Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৬ (২)

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৬ (২)

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৬ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি

সেদিনের ঘটনাটা ছিল আরও দিন পনেরোর আগের ঘটনা। ইয়াসিফ অজ্ঞান হওয়ার প্রায় সাত ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরে নিজেকে ওই অচেনা ঘরটিতে দেখতে পায়৷ এবং সেদিন রাতে ইয়াসিফ ফ্লোরেন্সের সঙ্গে অসভ্যতা করায় তাকে সত্যিই ফ্লোরেন্স হাত-পা বেঁধে, শরীরে আরও বেশি ড্রাগস দিয়ে স্টোররুমে ফেলে রাখে৷ এতে মাভিশার বেশ খারাপ লাগলেও ফ্লোরেন্সকে মানাতে পারেনি সে কিছুতেই। বাইরে থেকে ফ্লোরেন্স যতটাই নিরীহ আর শান্ত দেখতে, আদতে মেয়েটা প্রচণ্ড কঠিন ধাতুর মতোই।
কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এত ঝুঁকি নিয়ে ইয়াসিফকে ধরে আনা, সে উদ্দেশ্য গোটা পনেরো দিনের মাঝেও পূরণ হয়নি। একজন প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলার ছবি ইয়াসিফকে যখন বারবার দেখানো হয় আর ওকে বলা হয়, গত তিন মাস আগে ওই মানুষটির শেষ গন্তব্য ছিল গাজীপুর শেখ বাড়ি। সেদিন থেকেই মানুষটি নিখোঁজ। ফ্লোরেন্সের ধারণা, এই শেখ পরিবারের বড়ো মাথাগুলোই সেই মহিলাকে গুম করেছে। এমনকি ইয়াসিফও নিশ্চয়ই জড়িত এ ঘটনার সঙ্গে। তারপর ইয়াসিফকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘কোথায় আছে সেই মানুষটি? তাকে কোথায় আটকে রেখেছ তোমরা?’

আশ্চর্যভাবে ইয়াসিফও মহিলাটির ছবি যতবার দেখে, ততবারই এমনভাবে হাসে যে, মহিলাটির গুম হওয়ার পেছনের রহস্য তার অবশ্যই অবগত। কিন্তু সে ভুল করেও মুখ খুলবে না৷ আর নিজের মুখের কথার দাম ওর কাছে অনেক বেশি৷ কোনোভাবেই একটা শব্দ অবধি ওর মুখ থেকে বের করা যায়নি৷ মাভিশাও কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু তার পরিবর্তে অসভ্য, লম্পট পুরুষের মতো ইয়াসিফ মাভিশাকে বারবারই টিজ করে ফ্লোরেন্সকে খেপিয়ে তোলে।
পনেরোটা দিন একটা সুশ্রী মেয়ের শক্ত হাতের প্রহার সহ্য করতে হয় ইয়াসিফকে অবিরত। কখনও বিদ্যুৎ শক, কখনও শক্ত লাঠির মার, আবার কখনও তার থেকেও অসহনীয় ব্লেড খুরের আঘাতও। আরও ভিন্ন ভিন্ন কৌশলের আঘাত। শরীরের সর্বস্থানে সেসব আঘাতের প্রমাণ মেলে ইয়াসিফের। প্রতিটা আঙুল ওর ক্ষতিগ্রস্ত। যার জন্য সে ঠিকমতো বহুদিন খেতেও পারে না।

একটু আবেগী আর কোমল মনের মাভিশা এসব দৃশ্য প্রতিদিন নিতে পারত না৷ কেবল ইয়াসিফ বলেই নয়, অন্য কোনো মানুষ হলেও এমন অত্যাচার সহ্য করা অসম্ভব তার পক্ষে। তবে পনেরোটা দিনের মাথায় মাভিশা শেষমেশ আবেগ কণ্ঠে প্রচণ্ড অনুরোধ করে বলেছিল ইয়াসিফকে, সে যা জানে তা যেন বলে দেয়। ওই মহিলাটি ছাড়া ফ্লোরেন্সের জীবন শূন্য। তাকে না পেলে ফ্লোরেন্স আরও নির্দয় হবে ওর প্রতি। মাভিশার করুণ করা চেহারার আকুতি শুনে ইয়াসিফ ভাবনায় পড়ে। অবশেষে ওর জেদের পাহাড় টলে কিছুটা। কিন্তু শর্ত দেয় সে, ‘আমি সবই বলব। প্রয়োজনে সবরকম সাহায্যও করব তোমাদের। কিন্তু আমাকে মুক্ত রাখতে হবে, ট্রিটমেন্ট দিয়ে সুস্থ করতে হবে খুব দ্রুত, আমার সঙ্গে তোমাদের শত্রু আচরণ করা চলবে না। এক কথায় বন্ধু হতে হবে, আমি যা জানতে চাই আমাকে সব বলতে হবে।’

