Home অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭২ (২)

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭২ (২)

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭২ (২)
সুমি চৌধুরী

পরেরদিন সকালবেলা চৌধুরী বাড়িতে ভোর হতেই কাজের মানুষদের কোলাহল আর হইচইয়ে ধুম লেগে গেল। গায়ে হলুদের রেশ কাটতে না কাটতেই আজ বিয়ের মূল অনুষ্ঠান। তাই সকাল থেকেই বাড়ির সবাই যে যার কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাতে অনেক দেরিতে ঘুমানোর কারণে শুভ্রা সকালের অনেকখানি সময় পার করে চোখ মেলল। কিন্তু সে বিছানা থেকে উঠতে না উঠতেই মিহি আর বাড়ির আরও কয়েকজন কাজিন মিলে তাকে জোর করেই ঘর থেকে টেনে নিচে নিয়ে এলো। প্যান্ডেলের এক কোণে বসিয়ে তারা শুভ্রাকে মেহেদি পরিয়ে দিতে লাগল। মেহেদি পরার পুরোটা সময় শুভ্রার চোখ দুটো অনবরত চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। বাড়ির আনাচে-কানাচে এত এত ছেলেমেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কোথাও ঈশানের চেনা অবয়বটা দেখা যাচ্ছে না। শুভ্রার মনের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় মুচড়ে উঠল।

অন্য দিকে। নিজের ঘরে বসে শুভ্র ফোনের পর ফোন করে যাচ্ছে। সে একের পর এক ঈশানকে কল দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিবারই ওপাশ থেকে যান্ত্রিক গলায় বলছে ঈশানের নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে। ঈশানের ওপর চরম বিরক্ত আর ক্ষুব্ধ হয়ে শুভ্র ফোনটা পকেটে পুরে একাই বাড়ির বাইরে চলে গেল।
এদিকে সকাল থেকেই রিদি এক মুহূর্তের জন্য বসেনি। সে তার নিজের মা। আর মামির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিয়ের নানাবিধ কাজে হাত লাগিয়েছে। কাজের মাঝে ব্যস্ত থাকলেও আজ সকাল থেকে রিদির মনটা একেবারেই ভালো নেই। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কু ডাকছে কেন জানি বারবার মনে হচ্ছে। খুব বড় কোনো একটা বিপদ এই চৌধুরী বাড়ির দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে।

ধীরে ধীরে সকাল পেরিয়ে দুপুর গড়িয়ে এলো। চারদিকের সানাইয়ের আওয়াজ আরও মুখর হয়ে উঠল। কারণ বরের বাড়ি থেকে সব মেহমান আর আত্মীয়-স্বজনসহ স্বয়ং বর তূর্য এসে চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছাল। শুভ্রাকেও ততক্ষণে একদম নিখুঁত করে লাল বেনারসি আর গহনায় বধু সাজে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে তার ঘরের বিছানায় একদম স্তব্ধ হয়ে চুপচাপ বসে আছে। হুট করে শুভ্রার ঘরের সব মানুষ যখন বাইরে গেল। ঠিক তখনই ঘরের ওয়াশরুমের দরজাটা ধীর শব্দে খুলে গেল। ওয়াশরুম থেকে পুরো কনের সাজে সেজে অন্য একটি মেয়ে বেরিয়ে এলো। মেয়েটিকে দেখামাত্রই শুভ্রা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। এরপর কোনো কথা না বাড়িয়ে। সেই নতুন মেয়েটি এসে শুভ্রার জায়গায় কনে সেজে চুপটি করে বসে পড়ল।
শুভ্রা এক সেকেন্ডও আর দেরি করল না। সে নিজের ভারী লেহেঙ্গার ওপর দিয়েই চটপট একটা কালো বোরকা গলিয়ে নিল এবং মুখটা ভালোমতো ঢাকার জন্য হিজাবটা টেনে নিল।

বোরকা আর হিজাবে নিজেকে পুরোপুরি আড়াল করে সে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। চারিদিকে তখন অতিথিদের উপচে পড়া ভিড়। তাই বোরকা পরা এক মেয়েকে কনের ঘর থেকে বের হতে দেখেও কেউ তেমন একটা খেয়াল করল না। শুভ্রা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে হেঁটে বাড়ির মূল গেট পার হয়ে মেইন রাস্তায় চলে এলো এবং চোখের পলকে একটা খালি সিএনজি ডেকে তাতে উঠে চোখের আড়ালে চলে গেল।সন্ধ্যা নামার পর বিয়ের মূল লগ্ন শুরু হলো এবং অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে তূর্যের বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল। বিয়ে শেষের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে যখন রিদি সবার সামনে কনের মাথার বড় ঘোমটাটা আলতো করে টেনে তুলল। ঠিক তখনই পুরো হলরুমে যেন এক তীব্র ভোল্টের বিদ্যুৎ স্পষ্ট হলো। উপস্থিত সবার মুখের হাসি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। কারণ কনের আসনে শুভ্রার জায়গায় বধু সেজে মাথা নিচু করে বসে আছে পাখি।রিদি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে ছিটকে পিছিয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠল,

