আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৮ (৩)
অরাত্রিকা রহমান
রাত-১১টা~
চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় রাতের আকাশটা মোহনীয় হয়ে আছে। আশেপাশের সব কিছু খালি চোখে দেখার মতো স্পষ্ট। কয়েক দিনে যাবত বিয়ের আমেজে উন্মত্ত থাকা রহমান বাড়ি আজ নিস্তব্ধ। বাড়ির ছোট্ট, দুরন্ত মেয়েটা আজ শ্বশুড়বাড়ি চলে গেছে বলে সকলের মনে বিষন্নতা। তবে প্রকৃতির নিয়মে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় আছেন রোকেয়া বেগম ও শফিক রহমান। বাড়িতে এখন মোটে তিন জন। চাচা চাচি সঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে মিরা নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে রোকেয়া বেগম মিরার উদ্দেশ্যে বললেন –
“মিরা, ঘরে গিয়ে তোর রাতের ওষুধ গুলো খেয়ে নিস মনে করে। রিভান কল করে বলেছে তোকে মনে করিয়ে দিতে নাহলে নাকি ভুলে যাবি। খেয়ে নিবি কিন্তু মনে করে। আর কোনো দরকারে আমি ডাকবি।”
মিরা রোকেয়া বেগমের দিকে আশ্চর্য চোখে তাকালো-
“তোমাকে কল করেছিলেন উনি? কখন?”
-“এই তো খেতে বসায় আগেই করেছিল। আমি রান্না ঘরে ছিলাম। তুই তোর ঘরে ছিলি।”
মিরা হতাশ কণ্ঠে বলল- “একবার ডাকতে আমায়.. আমার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলেন হয়তো।”
রোকেয়া বেগম খাবার টেবিলটা গোছাতে গোছাতে বললেন- “কই না তো, রিভান তোকে চাইলে তো আমি ডাকতাম তোকে। ও তো শুধু বলল তোকে ঠিক সময়ে ওষুধ খেয়ে নিতে। আমিও রান্নায় ব্যস্ত ছিলাম তাই আর নিজের থেকে ডাকি নি। তুই বরং একবার কল করে নে।”
রায়ান তার সাথে কথা বলার আগ্রহ দেখাইনি শুনে মিরার মন বেজার হলো তবে সে বুঝতে পারছে রায়ান তার উপর অভিমান করেই কল করেনি তাকে। কিন্তু বউ বাচ্চার প্রতি যত্নশীলতাও লোকটার রক্তে মিশে গেছে তাই রোকেয়া বেগম কে কল করা হয়েছে। মিরা চাচির কথায় বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে চলে গেল নিজের ঘরে। বিছানার উপর অযত্নে পড়ে থাকা ফোনটা রায়ান যাওয়ার পর থেকে একবারও বাজে নি। ভারাক্রান্ত মনে মিরা নিজের ফোন হাতে তুলে নিয়ে রায়ানের নাম্বারে কল করে ফোনটা কানে ধরে তার বারান্দার ফুল গাছ গুলোর দিকে এগিয়ে গেল। ফুল গাছের ফুল গুলো আঙুল দিয়ে স্পর্শ করতেই মিরার মুখে একটা সুক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠলো। রায়ানের ফোনে কল ট্রান্সফার হতেই হঠাৎ মিরা তার আশে পাশেই কোথাও আবছা সুরে চেনা পরিচিত সেই রিং টোন শুনতে পেল-
Girl na you dey make. My temperature dey rise
If you leave me, I go die…I swear
You are like the oxygen I need to survive
I’ll be honest Your loving dey totori me
I, I’m so obsessed
I want to chop your nkwobi..”
মিরা অবাক হয়ে বান্দা থেকে নিজের নজর ঘুরিয়ে দেখলো। এই রিং টোন কেবল তার কলেই বাজে রায়ানের ফোনে। কয়েকবার রিং হতেই রায়ান কলটা রিসিভ করলো-
“হ্যালো..!”