ইয়াসিফ কী পরিমাণ চতুর অফিসার, তা অজানা নয় মাভিশার। সে ভীষণ চিন্তায় পড়ে যায়। তখন ইয়াসিফ আশ্বাস দেয়, ‘আমি পালাব না। তোমাদের কোনো ক্ষতিও করব না। ডিপার্টমেন্টে আমার মুখের প্রতিশ্রুতি লাখ টাকার চেয়েও মূল্যবান। তোমার মতো বিশ্বাসঘাতকতা করব না। আমাকে বিশ্বাস করো।’
শেষ দুটো কথায় মাভিশা বেশ অপমানিত, লজ্জিত হয়। ইয়াসিফকে সায় দিয়ে ফ্লোরেন্সকে রাজি করাতে ছোটে সে।তারপর দু’টো দিন চলে সেই কাজটি। মাভিশা একটা কথায় বারবার বোঝায় ফ্লোরেন্সকে, ‘এ দেশে আমাদের খুব কাছের কেউ নেই। টাকা দিয়ে আমরা কতজনকে হাত করে কাজে লাগাতে পারব? এক সময় সেই লোকগুলোই যে আমাদের ব্ল্যাকমেইল করবে না, অথবা পুলিশকে সব জানিয়ে দেবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই৷ এ বাড়ির মালিকটাকেও খুব সুবিধার লাগে না। লোকটা খুব পাঁজি ধরনের৷ আমরা একা দুটো মেয়ে আছি তার বাসায়। ইয়াসিফ শেখের উপস্থিতি সে একবার টের পেয়ে গেলে অনেক বড়ো বিপদে পড়ব। বেশি দিন আমাদের এখানে থাকাটাও ঠিক হবে না। ইয়াসিফ আমাদের হেল্প যতটা করবে ততটাই লাভ।’
ফ্লোরেন্স অনিশ্চয়তায়, দুশ্চিন্তায় ভোগে৷ ইয়াসিফ তাদের সহোযোগিতা করবে, এ কথা একেবারেই বিশ্বাস হয় না তার৷ যেখানে এই ছেলের পরিবারকেই সে অপরাধী ভাবছে তার কাছের মানুষটির নিখোঁজ হওয়ার জন্য, সেখানে কীভাবে তাহলে ইয়াসিফকে বিশ্বাসযোগ্য লাগবে?

সাঁঝ বেলা। খোলা বারান্দাতে বসে ধূসর, আবছা কালো আকাশটা দেখে মাভিশা আনমনে। ইয়াসিফ দেখে তাকে, তার পাশে বসেই। আজ ফ্লোরেন্সকে অমান্য করেই মাভিশা ইয়াসিফের অনুরোধে ওকে ঘরের বাইরে এনেছে। গায়ের সকল ক্ষততে ওষুধ লাগিয়ে দেওয়ার কাজটাও করেছে সারা বেলা ধরে।
মাভিশাকে জিজ্ঞেস করে ইয়াসিফ, ‘তুমি আমার প্রতি শুরু থেকেই সদয় আচরণ কেন করছ, মেরিনা?’
প্রশ্নটা সুন্দর লাগলেও নামটা বিরক্তির উদ্রেক করল মাভিশার মনে। ‘আমি মাভিশা তালুকদার। মেরিনা তো আমার ফেইক আইডেন্টিটি ছিল, তাই না?’
অবজ্ঞা সুরে বলে ইয়াসিফ, ‘একবার যখন আমার মুখে মেরিনা উঠে গেছে, ইহজনমে তা আর বদলাবে না। আর এর দায়ভার তোমার, আমার না। এবার আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।’
মাভিশা মনঃক্ষুণ্ণ হয় এ কথায়। জবাব দেয়, ‘তুমি আমার ক্রাশের মতো দেখতে, তাই।’

