Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে শেষ পর্ব

সমাপ্তির ওপাড়ে শেষ পর্ব

সমাপ্তির ওপাড়ে শেষ পর্ব
জাবিন ফোরকান

ল্যাটে অ্যান্ড লাভ ক্যাফে।
জানালা ঘেঁষা বুথে বসে আছে মিসির। আধখোলা জানালা বেয়ে ধেয়ে আসছে শীতল বাতাস। প্রকৃতি রং বদলাচ্ছে, ধীরে ধীরে শীতলতা ঘিরে ধরেছে চারিপাশ। সামনের টেবিলে ধোঁয়া ওঠা গরম কফির মগ, সঙ্গে পেস্ট্রি। মিসির একমনে কফির স্বাদ আস্বাদন করছে। তার বিপরীত দিকে বসে থাকা রমণী এতটা নিষ্পলক চোখে তাকে দেখছে যে সামান্য অস্বস্তি হচ্ছে। আরওয়ার নজর বরাবরই বিচলিত করে তোলে মিসিরকে।
কফির মগ নামিয়ে রেখে গলা খাঁকারি দিয়ে মিসির বলে উঠলো,
“তারপর বলো, কেমন আছো তুমি আরওয়া?”
বিগত কয়েক মাস যাবৎ আরওয়ার সঙ্গে কোনরকম যোগাযোগ মিসিরের হয়নি। এই কয়েকটা বছর অবশ্য মোটামুটি দেখা – সাক্ষাৎ এবং কথাবার্তা হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়। মিসিরের প্রশ্নে আরওয়া নিজের চিন্তার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এলো। মসৃণ চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে কানের পিছনে গুঁজে নিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বললো,

“আমি ভালো আছি। তুমি? শুনলাম তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে?”
প্রশ্নটা মিসিরের হৃদয়মাঝে গোত্তা খেলো। তবে হাতের চামচ শক্তভাবে ধরে রাখা ছাড়া বিশেষ অভিব্যক্তি ফুটলনা তার চেহারায়। পেস্ট্রি কেটে সামান্য মুখে দিয়ে মিসির মাথা দোলালো,
“হ্যাঁ। আগামী বছরের শুরুতে।”
“ওহ। তো মেয়ে কি করে? পড়াশোনা?”
“ডেন্টিস্ট। নিজের চেম্বার আছে।”
“দূর্দান্ত। তোমার সঙ্গে ভীষণ মানাবে, তাইনা?”
আরওয়ার কথার টানে স্পষ্টত বিষাদটুকু টের পাওয়া গেলো। তবে মিসির জোরপূর্বক নিজের হৃদয়কে রুখে বললো,
“বিষয়টা মানানোর নয়, মানিয়ে চলার।”
“তোমার মনে হয় অন্য কেউ তোমার সাথে মানিয়ে চলতে পারবে?”
“অন্য কেউ?”

মিসির বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলতেই আরওয়া অতর্কিতে টেবিলের উপর থেকে হাত বাড়িয়ে তার একটি হাত আঁকড়ে ধরল। রমণীর সুদর্শনা চেহারায় এমন এক আকুলতা ফুটলো যে মিসির সত্যিই ভড়কে গেলো।
“এই বিয়েটা তুমি করোনা, মিসির!”
নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে আরওয়ার দিকে চেয়ে রইলো মিসির। আরওয়া আরো শক্তভাবে তার হাতটা আঁকড়ে ধরলো। ব্যাকুল কন্ঠে বললো,
“আমি এবার সত্যিই তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, তোমাকে ছাড়া আমার চলবেনা মিসির, একদম চলবেনা।”
যে কথা শোনার আশায় একটা সময় মিসির নিজের জীবনও বিসর্জন দিতে রাজী ছিল, সেই কথাটিই আজ কাঁটার মতন বিঁধলো তার নরম অন্তরে। বুকটা চেপে এলো, হাজারো পুরাতন স্মৃতি ভর করল মস্তিষ্কে। আরওয়া আজ কোনো বাঁধা মানছেনা। তার পটলচেঁরা চোখের মাঝে গভীর টলটলে অশ্রুরেখা। আবেগে ভাসছে তার সমস্ত সত্তা।

