Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৩

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৩

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৩
insia isha chowdhury

রাফি তোমার সাহস কত বড়! কী করছো তুমি আমার বোনের সঙ্গে? এক্ষুনি, এই মুহূর্তে তুমি ঋতুকে ছেড়ে দাও।”
এই মুহূর্তে রাফি এক হাত দিয়ে ঋতুর চুল ধরে আছে, আর ঋতু এক হাত দিয়ে রাফির চুল ধরে আছে। তাদের দুজনেরই মত, অন্যজন আগে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু কেউই কাউকে সরি বলতে রাজি নয়। তাই কেউ কারও চুলও ছাড়ছে না। এদিকে প্রণয়ের কথাকে দুই পয়সারও পাত্তা না দিয়ে রাফি বলল,
“আমি কেন আগে তোমার বোনকে ছাড়ব? ও আমার সঙ্গে বেয়াদবি করেছে। আর সবথেকে বড় কথা, ও আমার চুল ধরে টেনেছে। কেউ আমার চুলে হাত দিক, এটা আমি একদম পছন্দ করি না।”
সূচনা প্রণয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। রাফির কথা শুনে ওর আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। নিজের বাম গালে হাত রেখে আস্তে করে বলল,

“এটা একদম সত্যি কথা। ছোটবেলায় আমি রাফি ভাইয়ার চুল টেনে দিয়েছিলাম। উনি আমাকে এক চড় মেরে দিয়েছিলেন। ওইদিন আমি কী কান্নাটাই না করেছিলাম!”
সূচনা আস্তে করে কথাগুলো বললেও প্রণয়ের কানে ঠিকই গেল। আর ব্যস! সূচনার মুখে এমন কথা শুনে প্রণয় নিজের মেজাজ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলল। সে সোজা গিয়ে কোনো কিছু চিন্তা না করেই ঋতুকে রাফির হাত থেকে ছাড়িয়ে দিল। তারপর ঠাস করে রাফির বুকের কাছে এক ধাক্কা দিল। হঠাৎ এমন আক্রমণে তাল সামলাতে না পেরে রাফি পড়ে যেতে লাগল। তবে শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল সে। সূচনা আতঙ্কে মুখে হাত দিয়ে দিল। নিজের ভাইকে সঠিক কাজ করতে দেখে ঋতু বলল,
“বেশ হয়েছে! তুমি জানো ভাইয়া, ও কী বলেছে? ও বলেছে তুমি আর আমি নাকি…”
ঋতু নিজের কথা শেষ করতে পারল না। তার আগেই প্রণয় গর্জে উঠল,
“শাট আপ! একদম চুপ কর!”

প্রণয়ের রামধমক খেয়ে ঋতু অনেকটাই ভয় পেয়ে গেল। রাফি ভালোভাবে দাঁড়িয়ে রাগী দৃষ্টিতে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। সুপ্তি তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এসে ঋতুর হাত ধরল। তারপর বলল,
“কী হয়েছিল এখানে? আর এই লোকটার সঙ্গে আবার কীভাবে ঝামেলা হলো?”
এসব কর্মকাণ্ডে প্রণয় প্রচণ্ড পরিমাণে ক্ষেপে আছে। কিন্তু সুপ্তির মুখে “আবার ঝামেলা” কথাটা শুনে সে অবাক হয়ে গেল। আবার ঝামেলা মানে?
প্রণয় সুপ্তির দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল,
“আবার ঝামেলা মানে? আসলে রাফি আর ঋতুর মধ্যে কী হয়েছিল?”
প্রণয়ের এমন রূপ বাড়ির মানুষ বহু বছর পর দেখছে। কারণ প্রণয় যেমন শান্ত স্বভাবের মানুষ, তেমনি রেগে গেলে তার মেজাজ ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। আর সেই রাগ সহজে ভাঙেও না। বাড়ির প্রত্যেকেই প্রণয়ের রাগকে ভীষণ ভয় পায়।
সুপ্তি কিছু বলছে না দেখে প্রণয় চিৎকার করে বলল,

