Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১০

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১০

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১০
জেরিন আক্তার

সুবহাকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে সৌরভ আশেপাশে তাকালো। ওর ভাইকে তো দেখছে না, এমনকি কোনো বন্ধুবান্ধবকেও দেখছে না। মিনিট দুই অপেক্ষা করার পরে সৌরভ সুবহাকে পাজা কোলে তুলে নিয়ে একটা মহিলাকে বলল সাথে যেতে। সে সাথে সাথেই গেলো।
সুবহাকে নিয়ে একটা প্রাইভেট হসপিটালে ভর্তি করালো সৌরভ। মাথায় আর হাতের কুনুইতে ছিলে গিয়েছে। সেটা ওয়াশ করে মেডিসিন দিয়ে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেওয়া হলো। আর সেন্স ফিরেনি, স্যালাইন চলছে।
সৌরভ ওর বেডের পাশে চেয়ারে বসে ফোন স্ক্রল করছে। সুবহার জ্ঞান ফিরতেই ও চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে রুমটা দেখে উঠে বসতে নিলে সৌরভ বলে উঠল,

“এই উঠছো কেনো? হাতে স্যালাইন দেখতে পাওনি?”
সুবহা শুয়েই রইলো। মনে করার চেষ্টা করলো কি করে ব্যাথা পেলো। আর সৌরভ ফোন স্ক্রল করতে করতেই রুম থেকে বেরিয়ে নার্স আর ডক্টরকে ডেকে আনলো। ডক্টর সুবহাকে দেখলো, স্যালাইন শেষ হওয়ায় সেটা খুলে দিলো। স্নিগ্ধ ডক্টরকে জিজ্ঞাসা করলো,
“পেশেন্টের কি রাত থাকতে হবে এখানে?
ডক্টর বললেন,
“না, থাকতে হবে না। আমি মেডিসিন লিখে দিচ্ছি এগুলো খেলেই হবে।”
ডক্টর নার্সকে নিয়ে চলে গেলেন। সুবহা সৌরভকে যত দেখছে অবাক না হয়ে পারছে না। ও আনুমানিক সন্ধ্যার দিকে মনে হয় রাস্তায় পড়েছিলো আর এখন বাজে রাত প্রায় ১০টা। এতোক্ষণ পর্যন্ত তাহলে সৌরভই পাশে ছিলো। সুবহা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
“ভাইয়া আপনি কি সন্ধ্যা থেকে এই পর্যন্ত এখানেই রয়েছেন?”
সৌরভ মনে মনে বলল, “নাহ আমি থাকবো কেনো? আমার আত্মা ছিলো।”
সুবহা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। সৌরভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“হুমম।”
এদিকে প্রাণেশা খুবই চিন্তিত। সৌরভ বাড়িতে ফিরছে না বলে। সেই রাতে বকাবকি করেছিলো তারপর থেকে একটা কথাও হয়নি। যতই হোক বড় ভাইতো। সাড়ে নয়টার উপরে বেজে গিয়েছে এখনও আসছে বলে কল দিলো। সৌরভ কল রিসিভ করে বলল,
“হ্যা বল!”
“ভাইয়া রাগ করে আছো আমার উপরে। বাড়িতে ফিরে এসো না। তোমার জন্য বসে আছি, খাইনি আমি খিদে পেয়েছে।”
“হুমম, আসছি।”
সৌরভ কল কেটে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে রিসিপশন থেকে ডিসচার্জ পেপার আর প্রেসক্রিপশন নিয়ে হসপিটালের বিল পে করে দিয়ে সুবহার কাছে এলো। সুবহাকে বলল,

“এখন যেতে পারবে?”
“হুমম।”
“এসো!”
সুবহা সৌরভের পেছন পেছন এলো। গাড়ির কাছে এসে সুবহা ড্রাইভিং সিটের পাশে বসলো। সৌরভ সুবহার ওষুধ আনার জন্য সামনের একটা ফার্মেসিতে গেলো। এরপরে সুবহার ওষুধগুলো ওকে দিয়ে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো।
সুবহা কিছু সেকেন্ড পরে বলল,
“আচ্ছা আমার ব্যাগ দেখেছেন?”
“পেছনের সিটে আছে।”

