Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 38

Naar e Ishq part 38

Naar e Ishq part 38
তুরঙ্গনা

❝ভাই তুই ফোন ধর—তোর ফেরারির উপর জ্বীনের আছর পড়ছে।❞
নিকষিত আবদ্ধ ফেরারির মাঝে, লাগাতার ফোনের রিংটোনে চারপাশ ছেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেসবের প্রতি উন্মাদ হয়ে ওঠা কেকের কোনো হুঁশ নেই। এমনকি ফোনটা যে সাইলেন্ট করে রাখবে, সেই সুযোগটাও যেন সে খুঁজে পাচ্ছে না কিংবা দিতে নারাজ। বন্য উন্মাদের মতো পাগলপারা হয়ে উঠেছে সে।
এতক্ষণ ধরে গমগমে বিদ্যুৎ চমকানোর শব্দ কিংবা জানালার কাঁচে তীব্র ঝড় বৃষ্টির ছাঁট সহ বারবার ফোনের আওয়াজে কেকে যতটা না বিরক্ত হয়েছে, তার চেয়েও বেশি বিরক্ত হলো বর্তমান চমলানরত বিশেষ মূহুর্তে ফোনের তীব্র আওয়াজটুকু কর্ণধারে লাগায়।

ফলাফলস্বরূপ নিজের সমস্ত বিরক্তির সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যেতেই কেকে আচমকা রমণীর নিষিদ্ধ ও তপ্ত উপত্যকা হতে নিজের মুখখানা তুলল। কপালে তার তীব্র বিরক্তির ভাঁজ। সে চরম ক্ষিপ্রতায় গাড়ির উইন্ডো গ্লাসটা সামান্য নামিয়ে দিয়ে, এই ঝড়-বৃষ্টির মাঝেই একগাল পানীয় তরল মুখ থেকে সোজা বাইরে ছিঁটকে ফেলে দিল। পরক্ষণেই আবার জানালার কাঁচটা সশব্দে বন্ধ করে দিয়ে, হাতড়ে সিটের এককোণা হতে ফোনটা তুলে নিল। ফোনের স্ক্রিনে সাদের নামটা ভেসে উঠতে দেখেই কেকের মেজাজ এক নিমেষে সপ্তমে চড়ল।
​উন্মাদ এই মানবের কাঁধ ছোঁয়া ওল্ফ কাটের চুলগুলো তীব্র মত্ততায় সব এলোমেলো হয়ে ভিজে সিক্ত হয়ে আছে; কপালসহ চোখ-মুখের প্রায় অর্ধেকটাই ঢেকে ফেলেছে সেই কুচকুচে কালো চুলে। অবাধ্য বউয়ের কান্না আর ছটফটানি সামলাতেই যেন তাকে আজ এক মহাযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছে।

একদিকে হাতের তালুতে ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে চলেছে, অন্যদিকে কেকে নিজের তীক্ষ্ণ ও জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে সুহিনকে পরখ করছে। সুহিন তখন নিজের হাত-পা গুটিয়ে ব্যাকসিটের এককোণে একরাশ জড়তা নিয়ে চুপটি করে বসে আছে। পা দুটো তার অস্বাভাবিক রকমের থরথর করে কাঁপছে। গায়ের অবিন্যস্ত পোশাক হতে শুরু করে তার লম্বা বাদামি চুলগুলো সব অবাধ্যভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। সে কেকের দিকে ভীত ও শঙ্কিত চোখে তাকিয়ে থেকেই ক্ষণে ক্ষণে ফুঁপিয়ে উঠছে। বেচারি কান্নাকাটি করতে করতে নিজের চোখ-মুখ লাল করে ফুলিয়ে ফেলেছে। কেকের কাছে এ যেন এক নতুন উপদ্রব—কিছু না করলেও এই মেয়ে বারবার কাঁদছে কেনো, তাই তার বোধগম্য নয়।
কেকে ততক্ষণে সুহিনের ওপর থেকে নিজের তীক্ষ্ণ নজরটা সরিয়ে ফোনটা রিসিভ করে, মাথাটা কিঞ্চিৎ কাত করে ঘাড় আর কানে মাঝে চেপে ধরল। তৎক্ষনাৎ ওপাশ থেকে সাদের আকাশ ফাটানো চিল-চিৎকার শোনা গেল,