“পাখি। তুই এখানে?”
পাখি আর নিজের কান্না চেপে রাখতে পারল না। সে মাথা নিচু করে ডুকরে কেঁদে দিল। এমন অদ্ভুত কাণ্ড দেখে সোহান রহমান অত্যন্ত রাগত পায়ে এগিয়ে এসে বললেন,
“পাখি। তুই এখানে কনের সাজে কেন? শুভ্রা কোথায়? শুভ্রার জায়গায় তুই কেন বসে আছিস?”
ঠিক তখনই হলরুমের এক কোণ থেকে শুভ্র শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
“শুভ্রা চলে গেছে।”
মেয়ের উধাও হওয়ার খবর শুনে সোহান চৌধুরী যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি কাঁপানো গলায় বললেন,
“চলে গেছে মানে? কী বলছিস এসব?”
“হ্যাঁ। সে চলে গেছে। যেখানে গেলে সে নিজের একটুখানি শান্তি পাবে। সে ঠিক সেখানেই চলে গেছে।”
সোহান চৌধুরী এবার রেগে গিয়ে বললেন,
“কী ছাইপাশ বলছিস তুই? ভালো করে বুঝিয়ে বল?”
শুভ্র হলরুমের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে সবার সামনে স্পষ্ট গলায় বলল,

“শুভ্রা ঈশানকে ভালোবাসে। এই বিয়ের মণ্ডপ ছেড়ে নিজের ভালোবাসার মানুষ ঈশানের কাছেই গিয়েছে।”
শুভ্রর এই একটা বাক্যে পুরো হলরুমে যেন পুনরায় এক মারাত্মক বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের মতো ধাক্কা লাগল। বিয়ের আসরে উপস্থিত সবার চোখ কপালে উঠে গেল। চৌধুরী বাড়ির একমাত্র মেয়ে একটা অন্য ধর্মের হিন্দু ছেলেকে ভালোবাসে? শুধু ভালোবাসেই না। তার জন্য নিজের বিয়ের মণ্ডপ ভেঙে এভাবে পালিয়েও গেছে। এ বংশের মুখে চুনকালি মেখে। সোহান চৌধুরী রাগে-ক্ষোভে জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থা হলেন। তিনি চিৎকার করে উঠে শুভ্রের কলার চেপে ধরার ভঙ্গিতে বললেন।
“তুই কি পাগল হয়ে গিয়েছিস শুভ্র? কী বলছিস এসব তুই? শুভ্রা ঈশানকে ভালোবাসে মানে? আরে। ও তো একটা হিন্দু ছেলে।”
শুভ্র নিজের বাবার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বিন্দুমাত্র না কেঁপে বলল,
“কেন? হিন্দু কি মানুষ নয়? তাদের শরীরে কি আমাদের মতো লাল রক্ত বইছে না?”
নিজের ছেলের মুখে এমন অকাট্য যুক্তি আর ধর্মের বিরুদ্ধে কথা শুনে সোহান চৌধুরী রাগে কাঁপতে কাঁপতে গর্জে উঠলেন,