সৌরভ স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে শার্টের উপরের বোতাম দুটো খুলে এসি বাড়িয়ে দিলো। এতো রাগ, চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সিগারেট ধরালো। কে পাশে আছে সেটা আমলে নিলো না।
মিনিট বিশেক পরে সৌরভ সুবহার বাড়ির সামনে গাড়ি থামালো। সুবহা গাড়ি থেকে নামতেই দারোয়ান কাছে এলো। সৌরভ আর গাড়ি থেকে নামলো না। সুবহা দারোয়ানের হাতে ওষুধ, প্রেসক্রিপশন দিয়ে, ব্যাক সিটে থেকে ব্যাগ বের সৌরভের কাছে এসে দাড়ালো। নরম কণ্ঠে বলল,
“আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া।”
সৌরভ গলার কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে “ওয়েলকাম” বলে চলে গেলো।
সৌরভ বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়াতেই প্রাণেশা এগিয়ে এলো। সৌরভের শার্টে রক্তও লেগে ছিলো একটু। সেটা প্রাণেশা দেখে সৌরভকে ধরে প্রায় কেঁদে দিয়ে বলল,

“এই ভাইয়া তোমার কি হয়েছে? কোথায় ব্যাথা পেলে? রক্ত লেগে আছে কেনো?”
সৌরভ প্রাণেশার মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
“ধুর পাগলী আমার কিচ্ছু হয়নি।”
প্রাণেশা বিশ্বাস করলো কিনা বোঝা গেলো না। সৌরভ শার্ট খুলে বলল,
“এই দেখ গাধা, শার্টে রক্ত। শরীরে রক্ত নেই।”
প্রাণেশা নাক টেনে সৌরভের পিঠে কিল মেরে বলল,
“বাড়িতে দেরি করে ফিরলে কেনো? আমি কত চিন্তা করেছি?”
সৌরভ বলল,
“ওই তোর দিনকানা বান্ধবী রাস্তায় দেখলাম পড়ে আছে। সেটাকে হসপিটালে ভর্তি করে এখন ওষুধ কিনে দিয়ে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে এলাম।”

প্রাণেশা বুঝলো না, কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। সৌরভ মুখ বাকিয়ে বলল,
“ও তোর তো আবার প্রিয় মানুষের বোন। দিনকানা বললেও মনে হয় পাপ হবে।”
প্রাণেশা সৌরভের পেছন পেছন গিয়ে বলল,
“আমার বান্ধবী এখন কেমন আছে?”
সৌরভ ভ্রু কুঁচকে নিয়ে বলল,
“আমাকে বলছিস কেনো? ফোন নেই, কল কর!”
প্রাণেশা সোফার কাছে এসে ফোনটা নিয়ে কল দিলো সুবহাকে।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে স্নিগ্ধ কল দিলো প্রাণেশাকে। সুবহার চিন্তায় আর কল দিতেই পারেনি। তাই এখন দিচ্ছে। স্নিগ্ধ ভেবেই নিলো প্রাণেশা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে, এখন প্রথমবার কল ধরলে ধরলো। আর না ধরলে ফোন রেখে ঘুমিয়ে পড়বে স্নিগ্ধ।
প্রাণেশা স্নিগ্ধর প্রথম কলই ধরলো। স্নিগ্ধ অবাক কণ্ঠে বলল,
“ঘুমাওনি?”
“ঘুম আসছিলো না। সুবহার জন্যও ভালো লাগছিলো না। কেমন আছে ও?”
“এখন ভালোই। প্রাণ জানো সুবহাকে যে ছেলে হসপিটালে নিয়ে ভর্তি করিয়েছে এবং বাড়ি পর্যন্ত দিয়ে গিয়েছে সেই ছেলেকেই দেখলাম না।”
প্রাণেশা বুঝতে পারলো হয়তো সুবহা সৌরভের কথা বলেনি। প্রাণেশাও না বোঝার ভান করে বলল,
“তাই নাকি? ছেলেটা তো তাহলে ভালো কাজই করেছে।”
স্নিগ্ধ শ্বাস ছেড়ে বলল,