“আমি জানি, আই সাউন্ড লাইক আ হিপোক্রেট নাউ। কিন্তু এটাই এখন আমার জীবনের অমোঘ সত্যি। আমি অতীতে কোনোদিন ভাবতে পারিনি, কোনো একটা সময়ে গিয়ে আমি তোমার প্রতি এমন অনুভব করব। তুমি আমাকে বাধ্য করেছ। তোমার চরিত্র, তোমার কর্ম, তোমার ব্যবহার, প্রত্যেকটা গুণ আমায় বাধ্য করেছে তোমার প্রেমে ফেলতে। আজ আমি তুমি নামক সুপুরুষটার দিকে তাকালেই বুঝতে পারি, কি পেয়েও হারিয়ে ফেলেছি। যাকে তাকে বিয়ে করব না বলে পরিবারের সাথে অভিমান করে বাড়িও ছেড়ে দিয়েছি আমি, কিন্তু তোমায় ছাড়তে পারিনি। কিভাবে পারবো বলো? তুমি আমাকে নিজেকে চিনতে শিখিয়েছ। আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হয়ে কীভাবে সফল হওয়া যায় তা দেখিয়েছ। আমার এই নতুন জীবনটা তোমারই দান। এমন একটা মহৎ মানুষকে না ভালোবেসে থাকা যায়?”
আরওয়ার হাতের বাঁধনের মাঝে মিসিরের হাতটা কাঁপতে শুরু করলো। রমণী সেটি খেয়াল করে হাতটা তুলে নিজের গালে ঠেকালো। নিগূঢ় স্নেহমাখা দৃষ্টিতে চেয়ে বললো,

“অতীতে তোমায় বড়ই মনঃকষ্ট দিয়েছি। আমার বিরহে জ্বলতে বাধ্য করেছি। সেসব স্মৃতি ভুলতে বলবো না, ভোলা সম্ভব না। সেসব মনে রেখেই নাহয় আমায় আর একটিবার নতুন করে ভালোবাসো? শুধুমাত্র একবার ওই ভালোবাসাময় হাত দুটো বাড়িয়ে ধরো, আমি নিজের সবটা তোমার জন্য উজাড় করে দেবো মিসির। হয়ত আমাদের গল্পের শুরুটা খুবই ভাঙাচোরা, তবে শেষটা সুন্দর হতে দোষের কি? আরওয়ার মিসির আর মিসিরের আরওয়া, আর কেউ না। আমরা দুজন নাহয় সব ছাপিয়ে ভঙ্গুর দুটি সত্তা নিজেদের আগলে নিয়ে একটি সুখের নীড় গড়ি? খুব ক্ষতি হবে কি তাতে?”
অবশেষে একটি নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করলো মিসির। আরওয়ার দিকে তাকালো। রমণী ভীষণ আশা নিয়ে চেয়ে আছে, যেন মিসির ফিরে আসবেই তার কাছে। তবে আরওয়ার বৃহৎ আশা চুরমার করে দিয়ে মিসির আস্তে করে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। নরম কন্ঠে জানালো,

“আমি দুঃখিত আরওয়া, দিস টাইম, আই চুয মাইসেল্ফ।”
হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো আরওয়া, যেন মিসির এমন কিছু বলতে পারে বা তাকে প্রত্যাখ্যান করার হিম্মত রাখে এমনটা সে কল্পনাও করেনি। মিসির নিজের চেয়ারে শিরদাঁড়া টানটান করে সোজা হয়ে বসলো, মোকাবেলা করলো আরওয়ার অবিশ্বাসী দৃষ্টিকে।
“একটা জায়গায় তুমি ভুল, আরওয়া। তুমি আমাকে আমার গুণ দেখে ভালোবাসোনি। তুমি আমাকে ভালোবেসেছ লাস্ট অপশন হিসাবে।”
“মিসির, আমার কথা…”
“আমি কোনোকালেই তোমার ফার্স্ট চয়েয ছিলাম না। না অতীতে, না বর্তমানে। অতীতে তুমি তোমার কাজিনকে প্রাধান্য দিয়েছ, তারপর যখন ব্রেকআপ হলো তখন আমার সঙ্গে ঘুরেছ। আমি তোমার ভাঙা হৃদয়টায় মলমের প্রলেপ দিতাম, এরপরই তুমি অন্য কারো কাছে চলে যেতে। বর্তমানের চিত্র বিশেষ ভিন্ন নয়। তোমার ফার্স্ট চয়েয ছিল জায়দান। যখন তুমি ওকে পেলে না, তখন তুমি ঠিক অতীতের মতোই আবারো আমার কাছে ফিরে এলে।”