“ভাই, ভাই তুই কোথায়? সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে।”
কেকে ভ্রু উঁচিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল,
“সর্বনাশ? কি হয়েছে?”
সাদ তখন বারান্দার রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে সবেমাত্র থমকে যাওয়া স্থির ফেরারিটাকে দূর হতে তীক্ষ্ণ নজরে পরখ করে নিল। হঠাৎ করে গাড়ির সেই ছন্দোবদ্ধ নড়াচড়া ও দুলুনি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাদ মনে মনে আরও বেশি বিচলিত ও শঙ্কিত হয়ে পড়ল। বাইরের প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের চেয়ে এখন তার ভেতরের চিন্তার ঝড়ের প্রকোপ যেন বহুগুণ বেশি।
​সাদ নিজেকে কিছুটা শক্ত করে, কাঁপতে থাকা অবরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
“ভাই… ভাই তোর গাড়ি…”
​কেকের ভ্রুযুগল এবার আরও কিছুটা কুঁচকে গেল। সে তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন ছুড়ল,
“তুই এই মুহূর্তে কোথায় আছিস?”

—“আমি… আমি তো বাড়িতে কিন্তু তুই কোথায়?”
—“আমার চিন্তা করতে হবে না, তোর কি হয়েছে সেটা বল দ্রুত। কাজে ব্যস্ত আছি, হাতে সময় কম।”
—“ভাই আমার তো কিছু হয়নি, হয়েছে তোর।”
—“কি আশ্চর্য, আমার আবার কি হয়েছে?”
—“ঐ বাপ, তুই দুমাস আগেই না গাড়ি চেঞ্জ করলি।”
—“হু, তো?”
—“বাপ,তোর ফেরারির উপর জ্বীন-পরীর আছর পড়ছে।”
—“হোয়াট দ্য হেল? এইসব কথার মানে কি?” কেকে দাঁতে দাঁত পিষে বলল। সাদ তাকে আশ্বস্ত করতে ছটফটে সুরে বলল,

—“বিশ্বাস কর ভাই, আমি মিথ্যা বলছি না। একটু আগেই ওটা নড়তে ছিল; এখন আবার নড়াচড়া থেমে গেছে। এই যে আমার রুমের বারান্দা থেকেই চোখের সামনে সবটা দেখা যাচ্ছে।”
মুহূর্তের মধ্যে কেকের কপালের সমস্ত বিরক্তির ভাঁজ যেন কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল। তার তীক্ষ্ণ মস্তিস্কে হুঁশ ফিরতেই বুঝতে আর বাকি রইল না যে সাদ আসলে দূর থেকে কী অবলোকন করেছে এবং তার কথার আসল নিহিতার্থ কী! কেকে নিজের গলাটা সামান্য খাকিয়ে ঝেড়ে নিয়ে, অত্যন্ত সংক্ষিপ্তে সহজাত গাম্ভীর্যের সাথে বলল,
“আমি ব্যস্ত আছি, পড়ে কথা বলছি।”
—“আরে আরে,ফোন কাটিস না। তোর গাড়ির কি করব সেটা বল? ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে ফেলে রেখেছিস, ফেরারির এজেন্সি জানতে পারলে নির্ঘাত কেস ঠুকে দেবে।”
—“ওসব আমি বুঝে নেবো, তোকে কিচ্ছু করতে হবে না চুপচাপ গিয়ে ঘুমা।”
বলেই সে খট করে ফোনটা কেটে দিল। সাদ বেচারা চরম অস্বস্তি নিয়ে বারান্দায় আবারও পায়চারি শুরু করল। কেকের কথামতো রুমে ফিরে যেতে চেয়েছিল সে, কিন্তু তার আগেই এক অভাবনীয় কাণ্ড দেখে তার পুরো শরীর হিম হয়ে গেল। আগের মতো চোখের সামনে আবারও গাড়িটাকে তীব্র আলোড়নে নড়াচড়া দেখে সাদের চোখ-মুখ শুকিয়ে কাঠ; সে ভয়ে কিঞ্চিৎ ঢোক শুষ্ক গিলল। আর কোনো প্রকার কালবিলম্ব না করে সে তড়িঘড়ি করে আবারও কেকের নাম্বারে কল করল। এবার অবশ্য ওপাশ থেকে প্রায় সাথে সাথেই কেকে কলটা রিসিভ করল,

