মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪২
ঐশী রহমান
ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো একের পর এক উল্টে গেছে, আর তার সাথে সাথে ধারার অপেক্ষার প্রহরগুলো আরও দীর্ঘ, আরও ভারী হয়ে উঠেছে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ নয়টি মাস। যে শূন্যতা ও একাকীত্বের ভয় বুকে নিয়ে ধারা সেদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওয়াসিফের চলে যাওয়া গাড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিল, সেই একাকীত্বকে সঙ্গী করেই সে আজ তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অথচ কঠিনতম অধ্যায়ের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
ধারা এখন নয় মাসের পূর্ণ গর্ভবতী। তার ছোট্ট শরীরটা এখন এক নতুন প্রাণের ভারে নুয়ে পড়েছে। নড়াচড়া করতে কষ্ট হয়, রাতে ঠিকমতো ঘুম আসে না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে যখন দম আটকে আসে, তখন সে জানালার বাইরে তাকিয়ে ওই দূর আকাশের তারাগুলোর মাঝে ওয়াসিফকে খোঁজে। বুকের ওপর আলতো করে হাত রেখে অস্ফুট স্বরে বলে, “দেখেছ তোমার বাবা কত নিষ্ঠুর? আর মাত্র কয়েকটা দিনের অপেক্ষা, অথচ এই সময়েও সে আমাদের পাশে নেই।”
মিশনের জটিলতা আর দেশের ক্রান্তিলগ্ন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ওয়াসিফ চাইলেও এই মুহূর্তে বর্ডার ছেড়ে এক কদম নড়ার সুযোগ পাচ্ছে না। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের সেই গোপন ক্যাম্প থেকে এখন আর আগের মতো নিয়মিত ফোনও আসে না। শেষ যখন তিন সপ্তাহ আগে একটা স্যাটেলাইট ফোন থেকে ওপাশ থেকে ওয়াসিফের কণ্ঠ ভেসে এসেছিল, তখন ওনার গলাতেও ছিল এক বুক হাহাকার আর অপারগতার তীব্র যন্ত্রণা। ওয়াসিফ বলেছিল, “মুমতাহিনা, আমাকে ক্ষমা করিস রে পাগল। বুকটা ফেটে যাচ্ছে তোকে এই অবস্থায় একা ফেলে রেখে। কিন্তু কমান্ডিং পজিশনে থেকে আমি এই মুহূর্তে ছেলেদের বর্ডারে ফেলে আসতে পারছি না। তুই শক্ত থাকিস। আমি আমার জান বাজি রেখে হলেও ঠিক সময়ে তোর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করব।”
ধারা সেদিন কাঁদেনি। ওয়াসিফকে সে দুর্বল করতে চায়নি। কিন্তু আজ যখন প্রসবের তারিখ ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে, তখন তার ভেতরের সমস্ত শক্ত দেওয়ালগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে চাইছে। একজন নারীর জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তগুলোতে তার স্বামীর উপস্থিতি কতটা প্রয়োজন, তা শুধু ধারার এই নিঃসঙ্গ মনটুকুই বোঝে।
দুপুরের দিকে হঠাৎ করেই আকাশে মেঘের ঘনঘটা শুরু হলো। দেখতে দেখতে চারপাশটা অন্ধকার করে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। জানালার কাচ বেয়ে পানির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছে। ধারা ঘরের এক কোণে আরামকেদারায় বসে হালকা হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল তার স্ফীত উদরে। হঠাৎ করেই তলপেটে এক তীব্র, তীক্ষ্ণ মোচড় দিয়ে ওঠা যন্ত্রণায় সে শিউরে উঠল। তার হাত থেকে কোলের ওপর থাকা কুশনটা মেঝেতে পড়ে গেল।
“আহ্…” ধারা নিজের অজান্তেই ককিয়ে উঠল। তার কপালে মুহূর্তের মধ্যে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল।
বেদনার তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে সে সোজা হয়ে বসতে পারছিল না। বুকের সঙ্গে হাত খামচে ধরে সে কাঁপা গলায় চিৎকার করে ডাকল, “আপা! আপা একটু এদিকে এসো…”
