Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৩

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৩

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৩
মাইশা জান্নাত নূরা

গাড়িটার গতি যেনো রাতের নিস্তব্ধতাকে চি*ড়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। অনুর কোলে মাথা রেখে নি*স্তেজ হয়ে পড়ে আছে নির্ঝর। ওর শার্টটার জায়গায় জায়গায় রক্তের দলা জমাট বেঁধে বেঁধে আছে। পেটের ক্ষতস্থান থেকে এখনও ধীরে ধীরে রক্ত বের হচ্ছে। অনুর দু’হাত কাঁপছে। তবুও অনু ওর এক হাত দিয়ে নির্ঝরের পেটের ক্ষ*তটা আলতো ভাবে ধরে রেখেছে। আর অন্য হাত দিয়ে বারবার ওর গালে আলতো চাপ দিতে দিতে বলছে…..

—”নির্ঝর! শুনতে পারছেন আপনি? চোখ বন্ধ করবেন না। দয়াকরে চোখ খোলা রাখুন।”
নির্ঝর আর কোনো সাড়া দিচ্ছে না। হাসিখুশি, চন্ঞ্চল, অতিরিক্ত-অপ্রয়োজনীয় কথা বলা ছেলেটা এভাবে নিথর হয়ে পরে থাকবে কখনও কেউ ভাবে নি। অনুর বুকের ভিতরটা কেমন মো*চড় দিয়ে দিয়ে উঠছে। কোনোভাবেই ও মানতে পারছে না নির্ঝর ওদের ছেড়ে চলে যাবে এমন জায়গায় যেখান থেকে কখনও কেউ ফেরত আসে না যেমন আর আসে নি ওর জন্মদায়িনী মা। অনু কাঁপান্বিত গলায় আবারও বললো….
—”আপনি কথা বলছেন না কেনো এখন আর! একটু কিছু বলুননা! এভাবে একেবারে চুপ হয়ল থাকবেন না। শুনছেন! নির্ঝর!”
সামনে বসে থাকা তেজ বারবার পিছনে তাকাচ্ছে। ওর বুকের ভিতরেও চাপা য*ন্ত্রণা কাজ করছে নির্ঝরের নিস্তেজ শরীরটা দেখে। কিন্তু এই মুহূর্তে ভে*ঙে পড়লে চলবে না।
তেজ ওর জিহ্বার অগ্রাংশ দিয়ে শুকনো ঠোঁটজোরা হালকা ভিজিয়ে নিয়ে বললো….

—”অনু, ওকে ডাকতে থাকো। নির্জীব হয়ে ঘুমাতে দেওয়া যাবে না।”
অনু শুধু মাথা নাড়লো। অতঃপর অনু নির্ঝরের মুখের খুব কাছে ঝুঁকে গিয়ে কাঁপান্বিত গলায় বললো….
—”নির্ঝর! আপনি তো বলেছিলেন আমাকে একা ছাড়বেন না। তাহলে এখন এমন করছেন কেনো? আপনি তো জানেন আমার মা-ও আমায় একা ছেড়ে চলে গিয়েছেন আমার জন্যই। আজ আপনি যদি চলে যান আমি বাঁচতে পারবো বলে মনে হয় আপনার? বিশ্বাস করুন, বাঁচবো না। ম*রে যাবো। এবার আর ধুঁ*কে ধুঁ*কে ম*রার মতো ধৈর্য থাকবে না। একেবারেই জানটা দিয়ে দিবো।”
পরপরই নির্ঝরের আঙুলগুলো সামান্য নড়লো। অনুর কাঁতর চোখে তা লক্ষ্য করে “নির্ঝর!” বলে ডাকলো। নির্ঝর খুব ধীরে চোখ খুলে নিজের ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে তাকালো অনুর দিকে। পেটের ক্ষ*ত এখন এতোটাই য*ন্ত্রণা দিচ্ছে নির্ঝরকে যে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে ওর খুব। নির্ঝর ওর ঠোঁটের ভাঁজ থেকে বের করলো অনুর নামটা…..

