Home আবির ভাই আবির ভাই পর্ব ২৫

আবির ভাই পর্ব ২৫

আবির ভাই পর্ব ২৫
উর্মিলা মজুমদার

পর্দা সরে যাওয়ার দরুন বিকেলের মরা রোদ হাসপাতালের জানলা দিয়ে আসছে। ঠিক সেই সময়েই মেঘ চোখ মেলল। জ্ঞান ফেরার দৃশ্যটা অলৌকিক। এই সে নেই, আবার এই সে আছে। মেঘের জ্ঞান ফেরার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের স্তব্ধতা ভেঙে হুলুস্থুল কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। বড় আম্মু আর খালামনিরা মিলে কান্নাকাটির একটা ছোটখাটো নদী বইয়ে দিলেন। ​খবর পেয়ে গ্রাম থেকে ছোট আব্বু আর আম্মু রওনা দিয়েছেন।
তাদের আসার সংবাদে বাড়িতে উত্তেজনা। মেঘ সুস্থ হয়েছে, তবে তার মুখে কোনো কথা নেই। সে পাথরের মূর্তির মতো সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। ডাক্তার কড়া ভাষায় বলে দিয়েছেন, কোনো প্রশ্ন করে তাকে বিরক্ত করা যাবে না। অরু মেঘের হাতটা শক্ত করে ধরে বসে আছে। অরুর চোখের কোণে পানি শুকিয়ে দাগ পড়ে গেছে, কিন্তু সে হাত ছাড়ছে না। যেন হাত ছাড়লেই মেঘ আবার অন্য কোনো জগতে হারিয়ে যাবে।
​রাত আটটার দিকে ডাক্তার মেঘকে রিলিজ দিলেন। বাড়িতে আজ উৎসব হওয়ার কথা ছিল। আবির ভাইয়ের জন্মদিন। দামী দামী আলোকসজ্জা আর রান্নাবান্নার আয়োজন সব পণ্ড। উৎসবের বাড়ি মুহূর্তেই শোকের বাড়িতে রূপ নিয়েছে। তবে এই শোকের ভেতর এক ধরণের প্রশান্তিও আছে মেঘ ফিরে এসেছে।
​বাড়িতে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই ছোট আব্বু এসে হাজির। মেঘকে দেখা মাত্রই তিনি তাকে জড়িয়ে ধরলেন।

এই মানুষটা সহজ-সরল, আবেগের আতিশয্য তার নেই। কিন্তু আজ তার চোখের জল মেঘের কাঁধ ভিজিয়ে দিচ্ছে। মেঘের চোখ দিয়েও টপটপ করে জল পড়ছে। অনেক দিন পর বাবার গায়ের সেই চিরচেনা তামাক আর রোদে পোড়া ঘাম মেশানো গন্ধটা সে পেল। মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বোধহয় তার বাবার বুক।
​ছোট আম্মু মেঘের পাশে বসে চামচ দিয়ে সুপ খাইয়ে দিচ্ছেন। বড়ই যত্ন করে তৈরি করা সুপ। তিনি খাওয়াতে খাওয়াতে হঠাৎ গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা মেঘ, তুই আজ অফিসে কেন গিয়েছিলি রে?”
​সবার মনেই এই প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে। মেঘের অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে অফিসের রাস্তায়। মেঘ তো ওই অফিসে কোনোদিন যায় না, যাওয়ার কথাও নয়। আবির ভাইয়ের নামটা কেউ মুখে আনছে না ঠিকই। মেঘ কথা বলল না। সে তার চিরাচরিত নির্লিপ্ততায় ডুবে রইল। ​খান বাড়িতে ছোট আব্বু আর আম্মু এসেছেন অনেক বছর পর। বাড়ির কাজের লোক আর আত্মিয়স্বজনরা তাদের আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। চায়ের কাপের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে জম্পেশ। সবাই মনে মনে পরম করুণাময়কে ধন্যবাদ দিচ্ছে— মেয়েটা অল্পের ওপর দিয়ে বেঁচে গেছে।