___”আবার কেন ফোন করেছিস, ইডিয়ট!”
কেকের কণ্ঠ চিরে যেন আগুন ঝড়ছে। সাদ আমতাআমতা করলেও, নিজের সব রাগ একত্রে উগড়ে দিয়ে বলল,
___”শালা ফোন কাটোস কেন? তোর গাড়ি তো আবারও…”
সাদের কণ্ঠস্বর মাঝপথেই আচমকা থেমে গেল। কারণ চোখের সামনে কেকের কালচে ফেরারিটা আবারও রহস্যময়ভাবে স্থির হয়ে গিয়েছে। সে এই অদ্ভুত সমীকরণটা কিছুতেই মেলাতে পারছে না। কেকের নাম নিলেই গাড়ি একা একাই নড়াচড়া বন্ধ করে দেয় কীভাবে? এই প্রলয়ঙ্করী ঝড়-বৃষ্টি আর নিকষ অন্ধকারের মাঝে, তার নিজের একা গিয়ে গাড়িটা চেক করার মতোও সাহস হচ্ছে না।
সাদ অত্যন্ত ভীতুস্বরে বলল,

___”বেটা আমার কিছু ঠিক লাগতেছে না, তুই কিছু বলিস না কেন।”
___”আশ্চর্য! আমি কি বলব?”
___”তোর নাম নিলেই গাড়ির নাচাকোঁদন থেমে যায়; ফোন কেটে দিলেই আবার জ্বীনে হাজির হয়—এসব কি হচ্ছে, বাপ?”
খানিকক্ষণ কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। পরক্ষণেই কেকের ক্ষিপ্ত স্বর ভেসে এলো,
___”গাধা! তোর সমস্যা কি বলতো? বললাম না চুপচাপ রুমে গিয়ে ঘুমাতে!”
___”ধুর, রাখ তোর মরণের ঘুম। এদিকে আমি টেনশনে… ভাই ভাই ঐ-যে আবারও…”
চোখের সামনে পুনোরায় কালো ফেরারিটাকে পুরোদমে নড়তে-দুলতে দেখে, সাদ আক্ষরিকঅর্থেই সোজা লাফিয়ে উঠে, চিলচিৎকার জুড়ে দিল,
___”উইযে ভাই…উইযে! তোর ফেরারি আবার নড়ে!”
এবার আর কেকে থামল না। নিজের মতো বন্য মত্ততায় ব্যস্ত থেকে, তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলল,
___”তোর হয়ে গেলে, এবার আমি ফোনটা সুইচঅফ করলাম।”
___”এই না না….এক সেকেন্ড, এক সেকেন্ড, সত্যি করে বলতো তুই এখন কোথায় আছিস?”
___”বউয়ের উপর!”
কেকে অত্যন্ত নির্লিপ্ততায় অকপটে উত্তর দিল। অথচ সাদ হকচকিয়ে ভড়কে বলল,