“কালকে ইউনিভার্সিটি যাবে?”
“না।”
“কেনো যাবে না?”
“সুবহা অসুস্থ। তাহলে একা একা গিয়ে কি করবো।”
এই শুনে স্নিগ্ধ ঝাড়ি বলল,
“একটা দিবো! কিসের যাবে না। কালকে যাবে ভার্সিটিতে।”
প্রাণেশা হেসে বলল,
“আমি যাবো না মানে যাবোই না স্যার।”
“আবার স্যার! কিসের স্যার? স্নিগ্ধ বলো।”
প্রাণেশা কখনই স্নিগ্ধকে নাম ধরে ডাকবে না। তাই এই প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল,
“আচ্ছা আজকে বাবা আপনাকে ডেকে কি বলল বললেন না তো!”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“তোমার বাবা আমার বাবা-মাকে যেতে বলেছে।”
“কিন্তু ভাইয়া যে….”
স্নিগ্ধ গভীর গলায় বলল,
“তোমাকে ভালোবেসেছি, তোমাকে আমার করতে যা করতে হয় আমি করবো। তোমার ভাইকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব আমার।”

প্রাণেশা ভ্রু উঠিয়ে বলল,
“আচ্ছা দেখবোনি কেমন ম্যানেজ করেন।”
“হুমম। পারবো আমি, বুঝলে!”
প্রাণেশা হেসে বলল,
“স্যার আই লাভ ইউ।”
স্নিগ্ধ হেসে ছোট্ট করে বলল,
“হুমম।”
“স্যার আই লাভ বলেছি!”
“আমি ‘হুমম’ বললামই তো।”
“না এতে হবে না। আই লাভ ইউ!”
“আই লাভ ইউ টু।”

সকালে ব্রেকফাস্ট করার সময় আরশাদ খান স্নিগ্ধর ব্যাপারে সৌরভকে কিছু বলার চেষ্টা করছে কিন্তু সাহস হচ্ছে না। আবার কালকে শুনলো সৌরভ রাগ করে অফিসে থেকে বেরিয়ে এসেছে। এমনকি সেই রাগে সৌরভ অফিসে যাবেই না।
সৌরভ খাবার খাচ্ছে সাথে ফোন স্ক্রল করছে। প্রাণেশা পাশে বসা। সৌরভ ওকে যত কিছুই বলুক ও সৌরভের পিছু ছাড়ে না। বিড়ালের মতো পেছন পেছনই ঘুরে। এই জন্যই বোধহয় সৌরভ ওকে বিড়ালের বাচ্চাই বলে।
আরশাদ খান সৌরভকে ছোট্ট করে ডাকলেন,
“সৌরভ!”
সৌরভ মাথা তুলে ফোন পাশে রেখে বলল,
“বলো।”
“বলছি অফিসে যাবে না?”
“না।”
“ঠিক আছে সমস্যা নেই। আচ্ছা একটা বলবো!”
“বলো!”
আরশাদ খান নরম কণ্ঠে বললেন,
“স্নিগ্ধ ছেলেটা ভালো। খোঁজ নিয়েছি। তোমার বোনের জন্য মানানসই আর সবদিক থেকেই ভালো। দুজনের বিয়েটা দিয়ে দেই!”

সৌরভের ভালো মেজাজটা বিগড়ে গেলো। চুপ করে রইলো। যা দেখে প্রাণেশা মনটা খারাপ করে মাথা নিচু করে রইলো। সৌরভ প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে আরশাদ খানকে বলল,
“ভালো হলে বিয়ে দাও, আমাকে বলছো কেনো? তুমি যখন স্নিগ্ধকে ডেকেছো আবার তার বাড়ির লোক আসতেও বলেছো আমাকে জানিয়েছো?..
…..তোমার মেয়ে, তুমি যা ভালো বোঝো তাই করো। আমি কে? আমি তো কেউ না খান বাড়ির। নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারো। আমিও নিজেকে খান বাড়ির কেউ মনে করিনা। বহুবছর আগে মা নামক কেউ একজন ছিলো সে চলে যাওয়ার পর নিজেকে এই বাড়ির কিচ্ছু মনে করিনা। ছোট ছিলাম তবুও সেই মানুষটাই আমার সিদ্ধান্ত শোনার অপেক্ষা করতো। তাছাড়া কে আমায় আপন ভাবে?”
প্রাণেশা মাথা নত করেই রইলো। আরশাদ খান লম্বা শ্বাস ছাড়লেন। সৌরভ ফোনটা নিয়ে উঠে চলে গেলো উপরে। প্রাণেশাও আর খেলো না। ভাইয়ের মুখে মায়ের কথা শুনে সেও নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো উপরে।

