আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৭
সুরভী আক্তার
আচানক কর্কশ ঝাড়িতে চমকালো মেঘা । ঘন পলক ফেললো । রৌদ্রের ছায়াতলে সেপ্টে যাওয়ার দরুন বৃষ্টি ফোঁটা প্রথমে ভেজাচ্ছে রৌদ্র কে । অতঃপর লম্বাটে লোকটার চোয়াল চুঁইয়ে চুঁইয়ে টপটপ করে বিন্দু কণা এসে পড়ছে অনুচ্চ রমনীর মুখের উপর । ভিজে জবজবে দু’জনাই ।
সেকেন্ড কয়েক চোখাচোখিতে কাটলো । অতঃপর নিজেকে সামলে রৌদ্র কে ঠেলে ওর থেকে দূরে সরালো মেঘা । এতক্ষণে ধ্যানে ফিরলো সে । বৃষ্টির বেগ কমছে না । একাধারে চলছে । রৌদ্র ও ভিজে একাকার । মেঘা দু কদম পিছিয়ে আসতেই ফের কাঠ স্বরে ধমকালো বেপরোয়া লোকটা ….
” কথা বলছিস না কেনো ? খুব নাচার সখ তোর ? এখানে এই সাত সকালে ঠান্ডার মধ্যে বৃষ্টিতে ভিজছিস কেনো ইডিয়ট ?
” ভেজার ইচ্ছে হয়েছে , তাই ভিজছি । আপনার কি ?
” সব আমার ! ইচ্ছে হয়েছে তাই ভিজছিস ? ট্রাস্ট মি..যদি জ্বর বাঁধাস এভাবে , তাহলে বাকি সাতচল্লিশ টা থাপ্পর একদিনে বসাবো তোর গালে ।
” আপনি কে আমাকে মারার ? আমার জ্বর আসলেই বা আপনার কি ?
” আবার জিগায় ,,, ইডিয়ট ! সব আমার , বুঝলি ? তুই ও আমার ! তোর শরীরে অন্য কেউ বাসা বাঁধবে না ! কোনো অসুখ ও নয় । কেবলই আমি নামক সুখ থাকবে তোর জীবনে ।
মেঘা দাঁত পিষে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । মুখ বাঁকালো ।
রৌদ্র বেখেয়ালে বলে ফেলেছে কথাটা । রিমঝিম শব্দের সাথে অর্ধেক কথা মিলিয়ে যায় ।
মেঘা বিড়বিড় করে রাগে….
” সুখ না ছাই , আস্ত একটা অসুখ আপনি আমার জীবনের ।
বৃষ্টি ছাপিয়ে হাওয়ার টালে রৌদ্রের কানে পৌঁছেছে কথাটা । অধর ঠেলে বক্র হাসে সে । বিড়বিড় করে নিজেও…
” আমি নামক অসুখটাই তোর সবচেয়ে বড় সুখ , জান পাখি । একটু বোঝ । অভ্যাস করে নিতে শেখ একটু । আমি নামক এই অসুখ টাকে সাথে করেই সারাটা জীবন কাটাতে হবে তোকে । কোনো দাওয়াই নেই এই অসুখ থেকে নিস্তারের ।
মেঘা শোনে না বিড়বিড়ানো । চেয়ে রয় রৌদ্রের কাঠিন্য দৃষ্টির পানে । ধারালো দৃষ্টি বেপরোয়া লোকটার । প্রথমে চোখের দিকে থাকলেও ধীরে ধীরে দৃষ্টির গমন হয় অন্যথায় । চোখ বুলিয়ে দেখতে থাকে ভেজা রমনীর পুরো মুখশ্রী । ঝিরিঝিরি বৃষ্টি কণার টুপটাপ বিচরন সমস্ত মুখ জুড়ে । দুধে আলতা কাঞ্চনবর্নের চেহারায় পানি বিন্দু মুক্তোর দানার ন্যায় চিকচিক করছে । রৌদ্রের দৃষ্টির বিচরন এলোমেলো । বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়েই মেয়েটার কপাল হতে চোখ মুখ , সবটাই অবলোকন করে সে । লালচে হয়ে উঠেছে ফর্সা ত্বক । নাকের ডগা , কপোল জোড়া রক্তিম আভায় রাঙানো । তিরতির করে কাঁপছে সর্বাঙ্গ ।
এক পর্যায়ে দৃষ্টি নেমে আসে ওষ্ঠ যুগলের উপর । গোলাপের পাপড়ির ন্যায় কোমল অধর যুগলের তিরতিরে কম্পন নজর কাড়ে সাংঘাতিক । ঠোঁট দুটি যেন সদ্য ফোঁটা গোলাপ । যেথায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃষ্টি কণা ভোরের শিশিরের ন্যায় আধিপত্য বিস্তার করেছে । নবকিশলয় সম তাহার অধর যুগল তীব্র আকর্ষণ করলো বেপরোয়া লোকটাকে ।
দৃষ্টি যেথায় থামলো, সেথায় অমঙ্গল নিশ্চিত । খেই হারিয়ে সাংঘাতিক কিছু ঘটিয়ে না ফেলে সে । সুপ্ত অনুভূতি প্রগাঢ় হয়েছে ।
রৌদ্র হাত মুঠিয়ে নেয় । সহসা চোখ খিচে দৃষ্টি নামায় । শ্বাস বন্ধ করে লম্বা হাঁফ ছাড়ে । হাঁসফাঁস করে লম্বা লম্বা শ্বাস টানে হাঁপানি রোগীর ন্যায় । ফের তড়িতে তীর্যক ধারালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মেঘার দিকে ।
তাৎক্ষণিক ছ্যাঁত করে ওঠে মেঘা ।
এতক্ষণে চাহনির অর্থ বোধগম্য হতেই চট করে নিজের দিকে তাকায় । একি হালাত্ ওর ? বিপদ সংকেতের সাইরেন বেজে উঠলো কানে । এক মুহুর্তেই নিজের ভেজা শরীরের বেগতিক অবস্থা দেখে থরথর করে কেঁপে উঠলো রমনী । ভেজা শরীরে ভেজা কাপড় বসে গেছে । নিজের হাল , আর পরিস্থিতি খুব একটা বাজে না হলেও অস্বস্তিতে পড়লো মেঘা । রৌদ্রের সামনে এভাবেই আছে , অথচ খেয়াল নেই । এজন্যই লোকটা ওভাবে দেখছিলো ওকে ?