মিরা খেয়াল করলো এখন আর সেই গানের আওয়াজটা আসছে না। মিরা অবাক হয়ে ফোনটা কানে ধরলো। রায়ান মিরার সাড়া না পেয়ে আবারো অপর দিক থেকে ডাকলো-
“হ্যালো, হৃদপাখি? কথা বলছো না কেন? কিছু হয়েছে!? মিরা..”
মিরা হাকচকিয়ে উঠলো- “হ্যাঁ, জি। না, কিছু হয় নি।”
মিরা হঠাৎ বাড়ির পিছনের দিকে একটা কালো রঙ্গের গাড়ি খেয়াল করলো। গাড়ির দৃশ্যমান অংশ টুকু মিরার খুব চেনা। মস্তিষ্কে একটু জোড়ে ফেলতেই মিরার মনে পড়লো রায়ানের গাড়ি ঠিক এমনটাই দেখতে। মিরার মনে সন্দেহের বীজ বপন হলো। চোখে মুখে একটু কুটিল ভাব নিয়ে মিরা রায়ান কে জিজ্ঞেস করলো-
“আচ্ছা, আপনি এখন ঠিক কোথায় বলূ্ন তো?”
রায়ান সোজাসাপ্টা জবাব দিল-
“কোথায় আবার ঢাকায়। আমার স্টাডি রুমে।”
-“স্টাডি রুমে কি করছেন?”
-“স্টাডি রুমে আমি কি করি?! কাজ করছি ল্যাপটপে অবভিয়েসলি।”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দার রেলিং এ হেলান দিয়ে দাড়িয়ে বুকে আড়াআড়ি বেঁধে সরিয়াস ভঙ্গিতে বলল-
“আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। ভিডিও কলে আসুন তো।”
রায়ান ঘাবড়ানো কণ্ঠে বলল-
“একটা ইমপোর্টেন্ট ফাইল চেক দিচ্ছি। ভিডিও কলে আসতে পারবো না এখন।”
মিরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বাড়ির নিচের গাড়িটা খেয়াল করছে। চাঁদের আলো গাড়ির কাঁচ চকচক করছে, তবে উপর থেকে স্পষ্ট কিছু দেখা যাচ্ছে না। মিরা রায়ানের অযুহাতে মনোযোগ দিল না। সে শান্ত ভঙ্গিতে রায়ান কে বলল-
“মনে তো হচ্ছে না কাজ করছেন। আচ্ছা একবার আপনার সামনের ল্যাপটপ টা বন্ধ করে আবার খুলুন তো। ভিডিও কল না করা গেল, আওয়াজ শোনাতে তো আর সমস্যা নেই।”
রায়ান তাড়াহুড়ো করে নিজের ল্যাপটপ টা বের করে সেটা ওপেন করলো। মিরা খেয়াল করলো গাড়ির ভেতরে একটা আলো জ্বলে উঠলো। মিরা সেই দিকে খেয়াল করতেই তার চোখে রায়ানের অবয়ব ভেসে উঠলো। ল্যাপটপের আলো রায়ানের মুখের উপর পড়ছে। মিরা ঠোঁট টিপে হেসে মুখে হাত রেখে নিজের ঘরে চলে এলো। অদ্ভুত খুশিতে তার মন এখন উচ্ছ্বাসে দুলছে। মিরা রায়ানের কথা চিন্তা করে বিছানায় নিজের গা এলিয়ে দিল। তার মানে সকালে বাড়ির বাইরে তখন রায়ানের ছায়াই দেখতে পেয়েছিল মিরা। মিরা নিজের মাথায় হাত দিয়ে অবিশ্বাস প্রকাশ করলো। মনে মনে বিড়বিড় করলো-“পাগল লোক একটা, আমাকে ছাড়া থাকতে পারবেন না তো চলে যাওয়ার ভান করলেন কেন? এখন লুকিয়ে লুকিয়ে বউয়ের উপর নজর রাখছেন গাড়িতে বসে। এটা কোনো কথা?”
রায়ান মিরার বিশ্বাস অর্জনের লক্ষ্যে বলল-
“কি..?! শুনেছ আওয়াজ? বিশ্বাস হয়েছে এখন?”