​মেঘকে ঔষধ খাওয়ানো হয়েছে।
রাত একটা। চারপাশ নিঝুম। জগতের অধিকাংশ মানুষ এখন ঘুমের রাজ্যে। মহাপুরুষদের মতে, রাতের এই শেষ প্রহরটা নাকি রহস্যময়। আবির ভাই বাড়িতে ফিরলেন। তিনি একজন ইনভেস্টর, জটিল সব বিনিয়োগ আর সংখ্যার হিসেব নিয়ে তার দিন কাটে। অফিসের কাজে রাত বিরেতে ফেরাটা তার কাছে ডালভাত, তাই বাড়ির লোকজনের মধ্যে কোনো উদ্বেগ নেই। তারা যে যার মতোন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
​আবির ভাইয়ের পরনের রক্তমাখা শার্টটা ঠিক কোথায় ছিল, তা এক রহস্য। শার্টটা কি কোনো গাড়ির সিটে পড়ে আছে? নাকি কোনো নির্জন রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে ঝুলে আছে? কে জানে! তার গায়ে এখন একটা মিশমিশে কালো শার্ট। বুকের দিকের কয়েকটা বোতাম খোলা, ইন করা প্যান্টের ভাঁজ অবিন্যস্ত হয়ে উপরে উঠে এসেছে। তাকে দেখে মাতাল মনে হচ্ছে না, তবে তার মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছে। যেন কোনো অতৃপ্তি তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

​তিনি নিজের শোবার ঘরে গেলেন না। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে সোজা মেঘের ঘরের দিকে হাঁটতে লাগলেন। মেঘের ঘরের দরজাটা ভেজানো ছিল। তিনি ভেতরে ঢুকলেন। ঘরটা একদম অন্ধকার নয়। বারান্দার দরজা খোলা থাকায় বাইরের ম্লান আলো এসে লুকোচুরি খেলছে ঘরের মেঝেতে।
​মেঘ অঘোরে ঘুমোচ্ছে। তার কপালে সাদা একটা ব্যান্ডেজ, বাম দিকে কালচে রক্তের দাগ। আবির ভাই কোনো শব্দ না করে বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ঘুমন্ত মেঘের দিকে। বিষণ্ণতা তার চোখেমুখে।
​অবচেতন মনেই তার হাতটা চলে গেল মেঘের চিবুকের কাছে।আঙুলের ডগায় হয়তো একটু আদর লেগে ছিল। মানুষের স্পর্শ নাকি বড় অদ্ভুত জিনিস, মাঝে মাঝে তা কথা বলার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়। আবির ভাই আপনমনে একটু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক বুক হাহাকার। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “আমার সাথে অন্য কাউকে দেখে হিংসা হয়, মেঘ?”

​মেঘ উত্তর দিল না। কিন্তু এই নৈঃশব্দের মধ্যেও কম্পন অনুভূত হলো। মনে হলো সে বলছে, “হুম।”
​আবির ভাই আবার প্রশ্ন করলেন, “কেন হিংসা করিস? ভালোবাসিস আমাকে?”
​এবার চারপাশটা গোরস্থানের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মেঘ আর কোনো কথা বলল না। আবির ভাই ঝুঁকে এলেন মেঘের কানের কাছে। পৃথিবীর সব গোপন কথা বোধহয় এভাবে ফিসফিস করেই বলতে হয়। তিনি বললেন, “মায়া যত সুন্দর, যন্ত্রণা তত গভীর হয়, মেঘ।”
​মেঘের ঠোঁট জোড়া নড়ে উঠল না, তবে হাওয়ায় ভেসে আসা একটা প্রতিধ্বনি যেন বলে গেল, “হয়তো।”
আবির ভাই দীর্ঘক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন। মেঘের ঘুমন্ত মুখটা কেমন ম্লান দেখাচ্ছে। আবির ভাই আপনমনেই কথা বলতে শুরু করলেন।​তিনি বললেন, “আমি আবির, তোকে একদম কষ্ট দিতে চাইনি মেঘ। বিশ্বাস কর। কী, বিশ্বাস করলি না?”

​মেঘের ঠোঁট নড়ল না, কিন্তু মেঘের হয়ে উত্তর দিল, “উহুম, বিশ্বাস করলাম না।”
​আবির ভাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর ধীরে ধীরে নিজের বাম হাতটা মেঘের চোখের সামনে তুলে ধরলেন। যেন মেঘ ঘুমিয়ে থাকলেও এই দৃশ্যটা তার অবচেতনে গেঁথে যাবে। তার হাতের কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত সাদা ব্যান্ডেজ পেঁচানো। ব্যান্ডেজের ভাঁজে ভাঁজে টাটকা রক্তের লাল আভা। আবির ভাই দাঁতে দাঁত চিপে ব’লে উঠলেন, “তোর অস্তিত্ব আমাকে যে তীব্র নেশায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে, পৃথিবীর কোনো জিনিস আমাকে সেই নেশা ধরাতে পারেনি। কোনোদিন পারবেও না”
​আবির ভাই কিছুক্ষণ থামলেন। ঘড়িটা টিকটিক শব্দ করছে। সময় বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এই মূহূর্তটা যেন দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আবার বললেন, “এখনও বিশ্বাস করলি না তো? আমার কারণে তোর কপালে রক্ত ঝরেছে, এই অপরাধবোধ নিয়ে আমি আবির কীভাবে নিজেকে ক্ষমা করি বল তো? তাই আমার রক্তও ঝরেছে। অনেক রক্ত ঝরেছে, বিশ্বাস কর। তবে একটুও ব্যথা লাগেনি। তোকে কষ্ট দিয়ে যে ব্যথার পাহাড় আমি বুকে বয়ে বেড়াচ্ছি, তার কাছে এই সামান্য ক্ষত তো নস্যি।”

​কথাটা বলেই আবির ভাই হাত দিয়ে চোখ মুছলেন। এই শক্তিশালী পুরুষটি সম্ভবত কাঁদছেন। যে হাতের কবজি তিনি নিজেই মদের বোতল ভেঙে থেঁতলে দিয়েছেন, যেখানে তেরোটা সেলাই লেগেছে, সেই হাতের যন্ত্রণার চেয়েও তার মনের ভেতরের ক্ষতটা ঢের বেশি গভীর।
​হঠাৎ আবির ভাইয়ের নজর গেল জানালার পাশের সোফাটার দিকে। সেখানে একটা চেনা বোতল পড়ে আছে।
ওটা তো ওনারই পারফিউম! যেটা মেঘ আর অরু মিলে ওনার রুম থেকে একদিন চুরি করে এনেছিল। মেঘের এই ছোটখাটো চপলতা দেখে আবির ভাইয়ের মুখে এক চিলতে বিষাদমাখা হাসি ফুটে উঠল। মানুষের মন বড় বিচিত্র; যার ওপর অভিমান করে থাকা যায় না, তার স্মৃতিগুলোই সবচেয়ে বেশি দংশন করে।
​আবির ভাই উঠে দাঁড়ালেন। শরীরের টালমাটাল ভাবটা এখন আর নেই। সংকল্প স্পষ্ট। রুম থেকে বের হওয়ার আগে মেঘের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো ফিসফিস করে বললেন, “কাল থেকে আমার মুখ আর দেখতে পাবি না মেঘ। কথা দিলাম।”

​বলেই তিনি আর পেছন ফিরে তাকালেন না। মেঘের ঘরের দরজাটা আগের মতোই ভেজানো অবস্থায় রেখে।
আবির ভাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। রাত এখন অনেক, চারপাশটা গা ছমছমে নিস্তব্ধ। তিনি খান বাংলোর বাগানের এক কোণে নির্জন বেঞ্চিতে গিয়ে বসলেন। পকেট থেকে সিগারেট বের করে একের পর এক টানতে লাগলেন। তবুও মনের ভেতরের অস্থিরতাটা মিটছে না। বড় অদ্ভুত এই মানবজীবন। মানুষ যখন সবচেয়ে বেশি একা হয়, তখনই সে তার স্মৃতির সিন্দুকটা খুলে বসে।
​আবির ভাই পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলেন। ভেতরে যত্ন করে রাখা মেঘের সেই ছোট্ট চিরকুট ‘শুভ জন্মদিন, আবির ভাই’। ছোটবেলার একটা ছবিও আছে। ছবিটার দিকে তাকিয়ে আবির ভাইয়ের ঠোঁটে একটা ফিকে হাসি ফুটে উঠল। মানুষের স্মৃতি কি সময়ের সাথে সাথে বিবর্ণ হয়? বোধহয় না। তিনি গুনগুন করে গাইতে লাগলেন—

​”জিসপে রাখে তুমনে কাদাম
আব সে মেরা ভি রাসতা হে
জে সে মেরা তুমসে কইয়ি
পিছলে জানাম কা বাসতা হ্যা
আধুরে আধুরে…”
​গানের সুরটা বাতাসের সাথে মেঘের ঘরের বারান্দার দিকে বয়ে গেল। হঠাৎ এক সশব্দে খসখস আওয়াজ। আবির ভাই চট করে পেছনে ফিরলেন। দেখলেন মেঘের ঘরের বারান্দার পর্দাটা দুলছে। কেউ কি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল?
কে থাকবে? মেঘ তো অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ​আবির ভাই একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার বাম হাতটা এখন পুরোপুরি অবশ হয়ে এসেছে। ব্যথায় টনটন করছে পুরো শরীর। বাড়িতে জানাজানি হওয়া মানেই একটা তুলকালাম কাণ্ড। হঠাৎ বাঁ দিকে তাকাতেই দেখলেন প্রেমা দাঁড়িয়ে আছে। আবির ভাই ভ্রু কুঁচকালেন। চট করে রক্তাক্ত হাতটা আড়ালে লুকানোর একটা বৃথা চেষ্টা করলেন।

​”প্রেমা? তুমি এই গভীর রাতে এখানে কী করছ? ঘুমাওনি?”
​প্রেমা চোখের চশমাটা নাকের ডগায় ঠিকঠাক করে বসিয়ে বলল, “নাহ। তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে?”
​আবির ভাই নির্লিপ্ত গলায় বললেন, “বাহিরে ছিলাম। রাত হয়েছে, তুমি এখন ঘরে যাও।”
​প্রেমা যেন কথা শোনার পাত্রী নয়। সে বলল, “শোনো, গতকাল তোমার জন্মদিন ছিল। ভেবেছিলাম পার্টিতে সবার সামনে তোমাকে উপহারটা দেব, কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। তাই এখন সাথে নিয়ে এসেছি। এই নাও তোমার গিফট।”
​আবির ভাই কিছুটা ভড়কে গেলেন। পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আগেই তিনি হাত বাড়িয়ে উপহারটা নিতে চাইলেন। আর ঠিক তখনি ঘটে গেল বিপর্যয়। ব্যান্ডেজ মোড়ানো রক্তাক্ত হাতটা প্রেমের চোখের সামনে ধরা পড়ে গেল। প্রেমা চিৎকার করে উঠল, “আবির! তোমার হাতে একি? কী হয়েছে তোমার?”
​আবির ভাই কড়া গলায় বললেন, “আওয়াজ করো না একদম। সবাই ঘুমাচ্ছে। সামান্য চোট লেগেছে, এমন কিছু না। তুমি এখন ভেতরে যাও আর মনে রেখো, বাড়ির কেউ যেন আমার হাতের এই অবস্থার কথা না জানে।”

​এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে আবির ভাই দ্রুত পার্কিং লটের দিকে হাঁটা দিলেন। প্রেমা পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে দিয়ে আবির ভাইয়ের গাড়িটা গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। এত রাতে লোকটা কোথায় যাচ্ছে? মহাপুরুষরা কি তবে এভাবেই রাতের আঁধারে নিরুদ্দেশ হয়ে যান? প্রেমা জানে না, হয়তো জানার প্রয়োজনও নেই। রাত তার রহস্য নিজের কাছেই গোপন রাখতে ভালোবাসে।

পরদিন আকাশটা কেমন যেন গোমরামুখো হয়ে রইল। দুপুরের পর থেকেই মেঘেরা দল বেঁধে আকাশে দোলনা পেতে বসেছে। মেঘের মাথার ব্যান্ডেজটা এখনো খোলা হয়নি। সাদা কাপড়ের এই পট্টিটা মাথার চারপাশে। সারাক্ষণ রুমের চার দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হচ্ছিল, সে নিজেও বুঝি ওই আসবাবপত্রগুলোর মতো স্ট্যাচু হয়ে যাচ্ছে।
​শেষমেশ অরুর কাঁধে ভর দিয়ে সে ছাদে এল। আজ রোদ নেই, এটাই বড় বাঁচোয়া। চারদিকে ঠান্ডা বাতাস বইছে। মাঝে মাঝে মেঘের ডাক শোনা যাচ্ছে। এই অবস্থায় টুপটাপ কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি পড়লে দৃশ্যটা বেশ ‘ময়ূরাক্ষী’ নদীর তীরের মতো হতো।
​অরু পাশে দাঁড়িয়ে আয়েশ করে চুইগাম চিবাচ্ছে। সে হঠাৎ মেঘের দিকে তাকিয়ে ডাকল, ‘মেঘ?’
​মেঘ কোনো উত্তর দিল না, শুধু হালকা করে মাথা দোলাল। তার ভেতর এখন কোনো শব্দ নেই। জীবনের হিসেবগুলো হুট করে ওলটপালট হয়ে গেলে মানুষের কথা বলার শক্তি কমে যায়। অথচ গতকাল এই সময়েও সে কতটা চনমনে ছিল! আজ সেই চনমনে ভাবটার ওপর কে যেন এক বালতি বিষণ্ণতার কালি ঢেলে দিয়েছে।
​অরু চুইগামের বেলুন ফুলিয়ে সেটা ফুস করে ফাটিয়ে দিয়ে বলল, ‘কাল আবির ভাইয়ের অফিসে কেন গিয়েছিলি রে?’

​মেঘ নিজের ভেতর গুটিয়ে গেল। গলা দিয়ে অস্ফুট শব্দ বের করল, ‘এমনি।’
​অরু বাঁকা হেসে বলল, ‘আমি জানি কেন গিয়েছিলি।’
​মেঘের ভুরু কুঁচকে গেল। সে যতটা সম্ভব গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল, ‘কেন?’
​‘আবির ভাইকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলি, তাই না?’
​মেঘের বুকের ভেতরটা হুট করে একটা লাফ দিল। অরুর মতো একটা কাণ্ডজ্ঞানহীন মেয়ে এই গোপন খবরটা জানল কীভাবে? সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে একটু জোর দিয়ে বলল, ‘আরে না! কী সব আজেবাজে বকছিস। এমন কিছুই নয়।’
অরু হাসল। অসুস্থ মেঘকে আর বেশি ঘাঁটাতে চাইল না সে। আকাশ আরও অন্ধকার হয়ে আসায় মেঘ দুলকি চালে নিচে নেমে এল। ড্রয়িং ​রুমে অন্যরকম দৃশ্য। মেঘের আম্মু, যাকে সবাই ‘ছোট্ট আম্মু’ বলে ডাকে। তিনি আজ নিজ হাতে মেয়েকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছেন। বাবা পাশে বসে চশমার ওপর দিয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে কড়া কড়া শাসন করছেন। মেঘ সেই শাসনের শব্দগুলোকে কানে নিচ্ছে, কিন্তু মন তার সেখানে নেই। মানুষের শরীর এক জায়গায় থাকলেও মন যে অন্য কোথাও পরিভ্রমণ করতে পারে, এটা মেঘ আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
​সারাদিন কাটল অস্থিরতায়। মেঘ কখনো নিজের রুমে গিয়ে জানলার পর্দা সরাচ্ছে, কখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে পার্কিং লটের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকছে। কখনো আবার বারণ সত্ত্বেও ছাদে চলে যাচ্ছে। বাড়ির লোক অতিষ্ঠ হয়ে বলছে, ‘আহা মেঘ, একটু তো স্থির হ! শরীরটা তো ভালো না।’ কিন্তু মেঘের মনে হচ্ছে, শরীরের চেয়েও মনের অসুখটা যখন বেশি হয়, তখন স্থির থাকাটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।
​রাতের খাবার টেবিলে সবাই হাজির হলো।

একটা চেয়ার খালি। সেই চিরচেনা উন্মাদ আবির ভাই নেই। মেঘের গলার কাছে খাবার আটকে যেতে চাইল। তার মনটা অকারণে উশখুশ করছে। তার কেবলই মনে হচ্ছে, আবির ভাই কেন একবারও এল না? সে কি জানে না মেঘের মাথার ব্যান্ডেজটার কথা? মানুষের অবহেলা সহ্য করা যায়, কিন্তু উপেক্ষা সহ্য করা বড় কঠিন। মেঘ নিজের ঠোঁট কামড়ে রাগ সামলানোর চেষ্টা করল।
​রাত তখন বারোটা। চারদিক নিঝুম। মেঘ গুটি গুটি পায়ে অরুর রুমে গিয়ে হানা দিল। অরু অঘোরে ঘুমাচ্ছে, একটা বড় পুতুল জড়িয়ে ধরে। মেঘ তাকে ধাক্কা দিয়ে জাগাতেই অরু চোখ পিটপিট করে চাইল।
​মেঘ ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, ‘অরু, আবির ভাই কোথায় রে?’
​অরু ঘুমের ঘোরেই বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরল। বিড়বিড় করে বলল, ‘কেন, আবির ভাইকে কি খুব মিস করছিস?’

​মেঘের রাগটা এবার চড়চড়িয়ে মাথায় উঠে গেল। সে গম্ভীর গলায় বলল, ‘ফালতু কথা একদম বলবি না। আমার তার ওপর বড্ড রাগ হচ্ছে। সারাদিন একবারও খবর নিল না!’
​অরু এবার শোয়া ছেড়ে উঠে বসল। তার চোখের ঘুম চট করে চলে গেছে। সে স্থির দৃষ্টিতে মেঘের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, ‘আবির ভাই আর এই বাড়িতে আসবে না মেঘ। তিনি চলে গেছেন।’
​মেঘের বুকের ভেতরটা হুট করে খালি হয়ে গেল। পৃথিবীর সব শব্দ যেন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে কাঁপা গলায় শুধাল, ‘কোথায় চলে গেছেন?’

আবির ভাই পর্ব ২৪

​অরু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘উনি বাইরে আলাদা ফ্ল্যাট নিয়েছেন। ওখানেই থাকবেন এখন থেকে।’
​মেঘ আর একটা কথা বলারও শক্তি পেল না। তার পায়ের তলার মাটি যেন একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। সে অরুর ঘর থেকে তড়িৎ গতিতে বেরিয়ে এল।

আবির ভাই পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here