Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৯

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৯

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৯
Raiha Zubair Ripti

প্রিয় সুবহান…
নাম ধরেই, তুমি বলে সম্বোধন করলাম। আশা করি এতে কিছু মনে করবে না। বয়সে তুমি আমার চেয়ে ছোটই হবে। নাদিম আমার থেকে দেড় বছরের ছোট, আর তুমি সম্ভবত তারও ছোট। তাই ছোট ভাই ভেবেই লিখছি।
প্রথমেই তোমার প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা রয়েছে। আমার সবচেয়ে কঠিন দুটো দিনে নিজের মাথা গোঁজার জন্য তুমি তোমার ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দিয়েছিলে। হয়তো তোমার কাছে বিষয়টা ছোট ছিল, কিন্তু আমার কাছে সেটা ছিল আল্লাহর পাঠানো এক বিশাল নিয়ামত। আল্লাহ তোমার এই উত্তম কাজকে সদকায়ে জারিয়ার মতো কবুল করুন এবং এর উত্তম প্রতিদান দুনিয়া ও আখিরাতে দান করুন।
আমি কখনো চাইনি, আজও চাই না,আমার কারণে কারও বিন্দুমাত্র ক্ষতি হোক। নিজের আপন মানুষদের ক্ষতিও কখনো কামনা করিনি। সেখানে তুমি তো আমার দুর্দিনের একজন সাহায্যকারী। আমি কীভাবে মেনে নেব, আমার জন্য তোমার চাকরি চলে যাক বা তোমার জীবনে কোনো বিপদ নেমে আসুক?
শুনলাম তোমার আম্মা অসুস্থ। তাঁর সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়নি, কিন্তু আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুলে দোয়া করি আল্লাহ তা’আলা যেন তাঁকে দ্রুত পরিপূর্ণ শিফা দান করেন, নেক হায়াত দান করেন এবং সব ধরনের কষ্ট থেকে হেফাজত করেন।

তুমি অনেক সৌভাগ্যবান সুবহান। কারণ তোমার কাছে এখনও মা নামে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নিয়ামতটি আছে। আমার সেই সৌভাগ্য হয়নি। মায়ের কোলে মাথা রেখে পৃথিবীকে চেনার, তাঁর স্নেহে বড় হওয়ার নসিব আল্লাহ আমাকে দেননি। তাই মায়ের মর্যাদা কত বড়, তা আমি তার অভাব দিয়েই বুঝেছি। যতদিন তাঁকে পাশে পাবে, তাঁর কদর করো। কারণ মায়ের দোয়ার মতো আশ্রয় এই দুনিয়ায় খুব কমই আছে। তাই বলছি, যতদিন তোমার আম্মা আছেন, তাঁর খেদমত করো, তাঁর দোয়া নিও। অনেক সময় মায়ের একটি দোয়াই বান্দার তাকদির বদলে দেওয়ার উসিলা হয়ে যায়।
আমার জন্য তুমি যথেষ্ট কষ্ট করেছ। তার জন্য আমি তোমার কাছে ঋণী হয়ে থাকলাম। কিন্তু আর নয়। আমার কারণে তোমার জীবনে কোনো বিপদ নেমে আসুক, সেটা আমি কখনোই চাই না।
তাই আমি চলে যাচ্ছি। আল্লাহ যদি আবার কখনো আমাদের দেখা করিয়ে দেন, ইনশাআল্লাহ তখন অন্য এক পরিস্থিতিতে দেখা হবে।
আমি যদি মনের অজান্তেই তোমার মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকি, তবে আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ক্ষমা করে দিও।
আন্টির জন্য সামান্য কিছু কেনার সৌভাগ্য হয়েছে। সম্ভব হলে সেগুলো আন্টির নিকট পৌঁছে দিও। আর তাকে আমার সালাম জানিয়ো।
আল্লাহ তোমাকে, তোমার আম্মাকে এবং তোমার পুরো পরিবারকে তাঁর হেফাজতে রাখুন।