লুইপা পাশের ঘর থেকে ধারার গোঙানির শব্দ শুনে প্রায় ছুটে এলো। ধারার ফ্যাকাশে মুখ আর ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া অবস্থা দেখে তার বুঝতে বাকি রইল না যে সময় হয়ে এসেছে। লুইপা আতঙ্কিত হলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বাড়ির বাকিদের ডাকল, “আম্মা! বড়ো আম্মা ! তাড়াতাড়ি আসুন, ধারা’র লেবার পেইন উঠছে!”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়িতে হইচই পড়ে গেল। শাহীন গত সপ্তাহে এসেছে বাড়িতে, ও আর উপরে উঠলো না। দ্রুত গাড়ির জন্য নিচে ছুটে গেল। লুইপা ধারাকে ধরে সাবধানে দাঁড় করানোর চেষ্টা করতেই ধারা ব্যথার চোটে লুইপার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখ দিয়ে তখন অঝোরে পানি পড়ছে। এই তীব্র শারীরিক যন্ত্রণার মাঝেও তার মনটা কেবল একজনকে তীব্রভাবে ডাকছে। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে আওড়ালো
“আপনি কোথায়? আমার খুব ভয় করছে। আপনি কেন এলে না?” ধারার ভাঙা কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দের মাঝে হারিয়ে গেল।
লুইপা ধারাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল, “চুপ, কিচ্ছু হবে না। আমরা আছি তো। ভাইয়াও ঠিক চলে আসবে। তুই একটু সাহস রাখ।”
গাড়িতে তোলার সময় ধারার শরীরটা যন্ত্রণায় কাঁপছিল। সে গাড়ির সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। তার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ঠিক এই সময়টাতে, যখন তার একটা ভরসার হাতের বড্ড প্রয়োজন ছিল, তখন মেজরের সেই শক্ত হাতটা তার হাত শক্ত করে ধরে রাখার জন্য পাশে নেই। দেশের মাটির টান আজ একজন বাবার দায়িত্বের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাসপাতালের উদ্দেশ্যে গাড়ি চলতে শুরু করল। বাইরের বৃষ্টির বেগ আরও বাড়ছে, ঠিক যেমন ধারার বুকের ভেতরের ঝড় আর অন্তহীন অপেক্ষার আর্তনাদ।
হাসপাতালের করিডোরে চাকার খটখট শব্দ আর লুইপার ক্রমাগত কান্নার আওয়াজ যেন ধারার কানের ভেতর এক অদ্ভুত কোলাহল তৈরি করছিল। স্ট্রেচারে শুয়ে ধারা শুধু দেখছিল ছাদের সাদা লাইটগুলো একটার পর একটা পেছনে চলে যাচ্ছে। তলপেটের মোচড় দিয়ে ওঠা তীব্র যন্ত্রণাটা এখন প্রতি মিনিটে আরও ঘন, আরও প্রলয়ংকরী হয়ে উঠছে। ব্যথার চোটে তার শ্বাস আটকে আসছিল, কিন্তু সেই শারীরিক কষ্টকে ছাপিয়ে এক বুক অভিমান আর একাকীত্বের হাহাকার তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিয়েছে।
“বোন আমার একটু শক্ত হ। কিচ্ছু হবে না, আমরা আছি তো…” লুইপা ধারার একটা হাত ধরে রেখে বলছিল।
ধারা লুইপার দিকে তাকানোর চেষ্টা করল। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল। তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও সে শুধু একটা কথাই বলতে পারল, “আপা,… ওনার একটা ফোনও কি আসেনি? উনি কি জানবেনও না যে আমি…”
লুইপা কোনো উত্তর দিতে পারল না, শুধু চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল। ওটি (অপারেশন থিয়েটার)-র সামনে আসতেই নার্সরা লুইপাকে আটকে দিল। ধারাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। ওটির ভারী দরজাটা যখন বন্ধ হয়ে গেল, ধারার মনে হলো সে এক সম্পূর্ণ অচেনা, নিথর জগতের বাসিন্দা হয়ে গেছে, যেখানে পাশে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো কেউ নেই।
