হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৮
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
ইয়াসমিন বেগম ছেলের ক্ষতস্থানে আলতো হাত বুলান। ভাঙা কণ্ঠে বলেন,
“ এসব কীভাবে হয়েছে? আগে এই ক্ষত গুলোতে একটু…….”
“ ওসব পরে, এখন যেটা বললাম সেটা করো। ”
মায়ের উদ্বিগ্ন সত্তা আরো কিছু বলতে চায় তবে থেমে যায় ছেলের কাতর কণ্ঠে,
“ আমার মেডিসিন নয় ওঁকে লাগবে আম্মু….. প্লিজ! ”
তার ভিতরের সব অস্থিরতা যেন কণ্ঠেই ফুটে উঠছে। সকলেই এবার যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়। নাছিমা বেগম ইয়াসমিন বেগমকে নিয়ে রুম ত্যাগ করতে করতে বলেন,
“ ইয়াসমিন এখন চলো, আমিতো এখানেই আছি? পরে নাহয় কৃশানকে দেখব। ওর এখন রেস্ট প্রয়োজন। ”
রুমে জনশূন্যতা নেমে আসতেই চোখের পলক টাও ফেলতে সক্ষম হলো না হুমায়রা। এর আগেই ধমকা হাওয়ার ন্যায় তার উপর আছড়ে পড়ল মানুষটা। মেয়েটা কিছু বলারও সুযোগ পেল না এর আগেই স্বামীর লাগাতার চুমুতে সিক্ত হয়ে উঠল তার পুরো মুখমন্ডল! যার তোপে চোখ খুলে রাখাও দুষ্কর, ঠিক যেনমটা ঝুম বৃষ্টিতে আকাশের পানে তাকালে হয়। অনেকটা সময়ের পর খানেক শান্ত হয় কৃশান। কপালে কপাল ঠেকিয়ে অস্থির স্বরে শুধায়,
“ প্রাণপাখি, প্রাণপাখি আমার! কি হয়েছিল তোর? শরীর বেশি খার….”
মানুষটার এমন উদ্বিগ্নতার বিপরীতে শোনা যায় হুমায়রার মিহি কণ্ঠ। সে কৃশানকে শান্ত করতে এদিক সেদিক না ভেবেই বলে উঠে,
“ আপনি শান্ত হোন, তেমন কিছু হয়নি তো! না খাওয়ার কারণে শরীরের দুর্বলতায় মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম শুধু! ”
তৎক্ষনাৎ চেহারার রঙ পাল্টে যায় কৃশানের। এতক্ষণের অস্থির বদন পরিণত হয় অগ্নিমূর্তিতে। ঠেকানো কপাল সোজা করে ভ্রূ কুঁচকে তাকায় স্ত্রীর পানে। রাশ ভারী কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে,
“ না খাওয়ার কারণে মানে! খাবার খাস নি কেন তুই…? ”
অকস্মাৎ পুরুষালী বজ্র কন্ঠে খানেক ভরকে যায় মেয়েটা। বুঝতে পারে ভুল সময়ে ভুল কথা বলে ফেলেছে। শুষ্ক ঢোক গিলে নিষ্পাপ চোখে চায় স্বামীর পানে। ছোট মুখে উচ্চারণ করে,
“ খেতে ইচ্ছে করছিল না। ”
পৃষ্ঠে নিস্পৃহ রইল মানব। কিছুপল শান্ত দৃষ্টিতে পরখ করে রমণীকে। পরপরই ঝুঁকে থাকা শরীরটা সরিয়ে এনে সোজা হয়ে বসে। অভ্যাস মোতাবেক রাগ সংবরণ করতে ডান হাত দিয়ে ঘাড় ঢলে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কিছু একটা বলতে নেয় হুমায়রা,
“ আপনাকে…..”
মাঝপথেই থেমে যায় বিকট শব্দে। চমকানো চিত্তে পাশে তাকায় সে। বেডের কাছে থাকা টিটেবিল টা তখনো খানেক কাঁপছে কৃশানের পায়ের লাথিতে। সেখানকার পানির গ্লাসটা ফ্লোরে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।
“ এটা কি করলেন? গ্লাসটা ভেঙে গে…..”