মিরা নিজের হাসি ধমনের তীব্র চেষ্টায় ব্যস্ত। কোনো মতো স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর করলো-
“হুম, হুম শুনলাম।”
রায়ান গম্ভীর গলায় ভাব নিয়ে বলল-
“এই কয়দিনে অনেক কাজ জমা হয়েছে। শেষই হচ্ছে না। ভীষণ ইম্পর্ট্যান্ট কাজ…তোমার আর কিছু বলার না থাকলে ফোন রেখে ঘুমিয়ে পড়ো।”
মিরা রায়ানের কথায় অভিমানের ছাপ অনুভব করলো। সে ভালো করেই জানে এই অভিমান ঠিক কি করলে গোলবে। মিরা সেই উদ্দেশ্যে নরম ও মিষ্টি হেঁসে বলল-
“আমার আর কোনো কথা নেই, ঘুমাতেও চাইছি। কিন্তু আপনার প্রিন্সেস না নিজে ঘুমাচ্ছে আর না আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছে। তার নাকি খুব আপনার কথা মনে পড়ছে। আপনাকে ছাড়া ঘুম আসছে না। আপনার সাথে তার অনেক কথা আছে।”
মিরার মুখে এসব কথা শুনে রায়ানের হৃদয়ের সকল কঠোরতা দুমড়ে মুচড়ে গেল। সিটে পিঠ ঠেকিয়ে রায়ান নিজের কপালে হাত রেখে আনমনে বিড়বিড় করলো-
“কি হাড়ে বজ্জাত বউ আমার! এভাবে কে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে? আল্লাহ তুমি আমাকে ধৈর্য দাও।”
মিরা রায়ানের শ্বাস প্রশ্বাসেরর গতি অনুভব করেও ছেলেটার তার কাছে আসার ব্যাকুলতা অনুভব করতে পারছে। মিরা তার পেটের উপর ফোনটা রেখে রায়ানের উদ্দেশ্যে বলল-
“নিন.. কথা বলুন আপনারা।”
রায়ান শুকনো ঢোক গিলে আবেগী শব্দের জিজ্ঞেস করলো-
“প্রিন্সেস.. তুমি কি করছো আম্মু? মাম্মা কি খাবার খেয়েছে? ওষুধ খেয়েছে?”
রায়ানের করা প্রশ্ন গুলো আসলে মিরার জন্য ছিল যা মিরার বুঝতে বিন্দু মাত্র অসুবিধা হলো না। মিরা ছোট্ট বাচ্চার আওয়াজে নরম গলায় বলল-
“হুম, খেয়েছে। তোমাকে ভীষণ মিস করছি আমি আর মাম্মা।”
রায়ানের ঠোঁটে ফাঁক গলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো -“উফফ্…!” অতঃপর শান্ত গলায় বলল-
“মাম্মা কে বলো পাপা ও তোমাদের ভীষণ মিস করছে। তাড়াতাড়ি সাবধানে মাম্মার সঙ্গে চলে এসো সাপার কাছে।”
মিরা মনে মনে জেদ ধরেই নিয়েছিল রায়ান তাকে নিতে না এলে সে যাবে না। আর এখন রায়ান কে দেখে সে নিশ্চিন্ত হয়েছে। মিরা একই কণ্ঠস্বর ধরে রেখে রায়ান কে জিজ্ঞেস করলো-
“তুমি আমাদের নিতে আসবে না পাপা?”
রায়ান হাঁফ ছেড়ে নিজের মাথা সিটের পিছন দিকে হেলিয়ে দিয়ে জেদি একরোখা সিদ্ধান্তে অটল থেকে ছোট্ট উত্তর দিল- “না..!”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“ভালোই অভিমান হয়েছে সাহেবের। বাচ্চার দোহাই ও খাটলো না! আর কি করা যায়?”
একটু ভেবেই মিরা কুটিল বাঁকা হাসলো। সে ফোনটা নিজের কানে ধরে বলল-
“বাপ বেটি অনেক কথা বলেছে এবার আমার কথা শুনুন, জানেন আপনি যাওয়ার পর আজকে কি হইছে?”