মেঘা হতবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বোকার মতো তাকালো রৌদ্রের দিকে ।
রৌদ্র খেয়ালি হয়ে অদ্ভুত এক দৃষ্টে চেয়ে । ধারালো ছুরির ন্যায় মেঘার ভেজা শরীরের খাঁজে খাঁজে বিদ্ধ হলো ওর দৃষ্টি । মেঘা দ্রুত ঢোক গেলে । ভেজা চুল কানের পাশে গুজে কুন্ঠা আর লজ্জা বোধে দৃষ্টি নামায় । রৌদ্রের নির্লজ্জ দৃষ্টি বুঝে খিটখিট করে ওঠে চোখ তুলে….
” অসভ্য লোক , দৃষ্টি সংযত করুন ।
” সভ্য মেয়ে , নিজেকে সংযত কর তুই । তুই সংযত থাকলে, আমাকে আর অসংযত হতে হয় না । নিজে কেনো থাকিস না সংযত ?
” ইরিটেটিং , নির্লজ্জ , অসভ্য , রাইনো মুখো ।
রৌদ্র কুটিল হাসে । ওষ্ঠপূটে দাঁত চেপে কদম বাড়ায় । ঘাড় ডলে মাথায় ঝাঁকায় রাউন্ড করে । মাথা ঝাঁকানো মাত্রই ভেজা চুলের পানি ঝড়িয়ে আছড়ে পড়ে কপালের এধার ওধার ।
ধক্ করে ওঠে মেঘা । রৌদ্রের ফিচেল মুখপানে তাকিয়ে ছলকে পিছনে কদম হটায় । মেঘার দিকে দৃষ্টি গাঢ় করে বেপরোয়া যুবক । তাহার কাকভেজা রমনীর পানে সূক্ষ্ম দৃষ্টি পাত করে চোখ টিপে হাস্কি স্বরে বলে….
” Hayyy Garmiiiiii….
রাগে গজগজ করে মেঘা । নাকের পাটা ফুলে আসে ক্ষুব্ধতায় । পা থামিয়ে তড়তড়িয়ে ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে….
” আসলেই নির্লজ্জ ব্যাটা ছেলে….
রাইনো মুখো । গরম লাগছে তো থাকুন এখানে বৃষ্টির মাঝে । অসভ্য কোথাকার….
আমার সব কিছুতে পদার্পণ করতে হবে ওনাকে । একটু যদি শান্তি দেয় আমায় ! রাইনো মুখো ইরিটেটিং ম্যান….
মেঘা গজগজ করতে করতেই দ্রুত ছাদ ত্যাগের জন্য দরজার দিকে এগোলো । হাসি সংবরন করতে পারলো না রৌদ্র । হেসে উঠলো শব্দ করে । মেঘা চলে গেছে । দুহাত মেলে আকাশের দিকে মুখ তুললো সে । ঠান্ডা বাদলকে আলিঙ্গন করে তৃপ্ত প্রশান্তির শ্বাস ফেললো । হৃদকোঠরের চলমান জোরালো ধুকপুকানি সামলে নিলো শ্বাস ফেলে । পরক্ষনে কিছু মনে পড়তেই স্বাভাবিক হলো ঝটপট । বিড়বিড় করলো…..
” ওওও শিট….
ওকে তো থাপ্পর মারতে চেয়েছিলাম । এই ইডিয়ট , দাঁড়া বলছি ! মার খেয়ে যা আমার কাছে । কোন সাহসে কাল তুই দরজা আটকে ঘুমিয়েছিলি ?
