Home আবির ভাই আবির ভাই পর্ব ৩

আবির ভাই পর্ব ৩

আবির ভাই পর্ব ৩
উর্মিলা মজুমদার

আকাশের মুখ আজ ভার। মেঘেরা দলবেঁধে ওড়াউড়ি করছে। গ্রাম ছাড়িয়ে আমরা যখন খোলা রাস্তায় পড়লাম, তখনই প্রকৃতি তার রুদ্রমূর্তি ধারণ করল। বাতাসের ঝাপটায় রাস্তার ধারের কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো মড়মড় করে ভেঙে পড়ার উপক্রম। আবির ভাই বেশ বিচক্ষণ পুরুষ। বিপদের সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে তিনি গাড়িটা রাস্তার পাশে একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড় করালেন। চারদিকে বৃষ্টির এমন তাণ্ডব যে, মনে হচ্ছে আকাশ ভেঙে মাথায় পড়বে। এই অবস্থায় সামনে এগোনো আর যমের দুয়ারে কড়া নাড়া একই কথা।
মেঘ জানালার কাচে নাক ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। কাচ ওঠানো থাকলেও বৈরীর ঝাপটার আওয়াজ ভেতরে শোনা যাচ্ছে। মেঘ আড়চোখে একবার আবির ভাইয়ের দিকে তাকাল। আবির ভাই সিটে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন। কপালে কয়েকটা অবাধ্য চুল ঘামে আর বৃষ্টির আর্দ্রতায় লেপ্টে আছে। মেঘের ভেতরে অস্থিরতা কাজ করছে।

সে নিজেকেই প্রশ্ন করল, “আমি কেন এই লোকটাকে দেখছি? আমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল?”
সে একটা লম্বা ঢোক গিলে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ঠিক তখনই আবির ভাইয়ের আইফোনটা বেজে উঠল। আবির ভাই ড্রয়ার থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে খুব গম্ভীর গলায় বললেন, “আসসালামু আলাইকুম, কাকা।”
‘কাকা’ শব্দটা শোনামাত্র মেঘের কান খাড়া হয়ে গেল। তার মানে ওর বাবা ফোন করেছেন! মেঘের ভেতরে এক ঝটকায় আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। সে কোনো বিচার-বুদ্ধি না খাটিয়েই খপ করে আবির ভাইয়ের হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিল। সে ফোন কানে দিয়ে চিৎকার করে উঠল।
“হ্যালো আব্বু! হ্যালো!”
ওপাশ থেকে বাবার চিন্তিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “হ্যাঁ মা, তোরা কোথায়? তোরা কি ঠিক আছিস? এখানে তো সাংঘাতিক ঝড় শুরু হয়েছে।”

মেঘ গদগদ হয়ে বলল, “আমরা একদম ঠিক আছি আব্বু। তুমি একদম চিন্তা করো না। আমরা ঢাকা পৌঁছেই তোমাকে কল ব্যাক করব। এখন রাখি?”
কথা শেষ করে মেঘ বীরের মতো ফোনটা ডিসকানেক্ট করে দিল। কিন্তু যেই না সে আবির ভাইয়ের দিকে ফিরল, অমনি তার মুখটা চুপসে তালের আঁটির মতো হয়ে গেল। আবির ভাই একদৃষ্টে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছেন। সেই চোখের দৃষ্টি একদম লালচে, অনেকটা ক্রুদ্ধ সিংহের মতো। মেঘ ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই দেখল, আবির ভাইয়ের হাতের কবজির উপরের দিকে গভীর এক খামচির দাগ। ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার তাড়াহুড়োয় মেঘের নখ দিয়ে চামড়া ছিলে গেছে।
গাড়িতে যদি চাচা-চাচি না থাকতেন, তাহলে মেঘ হয়তো একটা লজ্জিত ‘সরি’ বলত। কিন্তু বড়দের সামনে এই কাণ্ড করে ক্ষমা চাওয়ার মানে হলো নিজের হার মেনে নেওয়া। মেঘ সেটা পারবে না। সে গুম মেরে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। বেশ কিছুক্ষণ পর ঝড়ের তেজ একটু কমলে আবির ভাই গাড়ির স্টার্ট দিলেন আবার। কেউ কোনো কথা বলল না।

