Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫২

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫২

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫২
সোহানা ইসলাম

রাত তিনটার কাছাকাছি। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু দূরের পুকুরপাড়ে কিছু ব্যাঙ ডাকছে। আকাশে আধো চাঁদ, নদীর জলে সেই চাঁদের আলো ঝিকমিক করছে। হালকা কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে, যেন রাতটাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
গ্রামের পেছনের বড় মাঠটা পেরিয়ে নদী।এখন ঘাটে কেউ নেই,একেবারে নিরিবিলি । শুধু হালকা বাতাস, ঢেউয়ের মৃদু শব্দ আর আরমানের বাইকের হেডলাইটের আলো।
আরমান জারার দিকে তাকিয়ে বলল,

— “ওই পাগলী, আমার সাথে নদীর পারে যাবি?”
রাতের নীরবতায় জারার গলা একটু কাঁপল, মুখ শুকিয়ে গেল মুহূর্তেই।
— “আপনি… আপনি আমাকে তুই করে বললেন?”
তার গলায় অভিমান মেশানো কষ্ট।গাল ফুলিয়ে বলল— “আমি যাবো না।”
আরমান ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে এলো। চাঁদের আলোয় ওর মুখটা ঝলমল করছে। এসে দাঁড়াল ঠিক জারার সামনে। চোখে একটুখানি দুষ্টুমি, মুখে শান্ত হাসি। আলতো করে জারার নাকে একটা টুকা দিল।
জারা হতভম্ব হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎই আরমান ওকে কোলে তুলে নিল।
— “এই! কী করছেন আপনি!”
জারা মৃদু চিৎকার করে উঠল, কিন্তু সেই চিৎকার ডুবে গেল রাতের নিস্তব্ধতায়।
আরমান হেসে বলল,
— “চুপ কর, এখন নদীর ধারে যাবো।”
আরমান বাইকটার কাছে আসতে আসতে বলল,
— “ তুই হলো ভালোবাসার ডাক। এটা মন থেকে আসে। তুই মানে আপন, তুমি বললে কেমন জানি পরপর লাগে।”
জারা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে গেল। কিন্তু আরমান পরক্ষণেই যখন আবার বলে ,

— “এখন যদি নিজের বউ পর মনে হয়, তো অন্য বেডি চোখ দিবে আমার দিকে।”
তখন জারার চোখ বড় হয়ে গেল। “অন্য মেয়ে ওনার দিকে তাকাবে!”
এই কথা শুনে জারার রাগ একেবারে মাথায় উঠে গেল।সে আরমানের বুকে কিল ঘুষি মারতে লাগল,
— “আপনি একদম বাজে! আপনার সাথে কথা বলবো না আমি। আমি কোথাও যাবো না। আমি আপনার পর তাই না?”
আরমান হেসে ওর হাত ধরে বলল,
— “আরে বাবা! আমি তো সেই জন্য তোমাকে তুই করে বলি। যাতে তোমাকে পর না মনে হয়। একেবারে নিজের বলে মনে হয় । আর আমার দিকে যেনো কেউ না তাকায়।”
জারা মুখ ফিরিয়ে রইল। ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— “আমি তাহলে আপনার নিজের না?”
আরমান ওর মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিল।
— “এই চাঁদ টা সম্পূর্ণ আমার নিজের ।আমার জীবন, আমার মর, সুখ ময় বেঁচে থাকার কারণ । আর কখনো বলবো না এসব। তুই না বললেও মন খারাপ করিস, আবার বললেও রাগ করিস—এই ধাঁধা বুঝবো কেমন করে?”
জারা একটুখানি হাসল, তারপরও রাগী ভাব নিয়ে বলল,

— “আপনার যা ইচ্ছে হয় তাই বলুন, কিন্তু অন্য মেয়ের নাম মুখে আনবেন না—এই বলে দিলাম।”
আরমান মজার ভঙ্গিতে চোখ বড় করে বলল,
— “ওরে বাবা! আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম। আচ্ছা, আর বলবো না, এখন একটু হাসো না, আমার লক্ষী বউ।”
‘লক্ষী বউ’ কথাটা শুনে জারার মুখে হাসি ফুটে উঠল। রাগ কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
বাইকটা স্টার্ট দিল আরমান। হেডলাইটে ধুলো উড়ে গেল। চারপাশ অন্ধকার, শুধু বাইকের আলোয় দেখা যায় সরু পাকা রাস্তা। জারা বাইকের পেছনে বসে, শক্ত করে ধরে আছে আরমানের কোমর।
নদীর ঘাটে পৌঁছে বাইক থামালো সে। চারপাশ নিঃস্তব্ধ, শুধু নদীর ঢেউ আর চাঁদের আলো।
— “এই জায়গাটা মনে আছে? মাঠের মাঝে আমাকে কামড় দিয়ে, গালি দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলে একদিন। আবার ওই বড় আম গাছটার নিচেও আমাদের কতো সৃতি জড়িয়ে আছে ।”
— “তখনও তুই বলেছিলেন।”
আরমান মনে মনে ভাবে ‘ একেই বলে মেয়ে মানুষ। শুধু পুরনো কথা টেনে এনে ঝগড়া করার জন্য বসে থাকে। মনের কথা মনেই রইলো তার।
— “ কারণ তখনও ভালোবাসতাম। আর তখন রেগেও ছিলাম। কারণ তোমার ওই টা দেখা যাচ্ছিলো লা…।”