এদিকে বর্ডারের সেই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের পরিস্থিতি তখন অগ্নিগর্ভ। গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে চলা একটানা অপারেশনের পর অবশেষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। মেজর ওয়াসিফ তার কমব্যাট ইউনিফর্ম পরে, কাদা আর বারুদের গন্ধ মাখা শরীরে বেস ক্যাম্পে এসে ঢুকলেন। তার সারা শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় অশান্তি চলছে তার বুকের ভেতর।
আজ সকাল থেকেই ওয়াসিফের মনটা ভীষণ অস্থির। বুকের ভেতরটা বারবার কেঁপে উঠছে। সে জানে, ধারার সময় একদম শেষ প্রান্তে। যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। নিজের ভেতরের এই প্রবল ঝড়কে আড়াল করে সে যখনই স্যাটেলাইট ফোনটার দিকে এগোতে যাবে, ঠিক তখনই তার জুনিয়র অফিসার সামির হন্তদন্ত হয়ে ওনার তাঁবুতে ঢুকলেন।
“স্যার! ঢাকা থেকে হেডকোয়ার্টারের মাধ্যমে লুইপা’র একটা জরুরি মেসেজ এসেছে।” সামিরের গলা কাঁপছিল।
ওয়াসিফ চট করে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। “কী মেসেজ, সামির? মুমতাহিনা ঠিক আছে তো?”
“স্যার, ভাবিকে একটু আগে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। লেবার পেইন উঠেছে। অবস্থা বেশ জটিল…”
সামিরের কথা শেষ হওয়ার আগেই ওয়াসিফের হাত থেকে কফির মগটা মাটিতে পড়ে ছিটকে গেল। একজন কমান্ডো, যে কিনা হাজারো বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েও পলকের জন্য কাঁপে না, আজ তার পা দুটো যেন এক মুহূর্তের জন্য মাটির সাথে সেঁটে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল ধারার সেই ফ্যাকাশে, অভিমানী মুখটা— “আমি বীরের স্ত্রী হতে চাই না। আমি শুধু আমার স্বামীর স্ত্রী হয়ে থাকতে চাই।”
ওয়াসিফ নিজেকে কোনোমতে সামলে হন্ত দন্ত হয়ে বেরিয়ে যেতে নিলেই সামির এগিয়ে এসে বলে।
“কিন্তু স্যার, এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আর বৃষ্টির মধ্যে… ”
সামিরের কথা পুরোপুরি শেষ হয়না,ওয়াসিফ বলে।
“আমি কোনো ‘কিন্তু’ শুনতে চাই না, সামির! দেশের প্রতি আমার দায়িত্ব আমি শেষ করেছি। আমার ছেলেরা এখন নিরাপদ। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার স্ত্রী, আমার বাচ্চার আমাকে প্রয়োজন। আমি যদি আজ ওর পাশে না দাঁড়াতে পারি, আমি নিজের কাছে কোনোদিন ক্ষমা পাব না। অর্ডার ইট নাও!” ওয়াসিফের চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে, তাতে মিশে আছে এক বাবার, এক প্রেমিকের তীব্র আকুলতা।
হাসপাতালের ওটির বাইরে লুইপা আর বাড়ির বাকিরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সময় যেন কাটছেই না। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা পর ওটির দরজা খুলে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। ওনার মুখে ক্লান্তির ছাপ।
লুইপা দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ডাক্তার আপা! আমার বোন, ঠিক আছে তো? বাচ্চা…”
ডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “পেশেন্টের কন্ডিশন খুব একটা ভালো ছিল না। ট্রমা আর মেন্টাল স্ট্রেসের কারণে ব্লাড প্রেশার খুব হাই হয়ে গিয়েছিল। তবে আল্লাহর রহমতে আমরা ওনাকে এবং বাচ্চা দুজনকে বাঁচিয়ে তুলতে পেরেছি। একটা ফুটফুটে কন্যাসন্তান হয়েছে।”
লুইপার চোখে আনন্দের জল চলে এলো। কিন্তু ডাক্তারের পরের কথাতেই তার বুকটা ধক করে উঠল। “তবে পেশেন্ট এখনো অবচেতন। উনার যখন জ্ঞান ছিলো ঐ অবস্থাতেই কার যেন নাম ধরে ডাকছেন। ওনার মনের জোর এই মুহূর্তে খুব দরকার। ওনার হাসব্যান্ড কোথায়? ওনাকে কি ডেকেছেন?”
