Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১
রুপা

– “এই মেয়ে, তোমাকে এত অপমান করার পরেও আমার সামনে আসতে লজ্জা করে না?”
স্বামীর কর্কশ কথার কোনো জবাব দিল না পুষ্প; মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার এই নিশ্চুপ থাকা দেখে আর্য তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল—
– “অবশ্য কাকে কী বলছি! তোমার তো লজ্জা-শরম বলতে কিছু নেই। তোমাদের মতো মেয়েদের কোনো কথাই তো গায়ে লাগে না।”

পুষ্পকে তবুও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আর্যর রাগ যেন সপ্তমে চড়ল। সে পুষ্পকে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে সামনে থেকে সরিয়ে দিল। ধাক্কার তীব্রতায় পুষ্প ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল। পাশে থাকা টেবিলের কোণায় কপালে সজোরে আঘাত লাগল তার, মুহূর্তেই চামড়া ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল।
এদিকে আর্যর সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে নেশার ঘোরে টলতে টলতে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ল এবং মুহূর্তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। পুষ্প মুখ চেপে ধরে নিজের কান্না আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সে চায় না তার কান্নার শব্দ ঘরের বাইরে যাক। পুষ্পর কাছে এসব এখন রোজকার ঘটনা। বিয়ের এই তিন মাসে, বাসর রাত থেকেই আর্য তাকে অপমান আর অবহেলা করে আসছে।
আব্রাহাম আর্য সরকার, বয়স ২৮। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সে মাঝেমধ্যেই রাতে নেশায় বুঁদ হয়ে বাড়িতে ফেরে। বিয়ের পর থেকে সে পুষ্পকে দুচোখে সহ্য করতে পারে না। পুরো নাম শুভ্রতা নূর পুষ্প বয়স ১৬। কিছুক্ষণ নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে উঠে দাঁড়াল। কপালের রক্ত জমাট বেঁধে কালচে হয়ে গেছে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সে পরম মমতায় আর্যকে টেনে বিছানায় ঠিক করে শুইয়ে দিল। পায়ের জুতো জোড়া খুলে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে, নিজে একটা বালিশ নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ল।

আরো একটি নতুন ভোরের সূচনা হলো। আজানের সুমধুর ধ্বনি কানে আসতেই পুষ্পর ঘুম ভেঙে গেল। সে উঠে মেঝে থেকে বালিশটা তুলে বিছানায় পরিপাটি করে রাখল, তারপর ধীরপায়ে ওয়াশরুমে গেল। বেসিনের আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে কেন জানি তার খুব কান্না পাচ্ছে। পুষ্প আলতো হাতে কপালে কেটে যাওয়া জায়গাটা পানি দিয়ে ধুয়ে নিল। এরপর অজু করে বেরিয়ে এসে জায়নামাজ বিছিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করল। নামাজ শেষে মোনাজাত করে সে পরম মমতায় আর্যর মাথায় ফু দিল। মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া করল, আর্য যেন সব সময় ভালো থাকে, সুস্থ থাকে। তারপর একবুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
ভোরের আলো জানলার ফাঁক দিয়ে রুমে উঁকি দিচ্ছে। সকালের কড়া রোদ চোখে পড়তেই আর্যর কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। সে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। নেশার ঘোরে থাকায় মাথাটা প্রচণ্ড যন্ত্রণা করছে। সে বিড়বিড় করে উঠল— “এক কাপ কফি পেলে ভালো হতো।” তোয়ালে নিয়ে সে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
আর্য গোসলে যেতেই পুষ্প রুমে ঢুকে কফির কাপটা সেন্টার টেবিলের ওপর রাখল এবং আর্যর প্রয়োজনীয় কাপড়গুলো বিছানায় গুছিয়ে রেখে দ্রুত বেরিয়ে গেল। গোসল সেরে বের হয়ে নিজের জিনিসপত্র ছোঁয়া দেখে আর্যর মেজাজ আবার বিগড়ে গেল। সে চিৎকার করে উঠল—

– “এই মেয়ে, এক্ষুনি রুমে এসো!”
আর্যর গর্জন শুনে পুষ্প তড়িঘড়ি করে রুমে এল। সে ঢোকা মাত্রই আর্য তার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে বলল—
– “তোমাকে কতবার বলেছি আমার জিনিসে হাত দেবে না? কেন হাত দিয়েছ?”
আর্য এত জোরে চেপে ধরেছে যে পুষ্পর মনে হচ্ছে তার হাড়গুলো গুঁড়িয়ে যাবে। যন্ত্রণায় পুষ্পর চোখ টলমল করে উঠল। তার জলভরা চোখের দিকে তাকিয়ে আর্য এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিল। পুষ্প নিজেকে সামলে নিয়ে মিনমিন করে বলল—
– “ফুফুমণি বলেছিলেন আপনার প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে রাখতে…”
– “তোমাকে শেষবারের মতো সতর্ক করছি, এরপর যদি আমার জিনিসে হাত দাও, তবে তোমার হাত ভেঙে দেব। যাও এখান থেকে! ভুলেও আমার চোখের সামনে আসবে না, নাহলে তোমাকে মেরেই ফেলব।”
আর্যর কথা শুনে পুষ্প চলে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলল—
– “ছোটবেলা থেকে এত মার খাওয়ার পরেও যখন বেঁচে আছি, তখন আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনার মারার পরেও আমাকে আস্ত রাখবেন, সরকার সাহেব!”

