রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৫
সোহানা ইসলাম
আকাশে সূর্যটা ঝুলে আছে ক্লান্ত মুখে। বাতাসে ধুলার ঘূর্ণি, পাড়ার গলিতে কিছু বাচ্চা খেলছে, অথচ ফিহার বাড়িটা নিস্তব্ধ।
ভেতর থেকে শুধু ঝগড়ার আওয়াজ—
__“তুই কি জানিস না আমি কত ঋণে ডুবে আছি? চেয়ারম্যান সাহেব টাকা দিয়েছে অকেন দিন , এখন তোকে ওর ছেলের সাথে বিয়ে দিতে হবে!”
ফিহার বাবা গর্জন করছে।তার চোখ রক্তবর্ণ, শরীর কাঁপছে রাগে আর লজ্জায়।
দুই দিন আগেই সে জুয়ায় হেরে ফিহার মোবাইলটা বিক্রি করে ফেলেছিল। শুধু তাই নয়, চেয়ারম্যানের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছিল সুদে। কিন্তু জুয়ায় হেরে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন চেয়ারম্যান টাকা ফেরত না পেয়ে চাপ দিচ্ছে— “না হয় মেয়ে দে, না হয় জেলে যা ।”
ফিহা বসে আছে মেঝেতে, চোখ দুটো লাল কান্নায় ভেজা। ফিহার মায়ের কণ্ঠ কাঁপছে,
— “এভাবে মেয়েকে বেচে দিচ্ছো তুমি? এভাবে ঋণ শোধ হয়?”
বাবা হুংকার ছাড়ে,
— “চুপ কর! আমি যা ঠিক করেছি তাই হবে। মেয়ের বিয়ে হবে চেয়ারম্যানের ছেলের সাথে। এতে বাড়ির সম্মান বাঁচবে।”
ফিহার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।
— “বাবা, আমি ওকে বিয়ে করব না!ওই চেয়ারম্যান এর ছেলের চরিত্র ভালো না। ”
ফিহার বাবা এক চড় মেরে ফিহাকে ফেলে দেয় মাটিতে।মায়ের মুখে চিৎকার উঠে—
— “মানিক! ওকে মারছো কেনো?”
ফিহার বাবা আর শোনে না। তার মাথা যেন আগুনে জ্বলছে। ফিহার কাঁধ ধরে টেনে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।
— “যতক্ষণ পর্যন্ত বিয়ে না হয়, এই ঘরেই থাকবে। দরজা কেউ খুলবে না!”
ঘরটা অন্ধকার। জানালার ফাঁক দিয়ে সামান্য আলো ঢুকছে। ফিহা দরজায় কাঁদতে কাঁদতে বলে—
— “মা! আমাকে বের হতে দাও, আমি পালিয়ে যাব এই নরক থেকে। ”
মা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে চোখ মুছে।
— “তোর বাবা জানলে তোরে মেরে ফেলবে মা। চুপ থাক।”
মায়ের চোখে ভয়, মুখে অসহায়তা। ছোট বোন নীলা এক কোণে বসে কান্না করছে।
— “আপু, তুমি বিয়ে কইরো না।”
ফিহা বোনটাকে জড়িয়ে ধরে, বলে—
— “না রে, আমি বিয়ে করব না। আমি মরে গেলোও বিয়ে করব না ।”
কিন্তু ভয় তো কাজ করছিল। ভয়— নিজের বাবার প্রতি, সমাজের প্রতি, ভাগ্যের প্রতি। আজ তার এই দুঃসময়ে তার প্রিয় মানুষ টা তার পাশে নেই। ঠিক তখনই বাইরে কড়কড় শব্দ— কেউ দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। ফিহার বাবার গলা শোনা যায়—
— “এই, তৈরি হয়ে থাকিস! কাল বিকেলে চেয়ারম্যানের লোক আসবে। বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।”
ফিহা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। তার কণ্ঠে রাগ, অসহায়তা আর প্রতিবাদ একসাথে।
— “আমি বিয়ে করব না! মরে যাব, তাও না!”