“সুপ্তি! আই অ্যাম আস্কিং ইউ সামথিং!”
প্রণয়ের এমন ধমকানিতে সুপ্তির হাত থেকে ওর নোট খাতাটা গুলো নিচে পড়ে গেল। সূচনা এগিয়ে এসে প্রণয়ের এক বাহুতে হাত রেখে বলল,
“আপনি এত চিৎকার করছেন কেন?”
প্রণয় এবার সুপ্তি আর ঋতু দুজনের উদ্দেশে বলল,
“আমি কিছু জিজ্ঞাসা করছি, তোরা দুজন নিজের মুখ বন্ধ করে রেখেছিস কেন? আর কী এমন হয়েছিল যে তোরা এমন জঘন্যভাবে মারামারি করছিলি?”
সুপ্তি ছলছল নয়নে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আসলে একদিন আগে আমি আর ঋতু একটা জায়গায় যাচ্ছিলাম। তখন আমাদের গাড়ির সঙ্গে ওনার গাড়ির একটা ছোটখাটো এক্সিডেন্ট হয়।”
রাফির দিকে ইশারা করে সে আবার বলল,
“তারপর ঋতু ওনার সঙ্গে ঝগড়া করে। পরবর্তীতে ঝামেলা বাড়লে উনি ঋতুর মাথায় এক বোতল পানি ঢেলে দিয়েছিলেন।”

সব ঘটনা শুনে প্রণয় সুপ্তি আর ঋতু দুজনকেই বকা দিয়ে বলল,
“এত কিছু হয়ে গেছে, অথচ আমাকে জানানোর প্রয়োজন পর্যন্ত বোধ করিসনি তোরা দুজন?”
প্রণয়ের কথা শুনে সুপ্তি আর ঋতু দুজনেরই মন খারাপ হয়ে গেল। সুপ্তি কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু ভয়ে আর কিছু বলতে পারল না। ওর ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠছে। এদিকে সোহেল কোনো দিকে না তাকিয়ে শুধু সুপ্তির দিকেই তাকিয়ে আছে। মেয়েটা কত ভদ্র! এখন কতটা ইনোসেন্ট দেখাচ্ছে সুপ্তিকে। আর কী সুন্দর আস্তে আস্তে, এক টুকরো এক টুকরো করে কথা বলছে। কিন্তু সুপ্তি চোখে জমে থাকা জল দেখে সোহেল মনে মনে বিরক্ত বোধ করে বলল,
“বুঝলাম না ঝগড়া করল ঋতু, মারামারি করল রাফি আর ঋতু। তাহলে মাঝখান থেকে এই প্রণয় শালা কেন সুপ্তিকে বকছে?”
প্রণয় আরও কিছু বলতে যাবে, তখন সোহেল বলল,
“প্রণয়, তুই থাম। এই বিষয়টা বসে কথা বলা উচিত। এত রাগারাগি করা ঠিক না। আর এই রাফি ভাই, আপনি কে? বাড়িতে এসেই বাড়ি মাথায় তুলে নিয়েছেন।”
সোহেলের কথায় সবাই রাফির দিকে তাকাল।
রাফির এই মুহূর্তে নিজের গালে নিজেই চড় বসাতে ইচ্ছে করছে। সে কীভাবে এই পাগল মেয়েটার সঙ্গে পাগলামি করতে পারল!
ঠিক তখনই সূচনা সবার উদ্দেশে বলল,

“রাফি, উনি আমার ভাইয়া হন। আমার মামাতো ভাই।”
ঋতু তাৎক্ষণিক রাফি আর সূচনার দিকে তাকাল। তারপর বুঝতে পারল, এই লোকটা আসলে তার ভাবির ভাই। আর সেই কারণেই হয়তো এ বাড়িতে এসেছে। সেই মুহূর্তে সবাই চুপ করে ছিল। আর তখনই সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাফি দরজার ওপারে চলে গেল। রাফিকে যেতে দেখে সূচনা আতঙ্কে বলে উঠল,
“ভাইয়া, প্লিজ! তুমি চলে যেও না। কেউ তোমাকে অসম্মান করতে চায়নি। আমরা বসে কথা বলতে পারি।”
সূচনাকে এতটা তার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে দেখে রাফি মুচকি হাসল। তারপর দরজার বাইরে গিয়ে বড় ফুলের তোড়াটা হাতে নিয়ে সূচনার দিকে এগিয়ে এল। এতক্ষণ এই ছেলে বাড়িটাকে কুরুক্ষেত্র বানিয়ে রেখেছিল, আর এখন আবার হাসছে! সোহেলের সত্যি সত্যিই এই মুহূর্তে মনে হলো, এই ছেলের মাথায় কোনো সমস্যা আছে নাকি? রাফি ফুলের তোড়াটা সূচনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“চিন্তা করিস না। আমি এসব আলতু-ফালতু লোকের কথা শুনে এখান থেকে চলে যাব না। আমি তোকে দেখতে এসেছি, তোর সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। তুই আমার কাছে সবথেকে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। তোর সঙ্গে কথা না বলে আমি কীভাবে চলে যাই বল?”