— সিকান্দার শাহ্
চিঠিটা শেষ পর্যন্ত পড়তেই সুবহানের হাত কেঁপে উঠল। ধপ করে খাটের কিনারায় বসে পড়ল সে। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই শূন্য হয়ে গেল। এবার আর বুঝতে বাকি রইল না সিকান্দার নিশ্চয়ই নাদিমের সঙ্গে তার কথোপকথন শুনে ফেলেছিল। তা না হলে এসব জানার কোনো উপায় ছিল না। নাদিম নিজে থেকে কখনোই সিকান্দারকে এসব বলত না।
এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব গ্ৰাস করল সুবহানকে। মনে হতে লাগল, যেন সে নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে গেছে।
ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল সে। বাজারের ঝুড়িতে পরিপাটি করে রাখা তিন রকম ফল। পাশে হালকা কিছু বাজার ডাল, সবজি, ডিম আর প্রয়োজনীয় কয়েকটা জিনিস। সবই সিকান্দার বের হওয়ার আগে কিনে রেখে গেছে।
বাজারের ব্যাগটার দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইল সুবহান। বুকের ভেতরটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। যেই ছেলেকে সে বের করে দিতে চেয়েছিল সেই ছেলেই তার অসুস্থ মায়ের জন্য ফল কিনেছে!
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিল। সিকান্দার এখনও ফিরছে না দেখে খানিকটা দুশ্চিন্তা, বিরক্ত মুখ নিয়ে রুমে এসে ফোন হাতে নিয়েছিল সে। কিন্তু ঠিক তখনই বিছানার ওপর ভাঁজ করা চিরকুটটা চোখে পড়ে। খুলে পড়ার পর থেকেই অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হতে লাগল সে।
ইচ্ছে করল ছুটে গিয়ে সিকান্দারকে ফিরিয়ে এনে বলতে, “ভাই, কোথাও যাবেন না। এখানে,আমার সাথেই থাকুন।”

কিন্তু সেই ইচ্ছের চেয়েও কঠিন এক বাস্তবতা তার দুই হাত শক্ত করে বেঁধে রেখেছে। আর তা হলো চাকরি। এই একটিমাত্র শব্দের শিকলে বন্দী হয়ে আছে তার জীবন। চাকরিটা চলে গেলে মায়ের ওষুধ বন্ধ হয়ে যাবে, চিকিৎসা থেমে যাবে। এই নির্মম ঢাকা শহরে বেকার মানুষের জন্য কেউ অপেক্ষা করে থাকে না। এখানে মানুষ বাঁচে আয় দিয়ে, আবেগ দিয়ে নয়। হুট করে চোখের কোণে জমে উঠলো জল। আশ্চর্য হলো সুবহান। সিকান্দারের জন্য তার দুচোখে অশ্রু ঝড়ছে! মাত্র দুদিনের পরিচয়ের এক লোক অজান্তেই তার চোখ দুটোকেও নিজের করে ছাড়লো সাথে হৃদয়টাও! জলটা হাতের উল্টো পিঠে মুছে ফেলল সুবহান।
তারপর চিঠিটা খুব যত্ন করে ভাঁজ করল। টেবিলের ওপর রাখা একটি বইয়ের ভেতরে আলতো করে রেখে দিল।