___” ব্যাস! আর বলতে হবে না! ”
জারা আর কিছু না বলে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। পানির ওপর চাঁদের আলো নরমভাবে নাচছে। আরমান এগিয়ে এসে ওর চুল সরিয়ে দিল কাঁধ থেকে।
চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল তারা। চারপাশে শুধু রাতের শব্দ—ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ, বাতাসের সোঁ সোঁ, আর হৃদয়ের নিঃশব্দ ধকধক।
আরমান ধীরে বলল,
— “তুই মানে পর না, মানজারা। তুই মানে নিজের। মন থেকে উঠে আসা ভালোবাসা।”
জারা নরম স্বরে বলল,
— “তাহলে আমি এখন থেকে আপনাকে তুই বলবো। ভালোবাসা যখন দুজনের নিজের, তখন ডাক টাও সমান করে ডাকা উচিত । ”
আরমান হাসল, তারপর ওর কপালে আলতো চুমু দিল।
___” আমি তোমার স্বামী হই! তাই সম্মানের সঙ্গে কথা বলবে! না হলে মাথায় তুলে আছার মারব?”
ওমা আদরও করছে আবার হুমকি ও দিচ্ছে? গাল ফুলিয়ে নেয় জারা।
___” নিজের বেলা ষোলো আনা, আর আমার বেলা মাথায় তুলে আছার? ”
জারা গাল ফোলানো দেখে আরমান শব্দ করে হাসে। আর আরমানের হাসির দিকে জারা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কী সুন্দর লাগছে লোকটাকে? গেঁজা দাঁত বের হয়ে আছে।আরমান জারা’র হাত ধরে বলে
___’ চলো নদীর পারে হাঁটি। ‘

রাশেদ বেডে শুয়ে আছে, কিন্তু চোখে ঘুম নেই। ঘরের অন্ধকারে সবকিছু নিস্তব্ধ, শুধু মাঝে মাঝে ওর ঘড়ির টিকটিক করে সময় মনে করিয়ে দিচ্ছে। মাথা ভর্তি টেনশন আর চিন্তা। কিছুতেই মন শান্ত হচ্ছে না। ও নিজেই নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না।
ও বারবার মিমের মোবাইল হাতে নিয়ে স্ক্রিন অন করে। চোখে ভেসে ওঠে ওর আর মিমের ছবি—ওয়ালপেপার হিসেবে রাখা। ছবিটা শুধু মুখের হাসি নয়, বরং সেই অদ্ভুত মায়াময় অনুভূতি, সেই মুহূর্তগুলোর প্রতিফলন।
রাশেদের মনে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এই মিম কি সত্যিই সেই মিম, যাকে সে একসময় দূর থেকে ভালোবেসেছিল? যাকে সে কখনো দেখেনি? বুকটা অদ্ভুতভাবে দ্রুত ধক-ধক করে ওর।
ও আবার তাকায় ছবিটাকে, প্রতিটা বৃত্তাকারে চোখ, হাসির কোণ, চুলের লুকানো লাজুক দুষ্টুমি মনে পড়ছে। হঠাৎ মনে হলো, যদি এই মিমই তার মিহু হয় তাহলে ওকে নিশ্চয় প্রথম দেখায় চিনেছে। তাহলে কেনো পরিচয় দেয়নি। নাকি অন্য কিছু। মিম তাকে পছন্দ করে, বলেই ওর ছবি ওয়ালপেপারে দেওয়া। কিন্তু ওর সাথে তো আমার কোনো ভাবে কোনো সংযোগ নেই।
রাশেদের ভেতরে এক অদ্ভুত টান। ও বুঝতে পারছে—মনের এক কোণে মিমকে নিয়ে সন্দেহ গাড়ো হয়ে বসেছে, এখনও ওর ভাবনায় জড়িয়ে আছে। প্রতিবার মোবাইল হাতে ধরলেই মনে হয়, যেন সেই সময়ের অদৃশ্য সম্পর্ক আবার জীবন্ত হয়ে উঠছে।
তবু এই টান, এই অনুভূতি ওর কষ্টেরও এক অংশ। কেননা সে জানে—যে মানুষকে ভালোবেসেছিল, সে হয়তো ওর জীবনে আর পুরোপুরি নেই। কিন্তু ছবি দেখলেই মনে হয়, মিম যেন কাছেই আছে। রাশেদ আরও গভীরে চোখ রাখে—ছবিতে মিমের চোখে যে অদ্ভুত উষ্ণতা, সেইটিই ওর বুকের ভেতর এক রকম ঝড় তোলে।