—”অ-অনু….!”
অনু দ্রুত স্বরে বললো…..
—”এইতো আমি। আমি আছি আপনার পাশে। আপনার খুব কাছাকাছি এখানেই আছি আমি। দেখুন আপনি!”
নির্ঝর অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে অনুর অস*হায়, কাঁ*তর, ক্লান্ত মুখশ্রী পানে। নির্ঝরের এমন দৃষ্টি অনুর ভিতরটা পু*ড়িয়ে ছা*ড়-খা*র করার জন্য যথেষ্ট। নির্ঝর ধীর স্বরে বললো…..
—”আপ-আপনি-বাঁচবেন! শু-শুনছেন! আমি না থাকলেও আপনি থাকবেন। আপনার মা’কে দেওয়া কথা আপনাকে রাখতে হবে অনু।”
কথাগুলো বলতে নির্ঝরের ভিষন ক*ষ্ট হচ্ছে। নির্ঝর তবুও বলার চেষ্টায় খামতি রাখছে না। আবারও বললো…..
—”অ-অনেক, অনেক দিন বাঁচবেন আপনি। হাসবেন, কান্না করবেন না। নি-নিজের কোনো ক্ষ*তি কর-করবেন না। নিজেকে ভালো রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। আমার মৃ*ত্যুর জন্য কখনও নিজেকে দা*য়ী বানাবেন না। শুনছেন আপনি! আপনি নির্দোষ। আপনি সম্পূর্ণ ভাবেই নির্দোষ। আমার এই শেষ অনুরোধ টুকু রাখবেন আপনি। আমায় ওয়াদা দিন! অ-অনু!”
এই অবস্থাতেও নিজের কথা না ভেবে নির্ঝরের চিন্তাজুড়ে অনু কেবল নিজেকে থাকতে দেখে ওর দু’চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে শুরু হলো। নির্ঝর বললো…

_”ব-বললাম না কাঁদবেন না! কথা দিন আমায়! প্লিজ অ-অনু! পি….!”
বাকি কথাটুকু শেষ করতে পারলো না নির্ঝর ওর ঠোঁট জোড়াও আর সায় দিচ্ছে না তা ভেদ করে ভেতরের শব্দগুলোকে বাহিরে আনতে। পরপরই তীব্র কাশিতে নির্ঝরের সর্বশরীর কেঁপে উঠলো। আবারও বেড়িয়ে এলো মুখ ভর্তি র*ক্ত। অনু আত*ঙ্কি*ত চোখে তাকিয়ে দ্রুত নিজের চোখ মুছতে মুছতে বললো……
—”আমি কাঁদছি না নির্ঝর! দেখুন আমার চোখে কোনো পানি নেই। আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না। দয়া করে যাবেন না। ও নির্ঝর! শুনছেন! ওও নির্ঝর সাহেব! আমায় একলা করে যাবেন না। আমি কিভাবে করবো আমার মা’কে দেওয়া শেষ বিদায়ের সময় সেই কথার পুনরাবৃত্তি আপনার জন্যও! আমি পারছি না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে নির্ঝর। বিশ্বাস করুন আমি পারছি না। আপনি আমার সাথে থাকবেন। যাবেন না যা…..!”
নির্ঝর এবার চোখ বন্ধ করে নিলো পুরোপুরি। অনুর আত্মচিৎকার নির্ঝরের কান পর্যন্ত পৌঁছালেও ওর মস্তিষ্ককে ছুঁতে পারছে না হয়তো আর। সামনে স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে ড্রাইভ করা সারফারাজের হাতের রগগুলো হালকা ফুলে উঠেছে। সারফারাজ এবার গাড়ির স্পিড আরো বাড়িয়ে দিলো। তেজ ইতিমধ্যেই ওদের পরিচিত হাসপাতালে কল করে নির্ঝরের ট্রিটমেন্ট এর জন্য ইমার্জেন্সি টিমকে রেডি রাখতে বলে দিয়েছে।
হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনে এসে তীব্র শব্দ তুলে গাড়ি থামলো সারফারাজ। গাড়ি পুরোপুরি থামার আগেই সারফারাজ ও তেজ অন্যপাশ থেকে দরজা খুলে নেমে পড়লো। ইতিমধ্যেই স্ট্রেচার নিয়ে ডাক্তার, নার্স ও কয়েকজন ওয়াডবয় উপস্থিত হয়েছেন। অনু ওর কাঁপান্বিত হাতে নির্ঝরের বুঁজে থাকা মুখশ্রীর একাংশ ছুঁয়ে বললো….