রায়ান মিরার স্বাভাবিক গলা শুনে মনে মনে বিড়বিড় করলো- “একটু আগেই বললো তার নাকি কিছু বলার নেই আর এখন..!”
-“জি, ম্যাডাম বলুন। কি হয়েছে?”
মিরা দুষ্টু হেঁসে বলল-
“আজকে আসিফ ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছে।”
রায়ানের কানে তৎক্ষণাৎ ঘণ্টা বাজলো সজোরে। সে তো ঢাকা যায় নি। মাঝ রাস্তা থেকে ফিরে আসতে আসতে আসিফের সাথে দেখা হয়েছে বিষয় টা চিন্তা করে রায়ানের মাথা উলোট পালোট হলো। রায়ান শুরু তেই রাগ না করে নিজেকে শান্ত রাখলো-
“ওহ আচ্ছা, ভালো তো। ঠিক আছে।”
মিরা ঠোঁট টিপে হেসে আরো বলল-
“আমাকে দেখে বলল আমি নাকি অনেক বদলে গেছি। আরো বলেছে আমি নাকি অনেক গ্লো করছি। আমি আর কি বলি বলুন তো!”
রায়ানের হাতের পাঁচ আঙুল মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো রাগে। রাতে কাজ করতে করতে খাওয়ার জন্য আনা চিপসের প্যাকেটে জোরে একটা ঘুষি মেয়ে প্যাকেট টা ফাটিয়ে ফেলল। মিরা অপর পাশ থেকে এই বিকট আওয়াজ টা শুনে হেঁসে উঠলো তবে হাসির আওয়াজ আড়াল করলো। রায়ান মিরার উদ্দেশ্যে দাঁতে দাঁত চেপে বলল-
“বলতে পারো নি, তোমার ভেতরে আমার অংশ আছে তাই গ্লো করছো।”
মিরা চোখজোড়া বন্ধ করে নিয়ে আবলতাবল উত্তর করলো-“ভুলে গেছিলাম আসলে। মনে ছিল না বলতে।”
মিরা ধীর পায়ে বারান্দায় গেল রায়ানের অবস্থা স্বচোক্ষে দেখতে। রায়ান গাড়ির স্টেয়ারিং-এ সজোরে আঘাত করে বিড়বিড় করলো- “আআআআ..তুই প্রেগন্যান্ট এইটা তুই কেমনে ভুলিস বেয়াদব বউ কোথাকার।”
রায়ান চিপসের প্যাকেট টা ছিঁড়ে কয়েকটা চিপস মুখে দিতে নিলে মিরা সেসময় ইচ্ছে করে আরো বাড়িয়ে বলল-
“জানেন আসিফ ভাইকে দেখে মনে হলো অনেক ওয়েট লস করেছে এই কয়দিনে।”
রায়ান এ কথা শুনতেই হাতের চিপস গুলো হাতেই পিষে গুরো গুরো করে ফেলল। মিরার মুখে হাত চেপে নিজের হাঁসি ধরে রাখার চেষ্টা করছে। রায়ান অস্থির হয়ে গাড়ি থেকে বিরেয়ে এলো। রায়ান নিজের দুচোখের কোণায় আঙুল চেপে বলল-
“এ আবার এমন কি? সহজেই হয়ে যায়।”
মিরা হাঁসি গিলে বলল-
“বাই দ্যা ওয়ে, দেখতে কিন্তু আগের থেকে ভালোই লাগছিল।”
রায়ানের এই কথা গুলো গায়ে ঠিক গরম তেলের ছিটের মতো লাগছে তাই সে কথা থামাতে বলল-
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমার একটু কাজ আছে আমি আমার কাজ করি।”
মিরা খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করলো-
“আপনার ভালো লাগছে না তাই না? হিংসে হচ্ছে?”
রায়ান ধরা পড়ে যাওয়ার মতো হকচকিয়ে কেশে বলল-
“কি অদ্ভুত! আমার কেন হিংসে হবে?”