লুইপা মাথা নিচু করে বলল, “উনি… উনি বর্ডারে আছেন।”
কিছুক্ষণ পর ধারাকে কেবিনে শিফট করা হলো। কেবিনের ভেতরে মৃদু আলো। ধারা তখনো পুরোপুরি জ্ঞান ফেরেনি, তবে আচ্ছন্ন অবস্থায় তার ডান হাতটা বিছানার চাদরটা খামচে ধরছে। ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাপছে।
ঠিক তখনই কেবিনের দরজাটা ধড়াম করে খুলে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার পরনের ইউনিফর্ম তখনো বৃষ্টির পানিতে ভেজা, কপালে আর গালে লেপ্টে আছে যুদ্ধের দাগ। কিন্তু তার চোখ দুটোতে তখন শুধুই এক পৃথিবীর সমান ভালোবাসা আর অনুশোচনা।
মেজর ওয়াসিফ ভেতরে ঢুকলেন। তার বুটের শব্দে কেবিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। লুইপা আর বাড়ির বাকিরা ওয়াসিফকে এই অবস্থায় দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। ওয়াসিফ কারো দিকে না তাকিয়ে সরাসরি ধারার বিছানার পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসলেন।
তার কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে সে ধারার কপালে জমে থাকা ঘাম আর চুলগুলো সরিয়ে দিল। তারপর খানিকটা কপালে এক দীর্ঘ, গভীর চুমু খেল।
“আমি এসে গেছি রে পাগল। তোর ওয়াসিফ তোকে ছেড়ে কোথাও যায়নি। চোখ খোল মুমতাহিনা…” ওয়াসিফের ভারী কণ্ঠস্বর এবার আবেগে বুজে এলো।
সেই পরিচিত স্পর্শ, সেই চেনা পুরুষালি গলার আওয়াজ যেন ম্যাজিকের মতো কাজ করল। ধারা ধীর গতিতে তার ভারী চোখের পাতা দুটো মেলল। ঝাপসা দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই সে দেখতে পেল—তার সামনে কোনো স্বপ্ন নয়, স্বয়ং তার মেজর ওয়াসিফ ইউনিফর্ম পরেই তার হাত দুটো নিজের দুই হাতের মাঝে শক্ত করে ধরে আছেন। ওনার চোখে টলটল করছে পানি।
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪১
কাপতে থাকা ঠোট দুটো নেড়েও কিছু বলে উঠতে পারেনা,ধারার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু এবার সেই অশ্রুতে কোনো অভিমান ছিল না, ছিল এক পরম পূর্ণতার আনন্দ।
ওয়াসিফ ধারার হাতের ওপর আলতো করে নিজের মাথাটা ঠেকিয়ে রইল। বাইরে তখনো বৃষ্টি হচ্ছে, তবে এই কেবিনের ভেতরের নয় মাসের দীর্ঘ ঝড়টা অবশেষে শান্ত হয়েছে।