“শুভ্র।”
শুভ্র কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে নিজের কণ্ঠস্বর আরও দৃঢ় করে বলল,
“আপনি আজ যাই করেন না কেন আব্বু। কিন্তু আমি এই শুভ্র বেঁচে থাকতে ঈশান আর শুভ্রাকে কেউ আলাদা করতে পারবে না। আমি ওদের আলাদা হতে দেব না।”
শুভ্রর কথা শেষ হতে না হতেই সোহান চৌধুরী নিজের সমস্ত রাগ এক করে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন শুভ্রর ফর্সা গালে। সেই থাপ্পড়ের তীব্র শব্দে যেন পুরো রাজকীয় হলরুমটা একবার কেঁপে উঠল। সোহান চৌধুরী ঘেন্নায় মুখ কুঁচকে বললেন।
“ছিহ্। ছিহ্। বড় ভাই হয়ে এই কথা বলতে তোর একটুও লজ্জা করছে না? একজন মুসলমান ঘরের সন্তান হয়ে তুই নিজের আপন বোনকে কীভাবে একটা হিন্দু ছেলের হাতে তুলে দিতে পারিস?”
গালে থাপ্পড় খেয়েও শুভ্র এতটুকু দমে গেল না বা মাথা নিচু করল না। সে নিজের গালের রক্তিম দাগটা এক হাত দিয়ে মুছে নিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও শান্ত গলায় বলল।
“এসবের মধ্যে লজ্জা নয় আব্বু। সত্যিটা মেনে নেওয়ার মতো একটা কলিজা আর সাহস থাকতে হয়। আর রইল কথা ঈশানের হিন্দু হওয়াটা। ওটা তো ওর বাহ্যিক ধর্ম মাত্র। কিন্তু ওর ভেতরের শরীরটা। ওর জীবনটা তো কোনো আলাদা ধর্মের নয়। আর আমার বোন ওই শরীর। ওই খাঁটি জীবনটাকেই ভালোবেসেছে। ওর ধর্মকে না।”

সোহান চৌধুরী রাগে কাঁপতে কাঁপতে আঙুল উঁচিয়ে বললেন,
“যদি আমার মেয়ের কোনো ক্ষতি হয়। তাহলে কিন্তু আমি কাউকে ছাড়ব না। ওই ঈশানকেও না। মনে রাখিস।”
বলেই তিনি আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে পকেট থেকে ফোন বের করে সরাসরি পুলিশকে কল দিলেন। ওদিকে বিয়ের মণ্ডপে উপস্থিত শয়ে শয়ে অতিথিদের মধ্যে কানাঘোষা আর ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল। পুরো চৌধুরী বাড়ির সম্মান যেন এক নিমেষে ধুলোয় মিশে গেল। সাহেরা চৌধুরী নিজের একমাত্র মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে আর মাথায় হাত দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।শুভ্র সেখানে আর দাঁড়িয়ে রইল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত পায়ে হলরুম থেকে বেরিয়ে বাইরে ফাঁকা উঠোনে চলে আসল।আসলে। এই পুরো নাটক আর পলায়ন পর্বের মাস্টারমাইন্ড অন্য কেউ নয়। স্বয়ং শুভ্র নিজেই ছিল। এটা ছিল তার একদম নিখুঁত একটা সিক্রেট প্ল্যান।কাল রাতে শুভ্র যখন একটা জরুরি কাজে বাইরে থেকে বাড়ি ফিরছিল। তখন মাঝরাস্তায় হুট করে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা ঈশানকে দেখতে পায়। তখনই সে আড়ালে দাঁড়িয়ে ঈশানকে ফলো করে এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে বলা তার প্রতিটা বুকফাটা আর্তনাদ ও কষ্টের কথা নিজের কানে শোনে। নিজের সত্যিকারের ভালোবাসা হারানোর কেমন তীব্র যন্ত্রণা হয়।

তা শুভ্র নিজের জীবন দিয়ে খুব ভালো করেই জানে। তাই ঈশানের ভেতরের সেই দহনটা সে মুহূর্তে অনুধাবন করতে পেরেছিল।এরপর শুভ্র যখন বাড়ি ফেরে। ততক্ষণে গায়ে হলুদের ধকল শেষে বাড়ির সবাই আনন্দ করে যার যার রুমে ঘুমিয়ে পড়েছে। শুভ্র যখন নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ছাদের সিঁড়ির পাশে অন্ধকারে কারো ফুপিয়ে কাঁদার শব্দ পায়। সে কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখে। অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে পাখি ফোনের ওপাশে কারো সাথে কথা বলছে আর অঝোরে কাঁদছে। তখনই পাখির মুখ থেকে হুট করে ‘তূর্য’ নামটা বের হয়ে আসে।শুভ্র আর দেরি না করে পাখিকে হাতেনাতে ধরে ফেলে এবং জেরা করে তার মুখ থেকে সব সত্যি বের করে আনে। সে জানতে পারে পাখি আর তূর্যের মধ্যে গত চার মাস ধরে একটা গভীর রিলেশন চলছে। পাখি তূর্যকে প্রচণ্ড ভালোবাসে।