এবারও কথা শেষ করতে পারল না মেয়েটা। এর আগেই পুরো বিছানা কাঁপিয়ে তার দুপাশে দুটো শক্ত হাত রাখল কৃশান। মুহূর্তেই স্বামীর অস্পর্শ বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হলো তার ছোট্ট কায়া। কর্ণকুহর হলো মানুষটার অদ্ভুত কণ্ঠ,
“ সামান্য গ্লাসটার জন্য মায়া হয় তোর? আর আস্ত একটা মানুষের জন্য মায়া হয়না? ”
“ আপনি … ”
“ চুপ, একদম চুপ! কথা বলবি না তুই….এই তুই জানিস তোর সামান্য কিছু হলেও আমার ভিতর দিয়ে কি বয়ে চলে? ধারণা আছে তোর কতটা পাগলপাড়া হই আমি? হাতে কোনোকিছু উঠেনা আমার, সামনে পা এগোনোর জোর পাইনা, চোখ ঘোলাটে হয়ে আসে, মস্তিস্ক কাজ করেনা, নিশ্বাস নিতে কষ্ট, বুক পুড়ে যায় অস্থিরতায়, ধম বন্ধ লাগে…..! অথচ তুই? আমার দুর্বলতার সুযোগ নিস? না খেয়ে নিজেকে অসুস্থ বানাস? আমাকে পুড়াতে শান্তি লাগে তোর না? ”
কৃশান এক নাগাড়ে বলতে থাকে। তার অস্থিরতা বুঝতে পারে হুমায়রা। সে স্যালাইন লাগানো হাত টা ধীরে সুস্থে তুলে নেয়। দুহাতে জড়িয়ে ধরে মানুষটার গলা। মুখ নেয় তার কানের কাছে। সব রাগের উর্ধ্বে গিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠে,
“ শুনছেন…. বাবা হওয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক মোবারকবাদ! ”
কৃশান থেমে যায়, থামে তার পুরো দুনিয়া, রাগান্বিত সত্তা থমকে জবান হারায়। বুক সুদ্ধ খানেক কেঁপে ওঠে “বাবা” শব্দটায়। হৃদয় ছুঁয়ে যায় অন্যরকম অনুভুতিতে। প্রত্যাশিত ফলাফল পেতেই ঠোঁট প্রসারিত হয় হুমায়রার। কানের কাছ থেকে মুখ এনে সরাসরি চায় স্বামীর পানে। ওর ঠোঁট চাপা হাসির বিপরীতে কৃশান থেমে থেমে জানতে চায়,
“ কি…. বললি? ”
“ আপনি বাবা হতে চলেছেন। ”
কথাটা বলতে দেরি অথচ ওঁকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে দেরি হলো না কৃশানের। হুমায়রা আলতো হাতে পিঠে হাত রাখে মানুষটার। তখনি গলার কাছ থেকে শুনতে পায় একটা অশান্ত স্বর,
“ একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরনা বউ, বুকে যে বড্ডো বেসামাল অনুভতি হচ্ছে…! ”
হুমায়রা হাসে, বিলম্বহীন টাইট করে ধরে স্বামীকে। সময়ের নীরব স্রোতে কতক্ষণ এভাবে কাটে জানা নেই। সহসা গলায় তরল পদার্থের স্পর্শে নড়ে ওঠে হুমায়রা। কণ্ঠনালী চিরে বেরিয়ে আসে বিচলিত স্বর,
“ আপনি কি কাঁদছেন! কাঁদছেন কেন আপনি? ”
কৃশান মুখ তুলে। বড্ডো অনিহা নিয়ে চোখের কার্নিশে আসা অশ্রু কণা মুছে ফেলে। পরপর স্ত্রীর উদ্বিগ্ন মুখপানে চেয়ে হাসে, নাকে নাক ঘষে বলে,
“ কাঁদছি না রে পাগলি, তবে বুক টাতে কেমন যেন অদ্ভুত অনুভুতি হচ্ছে। ভাবা যায়- কিছুদিন আগের এই পথভ্রষ্ট আমিটার হাত ধরেও কেউ পথচলা শিখতে আসছে…! এই অনুভুতি তোকে কীভাবে বুঝাই রে বউ! ”