আজ আর বৃষ্টি কমলো না । তবে ভার্সিটি না যাওয়া থেকেও ছাড় মেলে নি ।
বৃষ্টির মাঝেই ও দুটো কে নিয়ে ভার্সিটিতে বেরিয়েছিল আদ্র । ফিরে এসে বিকেলে আবার বেরিয়েছে ওদের সাথে করে । বৃষ্টি কমে এসেছিলো ততক্ষণে । তবুও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি চলেছে সারাটা দিন । মেঘা আর শাফাহ্ কে সায়ান দের বাড়িতে নামিয়ে দিয়েছে আদ্র । সন্ধ্যার পর গিয়ে নিয়ে আসবে আবার ।
সায়ান বাড়িতে নেই । সকালে শুভ্র আর ও দুজন দুজনের অফিসে বেরিয়েছে । এপর্যন্ত বাড়ি ফেরে নি ।
মেহেরের মা #মিনারা বেগম রাতের রান্নার তোড়জোড় করছিলেন । মেয়ে দুটো এসেছে । আদ্র ও আসবে । শুভ্র তো আছেই ।
কিচেনে ব্যাস্ত তিনি । মেহের টুকটাক হেল্প করছে । শাফাহ্, মেঘা ড্রইং রুমে বসে ছিলো । আর বসে থাকতে পারলো না । মেঘা উঠে কিচেনের দিকে এগোতেই পিছু পিছু ছুটলো শাফাহ্ । মিনারা বেগম পেঁয়াজ কেটে কুঁচি করছেন নিচে বসে । মেহের মাছে মশলা মাখাচ্ছে । ফ্রাই হবে এক্ষুনি ।
ভেতরে ঢুকে এক গাল হেসে মুখ খুললো মেঘা….
” মেহের আপু , একলা একলা সব করছো ? আমরা তো বসেই আছি । বোর হচ্ছি । আমাদের বরং কিছু কাজ দাও । ভাগাভাগি করে করলে তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে ।
মিনারা বেগম চোখ তুলে মুচকি হাসলেন…
প্রশ্ন করলেন…
” তুমি রান্না করতে পারো মেঘা ?
” পারি আন্টি । টুকটাক পারি । তবে সব ধরনের রান্না পারি না । মামনি আর মনি তো আমাকে কিছু করতেই দেয় না । শিখবোই বা কি করে ?
” ধীরে ধীরে শিখে যাবে !
আমার মেহের সব পারে । তবুও শুনলাম , ও বাড়িতে নাকি ওকে কেউ কিছু করতে দেয় না ।
পরিপ্রেক্ষিতে মৃদু হেসে বুক ফুলিয়ে বলে মেঘা….
” দেবে কেনো ? মেহের আপু তো ও বাড়ির বড় বউ । আপুকে সবাই কত ভালোবাসে । এখনও নতুন বউ আপু । মনি আর মামনি সবটা সামলে নেয় তাই ।
” সেক্ষেত্রে তুমিও ও বাড়ির ছোট বউ । তোমার প্রতি ভালোবাসা টাও কম নয় । বরং একটু হলেও বেশি । তার উপর গত পাঁচ বছর ধরে ও বাড়িতে আছো তুমি । ভালোবাসা বেড়েছে বই কমেনি । তোমাকেই বা কেউ কাজ করতে দেবে কি করে ?
মেঘার মুখখানা চুপসে আসে সহসা । মেহের হাতের কাজ থামায় । ওর দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হয় দুজনের । চোখ নামিয়ে নেয় মেঘা । এ বাড়ির সবাই মেঘা আর রৌদ্রের বিষয়ে পুরোপুরি অবগত । মিনারা বেগম হঠাৎ এ কথা বলে বসবেন , তা মেহের ভাবে নি । আর বেশি কিছু বলার আগে কথা ঢাকতে ধীরে ডাকলো মেহের….
” আম্মু !
মিনারা বেগম পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকান । হাঁফ ছাড়েন । পাত্তা না দিয়ে নরম সুরে মুখ খোলেন অভিভাবকের ন্যায়…
” আমি জানি সবটা । কিন্তু আজ না বলে থাকতে পারলাম না । দুঃখ পেয়ো না মেঘা । আমি খারাপ ভাবে বলছি না । তবে কি জানো ? মেয়েদের বিয়ে আর সংসার কিন্তু একবারই হয় । সেই একবারের সংসার ভেঙ্গে দ্বিতীয় বার সংসার সাজাতে গেলে ঝড় ঝাপটা আসে হাজার । দাগ থেকেই যায় । ভুলক্রমে হলেও বিয়ে হয়েছে তোমার । রৌদ্র বিয়ে করেছিলো তোমায় । সংসার না সাজালেও পাঁচ বছর ধরে এখনো অবধি ওর সংসারেই আছো তুমি । হয়তো ভিন্ন কারনে । তবুও আছো তো ? এখন রৌদ্র ফিরে এসেছে । তুমি যেও না । সম্পর্ক টা ভাঙা কি খুব প্রয়োজন ?
মেঘা চিবুক নামিয়েছে । মিনারা বেগম একটু থেমে পুনরায় বললেন…..