___”কিহ্ কিহ্, এটা কি বললি তুই?”
___”কিছু না!”
___”বাপ, আমি টেনশনে আছি, তুই মজা করিস কেন?”
হুট করে সাদের চঞ্চলতা স্তিমিত হয়ে, কন্ঠস্বর গম্ভীর হতেই, কেকে কন্ঠস্বর তীক্ষ্ণ করে বলল,
___”আমিও ইজি কাজে বিজি আছি, সো ডোন্ট ডিস্টার্ব মি!”
___”আমি ডিস্টার্ব কোথায় করলাম, আমি তো শুধু জানতে চাচ্ছিলাম তুই এখন কোথায় আছিস। আমার কেমন যেন তোর কথাবার্তা শুনে, সবকিছু ঠিক মনে হচ্ছে না।”
___”হোয়াট ডু ইউ মিন?”
___” না মানে, সত্যি করে বল না তুই কোথায় আছিস?”
___”জাহান্নামে আছি, সো হোয়াট?”
___”তবে হাঁপাচ্ছিস কেন এভাবে?”
___”……..” কেকে সম্পূর্ণ নিরুত্তর। সাদ আবারও শুধালো,
____”আর কান্নার শব্দ কোত্থেকে আসতেছে? তোর আশেপাশে কেউ কান্না করছে?”
___”………”
___”এই বাপ, কিছু বলিস না কেন? সত্যি করে বল, কোথায় আছিস তুই? আমি যা ভাবছি তুই কি তাই….!”
___”কি ভাবছি তুই?”, এতক্ষণ নিরুত্তর রইলেও আচমকা কেকের গমগমে কন্ঠস্বর শোনা গেল। সাদ শুরুতে ইতস্তত করে তৎক্ষণাৎ বলে বসল,

___”হুট করেই গায়েব হয়েছিস! তুই আবার ঐসব করতে যাসনি তো? দেখ বেটা, মানুষ মা’রা কিন্তু ঠিক না। তুই একা একা কেন ঐসব করতে গেছিস। আমাদের বললেও তো পারতি, না জানি কোথায় কোন হালারে টপকে দিচ্ছিস। এমনিতেও দিনকাল ভালো যাচ্ছে না, আন্ডারগ্রাউন্ডের ঐ হালার ফুতেরাও মানুষের জাত না। সব দোষ তোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে যদি, শালারা কোনো অকাজ করে বসে? তখন কিন্তু, ব্যান্ডের মান সম্মান সব যাবে।”
সাদের মাথায় যতটুকু ধরেছে সে ততটুকুই উগড়ে বলে যাচ্ছে। কেনো না, এই ঝড়বৃষ্টির মাঝে কেকে কোনো মেয়ে সম্পর্কিত কাজে জড়াতে পারে, আপাতদৃষ্টিতে এমন ভাবনা তার চিন্তাশক্তির দূরদূরান্ত অব্দি নেই। অন্যদিকে কেকে তার নিজের ফেরারিতে অন্যকাউকে স্থান দিবে,এ-ও অসম্ভব বিষয়।
যথারীতি চোখের সামনে লাগাতার গাড়ির বন্য নড়চড়কে পরখ করতে দেখেও, সাদ কেকে-কে নিয়ে বিশেষ কোনোকিছু ভাবার সুযোগই পাচ্ছে না।
এদিকে কেকে হতে কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে, সাদ আবারও বলল,