সূর্য হেলে পড়েছে। মেঘদের গ্রাম থেকে যখন রওনা দেওয়া হলো তখন ঘড়িতে দুপুর দু’টো। আকাশটা কেমন যেন ঘোলাটে ছিল, অনেকটা পচা চালের ভাতের মতো। কিছুদূর যেতেই প্রকৃতির মেজাজ বিগড়ে গেল। ঝোড়ো বাতাসের সাথে শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির তোড়ে পথের ধারে গাড়ি থামিয়ে বসে থাকতে হলো ঘণ্টাখানেক।
এখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমেছে। অক্টোবর মাস, অথচ মনে হচ্ছে হিমালয়ের পাদদেশে বসে আছি। শিরশিরে একটা ঠান্ডা বাতাস হাড়ের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। মেঘের শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। ঢাকা পৌঁছাতে এমনিতে ছয় ঘণ্টা লাগে, তার ওপর লম্বা ব্রেক আর বৃষ্টির কারণে কচ্ছপ গতিতে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা আটের ঘর ছুঁইছুঁই। সব ঠিকঠাক থাকলে রাত দশটায় পৌঁছানোর কথা। কিন্তু মানুষের ভাগ্য তো আর পেন্সিল দিয়ে লেখা নয় যে চাইলেই মুছে ফেলা যাবে। ভাগ্যদেবতা সম্ভবত আজ মেঘের ওপর কিছুটা নাখোশ।
ঢাকা পৌঁছানোর কয়েক মাইল আগেই নির্জন এক রাস্তায় গাড়িটা একটা হেঁচকা টান দিয়ে থেমে গেল। মেকানিক্যাল সমস্যা। আবির ভাই কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, “গাড়ি ঠিক না করে এগোনো যাবে না, বড় কোনো এক্সিডেন্ট হয়ে যেতে পারে।”

রাস্তাটা একদম শুনশান। বৃষ্টির রাতে এমনিতেই মানুষজন ঘরকুনো হয়ে যায়, তার ওপর এই নির্জন পথে মেকানিক পাওয়া মানে হলো খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজা। তবে কপাল ভালো, কাছেই একটা মেকানিকের দোকানে খবর পাঠানো গেছে। লোক আসবে।
মেঘের খুব বোরিং লাগছে। দীর্ঘক্ষণ সিটে বসে থেকে কোমর ধরে গেছে। আবির ভাই আর চাচা গাড়ি থেকে নেমে বাইরে পায়চারি করছেন। মেঘ ভাবল, এই সুযোগ। সে-ও গাড়ি থেকে নামল।
বাইরে নামতেই ঝাপটা ঠান্ডা বাতাস তাকে অভ্যর্থনা জানাল। আশপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার! একেবারে কষ্টিপাথরের মতো কালো অমাবস্যা। বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ নাকে আসছে। আকাশে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, যেন কেউ নীল রঙের বিশাল এক ক্যামেরা দিয়ে প্রকৃতির ছবি তুলছে। মেঘের পরনে সাধারণ একটা সুতি থ্রি-পিস, হাতের কাজ করা। এই পাতলা পোশাকে শীতটা বেশ জাঁকিয়ে ধরল।

গাড়ি থেকে নেমে মেঘ এদিক-ওদিক তাকাল। আবির ভাইকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। হয়তো অন্ধকারের ভেতর মেকানিকের অপেক্ষায় দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন। রাস্তার দুই পাশে ঘন বাগান। অন্ধকারে গাছগুলোকে মনে হচ্ছে বড় বড় দৈত্য দাঁড়িয়ে আছে। মেঘের হঠাত খুব হাঁটতে ইচ্ছে করল। এই রহস্যময় অন্ধকারে একা হাঁটার একটা আলাদা আনন্দ আছে। মেঘ চাচার দিকে তাকিয়ে বলল, “চাচা, আপনারা একটু বসুন। আমি মেকানিক আসার আগে একটু সামনের দিক থেকে হেঁটে আসছি।”
চাচা চিন্তিত মুখে বললেন, “বেশি দূরে যাস না মা। চারদিকে অন্ধকার, বৃষ্টির দিন। সাপখোপের ভয় আছে।”
মেঘ মৃদু হাসল। মনে মনে বলল, ‘সাপখোপ মানুষের চেয়ে অধম নয় চাচা।’ মুখে কিছু না বলে মাথা দুলিয়ে সে সামনের দিকে পা বাড়াল। পিচঢালা কালো রাস্তাটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে অন্ধকারের গভীরে হারিয়ে গেছে। মেঘ হাঁটছে। ঝুম বৃষ্টির পর চারপাশটা নিঝুম হয়ে আছে।
অক্টোবর রাতের এই হিমেল হাওয়ায় বিষণ্নতা আছে। মেঘ হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থমকাল। ডানদিকের একটা বড় শিরীষ গাছের নিচে কার যেন অবয়ব দেখা যাচ্ছে। অন্ধকারেও চিনতে ভুল হলো না! আবির ভাই। গায়ে সেই ব্লেজারটা নেই, ধবধবে সাদা শার্টটা ইন করা। তিনি রাস্তার উল্টো দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন।