-‘হ্যাঁ? সে কে?’ হতবুদ্ধি দেখায় ইয়াসিফকে।
-‘অস্ট্রেলিয়ার কুখ্যাত মিস্টিক কিলার জায়িন মাহতাব। আমি যখন দেশে এসে তোমার পরিবারের সবার সম্পর্কে ড্যাটা, ইনফরমেশন কালেক্ট করি তখন সেখানে জায়িন মাহতাবকে দেখি আর তোমাকেও। তবে জায়িন মাহতাবকে দেখেছিলাম প্রথম আমার বাবার ঘরে রাখা একটা নিউজ আর্টিকেল থেকে। তখন আমি সবে আঠারো পেরিয়েছি। কী দেখতে ছিল তোমার আঙ্কল! প্রিন্স চার্মিং বোধ হয় তাকেই বলে। ওরকম একটা মানুষ ক্রিমিনাল হলেও আমি তার প্রেমেই পড়ে যাচ্ছিলাম প্রায়। কিন্তুরযখন পুরো আর্টিকেলটা পড়লাম তখনই আমার মনটা ভেঙে গেল, তার ক্রিমিনাল ওয়াইফ সম্পর্কে জেনে। মানে তোমার চাচির সম্পর্কে। তারপর এখানে এসে তোমাকে সামনাসামনি দেখে আমার ভাঙা মনটা আবারও জোড়া লেগে গেছে।’ বলেই হা হা করে হেসে ওঠে মাভিশা।

ইয়াসিফ তখনই রগড় গলায় বলে, ‘কিন্তু এই প্রথমবার সেটা আমার জন্য দুর্ভাগ্যের৷ তুমি আমার প্রেমে পড়া মানে আমি তোমার বোনের হাতে ডিরেক্ট মার্ডার হওয়া, তাই না!’
মাভিশা মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে আরও হাসে। তা কতক্ষণ গম্ভীর মুখ করে দেখতে দেখতে হঠাই ইয়াসিফ বলে বসে, ‘মেরি, তুমি আমার থেকে দূরেই থাকো। আমিও কোনোভাবে তোমার প্রেমে পড়ে যাই যদি? তাহলে আমার আর বেঁচে থাকা হবে না।’ বলার পরই ঘাড়টা পেছন দিকে হেলিয়ে দিলো তীব্র যন্ত্রণায়৷ সারা শরীরেই ব্যথা৷ বসে থাকতে কতটা কষ্ট হচ্ছে তা পুরোপুরি ওর চেহারাতে ফুটে উঠল না।
মাভিশা হাসতে হাসতে হঠাৎই লক্ষ করল ইয়াসিফকে। জিজ্ঞেস করল, ‘খারাপ লাগছে খুব? আইস ব্যাগটা আনি?’

-‘আনতে পারো। কোমর থেকে ঘাড় অবধি ব্যথায় অসাড় হয়ে আসতে চাইছে। তোমার বোন আমার মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলল কি না আল্লাহ জানেন।’
মাভিশার খারাপ লাগল ওর জন্য, ‘ঘরে যাবে? শোয়ার পর পুরো শরীরেই না হয় আইস ব্যাগটা ধরতাম।’
-‘না না, আমি আজকে এখানে অনেকক্ষণ থাকব৷ কতদিন পর বাইরে এলাম! পনেরো দিন না৷ মনে হচ্ছে পনেরো বছর। ওটা তোমার বোন সত্যিই? না কি বৃটিশ সামরিকের বংশধর?’
মাভিশা মৃদু হাসল, ‘আপন বোন না হলেও বোনই। আমরা একই সাথে বড়ো হয়েছি।’
বলা শেষে আর কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ দিলো না ইয়াসিফকে। ঘরে গেল আইস ব্যাগটা আনতে। ফ্লোরেন্স তখন হাতে একটা পেনড্রাইভ নিয়ে ল্যাপটপের সামনে ভার মুখ করে বসে আছে৷ মাভিশার আগমন টের পেতেই অভিভাবক গলায় বলে উঠল, ‘তোমাকে বলেছিলাম ওর কাছে কম ঘেঁষবে। তুমি আমার সব কথাই অবহেলা করছ, ম্যাভি।’
মাভিশা ফ্লোরেন্সের কাঁধে হাত রাখল, ‘অনেক তো মারপিট করলে। কোনো লাভ হলো কি? এবার না হয় মিশে গিয়ে দেখি কিছু উদ্ধার করা যায় কি না। আমি মনে করছি তোমারও তাই করা উচিত।’
ফ্লোরেন্স হিম চোখে তাকাল ওর দিকে, ‘তাই করতে বলছ?’