____”ভাই শোন আমি একটা কাজ করি,আমি বরং তালহা আর বাকিদের জানিয়ে দিচ্ছি। আপাতত সময় করে তুই দ্রুত বাড়ি ফিরে আয়, ততক্ষণে আমরা না হয় তোর গাড়িটাকে গ্যারেজে….”
____”এই নাহ্!”
আচমকা কেকের হুংকারের, সাদ থতমত খেয়ে গেল,
____”কি হলো আবার?”
____”সবসময় তোকে এতো বেশি কে বুঝতে বলে, গাধা?”
____”আরে, আমি আবার কি করলাম?”
____”কিচ্ছু করিসনি তুই, কিচ্ছু করারও প্রয়োজন নেই তোর। চুপচাপ নিজের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। আর কাউকে কিচ্ছু বলার প্রয়োজন নেই।”
____”আরে কিসের ঘুম, রাতে যে রেসিং ক্লাবে ইভেন্ট ছিল ভুলে গেছিস?”
____”না ভুলিনি, ইভেন্ট ছিল তা তোরা এখনো বাড়িতে কি করছিস?”
____”না মানে…যাবো আরকি…!”
____”তাহলে যা না গাধাআআআ!”
____”কিন্তু… তোর ফেরারি….”
____”জাহান্নামে যাক ওটা, তুই চুপচাপ নিজের কাজ কর।”
____”কিন্তু….!”
____”আবার কিন্তু? তোরা দুই গাধা মিলে কি এবার আমায় মে-রে ফেলবি?”
____”আরে ভাই চেতোস ক্যান? আমি তো শুধু…এক সেকেন্ড, দুই গাধা বলতে? আরেকটা কে?”

কেকের মাথা ভনভন করতে শুরু করেছে। এবার তো এটাও বুঝতে পারছে না, এই গাধাটার সাথে এতক্ষণ ধরে এতো কথাই বা কেনো বলছে; চোখের সামনে যখন আরেক গাধার মুখ চেপে ধরেও কান্নাই থামাতে পারছে না।
কেকে আর কথা বাড়ানোর মতো পরিস্থিতিতে নেই। সে চট করে কলটা কেটে দিয়ে ফোনটা এলোপাতাড়ি একদিকে ছুঁড়ে মারল। নিমিষেই সেটা কোনো এক কোণে গিয়ে, কিছুটা আঘাতপ্রাপ্ত হতেই সোজা বন্ধ হয়ে পড়ে রইল।
এবার চোখের সামনে কাচুমাচু হয়ে ফোঁপাতে থাকা রমণীরকে সোজা করবার পালা। নিজেই দুহাতে মুখ চেপে একাই সেই কখন থেকে সুহিন কান্না করে চলেছে। কেকে ফোনটা রেখে তার দিকে ফিরতেই যেন সুহিনের আতংক আরো কিছুটা বেড়ে গেল। এমনিতেও সাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে, কেকের চোখ-মুখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। মেয়েটা তাকে এভাবে ভয় পাচ্ছে দেখে, কেকে হা-হুতাশ ছাড়া আর কিছু করতে পারছে না। সাথে মেজাজের যে হাল হয়েছে, এইমূহূর্তে ইচ্ছে করছে দুনিয়া থেকেই উঠে যেতে। তবুও সে নিজেকে যথাসম্ভব সংবরণ করার চেষ্টা করে বলল,
“এখন আবার তুই কাঁদছিস কেন?”
সুহিন মুখে হাত চেপে রেখেই ফুঁপিয়ে উঠল,
“আমি বাড়ি যাবো!”

কেকে ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে তীব্র বিরক্তি নিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে ভাবল—
“ওহ গড! আমার কপালেই কেনো এইসব জুটেছে। আর এই মেয়েকে নিয়ে আমি জীবনে করবই বা কি? একে তো কিছু করলেও কাঁদে, না করলেও কাঁদে। ধমক দিলেও কাঁদে, আদর করলেও কাঁদে।”
সুহিন কাচুমাচু হয়ে নিজেকে আরো বেশি গুটিয়ে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। তার অনিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছে। তবে এসব ব্যতীতও সে কয়েকবার খেয়াল করেছে, এই গাড়িতে তারা দুজন ব্যতীত বোধহয় আরো কেউ আছে। অন্যকোনো বিশেষ এক অস্তিত্ব যে এখানে উপস্থিত, তা সে টের পেলেও বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারছে না। তার সকল ভাবনা ফুঁপিয়ে ওঠা কান্নার আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
ওদিকে কেকে নিজেকে পুরোদমে সংবরন করার শেষ চেষ্টাটুকু করে, বা-ভ্রু উঁচিয়ে তির্যক ভঙ্গিতে কথা ছুঁড়ল,

