Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২১

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২১

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২১
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো ইখতিয়ার।
‎জুম্মার পাঞ্জাবিটা খুলে সে বাড়ির আরামদায়ক পোশাক পরে নিয়েছে। ভেজা হাত তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। তার মুখে কোনো বিশেষ অভিব্যক্তি নেই। তবে মনের ভেতরে কোথাও একটা অদ্ভুত অপেক্ষা কাজ করছে। খুব ছোট্ট একটা অপেক্ষা।
‎যেমন কেউ গোপনে একটা বীজ মাটিতে পুঁতে রেখে পরদিন ভোরে উঠে দেখতে চায়, সেখানে অঙ্কুর ফুটেছে কি না। ঠিক তেমনিই কৌতুহলী অপেক্ষা।
‎ঘরে ঢুকেই তার দৃষ্টি বিছানার ওপর গিয়ে আটকাল।

‎সে থেমে গেল। একেবারেই থেমে গেল।
‎বিছানার মাঝখানে সাদা রুমালটা পড়ে আছে।
‎রুমালের ভাঁজও খোলা হয়নি ঠিকমতো, এমন ভাবে রাখা। ইখতিয়ারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
‎ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সে। পায়ের শব্দগুলোও যেন কেমন ভারী হয়ে উঠল। হাত বাড়িয়ে রুমালটা তুলে নিল। ভেতরে এখনও সেই জিলাপিগুলো রয়েছে। যেভাবে সে রেখে গিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই। একটাও কমেনি। একটাও না।
‎মুহূর্তেই বুকের ভেতর কোথায় যেন চিনচিন করে উঠল ইখতিয়ারের। অদ্ভুত এক অনুভূতি।
‎যেন কেউ খুব যত্ন করে গড়ে তোলা কাঁচের একটা ছোট্ট ঘর হঠাৎ আঙুলের ছোঁয়ায় ভেঙে দিয়েছে।
‎সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখদুটো রুমালের ওপর নিবদ্ধ।
‎তার মনে পড়ে গেল মসজিদের সেই মুহূর্তটা।
‎সবাই যখন জিলাপি নিচ্ছিল, সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। নিজের জন্য নয়। কোনোদিনই নেয় না সে।
‎কিন্তু আজ…

‎আজ কেন যেন হাত বাড়িয়ে নিয়েছিল। আলাদা করে রেখে দিয়েছিল পকেটে। খুব সাবধানে।যত্ন করে। কেবল একটা মানুষকে দেওয়ার জন্য।
‎আর সেই মানুষটা ছুঁয়েও দেখল না। ইখতিয়ারের ঠোঁট শক্ত হয়ে এলো।
‎মুখের রঙ বদলে গেল। ধরা দিল অসাহয়ত্ব ।
‎চোখ বুঝে নিল সে। মুহুর্তেই ভেতরে কোথাও যেন একটা দীর্ঘশ্বাস জমে রইল। কিছু কিছু কষ্ট আছে, যেগুলো চিৎকার করে প্রকাশ করা যায় না।
‎শুধু নীরবে বুকে বিঁধে থাকে। কাঁটার মতো।
‎দেখা যায় না, কিন্তু অদৃশ্য রক্ত ঝরায়।
‎হঠাৎ ঘরের ভেতরটা অসহ্য লাগতে শুরু করল তার। সে রুমালটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে বিকেলের আলো নরম হয়ে এসেছে। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। সোনালি আলো ছড়িয়ে আছে বাড়ির সামনের পথজুড়ে।