না, এই চিঠিটা সে কোনোদিন ফেলে দেবে না। আল্লাহ এই লোকটার ভালো করুক৷ তার উপর হওয়া অবিচারের বিচার যেন সে পায়৷ সুবহান জানালা দিয়ে দূর আকাশে তাকালো। কালো আকাশ আর দু একটা তারা ছাড়া তেমন কিছুই আর দেখা যাচ্ছে না। আকাশেরও হয়তো মন খারাপ আজ সিকান্দারের এমন সর্বস্বান্ত অবস্থা দেখে। সুবহান আকাশের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলল,
” আল্লাহ! সিকান্দার ভাইয়ের জন্য সবকিছুকেই আপনি সহজ করে দিন। তাঁর প্রতিটি কষ্টের উত্তম প্রতিদান আপনি নিজেই দান করুন। তিনি যেখানেই থাকুন, তাঁকে আপনার হেফাজতে রাখুন। তাঁর রিজিক হালাল ও প্রশস্ত করে দিন, তাঁর সব বিপদ-আপদ দূর করে দিন। যদি তিনি নিঃসঙ্গ হন, তবে আপনার রহমত দিয়ে তাঁর সঙ্গী হয়ে থাকুন। আর একদিন যদি আমাদের আবার দেখা হয়, তবে সেটাকে রহমতের সাক্ষাৎ বানিয়ে দিন। আমীন।”
ইলাদের বাসা থেকে বেরিয়ে সিকান্দার আর মুনতাহা পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কাছের একটা শিশু পার্কে এসে বসল।
মাগরিবের নামাজ শেষ হয়েছে বেশ খানিকক্ষণ আগে। মুনতাহা ইলাদের বাসাতেই নামাজ আদায় করে বের হয়েছিল। আর সিকান্দার পড়েছিল পাশের মসজিদে।
আকাশে সন্ধ্যার নরম অন্ধকার নেমেছে। বাতাসে শীতলতা। পার্কের এক কোণের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে তারা দু’জন।

সামনের মাঠে কয়েকজন ছোট ছোট শিশু এখনও খেলায় মত্ত। কারও হাতে ফুটবল, কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ হেরে গিয়ে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভার সময় যেন শৈশবই। বাসায় যাওয়ার তাড়া নেই কোনো তাদের মধ্যে।
মুনতাহা চুপচাপ সেসব দেখছিল। হঠাৎ একটা ছেলেকে দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যেতে দেখলো। মুনতাহা উঠতে গিয়েও আর উঠলো না। তার আগেই এক ভদ্রমহিলা এসে ছেলেটাকে দাঁড় করিয়ে রাগী গলায় বললে,
“কতবার বলেছি সন্ধ্যার আজান দেওয়ার আগে বাসায় আসবি। কথা শুনিস না কেন? তোর বাপ ফোন দিয়ে বকলো তোর জন্য আমাকে। ”
বলেই রাগের মাথায় ছেলেটার পিঠে দু-একটা চড় বসিয়ে দিলেন। ছেলেটা কেঁদে উঠলো।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন এক বৃদ্ধা। সম্ভবত ছেলেটার দাদি হবে। তিনি নাতিকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রাগী ভরা কণ্ঠে বললেন,
” কথায় কথায় খালি মারিস আমার নাতিটারে। হাত বেশি লম্বা হয়ে গেছে তাই না?
ভদ্রমহিলা বিরক্ত হয়ে বলল,

“মা, আপনি তো দেখলেন আপনার ছেলে কেমন রাগারাগি করলো আমার সাথে। বিকেলে খেলে ঠিক আছে৷ খেলতে তো নিষেধ করি নি। সন্ধ্যার পরও কেন খেলতে হবে? ওর টিচার এসে অপেক্ষা করছে ওর জন্য। পড়াশোনা না করে শুধু খেললে হবে?
বৃদ্ধা নাতির চোখের পানি মুছিয়ে দিলেন।
“আমি সবই দেখেছি। খবরদার আমার নাতির গায়ে আর হাত দিবি না। ওর মন যহন চাইবো তহন পড়বো। ”
নাতিকে নিয়ে তিনি চলে গেলেন৷ ভদ্রমহিলা তপ্ত শ্বাস ফেলে পেছন পেছন হাঁটলেন। মুনতাহা পুরোটা সময় তাকিয়ে ছিলো তাদের দিকে। ঠিক তখনই সিকান্দারের ফোনটা বেজে উঠলো। চেনা নম্বর। সে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একজন ভদ্রলোক নিজের পরিচয়দিয়ে জানালেন,
“আপনাদের দুজনের পাসপোর্ট ও হজের ভিসা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।”
এর অর্থ হলো,এ বছর তাদের আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য আর হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, আগামী বছর বা তারও পরে তারা হজে যেতে পারবে কি না, সে বিষয়েও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সিকান্দার ধীরে উঠে একটু দূরে চলে গেল। প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে শান্ত স্বরে কথা বলে ফিরে এলো। আশ্চর্যের বিষয়, তার চোখে-মুখে রাগের কোনো ছাপ নেই। আগের মতোই স্থির, সংযত, প্রশান্ত।
মুনতাহা উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে? কার ফোন ছিল?”
সিকান্দার কিছুক্ষণ মাঠে খেলতে থাকা শিশুদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,
“আমাদের সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। সব ব্যালেন্স শূন্য। আমার কাছে এখন কেবল ১৫ হাজার টাকা ছাড়া আর কিছুই নেই।”
মুনতাহা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
“সব?”
“হুম। এমনকি আপনার দেনমোহরের টাকা রাখার জন্য যে অ্যাকাউন্টটা খুলেছিলাম… সেটাও।”
কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল মুনতাহা। সিকান্দার আবার বলল,
“ওটা নিয়ে আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমাকে একটু সময় দিন। আমি আবার সেই টাকা পরিশোধ করে দেব।”