মনে মনে সে নিজেকে প্রশ্ন করে—“কীভাবে হতে পারে? আমার ভাবনা ভুল।এই মিম, সেই মিম না যাকে সে ভালোবেসেছিলো।”
ঘরের অন্ধকারে, নিস্তব্ধতায়, রাশেদের মন এখন শুধুই মিমের দিকে ঘুরছে। ছবি দেখার সময় প্রতিটা মুহূর্ত যেন পাথরের মতো ওর মনে জমে যাচ্ছে। নিজের অনুভূতিকে থামাতে পারছে না। রোহান লক খোলার চেষ্টা করে। বার বার পাসওয়ার্ড দিচ্ছে সে। কিন্তু বার বার ভুল দেখায়।
রাশেদ গভীর নিঃশ্বাস ফেলে, চোখের কোণে অল্পটা আর্দ্রতা।

রাতের নিঃশ্বাসে চারপাশ নিস্তব্ধ। নদীর ঢেউ আলতো করে ঘাটের পাথরের ওপর ভিজিয়ে যাচ্ছে। বাতাসে ঠান্ডা, আর চাঁদের আলো নদীর জলে ঝলমল করছে। জারাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে আরমান জারার দিকে এগোলো। জারার শাড়িটা একটু পেচানো হয়ে আছে, আরমান অল্প রাগী ভঙ্গিতে বলল,
— “এইভাবে শাড়ি কে পরিয়ে দিয়েছে তোকে বউ?”
জারার গলা কাঁপতে লাগল, চোখে হালকা লজ্জা,
— “জি… জিনিয়া আপু।”
আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবলো, তারপর ধীরে বলল,
— “এইজন্যই শাড়ি ঠিকভাবে পরানো হয়নি। নাদান মানুষের কাজ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। শুধু পেচিয়ে রেখেছে, তাই হাঁটতে সমস্যা হচ্ছে তোর।”
— “ না…না ঠিক আছে, সমস্যা হচ্ছে না আমার।আপনি চলুন।” জারা ভ্রু কুঁচকে বলল, কিন্তু মনে একটা লাজুক চঞ্চলতা।
আরমান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল জারার দিকে বলে
— “ সমস্যা হচ্ছে, না-কি হচ্ছে না সেটা তাে দেখতেই পাচ্ছি আমি।
তারপর দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে
__” আমি শাড়িটা ঠিক করে দেই বউ।”
জারা হঠাৎ আঁতকে উঠল,গলা শুকিয়ে আসে ভয়ে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে
___” দ..দরকার নেই। এই ভাবে ঠিক আছে! ”
আরমান জারা’র সামনে এসে দাঁড়ায়। আর অতি ভদ্রলোকের মতো করে বলে

__” দেখ বউ, আমি একজন ভালো মানুষ। আমি তোর দিকে খারাপ ভাবে তাকাব না। বিশ্বাস রাখ।”
___” আমার কোনো ভালো মানুষের সাহায্য চাই না। কারণ তাদের মনের ভিতর আরও বেশি শয়তানি থাকে। ”
___” বউ তুই আমাকে শয়তান বলছিস? ”
__” হুমম ”
__” আমি কিন্তু ভালো মানুষ! ”
__” তো ”
___” ভাব দেখাস আমার সাথে? আমি ভালো মানুষ এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে?”
__” হ্যাঁ ”
__” তাহলে এখন শয়তান লোক হয়ে তোর শাড়ি ঠিক করে দিব আমি। ”
জারা এবার আরমানকে ধমকে বলে
__” বললাম তো লাগবে না। ”
__” আমার লাগবে। কারণ এটা আমার স্বামী গত অধিকার। ”
বলেই আরমান শান্তভাবে শাড়িটা সামলাতে লাগল। নদীর ঠান্ডা বাতাসে তাদের নীরবতা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল। আরমান শাড়িটা সামলাতে সামলাতে নিজেকে অনেকটা কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করছিল, যেন কোনো অনুভূতি অতিরিক্ত প্রকাশ পায় না।