বাইরে ঝড় উঠছে, আকাশে মেঘ জমছে।
মায়ের কণ্ঠ ভেঙে আসছে,
— “হায় আল্লাহ, আমি কি পাপ করেছিলাম?”
ঠিক তখনই বাড়ির বাইরে থেকে একটা কণ্ঠ শোনা যায়,
— “মানিক ভাই! এইসব কি শুনছি?”
এটা মিমের বাবা। তিনি পাশের বাড়ি থাকেন, ফিহাদের বাড়ির দীর্ঘদিনের শুভাকাঙ্ক্ষী। ফিহার বাবার গলা রুক্ষ,
— “তুমি তোমার কাজ করো ভাই, আমার মেয়ের বিয়ে আমি ঠিক করব।”
মিমের বাবা চিৎকার করে বলেন,
— “বিয়ে না, এটা মেয়েকে বিক্রি করা বলে! তোমার লজ্জা করে না? চেয়ারম্যানের ছেলে কেমন মানুষ তা জানো?”
ফিহার বাবা চোখ লাল করে বলেন,
— “তুমি আমার ব্যাপারে মাথা ঘামাবে না! ঋণ আমি এই ভাবেই শোধ করব, আর যদি এতো দরত লাগে পারলে তুই দে টাকা!”
মিমের বাবা ধৈর্য হারান।
— “টাকা নয় মানিক, তোমার বিবেকটা বিক্রি করো না!”
এই কথা শুনে ফিহার বাবা আরও ক্ষেপে যান।
তার হাতে থাকা লাঠি তুলে ফিহার ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে যান। ফিহার মা ছুটে এসে সামনে দাঁড়ায়,
— “না! আর মারো না মেয়ে টাকে , মানিক!”
তবুও তিনি ফিহার দিকে এগোন, তখনই মিমপর বাবা এগিয়ে এসে হাত ধরে ফেলেন। দু’জনের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়।
ফিহার মা চিৎকার করে ওঠে,
— “মানুষ হয়েছো নাকি জানোয়ার?”
বাড়ির আশেপাশের লোকজন জড়ো হয়। কারো মুখে বিস্ময়, কারো মুখে নীরবতা।মিমের বাবা ঠান্ডা গলায় বলেন,
— “মানিক ভাই, মেয়েটা আপনার সন্তান, সম্পত্তি না। একবার ভেবে দেখুন।”
কিন্তু মানিক এখন আর শুনতে পাচ্ছে না।
সে যেন নিজের লজ্জা ঢাকতে হিংস্র হয়ে উঠেছে।
হঠাৎ সে মিমের বাবা’কে সরিয়ে দিয়ে বলে ওঠে,
— “তুমি এখন আমার শত্রু। কাল চেয়ারম্যানের লোক আসবে। ওদের মেয়ে আমি দিবই। কেউ আটকাতে পারবে না।”
এই বলে ঘর থেকে বের হয়ে যায় দরজার শব্দে।
বাড়ির আকাশটা আরও ভারি হয়ে ওঠে।ফিহা দরজার ওপাশে বসে কাঁদছে,
— “আল্লাহ, আমি কি করব এখন?”