‎ইখতিয়ারের চোখ থেমে গেল। মুগ্ধা চলে যাচ্ছে।
‎ধীর পায়ে হাঁটছে সে। তার ওড়নার একপ্রান্ত বাতাসে উড়ছে। পাশে ইশতিয়াক।
‎হাতে মোটরসাইকেলের চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে কিছু একটা বলছে। সম্ভবত মুগ্ধাকে পৌঁছে দিতে যাচ্ছে।
‎দূর থেকে তাদের দুজনকে দেখতে লাগল ইখতিয়ার।তার বুকের ভেতর হঠাৎ একটা তাগিদ উঠল। ইচ্ছে হলো ডাক দিতে।
‎বলতে ইশতিয়াকে, সাবধানে নিয়ে যেতে। রাস্তায় খেয়াল রাখতে। ও ঠিকমতো পৌঁছেছে কিনা আমাকে জানাতে।
‎কিন্তু শব্দগুলো গলা পর্যন্ত এসেও আর বের হলো না। অদৃশ্য কোনো শক্তি এসে যেন তার ঠোঁট সেলাই করে দিল। সে শুধু দাঁড়িয়ে রইল।
‎নীরবে। অসহায় হয়ে।
‎মুগ্ধা এক ফাঁকে তাকালো তার ঘরের ব্যালকনিতে ।
‎ ইখতিয়ারের উপস্থিতি সে অনেক আগেই টের পেয়েছে। হাতের মুঠো খুললো মুগ্ধা। জিপালাপির ছোট একটা অংশ । হালকা মুচকি হেসে গালে দিলো মুগ্ধা। ইখতিয়ারের তাকিয়ে বিরবরাল,
‎”এত ভালোবাসার জিনিস দূরে ঠেলব এত সাহস আমার কোনদিনও না হোক ইখতিয়ার সাহেব”
‎ইখতিয়ার কি শুনল? না, সে রইল তার বিষাদ নিয়ে। তার একাকিত্বঘরে একাকিত্বের মোহে।

‎একটা একটা করে দিন কেটে যাচ্ছে।
‎ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো বদলাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ইখতিয়ারের কাছে প্রতিটা দিন যেন একই রঙে রাঙানো—ধূসর, ক্লান্ত, বিষণ্ন।
‎সকালের সূর্য ওঠে, সন্ধ্যায় ডুবে যায়। মানুষ হাসে, কথা বলে, জীবন এগিয়ে চলে চিরবেগে। শুধু তার ভেতরে কোথাও সময় যেন আটকে গেছে স্থীরতায়।
‎এই কদিনে সে কম চেষ্টা করেনি। কখনো ফোন করেছে, কখনো বার্তা পাঠিয়েছে। কখনো অকারণে মুগ্ধার খোঁজ নিয়েছে পরিচিত মানুষের কাছ থেকে। কখনো আবার নিজের ইন্ট্রোভার্ট সত্তা গিলে ফেলেও তার সামনে দাঁড়িয়েছে।
‎কিন্তু ফলাফল? শূন্য। মুগ্ধা এখনও একই রকম।
‎শীতের কুয়াশায় ঢাকা কোনো পাহাড়ের মতো।
‎দেখা যায়, তবে ছোঁয়া যায় না। যতই কাছে যেতে চাও, ততই দূরে সরে যায়। আজ ইখতিয়ারের ধৈর্যের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
‎মানুষের সহ্যেরও তো একটা সীমা থাকে। অবশেষে সে সিদ্ধান্ত নিল। আজ কথা বলবেই। যেভাবেই হোক।

‎দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার মুখ। কলেজ ক্যাম্পাস তখন ছাত্রছাত্রীদের কোলাহলে মুখর। সব মিলিয়ে জীবন্ত একটা পৃথিবী। সেই ভিড়ের মাঝেই ইখতিয়ার দাঁড়িয়ে আছে। সাদা-কালো চেক শার্ট, কালো ঘড়ি, গম্ভীর মুখ। তার উপস্থিতি এমনিতেই দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো।
‎অনেকেই কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। তার চোখ শুধু একজনকেই খুঁজছে। মুগ্ধা।
‎অবশেষে তাকে দেখতে পেল ইখতিয়ার। কলেজ ভবনের সামনের পথ ধরে হাঁটছে মুগ্ধা। হাতে বই।
‎মুখে স্বাভাবিক নির্লিপ্ততা।
‎যেন পৃথিবীর কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। ইখতিয়ারের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন হয়ে গেল যেন। সে দ্রুত এগিয়ে গেল। মুগ্ধা প্রথমে খেয়াল করেনি। খেয়াল করার আগেই ইখতিয়ার তার সামনে এসে দাঁড়াল। মুগ্ধা থমকে গেল।
‎চোখে বিরক্তি ফুটে উঠল মুহূর্তেই।
‎”আপনি এখানে?”

