Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৬

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৬

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৬
Raiha Zubair Ripti

সে রাতে সিকান্দার আর খাবার খেলো না। সাইদা মির্জার ঢেকে রাখা খাবার টা ওভাবেই পড়ে রইলো টেবিলে। মুনতাহা কে নিয়ে রুমে ঢোকার আগে অবশ্য সিকান্দার রেণু কে ডেকে বলেছিল খাবার গুলো যেন বাহিরের কোনো কুকুর বিড়াল কে দিয়ে দেওয়া হয়। তা-না হলে খাবার গুলো নষ্ট হবে।
রেণু পরবর্তীতে কি করেছে তা সিকান্দারের জানা নেই। জানার আগ্রহও নেই। সে রুমে এসে আগে কিছুটা সময় নিয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করলো। গোসল শেষে বের হয়ে মুনতাহা কে এখনো ঠাঁই আগের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো,যেমন টা দেখে সে গোসলে ঢুকেছিল। ভেজা টাওয়াল টা বেলকনিতে মেলে দিয়ে বিছানায় পা তুলে বসলো। মুনতাহা কাচুমাচু হয়ে বলল,
“ আপনি খাবার টা খেলেন না কেনো? ”
সিকান্দার হাত বাড়িয়ে ইশারায় মুনতাহাকে লাইট নিভিয়ে কাছে আসতে বলল। মুনতাহা বাধ্য মেয়ের মতো তাই করলো। লাইট নিভিয়ে কাছে আসতেই সিকান্দার বলল,
“ খিদে নেই। ঘুমিয়ে পড়ুন। ”
মুনতাহা সিকান্দারের পাশে এসে শুয়ে পড়লো। সিকান্দার ও বালিশে মাথা ঠেকালো। রুম জুড়ে কিছুক্ষণ তাদের কেবল শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ছোটাছুটি করলো। তারপর আচমকা সিকান্দার বলে উঠলো,
“ মন একটা গল্প বলি? ”
মুনতাহা এক পাশ হয়ে শুলো সিকান্দারের দিকে ফিরে। ছোট্ট করে বলল, “ হু। ”
সিকান্দার মাথার চুল গুলোয় বা হাত চালিয়ে তারপর ধীর স্বরে বলতে লাগলো,
“ অনেক বছর আগে এক গ্রামে একজন মালি ছিল। তার একটা ছোট্ট বাগান ছিল। সেখানে অসংখ্য গাছ ছিলো। বাগানের গাছগুলো কে সে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতো। সারাদিন ক্ষেতখামারে কাজ করে প্রতি সন্ধ্যায় এসে গাছগুলোর যত্ন নিতো, পানি দিতো, আগাছা পরিষ্কার করতো।
একদিন একটা গাছের গোড়ায় ছোট্ট একটা পোকা দেখতে পাওয়া গেল। মালির নজরে আসে নি সেটা। কারন সে এতটাই ব্যস্ত থাকে দিনে যে সন্ধ্যার সেই আধো আধো আলোয় সেই একটি পোকা আর নজরে আসলো না। কিন্তু গাছ সেটা দেখেছিল। বুঝতে পেরেছিল। সে ভাবলো, ‘ সামান্য একটাই তো পোকা,এত ছোট্ট একটা ব্যাপার নিয়ে আমার মালীকে বিরক্ত করার দরকার নেই। সে তো সারাদিন পরিশ্রম করে। আমি নিজেই সামলে নেব।’