নীলা তার পাশে এসে বসে,চোখ ভরা জল নিয়ে বলে,
— “আপু, তুমি পালিয়ে যাও।”
ফিহা বোনের মাথায় হাত রাখে,
— “না রে, পালালে মা বিপদে পড়বে। আমি থাকব, কিন্তু বিয়ে করব না।”
মিমের বাবা মিমকে ফোন করে বলেন। মিম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ভয়ে হাত পা শুকিয়ে যায়। এখন তো সে বাড়িতে ও না। বাড়িতে পৌঁছাতে আরও দুই ঘন্টা লাগবে। মিম রাশেদ কে বলে তাড়াতাড়ি গাড়ি চালাতে। ফিহার কিছু হয়ে গেলে জাহেদ শেষ হয়ে যাবে।
ফিহা জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখে।
বাতাসে হালকা বৃষ্টি নেমেছে। মুখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, মনে একটাই কথা
—“একটা মেয়ের জীবন এত সস্তা কেন? আমাকে ওই মানুষ টা কেনো ভালোবাসার আশা দেখালো খুদা ? এতো টা অবিচার আমার প্রতি তুমি করো না? ”
সে চুপচাপ চোখ বন্ধ করে নেয়। বার বার জাহেদ মুখটা বেসে উঠছে তার চোখে। তার ভেতরে যেন এক নতুন শক্তি জেগে ওঠে। সে জানে, কাল সকালে যাই হোক না কেন, সে মাথা নত করবে না। কারণ নিজের জীবন, নিজের ইচ্ছার জন্য
আজ থেকেই সে লড়াই শুরু করবে। কারোর আশায় থাকবে না। যে বিপদের সময় পাশে থাকে না তাদের কোনো দরকার নেই ফিহার জীবনে।
বিকেল ধীরে ধীরে শেষের দিকে। বাড়ির চারদিকে আলো জ্বলছে, কিন্তু আরমানের চোখে কেবল অন্ধকার। গাড়ি থামতেই ও প্রায় ছুটে ঢোকে বাড়ির ভেতরে। মুখে ঘাম, চোখে আতঙ্ক, ঠোঁট কাঁপছে
—“বউ… বউ… মানজারা…”
ওর কণ্ঠে এমন কাঁপন, যেন কেউ বুক থেকে কিছু ছিঁড়ে নিচ্ছে। প্রথমে নিজের রুমে যায়, নেই।তারপর জারা যে রুমে থাকে সেই রুমে যায়। রুম ফাঁকা। পুরো রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজে। বিছানায় চাদর টেনে দেখে — মোবাইল বালিশের নিচে অবহেলায় পরে আছে।। চোখে পাগলামির ছাপ—
— “বউ তুই কই?”
রুম থেকে বের হয়ে দৌড়ে যায় নিচে, সিঁড়িতে পা আটকে পড়ে যেতে যেতে দেয়ালে ভর দেয়।
নিচে নেমেই জোরে চিৎকার—
__“কেউ দেখছো আমার বউকে? মানজারা..!”
কাজের মেয়েরা চুপ। কেউ কিছু বলে না।আরমানের গলা কাঁপছে, চোখে জল।
__“ মানজারা তুই না আমার লক্ষী বউ? প্লিজ বের হয়ে আয় জান!”
ঠিক এই সময় রুম থেকে বের হন ফারিয়া বেগম আর মারজিয়া বেগম। দু’জনেই হতভম্ব—
__“এই কী অবস্থা তোর, আরমান? কি হয়েছে, এমন করছিস কেনো?”
আরমান হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
___“আম্মু, আমার বউ কই? রুমে নাই, বারান্দায় নাই, উপরে নাই! কোনো জায়গায় নাই! ”
ওর দৃষ্টি ফাঁকা, শ্বাস দ্রুত।
__“আম্মু, আমি ভয় পাচ্ছি..প্লিজ বলো না আমার বউ কই?”
ফারিয়া বেগম তাড়াতাড়ি ছেলের দিকে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখেন,
— “বাবা, এমন করিস না! বস একটু।”
কিন্তু বসে থাকার সময় নেই।আরমান একবার বসে, আবার উঠে দাঁড়ায়। ওর চোখে যেন আগুন,
__“আম্মু, আমি শান্ত হতে পারব না যতক্ষণ না ওকে দেখি।”
ঠিক তখনই রোহান দৌড়ে আসে।
— “ভাই! কী হইছে তোর? ভাবি নেই বাড়িতে?”