‎শীতল স্বর। বরফের মতো ঠান্ডা। মুগ্ধা যেন ইখতিয়ারের চরিত্রের প্রতিচ্ছবি । ইখতিয়ার কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার কব্জিটা ধরে ফেলল।
‎মুগ্ধা বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকাল। আশেপাশে তাকালো সে।
‎”ছাড়ুন!”
‎কিন্তু ইখতিয়ার আজ থামার মানুষ নয়। সে কোনো কথা না বলে তাকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল।ক্যাম্পাসের কোলাহল পেছনে পড়ে গেল।
‎তারা এসে থামল পুরনো লাইব্রেরি ভবনের পেছনের নির্জন অংশে। এইসব স্থানে সচরাচর মানুষজন খুব একটা আসে না।

‎বড় বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ মাথার ওপর ছায়া বিস্তার করে আছে। বাতাসে শুকনো পাতার গন্ধ।
‎দূরে ভেসে আসছে ছাত্রছাত্রীদের অস্পষ্ট শব্দ।
‎মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে হাত ছাড়িয়ে নিল। চোখে রাগ।
‎”এভাবে টেনে আনার মানে কী?”

‎ইখতিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।তারপর ধীরে ধীরে মুগ্ধার দিকে তাকাল। সেই চোখদুটো আজ অদ্ভুত। ক্লান্ত,ভীষণ ক্লান্ত। যেন দীর্ঘ খরার পরে শুকিয়ে যাওয়া কোনো নদী। কযেখানে আর স্রোত ইখতিয়ার হালকা হাসল। সেই হাসিতে আনন্দের ছিটেফোঁটা নেই। আছে পরাজয়ের বিস্বাদসম যন্ত্রণা। বুকভাঙা ক্লান্তি। সে গভীর শ্বাস নিল।
‎মনে হলো বুকের ভেতরে জমে থাকা শত শত অব্যক্ত শব্দ একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
‎তারপর ধীরে, খুব ধীরে বলল—
‎”আমি কিছু বলতে চাই, মুগ্ধা।”
‎মুগ্ধা কিছু বলল না। বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকল।যাবে। ইখতিয়ার পেছনে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসল। ধূলো উড়িয়ে নিলো মুহুর্তে। মুগ্ধা ও বসল। তবে ব্যবধান রেখে।

‎ইখতিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখ তখন সামনে নয়, বহু বছর পেছনে। এমন এক সময়ে, যেখানে স্মৃতিগুলো আজও ধুলো জমা পুরোনো ডায়েরির পাতার মতো রয়ে গেছে। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে, কিন্তু লেখা মুছে যায়নি। ধীরে ধীরে সে বলতে শুরু করল,
‎”জানো মুগ্ধা, ছোটবেলায় আমি এমন ছিলাম না।
‎অন্তত পুরোপুরি না। জানো আমার একটা বন্ধু ছিল। একজনই। শুধু একজন।”