তাই গাছটা কিছু বললো না। কয়েকদিন পর পোকার সংখ্যা বাড়লো। গাছটা তখনও চুপ করে রইলো। কারন সে এখনো ভাবছে সে সামলে নিবে সবটা।
মাসখানেক পরে একদিন দিনের বেলায় মালী আসলো। সেদিন মূলত সে ফ্রী ছিলো। কারন বতরের দিন শেষ। বর্ষা কাল। কাজকর্ম নেই বললেই চলে। বাগানে এসে প্রতিটি গাছ দিনের আলোয় পর্যবেক্ষণ করে দেখে সেই গাছটার অর্ধেক ডাল শুকিয়ে গেছে।
সে খুব কষ্ট পেলো। এত যত্ন নিলো গাছ গুলোর। তারপরও এভাবে শুকিয়ে গেলো! গাছের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘তুমি আগে জানাওনি কেন?’
গাছটা বললো, ‘আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি। সারাদিন তুমিও হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে আসো। আমিও যদি তোমাকে আমার সমস্যার কথা বলি তাহলে তুমি কয়দিক সামাল দিতে? কষ্ট হয়ে যেত তোমার জন্য। তাই বলি নি।

তখন মালী হেসে বললো, ‘তুমি কি মনে করো তোমার শুকিয়ে যাওয়ার খবর আমার কাছে কম কষ্টের? তুমি যখন প্রথম পোকার কথা জানতে, তখন বললে আমি একদিনেই সমস্যার সমাধান করে দিতাম। এখন তোমার কষ্টও বেড়েছে, আমার কষ্টও বেড়েছে।’
তারপর সেই গাছ কে আগের ন্যায় করতে মালির এক মাস সময় লেগেছিল। যা প্রথম দিনই গাছটা বলে দিলে এক সেকেন্ডেই সমাধান হয়ে যেত।
গল্প শেষ করে সিকান্দার মুনতাহার দিকে তাকালো। মুনতাহা তখনো কিছু একটা ভাবছে। সিকান্দার জিজ্ঞেস করলো,
“ কিছু বুঝলেন? ”
মুনতাহা সিকান্দারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ গাছ কি কথা বলতে পারে? ”
“ না পারে না। ”
“ তাহলে গাছ কিভাবে তার মালিকে বলবে? ”

“ এগজ্যাক্টলী। গাছ কথা বলতে পারে না তার পক্ষে সম্ভব না মালিকে কথাগুলো বলার। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা মানুষদের সেই ক্ষমতা দিয়েছে। তাদের বলার জন্য মুখ দিয়েছে। তাহলে মানুষ কেনো গাছের মতো ব্যবহার করবে মন? সে কেনো চুপ করে থাকবে? আপনি কি জানেন, সবচেয়ে কষ্টের জিনিসটা কী? যখন কাছের মানুষটা কষ্টে থাকে, কিন্তু সেটা জানার সুযোগটাও আপনি পান না। আর যখন জানতে পারলেন তখন অনেকটা দেরি হয়ে গেল। যা আগে জানলে খুব সহজেই তার সমাধান পাওয়া যেত। ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্য সবসময় সত্য লুকাতে হয় না। কখনো কখনো নিজের বোঝার একটা অংশ তাদের হাতেও তুলে দিতে হয়। বিশেষ করে তা যদি হয় স্বামী স্ত্রীর ভেতরে। কিছু সত্য, কিছু কষ্ট, কিছু ভয়,সময় থাকতে বলে ফেলাই ভালো। কারণ অনেক সমস্যার ভয়াবহতা সমস্যার ভেতরে নয়, বরং দীর্ঘদিন তা লুকিয়ে রাখার ভেতরে লুকিয়ে থাকে। অনেক ক্ষত আছে, যা শুরুতেই দেখালে সহজে সেরে যায়,কিন্তু কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখলে একসময় এমন গভীর হয়ে যায় যে তার দাগ আর সহজে মুছে না। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা ওই মালী আর গাছের মতো। ঝড়ের কথা লুকালেই ঝড় থামে না। অসুখের কথা লুকালেই অসুখ সারে না। মন খারাপের কথা লুকালেই কষ্ট কমে না। বরং যে মানুষটা পাশে দাঁড়ানোর কথা ছিলো, সে সেই সুযোগটাই পায় না। আমি সব সমস্যার সমাধান করতে পারবো, এমন দাবি করি না। কিন্তু আমার স্ত্রীর সমস্যার কথা শোনার অধিকারটা অন্তত আমার আছে। সে যদি আমার রাগ কষ্ট কমানোর জন্য তার কষ্ট লুকায়, তাহলে তো শেষ পর্যন্ত দুজনেই কষ্ট পাবো। আমি আমার স্ত্রী কে কখনো জেরা করবো না। কিন্তু যদি কিছু থাকে, বিষয়টা যদি ছোটও হয়,তাহলে লুকানোর দরকার নেই। আই হোপ ইয়্যু আন্ডারস্ট্যান্ড, হোয়াট আই মিন? কারন আপনার সামান্যতম দুঃখ কষ্টও আমাকে আমার নিজের আঘাতের চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়। ”