“তুমি আমাকে ভুল বুঝছ। মানছি আমি অতীতে তেমনটা ছিলাম, তবে এখন আর নয়। যদি তাই হতো তাহলে এই কয়েকটা বছর আমি নীরবে তোমার সাথে থাকতাম না, যোগাযোগ রাখতাম না। নিজের জীবনে একটা ক্যারিয়ার গড়তে উঠেপড়ে লাগতাম না। আমি তোমার যোগ্য হতে চেয়েছি মিসির, তাই সময় নিয়েছি। কিন্তু তোমাকে আমার মনের কথাটা জানানোর আগেই শুনলাম, তুমি অন্য কারো হয়ে যাচ্ছ।”
মিসির একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সামান্য হাসি ফুটলো তার ঠোঁটে।
“ঠিক আছে আরওয়া, তোমার কথা আমি বিশ্বাস করে নিচ্ছি। তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো।”
আরওয়া নিজের চেয়ারে খানিক এলিয়ে পড়লো উত্তেজনায়, আরো একবার দ্বিগুণ আশা নিয়ে তাকালো মিসিরের দিকে।
“তবে, আমাদের ভালোবাসাটাকে পূর্ণতা দেয়া যায়না?”
মিসির ডানে বামে মাথা নাড়লো।
“না। যায়না। কারণ আমি অতীতের সেই মিসির নই যে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে তোমার প্রেমে ভবঘুরে হয়ে গিয়েছিল। তুমি সেই ভবঘুরে মিসিরকে ভালোবাসোনি, যার কাছে তুমি ছিলে সবকিছু। তুমি ভালোবেসেছ বর্তমান মিসিরকে, এই মিসির ভালোবাসার আগে নিজের অহংবোধে বিশ্বাসী।”
স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলো আরওয়া। মিসির চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। তার কন্ঠস্বর গভীর অনুভূতিপূর্ন শোনালো,

“ভুল বুঝো না, তোমার কোনো দোষ নেই। তুমি হয়ত মানুষটাই এমন। তোমার ভালোবাসাটা হয়ত তোমার মতোই সুন্দর, সত্য এবং পবিত্র। তবে তোমার আমার পূর্ণতাটা একসঙ্গে লিখা হয়নি। এক যুগ পেরিয়ে আমি শিখেছি বেঁচে থাকার মানে। দিস টাইম, আই রিফিউজ টু বি সামওয়ান’স সেকেন্ড চয়েয।”
পকেট থেকে টাকা বের করে বিলের প্যাডে গুঁজে রাখলো মিসির। অতঃপর তাকালো আরওয়ার দিকে। রমণীর চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু টপটপ করে গড়িয়ে নামছে। দৃশ্যটা মিসিরের হৃদয়ে আঘাত হানলো, অথচ সে ঠোঁটে ফোটালো অতি সূক্ষ্ম এক হাসি। হাত বাড়িয়ে সে আলতো করে আরওয়ার চোখ মুছে দিলো নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলে।
“এভাবে কাঁদতে হয়না, বোকা মেয়ে।”
“আমাকে ছেড়ে যেওনা, মিসির প্লীজ! শুধু একটা শেষ সুযোগ দেয়া যায়না?”
“ঐযে বললাম, মিসির বদলে গিয়েছে? জীবনে ঠেকে শিখেছে?”
ঝুঁকে এলো সে, আরওয়ার মুখটা নিজের দুই হাতের আজলায় তুলে অন্তিম বারের মতন ওই গভীর মায়াবী চোখে চেয়ে ব্যক্ত করলো,
“জীবনে তাকে চাইনা যাকে আমি ভালোবাসি। তাকে চাই, যে আমাকে ভালোবাসে!”
নিষ্পলক চেয়ে রইলো আরওয়া। আর একটা শব্দও উচ্চারণ করলোনা। মিসির তাকে ছেড়ে সামান্য দূরে সরে দাঁড়ালো।