‎পুরানো কথা মনে পড়তেই ইখতিিয়ারের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। থামল কিছুক্ষণ। আবার বলা শুরু করলো,
‎”সারা পৃথিবীর ভিড়ে যার কাছে আমি নিজের মতো করে থাকতে পারতাম। যার সামনে কথা বলতে গিয়ে শব্দ খুঁজতে হতো না। যার সঙ্গে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারতাম কোনো ক্লান্তি ছাড়া। বন্ধুত্বটা ছিল ঠিক বর্ষার প্রথম বৃষ্টির মতো নির্মল। নিঃস্বার্থ।
‎।
‎স্কুলের টিফিন ভাগাভাগি করে খাওয়া, মাঠে একসঙ্গে দৌড়ানো, ক্লাসে একে অপরের খাতা দেখা, পরীক্ষার আগে ভয় পাওয়া—সবকিছুর মাঝখানে ছেলেটা ছিল।
‎আমার ছোট পৃথিবীটায় আর কাউকে দরকার হতো না। ওর সাথে বন্ধুত্ব করেই ভালো যাচ্ছিল।
‎কিন্তু মানুষ তো আর জানে না, কোন দিনটা শেষ দিন। কোন সম্পর্কের শেষ কোথায়? একদিন ছেলেটা স্কুলে এলো না। প্রথমে ভাবলাম, অসুস্থ হয়েছে। পরদিনও এলো না। তারপর আরও একদিন,আরও একদিন।
‎দিনগুলো জমতে লাগল। অপেক্ষাও।
‎তখনকার দিনে মোবাইল ফোন সবার হাতে হাতে ছিল না। তার কোনো নম্বর আমার কাছেও ছিল না।
‎আর আব্বু-আম্মু ছিলেন খুব কড়া। স্কুল আর বাড়ি। এই ছিল আমার পৃথিবী।
‎কোথাও যাওয়া চলবে না। কাউকে খুঁজতে বের হওয়া বাড়িতে বলাই তো দুঃস্বপ্ন। অপেক্ষা ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না। তাই শুধু অপেক্ষাই করলাম। জানো, অভিমান করলাম খুব।
‎রাগও করলাম। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, ফিরে এলে আর কথা বলব না। একদম না। পায়ে ধরলেও না। ছোট্ট আমিটা জেদ ধরে রইল।
‎যে এভাবে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখার কী দরকার? ছোট্ট হৃদয়ের ছোট্ট অভিমান।
‎কিন্তু কিছুদিন পর যে খবরটা এল, সেটা আমার জীবনের দুর্বিসহ হয়ে এলো। একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল। ভয়াবহ।
‎আর ছেলেটা…
‎ফিরবে না। কখনো না।”

‎ইখতিয়ার থেমে গেল।
‎তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো।বুকের ভেতর বহু বছরের পুরোনো ব্যথা যেন আবার নড়ে উঠল। মুগ্ধা কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখেও ইখতিয়ারসম পানি। ইখতিয়ার দূরের আকাশে তাকালো আবার বলল,
‎”জানো মুগ্ধা, আমি তখন এত ছোট ছিলাম যে মৃত্যু শব্দটার গভীরতা পুরো বুঝতামই না। কিন্তু একটা জিনিস বুঝেছিলাম। আমি আর কোনোদিন আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুটাকে দেখব না ।কোনোদিন না। প্রথম প্রথম বিশ্বাসই করতে পারিনি।
‎প্রতিদিন স্কুলে যেতাম। মনে হতো, হয়তো আজ আসবে। হয়তো সবাই ভুল বলছে।
‎হয়তো ক্লাসরুমের দরজা খুলে হেসে হেসে ঢুকে পড়বে। কিন্তু দরজাটা খুলত। মানুষও ঢুকত।
‎শিক্ষক ঢুকতেন। কত কত শিক্ষার্থী ঢুকত। শুধু সে ঢুকত না।
‎সেই বয়সে ট্রমা শব্দটার সাথে আমার পরিচয় ছিল না । কিন্তু ট্রমা আমাকে চিনে নিয়েছিল। রাতে ঘুম ভেঙে যেত। বন্ধুর কথা মনে পড়ত। হাসির কথা মনে পড়ত। ঝগড়ার কথা মনে পড়ত।
‎একজন সাধারণ ইন্ট্রোভার্ট ছেলেটার জীবনে বন্ধুত্ব শব্দটা খুব আবেগি। সহজে কারো সাথে মিশতে না পারা ছেলেটার যখন একজন বন্ধু হয়,সে খুব স্পেশাল হয়। রক্তে মিশে যায় সে। সেই দিনগুলো আমার খুব কঠিন হয়ে উঠতো।
‎আর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা তৈরি হতো।
‎যেন আমার ছোট্ট পৃথিবী থেকে কেউ সূর্যটাকে তুলে নিয়ে গেছে। সবকিছু আছে।
‎কিন্তু আলো নেই। এই সুন্দর পৃথিবী থেকেও যেন আমি দেখতে পারছি না। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় কি ছিল বলতো? কাউকে কিছু বলতে পারতাম না।