মুনতাহা সাথে সাথে শোয়া থেকে উঠে বসলো। তার আর বুঝতে বাকি নেই সিকান্দার কি মিন করছে। অপরাধবোধে শেষ হয়ে যাচ্ছে। সিকান্দার ও উঠে বসলো।
“ উঠে বসলেন যে? ঘুমোবেন না? ”
মুনতাহা মাথা নত করে হঠাৎ নাকের জলে চোখের জলে এক করে বলে উঠলো,
“ আমার ভুল হয়ে গেছে। সরি,সরি খুউব সরি। আমার উচিৎ হয় নি আপনার থেকে লুকানোর। আমার বলা উচিৎ ছিলো। ”
সিকান্দার এই মুনতাহাকে দেখে মনে হলো সে কোনো পাপা কা পরী। ঐ যে কথায় কথায় হুট করে কেঁদে বুক ভাসিয়ে দেওয়া পশ কিডস। কেউ কি এই মুনতাহা কে এখন দেখলে বলবে,সে ছোট বেলায় কত অনাহারে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য সহ্য করে বড় হয়েছে! মনে হবে সে বাবা মায়ের একমাত্র আদুরে গুলুমুলু একটা মেয়ে। যাকে তার বাবা মা কখনো ধমক দেয় নি এই ভয়ে যে কেঁদে দিবে।
ঠিক ওমনই মনে হলো সিকান্দারের। মাথায় আলতো করে হাত রাখলো। মুনতাহা যেন আরো গলে গেলো। সিকান্দারের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে বলল,

“ ক্ষমা করুন আমায়। আমি ভুল করেছি। আমি ভেবেছি আপনি জানলে বাড়িতে অশান্তি হবে। এই ভয়ে বলি নি। ”
সিকান্দার সযত্নে মুনতাহার চোখ মুছে দিলো। চুল গুলো ঠিক করে কানের পাশে গুঁজে দিয়ে বলল,
“ কান্না কেনো করছেন? বকেছি? ”
মুনতাহা দু দিকে মাথা নাড়লো।
“ মেরেছি? ”
“ উঁহু। ”
“ তাহলে হোয়াই আর ইয়্যু ক্রায়িং মন? অপরাধবোধ থেকে? ”
মুনতাহা সাথে সাথে মাথা উপর নিচ ঝাঁকিয়ে বলল,
“ হু। ”
“ আর কান্না করে না। আমি বুঝতে পেরেছিলাম আপনি কিছু লুকাচ্ছেন আমার থেকে৷ এখন আপনি কি মুখ ফুটে বলবেন,নাকি আমি নিজ থেকে জেনে নিব সবটা? ”
মুনতাহা সিকান্দারের দু হাত চেপে ধরে বলল,