“বিদায়, আমার নীলাঞ্জনা। এই জনমে বা পরজনমে তোমায় আমার আর পাওয়া হলোনা। আফসোস নেই, খেদ নেই তাতে। আমি নির্বাচন করে নিয়েছি নিজেকে। ভালো থেকো, সুস্থ থেকো, সুন্দর থেকো আরওয়া। ভবিষ্যতে আর কখনো আমাদের যোগাযোগ না হলেই আমি খুশি হবো।”
আর দাঁড়ালোনা মিসির। উল্টো ঘুরে হেঁটে ক্যাফের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলো। আরওয়া ঝাপসা দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো, যতক্ষণ না মিসিরের অবয়ব তার দৃষ্টিসীমানার আড়াল হয়ে যায়।
আজ থেকে বিরহের নির্বাসন শুরু হলো আরওয়ার। অথচ বিপরীতে তাকে আজীবন বিনা বিনিময়ে ভালোবেসে যাওয়া মানুষটা আজ মুক্ত। তার বিরহ ফুরিয়েছে, মুক্তি পেয়েছে শৃঙ্খলিত অন্তর। সেই উচ্ছলতা ভাসলো মিসিরের সমস্ত চোখেমুখে। ঠান্ডা বায়ু ঝাঁপটা দিয়ে গেলো তার গায়ে, চোখ বুঁজে সেই বায়ু উপভোগ করলো সে। সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে আজ তার পরম শান্তি। মুক্তির শান্তি।
জগতে সবকিছুর আগে নিজেকে নির্বাচন করার শান্তিটা স্বর্গীয়।

দুই মাস অতিবাহিত হয়েছে। ধরায় এখন ঘোর শীতকাল। শৈত্যপ্রবাহে নাজেহাল জনজীবন। তবে অধিকাংশের জীবনেই এই শীত যেন উপভোগ্য।
জাফর আরেফিনের কারাদন্ডের পর আরেফিন পরিবারের সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পদের মালিকানা জায়দানের অবর্তমানে আয়দানের কাছে স্থানান্তরিত হয়েছে। প্রথমটায় সেই সম্পত্তি গ্রহণের ইচ্ছা আরেফিন কনিষ্ঠের ছিলোনা। তবে ভিন্ন একটি পরিকল্পনা তাকে পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরতে বাধ্য করেছে। চেয়ারে বসার পরপরই আয়দান কোম্পানির প্রায় ত্রিশ শতাংশ স্বত্বাধিকার ব্যবহার করে একটি হেল্পিং ফাউন্ডেশন গঠন করেছে। “নিয়ত”— নামের ফাউন্ডেশনটি নতুন হলেও ইতোমধ্যেই সারা দেশজুড়ে অভাবী মানুষের সহযোগিতায় ব্যাপক কাজকর্ম শুরু করেছে। অদূর ভবিষ্যতে আয়দানের নিয়তকে শুধু দেশের গন্ডিতে নয় বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়ারও ইচ্ছা আছে। সেই মহাকর্মযজ্ঞের কেবল সূত্রপাত হলো।
আজ মিসিরের আকদ। সেই কারণে সকাল থেকেই ভীষণ ব্যস্ততা। আয়দান, মীরা দুজনেই গতকাল মিসিরদের পৈতৃক বাড়িতে যেতে বাধ্য হয়েছে মিসিরের মায়ের একান্ত অনুরোধে। সাবিনকেও ভীষণ অনুরোধ করা হয়েছে, তবে হুট করে কোম্পানি রেখে যেতে পারেনি। উপরন্তু আজকে রেমান গ্রুপের সি ই ওর সাথে তার একটা ভার্চুয়াল মিটিং ছিলো। তাই সে জারিনকে নিয়ে দুপুরের মাঝেই পৌঁছে যাবে বলে ঠিক করেছে।

যে সাবিন শাড়ি পড়তে ভীষণ অপটু, সেই সাবিন আজ নিজে নিজেই ইউটিউব দেখে শাড়ি পড়লো। মিটিং কিছুক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে। সে অফিসের কেবিনরুমে পোশাক বদলে নিয়েছে। একটি সোনালী রঙের জর্জেট শাড়ি, লম্বা দীঘল চুল মাঝখানে সিঁথি করে ছেড়ে রাখা। ভিডিও কলে মিসিরের বাড়ি থেকে তাকে দেখছে মীরা, উপদেশ দিচ্ছে।
“ওই লম্বা এয়ারিং জোড়া পর, হেব্বি মানাবে।”
“এই না, ওই দুটো কি ভারী! আমার কান ছিঁড়ে যাবে।”
“পর বলছি!”
মীরার চোখ রাঙানিতে শেষমেষ ঠোঁট ফুলিয়ে সাবিন দুলজোড়া কানে পরে নিলো। স্বর্ণের অলংকারজোড়া সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে চকচকে দ্যুতি ছড়াচ্ছে। মীরা ফোনকলে থাকতেই পিছন থেকে উঁকি দিলো হাস্যোজ্জ্বল আয়দান।