রাফির কথা শুনে মুহূর্তেই সূচনা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যাক, তাহলে রাফি রাগ করেনি। সে আসলে ভয় পাচ্ছিল, রাফি বাড়ি গিয়ে যদি তার মামীকে এসব কিছু বলে দেয়! আর তার মামী যদি এসব নিয়ে কোনো ঝামেলা করেন! এমনিতেই তিনি সবসময় ঝামেলা করতে পছন্দ করেন। আর রাফির প্রতি তিনি যে কতটা পজেসিভ, সেটা সূচনা খুব ভালো করেই জানে। ঠিক এজন্যই সে ভয় পাচ্ছিল। তবে যেহেতু রাফি কিছু মনে করেনি এবং তাকে স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে, তাই সূচনাও খানিকটা স্বস্তি পেল।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই সূচনা প্রণয়ের দিকে তাকাল, আর সঙ্গে সঙ্গেই যেন আরেক বিপদে পড়ে গেল। এই মুহূর্তে প্রণয় ওর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন এখনই চোখের দৃষ্টিতেই সূচনাকে গিলে খাবে। অস্বস্তিতে সূচনা দৃষ্টি সরিয়ে রাখল রাফির হাতে ধরা ফুলের তোড়াটার দিকে। ফুলের তোড়াটা বেশ বড়। পুরো তোড়াজুড়েই সাদা গোলাপ। ছোটবেলায় সূচনা সাদা গোলাপ ভীষণ পছন্দ করত। সেই পুরোনো পছন্দের কথা মনে রেখেই রাফি আজ এই ফুলগুলো নিয়ে এসেছে।

রাফি ফুলের তোড়াটা সূচনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নিতে বলতেই অস্বস্তি যেন আরও গভীরভাবে তাকে গ্রাস করল। ও যদি রাফির হাত থেকে এই ফুল নেয়, তাহলে ঘরে ফিরে প্রণয় কি ওকে আর আস্ত রাখবে? তারপরও যদি রাফি আজ স্বাভাবিকভাবে বাড়িতে আসত, কোনো ঝামেলা না করত, তাহলে হয়তো প্রণয়ের কিছু বলার সুযোগ থাকত। কিন্তু বাড়িতে এসে রাফি যে কাণ্ডগুলো করেছে, তার পর এখন আর তার বলার মতো কোনো মুখই অবশিষ্ট নেই। ঠিক সেই মুহূর্তেই রাফির বাড়িয়ে দেওয়া ফুলের তোড়াটা প্রণয় এক ঝটকায় নিজের হাতে কেড়ে নিল। রাফি প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে রাগান্বিত স্বরে প্রণয়কে বলল,
“এই ফুলগুলো আমি সুজির জন্য এনেছি। তাহলে কোন হিসেবে তুমি এই ফুলগুলো নিচ্ছ?”
এমনিতেই সূচনাকে ‘সুজি’ বলে ডাকায় প্রণয়ের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ছিল। তার পিচ্চি বউকে অন্য কেউ কেন ‘সুজি’ বলে ডাকবে? ওর নাম কি সুজি? নিজের ভেতরের জ্বলতে থাকা ক্রোধটাকে কোনোমতে সংযত করে প্রণয় ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,

“ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন, সূচনার এই ফুল একদমই পছন্দ নয়।”
রাফি প্রশ্ন করল,
“আচ্ছা, তাই নাকি? তাহলে ওর পছন্দ কী, দেখি তুমি বলো।”
প্রণয় মুহূর্তের জন্য সূচনার দিকে তাকাল। সূচনা মনে মনে ভাবল, প্রণয় তো তাকে মাত্র কদিন হলো চেনে। সে কী করে জানবে তার পছন্দ-অপছন্দ? আর এত মানুষের ভিড়ে হঠাৎ এসব প্রসঙ্গই বা এল কোথা থেকে? ভাবতেই ও ভীষণ বিরক্ত বোধ করল। সবচেয়ে বড় কথা, তার প্রিয় ফুলের কথা তো সে কখনো কাউকেই বলেনি। তাহলে প্রণয় কীভাবে বলবে যে তার কী পছন্দ? কিন্তু পরমুহূর্তেই তাকে অবাক করে দিয়ে প্রণয় সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,

