রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৯
Bobita Ray
বীথি রানীর গগনবিহারী চিৎকারে ঘুমন্ত বাড়িটা হঠাৎ জেগে উঠল। বীথি রানী বিনয়কে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে। অতিরিক্ত ভয়ে শরীর থরথর করে কাঁপছে। বিধানবাবু হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এলো। ভয় জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“কী হয়েছে বীথি?”
বীথি রানী কোন কথা বলার অবস্থায় নেই। বিনয়ের গায়ে হাত রেখে, ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। বিধানবাবু বীথি রানীর গা ধরে ঝাঁকি দিতেই বীথির হুঁশ ফিরল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমার আদরের ছেলে, আমার সোনার টুকরো ছেলে, আমার মানিক, আমার রতন আমার উপর অভিমান করে কতবড় সর্বনাশ করল রে। এই তুমি কিছু একটা করো না। আমার বাবার কিছু হলে আমি মরে যাব। আমি সত্যি সত্যি মরে যাব।”
বিনয় আত্মঘাতী করার জন্য ঘুমের ঔষধ খেয়েছে বুঝতে বিধানবাবুর কয়েক মিনিট সময় লাগল। ততক্ষণে বিনয়ের বিয়েতে আসা আত্মীয় বিনয়ের ঘরে চলে এসেছে। বিনয়ের কাণ্ডে বিধানবাবু ঘাবড়ে গেছে। অতি উত্তেজনায় কিছুতেই মাথা ঠাণ্ডা রাখা যাচ্ছে না। বিনয়ের কোন হুঁশ নেই। বিধানবাবু এ্যাম্বুলেন্স ডাকল। ভোর হওয়ার আগেই বিনয়কে নিয়ে ছুটল ডাক্তারের কাছে। প্রাইভেট হাসপাতালে বিনয়কে ভর্তি নিল না। কোন উপায় না পেয়ে সরকারি হাসপাতালে বিনয়কে ভর্তি করতে বাধ্য হলো বিধানবাবু। হাসপাতালে বিধানবাবুর পরিচিত লোক ছিল দেখে, বিনয়কে নিয়ে খুব বেশি ছোটাছুটি করতে হয়নি।
বিনয়ের পেট থেকে পয়জন ওয়াশ করা হয়েছে। এখন বিপদমুক্ত। তবে আর খানিকক্ষণ দেরি করলে পরিস্থিতি হয়তো অন্যরকম হতো। ভাগ্যিস বীথি রানী ভোররাতে অধিবাসের জন্য বিনয়কে ডাকতে গিয়েছিল। নাহলে কী যে হতো। ভাবলেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। বিনয়ের হাতে স্যালাইন চলছে। ঘুমের রেশ পুরোপুরি কাটেনি৷ বীথি রানী বিনয়ের পাশে চুপটি করে বসে আছে। বেলা গড়িয়ে গেছে। শত বলেকয়েও বীথি রানীকে এখন পর্যন্ত কেউ কিছু খাওয়াতে পারেনি। মানুষটা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। মায়ের উপরে ছেলের এত অভিমান জমেছিল। ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি বীথি রানী। তার অভিমানী ছেলেটা কেন জোর গলায় বলল না। মা আমি এই বিয়ে করব না। আমার রুপুকে চাই। আজ পর্যন্ত বীথি রানী কী ছেলের কোন অবদার ফেলেছে? ফেলেনি তো। ছেলের খুশির জন্য বীথি রানী এই আবদারটাও ঠিকই রাখতো। আজ যদি বিনয়ের ভালো-মন্দ কিছু একটা হয়ে যেত। বীথি রানী কী নিয়ে বাঁচত? আরকিছু ভাবতে পারে না বীথি রানী। পাগল পাগল লাগে।
বিনয়ের কথা রুপুকে জানানো হয়েছে। বীথি রানীর ধারণা ছিল। যত যায় হয়ে যাক। বিনয়ের বিপদের কথাশুনে রুপু ছুটে আসবে। কিন্তু কঠিন হৃদয়ের পাষাণ মেয়েটা এলো না। সে নাকি দিব্যি অফিস করছে। ভগবান মেয়েটাকে কী দিয়ে তৈরি করেছে? তার কী একটুও বুক কাঁপেনি?