“একদম সেগুন গাছের রেশম পোকার মতন লাগছে, পারফেক্ট!”
“শয়তানের বাচ্চাটা! মীরা, আমার তরফ থেকে ঠাটিয়ে একটা দে তো শালার গাল বরাবর!”
দুজনের ঝগড়ার মাঝে খিলখিল করে হেসে উঠলো মীরা। তাতে ভ্রুকুটি করে সাবিন বললো,
“আমিও দেখব তোদের বিয়ের সাক্ষী কে হয়, বেঈমানের ঘরের বেঈমান।”
“এরকম একটা শুভ দিনেও মুখ খারাপ করা কেউ তোর থেকে শিখুক।”
“ইশ, যেন তোর মুখ দিয়ে জিলাপির রস বেরোয়! লিস্ট দেবো কি কি কুকর্ম করেছিস? ভুলে গিয়েছিস? একটা সিঙ্গেল লোককে টপকাতে পারিসনি, উল্টো নিজেও পুষ্পারাজের কাছে কিডন্যাপ হয়ে গিয়েছিলি?”
চোখ উল্টালো আয়দান, এবার সত্যিই তার নার্ভে লেগেছে স্পষ্ট।
“ওই পুষ্পার কথা মনে করাস না, ভাই। কেরানীগঞ্জ জেলে আমার নিচের ওয়ার্ডে থাকতো। দুইবার বাথরুমে ওকে ঠাটিয়েছি!”
আয়দান আগে যেমন তেমন ছিল। কিন্তু এখন তার মতন শান্ত মানুষ কোন পর্যায়ে গেলে একজনকে সহ্য না করতে পেরে বিরূপ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
“আইরনি!”

অট্টহাসি হেসে উঠলো সাবিন। মীরা অবশ্য তাতে যোগদান করলোনা। সে বলে উঠলো,
“হয়েছে অনেক হাসাহাসি, ঝগড়াঝাঁটি। জারিন সোনাকে নিয়ে তুই তাড়াতাড়ি রওনা দে তো। এদিকে মেহমানরা চলে আসতে শুরু করেছে। মিসির ভাইয়া সকাল থেকে আমাদের পাঁচবার তাড়া দিয়ে ফেলেছে, তোরা না আসা অবধি উনি ম্যারেজ রেজিস্ট্রিতে সাইন করবেনা।”
“আসছি বাবা আসছি।”
“কি সুন্দর না? আজকে সবাই একত্রিত হবে, অনেক আনন্দ উদযাপন হবে, থাকবে না শুধু আমার ভাইয়াটা।”
সাবিন ফোন কেটেই দিচ্ছিল, তবে আয়দানের হঠাৎ ভাবুক মন্তব্যে সে জমে গেলো। স্ক্রীনের ওপাশে মীরাও বিষাদ মাখা নয়নে দেখলো আয়দানকে। ছেলেটা একপাশে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে আছে।
“এভাবে বলো না, আল্লাহ্ যখন আমাদের সব প্রার্থনা কবুল করেছেন, তখন এটাও করবেন।”