কৃশানের গলা কেমন যেন নিভে আসছে অনুভূতির তোপে। ভিতরে কি চলছে বুঝানো দুষ্কর। খুশিতে আত্মহারা বুঝি এরকম অনুভূতিরই নাম।
“ সবকিছু বুঝলাম, কিন্তু এগুলো কীভাবে হলো? ”
ক্ষত স্থান উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুঁড়ল হুমায়রা। জবাবে কৃশান বেপরোয়া ভঙ্গিতে উত্তর করল,
“ ঐ ছোটখাটো একটু এক্সিডেন্ট করেছিলাম। ”
“ এটা ছোট খাটো? হাত পা শরীর সবজায়গায় ক্ষত হয়ে গেছে আর আপনি ছোট খাটো বলছেন? তাড়াহুড়ো করে বাইক চালিয়েছিলেন? ”
“ মাথা ঠিক ছিল না তখন। বাদ দে, কিছুই হয়নি। ”
“ আপনাকে খবর দিয়েছে কে? ”
“ ঘরেরই কেউ। কেন? ”
পৃষ্ঠে চুপ রইল হুমায়রা। সে সজ্ঞানে থাকলে কখনোই বাসায় ফেরার আগে এই বেপরোয়া লোককে আজকের ঘটনা সম্পর্কে জানাত না। কিন্তু এতবড় বোকামি টা করল কে? অবশ্য বোকামি বলা যায়না। কারণ মানুষটার যত পাগলামির খবর তো সেই জানে শুধু, বাকিরা হয়তো ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবে নিয়েই খবর দিয়েছিল। তাই এ ব্যাপারে আর কথা বাড়াল না। সরাসরি কৃশানের চোখে তাকিয়ে অধিকার নিয়ে বলল,
“ নাছিমা আন্টির থেকে এক্ষুনি ক্ষত স্থান গুলোতে মেডিসিন লাগিয়ে আসুন। ”
কৃশান একবার বলতে চাচ্ছিল সবসময়ের মতো হুমায়রা নিজেই মেডিসন লাগিয়ে দিতে। পরক্ষণেই স্ত্রীর স্যালাইন লাগানো হাত টার দিক তাকিয়ে থেমে গেল। যেখান টায় ক্যানেলা ফিট করা হয়েছে ঠিক সেখানটায় একটা শব্দ করে চুমু খেল সে। পরপরই নিজের শুষ্ক ঠোঁটের ভাঁজে নিয়ে নেয় মেয়েটার নরম অধর। ছোট্ট চুমু খেয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,
“ যে মেডিসিন প্রয়োজন সেটা তো প্রথমেই নিয়ে নিয়েছি, এখন এসব না নিলেও চলবে। তবে তুই যখন বলেছিস নিয়ে আসি না হয়? ”
বাক্যগুলো কর্ণপাত হতেই হুমায়রার দৃষ্টি এলোমেলো হয়। খানেক রাগ দেখিয়ে বলে,
“ আপনি যাবেন? ”
“ যাচ্ছি। ”
অতঃপর চলে যায় সে। মানুষটার যাওয়ার পানে শান্ত চোখে চেয়ে থাকে হুমায়রা। পরপর নিজের ধুলো বালিময় শরীরের দিক তাকিয়ে হেসে ফেলে।
ড্রয়িং পা রাখতেই শোনা গেল ইয়াসমিন বেগমের রাগী গলা। তিনি ইকরাকে বকে যাচ্ছেন অনবরত,
“ বয়সই হয়েছে যা, আক্কেল জ্ঞান এখনো হয়নি তোর? কোনোকিছু না ভেবে কীভাবে এসব ব্যাপারে জানালি ছেলেটাকে? আর জানালি তো- ভালো খবর টা না জানিয়ে খারাপ টা কেন জানাতে হলো? এখন কি অবস্থা হয়েছে ছেলেটার? ”
মাথা নুইয়ে মায়ের কথা চুপচাপ শুনে যাচ্ছে ইকরা। বলা বাহুল্য, ওরই সবটা দোষ। তখন হুমায়রার প্রেগন্যান্সির কথা শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে সবার অগোচরে কৃশানকে সাথে সাথেই কল করেছিল সে। ভাইকে সারপ্রাইজ দেয়ার কথা ভেবে আসল খবর না দিয়ে হুমায়রার শরীরের অবস্থা আর অজ্ঞান হওয়ার কথা জানিয়েছে। যেন কৃশান ঝটপট বাসায় চলে আসে। এবং