যদি স্বামী সত্যিই স্ত্রীর হাতে বা তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে দেনমোহর পৌঁছে দিয়ে থাকেন, এরপর তৃতীয় ব্যক্তি এমনকি স্ত্রীর বাবাও প্রতারণা করে তা আত্মসাৎ করে, তাহলে সাধারণভাবে স্বামীর ওপর আবার দেনমোহর দেওয়া ওয়াজিব হয় না। বরং যে ব্যক্তি টাকা আত্মসাৎ করেছে, সে গুনাহগার এবং তারই টাকা ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব। সেজন্য মুনতাহা বলল,
” কতবার পরিশোধ করবেন? আমি তো আমার দেনমোহর একবার পেয়েই গেছি। আর দরকার নেই। আমি আমার দেনমোহরের দাবি ছেড়ে দিলাম।”
“না। সেটা হবে না।”
“কেন?”
“কারণ দেনমোহর আপনার হক। আল্লাহ আপনার জন্য যে অধিকার নির্ধারণ করেছেন, সেটা আমি কিভাবে অস্বীকার করি? আমার কারনেই হারিয়েছেন। দায়টা আমারই। আমাকে একটু সময় দিন। আল্লাহ চাইলে আমি আবার পরিশোধ করবো। পুরো বত্রিশ লাখই।”
মুনতাহার চোখ ভিজে উঠল। সে নিচু স্বরে বলল,

“আপনি যদি সত্যিই আমার মতামত জানতে চান… তাহলে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি স্বেচ্ছায় সেই দাবি মাফ করে দিলাম। আপনার ওপর কোনো দেনা, কোনো বোঝা, কোনো দায় রেখে আমি জান্নাতের পথে হাঁটতে চাই না। আমার কাছে আপনার ঈমান, আপনার তাকওয়া আর আপনার পাশে থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা এই পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের চেয়েও মূল্যবান।”
সিকান্দার কিছুক্ষণ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,
“আরেকটা কথা আছে।”
“বলুন।”
“আমাদের এ বছর হজে যাওয়া হচ্ছে না। সেলিম মির্জা আমাদের দুজনের পাসপোর্ট আর ভিসা বাতিল করে দিয়েছে।”
মুনতাহা হতভম্ব হয়ে গেল।
“কী! কেন?”

“হয়তো তিনি বুঝেছিলেন, একবার দেশের বাইরে চলে গেলে আমাকে আর সহজে আটকে রাখা যাবে না। আমি তার নাগালের বাইরে চলে যেতাম। আর সেটাই তিনি হতে দিতে চাননি।”
মুনতাহার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। মুনতাহার কখনো মক্কায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয় নি। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল একদিন কাবার কালো গিলাফের সামনে দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে কাঁদবে। আল্লাহর ঘরের মেহমান হবে। এবার যখন সেই সৌভাগ্য দরজায় কড়া নাড়ছিল, ঠিক তখনই সব পথ বন্ধ হয়ে গেল।
তার বুকের ভেতর কষ্ট জমে উঠল।
“আল্লাহ কি আমার ওপর কোনো কারণে অসন্তুষ্ট? তিনি কি চাননি আমি তাঁর ঘরের মেহমান হই? আমার এই স্বপ্নটা কি আর কোনোদিন পূরণ হবে না? আমি কি আর কখনো আল্লাহর ঘরের দাওয়াত পাব না?”
সিকান্দার মমতাভরা দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকাল। তারপর খুব নরম স্বরে বলল,
“এভাবে ভাববেন না, মুনতাহা। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদেরও নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নেন। কখনো ভয় দিয়ে, কখনো ক্ষুধা দিয়ে, কখনো সম্পদের ক্ষতি দিয়ে, কখনো প্রিয় জিনিস হারিয়ে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)