“ওর জুলিয়েট রোজ পছন্দ। বলতে গেলে এই ফুলটাই ওর সবচেয়ে প্রিয়।”
কথাটা শুনে সূচনা বিস্মিত দৃষ্টিতে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রণয় কীভাবে জানল যে ওর জুলিয়েট রোজ পছন্দ? সে তো এই কথাটা কখনো কাউকে বলেনি। এমনকি পরিবারেরও কেউ জানে না। তাহলে প্রণয় জানল কীভাবে? রাফির অবশ্য কথাটা একটুও বিশ্বাস হলো না। ছোটবেলা থেকেই সে দেখেছে, সূচনাদের বাগানে সবচেয়ে বেশি লাগানো হতো সাদা গোলাপ, কারণ সেটাই নাকি সূচনার প্রিয় ছিল। সে সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সুজি, তুই বল! ও মিথ্যা কথা বলছে। তোর পছন্দ সাদা গোলাপ, কোনো জুলিয়েট ফুলিয়েট রোজ না। আর সেটা আমি ভালোমতোই জানি।”
সূচনা চোখের পলক না ফেলেই শান্ত স্বরে বলল,
“না, তুমি ভুল জানো এটা সত্যি। আমার সত্যিই জুলিয়েট রোজই পছন্দ।”
রাফি অবাক হয়ে বলল,
“সুজি, তুই এসব কী বলছিস?”

রাফির এমন আচরণে উপস্থিত সবাই প্রায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। প্রণয় কিছু বলার আগেই সোহেল মুখ খুলল,
“আরে মিস্টার রাফি, এসব সুজি-হালুয়া-পরোটা পরে বলবেন। আগে ভেতরে চলুন। আপনি দেখছি এখানে আর কাউকেই চোখেই দেখছেন না। যখন থেকে এসেছেন, শুধু সুজি, সুজি করেই যাচ্ছেন। সুজিকে ছাড়ুন, সুজি এখন বুকড। আশেপাশে খুঁজলে দেখবেন পায়েসও আছে, সেদিকেও একটু খেয়াল রাখুন।”
কথা শেষ করেই সোহেল নিজের কথাতেই হেসে উঠল। রাফি আর তেমন কিছু বলতে পারল না। ছোটবেলা থেকেই তার স্বভাব এমন। মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে না, কথাও বলতে পারে না। তার কমিউনিকেশন স্কিল বরাবরই দুর্বল। সে নিজের মনের কথা কখনোই কাউকে বলে বুঝাতে পারে না। কথাটা দুঃখের হোক বা সুখের হোক সে কখনোই কাউকে কোন কিছু বলতে পারে না। রাফি মাত্র ১৬ বছর বয়সে কানাডায় পড়াশোনার উদ্দেশ্যে গিয়েছিল এবং পরবর্তীতে সেখানেই জব করা শুরু করেছিল। এখন তার বয়স ২৮। অথচ এই পুরো ১২ বছরের সময়টাতেও রাফি ওখানে কোন ভালো বন্ধু বানাতে পারেনি। কারণ ও মন খুলে তেমন কারো সাথে কথাই বলতে পারেনা।

সব সময় নিজেকে গুটিয়ে রাখে। এইজন্য হয়তো নিজের মনের কথাও কখনো সূচনাকে বলতে পারিনি।
পরিস্থিতি আবার খারাপের দিকে যাচ্ছে বুঝতে পেরে সূচনা নরম গলায় বলল,
“ভাইয়া, তুমি ভেতরে এসে বসো। মানুষের পছন্দ তো সময়ের সঙ্গে বদলাতেই পারে, তাই না? এতে খারাপের কিছু নেই। তুমি আমার জন্য ফুল এনেছ, এতেই আমি খুশি হয়েছি। চলো, ভেতরে গিয়ে বসো।”
রাফি আর কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। প্রণয় নিজের হাতে থাকা ফুলের তোড়াটা পাশেই ফেলে দিয়ে এগিয়ে এসে সূচনার হাতটা আলতো করে ধরে ফেলল। সবকিছু দেখে ঋতুও তাদের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। এদিকে সুপ্তি খেয়াল করল, তার হাত থেকে নোটখাতাগুলো মাটিতে পড়ে গেছে। সেগুলো তুলতে সে একটু ঝুঁকতেই সোহেল তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে সব খাতা তুলে নিল। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে সুপ্তি অবাক হয়ে সোহেলের দিকে তাকিয়ে রইল। সোহেল খুশিমনে হেসে কপালে থাকা চুলগুলো বা হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে বলল,