বাসায় ফিরে আসল সংবাদ শুনে সারপ্রাইজ হয়ে যায়। কিন্তু হয়েছে হিতে বিপরীত, সব শুনে তাড়াহুড়া আর চিন্তায় তার ভাইয়ার সাথে যে এক্সিডেণ্ট এর মতো ভয়ানক ঘটনা ঘটে যাবে সেটা কল্পনায়ও আসেনি তার! এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি খারাপ তারই লাগছে। মন চাচ্ছে নিজের জ্ঞান শূন্য মাথাটা বারি দিয়ে ভেঙে ফেলতে। এর মাঝেই সেখানে কৃশানের আগমণ ঘটল। এসেই মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
“ সমস্যা কি? ওঁকে বকছো কেন? ”
“ বকব না তো কি করব? ”
“ ভালোবাসবে, প্রায় বছর দেড়েক পর আমার বোন এ বাড়িতে এসেছে বকা শুনতে? আমি যেন আর কখনো না দেখি ওঁকে কেউ বকছে! ”
ক্ষণিকের জন্য সকলের নয়ন বিস্ফোরিত হয়। অবাক নেত্রে পরখ করে কৃশানকে। ইকরা নিজেও বেশ অবাক হয়েছে। ছোট থেকেই ওদের ভাই বোনের সম্পর্ক সাপ- বেজির মতো। কখনো কারো সাইট নিয়ে কথা বলা তো দূর, উল্টো এক জন আরেকজন কে শুধু নিচে ধাবাতে চাইত। আজ হঠাৎ করে কি হলো তার খচ্চর ভাই- কৃশান মির্জার?
“ ভালোবাসার কাজ করলে সেন ভালোবাসব। ওর জন্য আজকে কতবড় অঘটন টা ঘটল? এর চেয়েও ভয়ানক কিছু হতে পারত! ”
“ এতে ওর কোনো দোষ নেই, আমার বেখেয়ালি পনার জন্যই বাইকটা একটা সিএনজি তে ধাক্কা খেয়েছে। ওসব বাদ দাও তো। এখন কি করবে করো, আমি ফ্রেশ হব তোমাদের কাজ শেষ হলে। ”
তখন ইকরার থেকে হুমায়রা কথা শুনে অতিরিক্ত তাড়াহুড়োয় বাইক চালাচ্ছিল কৃশান। মাথা ভর্তি তখন স্ত্রীর চিন্তা। চারপাশের কোনো কিছুতেই ধ্যান জ্ঞান ছিল না। যার ধরুণ বেখেয়ালি একটা সিএনজির সাথে বাইক লেগে বাইকসহ উল্টে পড়ে সে। সাথেই সাথেই হাত, পা সহ শরীরের বিভিন্ন অংশে গাঢ় চোট আসে। পুরুষালী দেহের প্রতিটি হাড় যেন এক লহমায় পুরো মুচড়ে উঠেছিল সে সময়। তবে পুরুষটির সেসবে ধ্যান নেই তার মস্তিষ্কে ছিল অন্য আকাঙ্ক্ষা, বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা, প্রিয় মুখ টাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা। ক্ষত স্থান থেকে গলগলিয়ে রক্ত বেরোনো শুরু হয়, ওভাবেই উঠার চেষ্টা চালায় সে। এর মাঝেই আশেপাশের সকলে এগিয়ে এসে সিএনজির ড্রাইভার কে গালাগালি শুরু করে। কারণ এতে সিএনজির ড্রাইভার এর দোষই বেশি ছিল। কৃশান তাড়াহুড়া করলেও যথেষ্ট সাইট দিয়েই বাইক চালাচ্ছিল। মধ্য বয়স্ক ড্রাইভার লোকটা নিজের ভুল স্বীকার করে। সবাই মিলে কৃশানকে দাঁড় করায়। হাসপাতালে নিতে চাইলেই শুনতে পায় আহতের প্রবল নিষেধাজ্ঞা। কারো কোনোরূপ কথা বা অবরোধ মানে না সে। ক্ষত বিক্ষত শরীর নিয়েই সবার বিরুদ্ধে গিয়ে ছুটে আসে নিজ গন্তব্যে।
কৃশানের কথায় এ প্রসঙ্গে আর শব্দ বাড়ালেন না ইয়াসমিন বেগম। নাছিমা বেগমকে বললেন তাকে চিকিৎসা দিতে। নাছিমা বেগম নিজের কর্মে নিয়োজিত হলেন। ফাঁকে ফাঁকেই কৃশানকে সতর্ক করে বললেন,