হয়তো এ বছর আল্লাহ আমাদের জন্য অন্য কোনো ফয়সালা রেখেছেন, যার হিকমত আজ আমরা বুঝতে পারছি না। কিন্তু তিনি যদি একবার তাঁর ঘরের দাওয়াত লিখে রাখেন, তাহলে দুনিয়ার কোনো শক্তি সেই দাওয়াত কেঁড়ে নিতে পারবে না। আর যদি আজ তিনি আমাদের ফিরিয়ে রাখেন, তবে জেনে রাখুন এটাও তাঁর রহমতেরই অংশ। আমাদের কাজ শুধু সবর করা, দোয়া করা আর তাঁর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। ইনশাআল্লাহ, একদিন আমরা অবশ্যই তাঁর ঘরের মেহমান হব।”
মুনতাহা শক্ত করে চেপে ধরলো সিকান্দারের হাতটা। সিকান্দার সেদিকে তাকিয়ে কিছুটা ঠাট্টার সাথেই বলল,
“আপনার স্বামী তো এখন পথের ভিখারি হয়ে গেল, মুনতাহা। এবার কি হবে? এই বেকারের পাশে থাকবেন? নাকি ছেড়ে দিবেন এই হাত?”
মুনতাহা আগের থেকেও আরো শক্ত করে চেপে ধরলো সিকান্দারের হাতটা। তারপর বলল,

” আপনার হাত ধরেছি আজীবন সাথে থাকার জন্য। মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার জন্য না। এই বাঁধন জীবনে ঢিলে হবে না। ক্রমশঃ শক্ত করে ধরে রাখবে আপনায়। মানুষ সম্পদের জন্য বিয়ে করে না। অন্তত একজন মুমিনার তো করা উচিত নয়। আজ যদি আল্লাহ আমাদের সম্পদ নিয়ে নেন, কাল চাইলে ফিরিয়েও দিতে পারেন। রিযিকের মালিক ব্যাংক নয়, কোনো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও নয়। রিযিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আজ আপনার হাতে কিছু নেই, কিন্তু আপনার হাতটা তো আছে। আমি সেই হাতটাই ধরেছিলাম। টাকার নয়। যদি একদিন সত্যিই পথে নেমে যেতে হয়, ইনশাআল্লাহ, আমি আপনার পাশেই হাঁটবো। কারণ দুনিয়ার সুখ-দুঃখ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একসাথে থাকা সেটাই তো আসল জীবন।”

হ্যাঁ আসলেই। এই যে তাদের সময়টা যাচ্ছে। এটা খারাপ সময় না৷ এটাই জীবন। জীবনের পথ কখনো ফুলে বিছানো থাকে, কখনো কাঁটায়। আর যে মুমিন প্রতিটি অবস্থায় নিজের রবের ওপর ভরসা রাখে, সে জানে আল্লাহর প্রতিটি ফয়সালার মাঝেই কল্যাণ লুকিয়ে থাকে। আর সিকান্দার প্রতিটি পরিস্থিতি তে তার রবের শুকরিয়া আদায় করতে ভুলে না। সর্বদা ঠোঁটের কোণে উচ্চারণ করে আলহামদুলিল্লাহ। আজও ব্যতিক্রম হলো না। আলহামদুলিল্লাহ উচ্চারণ করার সাথে সাথে তার মামার কল আসলো। সিকান্দার আশা করে নি মামার ফোন। হয়তো কোনো ভাবে জেনে গেছেন একমাত্র বোনের ছেলের এই করুণ অবস্থার খবর। সেজন্য তাদের শত অভাবের মধ্যেও ভাগ্নের খোঁজ নিতেই ফোন করা। সিকান্দার ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়ে সালাম দিলো।
হুমায়ুন আলী সালামের জবাব দিয়ে বলল,