জারা কাঁপছে, ঠোঁট চাপা দিয়ে হালকা হাসি দিতে চাচ্ছিল, কিন্তু গা ভেতর থেকে এক অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে যাচ্ছিল। আরমান শাড়িটা ঠিক করতে হাঁটু গেড়ে বসল। চোখটা তখন অনায়াসে ওর ফর্সা পেটের দিকে চলে গেল—ফিরে তাকাতে গিয়ে মনে হলো, কতটা কোমল আর ফর্সা মানজারার কোমর আর পেটে চাঁদের আলো খেলে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর, আরমান স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জারার কোমর দিয়ে আলতো করে সমন্বয় করে শাড়িটা ঠিক করল। মুহূর্তে যেন দুজনের হৃদয় এক হয়ে উঠল—চোখে চোখ, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস। জারা হালকা কাঁপতে লাগল, আরমান নিজেকে কষ্ট করে নিয়ন্ত্রণ করছে বার বার, যেন অনুভূতিটা চুপচাপ থেকে যায়।কিন্তু জারা’র কম্পন গুলো আরমান কে মাতাল করে তুলে। আরমান নিজের কন্টোল হারিয়ে জারা’র ফর্সা কোমল পেটে গভীর ভাবে চুম্বন করে।
জারার বুকের ভেতর যেন একটা অচেনা কাঁপুনি তৈরি হয়েছে। ওর হাত কাঁপছে, মনে হচ্ছে পুরো শরীরটা বুঝি হালকা কেঁপে উঠছে।ও চায় দূরে সরে যেতে, কিন্তু পা যেন মাটিতে গেঁথে গেছে। আর আরমান ওর কোমড় খানা শক্ত করে ধরে আছে।

জারা আরমানের চোখে তাকাতে পারছে না, তবু প্রতিবার চেষ্টা করলেই চোখ আটকে যায় সেখানে—ওই দৃষ্টির ভেতর এমন এক গভীরতা, যা থেকে নিজেকে সরানো যায় না।
হঠাৎ একটা মুহূর্তে জারা বুঝতে পারে, ওর ভেতরের সব অনুভূতি যেন একসাথে জেগে উঠেছে—লজ্জা, ভয়, ভালোবাসা, আর অজানা এক সুখের টান। সে উত্তেজনায় আরমানের চুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরে।
ওর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে, হৃদয় ছন্দ হারায়, কিন্তু মুখে লাজুক এক হাসি ফুটে ওঠে। আরমান যে আরও আশকারা পেলো এতে। আরমানের চুম্বন গুলো গভীর থেকে গভীর হতে থাকে। জারা’র ফর্সা কোমল পেটে পাগলের মতো একটার পর একটা চুমু খেয়েই যাচ্ছে।
জারা বোঝতে পারে আরমান এখন নিজের মাঝে নেই। ওকে থামাতে হবে । জারা বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে বলে

___” প্লি…প্লিজ, ছেড়ে দিন ”
আরমানের যেনো কোনো হুসই নেই। সে নিজের পাগলামিতে ব্যস্থ। জারা আরমানের চুলে শক্ত করে টান দিয়ে বলে
___” এ..এমন করবেন না। প্লিজ ছেড়ে দিন আমাকে! ”
আরমান বসা থেকে উঠে দাড়ায়। সে জারার কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকায়। বড় বড় শ্বাস ফেলে জারা’র চোখে চোখ রেখে বলে,
___“ এসব কথা বলাও পাপ বউ। আমি কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছি সোনা… এখন দূরে যেতে পারবো না। প্লিজ বোঝ একটু জান! ”
তার গলায় এমন এক নেশা, এমন এক আবেগ—যা জারার বুকের ভেতর কাঁপন তুলে দেয়।
জারা একটু পেছাতে চায়, কিন্তু পারছে না। মনে হয় তার পা দুটো জমে গেছে।আরমানের নিঃশ্বাস মিশে যায় ওর মুখের কাছে, জারার চোখে ভয়ও আছে, আবার অদ্ভুত এক টানও।

___“প্লিজ, দূরে যান…”
ওর কণ্ঠে কাঁপুনি, চোখে পানি চিকচিক করছে।
আরমান নরম স্বরে বলে,
__“দূরে যেতে বলিস, কিন্তু তোর চোখই তো আমাকে কাছে টেনে আনছে তোর ।”
জারা এবার মুখ ফিরিয়ে নেয়, নিজেকে সামলায়। কান্না রোতো কন্ঠে বলে
___“ভালোবাসা মানে জোর করে কাছে আসা নয়। এটা কে ভালোবাসা বলে না, দেহ লালোশা বলে! ”
তার কথা শুনে আরমান চুপ করে যায়। বাতাসের সঙ্গে মিলিয়ে যায় তাদের নিঃশ্বাস।আরমানের বুকের ভেতর কথাগুলো তীরের মতো বিঁধে যায়। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে জারার দিকে—
সে বুঝতে পারে, জারা তার কাছে আসাকে দেহ লালোশা ভেবেছে। সেই মুহূর্তে নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয় তার।