ওদিকে তূর্যও পাখিকে ছাড়া অন্য কাউকে চায় না। তাকে কোনোভাবেই হারাতে চায় না। সবকিছু শুনে শুভ্র যেন এক মুহূর্তের জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছিল। সে মনে মনে ভাবল একটা ভুলের কারণে একসাথে চার-চারটে মানুষের জীবন এভাবে জ্যান্ত পুড়িয়ে নষ্ট করা হচ্ছে। ঈশান-শুভ্রা ওদিকে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর এদিকে তূর্য-পাখি তিলে তিলে মরছে।নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে শুভ্র তখনই একটা চরম সিদ্ধান্ত নেয়। সে নিজের রুমে না গিয়ে সরাসরি শুভ্রার রুমে ঢোকে। শুভ্রা তখনো কাঁদছিল। শুভ্র নিজেই শুভ্রাকে কড়া আদেশ দেয় যেন সে বাড়ি থেকে পালিয়ে ঈশানের কাছে চলে যায়। আর পাখিকে বলে শুভ্রার জায়গায় কনে সেজে বসে থাকতে। যাতে তূর্য তার নিজের ভালোবাসাকেই পায়।অতঃপর। শুভ্রের সেই মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ীই আজ দুপুরে শুভ্রা বোরকা পরে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। আর তূর্যের সাথে পাখির বিয়েটা সুসম্পন্ন হয়।
শুভ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“আমি চারটে জীবন ধ্বংস হতে দিতে পারতাম না আব্বু। আজ না হয় আমি সবার চোখে অপরাধীই হলাম।”

অন্য দিকে শুভ্রা তখন ঈশানকে খুঁজতে খুঁজতে প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছে। তার পরনের ভারী লেহেঙ্গাটা চরণের প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। তবুও সে থামেনি। শহরের প্রতিটি চেনা গলি। পার্ক। রেস্টুরেন্ট আর ঈশানের ফ্ল্যাট সব জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুঁজে চলেছে সে। কিন্তু কোথাও ঈশানের বিন্দুমাত্র অস্তিত্বও নেই।রাত তখন ঠিক নয়টা। তীব্র গরমে আর ক্লান্তিতে হাঁপাতে হাঁপাতে শুভ্রা মাঝরাস্তায় এসে থামল। ভেতরের দমবন্ধ করা কান্নাটা আর চেপে রাখতে না পেরে সে নিজের গায়ের বোরকাটা টান মেরে খুলে রাস্তার ওপর ছুঁড়ে মারল। তারপর পিচঢালা খসখসে রাস্তার মাঝেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল।
“ঈশান। আপনি কোথায়? আমি আপনাকে কোথাও পাচ্ছি না কেন? প্লিজ। আমার সামনে একবার এসে দাঁড়ান। আমি আর পারছি না।”

শুভ্রা কাঁদতে কাঁদতেই আবার জোর করে নিজের টলমলে শরীরটাকে খাড়া করে উঠে দাঁড়াল। ভেজা চোখে। এলোমেলো পায়ে এক বুক শূন্যতা নিয়ে সে সামনে পা বাড়াল। হাঁটতে হাঁটতে সে একসময় পুরান ঢাকার সেই চেনা। জরাজীর্ণ ব্রিজটার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল।সেখানে আসতেই মুহূর্তের মধ্যে শুভ্রার নিষ্প্রাণ চোখ জোড়া চকচক করে উঠল। কারণ। সেই ব্রিজের রেলিংয়ের সামনেই টিমটিমে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং ঈশান। শুভ্রার বুকে যেন প্রাণ ফিরে এলো। সে মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে দৌড়ে ঈশানের দিকে এগোতে চাইল।কিন্তু সে কাছে পৌঁছানোর আগেই। ঈশান ব্রিজের লোহার রেলিংটার ওপরে চড়ে বসল। নিচে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যাওয়া অন্ধকারের মাঝে বয়ে চলেছে এক বিশাল। অতল নদী। ঈশানের এই রূপ দেখে শুভ্রার পায়ের গতি থমকে গেল। তার সারা শরীর ভয়ে পাথর হয়ে গেল। ঈশান একি করছে? ও কেন রেলিংয়ের ওপরে উঠেছে? এখান থেকে একবার নিচে পড়লে তো আর কোনো রক্ষা নেই।শুভ্রার এই তীব্র আতঙ্কের মাঝেই ঈশান রাতের কালচে আকাশের দিকে নিজের মুখটা তুলে ধরল। তার চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে এক বুক হাহাকার নিয়ে শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ভাঙা। রূঢ় গলায় বলতে লাগল।

