Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২০
ইসরাত জাহান দ্যুতি

অনবরত মেসেজ করে যাচ্ছে তামান্নাকে রাতুল৷ শেষ কিছুদিনে তুষারকে এড়িয়ে গিয়ে তামান্না রাতুলের সাথে খুব বেশি কথা বলেছিল ফেসবুকে৷ কিন্তু গতকাল থেকে সে রাতুলকেও তুষারের মতোই এড়িয়ে যাচ্ছে। তামান্না ততক্ষণ অবধি সেই পুরুষের সাথে সাগ্রহে কথা বলে, যতক্ষণ সেই পুরুষটি অনাগ্রহী থাকে ওর প্রতি। যখনই পুরুষটি ভীষণ আগ্রহী পড়ে ওর জন্য, তখনই তামান্নার আগ্রহ ফুরিয়ে যায় তার জন্য। নাওফিলের বন্ধুমহলের সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে ওর মধ্যে এই দুষ্টু চিন্তাটা চেপে বসেছে। নাওফিল, রুমান আর শিহাব ব্যতিত বাকি সকলকেই সে ফ্লার্ট করবে। রাতুলের পর পরবর্তী লক্ষ্য সবুজ। আর একদম শেষে দীপ্ত৷ এই ছেলেটার জন্য একটু প্রস্তুতি প্রয়োজন। তামান্নার বিশ্বাস, দীপ্ত গভীর পানির মাছ। সতটা সহজভাবে ছেলেটা সবার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করে, আদতে ছেলেটার মাঝে বহুত প্যাচ৷ এই পরিকল্পনা একটা মিশনও বটে ওর জন্য।

দীধিতি ছাদ থেকে আসার পর অলসতায় বিছানাতে পড়েই গড়াগড়ি দিচ্ছে শুধু। তামান্না সকালের নাশতা তৈরি করছে৷ ওর ফোনটা সেই তখন থেকে টুংটাং টুংটাং আওয়াজ করে যাচ্ছে বলে খুব বিরক্ত হচ্ছে দীধিতি। পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে রাতুলের প্রত্যেকটি মেসেজ সিন করে ফোনটা মিউট করে রাখল শেষমেশ।
-‘তোর কি মনে হয় নাওফিল আর নাওফিলের প্রত্যেকটা দোস্ত নাদান বাচ্চার মতো?’
-‘উহুঁ, একদমই না। প্রত্যেকটাই শেয়ানার বাচ্চা।’ শুকনো মরিচ ফ্রাই প্যানে ভাজতে ভাজতেই জবাব দিলো তামান্না।

-‘আমি চাই না আমার জন্য তুই কোনো ভেজালে জড়া। শিহাব তন্বীকে মন থেকে ভালোবাসে বলেই আমি তন্বীকে সাপোর্ট দিয়েছি। তুই যদি তুষারকে বা রাতুলকে মন থেকে চাস, নিদ্বিধায় আমাকে জানাস।’
প্যান থেকে মরিচগুলো নামিয়ে এবার বাটিতে গুলে রাখা ডিমটা প্যানে ছেড়ে দিয়ে দীধিতির কাছে আসলো তামান্না৷ সুক্ষ্ম হাসি ঠোঁটে টেনে বলল, ‘সত্যি বলতে আমার আর তন্বীর টেস্ট একই। শুরুতে আমার নজর গেঁথেছিল শিহাবের প্রতি। কিন্তু তন্বীকেও ওর দিকে ঝুঁকতে দেখে আমি নিজেকে সামলাই। এখন অবধি ভালো লাগা আর কারও প্রতি তৈরি হয়নি। আমি চাইও না নাওফিলের আর কোনো বন্ধুর প্রতি আমার ফিলিংস তৈরি হোক। আমি কথা দিয়ে কথা রাখা মানুষ, দীধি। আমাকে বিশ্বাস না করতে পারলে সরাসরি জানিয়ে দিবি। কিন্তু আকারে ইঙ্গিতে বোঝাবি না বা ইগনোর করবি না। তুই ধরে রাখ, নাওফিলের আর কোনো বন্ধুই আমাকে মন থেকে চাইবে না। দুই বন্ধুর সঙ্গে ফ্লার্টিং করছি, মজা নিচ্ছি। তা কি ওরা একজন আরেকজনের সাথে শেয়ার করবে না বলে তোর মনে হয়? হয় ওরাও আমাকে সন্দেহের তালিকাতে রেখেছে, নয়ত শুধুই মজা নিচ্ছে ওরাও আমার মতো।’
শোয়া থেকে উঠে বসল দীধিতি, চিন্তাশীল মুখ করে জিজ্ঞেস করল তামান্নাকে, ‘আমাকে, তোকে কি সত্যিই সন্দেহ করছে ওরা?’