-‘হুঁ, করেই দেখো। একই পথে না হেঁটে এবার ভিন্ন পথে হেঁটে দেখি আমরা, কোনো সমাধান পাই কি না।’
-‘ওকে কোথায় রেখে এলে?’
-‘বারান্দাতেই আছে৷ ওর শরীর ব্যথা খুব। আইস ব্যাগটা নিতে এলাম।’
ইয়াসিফের প্রতি মাভিশাকে এত বেশি নরম হতে দেখে ফ্লোরেন্স খুশি না হলেও মনে মনে কী ভেবে হাসল। তা দেখে ভ্রু কুচকালো মাভিশা, ‘হাসছ যে?’
-‘এমনিই। দাও দেখি আইস ব্যাগটা। মিষ্টি আচরণটা আইস ব্যাগ দিয়েই শুরু করি।’
মাভিশা সন্তুষ্ট হলো। হাতের পেনড্রাইভটা ট্রাওজারের পকেটে পুরে ফ্লোরেন্স আইস ব্যাগটা নিয়ে চলে এলো ইয়াসিফের কাছে।

সামনের খোলা জায়গাতে দু’টো খরগোশের দৌড়াদৌড়ি দেখছিল ইয়াসিফ উদাসীন চোখে। ওকে যেখানে রাখা হয়েছে সেটা একটা ছোটো খাটো ফার্ম হাউজ। যদিও বাসার চারপাশে বাউন্ডারি। বাউন্ডারির ওপাশের দক্ষিণ দিকে কোনো গাছপালার বাগান থাকতে পারে৷ এমনিতে বাউন্ডারির সারা দেওয়াল লতাবট আঁকড়ে ধরে ছেয়ে থাকা। ঘরের সামনেই ছোটো একটা বাগান করার মতো জায়গা। কিন্তু সেখানে বাগান না করা হলেও বেশ বড়ো বড়ো ঘাস জন্মে গেছে। এ বাড়ির মালিক এখানে খরগোশের ছানা পুষে বড়ো করে। তারপর তা বিক্রি করে দেয়। খরগোশ দেখাশোনা করার দায়িত্বে একটা ছেলেকে রাখা হয়েছিল। মাভিশা আর ফ্লোরেন্স আসার পর ওরা দুজন সাগ্রহে সে দায়িত্ব নিজেরা নিয়ে নেয়৷ বাড়ির মালিক তাই এ বাহানায় মাঝেমধ্যেই আসে এখানে। নানারকম ছলছুতা তৈরি করে ঘরে এসে বসে বিরক্তিকর গল্প ধরে ওদের সঙ্গে। আর গল্পের ফাঁকে সুযোগ পেলেই মন্দ বাসনা নিয়ে চেয়ে চেয়ে দেখে ওদের।
হঠাৎ করেই ঘাড়ে আইস ব্যাগের শীতল স্পর্শে উদাসী ইয়াসিফ একটু চমকে ওঠে। ফিরে তাকিয়ে ফ্লোরেন্সকে দেখে চমকটা আরও বাড়ে। তা তার চেহারাতেই শুধু প্রকাশ পায় না, কণ্ঠেও প্রকাশ পায়, ‘ওরেব্বাপ তুমি! এবার আইস ব্যাগ দিয়ে পানিসড করতে আসছ না কি?’

ফ্লোরেন্স ঠোঁট চেপে হাসি আটকাতে চাইল। মুখে হাসি বিলীন হয়ে গিয়েছিল ফ্লোরেন্সের গত তিন মাস ধরে। আজ আবার অনেকদিন পর ইয়াসিফের এমন ভয়াতুর অভিব্যক্তিতে পারেনি হাসি আটকাতে।
মাভিশার চেয়ারটাতে বসল সে। আইস ব্যাগটা বারান্দার কার্নিশে রেখে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, ‘যাকে জব্দ করছি রোজ, তাকে সেবা দেওয়ার মতো উদারতা সত্যিই আমার আসে না। কিন্তু আমি অবাক হই তোমাকে দেখে। এত টর্চার করি তোমাকে! তাও তোমার চেহারাতে আমার জন্য রাগ, ঘৃণা টের পাই না। একটা গালি পর্যন্ত ব্যবহার করো না। আর তোমার সহ্য ক্ষমতার প্রশংসা নতুন করে করার কিছু নেই। কিন্তু তোমার ব্যাপারে খোঁজ নেওয়ার সময় আমি মোটেও ভুল তথ্য পাইনি। তুমি নিজেকে প্রচণ্ড ভালোবাসো। আর শত্রুকে ঠিক ততটাই ঘৃণা করো। রেগে গেলে তুমি অসহনীয় মাত্রার স্ল্যাং ব্যবহার করো৷ যেটা তুমি নিজেও স্বীকার করেছিলে। আমাদের দুজনের বেলাতে কেন তার কিছুই দেখি না তোমার মধ্যে? উলটে সুযোগ পেলেই বখাটেদের মতো ফ্লার্ট করো। দয়া করো আমরা মেয়ে বলে?’
সেসব কথা ইয়াসিফ নীরবে শুনে গেল শুধু। ফ্লোরেন্স ওর চোখের দিকে তাকিয়ে তখন৷ তাকে জিজ্ঞেস করল সে, ‘কী আশা করো তাহলে? আমাকে মারার জন্য আমার মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা?’
-‘সেরকম কিছুই তো শুনেছিলাম তোমাকে নিয়ে।’
কথাটা শেষ হতেই ভাবনাতীত ইয়াসিফ সে সময়ই ওর ডান হাতের উলটো পাশ দিয়ে ফ্লোরেন্সের গালে সজোরে থাপ্পড় মেরে বসে৷ চেয়ার থেকে ছিটকে পড়তে তখন এক মুহূর্ত সময় লাগল না ফ্লোরেন্সের৷