“ মামাদের একটুও জানানোর প্রয়োজন বোধ করলে না ভাগ্নে! তোমার ঐ পাষণ্ড বাপ অজাত হতে পারে। কিন্তু তোমার মামারা অজাত না৷ অভাব অনটন থাকতে পারে , কিন্তু আমাদের মন মানসিকতা সেলিম মির্জার মতো ছোট না। আমার বোনের রেখে যাওয়া একমাত্র স্মৃতি তুমি। তোমার অযত্ন কোনোদিন করবো না আমরা। এই বিশ্বাস রাখো মামাদের উপর। কোথায় আছো,কি করছো,না জানি কতটা জুলুম সহ্য করছো। বউমা কে নিয়ে এখানে চলে আসো ভাগ্নে। দেখি তোমার বাপ কি করে আমাদের। ”
সিকান্দারের বুকের ভেতরটা শীতলতায় ভরে গেলো। আল্লাহ মানুষকে কখনো একেবারে একা ফেলে দেন না। সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি কোথাও না কোথাও একটি দরজা খুলে দেন। সিকান্দার চায়নি তার কারণে মামাদের কোনো বিপদ হোক। কিন্তু তাদের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা উপেক্ষা করারও শক্তি তার ছিল না।মাথা নিচু করে সে শুধু বলল,

“জাযাকাল্লাহু খাইরান, মামা। ইনশাআল্লাহ আসছি।”
ফোন রেখে দীর্ঘ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে।
মুনতাহার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“চলুন।”
উদ্দেশ্য বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে মামার বাড়ি।
কিন্তু মানুষের পরিকল্পনার ওপরে তো আল্লাহর পরিকল্পনাই চূড়ান্ত। কিছুদূর এগোতেই আবার ফোন বেজে উঠল। সেলিম মির্জা ফোন করেছে। সিকান্দার একবার স্ক্রিনের দিকে তাকাল। রিসিভ করলো না। সরাসরি নম্বর ব্লক করে দিল। অপমানটা সহ্য করতে পারলেন না সেলিম মির্জা। প্রতিটি জায়গা থেকে ব্লক হওয়ার আগমুহূর্তেই দ্রুত কয়েকটি ছবি আর একটি ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে দিলেন। না চাইতেও ছবিগুলো চোখে পড়ে গেল সিকান্দারের।
একটি ট্রাক ভর্তি লোক। কারও হাতে রামদা, কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে কেরোসিনের গ্যালন।
সিকান্দারের ভ্রু কুঁচকে গেল। ভয়েসটি চালু করতেই কানে ভেসে এলো সেলিম মির্জার বিষাক্ত কণ্ঠ-
” ভুলেও মামাদের বাড়ি যাওয়ার চিন্তা করো না। দেখছো তো ছেলেপেলে যাচ্ছে। তুমি বগুড়ায় পা রাখা মাত্রই তোমার মামাদের ফসলের জমিতে আগুন ধরিয়ে দিবে। সাথে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে আসবে। এমনিতেই পথের ভিখারি তারা। পরে সব হারিয়ে তারাও তোমার মতো নিঃস্ব হয়ে যাবে। কি চাও সেটা? ওয়ার্নিং দিয়ে রাখলাম। ”