‎ধীরে ধীরে পড়াশোনায় প্রভাব পড়তে শুরু করল।
‎যে ছেলেটা সবসময় প্রথম হতো, সে পিছিয়ে যেতে লাগল। একটু একটু করে রেজাল্ট খারাপ হতে লাগল। আর বাড়িতে শুরু হলো চাপ,বকাঝকা, তুলনা,হতাশা।
‎আমার আব্বা আমাকে ভালোবাসতেন। খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা সবসময় কোমল হয় না।অনেক সময় সেটা কঠোর হয়ে আসে। তখন আমার মনে হতো, কেউ আমাকে বুঝছে না। একদম না। নিজেই নিজেকে বোঝাতে পারতাম না। অন্যরা কীভাবে বুঝবে?
‎তবু সময় বড় অদ্ভুত জিনিস।
‎ভাঙা হাড় যেমন একসময় জোড়া লাগে, তেমনি ভাঙা মনও কোনো না কোনোভাবে বাঁচতে শিখে যায়। আমি ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নিলাম।
‎আবার পড়াশোনায় মন দিলাম। আবার সামনে হাঁটতে শুরু করল।
‎কিন্তু আগের মানুষটা আর ফিরল না। কোথাও যেন হারিয়ে গেল। সেই প্রাণবন্ত ছেলেটার জায়গায় জন্ম নিল এক চুপচাপ মানুষ। শান্ত,গম্ভীর।
‎নিজের ভেতর গুটিয়ে থাকা।
‎এরপর সে আর কাউকে বন্ধু বানাতে পারল না।
‎চাইলও না। কারণ তার মনে হতো, কাছের মানুষ একদিন না একদিন হারিয়েই যায়। তাই দূরে থাকাই ভালো।”

‎ইখতিয়ার আবারো থামল। ঠোঁটে তার তাচ্ছিল্য হাসি। চোখ অস্বাভাবিক লাল। গাল তো কখনই ভিজে গেছে। দৃষ্টি এখনো দূরাকাশে। ঠোঁট আবার নড়ল তার। বলতে শুরু করল,
‎”প্রাইমারি শেষ হলো।
‎হাইস্কুলে উঠলাম। চারপাশে প্রচুর মানুষ ছিল। কিন্তু নিজের মানুষ ছিল না। করিডোর ভরা ছাত্রছাত্রী।
‎তবু আমি একা। মাঠ ভরা কোলাহল। তবু স্থীরতার প্রতিক হয়ে রয়ে গেলাম। যেন মানুষের ভিড়ে হাঁটতে থাকা একটা নিঃসঙ্গ ছায়া।
‎আমার চুপচাপ স্বভাবের কারণে কেউ খুব একটা কাছে আসত না।
‎কেউ হয়তো ভাবত অহংকারী। কেউ হয়তো ভাবত উদাসীন। আসলে আমি শুধু ভয় পেতাম। আবার কাউকে হারানোর ভয়।

‎এরপর কলেজ জীবন এলো। আর সেখানেই বহুদিন পর প্রথমবারের মতো একটা বন্ধুমহল পেলাম।তৃষা ছিল সেই দলেরই একজন। আরও কয়েকজন ছিল। তারা খুব অদ্ভুত মানুষ ছিল।
‎তারা আমাকে বদলানোর চেষ্টা করেনি। আমার নীরবতাকে অপমান করেনি। বরং সেই নীরবতাসহ আমাকে গ্রহণ করেছিল। আমি খুব কম কথা বলতাম। তারা তবু পাশে বসত।
‎আমি আড্ডা দিতাম না। শুধু তাদের আড্ডা শুনতাম। তারা তবু ডাকত।
‎প্রথমবারের মতো আমার মনে হয়েছিল—হয়তো পৃথিবীতে এখনও কিছু মানুষ আছে, যারা বিনা শর্তে পাশে থাকে। সেই দিনগুলো সুন্দর ছিল।
‎খুব সুন্দর।দীর্ঘ খরার পর হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির মতো। কিন্তু সুন্দর জিনিসের আয়ু যে বড় কম।