—”নির্ঝর! আমরা হাসপাতালে চলে এসেছি। আর একটু ধৈর্য ধরুন। প্লিজ!”
নির্ঝরের চোখ দু’টো ৩ভাগ বন্ধ ও ১ ভাগ খোলা আছে। নিঃশ্বাসটা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ভারী হয়ে আসছে। ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া র*ক্তের দাগের মাঝেও ফাঁটল দেখা যাচ্ছে। সারফারাজ নির্ঝরকে পাঁজাকোলা করে গাড়ি থেকে নামাতেই নির্ঝরের মাথাটা হেলে পড়লো একপাশে।অনুর বুকটা আবারও ধক করে উঠলো। এখন প্রতিটা সেকেন্ডে ওর মনে হচ্ছে এই বুঝি ও শুনে নির্ঝর ওদের ছেড়ে চিরতরের জন্য হারিয়ে গিয়েছে অজানায়। ওয়ার্ডবয়ের সাহায্যে নির্ঝরকে দ্রুত স্ট্রেচারের উপর শুইয়ে দেওয়া হলো।ডাক্তার নির্ঝরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বললেন….
—”রোগীর অবস্থা খুবই ক্রি*টি*ক্যাল। অনেক র*ক্ত-ক্ষ*রণ হয়েছে। দ্রুত ওটিতে নিতে হবে।”
অনুর চোখের সামনে যেনো পুরো পৃথিবীটা যেনো দুলে উঠলো। অনু নিজেকে কোনোরকমে সামলে নিয়ে বললো…..

—”ডাক্তার, উ-উনি ঠিক হয়ে যাবেন তো?”
ডাক্তার স্ট্রেচারের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই বললেন….
—”আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। বাকি ভরসা আল্লাহ তায়ালার উপর রাখুন। দোয়া করুন রোগীর জন্য।”
স্ট্রেচারটা দ্রুত ওটির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওটির সামনে আসতেই অনু একপ্রকার অবাধ্যের ন্যায় ভিতরে যেতে নিলে একজন নার্স ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন…..
—”ম্যাম, আপনি ভিতরে যেতে পারবেন না।”
অনু অনুনয়ের স্বরে বললো…..
—”আমাকে যেতে দিন। দয়াকরে যেতে দিন! উ-উনি ভিতরে একা ভয় পাবেন। আমাকে একবার যেতে দিন!”
—”দুঃখিত। এটা নিয়মের বাহিরে। আপনাকে বাকিদের সাথে এখানেই অপেক্ষা করতে হবে।”
এই বলে নার্সটি ভিতরে প্রবেশ করে ওটির দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলেন। দরজার উপরে “অপারেশন থিয়েটার” লেখা লাল বাতিটা জ্বলে উঠলো পরপরই। অনু নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ধপ করে বসে পড়লো মেঝের উপর। তেজ এগিয়ে আসতে নিলে সারফারাজ ওকে থামিয়ে দিলো। চোখের ইশারায় না করলো এইমূহূর্তে অনুর কাছে যেতে। তেজ শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্লান্ত শরীরটা দেওয়ালের সাথে ঠেকিয়ে দাড়ালো। অনু দুই হাত দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো…..

—”আল্লাহ! আপনি তো পরম করুণাময়। আপনার অসীম দয়া। দয়া করে মানুষটাকে আপনি বাঁচিয়ে দিন। ও আল্লাহ! আমার মায়ের বেলায় যে নিষ্ঠুরতা আপনি দেখিয়েছিলেন সেই একই রূপ ওনার সময় দেখাইয়েন না দয়া করে। আপনার কাছে আমি ভিক্ষা চাইছি আল্লাহ। ওনার জান আপনি ভিক্ষা দিন। ভিক্ষা দিন।”
তেজের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে বোঝার বয়স থেকে নির্ঝর যে ছিলো ওর সর্বক্ষণের ছায়াসঙ্গী ওর সাথে কাটানো অসংখ্য স্মৃতিসমূহ। আজ সেই ছেলেটাই জীবন ও মৃ*ত্যুর সাথে ল*ড়াই করছে। তেজের দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রুধারা। তেজ ওর মাথাটা নিচু করে চোখ দু’টো বন্ধ করে বিরবিরিয়ে বলতে লাগলো….
—”ইয়া আল্লাহ! নির্ঝরকে আপনি ফিরিয়ে দিন। ওর দু’চোখ ভরা অনেক স্বপ্ন। নিজের জীবনটাকে দারুণ ভাবে কাটানোর অনেক আকাঙ্ক্ষা জমে আছে ওর মন জুড়ে। জানের বদলে আপনার দরবারে জান হাজির করা হবে। আপনি ওর আয়ু বাড়িয়ে দিন। আমার ভাইটাকে আপনি সুস্থ করে দিন আল্লাহ।”