মুহূর্তেই আগুন জ্বলে উঠল সিকান্দারের বুকের ভেতর। তার প্রতিটি পদক্ষেপের খবর সেলিম মির্জা কীভাবে পাচ্ছেন? তাহলে কি আশেপাশেই কেউ নজরদারি করছে? সে চারদিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। মানুষের ভিড়, ব্যস্ততা সবই আছে।
কিন্তু সেই অদৃশ্য মানুষটিকে আর খুঁজে পেল না।
সিকান্দার বুঝে গেল মামাদের বাড়িতে যাওয়া মানেই তাদের বিপদে ফেলে দেওয়া। সে নিজের কষ্ট সহ্য করতে পারবে, কিন্তু নিরপরাধ মানুষের সর্বনাশের কারণ হতে পারবে না। নীরবে নিজের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলল। এরই মধ্যে তারা এসে পৌঁছেছে কমলাপুর রেলস্টেশনের সামনে। প্রচণ্ড পিপাসা পেয়েছে মুনতাহার৷ সেজন্য মৃদু স্বরে বলল,
“আমার খুব পানি পিপাসা পেয়েছে।”
সিকান্দার চারপাশে তাকিয়ে রাস্তার পাশের একটি বেঞ্চ দেখিয়ে বলল,

“ আপনি এখানে বসুন। আমি এক মিনিটেই পানি নিয়ে আসছি। কোথাও যাবেন না।”
মুনতাহা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে বেঞ্চে বসে পড়ল। সিকান্দার দ্রুত পাশের দোকানের দিকে এগিয়ে গেল। দোকানদার একটি পানির বোতল এগিয়ে দিতেই পকেটে হাত দিল সে। টাকা বের করতে গিয়েই হঠাৎ মনে পড়ে গেল গতকালের ঘটনাটা। সুবহানের মায়ের জন্য কিছু ফলমূল, সামান্য বাজার আর নিজেদের পথচলার খরচ জোগাড় করতে নিজের বহু শখের, ব্র্যান্ডের দামী রোলেক্স হাতঘড়িটা সে প্রায় পানির দামে বিক্রি করে দিয়েছিল।

দোকানদার রাও হয়তো মুখ দেখেই বুঝে ফেলে কার খুব টাকা প্রয়োজন৷ সেজন্য ওমনি কম দাম বলে বসে।
সিকান্দার হিসাব মিটিয়ে টাকা বাড়িয়ে দিতেই চারপাশের ভিড় আরও ঘন হয়ে উঠলো। কারও ধাক্কা, কারও তাড়াহুড়ো সবকিছু মিলিয়ে কয়েক সেকেন্ডের বিশৃঙ্খলা। সিকান্দার কিছুই টের পেল না। কিন্তু দোকান থেকে সরে আসতেই অভ্যাসবশত ফোন বের করতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। পকেট ফাঁকা। ফোনটা নেই।
ঘুরে আবার সেই দোকানটার সামনে গেলো৷ যদি পেয়ে যায় এই আশায়। কিন্তু নাহ পেলো না৷ দোকানদারের ফোন থেকে নিজের নম্বর ডায়াল করে তাতে ফোন দিতেই দেখতে পেলো ফোন বন্ধ। ভিড়ের সুযোগে কোনো পকেটমার নিঃশব্দে সেটি নিয়ে গেছে। ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা আর নেই। শেষ সম্বল ছিলো ফোন৷ ইচ্ছে ছিলো সেটাও বিক্রি করার। কিন্তু কেউ একজন তার অভাব পূরণ করার জন্য সিকান্দার কেই বেছে নিলো। সে বুঝি সিকান্দারের থেকেও বেশি কষ্টে আছে? আজ বোধহয় মসিবত মানুষের ঘরে ঢুকতে চাইলেই তারা সিকান্দার কে দেখিয়ে বলছে ওর ঘাড়ে গিয়ে চাপো। আর মসিবত তাদের কথা শুনে সত্যি সত্যি সিকান্দারের ঘাড়ে এসেই চাপছে।
একটা দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে।
চোখ বন্ধ করে শুধু বলল,