“ সবটা বলার পর রাগারাগি করবেন না বলুন? কথা দিন? ঠান্ডা মাথায় সামলাবেন। ”
“ বেশ কথা দিচ্ছি। ”
মুনতাহা তারপর সবটা খুলে বলল। কিভাবে তাকে খাবারের কষ্ট দিচ্ছে। রান্না ঘর তালা দিয়ে রাখছে। গ্যাস থাকছে না। ফ্রিজ তালা দেওয়া। সবটা বলা শেষে সে সিকান্দারের মুখের দিকে তাকালো। মুখের ভাব ভঙ্গির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলো না। বোঝা গেলো না কথা গুলো শুনে তার রিয়াকশন।
সিকান্দার চুপচাপ মুনতাহা কে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে শুয়ে বলল,
“ ঘুমান মন। ”
মুনতাহার চোখে তৎক্ষণাৎ ঘুম ধরা দিলো না। সিকান্দারের শীতল কন্ঠ কেমন যেন শোনালো। পরের দিন সকালে সিকান্দার খাবার খাওয়ার জন্য মুনতাহা কে নিয়ে নিচে আসে। সকালের টেবিলে মুনতাহার জন্য খাবার থাকে। সিকান্দার তাকে নিয়ে চেয়ার টেনে বসলো। মনোয়ারা মির্জা নেই। উনার ইদানীং শরীর বেশ খারাপ যাচ্ছে। খাবার বেশিরভাগ সময় রুমেই দিয়ে আসতে হয়। সাইদা মির্জা রেণু কে দিয়ে তার খাবার টা রুমে পাঠিয়ে চেয়ার টেনে বসতেই সিকান্দার খাবার মুখে দিতে দিতে বলল,
“ মির্জা বাড়ির দিনকাল কি এতই খারাপ হওয়া শুরু করলো নাকি যে এত বড় বিশাল এক বাড়িতে দিনের বেলায় রান্না ঘরে তালা দিতে হয়। গ্যাসের লাইন বন্ধ করে দিতে হয়,ফ্রিজ তালা দিতে হয়। কোনো সমস্যা? সমস্যা থেকে থাকলে বলুন আমাকে। মাস শেষে একটা বড় অংকের খরচ তো আমিও দেই এই বাড়িতে। জানার অধিকার আছে। ”

সাইদা মির্জার যেন গলায় আঁটকে গেলো খাবার। সেলিম মির্জা ঠিক বুঝলেন না। তিনি সারাদিন রুমের ভেতরে থাকে। নিচে কি হয় তা সাইদা মির্জা না বললে জানার কথা না।
“ কিসব বলছো তুমি? রান্না ঘরে তালা দেওয়া থাকবে কেনো? ”
সিকান্দার পানির গ্লাস টা সাইদা মির্জার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ পানি খেয়ে বলুন,এমনটা কেনো করছেন? ”
সাইদা মির্জা পানি টা খেলেন। তার জানা মতে মুনতাহার তো বুক ফাটে তবুও মুখ ফোটে না৷ তাহলে? বলে দিলো সবটা! আমতা-আমতা করে বলতে লাগলো,
“ আর বলো না, বাড়িতে হুট করে বিড়ালের উপদ্রব বেড়েছে৷ রান্নাঘর ঢুকে যা-তা করে। সেজন্য তালা মেরে রেখেছিলাম। ”
“ সেই বিড়ালের বুঝি হাত ও আছে ফ্রিজ খোলার মতো? সেজন্য ফ্রিজও লক করে রাখেন। ”
সাইদা মির্জা আবার একটা নড়বড়ে যুক্তি দাঁড় করাতে চাইলো। কিন্তু সিকান্দার থামিয়ে দিলো। খাবার খাওয়া শেষ। উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ ফারদার এই ঘটনা দ্বিতীয় বার যেন না ঘটে। ঘটলে ভালো কিছু যে বয়ে আনবে না তা জানিয়ে রাখলাম। আসছি। ”