মীরার কথায় আয়দান মুচকি হাসার চেষ্টা করলো, তবে তার হাসিটা ঠিক অকৃত্রিম দেখালোনা।
“প্রার্থনা ছাড়া করার কিছু নেই। অথচ এই দুটো চোখ ওই মানুষটার জীবন একটা বিছানায় আবদ্ধ থাকতে দেখতে পারছেনা দিনের পর দিন ধরে। জারিনের হক আছে, সাবিনের হক আছে, আমার হক আছে। যে মানুষগুলো ভাইয়াকে এতটা যন্ত্রণা দিয়েছে তারা আজ পৃথিবীতেই নিজেদের কর্মফল ভোগ করছে। কেউ প্রকাশ্যে, কেউ আড়ালে। ওদের জন্য না হোক, আমাদের জন্য হলেও কি ও ফিরে আসতে পারেনা?”
গাঢ় নৈঃশব্দ্য। মীরা একটি হাত বাড়িয়ে আয়দানের কাঁধ ছুঁয়ে দিলো, অপরদিকে আয়দান নিঃশব্দে নিজের মাথার চুলে হতাশার হাত বুলিয়ে আনলো। ফোনকলটি হঠাৎ করেই ভীষণ অস্বস্তিদায়ক লাগলো সাবিনের। তাই আর কোনো কথা না বলেই সে ফোনটা কেটে দিলো।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি নিয়ে কোম্পানি থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল সাবিন। ন্যানিকে জানিয়ে দেয়া আছে, জারিনকে তৈরি করে রেখেছে। সাবিন গিয়ে মেয়েকে গাড়িতে তুলে সোজা রওনা দেবে মিসিরের বাড়ির দিকে। আজ পথে গাড়ি চালাতে চালাতে আরো একবার নতুন করে চিন্তায় ডুবে গেলো সাবিন।
কত দীর্ঘ একটা পথ পেরিয়ে এসেছে সে! উশৃঙ্খল এক রগচটা মেয়ে থেকে আজ সে এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জননী। এই পথে ছিল কতই না উত্থান পতন। অল্প বয়সে ডিভোর্স, ডিভোর্সের পরে নতুন অনুভূতিদের সূচনা। নিজেকে চেনা, নতুনভাবে আবিষ্কার করা জীবনের আসল অর্থটা। এমন একটা মানুষকে পাওয়া যে শুধুমাত্র একজন স্বামী নয়, বরং সাবিনের মাথার উপর বটবৃক্ষের ছায়া। এককালের সাবিন নামক বেয়াদব বাচ্চা মেয়েটাকে যে বউ হিসাবে নয়, বড় করে তুলেছে একজন শিশুর মতন। যার কাছে গিয়ে সাবিনের সকল অভিযোগ, অভিমান ফুরাতো। তাকে ভালোবাসতে সাবিনের কোনোদিন কোনো কারণের প্রয়োজন হয়নি। একটা সময় ভাবতো, তার ভালোবাসা বুঝি এক তরফা। অথচ ওই মানুষটা নিজের সবকিছু উৎসর্গ করে বুঝিয়ে দিয়ে গেলো, তার ভালোবাসার সামনে জগতের সকল কিছুই যেন তুচ্ছ। সাবিনের কন্টকাকীর্ণ জীবনটাকে ফুলে ফুলে সাজিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছে মানুষটা। সমাপ্তির ওপাড়ে এসে মিলেছে পূর্ণতা। কিন্তু কিসের বিনিময়ে?

সাবিনের চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে নামলো। ভিজিয়ে তুললো গাল। মুখটা তার পাথুরে, কঠোর, অথচ নয়নমাঝে অফুরন্ত বিরহ বেদনা। আজ বড্ড বেশি মিস করছে সাবিন তার আরেফিন টাওয়ারকে। খুব বেশি।
গাড়ি যখন সাবিনের বাড়ির সামনে এসে থামলো তখন দ্রুতই টিস্যু দিয়ে নিজের চোখমুখ মুছে নিলো সে। জারিনকে কিছুতেই বুঝতে দেয়া যাবেনা তার অভ্যন্তরের মহাকষ্ট। ফোন হাতে নিতেই সাবিন খেয়াল করলো বেশ অনেকগুলো কল এসেছে বাসার নাম্বার থেকে। সাইলেন্ট থাকায় এবং ড্রাইভ করায় সাবিন খেয়াল করেনি। নিশ্চয়ই জারিন করেছে। মেয়েটা এসব বিষয়ে খুবই উত্তেজিত কিনা। সাবিন কেন তাড়াতাড়ি ফিরছেনা, কেন সে মিসির চাচ্চুর বিয়েতে যেতে পারছেনা এই নিয়ে অভিযোগ করতেই বুঝি ফোনের উপর ফোন দিয়েছে। মুচকি হাসলো সাবিন। মেয়েটা তার এত্ত আদুরে!

গাড়ি থেকে বেরিয়ে সে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। সুনসান নীরবতা। শীতল সকালের মন্থর হাওয়া এবং কোমল সূর্যালোক প্রবেশ করছে আধখোলা জানালা বেয়ে। অদূরে দেয়ালঘড়ি টিকটিক শব্দ করে চলছে। স্নিগ্ধ এবং শান্ত পরিবেশ। সাবিন এগোলো, তার পরনের শাড়ি-চুড়ি মৃদু সুরেলা ঝংকার তুললো প্রতি কদমে। ঠিক তখনি দুই তলার সিঁড়ির গোড়ায় উপস্থিত হলো জারিন। কথামত তৈরিই আছে সে। একটা আরামদায়ক কাপড়ের এমব্রয়ডারি করা ফ্রক পরনে। ধবধবে সাদা ফ্রকের বুকজুড়ে লালচে রসের দাগ। হাতে ঝুলছে একটা স্টিলের থালা, মুখেও রস লেপ্টে আছে। থালাটা চিনতে অসুবিধা হলোনা সাবিনের, জায়দানের রুমে থাকে। কিন্তু মেয়ে এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে কেন নিজের উপর? সাবিন দ্রুত এগিয়ে এলো, জারিন সিঁড়ি থেকে লাফিয়ে নামতেই তাকে কোলে তুলে ফেললো।