“হ্যাঁ ঈশ্বর আমি পারলাম না। এই অভাগা জীবনটাকে আমি আর কোনোভাবেই এই বুকে ধরে রাখতে পারলাম না। এই জীবনটা আজ আমার এই পাঁজরের ভেতর বড্ড বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছে ঈশ্বর। অনেক বেশি। আমি একটুও নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। বুকের ভেতরটা কেমন যেন কয়লার মতো পুড়ছে। অনেক কষ্টে বুকের সমস্ত শক্তি এক করে মাত্র এক চিলতে তপ্ত নিঃশ্বাস আসছে আমার বুকে। আর সেই এক চিলতে নিঃশ্বাস আমাকে প্রতিটা সেকেন্ডে মৃত্যুর থেকেও দ্বিগুণ যন্ত্রণা দিচ্ছে। এত তীব্র দহন। এত অপার যন্ত্রণা আমি আর সইতে পারছি না ঈশ্বর। আমি চলে আসছি তোমার কাছে এই বুকভরা এক আকাশ হাহাকার আর শূন্যতা নিয়ে আজ আমি তোমার কাছে চলে আসছি।”
ঈশান এক মুহূর্ত থামল। তার ঠোঁট দুটো অবাধ্যের মতো কাঁপছে। সে আবার নিচের কালচে পানির দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলল।

“আমাকে ক্ষমা করে দিও শুভ্রা। তোমাকে ভালোবেসেও ‘ভালোবাসি’ বলতে পারিনি। কিন্তু এই না-পাওয়া ভালোবাসার তীব্র কষ্ট আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। তুমি অনেক ভালো থেকো শুভ্রা। অনেক সুখে থেকো। আমি যদি মরে যাওয়ার পর কোনো অদৃশ্য ছায়া হয়ে বেঁচে থাকতে পারি তবে সেই দূর সীমানার ছায়া থেকেই আমি সবসময় তোমার মিষ্টি মুখের হাসিটা দেখে নিজের এই অতৃপ্ত মনকে বোঝাব আমার শুভ্রা অনেক ভালো আছে। কখনো কখনো যাতে তোমার এই সুন্দর চোখ দুটোতে আমি এক ফোঁটাও জল না দেখি।”
ঈশানের চোখ ফেটে এবার ডুকরে কান্না বেরিয়ে এলো। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।

“ভালো থাকবেন বস। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে আমি যখন একলা। অসহায় হয়ে রাস্তায় পড়েছিলাম। তখন আপনি নিজের ছায়া দিয়ে হয়েছিলেন আমার একমাত্র আশ্রয়। যখন আমার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না। তখন পরম যত্নে আমার জীবনের সেরা সঙ্গী হয়েছিলেন আপনি। যখনই আমার ওপর কোনো বিপদ এসেছে। ঠিক পাহাড়ের মতো ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন আপনি। আপনি শুধু আমার বস নন আপনি আমার নিজের ভাই। হয়তো আপনি আমাকে বহুবার বলতেন আপনাকে ‘ভাই’ বলে ডাকতে আমি কোনোদিন ডাকিনি। কারণ। কিছু জিনিস মুখে প্রকাশ করার চেয়ে মনের গভীরে লুকিয়ে রাখাটা অনেক বেশি সুন্দর আর যত্নের হয়। আর আমি সেই পরম যত্নটাই নিজের মনের কোণে রেখে দিয়েছিলাম। আজ আমি এমন এক বিষাক্ত জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি বস। যেখানে একদিন জীবনের কোনো এক কঠিন মুহূর্তে আপনিও এসে দাঁড়িয়েছিলেন। আজ ঠিক সেই একই রূপ পেয়েছে আপনার এই ঈশান। বস আপনার বোনকে আমি অনেক ভালোবাসি। খুব বেশিই ভালোবাসি। এতটাই ভালোবাসি যে। আজ এই ভালোবাসার খাতিরেই আপনার ওই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা থেকে নিজেকে চিরতরে ত্যাগ করতে হচ্ছে। এতটাই ভালোবাসি যে আজ এই ভালোবাসার তাগিদেই আমাকে এই সুন্দর পৃথিবীটা ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। আপনার এই ছোট ভাইটাকে ক্ষমা করে দিয়েন বড় ভাই।”