মিরা এবার প্যারেকে শেষ আঘাত টা দিয়েই বসলো-
“ওহ্ ভালো কথা, কাল আসিফ ভাই একবার দেখা করতে বলেছেন। আপনি থাকলে আপনাকে নিয়েই যেতাম কিন্তু আপনিতো চলে গেলেন। এখন আমি ভাবছি গিয়ে একবার দেখা করেই আসি আবার কবে না কবে আসবো।”
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে নিজের হাত পুরো শক্তিতে উপরে তুললো ফোনটা আছাড় দিতে কিন্তু এই কথার শেষ কোথায় তা না জানলেও তো চলবে না তাই আর ফোনটার জীবন সীমা বৃদ্ধি পেল। রায়ান নিজের মাথার চুল খামচে ধরে তার কোনো ফারাক পড়ছে না এমন দেখাতে ভারী নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলল-
“ঠিক আছে।”
মিরা শুধু উপর থেকে রায়ানের হাল বেহাল হতে দেখছে। মিরাও কম যায় না সেও কথা ঘুরিয়ে বলল-
“আমি ভাবছি যাব কিনা। গেল যদি আপনার খারাপ লাগে। আচ্ছা আপনার মনে যা আসছে আপনি তা আমাকে বলতে পারেন।”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুলে মাটিতে পুশ-আপ দিতে দিতে বলল-
“সবই তোমার ইচ্ছে। এখন এই বিষয়ে আমি আর কি বলবো?”
মিরা রায়ানের কর্ম কান্ড দেখে হাঁফ ছেড়ে বলল-
“আরে স্বীকার করে নিন না, আপনার হিংসে হচ্ছে। আপনি জ্যাইলাস মি. রায়ান চৌধুরী।”
রায়ানের ধৈর্যের সমাপ্তি ঘটলো। এক প্রকার চিকিৎসা করে উঠলো সে-
“জ্যাইলাসি মাই ফুট। আই ডোন্ট গিভ আ ফাক টু দ্যাট ইডিয়ট। ডু ইউ হিয়ার মি?”
মিরা হাড় মেনে নিল। এর বেশি আগালে নিচ থেকে তার উন্মাদ বরের উপরে আস্তে সময় লাগবে না। আর এমন রাগ সামাল দেওয়ার শক্তি এখন তার নেই। মিরা কপালে হাতের তালু হালকা করে আঘাত করে বলল-
“ওকে ফাইন। ইউ আর নট জ্যাইলাস। বাট আই অ্যাম স্লিপি। সো গুড নাইট।”
মিরা এই বলে ফোন কাটলো। কিন্তু রায়ানের ঘুম তো এখন পগারপার। রায়ান চটজলদি উঠে দাঁড়িয়ে ফোনটা শক্ত করে হাতে চেপে ধরে বিড়বিড় করলো-
“আমার স্লিপ হারাম করে এখন মহারানি স্লিপি। আমিও দেখবো কিভাবে দেখা করতে যাও তুমি হৃদপাখি। যদি ওই হারামজাদা তোমার আশেপাশেও আসে, আই উইল কিস ইউ ইনফ্রান্ট অফ হিম। আই সুয়ের!”
রাতে মিরার বেশ ভালোই ঘুম হয়েছে রায়ান তার কাছেই আছে জানতে পেরে। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে মেয়েটা। সকালের সূর্যের কিরণ তার চোখ স্পর্শ করতেই মিরা টলমলে চোখে কচলে বিছানায় উঠে বসলো।
-“গুড মর্নিং মিসেস..!”
-“হুম, গুড মর্নিং হাবি..!”