“কি ব্যাপার? রেডি হওয়ার পরে এভাবে জামা নষ্ট করার মানে হয়?”
গুঙিয়ে উঠলো জারিন।
“কাত্তিলাম তো!”
সাবিন ততক্ষণে হাঁটতে হাঁটতে কিচেনে চলে এসেছে। জারিনের হাত থেকে প্লেট নিয়ে বুঝল আনার ফল খেয়েছে, সেটারই লাল রস সারা মুখ এমনকি জামায়ও লেপ্টে ফেলেছে। প্লেট রেখে ওয়েট টিস্যু নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে সাবিন জারিনের হাত মুখ মুছিয়ে দিতে লাগলো।
“আনার খেতে ইচ্ছা হলে ন্যানিকে বলতে। কি সুন্দর তোমাকে তৈরি করেছিল, দেখেছ এখন সবটা নষ্ট করে ফেলেছ, হুম? ভেরি ব্যাড জারিন।”
“উন্না! ন্যালি না তো!”

ঠোঁট ফোলালো জারিন। তার রাঙা সেই ঠোঁট মুছতে মুছতে সাবিন হেসে জিজ্ঞেস করলো,
“ন্যানি না? আরেকজন?”
“উ, অল্য কেউ!”
“অন্য কেউ আনার খাইয়ে দিয়েছে তোমায়?”
“উম।”
“নার্স আন্টি?”
জোরে জোরে ডানে বামে মাথা নেড়ে জারিন হঠাৎ বলে উঠলো,
“আপ্পা!”
সাবিন জারিনের হাত মোছার ঠিক মাঝামাঝি পর্যায়ে জমে গেলো। তার নয়নজোড়া প্রসারিত হয়ে উঠলো। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো, সে ভুল শুনেছে নয়তো জারিন ভুলভাল বকছে। তাই চোখ পিটপিট করলো সে। গলা কাঁপলো তার যখন সে শুধালো,
“কে খাইয়ে দিয়েছে তোমায়?”
“আপ্পা! আপ্পা!”

দুহাত নেড়ে ছোট্ট জারিন লাফিয়ে উঠলো ভীষণ উত্তেজনায়। তার বলতে যতটুকু দেরী হলো, সাবিনের উঠে দাঁড়াতে একটুও দেরী হলোনা। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সে ছুটে গেলো দুই তলার সিঁড়ির দিকে। শাড়ির আঁচল খুলে মেঝেতে টেনে যেতে লাগলো, সাবিন খেয়ালটুকুও করলোনা। উন্মাদপ্রায় হয়ে দৌঁড়ে দুই তলায় উঠে গেলো। জারিনও ছোট্ট ছোট্ট পায়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে মায়ের পথ অনুসরণ করলো।
সাবিনের সমস্ত শরীরে ভূমিকম্প খেলে যাচ্ছে। মাথার ভেতর মস্তিষ্ক দপদপ করছে। মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে জ্ঞান হারাতে পারে সে। তবুও থামলোনা তার পদক্ষেপ। অমোঘ বাসনায় সে ছুটে চললো করিডোর বেয়ে। মাথায় তার কিছুই নেই আর, কিচ্ছু না! রুমের দরজার সামনে পৌঁছেই ধাক্কা দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকে গেলো সাবিন। সামনের দৃশ্যটি দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার হাঁটু ভেঙে এলো, ধপাস করে সে মেঝেতেই বসে পড়ল। শাড়ির আঁচল ছড়িয়ে রইলো চারিপাশে, চোখজোড়া হন্যে হয়ে লোভীর মতন অবলোকন করলো এক স্বর্গীয় প্রতিচ্ছবি।

