেসমিন? বুঝতে পারলাম না। আমাকে কিছু বুঝতেও দিলেন না তিনি। এগিয়ে এসে নিজের হাত বাড়িয়ে ধরলেন। দেখলাম, তার হাতে একটা খাম। সেটা হাতে নিতেই তিনি জানালেন,
“আব্বুটা যেদিন ফিরে আসবে, সেদিন ওকে দিও। আর হ্যাঁ, কেবিনের ভেতরে চেয়ারের উপর একটা বক্স আছে। ওকে বলো, ওটাও ওর।”
“আপনি কি করছেন, কি বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা।”
মুচকি হাসলেন জেসমিন। মাথা দুলিয়ে বললেন,
“আমি নিজেই নিজেকে বুঝতে পারিনা। এটা নতুন কিছু নয়।”
তার দৃষ্টি এবার পড়লো আমার ফোলা পেটের উপর। একটি হাত তুললেন তিনি অনিশ্চিতভাবে, আমি বারণ করলাম না। আলতোভাবে ছুঁয়ে দিলেন তিনি আমার পেট। স্পষ্ট দেখলাম, তার নয়নমাঝে টলটল করে ওঠা অশ্রুকণা। জেসমিন নিঃশব্দে নিজের হাতের কব্জিতে জড়ানো দুইটি স্বর্ণের বালা খুলে নিলেন। তারপর আমার হাতে সেগুলো ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
“তিন পুরুষ ধরে আরেফিন বংশে কোনো মেয়ে সন্তান আসেনি। জানিনা, এবার কপালে আল্লাহ্ কি রেখেছেন। যাই হোক না কেনো, এই দুটো রাখো, ওর দাদীর তরফ থেকে। যদি ছেলে হয়, বালা দুটো বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে হীরা অথবা রুপোর কিছু একটা গড়িয়ে দিও। যদি মেয়ে হয়, এগুলো ভেঙে স্বর্ণের দুল আর চুড়ি গড়িয়ে দিও। আর যদি তোমার মনে হয়, সন্তানের উপর আমার মতন অধমের ছায়া পড়তে দেবেনা, তাহলে এগুলো গরীব দুঃখী কাউকে দান করে দিও।”
বালা দুটো এবং খামটা হাতে নিয়ে আহাম্মকের মতন তাকিয়ে থাকলাম আমি। জেসমিন বিনা কারণেই আমার দিকে চেয়ে রইলেন, নিষ্পলক। মনে হলো তিনি আমাকে এবং আমার গর্ভে বেড়ে ওঠা অনাগত সন্তানকে দেখে নিচ্ছেন, প্রাণভরে। যখন আমি বিষদভাবে তার অনুভূতি খেয়াল করলাম, তিনি চোখ সরিয়ে নিলেন।
“আমি বাড়িতে যাচ্ছি, তুমি থাকো ওর কাছে কিছুক্ষণ।”
এটুকু বলে তিনি হনহন করে এগোলেন। আমি তাজ্জব বনে দাঁড়িয়ে রইলাম। তবে বেশিদূর যাওয়ার আগেই থমকালেন জেসমিন।
“সাবিন?”
“জি?”
মাথা তুলে তাকালাম আমি। জেসমিন ফিরে দেখলেন না, তার পিঠ দেখতে পেলাম আমি শুধু। গভীর কন্ঠস্বরটি ভেসে এলো আমার কানে,
“যদি কোনোদিন সম্ভব হয়, একজন ব্যর্থ মা হিসাবে আমায় মাফ করে দেয়ার চেষ্টা করো। আমি জানি, তুমি আমার মতন হবে না, তুমি একজন আদর্শ মা, আদর্শ স্ত্রী। সবার আগে, তুমি একজন আদর্শ নারী।”
বুকের ভেতর ভীষণ ভারী একটা বেদনা টের পেলাম। ঝাপসা চোখে দেখলাম জেসমিন পা ফেলে চলে যাচ্ছেন, দূরে। বহু দূরে। তখন বুঝতে পেরেও বিশ্বাস করতে চাইনি।
সেটাই ছিলো আমার শ্বাশুড়ি জেসমিন শিকদারকে শেষ দেখা!
প্রায় ৪ বছর পেরিয়ে এসেছে বর্তমান। ডায়েরীর পাতা ফুরিয়েছে। বিরাট এক আখ্যানের সমাপ্তি ঘটেছে। তার সঙ্গে টেবিলের উপর লুটিয়ে পড়েছে সাবিনের মাথা। গভীর ঘুম নেমে এসেছে চোখেমুখে। সকালের রোদের আলো টলমল করে ভেতরে ঢুকছে, সাবিনের চোখে লেগে জাগিয়ে তুলতে চাইছে যেন। তবুও চোখ খুললো না সে। অতীতের সুন্দর স্মৃতিগুলোর স্বপ্নে বিভোর তার মস্তিষ্ক।
হঠাৎ করে ফোন ভাইব্রেট করে ওঠার কারণে অবাধ্য হয়ে আর ঘুম জারি রাখতে পারলো না সাবিন। চোখ পিটপিট করে জেগে উঠল। ঘুম জড়ানো চোখেই হাতড়ে টেবিলের এক কোণায় পরে থাকা ফোনটা হাতে নিলো। ভ্রু কুঁচকে কলার আইডি দেখলো। উকিল ফোন করেছে! এই সাত সকালে? একটা আতঙ্ক ঘিরে ধরলো তাকে। ফোনটা দ্রুত রিসিভ করলো।
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৯
“হ্যালো? জি মিস্টার হাসনাত, বলুন।”
“একটা দূর্দান্ত খবর আছে মিসেস হুসেইন আরেফিন।”
বুকটা ধুকপুক করতে আরম্ভ করলো তার। ওপাশ থেকে বলা হলো,
“ভালো আচরণ, কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং জেল সুপারের পজিটিভ রিপোর্টের কারণে ছয় বছরের কারাদণ্ডে রেমিশন হয়েছে।”
নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলো সাবিনের বুঝি। মোবাইলটা আঁকড়ে ধরলো অতি কাঙ্ক্ষিত বাক্যটি শোনার আশায়,
“নভেম্বরের ৭ তারিখ আয়দান আরেফিন জেল থেকে মুক্তি পাচ্ছেন।”