—“সিরিয়াসলি? ঠিকমতো ধরলাম না, ছুঁলাম না, খেলাম না তার আগেই বাড়ি চলে যাবি?”
কেকে একটু থামল। বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ভ্রু স্লাইড করে আবারও অকপটে বলল,
“এমিনতেও কার বাড়ি যাবি তুই? তোর বরের বাড়ি তো এখান থেকে মাত্র দুমিনিটের পথ। গাড়িতে প্রবলেম হচ্ছে এটা আগে বললেই তো হতো—রুমে গিয়েই না হয় করতাম।”
—-“চুপ থাকুন আপনি, আমাকে বাড়ি রেখে আসুন।”
আবারও ফোঁপাতে শুরু করল সুহিন। কেকে নিজেকে আরেকটু শান্ত করার চেষ্টা করল। সুহিনের দিকে দু-হাত বাড়িয়ে, তাকে আগলে নেবার উদ্দেশ্যে আওড়াল,
“ওয়াইফি আমার,এমন করতে নেই। আমি কি তোকে বেশি ব্যাথা দিয়েছি? আমি তো কিছু করিই নি এখনো! তবে কাঁদছিস কেনো, বলতো?”
কেকের এহেন কথা শুনে, আচমকাই সুহিন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল,
“কিছু করেননি? আমার সবকিছু শেষ করে দিয়ে বলছেন, কিছুই করেননি?”
কেকে চোখ-মুখ কুঁচকে, বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ভ্রু স্লাইড করতে করতে নাদান ভঙ্গিতে বলল,
“ওটা তো যাস্ট ট্রায়াল ছিল। আই মিন, এগুলোকে এতো সিরিয়াসলি কে নেয়?”
সুহিন তার কথার ভঙ্গিতে আবারও কেঁদে ফেলল,

“অমানুষ, শয়তান একটা! অনেক হয়েছে আমি আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না। ছেড়ে দিন আমি একাই বাড়ি ফিরে যাবো। কালকের মধ্যেই এদেশ থেকেও চলে যাবো।”
বলেই সুহিন অনবরত ফোপাঁতে লাগল। একইসাথে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“বেটা মানুষের সমস্যাই একটা—ছুঁতে দিলেই খেতে চায়!”
বলেই সে আবারও হুড়মুড়িয়ে কেঁদে উঠল। অন্যদিকে কেকে’র হাতদুটো নিশপিশ করছে এই অবাধ্য বউয়ের গালে, দু-চারটে চড় থাপ্পড় বসিয়ে দিতে। কিন্তু এখন তো তার একদমই মাথা গরম করলে চলবে না।
কেকে তার দুবাহু শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরে, নিজের বক্ষস্থলে আগলে নেবার প্রয়াসে আওড়াতে লাগল,
“তুই না আমার ভালো বাচ্চা, কথা শোন আমার…”
মুহূর্তেই সুহিন হাত-পা ছুঁড়ে ছটফট করে বলতে লাগল,