সিকান্দার চলে গেলো মুনতাহা কে আসতে বলে। ভার্সিটি খুলেছে। সিকান্দার তাকে দিয়ে আসবে। সেলিম মির্জা বিরক্ত হলেন স্ত্রীর কাজের প্রতি। সেই তো সিকান্দার জেনেই গেলো৷ তাহলে করে কি লাভ হলো?
তিনিও চলে গেলেন। মুনতাহা তৈরি হওয়ার জন্য রুমে যেতে নিলে সাইদা মির্জা রাগে গিজগিজ করতে করতে বলে উঠলো,
“ রাতে স্বামীর কান ভাঙিয়েছ আমার বিরুদ্ধে তাই না? যাও আমিও দেখবো কিভাবে শান্তিতে সংসার করো। মির্জা বাড়ির বউ হয়ে থাকার খুব সখ তাই না? সখ এবার পূরণ করাবো। ”
মুনতাহা চলতি পথে শুধু শুনে গেলো। রুমে এসে রেডি হয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
সিকান্দার মুনতাহা কে ভার্সিটি তে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে। আজ ইলার সাথে দেখা হলো। অনেক গুলো দিন বাদেই দেখা৷ পেট পাতলা ইলা কথার ছলে বলে দিলো আজ এক সপ্তাহ হলো নাদিম তার থেকে এক হাজার টাকা নিয়েছে ধার৷ দেওয়ার নাম নেই। মুনতাহার জানা মতে নাদিম এমন ছেলে না। ধার নিলেও সেটা সময়ের আগেই দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে৷ একবার ময়না বেগমের থেকে টাকা নিয়েছিলেন৷ এক সপ্তাহ পর বেতন পেলে দিবে বলে তার দুদিন পরই দিয়ে দিয়েছিল।

মুনতাহা নিজের ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিতে চাইলো৷ ইলা নিবে না মুনতাহার টাকা। সে নাদিমের থেকেই নিবে। রোজ যেভাবে জ্বালায়,আজ দেখা হলে আজও জ্বালাবে। ক্লাস শেষ করে দু’জন দু’দিকে চলে গেলে বাড়ির পথে। সিকান্দার নিয়ে চলে গেছে মুনতাহা কে।
আর ইলা হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছে। কানে হেডফোন। চলতি পথে হুট করে রাস্তার ওপর পাশে এক লোক কে মুখ ঢেকে দ্রুত পায়ে হাঁটতে দেখে ইলাও পায়ের গতি বাড়িয়ে দিলো৷ নাদিমের অফিস টা ইলাদের বাড়ি যাওয়ার পথেই সামনে পড়ে। এই টাইমে তো নাদিম খেতে বের। নিশ্চয়ই ইলাকে দেখেই এভাবে চোরের মতো লুকিয়ে যাচ্ছে।

নাদিম ইলার থেকে এক হাজার টাকা হাওলাত নিয়ে খুবই বিপাকে পড়েছে। সাত দিন দেখা হয়েছে তাদের। সাতদিনই ইলা হাজার টাকা ব্যাক চেয়েছে। নাদিম দেয় নি। দিবে না বলেছে। ইলা কেঁদে দিবে এমন এমন ভাব। পরে অবশ্য নাদিম মন রক্ষার্থে বলেছিল – “ আচ্ছা দিব নি দুদিন পরে। আজ নিয়ে আসি নি টাকা। ” নাদিমের আসলে দেওয়ার ইচ্ছে নেই টাকা টা। কেনো দিবে? এটা নাদিমের সেদিন ইলার প্রাণ বাঁচানো, আর বাইকের তেল ফুরানোর বখশিশ। যেচে দেয় নি। নাদিম না হয় ধারের নাম করে নিয়ে নিছে চেয়ে। ফেরত দেওয়াটা শোভা পায় না। কিন্তু ইলা নামের বদ মেয়েটা তাকে হজম করতে মোটেই দিচ্ছে না এই হাজার টাকাটা। রাস্তাঘাটে দেখা হলেই নাদিম কে শুনিয়ে শুনিয়ে উচ্চস্বরে গান গেয়ে উঠে…
টাকা হাওলাত নেওয়ার সময় পায়ে ধরে
আবার টাকা চাইলে ঝারি মারে
কিছু মানুষ আছে শুধু নিতেই জানে
দেওয়ার সময় তাদের ফাটে….