-‘কী জানি? চোরের মন পুলিশ পুলিশ বলে না? আমরা চুরি করছি বলে মনে হচ্ছে হয়ত ওরা আমাদের সন্দেহ করছে। এমনটা নাও হতে পারে। তবে মিসেস বিদেশীনি, আপনাকে ভালোভাবে দেখলে যে কেউ এখন ধরে ফেলবে আপনার নকল কালো রঙের চুলের আড়ালে ঢেকে থাকা আসল সোনালী চুলের রহস্য। আবার চোখেও কালো লেন্সজোড়া খুলে রেখে সিন্ধু নীল মনিদুটো উন্মোচন করে রেখেছেন। গতকাল তো চুল কালার করতে যেয়েও করলি না। আজ তো করা মাস্ট জরুরি। কালার কিন্তু উঠে যাচ্ছে চুলের।’
দীধিতি তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। কানের পাশে কয়েকটা চুলে সত্যিই কালো রংটা চলে গিয়ে সোনালী রং ভেসে উঠেছে। তাওসিফ ভোরবেলা লক্ষ করেনি তো!
-‘ইস! কাল বাসায় ফিরে তো খেয়ালই করিনি। তাওসিফ শেখ আবার খেয়াল করেনি তো! মহা চিন্তাই পড়লাম ভাই!’

-‘আরে খেয়াল করলেই বা কী? ভাববে চুল পেকে যাচ্ছে। আজ-কাল চুলে যখন তখন পাক ধরে না! তাছাড়া ভালো লাগলেও বা খারাপ লাগলেও সে এখন তোর বর।’
দীধিতি চোখের মনিতে কালো লেন্সটা পরে নিতে নিতে হাসে, ‘আমরা যাকে যে রূপে দেখছি সে কি সত্যিই সে রূপের? আমার কেন যেন তাওসিফ শেখকেও সন্দেহ হয়। জাকির শেখ গরম মস্তিষ্কে হলেও আমার উদ্দেশ্য কিন্তু ঠিকই ধরেছেন। তাওসিফ কি এতটাই উদার আর বোকা যে, সামান্য অপরাধবোধ আর আমাকে সেফটি দিতে সোজা বিয়েই করে নেবে? আমার দেখা দুনিয়াতে এত ভালো মানুষ আছে? তোকে বললাম না, কোর্ট ম্যারেজের কাগজ রেডির সময় আমি কিন্তু লেডি কনস্টেবলদের কেয়ারে ছিলাম। ওই মুহূর্তে সতর্ক দৃষ্টিতে কাগজ আসল না নকল তা খেয়াল করেছি অবশ্য। আসলই মনে হয়েছে। তাও আমার সন্দেহ লেগেছে। সব সময় তো চোখের দেখা সত্যি হয় না। আমি তাওসিফ শেখকেও ভালো মানুষ করি না। আর বিশ্বাসও না।’
ডিম ভাজিও করা শেষ তামান্নার৷ শুকনো মরিচের আলু ভর্তা, ডাল আর ডিম ভাজি সাজিয়ে গুছিয়ে বসে গেছে সে খেতে। ‘বিয়ে নকল হোক আর আসল। শেখ পরিবারের নাতবউ হিসেবে তুই স্বীকৃতি পাচ্ছিস কি না সেটাই আসল কথা, তাই না?’

-‘হুঁ, তাওসিফ কোনো ডাবল গেম খেললে আমার উদ্দেশ্য পূরণ করা মুশকিল হবে রে। ওই বাড়িতে আমি সম্পূর্ণ একা। পারব কি না লক্ষ্যে পৌঁছতে কে জানে!’
-‘আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ। আয় খেতে বস। খাবার বেড়েছি।’
চুলগুলো খোঁপা করে বিছানাতে এসে বসল খাবারের প্লেটটা নিয়ে, খেতে খেতে বলল, ‘আমি তোকে অবিশ্বাস করিনি আর করতে চাইও না৷ আমার লক্ষ্যে পৌঁছনোর সাথী তুই আর জাইমা আন্টিই। তোদের অবিশ্বাস করলে আমি কখনই সফল হবো না। এখন আমাকে প্রিপারেশন নিতে হবে শেখ পরিবারের বউ হওয়ার জন্য। খুব দ্রুতই তাওসিফকে বলব ওর বাড়িতে নেওয়ার জন্য।’
-‘তাহলে আজকে থেকেই অভ্যাস কর পর্দানশীল বউ হওয়ার, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার। ওখানে গিয়ে এই দুটো কাজ তো তোকে করতেই হবে।’