—“নির্লজ্জ, বেহায়া, অসভ্য লোক! কতবার বলেছি, মুখ বন্ধ করুন। আপনার কথাবার্তা শুনেই আমার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে।”
—“তাহলে এবার কান্না বন্ধ কর! আমি কি তোকে ব্যাথা দিয়েছি? একদমই না? দেখ, তুই এখনো বেঁচে আছিস। তার মানে আমি ওদের মতো ওতোটাও খারাপ নই যে এসব করতে গিয়ে বাচ্চা বউ মেরে ফেলব।”
—“আপনি, আপনি, আপনি মুখ বন্ধ করুন….আম্মুউউউউউ!”
সুহিন বিস্ময়ে ফোপাঁতে ফোপাঁতে চিৎকার করে উঠল। কেকে ধমক দিয়ে বলল,
—“তাহলে চুপ কর!”
—“আব্বুউউউউউউ!”
—“কি আশ্চর্য, এসবের মধ্যে ওনাদের কেনো ডাকছিস, গাধা!”
—“আমি কিছু জানিনা, আমি আর পারব না।”
বলেই সুহিন হাত-পা ছোড়াছুড়ি করতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে একপর্যায়ে তার নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কোনো কারণ ছাড়াই রমণীর এমন শারীরিক অধঃপতনে কেকে রাগ ঝাড়ার আর সুযোগ পেল না। বরং সে সুহিনের অবস্থার অবনতিতে আচমকা বিচলিত হয়ে উঠল। সে তাকে দু’হাতে আগলে জড়িয়ে, বক্ষস্থলে নিস্তেজ দেহটাকে টেনে নিয়ে বলল,

—‘হেই ওয়াইফি! ব্রেথ এন্ড লুক এট মি!”
সুহিন এমন পরিস্থিতিতেও শুষ্ক ঢোক গিলে কেবল একটি কথাই আওড়াল,
—“বললাম তো আর সম্ভব না….!”
কেকে তার কথা শুনে আবারও এক নিমিষেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। রমণীর গাল-পিঠ শক্ত করে আঁকড়ে ধমকে উঠল,
—“গাধা, আমার কথা শোন। নয়তো মেরে তক্তা বানাবো।”
আচমকা ধমক শুনে সুহিন পুনরায় ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠল,
—“আম্মুউউউউউ!”
—“আবার আম্মু?”
—“আব্বুউউউউউ!”
—“আবার আব্বু?… হোয়াট দ্য হেল, কি শুরু করেছিস তুই এসব?”
পূর্বের চেয়েও ধমকের প্রকোপ বাড়তেই, সুহিন আবারও কেঁদে ফেলল। কেকে’র মাথা ভনভন করছে কেবল এই একটা মেয়েকে সামলাতে গিয়ে। জোর করে কিছু করাও সম্ভব না। নয়তো সেই কখনই সবটা সেরে ফেলত। সে নিজের রাগটা আবারও চাপিয়ে, শান্ত সুরে রমণীর গাল আলতো হাতে চাপড়ে বলল,

—“বেইবি,জান আমার,শোন একটু…”
—“না,না,সম্ভব না….”
সুহিন মাথা এপাশ-ওপাশ করে একই বাণী আওড়াল। কেকে আর তার সাথে কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করতে চাইল না। ফলে পুনরায় বিশেষ কিছু করে বসার প্রয়াসে, সুহিনের উদ্দেশ্যে ভগ্নসুরে ফিসফিস করে আওড়াল,
—“বেইবি, জাস্ট কাম ডাউন এন্ড ফলো মাই লিড।”
সুহিন আগাম সতর্কসংকেত টের পেয়েই, চিৎকার করে উঠল,
—“এ্যাই না, না, না…. ”
কিন্তু কেকে তার একটা কথাও শুনলো না। সে নিজের মতো কাজ চালিয়ে যেতে যেতে বলল,
—“জান, আমার কথাটা তো শোন। আমি যেভাবে বলছি জাস্ট ওভাবেই কর, দেখবি একটুও ব্যাথা লাগবে না।”
সুহিন তৎক্ষনাৎ চোখমুখ খিঁচে চেঁচিয়ে উঠল,