কি আশ্চার্য নাদিম কবে তার পায়ে ধরলো? ডাহা মিথ্যা অপবাদ এটা। ইলার গানের জন্য রাস্তাঘাটে মানুষজন চেয়ে থাকে নাদিমের দিকে। নাদিম শরম পায়। আজও দেখা বেয়াদবটার সাথে। সেজন্য মুখ ঢেকে তাড়াতাড়ি করে পা চালিয়ে হাঁটা ধরে। কিন্তু এতেও রক্ষা নেই। ইলা ঢিলা বেহায়া ছোটলোক নাদিম কে দেখেই ফেলছে। পেছন পেছন আসছে। সেই গান গাওয়া মোটেও থামায় নি। নাদিম আর আজকে এই জ্বালা সইতে না পেরে বলল,
“ ছোটলোকের মতো এমন বিহেভিয়ার কেনো করছেন মিস ঢিলা? সমস্যা কি? মেরে একদম তক্তা বানায় ফেলবো কিন্তু আর জ্বালালে। ”
বেহায়া ইলা এবারও হাত পেতে বলল,
“ আমার টাকা দিন। আর জ্বালাবো না। ”
বেয়াদব মেয়ে,শুধু হাত পাতবে আর টাকা চাইবে। নাদিম কে কি চাওয়া যায় না? বলা যায় না? টাকা দিতে পারবেন না ঠিক আছে,কথা মতো চলুন আপনাকে বিয়ে করে নেই? নাদিম কি এ কথা বলে নি সেদিন টাকা নেওয়ার সময়? কিন্তু বেয়াদব মেয়ে তা বলবে না। বলবে শুধু টাকা দিন,টাকা দিন।
নাদিম বিরক্ত হয়ে প্যান্টের পকেট থেকে হাজার টাকার একটা নোট বের করে ইলার হাতে ঠুসে দিয়ে বলল,

“ শান্তি পাইছেন? ছোট লোকের মতো যা তা শুরু করে দিছেন টাকা নেওয়ার জন্য। অসভ্য বেয়াদব মেয়ে। ”
ইলা মুখ ভেঙচিয়ে টাকাটা সামনে ধরে চেক করলো নকল নাকি আসল। বিশ্বাস নেই এই খবিশ কে দিয়ে। চাওয়া মাত্রই আজ টাকা দিলো হয়তো নকল টাকাই দিয়েছে। কিন্তু নাহ্। এ তো আসল টাকা। ইলা স্বস্তির শ্বাস ফেলে সাইড ব্যাগে ভরে উল্টো হাঁটা ধরে আবার ফের গাইলো,
“ আমার বাড়ি কিছু টাকা ছিলো
একজন হঠাৎ করেই হাওলাত নিলো
দুইদিন পরে দিবে বলে টাকা নিছে
দুই মাস পরে ঝগড়া করে টাকা দিছে।
আল্লাহ এর বিচার কইরো। এই ব্যাডা এখন রাস্তায় ফিট খেয়ে মরলেও আমি আর জীবনেও সাহায্য করবো না। ”

সেদিন দুপুরে এক কাণ্ড ঘটলো মির্জা বাড়িতে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সাইদা মির্জা পা ফস্কে পড়ে গিয়ে পা টা মচকে গেলো। মুনতাহা বাড়িতে ছিলো না। ভার্সিটি তে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে এসে শুনলো এ-কথা। সিকান্দার সেদিন সকালে খাবার টেবিলে রান্না ঘরের বিষয়টা তুলার পর সাইদা মির্জা আর বন্ধ করে নি রান্নাঘর। তিনি নিজেই রেঁধে দিত খাবার। এখন বাড়িতে তিনজন অসুস্থ হয়ে পড়লো বিছানায়। রেণু একা আর কয়জন কে দেখবে। মুনতাহা ভার্সিটি থেকে ফিরতেই সাইদা মির্জা ডাকলেন তাকে। মুনতাহা ফ্রেশ হয়ে তার রুমে যেতেই বাড়ির রান্না বান্নার কাজ সব মুনতাহার উপর দিলো। আজ নাকি বাড়িতে মেহমান আসবে। অনেক রান্না বান্না করতে হবে। মুনতাহা তো রান্না বান্না পারেই। এমনিতেও তার যদি একান্নবর্তী পরিবারে বিয়ে হতো তাহলে তো বাড়ির রান্নাবান্না থেকে শুরু করে কাপড় ধোয়া,বাড়ি উঠান ঝাড়ু দেওয়া সব তারই করতে হতো। সমস্যা হবার কথা না। শ্বশুর বাড়িতে কে এভাবে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকে?
সাইদা মির্জা খাবার বাহির থেকে আনার বিষয়েও বলল, যে তুমি তো রান্না পারো,এমন তো না যে রান্না পারো না। এই মির্জা বাড়ির না বউ তুমি? বাহির থেকে খাবার এনে খাওয়ানো টা কেমন দেখায়? পারবে না ১০-১২ জনের রান্না রাঁধতে?