সৌরভ এসে রুমে বসে সিগারেট ধরিয়ে খাচ্ছিলো। ও কাঁদবে না কি করবে ঠিক পাচ্ছে না। এই হাত দিয়ে যেই বোনটাকে মানুষ করলো তার আবার বিয়ে হবে। আবার পছন্দ করে বিয়ে করছে। আজ ভালোবাসছে যদি কালকে বলে তোমাকে ভালো লাগে না তখন? এই নিয়েই সৌরভ খুব ভয় পায়।
বেলা ৯টার দিকে সৌরভ বেরিয়ে যায়। সারাদিনে আর বাড়ি ফিরলো না। রাত ৮ টার দিকে প্রাণেশা রুম থেকে বেরিয়ে নিচে এলো। সারাদিনে ভাইও বাড়ি ফিরেনি আর প্রাণেশাও কিচ্ছুটি খায়নি।
প্রাণেশা ড্রইং রুমে এসে যখন শুনলো সৌরভ এখনও আসেনি তখন আরও মনটা খারাপ হয়ে গেলো। আরশাদ খান পাশে বসে কল দিচ্ছে সৌরভকে।
প্রাণেশা জেদ ধরে বলল, “দেখি কতক্ষন ভাইয়া বাড়িতে না এসে থাকতে পারো। আমিও খাবো না। দেখি কতক্ষন জেদ দেখিয়ে বাহিরে থাকতে পারে। আমিও দেখবো ও কি করে আমার ভালোবাসা না মানে। যে পর্যন্ত না মানবে সেই পর্যন্ত কিচ্ছু খাবো না। দরজাও খুলবো না।”
এই বলে প্রাণেশা উপরে চলে গেলো। প্রাণেশা যা জেদ ধরে তাই করে দেখায়। আরশাদ খান দুই ছেলে-মেয়ের চিন্তায় পাগল হয়ে যাওয়ার পর্যায়।

সৌরভ ফিরলো রাত ১১ টায়।
রোকেয়া বেগম দুজনের জন্য খাবার নিয়ে বসেছিলেন। সৌরভকে দেখে তিনি এগিয়ে এলেন। সৌরভকে বললেন,
“সারাদিন কোথায় ছিলে বাবা? এদিকে আমরা সবাই কত চিন্তা করছি।”
সৌরভ বলল,
“একটা বন্ধু অসুস্থ। তার সাথে দেখা করতে শহরের বাহিরে গিয়েছিলাম। ফোনটায় চার্জ ছিলো না।”
রোকেয়া বেগম খাবার রেডি করছেন। সৌরভ তাকে বলল,
“আমি খাবো না এখন ভালো লাগছে না। খাবার বাড়তে হবে না। শুয়ে পড়বো।”
রোকেয়া বেগম নিচু গলায় বললেন,
“তুমি বেরিয়ে যাওয়ার পরে থেকে এখন পর্যন্ত তোমার বোন না খেয়ে আছে। তুমি ওর সাথে কথা বলে ওকে বুঝিয়ে কিছু খাওয়াও নাহলে অসুস্থ হয়ে যাবে।”
সৌরভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৯

“খাবার নিয়ে উপরে আসো।”
রোকেয়া বেগম খুশি হয়ে খাবার নিয়ে উপরে গেলেন। প্রাণেশা সৌরভের ডাকে রুমের দরজা খুলে দিলো। রোকেয়া বেগম খাবারগুলো রুমে রাখলো। আরশাদ খানও এলেন। সৌরভকে জিজ্ঞাসা করলেন,
“এতো দেরি করে ফিরলে কেনো?”
সৌরভ ভ্রু কুঁচকে নিয়ে কিছু একটা ভাবলো এরপরে ফট করে মিথ্যে কথা বলল,
“আরও আগে ফিরতাম কিন্তু একটু লেট্ হলো। বাবা প্লেনের টিকিট কেটে আসলাম। এই সপ্তাহেই লন্ডনে চলে যাবো।”

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here