চুপ করে থাকে। মুখে কোনো কথা নেই, শুধু চোখে হালকা রাগ আর প্রচণ্ড হতাশা জমে আছে। আর বার বার কানে ভাজে ‘ দেহ লালসা ‘।
জারা ওর সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
আরমান পাশে তাকায়, কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পায় না। রাগ আর অপরাধবোধে নিজের চুল শক্ত করে টানতে থাকে। হাত নিসপিস করছে—নিজেকেই আঘাত করার জন্য ।
একটু দূরে গিয়ে পকেট থেকে সিগারেট বের করে। আগুন ধরায়। প্রথম ধোঁয়াটা ছাড়তেই বুকটা ভার হয়ে ওঠে। একটার পর একটা—তিনটা সিগারেট শেষ করে ফেলে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে। তারপর ভারী পায়ে ফিরে আসে জারার সামনে।
চোখ নিচু করে, শান্ত কিন্তু ক্লান্ত কণ্ঠে বলে,

__“সরি… তোমার অনুমতি ছাড়া তোমাকে স্পর্শ করেছি। এমন ভুল আর দ্বিতীয় বার হবে না।”
জারা চুপ। বুকটা মুচড়ে ওঠে তার। একটু আগেও তুই করে বলার জন্য কতো বাহানা করলো?আর এখন তুমি করে বলছে?আরমান কী তবে রেগে গেছে ওর উপর? ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে আরমানের মুখের দিকে, কিন্তু আরমান তাকায় না।
নীরবে বাইকের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় সে।
ঠান্ডা গলায় বলে,
__ “বাইক এ ওঠো। তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেই।”
আরমানের এমন শান্ত কন্ঠে বলা কথা গুলো জারা’র মনকে অশান্ত করে দিচ্ছে। কান্না করে দেয় সে। অপরাধবোধ কাজ করছে এখন। লোকটা তো ওর স্বামী, কাছে আসতেই পারে?আর সে না বোঝে এতো বড় কথা বলে ফেলেছে?
___” আ..আপনি রাগ করেছেন আমার উপর? বিশ্বাস করুন আমি এটা ইচ্ছে করে বলতে চাই নি! ”
আরমান নিরভ। নির্বাক হয়ে বাইকের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

___” কথা বলছেন না কেনো? ও…স্বামীজান? ”
___'” বাইকে এসে বসো। ”
জারা কিছু না বলে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
চোখের জল মুছে বাইকে উঠে বসে।সারা রাস্তা—দুজনের মধ্যে একটাও কথা হয় না।
রাতের বাতাস বইছে, কিন্তু কারও মুখে নেই কোনো সাড়া। মিনিট দশেক পর বাইক থামে জারাদের বাড়ির সামনে।
জারা বাইক থেকে নেমে তাকায় আরমানের দিকে। চায় যেন একবার চোখে চোখ পড়ে—একবার হলেও কিছু বলে যায় সে। কিন্তু আরমান কিছু বলে না, এমনকি তাকায়ও না।
বাইকটা স্টার্ট দেয়, ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।
আর একবারও পিছনে ফিরে তাকায় না।

সকাল আটটা। রোদের আলো তখনও পুরোপুরি তেজ পায়নি। বাড়ির আঙিনায় কুয়াশার মতো হালকা ধোঁয়া জমে আছে। ফিহা আর মিম অনেক সকালে বাড়ি ফিরে এসেছে—আজ তাদের কলেজ আছে, আগামী সপ্তাহেই পরীক্ষা। তাই আজ কোনোভাবেই ছুটি দেওয়া যাবে না।
জারা কলেজের জন্য তৈরি হয়, কিন্তু মনটা তার ভারী। গতরাতের ঘটনার পর থেকে মাথার ভেতর শুধু একটাই মুখ ঘুরছে—আরমান। না চাইতেও ওকে কষ্ট দিয়েছে সে, আর এখন সেই কষ্ট তার নিজের বুকেই গেঁথে আছে। বাড়ির গেট পেরিয়ে ধীরে পায়ে হেঁটে বটগাছের নিচে এসে দাঁড়ায় জারা। বড় মাঠটার দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ, মনে মনে ভাবে—“যদি একবার আরমানের দেখা মিলে?”
কিন্তু ভুল ভেবেছিল সে। মাঠটা আজ ফাঁকা। শুধু বাতাসে উড়ছে কিছু শুকনো পাতা। শুধু লোহা পেটানো আর যন্ত্রপাতির শব্দ ভেসে আসছে।
ঠিক তখনই ফিহা আর মিম আসে। দুজনের মুখেই হালকা চিন্তার ছাপ। মিম চুপচাপ হাঁটছে, মাথা নিচু। ফিহা তার পাশে এসে বলে,