পুষ্প নিচে নেমে সোজা রান্নাঘরে চলে গেল। সেখানে আগে থেকেই কাজের লোকেরা ব্যস্ত ছিল, সে-ও তাদের সাথে হাত লাগাতে লাগল। সরকার বাড়ির দুই ভাই এক বোন! বড় ছেলে আমজাদ সরকার ও শেহনাজ সরকার। তাঁদের একমাত্র সন্তান আব্রাহাম আর্য সরকার। মেজ ছেলে আহমেদ সরকার ও জেনিফার সরকার। তাঁদের এক ছেলে আহনাফ এবং এক মেয়ে সিমরান। ছোট বোনের কথা গল্পের প্রবাহে আস্তে আস্তে জানা যাবে।
রান্নাঘরে কাজ করার সময় শেহনাজ সরকার সেখানে এলেন। পুষ্পকে দেখে তিনি মমতাভরা কণ্ঠে বললেন—
– “পুষ্প, খেতে আয় তো মা।”
ফুফুর কথায় পুষ্প মাথা নিচু করে মিনমিন করে বলল—

– “ফুফুমণি, উনি খেয়ে আগে চলে যান, তারপর না হয় আমি খাব। আমাকে দেখলে উনি আবার রেগে যাবেন।”
শেহনাজ সরকার কিছু বলতে গিয়েও পুষ্পর মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
– “এই পুষ্প! তোর কপাল এভাবে কাটল কী করে?”
ফুফুর প্রশ্নে পুষ্পর দৃষ্টি এদিক-ওদিক হতে লাগল। সে চায় না তার কারণে মা আর ছেলের মধ্যে কোনো অশান্তি হোক। তাই আমতা আমতা করে বলল—
– “সে ফুফুমণি… গোসল করতে গিয়ে সাবানের ফেনায় পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম। দেওয়ালে লেগে একটু কেটে গেছে।”
শেহনাজ সরকার পুষ্পর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। কথাটার সত্যতা নিয়ে তাঁর মনে সংশয় থাকলেও তিনি আর বাড়াবাড়ি করলেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
– “সাবধানে দেখে-শুনে চলবি তো মা।”
– “পরের বার থেকে খেয়াল রাখব ফুফুমণি।”
– “দেওয়ালে বাড়ি খেয়ে মাথা কেটেছিস, সেখানে কিছু লাগাসনি কেন? ব্যান্ডেজ তো করবি অন্তত!”
– “বেশি ব্যথা হচ্ছে না ফুফুমণি, ঠিক হয়ে যাবে।”
– “চুপ কর একদম! আয় আমার সাথে।”

সবাই নাস্তার টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছে। এমন সময় মাথা চেপে ধরে নিচে নামল আর্য। নিজের জন্য বরাদ্দ রাখা চেয়ারটায় সে গুমসো মুখে গিয়ে বসল। কাজের লোক খাবার এগিয়ে দিলেও সে কারও দিকে তাকাল না। চুপচাপ খাওয়া শেষ করে কারো সাথে কোনো কথা না বলেই আবার উপরে চলে গেল।
ছেলের এই খামখেয়ালি আর উদাসীনতা দেখে শেহনাজ সরকার বিরক্ত হলেন। আমজাদ সরকার পেছন থেকে ডাক দিয়ে বললেন—
– “আর্য, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে অফিসে আসো। সবাই মিটিংয়ের জন্য তোমার অপেক্ষা করছে।”
আর্য বাবার কথা শুনল ঠিকই, কিন্তু কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। এদিকে পুষ্প সবার অলক্ষ্যে রান্নাঘরের মেঝেতে বসে খাবার খেয়ে নিল। খাওয়া শেষে কাজের লোকদের সাথে হাত লাগিয়ে টেবিলের এঁটো বাসনগুলো পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখল। কিছুক্ষণ পর আর্য রেডি হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।

অফিসে একটা মিটিং শেষ করেই আর্য তড়িঘড়ি বাড়িতে চলে এল। তার মাথাটা আজ যেন ফেটে যাচ্ছে। গতরাতে যে পরিমাণ নেশা করেছিল, তাতে মাথা ধরাটাই স্বাভাবিক—না ধরলে বরং সেটাই অস্বাভাবিক হতো।
গাড়িটা পার্কিং এরিয়ায় রেখে কোটটা হাতে ঝুলিয়ে সে ধীরপায়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। শরীর আর মন দুটোই আজ খুব ক্লান্ত। কিন্তু বাড়িতে ঢোকার আগেই হঠাৎ আর্যর পা থেমে গেল…

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here