কথাগুলো শেষ করতেই ঈশান এক বুক ভরে শেষবারের মতো একটা তপ্ত শ্বাস টেনে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। তারপর পুরো পুরান ঢাকার আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে। নিজের শেষ আর্তনাদটুকু ঢেলে দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল।
“আই লাভ ইউ শুভ্রা।আই ক্যা’ন্ট লিভ উইদাউট ইয়োর লাভ।”
বলেই ঈশান আর এক সেকেন্ডও দ্বিধা করল না। সে নিচের ওই গভীর। কালচে পানিতে ঝাঁপ দিতে যাবে ঠিক তখনই।পিঠে তার ধবধবে সাদা শার্টের কাপড়ে আচমকা এক তীব্র টান লাগে। মনে হলো পেছন থেকে দুই হাত বাডিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে কেউ তার শার্টের কাপড়টা খামচে ধরেছে। আর তার ঠিক পরক্ষণেই। ব্রিজের সেই সুনসান নিস্তব্ধতা আর রাতের ঠান্ডা বাতাস কাঁপিয়ে এক বুকফাটা। হুহু করে ওঠা মেয়েলি কান্নার করুণ সুর ভেসে আসে।এই গভীর রাতে। মৃত্যুর ঠিক এক সেকেন্ড আগে এমন অতি পরিচিত কান্নার আওয়াজ পেয়ে ঈশানের পুরো শরীর যেন এক মারাত্মক ঝাঁকুনি খেল। সে প্রচণ্ড চমকে উঠল। এক বুক আতঙ্ক আর অবিশ্বাস নিয়ে বহু কষ্টে নিজের শক্ত হয়ে যাওয়া ঘাড়টা পেছনের দিকে ঘোরাল সে।ঘাড় ঘোরাতেই ঈশানের চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। ঠিক পেছনে লোহার রেলিংয়ের নিচে শুভ্রা দুই হাতে তার শার্টের কাপড়টা শক্ত করে খামচে ধরে অবিরত কেঁদে চলেছে। শুভ্রার কান্নার তীব্রতায় আর তার শরীরের কাঁপুনিতে লোহার তৈরি শক্ত রেলিংটাও যেন থরথর করে কাঁপছে। শুভ্রা হারানোর ভয়ে ছোট বাচ্চাদের মতো ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা গলায় বলতে লাগল।

“আমাকে এভাবে একলা ফেলে রেখে চিরতরে ছেড়ে যাবেন না ঈশান ভাইয়া। যদি যেতেই হয়। তবে আমাকেও আপনার সাথে করে নিয়ে চলুন আমিও যাব আপনার সাথে। আপনি ছাড়া আমার এই দুনিয়াতে আর কিচ্ছু নেই।”
শুভ্রাকে এভাবে নিজের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঈশানের ভেতরের সমস্ত পাগলামি যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও রেলিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকল না। এক ঝটকায় সে রেলিং থেকে নিচের পিচঢালা ফ্লোরে নেমে পড়ল।নেমে এসেই সে চরম বিস্ময় আর অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে রইল। বারে বারে নিজের চোখের পলক ফেলে সে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মেয়েটি কি আসলেই তার রক্ত-মাংসের শুভ্রা। নাকি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে তার অবুঝ মন কোনো অলীক ভুল ছায়া দেখছে।ঈশানের এই স্তব্ধ ভাবনার মাঝেই শুভ্রা আর এক সেকেন্ডের দূরত্ব সহ্য করতে পারল না। সে সামনে এগিয়ে এসে দুহাতে ঈশানের চওড়া বুকটা জড়িয়ে ধরল। ঈশানের বুকে নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে সে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে তীব্র অভিমানী কণ্ঠে বলল।

“আপনি আপনি এত খারাপ কেন ঈশান ভাইয়া? আমাকে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে একা ফেলে এভাবে চলে যাওয়ার জঘন্য কল্পনাটা আপনি নিজের মনে কীভাবে করতে পারলেন? আপনি কি একবারও আমার কথা ভাবলেন না? এই মেয়েটা আপনাকে ছাড়া থাকবে কি করে৷ আপনি খুব ভালো করে জেনে রাখুন। আপনি যেমন এই সমাজে আমাদের ভালোবাসা হারানোর তীব্র যন্ত্রণা সইতে না পেরে এই সুন্দর পৃথিবীটা ছেড়ে চলে যেতে চান। ঠিক তেমনি। আমিও এই দুনিয়ার সব মায়া ত্যাগ করে আপনার হাতটা শক্ত করে ধরেই এই পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিতে চাই। আপনাকে ছাড়া বাঁচার কোনো ইচ্ছে আমারও নেই।”
ঈশানের বুকের ভেতর যেন এক প্রলয়ংকারী ঝড় শুরু হলো। তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে। শুভ্রা নিজের বিয়ের মণ্ডপ। পরিবার। সমাজ সবকিছু এক নিমেষে ছেড়ে দিয়ে তার খোঁজেই এভাবে মাঝরাতে ছুটে এসেছে। আর রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে বলা তার প্রতিটি গোপন কথা। তার হৃদয়ের সবটুকু আর্তনাদ শুভ্রা নিজের কানে শুনে নিয়েছে। এক চরম অপরাধবোধ আর তীব্র জেনেই হোক বা না-পাওয়ার তীব্র যন্ত্রণায়। ঈশান একদম পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে চুপ করে রইল। তার মুখ থেকে একটা শব্দও বের হলো না।