” তুমি এখনো ছোট মেঘা । সম্পুর্ন বোধশক্তি না হলেও বোঝার ক্ষমতা আছে তোমার । রৌদ্র একটু অগোছালো ! কিন্তু আমি ওকে যতদূর জানি, মন্দ নয় ও । তুমি মেনে নিলে ঠিক মানিয়ে নিতে পারবে ওর সাথে । যখন সংসার সাজাবে , দেখবে তখন ঠিক সংসারী হবে রৌদ্র । সারাজীবন তো আর এক থাববে না ও । বিদেশ থেকে আসার পর একটু হলেও তো বদলেছে । দেখবে , আরো বদলাবে । সংসার টা নষ্ট করো না এভাবে ।
কথা শেষ করে হাঁফ ছাড়লেন তিনি । ফের মনযোগ দিলেন কাজে । মেহের মেঘার ইতস্তত অভিব্যক্তি বুঝে কথা কাটাতে চট করে বললো….
” মেঘা , তুমি বরং একটু কফি বানাও । ভালো কফি বানাতে পারো তুমি । ভাইয়া আর শুভ্র ভা…. না মানে , ওনার ও আসার সময় হয়ে গেছে । আমরাও আছি । ওনারা আসলে সবাই একসাথে কফি খাবো ভেজা ভেজা ওয়েদারে ।
মেঘা সায় দিয়ে মৃদু স্বরে বলল….
” আচ্ছা আপু ।
কফির জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু এগিয়ে দিলো মেহের ।
শাফাহ্ সেই তখন থেকে মিনারা বেগমের দিকে ভ্যাট ভ্যাট করে চেয়ে আছে । এখানকার বাড়তি কোনো কিছুই বোকা মেয়েটার মাঝে প্রতিক্রিয়া জাগাতে পারেনি ।
চোখের কোনে ভেজা কিছু অনুভব করলো সে । চোখ জ্বলছে পেঁয়াজের ঝাঁজে । পিটপিট করে চোখ মেলে রেখেছে কোন রকমে । নাক টানলো ।
এগিয়ে এসে মিনারা বেগমের সামনে বসে ভেজা গলায় বলল…..
” আন্টি , তোমার চোখ জ্বলছে না ?
সহসা হাসলেন ভদ্রমহিলা । বোঝা সত্ত্বেও চোখ তুলে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে শুধালেন….
” কেনো ?
” পেঁয়াজ কাটছো যে ? তুমি কাটছো আর আমি কাঁদছি । দেখো , চোখ জ্বলছে ভীষণ ।
হাসি চওড়া হলো ভদ্রমহিলার ঠোঁটে । এই মেয়ে টা যে বড্ড সহজ , তা অজানা নয় ।
” পাগলী মেয়ে , তোকে এখানে থাকতে হবে না । পেঁয়াজের ঝাঁজ খুব । বাইরে যা । পানি পড়ছে চোখ থেকে ।
শাফাহ্ চোখ ডলে নাক টেনে উঠে দাঁড়ালো । আসলেই টেকা যাচ্ছে না এখানে । তড়িঘড়ি করে কিচেন হতে বেরোলো সে । চোখের জ্বলন বেড়েছে । আর খুলতেও পারছে না । এটুকুতেই চোখের জলে নাকের জলে একাকার নমনীয় কন্যার ।
কোনো রকমে চোখের ভেজা পাপড়ি যুগল ফাঁক করে সোফায় বসলো শাফাহ্ । কিটকিট করছে দুচোখ । জ্বলন কমাতে চোখে মুখে পানি ছেটানোর মতো সামান্য বুদ্ধি টুকু নেই গবেটের মাথায় । একাধারে হাতের উল্টো পিঠে চোখ ডলেই যাচ্ছে কেবল । নাক টানছে ক্ষণে ক্ষণে ।
শুভ্র আর সায়ান ফিরলো একসাথে । আজান পড়ছে সন্ধ্যার । সদর বরাবর পিছু ফিরে সোফায় বসে শাফাহ্ । পেছন থেকে দেখেই অতিব আকাঙ্ক্ষিত আপন রমনীকে চিনতে একটুও বেগ পোহাতে হলো না সায়ানের । এক মুহুর্ত থমকালো সে । বাতাসের সাথে তার কিউটিপাইয়ের উপস্থিতির ঘ্রাণে শিথিল হলো অন্তঃস্থল । মুহুর্তেই প্রশান্ত হাসলো সে । হাতে এক গুচ্ছ গোলাপ । শাফাহ্’র বড্ড পছন্দ । আজ অবধি ওর সামনে ফুল ব্যাতীত কভুও হাজির হয় নি সায়ান ।
ভরা গাল হেসে পাশে শুভ্রর দিকে একপলক তাকালো মিটমিট করে । ঠোঁট কামড়ে এগোলো অতঃপর । কাছে যেতেই শাফাহ্’র নাক টানার শব্দ শোনা মাত্রই শিথিলতা টিকলো না আর । ধক্ করে দ্রুত কদম বাড়িয়ে মেয়েটার সামনে দাঁড়ালো ।
ঠোঁট উল্টে চোখ ডলতে দেখে তড়তড়িয়ে সামনে বসলো হাঁটু ভেঙ্গে । উদ্বেগাকুল চিত্তে বিচলিত হয়ে পড়লো….