খাওয়া থামিয়ে দীধিতি কিছুক্ষণ মৌন রইল, তারপর শান্ত চোখে চেয়ে তামান্নাকে বলল, ‘আমি এর উলটো করব ওখানে। আমি তাদের মনের কাছাকাছি পৌঁছতে চাই না। আমি আমার বায়োলজিকাল প্যারেন্টসের হদিস জানতে চাই শুধু। আদতে আমি কে, আমার ধর্ম কী, এসব না জানা অবধি ইমানদার নারী হওয়ার নাটকটা করতে চাই না। আজও আমি মন থেকে মুসলিম ধর্ম পালন করতে পারিনি, তামান্না। কথাটা খারাপ শোনাল জানি। কিন্তু আমি সত্যি বহুবার প্রার্থনা করেছি অন্তত মন থেকে আল্লাহকে ডাকতে। কিন্তু বারবার কষ্ট আর অভিমানে আমার হৃদয় আল্লাহকে ডাকতে নারাজ। অভিনয় করতে গিয়ে অসম্মান করতে চাই না ইসলামকে। যেদিন নিজের সঠিক পরিচয় জানতে পারব সেদিনই আল্লাহকে ডাকব।’
তামান্নার খুব রাগ হলো দীধিতির এমন স্বীকারোক্তিতে, ‘তোকে আমি আগেও বলেছি আর এখনও বলছি। আল্লাহকে ভরসা করতে শেখ৷ না করলে তিনি কেন তোর চাওয়া পূরণ করবেন বল? তবে এটাও ঠিক, মন থেকে তাঁর ইবাদত করতে না পারলে অভিনয়ও করিস না৷ তোকে বোঝার পূর্ণ জ্ঞান দিয়েছেন আল্লাহ৷ তারপরও এ ধরনের হতাশার বাণী শুনতে রাগ লাগছে।’

চোখদু’টো জলে ভরে উঠল দীধিতির, খাবার প্লেটে ভাত নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, ‘আমার শৈশবটা কেমন কেটেছে তা তো জানিসই। বাঙালিদের মতো দেখতে না বলে নিজের অধিক উজ্জ্বল ত্বক, নীল চোখ আর সোনালী চুলের জন্য স্কুলের সহপাঠীরা, পাড়ার বাচ্চারা, সবাই আমাকে এড়িয়ে যেত। আমি দেখতে কেন বিদেশীদের মতো? এই প্রশ্নে প্রতিটি মানুষ আম্মুকে জর্জরিত করে ফেলত, তিক্ত করে ফেলত। আর তার প্রভাব পড়ত আমার ওপর। আব্বুর সঙ্গে প্রায়ই ঝামেলা করত আমাকে নিয়ে, আমাকে যেন অন্য কোথাও রেখে আসা হয়৷ কারণ, আমার জন্য মানুষের চোখে সন্দেহের কারণ হচ্ছে তারা। মিথ্যা বলেও কিছু কিছু লোককে বিশ্বাস করানো যেত না আমার চেহারার সাথে তো তাদের কোনো কিছুই মিলত বলে। আবার আমার জন্ম পরিচয়ও আম্মু জানত না, আব্বু জানায়নি কোনোদিন তাকে। তাই আম্মুর মনে হত হয়ত আমি আব্বুর কোনো অবৈধ সন্তান। আব্বু একবার আম্মুর সঙ্গে এসব নিয়ে রাগারাগি করে আমাকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়েও গিয়েছিল। আমাকে মেনে নিতে অনেক বছর সময় লেগেছে আম্মুর। ক্লাস ফোরে ওঠার পর আব্বু যশোরের মধ্যেই বাসা অন্যত্র নেয়। নতুন স্কুলে আমাকে ভর্তি করে। আর তখন থেকেই আমার চুলের রং বদলে দেয় আম্মু, ডাক্তারের থেকে পরামর্শ নিয়ে চোখে কালো লেন্সও পরিয়ে দেয়। তখন ছোটো ছিলাম। লেন্স ব্যবহার করতে খুব কষ্ট হত৷ তবুও করতে হয়েছে মানুষের প্রশ্নের মুখ থেকে বাঁচতে, আমাকে অন্যসব বাঙালিদের মতো হতে। আমার শৈশবটা এতটা করুণ না করলেও পারতেন আল্লাহ৷ এইচএসসি পাস করার পর যখন জানতে পারলাম আমি ঝুমুর আর রেজা হকের সন্তানই না। তখন আমার কেমন লেগেছিল তা কেউ জানে না।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৯

জাইমা আন্টির সঙ্গে যোগাযোগটা ছিল বলেই এই সত্যটা জানতে পারলাম। নয়ত সারাজীবন অন্ধকারেই থাকতাম, তাই না? আমার সঙ্গে কেন আল্লাহ এমন করলেন? আমার কি অভিযোগ থাকা তাহলে সাজে না? অভিমান তাহলে হবে না, বল?’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here