পুতুল বিনয়কে বিয়ে করার জন্য খুব জেদ করছে। দরকার হলে হাসপাতালেই বিয়ে করবে পুতুল। তবুও আজকের ডেটেই বিনয়কে বিয়ে করতে চায়।
একবার শিক্ষা হয়েছে। বিনয়ের জন্য রুপুই ঠিক আছে। কোন দরকার নেই। ওই আধল্যাংটা মেয়েকে বিনয়ের বউ করার৷ রুপু স্বাধীনচেতা মেয়ে হলেও কখনো মায়ের কাছ থেকে বিনয়কে কেড়ে নেওয়ার ছলচাতুরী করেনি। অথচ ওই ননীর পুতুল বউ হওয়ার আগেই যে কাণ্ড করেছে। একবার বউ হয়ে এলে বীথি রানীকে হয়তো বিনয়ের কাছে ঘেঁষতেই দেবে না। ননীর পুতুলের বাড়ি থেকে খুব চাপ দিচ্ছে। বিয়েটা ভাঙা খুব সহজ হবে না। পুতুলকে বিয়ে না করলে বিনয়ের নামে কেসও করে দিতে পারে। এইরকম কিছু ঈঙ্গিত করছে পুতুলের বাবা।
এতবড় বিপদ থেকে একমাত্র রুপুই এখন বাঁচাতে পারে। যে জেদি মেয়ে। সহজে আসবে বলেও তো মনে হচ্ছে না।
বিনয় এখন আগের থেকে অনেকটা সুস্থ। বীথি রানী ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিনয়ের পাশে বসে গল্প করলেও বিনয় সেই আগের মতো মনোযোগ দিয়ে বীথি রানীর গল্প শুনে না।
হাসে না। প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা কথাও বলে না।
কী করলে তার ছেলেটা আবার আগের মতো প্রাণবন্ত হাসিখুশি হয়ে যাবে। বীথি রানী শত ভেবেও কুল পায় না। মাঝখান থেকে পুতুলের জন্য বীথি রানীর ছোটবোনের সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে।
বিনয় হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি আসার কিছুদিন পরে কাউকে কিছু না বলে বীথি রানী কোথায় যেন চলে গেল।
রুপু ছুটির পর বাসায় না গিয়ে পুকুর পাড়ে বসে থাকে। সারা পুকুর পদ্মফুলে ছেয়ে গেছে। পাখির কলতানে চারপাশ মুখরিত। পুকুরপাড়ে জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে বেশ লাগে। প্রতিদিনের মতো আজও সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকার ইচ্ছে। তাই চায়ের ফ্লাক্স নিয়ে বসেছে রুপু। রুপু চায়ে চুমুক দিয়ে গেইটের দিকে তাকাতেই বেশ চমকে উঠল৷ রুপু কী ভুল দেখছে? নাকি সত্যি সত্যি বীথি রানী আসছে? এই মহিলা অসময়ে এখানে কেন এসেছে। রুপু বুঝতে পারল না। তবে কিছু একটা আঁচ করতে পারল বোধহয়। রুপুকে দেখে বীথি রানীর মুখে এই প্রথমবার সত্যিকারের হাসিফুটে উঠল। বীথি রানী ভেবেই নিয়েছিল। রুপু ওনাকে দেখে খুব খুশি হবে। খুশি হয়ে ছুটে আসবে। বীথি রানীর ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। রুপু পুকুরপাড়ে আগের মতোই বসে বসে চা খাচ্ছে। বীথি রানীর দিকে তাকিয়ে আছে ঠিকই তবে উঠে এসে কথা বলার কোন আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
বীথি রানী রুপুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রুপু খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল,
“দাঁড়িয়ে আছেন কেন? জলে পা ডুবিয়ে বসুন মা। তারপর ম্যাজিক দেখুন।”
বীথি রানী সাথে সাথে জলে পা ডুবিয়ে বসল। সেই প্রথমদিন রুপু যেমন জলে পা ডুবিয়ে চমকে উঠেছিল। ঠিকই সেইভাবে বীথি রানীও চমকে উঠল। রীতিমতো ভয় পেয়ে চিল্লিয়ে উঠল। রুপু খিলখিল করে হেসে দিল। বীথি রানী ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তবে কিছু বলল না। রুপু বলল,
“চা খাবেন মা?”
“না।”
“খেয়ে দেখুন এককাপ চা। ভালো লাগবে।”
রুপু চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে পুকুরের জলে কাপটা ধুয়ে ফেলল। তারপর ফ্লাক্স থেকে কাপে চা ঢেলে শাশুড়ী মায়ের হাতে দিল। বীথি রানী চায়ের কাপে তৃপ্তি করে চুমুক দিল। রুপু বলল,
“ভাত খেয়ে যাবেন? নাকি এখুনি চলে যাবেন?”
বীথি রানী হতভম্ব হয়ে গেল। এই মেয়েটা এত রসকষহীন কেন? ভদ্রতা করেও তো একবার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল। আপনার ছেলে এখন কেমন আছে মা? আপনি এতদূর কষ্ট করে আসলেন কেন? আমাকে বললেই তো আমি চলে যেতাম৷
“কী ভাবছেন মা?”
“না কিছু না।”
“বাড়িটা সুন্দর না মা?”
“সুন্দর।”
“আপনাদের বাড়ির থেকেও সুন্দর, তাই না?”