___“এই, এমন মুখ করে আছিস কেন? রাশেদ ভাইয়া তোকে খেয়ে ফেলবে না।”
মিম হালকা শ্বাস ফেলে
__ “তুই বুঝিস না, ওনি যদি জেরা করে? আমি কী বলব?”
ফিহা কাঁধে হাত রেখে হেসে বলে
___ “আরেহ! ও এখন তোকে ভালোবাসে না আর যানেও না তুই সেই মিম, ভয় পাস কেন? যা হবে সামলে নিব। ”
দুজন ধীরে ধীরে এসে জারা’র পাশে থামে। তারপর তিনজন মিলে নদীর ঘাটের দিকে এগোয়। জারা তখনও কিছুটা চুপচাপ। নিজের চিন্তায় হারিয়ে আছে।
মিমের চোখ হঠাৎ থেমে যায়। গাছের ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে আছে রাশেদ। চোখে কালো সানগ্লাস, হাতে মোবাইল। ওকে দেখেই মিমের বুক ধক করে ওঠে। হাঁটতে গিয়ে থেমে যায় একদম।
সে চায় না রাশেদের চোখে পড়তে। দ্রুত পা বাড়াতে চায় ঘাটের দিকে,কিন্তু ঠিক সেই সময় পিছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠে ভেসে আসে—

___“মিম।”
শব্দটা শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায় তার ভেতরে।
পা থেমে যায়। হাত-পা কাঁপছে, কিন্তু পিছন ঘোরে না।
রাশেদ আবার বলে
___ “তোমার কি মোবাইল নেওয়ার ইচ্ছে নেই?”
জারা আর ফিহা একে অন্যের দিকে তাকায়। বোঝা যাচ্ছে, মিম ভয় পেয়েছে। ফিহা নরম কণ্ঠে বলে
___ “যা, ভয় পাস না। ও কিছু করবে না। গিয়ে মোবাইল নিয়ে আয়।”
মিম বড় একটা শ্বাস নেয়, ঠোঁট কামড়ে এগিয়ে যায় ধীরে ধীরে। রাশেদ থেকে কয়েক পা দূরে দাঁড়ায়, মুখ নামিয়ে নিজের কাছে থাকা রাশেদের মোবাইল টা বাড়িয়ে দেয় তার দিকে।
রাশেদ কোনো কথা না বলে নিজের মোবাইল হাতে নেয়। চোখে একটা অনির্বচনীয় ক্লান্তি।
মিম ঠোঁট শুকিয়ে আসে, তবু বলে,

__“আ… আমার মোবাইলটা দিন এখন।”
রাশেদ সরাসরি উত্তর দেয় না।বরং এগিয়ে যায় জারা আর ফিহার দিকে।
“ম্যাম… না, মানে ভাবি,” রাশেদ একটু নার্ভাস।
___“কি বলব বুঝতে পারছি না।”
জারা একটু লজ্জা পায়, মাথা নিচু করে বলে,
___“আপনার যা ইচ্ছে বলুন।”
রাশেদ গভীর শ্বাস ফেলে, মুখে একটুখানি হাসি ফুটে ওঠে।
___“ভাবি, আপনারা কলেজে চলে যান। মিম যাবে না।”
ফিহা ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
__“মানে? আমরা যাব, মিম যাবে না?”
রাশেদ স্থির গলায় বলে
___“ওর সাথে আমার কিছু কথা আছে। খুব ইম্পর্ট্যান্ট।”
জারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। বোঝে না, রাশেদের কথার ভেতরে কী লুকিয়ে আছে।
তবুও কিছু বলে না, হয়তো সময়কে সুযোগ দেয়।
মিম দাঁড়িয়ে আছে দূরে, সে বোঝতে পারছে না রাশেদ হঠাৎ ওদের কাছে কেনো গেলো?আর কি কথা বলছে তাদের সাথে?
রাশেদ ফিরে আসে তার দিকে, ধীরে ধীরে এগিয়ে দাঁড়িয়ে মিমের সামনে ।
জারা আর ফিহা মিমের দিকে শেষবার তাকায়, তারপর ঘাটের দিকে হাঁটা দেয়।
মিম কাঁপা গলায় ডাকে

__ “ এই জারা! ফিহা! আমাকে রেখে কোথায় যাচ্ছিস তোরা?”কিন্তু কেউ ফিরে তাকায় না।
রাশেদ শান্ত কণ্ঠে বলে
___ “ওরা আর দাঁড়াবে না, মিম। এখন তুমি আমার কথার জবাব দাও।”
মিমের বুকের ভেতর কাঁপন। ঠোঁট শুকিয়ে আসে।
___“কি… কিসের জবাব?”
রাশেদ আরও এক পা এগিয়ে আসে, কণ্ঠ নিচু কিন্তু গম্ভীর।
__“এই যে তোমার মোবাইলে আমার ছবি ওয়ালপেপার দেওয়া—এর মানে কী?”
মিম এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। মনে পড়ে যায় গতরাতের কথা—যখন রাশেদ তাকে এই একি প্রশ্ন করছিলো। আর এখনো করছে, কি জবাব দিবে এখন সে? মিম ভাবতেও পারেনি ওর নজরে পড়বে এটা।
রাশেদ ধীরে বলে,
___“তুমি তো অন্য কাউকে ভালোবাসো? ফেসবুকে পোস্ট করেছিলে? তাহলে এখনো আমার ছবিটা কেন রেখে দিয়েছো?”