রোহান পাশে বসে, কিন্তু আরমান বসে না।
ও হাত মুঠো করে হাঁটে এদিক–ওদিক।
— “ওকে খুঁজে পাচ্ছি না, রোহান। ফোন করলাম, ধরতেছে না। মোবাইল রুমে ।”
রোহান ভাবে হয়তো কিছু হবে না, কিন্তু ওর চোখে ভয় দেখে নিজেই কেঁপে ওঠে। আরমান আবার রুমে ঢোকে,চিন্তার শেষ সিমান্ত পেরিয়ে যায়। পাগলের মতো আলমারি খোলে, পর্দা সরায়, এমনকি ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা ঠেলে দেখে—
__“না, নাই!”
ওর মুখে নিঃশব্দ চিৎকার।
__“কোথায় গেলি রে, লক্ষী বউ?”
বুকের মধ্যে যেন কেউ পাথর বসিয়েছে।
ওর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। ঠিক সেই সময় জাহেদ রুম থেকে বের হয়।আরমানের এই অবস্থা দেখে দৌড়ে ইনহেলার আনে। জাহেদ এসে রোহানের হাতে দেয়।
— “নে ভাই, এটা ধর!”
আরমান গভীর শ্বাস নেয়, কিন্তু শান্ত হয় না।
চোখের পানিটা গাল বেয়ে নেমে আসে।
— “আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। তোমরা কেও বলো না আমার বউ কই? ”
ফারিয়া বেগম ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে
—“শান্ত হও বাবা, জারা পার্লারে গেছে।”
এক মুহূর্তে যেন চারপাশ থেমে যায়।আরমান তাকায় মায়ের মুখে, চোখ রক্তবর্ণ—
__“পার্লারে? কার সাথে? কার পার্মিশন নিয়ে গেছে?কই আমাকে তো বলে নি?”
জাহেদ আস্তে বলে,
__“জাহির ভাই গেছে সাথে… জোহানও। জিনিয়াদের সাথে গেছে!”
আরমান এক ধাক্কায় উঠে দাঁড়ায়—
___“কার পারমিশনে গেছে ও? আমারে না বলে? আমি অনুমতি দিয়েছি?”
ওর গলার স্বর বজ্রের মতো কাঁপছে।
___“দশ মিনিটের মধ্যে আমার চোখের সামনে দেখতে চাই ওকে!”
চিৎকারে সিঁড়ি কেঁপে ওঠে।মারজিয়া বেগম চোখের পানি মুছে বলেন,
__“বাবা শান্ত হও, তোমার শ্বাস কষ্ট বাড়বে।”
আরমান অস্থির দৃষ্টি ফেলে বলে
__“ আম্মু, আপনার মেয়ে শান্ত থাকতে দেয় না! ”
রোহান আর জাহেদ দুইজন মিলে আরমানকে এনে সোফায় বসায়। শান্ত হতে বলে। কিন্তু কারও কথা শোনে না আরমান। ও নিজের চুলে হাত দেয়, চেয়ার ছুঁড়ে ফেলে দেয়, দেয়ালে ঘুষি মারে।
__“সবাই আমারে বলে শান্ত হ, কিন্তু কেউ জানে না আমার বুকের ভিতরটা পুড়তেছে।”
রোহান ভয়ে পাশে দাঁড়িয়ে, জাহেদ ধরে রাখে ওর হাত।
__“ভাই, বসো… তুমি এমন কোরো না।”
আরমান হঠাৎ দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
__“জাহেদ, ফোন কর জাহিরকে। এখনই ওকে বল, দশ মিনিটের মধ্যে মানজারাকে নিয়ে আসতে।”
ওর চোখের রক্তচাপ বেড়ে গেছে। মুখ ফ্যাকাশে, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। রোহান পানি এগিয়ে দেয়, ও নেয় না।
__“ আমি কিছু খাব না।”
আরমান সোফায় বসে পড়ে, দুই হাত মাথায় রেখে হাপাচ্ছে।