“জানি না।”
“জানবেন কীভাবে? ভালো করে দেখুন। তারপর বলুন।”
“তুমি আমার সাথে চলো রুপু।”
“আচ্ছা।”
বীথি রানী আশ্চর্য হয়ে বলল,
“আমি কিন্তু সত্যি সত্যি যেতে বলছি।”
রুপু হেসে ফেলল। বলল,
“আমিও তো সত্যি সত্যি যেতে চাচ্ছি।”
বীথি রানীর সন্দেহ তবুও দূর হলো না। এত সহজ পাত্রী তো রুপু না। হঠাৎ কী হলো ওর?
“তাহলে ব্যাগপত্র গুছিয়ে নাও।”
“গোছানোর তেমন কিছু নেই। এতদূর কষ্ট করে এসেছেন৷ আমার সাথে বসে চারটা ডালভাত খাবেন। তারপর আপনার সাথে যাব। সঙ্গে কী গাড়ি এনেছেন মা?”
“এনেছি।”
“তাহলে রাত হলেও চিন্তা নেই। চলুন ঘরে যাই।”
বীথি রানী দ্বিমত করল না। রুপুর ঘরে গেল। রুপুর ঠাম্মি সাথে পরিচয় হলো। ভদ্রমহিলা প্রচুর কথা বলে। অসুস্থ ছেলেকে একা বাড়িতে রেখে এসে এমনিতেই চিন্তার শেষ নেই। তারউপর এই বুড়ির বকবক শুনতে ভালো লাগছে না। বিরক্ত লাগছে।
অনেকগুলো দিন পর ভরপেট ভাত খেল বীথি রানী। রুপু ঠাম্মির কাছ থেকে পান সাজিয়ে এনে দিল। পান দেখে বীথি রানীর চোখে জল এসে গেল। রুপুর সামনে কাঁদা যাবে না। অন্যদিকে তাকিয়ে চোখের জল চট করে মুছে ফেলল।
রুপুকে দেখে প্রচণ্ড অবাক হলো বিনয়। শেষ কবে এত খুশি হয়েছিল বিনয়। সঠিক মনে পড়ছে না। বিনয়ের উচ্ছ্বাস দেখার মতো। রুপুকে দেখে একবার হাসছে, একবার কাঁদছে। একবার নিজের হাতে চিমটি কেটে দেখছে। রুপু কী সত্যি এসেছে। নাকি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে। না স্বপ্ন না৷ রুপু সত্যিই এসেছে। মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মাথা নুইয়ে গেল বিনয়ের৷ বার বার খুশি খুশি গলায় মাকে বলতে লাগল,
“এই অসাধ্য কী করে সাধন করলে মা? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না। রুপু সত্যি সত্যি এসেছে।”
রুপুর প্রতি ছেলের অতিরিক্ত আবেগ একদম সহ্য হচ্ছে না বীথি রানীর। মনে মনে প্রচুর রাগ লাগছে। তবে বিনয়ের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে বীথি রানীকেও মিথ্যেমিথ্যি হাসির অভিনয় করতে হচ্ছে।
রুপুর এই বাড়িতে আসার কারণটা রাতে জানা গেল। রুপু পরীক্ষা দিতে এসেছে। পরীক্ষা শেষ হলেই যথাসময়ে আবারও চলে যাবে। শেষের কিছু পরীক্ষা অনেক গ্যাপে গ্যাপে। তখন অফিস করে পরীক্ষা দিতে সরাসরি আসবে। রাতটা শুধু থেকে ভোরেই চলে যাবে। আগামীকাল শুক্রবার। শনিবারে পরীক্ষা নেই। রবিবারে পরীক্ষা আছে। পরীক্ষার জন্য দুইদিন ছুটি নিয়েছে রুপু।
রুপু বিনয়ের জন্য আসেনি। পরীক্ষা দিতে এসেছে। কথাটা শোনার পর থেকে বিনয়ের বুকের ভেতরে অসহ্য যন্ত্রণা করছে। মন পুরোপুরি ভেঙে গেছে।
রাতে অতিথি ঘরে পড়ার বাহানায় ঘুমাতে গেছে রুপু। রাগে, দুঃখে বিনয়ের শরীর কাঁপছে। এই মেয়েটা এত পাষাণ কেন?
বিনয় ধুমধাম পা ফেলে ছাদে উঠে এলো। উন্মাদের মতো ঘরের দরজা ধাক্কাতে লাগল। চাপা কণ্ঠে বলল,
“রুপু..রুপু দরজা খুলো? দরজা খুলো বলছি।”
রুপু দরজা খুলে দিল। বিনয় রুপুর হাতে বই দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। রুপুর হাত থেকে বইটা কেঁড়ে নিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলল। তারপর রুপুর একহাত আঁকড়ে ধরে মলিন কণ্ঠে বলল,
রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৮
“তুমি সত্যি সত্যি পরীক্ষা দিতে এসেছ? আমার জন্য আসোনি?”
রুপু হেসে ফেলল। একচোখ টিপে বলল,
“এক ঢিলে দুই পাখি মারতে এসেছি।”
বিনয় বোকার মতো রুপুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু জল জমতে লাগল।