“ শুনো কৃশান, এখন থেকে সব জায়গায় সতর্কতা অবলম্বন করে চলবে। এমন লা পরোয়া হলে কিন্তু হবেনা! তোমার উপর দুটো জীবন নির্ভরশীল। নিজের প্রতি এতো পরোয়াহীন হলে চলবে? ”
কৃশান বাধ্য ছেলের ন্যায় শুনে মা বয়সী নারীটির কথা। তিনি থেমে নেই। ফের ছুঁড়লেন সাবধানী বাণী,
“ আর হ্যাঁ, আগামী তিন মাস সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে স্ত্রীর দিকে খেয়াল রাখবে। প্রথম তিন মাস অনেক সাবধানে থাকতে হয়। তোমার স্ত্রীর ওজন তুলনামূলক খুব কম, খাওয়ায় কনসার্ন করবে। সবদিক দিয়ে খুব যত্নে রাখতে হবে কিন্তু। ”
“ হুম আন্টি রাখব ”
ভদ্রমহিলা হাসেন। আর কিছু বলেন না। এতক্ষণে তিনি এতটুকু বুঝে গেছেন যে আর যাই হোক ছেলেটার বউয়ের জন্য অসম্ভব টান।
ছেলের কান্নার শব্দে ত্রস্ত পায়ে রুমে ছুটে আসে ইকরা। উমর ছেলেকে কোলে করে ঘরের এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্তে হেঁটে চলেছে। মসজিদ থেকে এসেই উবায়দুল্লাহ কে কোলে নিয়ে রুমে এসেছে সে। এরপর থেকে ইকরা একবারও রুমে আসেনি। এতক্ষণে স্ত্রীকে রুমে প্রবেশ করতে দেখে খানেক রেগে যায় শান্ত মানব। কঠিন গলায় বলে,
“ আর আসার দরকার ছিল কি তোমার? এ বাড়িতে আসলে বেশ অবাধ্য হয়ে উঠ তুমি। কখন থেকে ছেলেটা না খাওয়া মাথায় আছে? স্বামী, বাচ্চা রেখে শুধু টইটই করা মেয়ে আমার মোটেও পছন্দ নয়। ”
অপ্রত্যাশিত রাগের সম্মুখহীন হয়ে প্রথমটায় খানেক ভরকে যায় রমণী। পরক্ষণেই মুখে আধার নেমে আসে। একে তো মাত্রই মায়ের বকা শুনে এসেছে উপরে স্বামীর কড়া কথায় মুখটা একেবারে এইটুকুনে হয়ে যায়। ওভাবেই এগিয়ে এসে ছেলেকে নিজের কোলে নেয়। গটগট পায়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে উল্টো দিক ফিরে। উমরের মাঝে খুব একটা ভাবান্তর দেখা যায় না। শান্ত দৃষ্টিতে স্ত্রীর কান্ড পরখ করে সে।
নাছিমা বেগম হুমায়রার স্যালাইন খুলে রুম থেকে বেরোতেই মেয়েটা শুয়া থেকে উঠে বসে। কৃশান তখন ওয়াশরুমে শাওয়ার নিচ্ছে। শরীরের হালাত বেঠিক হওয়ায় অনেকটা সময় লাগছে তার। এর মাঝেই দুজনের জন্য খাবার হাতে রুমে প্রবেশ করেন ইয়াসমিন বেগম। খাবারগুলো সামনে আনতেই অনিহা আসে হুমায়রার। তার মুখ দেখেই তা বুঝতে পারেন ইয়াসমিন বেগম। তিনি পুত্রবধূর উদ্দেশ্যে বলেন,
“ জানি এখন খাওয়ার ইচ্ছে করবে না তোমার। কিন্তু জোর করে হলেও খেতে হবে। খাবারের প্রতি অনিহা করলে চলবে না বুঝেছ? ”
“ পেটে না রাখতে পারলে খেয়ে লাভ কি? ”
“ যেটুকু রাখতে পারবে তাতেই চলবে। কিন্তু খাবার বেশি বেশি খেতে হবে। ”
“ খেতে ইচ্ছে করেনা যে? ”
“ দুনিয়াতে কি খাবারের অভাব রয়েছে? একটা খেতে ইচ্ছে না হলে আরো হাজার রকমের খাবার এনে হাজির করব তোর সামনে। তবুও ঠিকমতো খাওয়া চাই। খাওয়ায় অনিয়ম করলে মার খাবি কিন্তু। ”