” কিউটিপাই , কি হয়েছে ? কাঁদছিস কেনো ?
শাফাহ্ চোখ থেকে হাত সরিয়ে আধো ভেজা চোখে চায় । আসার আগে চোখে চিকন করে কাজল লাগিয়েছিলো । হাত ডলা দেওয়ায় ঘেঁটে এবড়োথেবড়ো হয়ে গেছে তা । চোখ সমেত পাপড়ি যুগল ভেজা । পিটপিট করে তাকিয়ে সায়ানের ভ্রু গুটানো উৎকন্ঠিত মুখপানে তাকিয়ে বললো….
” কাঁদছি না বাডি !
” তাহলে এই অবস্থা কেনো ? পানি কেনো চোখে ?
” আন্টি কিচেনে পেঁয়াজ কাটছে । ওখানে গেছিলাম । যা ঝাঁজ , এতেই চোখ জ্বলছে ।
” কিচেনে গেছিস কেনো তাহলে তুই ?
কন্ঠ চড়া হলেও পরক্ষনে দমন করলো । ধীরে বললো….
” না , আই মিন…
চোখে মুখে একটু পানি ছিটিয়ে নে , আর জ্বলবে না চোখ ।
” লাগবে না , ঠিক হয়ে গেছে ।
আর জ্বলছে না ।
সায়ান সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত । শাফাহ্ মাথা তুলে শুভ্র কে দেখলো । পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বুকে হাত গুটিয়ে । তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে সায়ানের দিকে । দেখছে নিজের বোনের প্রতি বন্ধুর ব্যাকুলতা ।
ভাইকে দেখে চিকচিক করে হাসলো মেয়েটা । উঠে দাঁড়িয়ে নাক টেনে ভাইয়ার দিকে ফিরে বললো….
” ভাইয়া …
বাড়ি যাবে না তুমি ? শশুর বাড়ি এসে নিজের বাড়ির কথা ভুলেই গেছো দেখছি ।
শুভ্র স্বাভাবিক হলো । বোনের দিকে তাকালো । মুচকি হেসে পকেটে হাত ঢোকালো । হাত ভরে কতগুলো ক্যাটবেরি বের করে বোনের দিকে বাড়িয়ে বললো….
” শশুর বাড়িতে এসেছি জামাই আদর নিতে । এতো তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলে হবে ? তবে, কাল যাবো ।
শাফাহ্ গদগদ হয়ে ওঠে । সব চকলেট টেনে হাতে নেয় । আর কান দেয় না কোনোদিকে । এই মেয়ে বড় পাগল এই খাবার টার প্রতি । কেউ ওকে চকোলেটের লোভ দেখিয়ে ভুলিয়ে নিয়ে গেলেও, পিছু পিছু যেতে দুবার ভাববে না এই মেয়ে । সোফায় ধপ করে বসে প্যাকেট খুলে কামড় বসালো । চোখ বুজে তৃপ্ত ভঙ্গিতে চিবিয়ে বললো…
” থ্যাংক ইউ ভাইয়া ।
সায়ান , শুভ্র দু’জনেই হাসে । সায়ান ফুলের তোড়াটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে….
” আর আমায় ?
শাফাহ্ হাতে নেয় সেটাও । পাশে রেখে খেয়ালি ভঙিতে আচমকা হাত বাড়িয়ে সায়ানের গোছানো চুল গুলো এলোমেলো করে দেয় । প্রসস্থ হেসে বলে….
” থ্যাংক ইউ বাডি….
সায়ান এক মুহুর্ত থমকায় । পরক্ষনে নিঃশব্দে হাসে ।
শুভ্র আর থামলো । মাথা ঝাঁকিয়ে সিঁড়ির পথে পা বাড়ালো । সায়ান একখানা সাদা রুমাল বের করে পকেট হতে । শাফাহ্’র দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলে….
” দেখি…
শাফাহ্ তাকানো মাত্রই মেয়েটার ভেজা চোখ গুলো আলগোছে মুছিয়ে দিলো সে । ঘেঁটে যাওয়া কাজলের দাগ তুলে নিলো সাদা রুমালে । রুমালের স্পর্শ , এটুকু আপন অধিকার বোধে । নতুবা এ অবধি সেভাবে কখনো স্পর্শ করা হয় নি শাফাহ্ কে । করবে তো করবে , একেবারে হালাল স্পর্শ ।
চোখ মুছিয়ে দিয়ে শুভ্রর পিছনে হাঁটা ধরলো সে । সিঁড়ি উঠতে উঠতে দু’জনের পা মিলতেই শুভ্র বললো প্রথমে….
” বিয়ে করে নে ওকে । তারপর যত খুশি যত্ন নিস । দ্বিধায় ভুগতে হবে না তখন ।
সায়ান কেবলই দীর্ঘ শ্বাস ফেললো….
” তোর বোন এখনো ম্যাচিউর নয় ।
” আঠারো প্লাস অলরেডি । টুয়েন্টি চলছে….
” বয়সই বেড়েছে কেবল । বোধশক্তি কম…..