ঈশানের এই নির্মম নীরবতা দেখে শুভ্রা তার চওড়া বুক থেকে নিজের কান্নাভেজা। লোনা জলে ভেজা মুখটা তুলল। সে ঈশানের নিষ্প্রাণ চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অভিমানী গলায় বলল।
“আপনি কি এভাবেই সারাজীবন চুপ করে থাকবেন? আর একটা শব্দও কি আপনার মুখ থেকে বের হবে না? আমি চলে এসেছি ঈশান ভাইয়া আপনার কাছে চলে এসেছি নিজের সবকিছু। নিজের পরিবারকে পেছনে ফেলে। আমাদের ধর্ম আলাদা তো কী হয়েছে? আমাদের শরীরের রক্ত। আমাদের এই জীবন্ত শরীর দুটো তো আর আলাদা ধর্মের নয়। আপনি আপনার ধর্ম পালন করবেন। আর আমি আমার ধর্ম। আমরা শুধু সারাজীবন একসাথে একই ছাদের নিচে বসবাস করব। কিন্তু ধর্ম যার যার নিজের মতো পালন করব। আমাদের এই ভালোবাসার জন্য কেউ কারো ধর্ম থেকে একচুলও আলাদা হব না। কেউ কারো ধর্ম পরিবর্তন করব না।”

ঈশান তবুও কোনো উত্তর দেয় না। সে শুধু এক দৃষ্টিতে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঈশানের এই অতিমাত্রায় চুপচাপ থাকাটা শুভ্রা আর কোনোভাবেই মেনে নিতে পারল না। সে নিজের দুহাতে চোখের নোনা জলটুকু এক ঝটকায় মুছে নিল। তারপর ঈশানের বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কয়েক পা দূরে গিয়ে দাঁড়াল। তীব্র ক্ষোভ আর যন্ত্রণায় ফেটে পড়ে সে বলল।
“কেমন ভালোবাসেন আপনি আমাকে? যেই ভালোবাসা শুধু আড়ালে দাঁড়িয়ে মুখে বড় বড় ডায়লগ দিয়ে বলতে পারেন। কিন্তু সবার সামনে সেই ভালোবাসাকে সম্মান করতে জানেন না। কেমন পুরুষ আপনি যে এই ভালোবাসার জন্য নিজের জীবনটা বিসর্জন দিয়ে পৃথিবী ছাড়তে রাজি আছেন। কিন্তু সেই ভালোবাসাকে লড়াই করে নিজের করে নিতে একবিন্দু রাজি নন?”
ঈশান তবুও চুপ। তার ভেতরের সমস্ত শক্তি যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেছে। এই মুহূর্তে কোনো কথা বলার মতো বিন্দুমাত্র মানসিক শক্তি সে নিজের ভেতর খুঁজে পাচ্ছে না।
শুভ্রা এবার চরম এক জেদ আর উন্মادনা নিয়ে বলে উঠল,