রায়ানের ভারী কণ্ঠের শুভেচ্ছায় অভ্যাসগত কারণে মিরা তা গ্রহণ করলো ঘুমকাতুরে স্বরে। চোখ ডলতে ডলতে হঠাৎ রায়ানের অস্তিত্বের আভাস মাথায় স্পষ্ট হতেই মিরার ঘুম উড়ে গেল। বড় বড় চোখ করে সামনের দিকে তাকাতেই দেখলো। নিদ্রাহীন রক্তিম ফোলা এক জোড়া চোখ তাকে এক নজরে দেখে যাচ্ছে যেন এক্ষুনি গিলে খাবে তাকে। মিরা হতভম্ব হয়ে কেবল তাকিয়েই রইল। রায়ান নিজের চোখ কচলে মিরাকে বলল-
“গেট রেডি। বের হতে হবে।”
মিরা কিছু বলার আগেই রায়ান ওয়াশ রুম ঢুকে গেল। সম্ভবত চোখে মুখে একটু পানি দিতে। রায়ান ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়েও মিরাকে একই ভাবে বিছানায় বসে থাকতে দেখে গম্ভীর গলায় বলল-
“মিরা..আমার কাজ আছে। তোমার জন্য নিজের কাজ ফেলে এখানে পড়ে থাকার কোনো মানে হয় না। রেডি হও। আমি এই নিয়ে তোমার সাথে তর্কে যেতে চাই না। আমার এনার্জি নেই।”
মিরা রায়ানের শুকনো মুখ দেখে আর কিছু বললো না। চুপচাপ বিছানা থেকে নেমে ওয়াশ রুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে রেডি হয়ে রায়ানের হাত ধরে নিচে নামলো। মিরা আর রায়ান কে দেখে রোকেয়া বেগম খাবার টেবিল থেকেই বললেন-
“এই দিকে আয় খেতে বসে যা তাড়াতাড়ি। অনেক লম্বা জার্নি করতে হবে।”
মিরা কিছু টা অবাক হলো রোকেয়া বেগমকে এতো স্বাভাবিক আচরণ করতে দেখে। মূলত রায়ান সকাল সকাল দরজার বেল বাজিয়েই বাড়িতে ঢুকেছে মিরাকে নেওয়া উদ্দেশ্যে। এই নিয়ে শফিক রহমান ও রোকেয়া বেগমের সাথে ছোট খাটো তর্ক বিতর্ক ও হয়েছে তার তবে সব শেষে সে বিজয়ী। রায়ান মিরার হাত ধরে তাকে খাবার টেবিলে নিয়ে গিয়ে বসালো। একসাথে নাস্তা করে দুজনে বাড়ির বাইরে পা ফেলল। রায়ান মিরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“তোমার ওই আসিফ ভাই কই? দেখছি না কেন?”
মিরা অবুঝ মুখ করে রায়ানের দিকে মাথা উঁচু করে বলল-
“আমি কি জানি আসিফ ভাই কই। আমার সাথে কথা হয়েছে নাকি?”
রায়ান ছোট ছোট চোখে মিরার দিকে তাকিয়ে দেখলো। মিরার কপালে গালে গলায় হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করে বলল-
“তোমার কি শরীর খারাপ করছে? নাকি আমি পাগল হয়ে গেছি। রাতের এতো কাহিনী পুরোটাই কি কল্পনা ছিল নাকি?”
মিরা লজ্জায় মাথা নিচু করে নিয়ে মিনমিনে আওয়াজে বলল-
“পাগল কেন হতে যাবেন? কল্পনাই বা কেন করবেন? আমিই ইচ্ছে করে বলেছি ওগুলো বানিয়ে বানিয়ে। আপনি এখানে থেকেও আমাকে ইগনোর করছিলেন এটা আমার ভালোই লাগছিল না। তাই দুষ্টুমি করেছি একটু।”
রায়ান হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মিরার মায়াবী মুখটার দিকে। তার মনে অদ্ভুত এক শান্তি কাজ করলো মিরা বলা সব কিছু মিথ্যে প্রমাণিত হওয়ায়। রায়ান মিরার চিবুক হাল্কা করে ধরে মেয়েটার নিচু মুখ নিজের দিকে উঁচু করে তুলে আলতো করে তার ঠোঁট ঠোঁট ছোয়াল। মিরা সঙ্গে সঙ্গে রায়ানের বুকে হাত রেখে তাকে বাঁধা দিয়ে বলল-
“কি করছেন? চাচা চাচি আছে ভেতরে। যদি বাইরে চলে আসে এখন।”
রায়ান সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তিতে আত্মসমর্পণ করলো-
“আমার ওই ঠোঁট জোড়া চাই। এখন…এখন মানে এখনই। ক্রেভিংস হচ্ছে…!”