আর একটু বড় হতে দে । নিজেকে বুঝতে দে , সামলাতে দে নিজেই নিজেকে । তবেই না আমাকে বুঝবে আর সামলাবে ।
” এদিকে যে তোর বয়স বেড়ে যাচ্ছে ।
” ইকুয়াল গ্যাপ । আমার বাড়লে ওর ও বাড়ছে ।
বাড়ুক । আর একটা বছর অপেক্ষা করি ?
” এক বছর ?
” হু । কম ও হতে পারে । তোর বোনের জন্য শুধু এক বছর কেনো , পুরো একটা জনম অপেক্ষা করতে বিনা দ্বিধায় প্রস্তুত আমি ।
শুভ্র মুচকি হাসলো । বললো কৌতুক স্বরে….
” ধৈর্যবান যুবক, যদি একটু পায়ের ধুলো দিতেন । তাহলে আমিও আর কিছুটা দিন অপেক্ষা করে আপনার বোনকে শুধরে নিতে পারতাম ।
” মেহের আবার কি করলো ?
” তোর বোন এখনো ভাইয়া ডাকে আমায় । গাধা একটা ।রোজ রোজ ভাইয়া ডেকে ডেকে ঘুম ভাঙায় । ক্যামনে সহ্য করি বল ?
সায়ান হো হো করে হেসে উঠলো । করিডোরে উঠে পাশাপাশি পা বাড়াতে বাড়াতে বললো….
” এজন্যই তোর বোনকে ভাইয়া ডাক থেকে বিরত রেখেছি । ভাগ্যিস ও আমাকে ভাইয়া বলে ডাকে না ।
” অভ্যাস বড় বিপদ ডেকে আনে ভাই ।
কাল সকালে মেহের কে তুই করে সম্বোধন করার জন্য বাপ – মা – বাবাই , সবার কাছে ঝাড়ি খেয়েছি ।
” এখনো মেহের কে তুই করে কথা বলিস ?
” না , তেমন টা নয় । মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় মাঝে মাঝে । তুই বরং এখন থেকেই তুমিটা আয়ত্ত করে নে । আমার যা অভিমানী বোন । বিয়ের পর ওকে তুই করে বললে , আস্ত রাখবে না তোকে ।
সায়ান নিজের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ালো । হাসলো কিছুটা । পরক্ষনে হাসি আটকে শুভ্রর দিকে তাকালো । পিছু পিছু এসেছে ও । ফিক করে ঠোঁট ফাঁক করে বললো সায়ান….
” আসলেই অভ্যাস বড়ই কঠিন । এখন তুই আমার রুমে আসছিস কেনো ? তোর বউয়ের ঘর ওদিকে , ভুলে গেলি ?
শুভ্র জিভে কামড় বসায় । মাথা ঝাঁকিয়ে বলে….
” দেখেছিস , তোর ঘরে আসাটাও ঐ অভ্যাস । মানুষ কেবলই অভ্যাসের দাস । যাই বউয়ের ঘরে । ফ্রেশ হয়ে নেই আগে ।
চটপট মেহেরের ঘরের দিকে ফিরলো শুভ্র । সায়ান ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে ঘাড় ঝাঁকায় । হাসে মুচকি ।
পর পর কয়েকটা দিন পেরিয়েছে । রোজকার রুটিন মাফিক দিন চলছে । যে যার মতো কাটাচ্ছে দিন গুলো ।
রৌদ্র দেশে ফেরার মাস পেরোলো বোধহয় । সেই বেপরোয়া, ছন্নছাড়া হয়েই দিন চলছে তারও । সারাদিনে দেখা মেলে না । রাতে ফেরে , তাও অনেক রাত করে । দেখা টুকু হয় কেবলই সকালে নাস্তার টেবিলে । তার পর উধাও হয় সেই ছেলে । সারাটা দিন কোথায় থাকে না থাকে , খোঁজ নেই । কোথায় খায় , কি খায় জানা নেই । এমনই তো ছিলো পাঁচ বছর আগেও । একটুও কি পরিবর্তন হয় নি ?
সেই ছন্নছাড়া , বিরাগী হয়েই রয়েছে এখনো । তোফায়েল কাবির ছেলের কান্ড দেখেও চুপ করে আছেন । মাঝে মাঝে রুবিনা কাবির কে কথা শোনান । শুনে যান রুবিনা কাবির । তিনি যে ছেলেকে নিয়ে বড় মুখ করে বেড়ান । কিন্তু ছেলে কি তার সেই মুখ রক্ষা করে ?