মুনতাহা পারবে বললো। সাইদা মির্জা সেই সাথে এটাও বললো যে জুলি নামের মেয়েটাও আসবে।
কয়েকবার নাম টা শুনেছিল সে সাইদা মির্জার মুখে। এই মেয়েকে নাকি সিকান্দারের বউ করতে চেয়েছিল। কখনো সামনা-সামনি দেখে নি। আজ সে দেখবে। দেখবে মেয়েটা দেখতে কেমন।
মুনতাহা দুপুর থেকে লেগে পড়লো রান্নার কাজে। মাছ, ডিম,মাংস, ডাল,সাদা ভাত,পোলাও,ভাজি সব রাঁধতে বললো।
মুনতাহা হিমশিম খেতে লাগলো। রান্নাঘরের সব কিছু ছড়ানো ছিটানো। সেগুলো গুছিয়ে মাছ মাংস ফ্রিজ থেকে বের করে ভিজালো। তারপর তরকারি কাটতে বসলো। কাটা শেষে মাছ ভাজতে গিয়ে তেল ছিটে আসলো হাতে। দাঁত চেপে সহ্য করে নিলো। রাঁধতে গেলে এমন তেল ছিটেই। মাছ মাংস ডিম রান্না করার মাঝে জুলি নামের মেয়েটা আসলো। মেয়েটার ড্রেসআপ দেখেই চোখ কপালে মুনতাহার। কি বিশ্রী হাতা কাটা শর্ট ওয়েস্টার্ন ড্রেস। শরীর সব বোঝা যাচ্ছে দেখা যাচ্ছে।
মেয়েটা এসেই হুকুম করলো তার ঠান্ডা জুশ লাগবে ফলের। চুলায় রান্না রেখে মুনতাহা জুশ বানিয়ে দিলো। মেয়েটা খেয়ে উপরে চলে গেলো।

মুনতাহা তরকারি রান্না করে ভাজি,ডাল বসালো। সেগুলো শেষ করে এক চুলায় পোলাও আর অন্য চুলায় ভাত বসালো। পোলাও রান্না শেষ হলে সেসব টেবিলে গুছিয়ে রান্না ঘরে গেলো ভাতের মাড় গালতে। মাড় গালতে গিয়ে সে আর ধরনি টা খুঁজে পেলো না। তন্ন তন্ন করে খুঁজলো। পেলোই না। অগ্যতা সে ওড়নার দু প্রান্ত দিয়ে পাতিল ধরে ঠেকনির উপর বসিয়ে মাড় গালতে যাবে এমন সময় কোথা থেকে জুলি নামের মেয়েটা মুনতাহার উপর এসে পড়তে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো।কিন্তু মুনতাহা নিজেকে সামলে নিতে পারলো না। জুলির শরীরের ধাক্কায় তার হাত থেকে গরম ভাতের পাতিল টা ছিটকে গিয়ে পড়লো হাতে আর পায়ে। গরম মাড় ভাত পড়ায় ব্যথায় হাত পা ধরে চেঁচিয়ে উঠলো মুনতাহা। হাল্কা দু এক ফোঁটা জুলির শরীরে গেলো। সেও চেঁচিয়ে উঠলো। যেভাবে চেঁচালো,তাতে তেমন ব্যথা পাওয়ার কথা না। সামন্যই ছিটে গেছে। তাদের দু’জনের চিৎকার শুনে বেরিয়ে আসলো খোঁড়াতে খোঁড়াতে সাইদা মির্জা। তার চোখ সর্বপ্রথম গেলো জুলির দিকে। হায়হায় করতে করতে জুলিকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো রান্না ঘর থেকে। মুনতাহা কে শুনিয়ে বলে গেলো,