সারফারাজ নি:শব্দে সেখান থেকে সরে অন্যত্র এসে দাঁড়ালো। সামনে লোহার গ্রিল দিয়ে পথ কাটানো। এই রাস্তায় শেষ এখানেই। সারফারাজ গ্রিলটা একহাতে শক্ত করে ধরে মেঘে ঢাকা আকাশের পানে তাকালো। যে হাতে ও গ্রিলটা ধরে রেখেছে সেই হাতেই নির্ঝরের শরীরের তাজা রক্তের ছো*প ছো*প দাগ দৃশ্যমান হয়েছে। যা ইতিমধ্যেই শুকিয়ে গেছে। সারফারাজের পরণে থাকা সাদা পান্ঞ্জাবিটার বুকের কাছটা সম্পূর্ণই র*ক্তে ভিজে গাঢ় লাল বর্ণ ধারণ করেছে। শুকিয়ে তা আরো গাঢ় হয়েছে। সারফারাজের শক্ত শরীরের ভিতরে লুকিয়ে থাকা দূর্বল হয়ে আসা ভঙ্গুর অবস্থার মনটা যেনো চিৎকার করে আল্লাহর দরবারে ভিক্ষা চাইছে তেজ ও অনুর মতোই, নির্ঝর যেনো বেঁচে যায়। বড় ভাই হয়ে সে পারবে না আদরের ছোট ভাইটার লাশ কাঁধে তুলে কবরে শুইয়ে দিয়ে আসতে। এতো শক্তি ওর মাঝে নেই।

সময় যেনো থেমে আছে। সেকেন্ডগুলোকে মনে হচ্ছে এক একটা ঘণ্টার মতো করে পার হচ্ছে। অটির বাহিরে তিন স্থানে দাঁড়িয়ে ও বসে থাকা ৩ অসহায় প্রাণের মাঝে আত*ঙ্কের মাত্রা বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।
অনু এখনও মেঝেতেই বসে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে কান্না করতে করতে মেয়েটার চোখ-মুখ ফুলে লাল হয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝেই অনু ওটির বন্ধ দরজাটার দিকে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখনই হয়তো দরজাটা খুলে যাবে আর নির্ঝর হেঁটে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আগের মতো রাগী স্বরে বলবে….
—”এভাবে কাঁদছেন কেনো আপনি? আপনাকে বলেছিলাম না আমি আপনার কান্না সহ্য করতে পারি না! কথা শুনেন না কেনো আপনি? বড্ড অবাধ্য আচারণ করছেন।”
কিন্তু দরজাটা সেই আন্দাজে খুলছে তো না। আরো প্রায় ঘন্টা খানেক পর ওটির দরজার উপরে জ্বলে থাকা লাল বাতিটা নিভে গেলো। সারফারাজ ও তেজ পাশাপাশি চেয়ারে বসে ছিলো। ওরা সহ অনুও উঠে দাঁড়ালো। কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলে একজন ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।
ওরা ডাক্তারের সামনে দাঁড়ালো। সারফারাজ বললো….

—”ডাক্তার, আমার ভাই কেমন আছে?”
ডাক্তার গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন…..
—”রোগীর শরীর থেকে প্রচুর র*ক্ত-ক্ষ*রণ হয়েছে। আমি যতোটুকু ধারণা করেছিলাম তার থেকেও বেশি। তার পেটে লাগা ছু*রির তিনটে আ*ঘাতের মধ্যে একটি খুব গভীর ছিলো। সেই ক্ষ*ত থেকেই ব্লেডিংটা বন্ধ করা যাচ্ছিলো না। তবুও অনেক চেষ্টার পর আমরা আপাতত ব্লিডিং হওয়াটা কন্ট্রোল করতে পেরেছি।”
অনুর দম বন্ধকর অনুভূতি কাজ করছে ডাক্তারের কথাগুলো শুনে। তেজ বললো….
—”আমরা কি এবার নিশ্চিত হতে পারি যে আমাদের ভাই এখন বিপদমুক্ত?”
ডাক্তার বললেন….
—”এই মুহূর্তে তেমন কিছুই বলা যাচ্ছে না। কারণ রোগীর যে অবস্থা তাতে ওনার জন্য আগামী চব্বিশ ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
অনু নিস্তব্ধের ন্যায় কেবল দাঁড়িয়ে শুনছে সব কথা। ডাক্তার আবারও বললেন…..