তবে একটা খটকা আছেই । এভাবে ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য টাকা কোথায় পায় রৌদ্র ? আগে তো তৌসিফ কাবির দিয়ে দিয়ে বিগড়ে ফেলেছেন । এখন কোথায় পায় ? বিদেশে পাঁচটা বছর কাটিয়েছে , ফিরে আসার পর লাক্সারিয়াস লাইফস্টাইল নজরে ঠেকেছে । কি করে ? খোঁজ খবর আর ছেলের ভাষ্যমতে ওখানে জব করতো রৌদ্র । কিন্তু কিসের জব তাও অজানা ।
এখন দেশে ফেরার এতো গুলো দিন পেরোলো । মদ গেলা , মুহুর্তে মুহূর্তে সিগারেট পোড়ানো , নামি দামি পোশাক , সারাটা দিন খেয়ালের বশে বাইরে টাইম স্পেন্ড করা, খাওয়া , এসবের টাকা আসছে কোথা থেকে ? তোফায়েল কাবির খোঁজ করেও হোদিশ পাননি । ছেলে যে কর্মঠ হয়েছে , তাও নয় । হলে পরে পরিবর্তন নজরে আসতো ।
তাহলে কি ?
তবে একটা পরিবর্তন ঠিক নজরে এসেছে । মেঘার প্রতি দূর্বলতা । তোফায়েল কাবির খুব করে লক্ষ্য করেছেন এটা । দূর্বলতা , না অন্যকিছু । তা সঠিকভাবে ধারনা নেই । তবে কিছুতো একটা বটেই ।
এটাকে গাড় হতে না দেওয়ার শত কসরত করছেন তিনি ।
আজ বৃহস্পতিবার রাত । ইদানিং রোজ রোজ ভার্সিটিতে যাওয়া হচ্ছে । সেমিস্টার শেষ প্রায় । পড়ার চাপ পড়েছে খুব । টার্ম পেপার তৈরির জন্য দুই সপ্তাহের ডেডলাইন পেরোতে হাতে আর দুটো দিন বাকি । মেঘা এখনো কিচ্ছুটি করে নি । ফেলে রেখেছে সবটা । রবিবার পেপার সাবমিটের লাস্ট ডেট । এখন এই রাত বিরেতে চিন্তায় চিন্তায় হয়রান সে । কেনো আগে থেকে ফেলে রাখলো সবটা । এখন সব ঘেঁটে যাচ্ছে ।
সন্ধ্যা হতে টানা আটটা পর্যন্ত পড়ার টেবিল বসে থেকেও লাভ হয় নি । ল্যাপটপের স্ক্রিন খুলে বসে ছিলো । হেডলাইন টুকুও লিখে শেষ করতে পারে নি ।
ডিনারের পর আবার বসেছে স্ক্রিন খুলে । অবস্থার উন্নতি নেই একটুও । মেইন টপিকের জটিল জটিল তাত্ত্বিক শব্দ গুলো কেবলই মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছে । শাফাহ্ টা কি করেছে কে জানে । এই মুহুর্তে আদ্রের সাহায্য নেওয়া ছাড়া উপায় নেই । মেঘা কিছুতেই পেপার টেস্টে মন বসাতে পারছে না । ট্রমা ক্রিয়েট হচ্ছে নিজের মাঝে । সবটা খিটখিটে অনুভুত হচ্ছে ।
শেষে কিনা সব ছেড়ে রাত্রি দশটা থেকে ল্যাপটপ খুলে রেখেই বারান্দায় বসে লাস্ট ঘন্টা যাবত ফোনে কথা বলে মন হালকা করেছে মেঘা । ফোনের ওপাশের জন বড্ড চেনা । মেঘার সবসময়ের সঙ্গী । নিজেকে রেডিওর মতো করে সব কথা উজাড় করে দেয় ওখানে । আর ও পাশের কান জোড়া মনযোগ দিয়ে শোনে সবটা ।
সবটা মেনে নেয় বিনা বাক্যে । মেঘা কেবলই চঞ্চল সেখানটায় । সব কথা বলতে পারে ওখানে । সব অভিযোগ , অভিমান , আবদার , চাওয়া পাওয়া , উগরে দেয় । বিপরীতে শান্তনা যোগে । কাছে থাকলে হয়তো আদুরে আলিঙ্গন জুটতো ।
এখন বাজে এগারোটা দশ । টানা এক ঘন্টা কথা বলে হাঁপিয়েছে একবিংশী । অবশেষে তার গল্পের ঝুড়ি খালি হলো । কান হতে ফোন নামালো । এখন প্রশান্ত অনুভুতি হচ্ছে । হালকা লাগছে নিজেকে । লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে ঘরে আসলো মেঘা । শাফাহ্ ততক্ষণে ঘুমে অচেতন । আঁধার ঘরে ডিম লাইট , আর ল্যাপটপের স্ক্রিনের আলো । ল্যাপটপ চোখে পড়া মাত্রই ফের চিন্তারা ভর করলো মাথায় । ঠোঁট উল্টে টেবিলে বসলো লাস্ট বার । ঘুম পাচ্ছে । তবুও শেষ চেষ্টা করে একটু লিখলেই এগোবে কিছুটা ।
মেঘা শান্ত মস্তিষ্কে কিছুটা টাইপ করলো ।
ব্লক কাটিয়ে টার্ম পেপারের টপিক অনুযায়ী কিছু শব্দ লিখে উঠতে পারলো অবশেষে ।
বেশিক্ষণ টেকা গেলো না ঘুমের জোরে ।
এক মুহুর্তের জন্য টেবিলে মাথা কাত করতে গিয়ে সেখানেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই আর । চেয়ারে আনইজি বসে থেকেই টেবিলের মাথা এলিয়ে কাত করে বেঘোরে ঘুমের রাজ্যে তলিয়েছে রমনী । ঘুম কাতুরে সে ।
এক হাত মাথার নিচে । অন্য হাত ঝুলে এসেছে টেবিলের পাশে । এদিক ওদিক হলেই চেয়ার ছেড়ে ধপ করে পড়তে সময় লাগবে না ।
বারোটা পেরিয়েছে সেই কখন ।
রৌদ্র ফিরেছে , ফ্রেশ হয়েছে । অতঃপর খুঁজতে বেরিয়েছে নিজের প্রশান্তি । ঘর ছেড়ে মেঘার ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো । ইদানিং মেঘা দরজা লাগালেও টুকটুকি ঘুমোনোর আগে খুলে রাখে । রৌদ্রের সাথে ডিল হয়েছে তার । বিনিময়ে চকলেট ।
ঘরে ঢুকে বিছানার উপর কেবল একজন কে দেখে কপালে ভাঁজ পড়লো বেপরোয়া লোকটার । অবয়ব দেখে বুঝতে বাকি রইলো না ,এটা তার আপন নারী নয় । ঐ ইডিয়ট কোথায় ? ওয়াশ রুমে ?