‎কলেজ শেষ হলো। সবাই ছড়িয়ে গেলাম।কেউ মেডিকেলে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেউ বা অন্য শহরে।সবাই নিজের জীবনের পেছনে ছুটতে শুরু করল। আর আমি?
‎আমি আবার একা হয়ে গেলাম। ঠিক আগের মতো।যেন একবার ফুটে ওঠা বাগান হঠাৎ ঝরে গেছে। ফুলগুলো নেই। শুধু খালি ডালপালা রয়ে গেছে।
‎এরপর শুরু হলো আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন।
‎প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া অনেকের কাছে স্বপ্ন ছিল।
‎আমার কাছেও ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের ভেতরেও এক ধরনের নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে ছিল।
‎বিশাল ক্যাম্পাস।
‎হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। নতুন পরিবেশ। নতুন জীবন। তবু প্রথম দিন থেকেই আমার কেমন জানি মনে হয়েছিল, আমি এখানে অতিথি।
‎অন্য সবাই যেন কোথাও না কোথাও যুক্ত। শুধু আমিই বিচ্ছিন্ন।
‎দিনগুলো এমনভাবে কাটতে লাগল, যেন কেউ একই পৃষ্ঠার ফটোকপি বারবার ছাপাচ্ছে।
‎একই রুটিন। একই একাকীত্ব।
‎বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ছাদে দাঁড়িয়ে আমি প্রায়ই নিচের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।দেখতাম বন্ধুরা একসঙ্গে হাঁটছে। কেউ চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে তো কেউ গল্পে মাতোয়ারা।আবার কেউ হাসিতে ঝড় তুলছে।
‎আর আমি?
‎আমি ছিলাম দর্শক। সবসময়ের একানিষ্ঠ দর্শক।

‎দুই বছর কেটে গেল।একটা নয়। দুইটা দীর্ঘ বছর।
‎সময়ের নদী বয়ে চলল।
‎মানুষ এলো, গেল। কিন্তু আমার জীবন একই রকম রয়ে গেল। একলা। যেন কুয়াশায় ঢাকা কোনো স্টেশন। যেখানে ট্রেন আসে , যায়। শুধু একজন যাত্রী চুপচাপ বসে থাকে। অপেক্ষায়।
‎কিসের অপেক্ষা, সে নিজেও জানে না…”

‎ইখতিয়ার থামল। গালবেয়ে পরা অশ্রুগুলো শুকিয়ে গেছে। এখনো এদিকটা নিরব। তেমন কেউ এদিকে নেই। তবে বিকাল হয়ে গেছে। দুজনের কারো খেয়াল নেই। মুগ্ধার চোখে পানি গড়াচ্ছে। প্রিয় মানুষের কষ্ট কে বা সহ্য করতে পারে? তা প্রিয় মানুষটির জীবনে এত নিঃসঙ্গতা?
‎মুগ্ধা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইখতিয়ারের পানে। তবে ইখতিয়ারের দৃষ্টি এখনো আকাশের থেমে আছে। পলক পড়ছে খুব ধীরে। ইখতিয়ার নিজের এক হাত দিয়ে আরেক হাত মুঠো করে ধরল ‌। খুব শক্ত করে। যেন নিজেকে নিজে ভরসা দিচ্ছে। ইখতিয়ার আবার নিজ কাহিনী আওড়াতে থাকল। উকড়ে দিলো নিজের সব কষ্ট,বেদনা। বলল,

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২০

‎”জানো মুগ্ধা , আর তারপরই আমার জীবনের সেই দীর্ঘ নীরবতার ভেতর একদিন হঠাৎ করে একজন এসে পড়ল। একজন এন্জেল।
‎যে নিজেই ছিল একটা ঝলমলে বিকেল।
‎চঞ্চল, প্রাণবন্ত হাসিখুশি। তার নামের মতোই সুন্দর।”
‎একটু থামল ইখতিয়ার। এবার থেমে থেমে আওড়ালো,
‎”মুনতাহা…সিদরাতুল মুনতাহা”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here