“ কি অলক্ষুণে মেয়েরে বাবা। দিলো দিলো জুলির পা টা পুড়িয়ে দিলো। ”
শুনে মনে হলো জুলির হাত পা একদম পুড়ে ভষ্ম হয়ে গেছে। রেণু দৌড়ে আসলো। মুনতাহা কে নিয়ে রুমে গেলো। মলম লাগিয়ে দিয়ে বলল,ভাত টা সে রেঁধে নিবে। মুনতাহা যেন রেস্ট নেয়। যন্ত্রনা এতটা বেড়ে গেলো যে সন্ধ্যার দিকে গা কাঁপিয়ে জ্বর চলে আসলো একেবারে। অতিথিরা এসে খেয়ে দেয়ে কখন চলে গেছে মুনতাহা বলতে পারবে না। দ্বিতীয় বার আর রেণু এসে মুনতাহা কে দেখে যাবে সেটাও আসতে দিলো না সাইদা মির্জা।

সিকান্দার রাতে ফিরলো ক্লান্ত শরীরে। রুমে ঢুকে মুনতাহা কে অসময়ে শুয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে আসলো। মুখের উপর এসে থাকা চুল গুলো সরিয়ে দেওয়ার জন্য হাত দিতেই অস্বাভাবিক ভাবে গরম দেখলো। ভালেমতো কপালে হাত দিয়ে দেখলো জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। ঘাড় ঘুরাতে গিয়ে চাদরের বাহিরে থাকা পুড়ে যাওয়া হাতটা নজরে আসতেই শরীর জমে গেলো। হাত বাড়িয়ে হাতটা ধরতে দেখতে পেলো যেন সদ্য ফোস্কা পড়া জ্বলন্ত ঘা। জ্বরের ঘোরে ফুঁপিয়ে উঠছে বারবার। কয়েকবার সিকান্দার নাম ধরে ডাকলো। কিন্তু মুনতাহার সাড়া আসলো না। মেয়েটা যে জ্ঞানে নেই তা বোঝার বাকি নেই। সে কাঁধের ব্যাগটা ফ্লোরে ফেলে রেখেই রুম থেকে ব্যস্ত পায়ে গলার টাই খুলতে খুলতে বেরিয়ে গেলো। রেণু কে ডাকলো। রেণু আসতেই তাকে মুনতাহার বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই রেণু তোতাপাখির মতো গলগল করে সব বলে দিলো। কিভাবে সাইদা মির্জা পা মচকানোর নাটক করলো।

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৫

কিভাবে এত এত মানুষের রান্নার দায়িত্ব দিলো। কিভাবে ইচ্ছে করে জুলি কে রান্না ঘরে পাঠিয়ে মুনতাহার শরীরে গরম মাড়,আর ভাত ফেলালো। রেণুকে আসতে দিলো না মুনতাহার রুমে। সন্ধ্যা থেকে মুনতাহার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ডক্টর ডাকতে দিলো না। সিকান্দার কে ফোন দিতে চাইলো রেণু,সেটাও দিতে দিলো না। সব শুনে সিকান্দারের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেলো। সমস্ত রাগ শরীরে এসে হানা দিলো। এত অপছন্দ তাদের মুনতাহা কে। এত ঘৃণা,এত রাগ! ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে গেছে সিকান্দারের। কেন এভাবে তারা বারবার মুনতাহা কে কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করছে? কেন? রাগে গিজগিজ করতে করতে সে বসার ঘরে গিয়ে ডাকতে লাগলো সেলিম মির্জা আর সাইদা মির্জা কে।

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here