“নির্লজ্জ বেটা ছেলে! কতবার বলেছি মুখ বন্ধ করতে। আপনার মুখের উপর ঠাডা পড়ুক!”
সুহিনের বলতে দেরি অথচ আচমকা বিকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকাতে দেরি নেই। অকস্মাৎ এমন ঘটনায় সুহিনের মুখখানা শুকিয়ে চোখ ছানাবড়া হলো। এক মূহুর্তের জন্য ভেবেই নিল, কথা মতো ঠাডাটা হয়তো তাদের মাথার উপরেই পড়েছে। ফলে এতক্ষণ হতে যে মেয়েটা কেকের কাছ থেকে সরতে, চিৎকার চেঁচামেচি করে যাচ্ছিল, সেই রমণীই হুট করে এক চিৎকারে কেকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল,
“আআআআআআ…!”
সোজা দুহাতে কেকের ঘাড়-কাঁধ শক্ত হাতে পেঁচিয়ে, কেকের গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে মিনমিন করে বলে উঠল,
“না, না, ঠাডা পড়ার দরকার নেই।”
কেকে তার কান্ডে তপ্ত শ্বাস ফেলল; দুহাতে সুহিনকে আগলে, প্রশস্ত বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিল। রমণীর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“তাহলে বল, আর কাঁদবি?”

—“না,না, আর কাঁদব না। কিন্তু….”
সুহিনকে বুকের মাঝে দু’হাতে আগলে রেখেই,নিজের মুখটা খানিক পিছিয়ে আনল কেকে;অতঃপর সুহিনের ভয়ার্ত নীলাভ চোখের দিকে নিজের গাঢ়-নেশাতুর চোখ জোড়া রেখে প্রশ্ন করল,
—“কিন্তু কি?”
সুহিন কিছুটা ইতস্তত করে কাচুমাচু হয়ে মিনমিন করে বলল,
“একটু আস্তে…নয়তো ব্যাথা লাগে।”
কেকে তার কথা শুনে এক চিলতে তির্যক হাসল। রমণীর চেইন খোলা উন্মুক্ত পিঠটায় অভ্যাসবশত ধীরস্থিরে হাত বুলাতে বুলাতে উৎসুক রমণীকে দেখতে লাগল। কেঁদে-কেটে নিজের ফর্সা মুখটা কি এক করুন দশা করে রেখেছে।

এদিকে সুহিন ভেবেছিল এতক্ষণ যেভাবে কেকে তাকে ভালো ভালো কথা বলে আশ্বস্ত করছিল, সেভাবেই হয়তো এখনো তার আবদারটুকু মেনে নিবে।
অথচ সুহিনকে সম্পূর্ণ চমকে ও স্তব্ধ করে দিয়ে কেকে আচমকা নিজের সমস্ত ভারসহ রমণীকে নিয়ে ফেরারির লেদার সিটের ওপর সশব্দে আছড়ে ফেলে দিল। কেকে অকস্মাৎ সুহিনের একটা পা টেনে খানিকটা নিজের কোমরের পাশে উঁচিয়ে ধরে লক করে দিল; অন্য হাতখানা সুহিনের মাথার পাশে সিটের ওপর সুদৃঢ় প্রাচীরের মতো ঠেকিয়ে সে পূর্ণ হিংস্রতায় রমণীর ওপর চড়ে বসল।
​সুহিন বিস্ময়ে ও আকস্মিকতায় নিজের চোখ দুটো ছানাবড়া করতেই কেকে তার দিকে বেশ খানিকটা ঝুঁকিয়ে আনল নিজের বলিষ্ঠ অবয়ব; অতঃপর তার ওষ্ঠাধরের ওপর নিজের তপ্ত নিশ্বাস আছড়ে ফেলে কানের কাছে হাস্কিটোনে পাশবিক সুরে ফিসফিস করে বলল,

Naar e Ishq part 37

​”সরি ওয়াইফি! আই’ম নট অ্যা জেন্টলম্যান!”
বলেই কেকে তার ওষ্ঠকোণ কামড়ে, গুনগুন করে চাপা স্বরে গাইল,
“ও শ্যামরে তোমার সনে…
একেলা পাইয়াছিরে শ্যাম,
এই নিগুড় বনে………
আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম…!”

Naar e Ishq part 39

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here