রায়ানের চোখে মিরা অন্যরকম এক চাহনা দেখতে পেল যেন কত দিনের অনাহারে আছে ছেলেটা। মিরার মেয়ে মন দূর্বল হয়ে এলো। কিন্তু এখন এখানে কিভাবে এই চাহনা পুরণ করবে সে? রায়ান মিরার ওষ্ঠযুগলের দিকে পুনরায় ঝুঁকে আসতেই মিরা রায়ানকে বাঁধা দেয়। রায়ান অস্থির হয়ে উঠলো- “আই সেড, আই ওয়ান্ট দোস লিপস। জাস্ট স্ট্যান্ড স্টিল, এ্যান্ড লেট মি হ্যাভ দ্যাম।”
মিরা রায়ানের অস্থিরতা দেখে কাঁপতে শুরু করেছে। সে রায়ানের গালে আলতো করে হাত রেখে বলল-
“একটু ধৈর্য ধরুন না। পরে দেই একটু?”
-“এখন..!” রায়ান নিজের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়ে মিরার দিকে অগ্রসর হলো। মিরা এক পা দু পা পিছিয়ে যেতে যেতে না সূচক মাথা নেড়ে অনুরোধ পূর্বক বললো-
“রায়ান প্লিজ.. এখন না..!”
র..!”
রায়ান উল্টো হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বলল-
“অবশ্যই এখনই.. এখনই চাই আমার।”
রায়ান মিরাকে লজ্জায় লাল হতে দেখে যেন নিজেকে আর সামাল দিতে পারছে না। তবে মিরার চোখের ভয় তার পিছু টানছে।
খান বাড়ি~
সকালে অ্যালার্মে বিরক্ত হয়ে সেটা বন্ধ করে ঘুমিয়েছে মাহির। ইদানিং রাত জাগা পড়ছে তাই সকালে উঠার বিষয়টা এখন তার বিরক্তিকর লাগে। কিন্তু এ্যালার্মের আওয়াজে সোরায়ার ঘুম ভাঙার পর সে আর ঘুমোতে পারে নি। মাহির ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা কালীন তাকে না জাগিয়ে তার আয়ত্ত থেকে বের হওয়া সোরায়ার জন্য এক প্রকার নীরব যুদ্ধ। আজ সে এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। মাহিরকে ঘুমে রেখে নিজে একা শাওয়ার নেওয়া দুঃসাহস ও হয়েছে তার। সোরায়া শাওয়ার সেরে ওয়াশরুমের দরজা একটু খুলে উঁকি দিয়ে একনজর দেখলো মাহির এখনো ঘুমাচ্ছে কিনা। বিছানার উপর মাহির কে এখনো নিবৃত্তে ঘুমাতে দেখে সে স্বস্তির একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল। গায়ে টাওয়াল জড়িয়ে পা টিপে টিপে ঘরে প্রবেশ করলো সে। মাহিরের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“বাঘের মুখে দাঁড়িয়ে আছি তাও আবার এভাবে। এখন বাঘের ঘুম ভাঙলে তোকে সকাল সকাল স্বীকার হওয়া থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না সোরা। তাড়াতাড়ি নিজের হাত চালা। আমার কিউট স্বামী জান আরেকটু ঘুমান প্লিজ। শাড়িটা পড়ে নেই।”
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৮ (২)
সোরায়া পা টিপে টিপে আলমারির কাছে গিয়ে একটা নীল রঙের শাড়ি বের করলো। ব্লাউজ ও পেটিকোট টা পড়ে গোটা শাড়ি ভাঁজ খুলে নিজের চার পাশে ছড়িয়ে দিয়ে শাড়ির গোলচক্রে মধ্যমনি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। শাড়ির আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারছে না। তবুও হার না মেনে বেশ কয়েকবার শাড়িটা নিজের গায়ে জড়ানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনো দিক থেকেই শাড়ি টা তার গায়ে টিকে থাকছে না।