__“ওকে তাড়াতাড়ি বলো আসতে, আম্মু।”
ফারিয়া বেগম কাঁদতে শুরু করেন। মারজিয়া বেগম এসে আরমানের পিঠে হাত রাখেন,
__“ ও আসবে বাবা! এই জাহেদ তুমি একটা কল করো না! ”
কিন্তু আরমান যেন শুনছেই না কারও কথা।
চোখ ফাঁকা, ঠোঁট নড়ছে নিঃশব্দে—“বউ… বউ…”
জাহেদ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ফোনটা হাতে রাখে,
দৃষ্টি নিচু। ডায়াল করতে দিয়েও হাত কাপছে তার। রোহান হালকা কাঁপা কণ্ঠে বলে,
__“ভাই, প্লিজ… প্লিজ নিজেকে সামলা।”
কিন্তু না।আজ আরমানকে কেউ থামাতে পারে না। তার ভালোবাসা, ভয় আর অস্থিরতা একসাথে ছটফট করছে—যেন আগুনে পুড়ছে তার বুক।ও হঠাৎ উঠে দরজার দিকে ছুটে যায়।
___“আমি নিজেই যাচ্ছি ওকে নিতে। কাউকে কল করতে হবে না! ”
জাহেদ ও রোহান দুজনেই গিয়ে ওকে ধরে ফেলে।
___“না ভাই, এমন কোরো না। একটু অপেক্ষা করো। আমি করছি ।”
আরমান হাত ঝাঁকিয়ে ছাড়িয়ে নেয়।
__“আমার বউ কোথায় গেছে আমি নিজে দেখে আসব।”
বুকের ভিতর চাপ বাড়ে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ইনহেলারটা ধরে রাখে ফারিয়া বেগম,
__“এমন করিস না, জারা তো পার্লারে আছে। জাহিরও তো আছে সাথে। তাহলে এমন করছি কেন। শ্বাস বারছে তোর। এই নে বাবা, একবার নে।”
আরমান গভীর শ্বাস নেয়, চোখ বন্ধ করে দেয়।
জল গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। কিন্তু আরমান তখন কেবল ফিসফিস করে বলে—
__“ সারাটা দিন দেখি নি ওকে। কথাও হয় নি। আমার পাষাণ বউ একবার কলও করলো না আমায়?”
ওর চোখে ঝড়।ওর ভালোবাসা আজ সীমাহীন হয়ে গেছে। জাহেদ কল ডুকিয়ে এসে আরমানের পাশে বসে। রিং হচ্ছে। রোহান আরমানের কাঁধে হাতে রেখে দাঁড়িয়ে আছে।
আরিফ খান, আসিফ খান আর আনিছুর রহমান বাড়িতে নেই। তারা একটু বাইরে গেলে গাইতে। জেসমিন বেগম জেরিন কে নিয়ে ওর নানু বাড়িতে গেছে। জিনিয়ার নানু অসুস্থ তাই দেখতে গেছে। চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।
ফারিয়া বেগম আর মারজিয়া বেগম আরমানের দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন বউ পাগল হলে এমন করতে পারে। মারজিয়া বেগমের চোখে পানি চলে আসে খুশিতে। মনে মনে ভাবে মেয়ের ভাগ্য সত্যি অনেক ভালো তাই তো এতো ভালো একজন জীবনসঙ্গী পেয়েছে।যে একদণ্ড তাকে না দেখলে পাগল হয়ে যায়।
বিয়ের আর মাত্র চার দিন বাকি। পুরো খান ম্যানশনে আনন্দের আমেজ। সাজঘরে কাপড়চোপড়, গয়না, মেহেদি — সব চলছে নিজের তালে। যদিও বিয়েটা হচ্ছে ঘরোয়া ভাবে, তবুও মেয়ের বউ সাজার স্বপ্ন তো আর কম নয়।
ফারিয়া বেগম সকাল থেকেই ব্যস্ত। জারার দিকে তাকিয়ে একটু মৃদু হেসে বলেন,
__“মা, ঘরোয়া হোক বা না হোক, তুই কিন্তু আমার চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কনে হবি। আজ পার্লারে গিয়ে সব ঠিকