আবির ভাই পর্ব ২৩
উর্মিলা মজুমদার
দুপুরবেলাটা আজ কেমন যেন ঝিমধরা। জানালার বাইরে রোদের তেজ বাড়ছে বৈ কমছে না। অরু ড্রয়িং রুমের সোফায় পা তুলে আয়েশ করে বসে আছে। তার হাতে একটা বড় বাটি ভর্তি পপকর্ন। সে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে একেকটা পপকর্ন মুখে দিচ্ছে আর খচমচ শব্দে চিবুচ্ছে। মানুষের জীবনে বড় কোনো লক্ষ্য না থাকলে এই দুপুরবেলা পপকর্ন চিবানোর চেয়ে আনন্দদায়ক কাজ আর কিছু হতে পারে না।
ঠিক তখনই আবির ভাইকে দেখা গেল। পিঠে প্রকাণ্ড এক ব্যাগপ্যাক। বড় বড় কদমে তিনি দরজার দিকে এগোচ্ছেন। আবির ভাই মানুষটা চিরকালই একটু উগ্র স্বভাবের। অরুর হঠাৎ মনে পড়ল সকালের সেই ছেলেটার কথা। সকাল থেকে মনের মধ্যে একটা ‘বিচার’ জমা করে রেখেছে সে। সুযোগ যখন সামনে, তখন ছাড়লে চলে না।
অরু ডাকল, “আবির ভাই?”
আবির ভাই না থেমেই ছোট করে বললেন, “বলে ফেল।”
”আজ সকালে আপনার সাথে যে ছেলেটা দেখা করতে এসেছিল, সে কে?” অরুর গলায় সামান্য তাচ্ছিল্য।
আবির ভাই এবার থামলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, “তুর্য। মেজো আব্বুর বন্ধুর ছেলে। আমরা এক স্কুলে, এক কলেজে পড়েছি। কেন, তাকে নিয়ে তোর এত কৌতূহল কেন?”
অরু মুখটা একটু বাঁকিয়ে বলল, “নাহ, মানে ছেলেটা খুব ফাজিল। বেশি কথা বলে। কেমন যেন উগ্র ভাব।”
আবির ভাই শান্ত গলায় বললেন, “ও আচ্ছা। তুর্য আসলে ডিবির (DB) পুলিশ চিফ। অপরাধীদের সাথে থাকতে থাকতে ওর স্বভাবটা একটু ওরকমই হয়ে গেছে। সামান্য উগ্র।”
বলেই আবির ভাই বেরিয়ে গেলেন। অরুর মুখে তখন একলাফে একদলা পপকর্ন। ‘পুলিশ চিফ’ শব্দটা কানে আসামাত্র তার চিবানো বন্ধ হয়ে গেল। মনে হলো একটা আস্ত পপকর্ন গলার নালিতে গিয়ে চিরস্থায়ী আসন গেড়েছে। অরুর বুকটা ধক করে উঠল। সর্বনাশ! যার সাথে সকালবেলা এত তর্ক করল, ঝাড়ি দিল, সে কি না পুলিশের বড় কর্তা? আজ ভাগ্যিস সে বেঁচে গেছে, নয়তো কেউ থাকলে নির্ঘাত বলতেন ‘অরু, পুলিশ আর বাঘের মধ্যে পার্থক্য হলো বাঘ যখন খায় তখন মানুষ টের পায়, কিন্তু পুলিশ যখন খায় তখন মানুষ বুঝতেও পারে না কী হারিয়েছে।’ অরু মনে মনে নিজেকে বলল, “অরু, তুই যে আজ গারদে যাসনি, এটাই তোর পুনর্জন্ম।”
আবির বেরিয়ে যেতেই সদর দরজা থেকে প্রেমা আপু তীক্ষ্ণ গলায় ডাক দিলেন, “আবির, যাচ্ছো কোথায়?”
আবির ভাই দরজার বাইরে থেকেই চটজলদি উত্তর দিল, “ক্লাবে যাচ্ছি।”
বলেই সে হাওয়া। ছেলেটার হাঁটাচলার মধ্যে সবসময় একটা অস্থিরতা থাকে। আজ শুক্রবার, সম্ভবত বাস্কেটবল প্রাকটিসের ভূত তার মাথায় চড়েছে। প্রেমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরুর পাশে এসে বসল। প্রেমার দিকে তাকালে মায়া লাগে। মেয়েটা দিনকে দিন শুকিয়ে শুঁটকি হয়ে যাচ্ছে। যেন রোদে দেওয়া আমসত্ত্ব।
ঠিক সেই মুহূর্তে মেঘ ছাদ থেকে ঝড়ের বেগে নেমে এল। এসেই কোনো ভণিতা না করে প্রেমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ল। তার স্বভাবটাই এমন বাঁদর টাইপ। অরুর হাত থেকে পপকনের প্যাকেটটা কেড়ে নিয়ে সে আয়েশ করে চিবোতে শুরু করল। চিবুনোর শব্দ হচ্ছে কটমট, কটমট।
হঠাৎ মেঘ প্রেমার গাল টেনে ধরে বলল, “কী ব্যাপার প্রেমা আপু? তুমি দিনকে দিন এভাবে শুকিয়ে যাচ্ছ কেন? শরীর কি বাতাসে উড়ে যাওয়ার প্ল্যান করছে?”
প্রেমা একটু অপ্রস্তুত হলো। তার ফর্সা গালে হালকা লালিমা দেখা দিল। সে মৃদু হেসে বলল, “আরে না, পড়াশোনার একটু চাপ যাচ্ছে। এই তো মাত্র এক্সাম শেষ হলো। বেশ কয়েকটা রাত জাগতে হয়েছে তো, তাই হয়তো এমন দেখাচ্ছে।”
মেঘ পপকন চিবানো বন্ধ না করেই চোখ টিপে বলল, “হুম, বুঝেছি। পড়াশোনার চাপ নাকি অন্য কিছুর চাপ—সেটা আমরা খুব ভালোই বুঝি।”
প্রেমা কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু মেঘ ছাড়ার পাত্র নয়। সে হঠাৎ সোজা হয়ে বসে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলল, “শোনো প্রেমা আপু, আজ তো চমৎকার একটা শুক্রবার। চলো না, কোথাও থেকে ঘুরে আসি। বাড়িতে বসে থাকলে আত্মা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে।”
প্রেমা আপু অনেকক্ষন চুপ করে থেকে কী যেন ভাবলেন। তারপর হঠাৎ ঘাড় ফিরিয়ে অরুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “হুম, এটা করা যায়। দর্শক হিসেবে আবির ভাইয়ের খেলা দেখব। এতে অন্তত অলস বিকেলটা মাটি হবে না। তাহলে এটাই ফাইনাল, আমরা বিকেলে ক্লাবেই যাচ্ছি।”
সবাই এক বাক্যে সায় দিল। মেঘ তো খুশি হয়ে এক পাক নেচে নিল। প্রেমা আপু কিছুক্ষণ পর আলসেমি ভাঙতে ভাঙতে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। রয়ে গেল ড্রয়িং রুমের সেই দুই মহাবাঁদর—অরু আর মেঘ। টিভিতে তখন কোনো এক চ্যানেলে বন্যপ্রাণী নিয়ে তথ্যচিত্র দেখাচ্ছে। একটা ধূর্ত শিয়াল হরিণ শিকারের অপেক্ষায় ওত পেতে আছে।
অরু হঠাৎ টিভির দিক থেকে চোখ সরিয়ে মেঘের দিকে তাকাল। গলায় রহস্য ঢেলে বলল, “জানিস মেঘ, আজ সকালে এক এলাহি কাণ্ড ঘটেছে!”
মেঘ তখন টিভির শিয়ালের বুদ্ধিতে মুগ্ধ। সে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “কী কাণ্ড? তুই কি পপকর্ন খেতে খেতে বাটিসহ চিবিয়ে ফেলেছিস?”
”ধুর, ফাজলামি করিস না তো! সকালে আমি যখন বাগানে ফুল গাছে পাইপ দিয়ে পানি দিচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ একটা ছেলে উদয় হলো। আমার অসাবধানতায় হোক আর কপালগুণে হোক পাইপের সবটুকু পানি গিয়ে পড়ল তার গায়ে। ছেলেটা একদম কাকভেজা হয়ে গেল।”
মেঘ এবার একটু আগ্রহ পেল। “বলিস কী! তারপর? সে কি তোকে মারতে এসেছিল?”
অরু ঝাড়ি দিয়ে বলল, “মারতে আসবে কেন? তবে ছেলেটা ঝগড়া করতে পারে ওস্তাদ লেভেলের। আমাকে সোজাসুজি ‘বাঁদর’ বলে দিল। বলল, আমার নাকি কোনো ম্যানারস নেই, আমি নাকি অসভ্য! আমিও কি ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী? তেরিয়া হয়ে উচিত জবাব দিয়ে দিয়েছি।”
মেঘ হাই তুলে বলল, “তাহলে তো হিসেব চুকেবুকেই গেল। সে তোকে গালি দিল, তুই তাকে ঝাড়ি দিলি। কাটাকাটি। সমস্যা কোথায়?”
অরু এবার গলা নামিয়ে আনল। একদম ফিসফিস করে বলল, “সমস্যা তো অন্য জায়গায় রে গাধা। ছেলেটা আসলে আবির ভাইয়ের বন্ধু আর পেশায় সে একজন পুলিশ অফিসার! ভাবতে পারিস? আমি একজন দুঁদে পুলিশ অফিসারের গায়ে পানি ছিটিয়ে তার সাথে ঝগড়া করেছি! সে যদি এখন ডিবি পুলিশ দিয়ে আমাকে তুলে নিয়ে যায়?”
কথাটা শোনামাত্র মেঘ তার কোল থেকে মাথা সরিয়ে সোফায় সোজা হয়ে বসল। তার মুখের রেখাগুলো হঠাৎ কঠিন হয়ে গেল।
“কী বললি? আবির ভাইয়ের সাথে দেখা করতে আজ পুলিশ অফিসার এসেছিল? শিওর তো?”
”আরে হ্যাঁ! আবির ভাই নিজের মুখেই বলল তুর্য নামের ওই ছেলেটা পুলিশের চিফ।”
মেঘের মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তার মাথায় তখন অন্য চিন্তা খেলা করছে। গত রাতে কিছু বখাটে ছেলে মেঘকে বেশ কিছুক্ষণ বিরক্ত করেছিল। আবির ভাই কি তবে কোনোভাবে সেটা জেনে গেছেন? তিনি কি পুলিশ ডাকিয়ে ওই বখাটেদের শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করছেন? কিন্তু আবির ভাই জানলেন কী করে? মাঝে মাঝে প্রকৃতি নিজের প্রয়োজনে কিছু মানুষকে সব জানিয়ে দেয়। মেঘের মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। চিন্তাগুলো জট পাকিয়ে যাচ্ছে। তবে কি ওই পুলিশ অফিসারের আসাটা মেঘের গতরাতের ঘটনার সাথেই জড়িত?
বিকেল তিনটে বাজে। রোদের তেজ কিছুটা ম্লান হয়ে এলেও আকাশটা বড় বেশি তামাটে হয়ে আছে। মেঘ, অরু আর প্রেমা আপু সেজেগুজে তৈরি। গন্তব্য—সেই বাস্কেটবল ক্লাব। প্রায় আধ ঘণ্টার ঝক্কি পেরিয়ে যখন তারা পৌঁছাল, মেঘের ভেতরটা তখন কেমন জানি দুরুদুরু করছে। এই যে একটা অজানা অস্বস্তি, এটাকে বোধহয় বলে ‘নার্ভাসনেস’। সে আগে কখনো এমন জায়গায় আসেনি। চারদিকের হইচই আর ভিড় দেখে সে অরুর হাতটা খপ করে চেপে ধরল। যেন অরুর হাতটা কোনো লাইফ-বোট, আর সে অকূল সাগরের যাত্রী।
তারা গিয়ে দাঁড়াল ভিআইপি জোনে। সেখান থেকে নিচের মাঠটা পরিষ্কার দেখা যায়। নিচে আবির বল নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পরনে একটা জার্সি আর হাফ প্যান্ট। জার্সিটা ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। ওর এলোমেলো চুলগুলো অবাধ্যভাবে কপালের ওপর আছড়ে পড়ছে বারবার। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। মেঘ অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। মানুষটা যে আসলে এতোটা সুদর্শন, সেটা আগে কখনো এভাবে খেয়াল করা হয়নি। ঘামভেজা একটা মানুষকেও যে এতোটা সুন্দর লাগতে পারে, এটা মেঘের কাছে এক বিস্ময়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেঘের মনে পড়ে গেল গতরাতের কথা।
কী অদ্ভুত এক রাত ছিল সেটা! আকাশ থেকে বৃষ্টি নেমেছিল। সেই বৃষ্টিতে মেঘ আর আবির দুজন একদম কাকভেজা হয়ে গিয়েছিল। সেই স্মৃতির রেশ ধরে মেঘের ঠোঁটের কোণে আপনমনেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। স্মৃতির ডালপালা মেলে সে কোথায় যে হারিয়ে যায়!
ঠিক তখনই অরুর তীক্ষ্ণ খোঁচা।
“কীরে, তুই হাসছিস কেন? তোর কি মস্তিস্কের কোনো স্ক্রু ঢিলে হয়ে গেল নাকি?”
মেঘ চমকে উঠল। যেন এক নিমেষে আকাশ থেকে মাটিতে আছড়ে পড়ল সে। অপ্রস্তুতভাবে হাসিকে সামলে নিয়ে বলল, “নাহ, কিছু না। এমনি।”
অরু সন্দেহী চোখে তাকাল। অন্য কেউ হলে হয়তো এই অবস্থায় বলত, “হাসি হচ্ছে মনের জানালা দিয়ে উঁকি দেওয়া এক টুকরো আলো।”
কিন্তু মেঘ তা বলল না, সে লজ্জায় মুখটা নিচু করে ফেলল। মাঠজুড়ে তখন উন্মাদনা। আবির ভাই বল নিয়ে এগোচ্ছে। তার দৌড়ানোর ভঙ্গিটা অনেকটা চিতাবাঘের মতো। গ্যালারি থেকে একঝাঁক মেয়ে সমস্বরে চিৎকার করছে, “আবির! আবির!”
মেঘের ভ্রু কুঁচকে এল। মেয়েগুলোর কী হয়েছে? মুখের খই এমনভাবে ফুটছে যেন আবির ভাই গোল দিলেই দুনিয়াটা উদ্ধার হয়ে যাবে। মেঘ কি কিছুটা ঈর্ষান্বিত? মানুষের মনের জটিল রসায়ন বোঝা বড় দায়। ঈর্ষার নীল বিষ হয়তো তার রক্তে সামান্য হলেও মিশেছে। অরু কনুই দিয়ে একটা গুতো দিল।
“কিরে, হাত গুটিয়ে বসে আছিস কেন? হাততালি দে। চিয়ার আপ কর আবির ভাইকে!”
মেঘ অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা দুলাল। ঠিক তখনই আবির সবাইকে কাটিয়ে, অদ্ভুত এক কায়দায় বাস্কেটটা করে ফেলল। চারদিকে কানফাটানো চিৎকার আর শিস। মেঘও সেই চিৎকারে যোগ দিল, তবে তার চোখদুটো তখন বাস্কেটের দিকে নেই। তার অবাধ্য দৃষ্টি বারবার আবিরের ঘামে ভেজা, পেশিবহুল শরীরের দিকে চলে যাচ্ছে। জিম করা টানটান শরীর। সে নিজের মনকে বোঝাতে চাইল। সে ইচ্ছে করে দেখছে না, কিন্তু চোখদুটো বড়ই বেইমান। কিছু দৃশ্য মনে হয় জোর করে গেঁথে যায়।
খেলা শেষ হলো। ছেলেদের ড্রেসিং রুম মানেই নিষিদ্ধ এলাকা। সেখানে মেয়েদের প্রবেশাধিকার নেই। দূর থেকে আবির ভাইয়ের সাথে একবার চোখাচোখি হলো। আবির ভাই ইশারায় কিছু একটা বলল, কিন্তু মেঘ চট করে মাথা নিচু করে ফেলল। বুকটা কেন জানি দুরুদুরু করছে। মেঘের মতো ডানপিটে মেয়ের মাঝেও কোত্থেকে একরাশ লজ্জা এসে ভিড় জমালো, সে নিজেও জানে না। প্রকৃতি মাঝে মাঝে মানুষকে বড় অদ্ভুত সব অনুভূতির মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
মাগরিবের নামাজের পর সবাই গাড়িতে চড়ে বসল। মেঘ জানালার ধারে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো দ্রুত পেছনে ছুটে যাচ্ছে। ঠিক যেন মানুষের জীবন। এক একটা স্মৃতি আসে আর হু হু করে পেরিয়ে যায়।
হঠাৎ অরু বলে উঠল, “আচ্ছা, কাল তো আবির ভাইয়ের বার্থডে। আমরা কী প্ল্যান করব বল তো?”
মেঘের ধ্যান ভাঙল। সে প্রায় আঁতকে উঠে বলল, “কাল আবির ভাইয়ের বার্থডে?”