_____ ফ্ল্যাশব্যাক______
রাত গভীর। ঘরে আলো নিভিয়ে শুয়ে আছে রাশেদ। তবু ঘুম আসছে না। বালিশের পাশে রাখা মিমের মোবাইলটা বারবার হাতে নিচ্ছে, আবার রেখে দিচ্ছে।মাথার ভেতর ঘুরছে একটাই ভাবনা—পাসওয়ার্ডটা কী হতে পারে?
বহু চেষ্টা করেও খুলতে পারছে না ফোনটা।
“মিম কী দিতো?” নিজেকে প্রশ্ন করে।
জন্মদিন, কলেজ কোড, না কি কোনো নাম?
একসময় মনে পড়ে যায়—ও তো তাকে “রাজ বাবু” বলে ডাকত। মৃদু হেসে নিজেই বলে, “এইবার দেখি, এই রাজ বাবু খুলে দিতে পারে কিনা।”
পাসওয়ার্ড টাইপ করে—R A J B A B U
এক মুহূর্তে ফোনটা আনলক হয়ে যায়।
রাশেদের চোখ থেমে যায় স্ক্রিনে।গলার ভেতর কিছু একটা আটকে আসে।
___“তার মানে এটাই আমার মিম?আমার মিউ।”
চোখের কোণে অজান্তে জল গড়িয়ে পড়ে।
সে ধীরে ধীরে ফোন স্ক্রল করতে থাকে।
প্রথমেই যায় মেসেঞ্জারে। ওর নিজের আইডিটাই সবার ওপরে। ব্লক করা অবস্থায় পড়ে আছে।
তারপর থেকে আর কোনো কথাই হয়নি তাদের। না অন্য কারো সাথে মিমের কথা হয়েছে?
রাশেদ স্থির হয়ে থাকে কিছুক্ষণ।ওর আঙুল কাঁপছে। মনে হয় যেন প্রতিটা মেসেজের ভেতরে শোনা যায় মিমের কান্নার শব্দ।
আরও অবাক হয় যখন দেখে—ওর ইনবক্সে অন্য কোনো ছেলের আইডি নেই। শুধু সে ছাড়া।
একটা নিঃশব্দ শান্তি ছুঁয়ে যায় বুকটা, কিন্তু সেইসাথে তীব্র আফসোসও।

__“তুমি সত্যিই শুধু আমাকেই ভালোবাসো… আর আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম।”
মোবাইলটা হাতে নিয়েই সে যায় গ্যালারিতে।
প্রথমেই চোখে পড়ে—ওর নিজের ছবি, স্ক্রিনশট দেওয়া, পাশে লেখা__“আমার রাজ বাবু”
তার নিচে আরও একটা ছবি। যে ছবিটা দেখেই সে মিমকে ভুল বুঝেছিল, যে ছবির জন্য সে ওকে ক harsh কথা বলেছিল, গালি দিয়েছিলো,
আর ও কেঁদে কেঁদে বলেছিল
__“বিশ্বাস করুন , আমি শুধু আপনাকেই ভালোবাসি।অন্য কাউকে না, এই ছবি টা শুধু মজা করে দিয়েছিলাম। ছবির মাঝের মেয়ে টাও আমি না ।”
কিন্তু রাশেদ তখন বিশ্বাস করেনি। বিশ্বাস না করার সেই এক ভুলেই ভেঙে গিয়েছিলো এক ভালোবাসা। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রাশেদ নিঃশব্দে বলে,
__“তুমি জিতেগেছো, মিউ। আমি হেরে গেছি তোমার ভালোবাসার কাছে।”
বাতাসে হালকা সোঁদা গন্ধ। জানালার পর্দা দুলছে। রাশেদ চোখ বন্ধ করে ফোনটা বুকের কাছে টেনে নেয়। তার মনে হয় যেন ওই স্ক্রিনের ওপারে কোথাও মিম হাসছে—ঠিক আগের মতো, নিষ্পাপভাবে, ভালোবাসা নিয়ে।
রাশেদের ঠোঁট নড়ে—