“হ্যালো, আমি সোহেল। নাম তো সুনা হি হোগা!”
সোহেলের এমন থার্ড ক্লাস কথায় সুপ্তি কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার হাত থেকে নোটখাতাগুলো নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো। তখন সোহেল আবার বলল,
“ আচ্ছা সুপ্তি, তোমার অনেক বেশি বুদ্ধি, তাই না?”
সুপ্তি সোহেলকে তেমনভাবে চিনত না। অথচ এই লোকটা তার নাম জানে এতে খানিকটা অবাক হলো। পেছন ফিরে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমার বুদ্ধি থাকুক আর না থাকুক, তাতে আপনার কী?”
সোহেল মনে মনে একটু হেসে ফেলল। বাহ! এই মেয়ের তো বেশ তেজ আছে। এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, আর এখন মুখে যেন খই ফুটছে!
তারপর সে বলল,

“না, মানে… আমার কিছু না। তবে তোমাকে একটা প্রশ্ন করার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম।”
সুপ্তি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কী প্রশ্ন?”
এই মুহূর্তটারই অপেক্ষায় ছিল সোহেল। এক মুহূর্তও দেরি না করে বলে উঠল,
“আচ্ছা, তোমার ছেলে আর আমার মেয়ে যদি আপন ভাইবোন হয়, তাহলে তুমি আমার সম্পর্কে কী হও?”
এমন আজব প্রশ্ন শুনে সুপ্তি প্রথমে পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। পরক্ষণেই প্রশ্নটার আসল অর্থ বুঝতে পেরে ওর মেজাজ মুহূর্তেই বিগড়ে গেল। সে রাগী দৃষ্টিতে সোহেলের দিকে তাকিয়ে একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেলল। বাঁ হাত দিয়ে চশমাটা ঠিক করে নিল। ভালোমতো পড়ে তারপর আর একটি কথাও না বলে সেখান থেকে চলে গেল।

অন্যদিকে প্রণয়ের বাকি তিন বন্ধু রাজা, রনি আর শুভ একসঙ্গে প্রণয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে এসে পৌঁছাল। দরজার সামনে সোহেলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনজন এগিয়ে এসে বলল,
“কী ব্যাপার সোহেল? তুই কি আমাদের স্বাগত জানানোর জন্য এখানে দাঁড়িয়ে আছিস?”
কিন্তু সোহেলের যেন ওদের কোনো কথাই কানে গেল না। সে একদৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর দৃষ্টির অনুসরণ করে তিনজনও সামনে তাকাতেই দেখতে পেল, অফ-হোয়াইট রঙের একটি পোশাক পরা একটি মেয়ে ধীর পায়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। মেয়েটিকে দেখে ওরা তিনজন একসঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
“ভাই, মেয়েটা কে? আর তুই এভাবে কি দেখছিস?”
সোহেল সঙ্গে সঙ্গে ওদের দিকে ফিরে গম্ভীর মুখে বলল,
“চুপ থাক, পাপীর দল! খবরদার, কেউ চোখ দিবি না। ওটা তোগো ভাবি হয়!”
রাজা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২২

“ভাবি হয় মানে? কিন্তু এটা কে?”
সোহেল মুখে মুচকি হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আরে, এটা প্রণয়ের খালাতো বোন, সুপ্তি। কী কিউট নাম, আর দেখতেও কী কিউট! আমি কিন্তু তোদের আগে থেকেই বলে রাখছি, খবরদার! কেউ যদি ওর সঙ্গে লাইন মারার চেষ্টা করিস, তাহলে আমি কিন্তু তোদের লাইনই কেটে দেব। ওর সঙ্গে লাইন মারার অধিকার শুধু আমার!”
সোহেলের কথা শুনে রাজা, রনি আর শুভ একসঙ্গে হেসে উঠল। তারপর রাজা বলল,
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমরা আমাদের হবু ভাবীর দিকে নজর দেব না। এখন চল, ভেতরে যাই।”

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here