অরু অবাক হয়ে তাকাল, “হ্যাঁ, তা নয়তো কী? সেই কবে থেকে জল্পনা-কল্পনা চলছে। তুই ঢাকায় আসার আগে থেকেই। বড় আব্বু তো কাল বিশাল পার্টির আয়োজন করেছেন। যদিও আবির ভাই এসব মানা করেছিলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা!”
মেঘ বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল। কাল জন্মদিন! অথচ সে কিছুই জানে না। তার মনের মধ্যে ছোটখাটো একটা তোলপাড় শুরু হয়ে গেল।
রাত বাড়ছে। আকাশের মন ভার। মেঘগুলো আজ বড্ড অস্থির। মনে হচ্ছে প্রকৃতির কোথাও কোনো এক তুলকালাম কান্ড ঘটিয়েছে। তাই অঝোরে কান্না নামবে যেকোনো সময়। বাইরে বৃষ্টির টুপুর-টাপুর শব্দ শুরু হয়ে গেছে।
মেঘের চোখে ঘুম নেই। সে পড়ার টেবিলে বসে আছে। তার সামনে একটা ছোট্ট চিরকুট। কাল আবির ভাইয়ের জন্মদিন। মানুষটাকে একটা সারপ্রাইজ দেওয়া দরকার। কিন্তু সাহস? সেটা তো মেঘের কোনোকালেই তেমন ছিল না। তবে ইদানীং আবির ভাই মানুষটা কেন যেন তাকে অদ্ভুত এক অবাধ্য সাহস জুগিয়ে চলেছেন।
সে চিরকুটে অতি সংক্ষেপে লিখল, ❝শুভ জন্মদিন, আবির ভাই। ❞
ব্যাস, এইটুকুই। বড় কোনো মহাকাব্য লেখার সময় এখনো আসেনি। আপাতত এই এক লাইনের চিরকুটেই থাকুক। মেঘ রুম থেকে বিড়ালের মতো নিঃশব্দে বের হয়ে এল। নিচে ড্রয়িং রুমে উঁকি দিয়ে দেখল আবির ভাই গভীর মনোযোগে ল্যাপটপে কাজ করছেন। মানুষটা যখন কাজ করে, তখন তার চারপাশে পৃথিবী উল্টে গেলেও বোধহয় সে টের পায় না।
এটাই সুযোগ।
মেঘ ঝড়ের বেগে আবির ভাইয়ের রুমে ঢুকল। বালিশের এক পাশে চিরকুটটা আর একটা ছোট ডেইরি মিল্ক চকলেট রেখে দ্রুত বেরিয়ে এল। কিন্তু দরজায় বেরোতেই যমদূত সাদিফ ভাইয়ের সামনে পড়া! ধাক্কা খেয়েছে বেচারার সাথে। সাদিফ ভাই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন।
”কীরে মেঘ? এই অসময়ে চোরের মতো কোথায় থেকে ছুটতে ছুটতে আসছিস?”
মেঘ কপালে হাত দিয়ে ঘষতে ঘষতে আমতা আমতা করে বলল, “উহ, সাদিফ ভাই আপনি? না মানে, আমি ওই ছাদ থেকে আসছিলাম।”
সাদিফ ভাই হা হয়ে গেলেন। “কী বললি? বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে আর তুই এই রাতে ছাদে গিয়েছিলি?”
মেঘ তৎক্ষণাৎ নিজের জিহবায় একটা কামড় দিল। ইস, মিথ্যেটা বড্ড কাঁচা হয়ে গেল! সে এক দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে প্রাণ বাঁচাল।
রুমে এসে মেঘের বুকটা ধড়ফড় করছে। তবে মনের কোণে একটা প্রশান্তি। কালকের পরিকল্পনাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একের পর এক শাড়ি ধরছে। কাল নীল রঙের কোনো শাড়ি পরবে নাকি বাসন্তী রঙের থ্রি-পিস? আবির ভাইয়ের চোখের দিকে তাকালে সব পরিকল্পনা অবশ্য ওলটপালট হয়ে যায়।
আবির ভাই পর্ব ২২
রাত গভীর। মেঘ ভাবছে, কাল যখন আবির ভাই বালিশের পাশের ওই ছোট্ট চিরকুটটা খুঁজে পাবেন, তখন তার ঠোঁটের কোণে কি সামান্য একটু হাসির রেখা ফুটে উঠবে? সেই হাসি দেখার জন্য মেঘ একটা পুরো জীবন অপেক্ষা করতে পারে।