—”তবে একটা ব্যাপারে পজেটিভ বার্তা দিতে হচ্ছে। এমন ক্রি*টি*ক্যাল অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আমরা রোগীর মধ্যে বাঁচার প্রবল ইচ্ছাশক্তিটা লক্ষ্য করেছি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উনি হাল ছাড়ছেন না। আর আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা তো করেইছি। বাকিটা এখন মহান আল্লাহর হাতে।”
সারফারাজ দু’চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললো। মনে মনে ‘শুকুর আলহামদুলিল্লাহ’ বললো কয়েকবার। অতঃপর ডাক্তার চলে গেলেন। তার কিছুসময় পর একজন নার্স এসে বললেন…..
—”রোগীকে আইসিইউতে শিফট করা হয়েছে। আপনাদের রিলেটিভদের মাঝে মাত্র একজন কিছুসময়ের জন্য রোগীর সাথে দেখা করতে পারবেন৷ তবে উত্তেজিত হওয়া যাবে না রোগীর কাছে যাওয়ার পর।”
নার্সটি চলে গেলেন। তেজ আর সারফারাজ একে অপরের দিকে তাকালো। অনু নিচের দিকে তাকিয়ে আছে কেবল নিজের ক্লান্ত মুখশ্রীটা নিয়ে। সারফারাজ ধীর গলায় বললো….

—”অনু, তুমি যাও নির্ঝরের কাছে।”
অনু অবাক চোখে তাকালো সারফারাজের দিকে। ও ভাবে নি ওকেই এইমূহূর্তে যেতে বলবে সারফারাজ। সারফারাজ আবারও বললো…..
—”আমার ভাইটা তোমাকে বাঁচানোর জন্য নিজের জানের মায়া ত্যাগ করেছিলো। তাই ওর সাথে ১ম সাক্ষাৎ-এর অধিকার তুমিই রাখো অনু। যাও ভিতরে।”
অনুর চোখ আবারও ভিজে উঠলো। অনু ধীরপায়ে আইসিইউর সামনে এসে দরজাটা ঠেলে খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো। সাদা বিছানার উপর নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে নির্ঝর। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় তার জড়িয়ে আছে। হাতে স্যালাইন এর লাইন লাগানো, মুখে অক্সিজেন মাস্ক পড়ানো রয়েছে। হার্টবিট এর মাপটা পাশেই একটা স্ক্রিনের উপর উঠানামা করতে দেখা যাচ্ছে। কিছুটা রাগী, মজা-মশকরায় মেতে থাকা মানুষটাকে আজ বড্ডা অসহায় দেখাচ্ছে। অনু নির্ঝরের বেডের পাশে রাখা চেয়ারটা টেনে সেখানে বসলো।
অতঃপর কাঁপা হাতে নির্ঝরের হাতটা নিজের হাতের মাঝে নিতেই হালকা শীতল অনুভূতি কাজ করলো অনুর। অনু ধরে আসা গলায় বললো…

—”নির্ঝর! চোখ মেলে তাকান একবার! দেখুন আমি এসেছি।”
কোনো সাড়া অনু পেলো না নির্ঝরের থেকে। অনুর দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো নির্ঝরের হাতের উপর। অনু আবারও বললো…….
—”আপনি না বলেছিলেন আমাকে একা ছেড়ে কোথাও যাবেন না! তাহলে এখন কেনো এভাবে শুয়ে আছেন?”
অনু কয়েকসেকেন্ড এর জন্য চুপ করে থাকার পর বললো…

—”আপনি সুস্থ হয়ে উঠুন নির্ঝর। আপনার কাছে আমার অনেক প্রশ্ন করার আছে। উত্তর গুলো না জানিয়ে স্বার্থপরের মতো আপনি আমায় ছেড়ে চলে গেলে ভালো হবে না একদম বলে দিচ্ছি। আল্লাহর দোহাই লাগে আপনাকে, আপনি ফিরে আসুন, সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন আবারও সবার মাঝে।”

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪২

পরমুহূর্তেই অনুর মনে হলো নির্ঝরের আঙুলগুলো সামান্য নড়ে উঠলো। অনু বিস্ময়কর চাহুনি নিয়ে তাকালো নির্ঝরের দিকে। নির্ঝরের চোখের পাতাও হালকা কেঁপে উঠলো।অনু আশাভরা কন্ঠে “নির্ঝর” বললো। কিন্তু পরমুহূর্তেই সবকিছু আবারও আগের ন্যায় নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। তবুও অনুর মনে হলো, এই মানুষটা ফিরতে চাইছে ওদের মাঝে। একটু সময় প্রয়োজন ওনার।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here