এমন সন্ধ্যার সময় রুফটপে যাওয়া একেবারেই বারণ ছিল দীধিতির৷ কিন্তু জাকির শেখের আবদারে মুখের ওপর না বলাটা সম্ভব হলো না ওর। ভেবেছিল ট্যারেসের ভেতর বসবে দীধিতি তাকে নিয়ে৷ কিন্তু ট্যারেসের উলটো দিকে ছাদের একদম কোনে গিয়ে দাড়ালেন তিনি। দীধিতি কফির মগটা নিয়ে তার পাশে দাড়াতেই বললেন, ‘তুমি তো জাইমার এজেন্ট হয়ে এসেছ, তাই না?’
-‘কী?’ দীধিতি আশা করেনি এমন প্রশ্ন।
জাকির শেখ নির্বিকার। ‘ওকে বলেছিলাম ভালো থাকতে চাইলে আর কখনও এ দেশে না আসতে। রেজার সঙ্গে ওরও যে মৃত্যু হয়নি, এটা ওর সৌভাগ্য ছিল। তাই বেঁচে যেহেতু গেছেই, জীবনটা নিয়ে একাকী ভালো থাকার সুযোগটাও গ্রহণ করা উচিত ছিল। কিন্তু স্বামীপ্রাণ স্ত্রী হয়ে সে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও স্বামীর হত্যার প্রতিশোধ নিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে। ছলেবলে তোমাকেও গুটি হিসেবে চালছে৷ তোমরা এত বোকা কেন? নিজেদের জীবনের পরোয়া কি তোমাদের নেই?’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৬ 

দীধিতি অপ্রত্যাশিত বিষবাক্যগুলো শোনার পর নিস্তব্ধ হয়ে রইল। অনুমান করেছিল সে, জাকির শেখ বিশেষ কোনো কথায় হয়ত বলবেন ওকে। কিন্তু কল্পনা করেনি সে কথাগুলোর বিষয়বস্তু এত কঠিন হতে পারে। ওকে নিশ্চুপ দেখে জাকির শেখ বলে গেলেন, ‘জাইমার মতো টেরোরিস্টকে ধরতে দেশের উচ্চ পদস্থ গোয়েন্দা, পুলিশ আলাদা আলাদাভাবে কর্মরত আছে৷ খুব বেশিদিন লাগবে না ধরে ফেলতে। তাই তোমাকে সাবধান করতে এসেছি। যদি নিজের ভালো চাও তাহলে আমার ছেলেকে ভালো রাখার চেষ্টা করবে। ভুলে যাবে জাইমাকে, রেজাকে। ওসব প্রতিশোধ সিনেমা গল্পে মানায়৷ বাস্তবে সিনেমার মতো তা করা পানির মতো সহজ না। যে যা কর্ম করেছে এবং করবে, সে তার কর্মের সাজাও একদিন ভোগ করেছে আর ভবিষ্যতেও করবে৷ এটাই চিরকালের নিয়ম। জাইমার সঙ্গে ভুল করেও যোগাযোগের চেষ্টা করবে না। আমি তোমাকে এত অনায়াসে আমার ছেলের পাশে মেনে নিচ্ছি শুধু ওর ভালো থাকার জন্য। ও ভালো না থাকলে আমি তোমাকেসহ তোমার সঙ্গে জড়িত সবাইকে তার ফল ভোগ করাব।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here