অকস্মাৎ পুরুষালী কণ্ঠে দুই জোড়া আঁখি নিবদ্ধ হলো ওয়াশরুম থেকে বেরোনো মানবের পানে। ছেলের মুখে এখনো ‘তুই’ সম্বোধন শুনে কপাল কুঁচকে ফেলফেন ইয়াসমিন বেগম। শাসনের সুরে বললেন,
“ তুই দেখি এখনো ওঁকে তুই তুকারি করিস? আবার মারের কথাও বলিস? তোর পিটে কটা ধুমধাম দেয়া দরকার! কিছুদিন পর তাহলে বাচ্চার সামনেও তার মাকে তুই তুকারি করবি তুই? আমি যেন এরপর থেকে আর এসব উচ্চারণ না শুনি! ”
“ অভ্যাস হয়ে গেছে আম্মু। ”
“ অভ্যাস বললেই হলো? কই উমরও তো আগে ইকরাকে আপনি আপনি করে বলতো এখন কি সুন্দর তুমি বলে ডাকে! ”
কথাটুকু বলতে নিয়েও তুলনার ব্যাপারটা এড়াতে গিয়ে থেমে গেলেন ইয়াসমিন বেগম।
“ অভ্যাস মানে কি? অভ্যাস পাল্টাতে হবে। ”
পৃষ্ঠে শোনা গেল কৃশানের বাধ্য স্বর,
“ ক্ষমা করবেন মাতা মহি, আপনার পুত্র যে তুইতেই অভ্যস্ত! কিন্তু সে এখন আগের মতো নেই, অভ্যাস বদলাতে শিখে গেছি আমি। চেষ্টা করব সর্বচ্চো। ততদিনে আশা করি সম্বোধন চেঞ্জ হয়ে যাবে। ”
ছেলের কথায় হাসেন ভদ্রমহিলা। রুম ত্যাগ করতে করতে বলেন,
“ সেটাই যেন হয়। আর খাবার দিয়ে গেছি, খেয়ে নিস দুজনে। ”
কৃশান আস্তে ধীরে এসে হুমায়রার মুখোমুখি বসে। নিস্পৃহ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“ কি বলে ডাকব তোকে? আপনি না তুমি? ”
“ আপনি….! ”
চোখ ছোট করে শব্দটুকু উচ্চারণ করল হুমায়রা। মানুষটার মুখে তুই এর পরিবর্তে আপনি সম্বোধন ভাবতেই কেমন যেন অসহনশীল অনুভুতি হলো তার। মেয়েটার রিয়েকশন দেখেই আর সে সম্বোধনের কথা মাথায় আনে না কৃশান। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজে নিজেই অন্য সম্বোধন করার ট্রাই করে,
“ হুজুরনী শোনো….? হোয়াট আ জটিল ল্যাঙ্গুয়েজ….! এগুলো কীভাবে বলব রে আমি হুজুরনী? ”
শেষ টুকু বড্ডো বিরক্তি নিয়ে বলে কৃশান। হুমায়রা ফিক করে হেসে ফেলে তার কাণ্ডে। হাসতে হাসতেই বলে,
“ এখনি বলতে হবে না। আস্তে আস্তে হয়ে যাবে সমস্যা নেই। এখন খাবার খান আপনি। ”
“ আমার খাওয়া ধরলেই শেষ হয়ে যাবে। তুই খাওয়া শুরু কর। আর এসব না খেতে ইচ্ছে হলে কি খাবি বল। ”
“ না খেতে পারব সমস্যা নেই। একটু লেবু হলেই চলবে। নিয়ে আসছি আমি। ”
কথাটুকু বলে এক পা বাড়াতে সক্ষম হলো না মেয়েটা। এর আগেই তাকে ধমকে উঠল মানব,
“ এই কোথায় যাচ্ছিস তুই? আমি বলেছি তোকে যেতে? চুপচাপ বস এখানে আমি নিয়ে আসছি। ”
“ আমি পার…”
“ আমার অনুমতি ছাড়া এখন থেকে এক পা এদিক সেদিকও করা নিষিদ্ধ তোর জন্য। নেক্সট টাইম যেন মনে করিয়ে দিতে না হয়। ওকে? ”