মেঘের কৌতুহল হলো। সে পা টিপে টিপে একটু সামনে এগোতেই বড় রকমের একটা ধাক্কা খেল। আবির ভাই সিগারেট টানছেন! মেঘের চেনা পরিপাটি মানুষটার এই রূপটা একদম নতুন। সে কান খাড়া করল।
আবির ভাই নিচু স্বরে বলছেন, “হ্যাঁ, আমরা এগারোটার মধ্যে ফিরব। তুমি জেগে থেকো না, ঘুমিয়ে পড়ো।”
‘তুমি’ করে কাকে বলছেন আবির ভাই? কার প্রতি এতো মায়া? মেঘের বুকের ভেতরটা হঠাত কেমন জানি খচখচ করে উঠল। মানুষটা কি প্রেমে পড়েছে? কোনো রহস্যময়ী মানবী কি তবে আবির ভাইয়ের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে? মেঘের ঠোঁট দুটো অপমানে আর অভিমানে কাঠ হয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে আবির ভাই পেছন ফিরলেন। মেঘকে সেখানে দেখে তার শান্ত চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই পাল্টে গেল। চোখ দু’টো রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠল। মেঘকে দেখে আবির একদমই প্রস্তুত ছিলেন না। গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে উঠল, “তুই এখানে কী করছিস? কে আসতে বলেছে তোকে?”
মেঘের সারা শরীর কেঁপে উঠল। এই ধমকের জন্য সে মোটেও তৈরি ছিল না। মেঘের চোখে পানি টলমল করে উঠল। সে আমতা আমতা করে বলল, “না, এমনি… মানে এমনিই আসলাম।”

আবির ভাই পর্ব ২

কথাটা শেষ না করেই মেঘ দ্রুত গাড়ির দিকে চলে এল। তার ভীষণ রাগ হচ্ছে। কেন ধমকালেন তাকে? তার অপরাধটা কী? কারো গোপন কথা শুনে ফেলা কি এতোই বড় পাপ? আবির ভাই নিশ্চয়ই তার প্রেমিকার সাথে কথা বলছিলেন, আর মেঘ সেটা দেখে ফেলেছে বলেই এতো রাগ! হুহ্, অদ্ভুত মানুষ!
মেঘ গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থম মেরে রইল। শীতটা এখন আরও জেঁকে বসেছে। পাতলা কাপড়ে তার দাঁতে দাঁত লাগছে। হঠাৎ মেঘ অনুভব করল, তার কাঁধের ওপর উষ্ণ এবং ভারী কিছু একটা জড়িয়ে দেওয়া হলো। আবির ভাই। নিজের ব্লেজারটা তিনি ব্লেজারটা থেকে কড়া সিগারেটের গন্ধ আসছে, আর তার সাথে মিশে আছে আবির ভাইয়ের শরীরের একটা মারাত্নক পুরুষালি ঘ্রাণ। মেঘের মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। একটু আগে যে মানুষটা অকারণে তাকে ধমক দিয়ে কাঁদিয়ে দিল, সেই মানুষটাই আবার এতোটা যত্ন করে শীত তাড়াতে ব্লেজার দিয়ে গেল। মানুষ কি এতোটা বৈপরীত্য নিয়ে জন্মায়? মেঘ চোখ বন্ধ করল। বৈরী হাওয়ার একটা ঝাপটা এসে তার কপালে অবাধ্য কিছু চুল উড়িয়ে দিল। আবির ভাইয়ের গায়ের গন্ধে ভরা ব্লেজারটা মেঘ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

আবির ভাই পর্ব ৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here