__“আমার সপ্ন ছিলো,একদিন তোমাকে হালালভাবে দেখব, বউ করে সামনে থেকে, নিজের মানুষ হিসেবে।”
এই সপ্নটা আমি পূর্ণ করবো খুব তাড়াতাড়ি। তোমাকে হালাল ভাবে নিজের করে নিব ইনশাআল্লাহ।
______ বর্তমান ________
রাশেদ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখের সামনে মিম। তার হারানো ভালোবাসা। একসময় যে মেয়েটির কণ্ঠ শুনে দিন শুরু হতো, আজ সেই মেয়েকে এতটা দূরে লাগছে, যেন কখনও চেনেনি। হাতে মিমের ফোন, যেটা এখন রাশেদের কাছে কেবল একটা প্রমাণ—ওই মেয়েটা সত্যিই ওর মিম ছিল।
___“মিউ…”
খুব ধীরে ডাকল রাশেদ। গলা কেঁপে উঠল নিজেরই কণ্ঠে।
মিম তাকাল না, শুধু বলল
__“আপনি আমার মোবাইল টা দিন। আমার লেট হয়ে যাচ্ছে ?”
__“ পা..পালানোর চেষ্টা করছো? ”
মিমের ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কি বলবে বোঝতে পারছে না। লোকটার কন্ঠ কেমন অন্য রকম ঠকছে।
__” আ..আজব! পালাব কেন? কলেজে যাবো না আমি?”
রাশেদ হাসলো একটু। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো প্রাণ নেই।
__” সব জানি এখন। তুমি—তুমি সেই মিম, আমার মউ! তাই না?”
মিমের ঠোঁট নড়ল, কিন্তু শব্দ বেরোল না। চোখের কোণে জল চিকচিক করছিল।
__“তুমি কেন বলোনি আগে?” রাশেদের কণ্ঠ ভেঙে গেল।
___ “আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম, অপমান করেছিলাম—”
মিম রাশেদের কথা শুনে বোঝে ফেলে রাশেদ তাকে চিনে ফেলেছে। চোখে জল চলে আসে। তবুওমিম এবার শান্ত গলায় বলল

__“ আমি অপমান পাওয়ার যোগ্য। আমি গালি পাওয়ার যোগ্য, তাই আমাকে আপনি করেছিলেন। নষ্ট মেয়েরা এগুলোরই যোগ্য।”
রাশেদ চোখ নামিয়ে ফেলল। মনে হলো বুকের ভেতর কেউ পাথর বসিয়ে দিয়েছে।
__“যত কিছুই হোক, মিউ,আমি তোমাকে হারাতে চাই না। আমি ভুল করেছি। অনেক বড় ভুল।”
মিম হঠাৎ কান্না থামাতে পারল না। চোখ মুছে বলল
___ “আপনার ওই তীক্ষ কথাগুলো আজও আমার মন থেকে যায়নি। আপনি বলেছিলেন আমি নষ্ট… আমি তখন কেঁদে কেঁদে বলেছিলাম, ছবিটা মিথ্যা। কিন্তু আপনি বিশ্বাস করেননি।”
রাশেদের চোখে জল ভরে উঠল।
___“মিম, আমায় একবার ক্ষমা করো। আমি জানতাম না তুমি এতটা কষ্ট পাবে। আর..আর আমি তোমাকে কখনো দেখি বলেই, ভেবে ছিলাম ওই ছবিতে থাকা মেয়েটা তুমি!”
___” মানুষ যদি জানতো, কথার আঘাত মন কে কতো টা ক্ষত করে তাহলে কখনো বলতো না! ”
__” প্লিজ ক্ষমা করে দাও আমাকে। আর একবার সুযোগ দাও। বিশ্বাস করো, আর কষ্ট দিব না। ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহ করবো না! ”

__“ক্ষমা দিতে পারি, “কিন্তু ভালোবাসতে পারব না আর।”
এই একটিমাত্র বাক্য যেন রাশেদের বুক চিরে ছুরির মতো ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল দু’জনেই। হাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।
মিম ধীরে ধীরে পেছন ফিরল।
__ “আপনার জন্য আমি অনেক কেঁদেছি। কিন্তু এখন আমি শান্তি চাই, মি.রাশেদ। এই শান্তির ভেতর আপনি নেই।”
রাশেদ কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কণ্ঠ আটকে গেল। মিম পা বাড়াল চলে যাওয়ার পথে। প্রতিটি পা যেন রাশেদের হৃদয়ে শব্দ তুলে যাচ্ছিল।
শেষ মুহূর্তে রাশেদ শুধু বলল

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫১

___ “মিউ, আমি তোমাকে এখনো অনেক ভালোবাসি …”
মিম থামল না। একবারও পিছনে তাকাল না।হাতে থাকা ঘড়িতে সময় দেখে চলে যায় ঘাটের দিকে। কলেজের উদ্দেশ্যে।
রাশেদ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, আকাশের দিকে তাকিয়ে। চোখ থেকে জল গড়িয়ে নামছে, কিন্তু সে বুঝতে পারছে—কিছু সম্পর্ক একবার ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগে না।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here