বাধ্যের ন্যায় মাথা দোলালো মেয়েটা। অতএব তাঁকে ওভাবেই বসে থাকতে হলো। কৃশান নিজেই গিয়ে লেবু কেটে আনল ওর জন্য। তবে লেবু দিয়েও প্লেটের সবটুকু খাবার শেষ করতে সক্ষম হলো না। কৃশানও ওঁর অবস্থা দেখে আর তেমন জোর করল না। ডিনারের আগেই আরেকবার খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ছেড়ে দিল।
দুপুর থেকে সন্ধ্যা পুরোটা সময় রুমে ছিল ইকরা। শুধু দুবেলা সালাত আদায় ব্যতীত আর বাইরে যায় নি। গোমড়া মুখে ঘরেই বসে আছে। কক্ষে থাকা উমরের সাথে এই অব্দি একটা কথাও বলেনি পুরোটা সময়। মাত্রই মাগরিবের নামাজ শেষ করে এসেছে উমর। কক্ষে ফিরে স্ত্রীকে আগের মতোই গোমড়া মুখো অবস্থায় দেখল। নিঃশব্দে বিছানার দিক এগিয়ে এলো সে। বিছানার অপর প্রান্তে উবায়দুল্লাহ কে কোলে নিয়ে পা মেলে বসে আছে ইকরা। বাবাকে দেখতেই শিশুটির মুখে হাসি ফুটল। হাত, পা নাড়িয়ে বুঝাল বাবার কোলে যেতে ইচ্ছুক সে। বিলম্বহীন ছেলেকে কোলে নেয় উমর। পরপরই হুট করে মাথা এলিয়ে দেয় স্ত্রীর কোলে। ছেলেকে বসায় নিজের পেটে। বলে,
“ আব্বু তোমার আম্মু বোধ হয় রেগে আছে আমার উপর। কিন্তু তাকে বলে দাও আজকে আমি তার রাগ ভাঙ্গাব না। কারণেই তার সাথেই রাগ দেখিয়েছি আমি। ”
ইকরা কথা বলেনা। উমরের মাথা ঠেলে তাকে কোল থেকে সরাতে চায়। তবে পেরে উঠেনা। ব্যার্থ হয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হয়। উমর কে উদ্দেশ্য করে ছেলের কাছে বলে,
“ তোমার বাবাকে বলো তার রাগ ভাঙানোর আশায় বসে নেই আমি। কোল থেকে উঠুক সে। ”
“ তোমার মাকে জানিয়ে দাও- কোল থেকে উঠানোর অধিকার নেই তার। সে বলেছিল এটা তোমার বাবার পারমানেন্ট দলিল করা স্থান। ”
অবুঝ শিশুটি আঙ্গুল চুষতে চুষতে একবার বাবার দিক তো একবার মায়ের দিক তাকাচ্ছে। ফ্যালফ্যাল নয়নে বুঝতে চাইছে তাদের কথাবার্তা। ইকরার এবার মেজাজ খারাপ হয়। সরাসরিই বলে,
“ সরুন তো এখান থেকে! ”
“ সরব না। কি করবে? ”
“ কেন সরবেন না? আমি যখন আপনার অপছন্দ তাহলে আমার কোলে শুয়েছেন কেন? উঠুন বলছি। ”
“ কথা সত্য, তবে কিছুটা খাদ আছে। ”
“ কোনো খাদ নেই। আমি আপনার অপছন্দ আপনি নিজ মুখে বলেছেন। সুতরাং কাছে আসবেন না আমার। ”
উমর এবেলায় কোল থেকে মাথা উঠায়। ইকরা সরতেই নিচ্ছিল ওমনিই ওর হাত খানা খপ করে ধরে নেয়। কোনোরূপ কথা বার্তা হীন অকস্মাৎ অভিমানীর ঠোঁটে শুষ্ক চুমু খায়।
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৭ (২)
“ কাছেও আসব, ভালোও বাসব। পছন্দ, অপছন্দ সব অধ্যায়ে তোমাকেই রাখব।
বুঝেছ ইকরা বিবি? আর হ্যাঁ স্যরি তখনকার জন্য। ”
“ আপনার স্যরি আপনার কাছেই রাখুন। ”
“ আচ্ছা এটা রেখে দিলাম, আরেকটা দিচ্ছি নতুন করে- স্যরি ইকরা বিবি! ”
ইকরার মন গলে যায়। ফিরে তাকায় সে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠে,
“ আমিও স্যরি, এরপর থেকে আপনাকে বেশিক্ষণ একা রেখে বাইরে থাকব না। ”
উমর হাসে ওর কাণ্ডে। ভালোবাসার পরশ এঁকে দেয় কপালে।