“তার মানে দাঁড়াল আপনি আমার জন্য মরতে পারবেন। কিন্তু এই সমাজ আর জাত-ধর্মের দেয়াল ভেঙে আমাকে নিজের করে নিতে পারবেন না। তাহলে আপনিও খুব ভালো করে শুনে রাখুন এই পুরো পৃথিবীতে আপনি ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের হওয়ার বা অন্য কারও হাত ধরার বিন্দুমাত্র ক্ষমতা আমার এই শরীরের নেই। যদি এই জীবনে আমি আপনাকে না পাই। তবে এই অভাগা প্রাণটা নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছে আমারও নেই। আপনি থাকুন আপনি আপনার এই পচা সমাজ আর ধর্মের ভয় নিয়ে একাই বেঁচে থাকুন।”
কথাটা শেষ করতে না করতেই শুভ্রা নিজের ভারী লেহেঙ্গার কুঁচিটা এক হাতে টেনে ধরল। তারপর চোখের পলকে ব্রিজের লোহার রেলিংয়ের ওবারে উঠে দাঁড়াল। নিচের ওই অন্ধকার। অতল কালচে পানিতে সজোরে ঝাঁপ দিতে যাবে ঠিক তখনই ঈশান এক বন্য পশুর মতো চিৎকার করে উঠল।সে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে এক লাফে এগিয়ে গিয়ে শুভ্রার হাতটা শক্ত করে টেনে ধরে এক ঝটকায় তাকে রেলিং থেকে নিচে নামিয়ে আনল। আর শুভ্রা মাটিতে পা রেখে কিছু বুঝে ওঠার আগেই। ঈশান নিজের হাতের সমস্ত রাগ আর তীব্র আতঙ্ক এক করে দ্বিতীয়বারের মতো সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল শুভ্রার অন্য গালে। থাপ্পড়ের তীব্র চোটে শুভ্রার ঠোঁটের কোণ ফেটে এক ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে এলো।কিন্তু শুভ্রা সেই ব্যথায় চিৎকার করারও সুযোগ পেল না। তার অবশ হয়ে যাওয়ার আগেই ঈশান এক মরণ কামড়ের মতো শুভ্রাকে টেনে নিজের শক্ত বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। শুভ্রার পিঠে নিজের দুহাত আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে। তার গলার খাঁজে মুখ লুকিয়ে ঈশান এবার শিশুর মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার চোখের তপ্ত জল শুভ্রার কাঁধ ভিজিয়ে দিতে লাগল। যেন এই এক থাপ্পড় আর জড়িয়ে ধরার মাঝেই সে নিজের জীবনের সবটুকু অধিকার আর ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দিয়ে দিল।শুভ্রাও আর নিজের ভেতরের আবেগ আটকে রাখতে পারল না। সে নিজের দুহাতে ঈশানের চওড়া পিঠটা খামচে ধরে আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল। ঈশান তখনো বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে শুভ্রার গলার খাঁজে মুখ রেখেই অত্যন্ত ভাঙা। অবাধ্য গলায় বলতে লাগল।

“আমি পাগল হয়ে যাব শুভ্রা। তোমাকে ছাড়া এই পৃথিবীতে আমি আস্ত একটা পাগল হয়ে যাব। আমি নিজের মুখে যত বড় বড় কথাই বলি না কেন। আমার এই অবুঝ মন কোনোদিনও তোমাকে হারাতে চায় না রে। অনেক অনেক দূরে চলে যাব আমরা এই শহর ছেড়ে। এমন এক জায়গায় চলে যাব যেখানে আমাদের কেউ কোনোদিন ছুঁতে পারবে না। যেখানে জাত-ধর্মের দেয়াল তোলার মতো কোনো সমাজ থাকবে না। আর যদি চলেও আসে তেমন কোনো সমাজ তবে সেই সমাজকে আজ থেকে আর আমি বিন্দুমাত্র মানি না।”
শুভ্রাও কাঁদতে কাঁদতে ঈশানের বুকে নিজের মাথাটা আরও একটু চেপে ধরে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমিও মানি না। এই ভালোবাসার জন্য যদি পুরো পৃথিবীর সাথেও লড়তে হয়। তবে আমি একাই লড়ব। তবুও তবুও আমি কোনোদিনও আপনার এই হাতটা ছাড়ব না ঈশান ভাইয়া।”
ঈশান নিজের মুখটা শুভ্রার কাঁধ থেকে তুলে আনল। পরম মায়া আর গভীর ভালোবাসায় সে শুভ্রার কপালে নিজের ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে এক দীর্ঘ চুমু খেল। তারপর তাকে আবার নিজের বুকের মাঝে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তীব্র এক ব্যাকুলতায় বলে উঠল,

“আই লাভ ইউ শুভ্রা। আই লাভ ইউ সো মাচ।”
শুভ্রাও ঈশানের পিঠে নিজের নখ বসিয়ে দিয়ে চোখের পানি মুছে বলল,
“আই লাভ ইউ টু ঈশান ভাইয়া
আই লাভ ইউ সো মাচ।”

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭১

দুই কপোত-কপোতী যখন রাতে ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের দুনিয়ায় মগ্ন। ঠিক তখনই চারিদিকের সেই সুনসান নীরবতা আর রোমান্টিক আবহকে এক নিমেষে চুরমার করে দিয়ে পেছন থেকে কারো অত্যন্ত গম্ভীর। কর্কশ ও পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“বাহ্। পিরিত দেখি একদম উতলিয়ে পড়ছে। হিন্দু-মুসলিমের প্রেম ফ্যান্টাস্টিক।”

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here