রুমটি আগের মতোই আছে। স্নিগ্ধ, উষ্ণ, ঔষধি ঘ্রাণে পূর্ণ। খোলা জানালা বেয়ে আরামদায়ক বাতাস আসছে। সঙ্গে শীতের সূর্যের মৃদু ওম। সেই স্বর্ণতুল্য রশ্মি এসে পড়ছে বিছানায়। বিছানার উপর বেশ কয়েকটি বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে জায়দান। মাথার হালকা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে কপালের উপর। ঢোলা ফতুয়া বাতাসে দুলছে খানিক। তার একটি হাত থেকে অতি যত্নে ধীরে ধীরে ক্যানোলা সংযোগ খুলে নিচ্ছে নার্স। জায়দানের প্রসারিত বাদামী চোখজোড়া নব্য বিস্ময়ে জ্বলজ্বল করছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সে নার্সের কার্যক্রম। সমস্ত ফ্যাকাশে চেহারাজুড়ে শিশুসুলভ বিস্ময়।
সাবিনকে প্রথম খেয়াল করলো নার্স। দ্রুত বললো,
“আরে ম্যাম, আপনাকে কতবার কল করলাম ধরলেন না! আমি ডাক্তারকে জানিয়ে দিয়েছি, উনি পাঁচ মিনিটের মধ্যে চলে আসবেন চেকআপের জন্য।”

কিন্তু নার্সের দিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই সাবিনের। সে একদৃষ্টে চেয়ে আছে নিজের স্বামীর দিকে। নার্সের কথা শুনেই হালকা মাথা কাত করে সাবিনের দিকে তাকালো জায়দান। ওই সামান্য নড়চড় করতেই তার ভীষণ কষ্ট হয়েছে সেটা অভিব্যক্তি দেখেই বোঝা গেলো। শরীরটা বুঝি কাদামাটির মতন, কিছুতেই নিজেকে নিজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়না। একপাশ থেকে নার্স তাকে ধরে রেখে স্থিরভাবে বসে থাকতে সাহায্য করলো।
জায়দানের বাদামী দৃষ্টি মিলিত হলো সাবিনের সঙ্গে। তারপরই শুষ্ক ঠোঁটে ফুটলো অতি সূক্ষ্ম এক হাসির রেখা। নরম সূর্যের আভা প্রতিফলিত হলো জায়দানের সৌম্য চেহারায়, একটুও অসুস্থ লাগলোনা তাকে ওই মুহূর্তে, যেন সদ্য ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া এক রাজপুত্র।
“গুড মর্নিং….মাই ওয়াইফ।”

দীর্ঘদিন যাবত ব্যবহার না করায় জায়দানের কণ্ঠস্বর শোনালো ভীষণ কর্কশ এবং ভাঙা ভাঙা। কথাগুলোও কেমন জড়ানো। তবে বিশাল ধাক্কাটা সইতে পারলোনা সাবিন। সে জানেও না কেমন অনুভব করছে। চোখের সামনে নিজের সবথেকে প্রিয় শখের পুরুষটাকে এভাবে দেখে নিজের আবেগ, বিবেক কোনোকিছুরই হদিস পেলনা সে। তার চোখে ভাসলো অসংখ্য স্মৃতিরা। বিয়ে, ভুল বোঝাবুঝি, নরক সংসার, ডিভোর্স, অনুভূতির টান, পুনরায় কাছে আসা, প্রত্যাখ্যান, মায়া, নতুন সংসার, বিচ্ছেদ বিরহ, সবকিছু। এবং সমাপ্তির ওপাড়ে,
“আপ্পা, জা-ইন! জা-ইন মাম্মামকে নিয়ে এতেতে! মাম্মাম, আপ্পার গুম বেঙে গেতে!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৬১

টুকটুক করে রুমের ভেতর পৌঁছে গিয়েছে জারিন। সাবিনের ঠিক পাশে দাঁড়িয়েই লাফাতে লাফাতে সে কথাগুলো বললো। জায়দানের বাদামী নয়নমাঝে অশ্রু ভরে এলো। সেই অশ্রু সংক্রমিত হলো সাবিনের চোখেও। ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। জায়দান রীতিমত ফিসফিস করে উচ্চারণ করলো,
“হ্যাঁ আম্মু, আপ্পার ঘুম ভেঙে গিয়েছে।”
বাঁধভাঙা অশ্রু অথচ ঠোঁটে অসীম সুখের উল্লাস নিয়ে সাবিন প্রফুল্ল কন্ঠে বললো,
“ওয়েলকাম হোম, মিস্টার জায়দান আরেফিন, ফাদার অব জারিন আরেফিন।”

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here