“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন…মুসিবত যখন আসে, তখন সে একা আসে না। একটার পর একটা ঢেউ হয়ে চারদিক থেকে মানুষকে ঘিরে ধরে। আল্লাহ যার ধৈর্য পরীক্ষা করতে চান, তার জন্য সব পথই যেন একসঙ্গে সংকীর্ণ হয়ে আসে। তবু আলহামদুলিল্লাহ… আমার রব যা ফয়সালা করেন, তার প্রতিটিতেই হিকমাহ আছে।”
ওদিকে স্টেশনের পাশে বেঞ্চে বসে থাকা মুনতাহা সিকান্দারের ফেরার অপেক্ষা করছিলো। আশেপাশে তাকিয়ে মানুষজনের ব্যস্ততা দেখতে দেখতে দৃষ্টি হঠাৎ রাস্তার দিকে আটকে গেল। একটি ছোট্ট অসুস্থ দূর্বল বিড়াল ভয়ে ভয়ে বারবার রাস্তার ভেতর চলে যাচ্ছিলো। এক্সিডেন্ট হওয়ার চান্স আছে। ক’টা গাড়ি আর এক অবলা বিড়ালের জন্য থামবে? বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে একটি গাড়িকে ছুটে আসতে দেখে মুনতাহার বুক ধক করে উঠল।

সে আর এক মুহূর্তও ভাবল না,সময় নষ্ট করলো না।আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,”আর যে ব্যক্তি একটি প্রাণকে বাঁচালো, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে বাঁচালো। ” এই বাক্যটিতে প্রাণ বলতে শুধু মানুষের প্রাণ বুঝায় নি। আল্লাহর সৃষ্টি প্রতিটি প্রাণের কথা বলা হয়েছে।
মুনতাহা নিজের জীবনের তোয়াক্কা করলো না। তার মাথায় কেবল একটাই ভাবনা,বিড়ালটিকে বাঁচাতে হবে। বিড়ালটিকে বাঁচানোর জন্য দৌড়ে গিয়ে রাস্তার মাঝখানে এসে বিড়ালটিকে ঝুঁকে কোলে নিয়ে সোজা হতেই তার শরীর জমে গেলো। গাড়িটা এসে মুনতাহা মুন নামের মেয়েটির উপর দিয়ে চলে যাবে যাবে এমন ভাব। হঠাৎ একটি হাত তার বাহু আঁকড়ে ধরল। প্রচণ্ড টানে তাকে রাস্তার পাশের দিকে টেনে ফেলল। আগন্তক ও মুনতাহা, দুজনেই ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তার ধারে পড়ে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই শোঁ শোঁ শব্দ তুলে গাড়িটা তাদের পাশ ঘেঁষে ছুটে চলে গেল। রাস্তার মানুষজন হা করে তাকিয়ে আছে তাদের দু’জনের দিকে। আগন্তক তড়িঘড়ি করে উঠে বসে মুনতাহা কে ধরে তুলে বলল,

“ এভাবে কেউ রাস্তার মাঝে আসে? বড়সড় দূর্ঘটনা হতে পারতো তো। ”
সিকান্দার পানির বোতল নিয়ে মুনতাহা কে যেখানে বসিয়ে রেখে গিয়েছিল সেখানে এসেছে। কিন্তু মুনতাহাকে না দেখে তার ভ্রু কুঁচকে আস। পাশেই আচমকা ভীড় দেখে এক লোক কে জিজ্ঞেস করে,
“ কি হয়েছে ওখানে? ”
লোকটা জানায়,একটা বিড়াল কে বাঁচাতে গিয়ে নাকি এক মেয়ে এক্সিডেন্ট করেছে। ”
হঠাৎ করে সিকান্দারের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। দৌড়ে সেই ভীড় ঠেলে দেখলো মেয়েটা আসলে মুনতাহা। সিকান্দার দ্রুত অস্থির পায়ে এগিয়ে এসে মুনতাহার সামনে দাঁড়িয়ে শরীর দেখতে দেখতে বলল,
“ কোথায় লেগেছে? খুব লেগেছে তাই না? বলেছিলাম তো চুপচাপ বসে থাকতে। কোনো কথা শুনেন না আমার। দেখি কোথায় লেগেছে। ”

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৮

সিকান্দারের দৃষ্টিতে যেন পাশে থাকা সেই আগন্তুকের ছায়াটারও উপস্থিতি নেই। তার চিন্তাভাবনা জুড়ে কেবলই তার মুনতাহা মুন। তবে আগন্তুক বেশ থমকালো সিকান্দার কে দেখে। অতিপরিচিত মানুষ কি না সিকান্দার তার! কন্ঠস্বর শুনেই চিনে ফেলেছিল।

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here