আচানক ঘাড় ঘোরাতেই দরজার পাশের টেবিলে নজর পড়লো । অমনি তিক্ত ভাঁজ পড়লো কপালে ।
কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বুকে হাত গোটালো । আসলেই এই মেয়ের যেখানে সেখানে ঘুমানোর অভ্যাস ।
সামনে ল্যাপটপ ওপেন এখনো । রৌদ্র এগোলো । মুখোমুখি হাঁটু গেড়ে বসলো । সেও একই ভাবে মাথা কাত করে টেবিলের উপর রাখলো । মৃদুমন্দ হেসে চেয়ে দেখলো ঘুমন্ত রমনীকে । এই ঘুম পরীর ঘুমন্ত চেহারা না দেখা অবধি চোখে ঘুম ধরা দেয় না ।
মেঘা মাথার চুল বাঁধে নি আজ । খোঁপা খুলে এলোমেলো চুল । রৌদ্র বিড়বিড় করে….
” ইডিয়ট !!
অতঃপর রমনীর নিথর দেহ খানা আগলে নিয়ে বিছানার দিকে এগোয় । ঘুমন্ত মেয়েটার নিস্তেজ শরীর টা খাটে বসিয়ে নিজে সামনে বসে । মেঘাকে নিজের বুকের সাথে ভর করিয়ে ওর মাথাটা নিজের বুকে রাখে আলগোছে । বিভ্রান্ত হয়ে নড়েচড়ে ওঠে একবিংশী । ঘুমের ঘোরে কুঁচকে ফেলে মুখ । রৌদ্র কিছুটা সময় দেয় ওকে শান্ত হওয়ার জন্য । পিঠে হাত বোলায় ধীরে । রমনী স্থির হতেই নিজে চোখ বুজে নেয় । মাথা এলিয়ে নাক ডুবিয়ে দেয় রমনীর কাঁধের নিকট এলোমেলো চুলের ভাঁজে । লম্বা শ্বাস টানে বুক ভরে । পরপর কয়েকটা । এই ইডিয়টের চুলের ঘ্রাণ কোনো নেশার দ্রব্যের থেকে কম নয় ।
চোখ খুললো রৌদ্র । নিজেকে সামলে চুলগুলো আলগোছে গুছিয়ে দিলো । পেঁচিয়ে বেনি পাকানোর চেষ্টা করলো । কোনমতে রশির ন্যায় পাকিয়ে তবেই থামলো ।
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৬
খোলা রাখলে এলোমেলো চুল ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাবে এই মেয়ের । তা তো হতে দেওয়া যায় না ।
সব শেষে মেঘা সন্তর্পণে শুইয়ে দেয় । বেঘোরে ঘুমানো রমনীর পানে খেই হারিয়ে তাকিয়ে রয় বহুক্ষণ । এ যেন চোখের প্রশান্তি । রোজরোজ এই প্রশান্তি না পেলে তীব্র অশান্তি লাগে ।
কিছু সময় পার করে উঠে আসে রৌদ্র । বেশিক্ষণ থাকলে নিয়ন্ত্রণ হারাবে সে । ঘুমন্ত রমনীর একটু সুযোগ নিতেও নারাজ তার বেপরোয়া হৃদয় । নতুবা কত কিছু করে ফেলতো এতো দিনে ।
বেরোনোর আগে টেবিলের উপরের ল্যাপটপ টা চোখে পড়লো রৌদ্রের । লক করার সময় আরো চোখে পড়লো টার্ম পেপারের হেড লাইন সহ আরো কয়েকটা লাইন । এই মেয়ের এসাইনমেন্ট । এটা করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো এখানে । টপিক বেশ হার্ড । রৌদ্র কিছু একটা ভাবলো । স্ক্রিন লক করে ল্যাপটপ হাতে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে বেরোলো ঘর ছেড়ে ।
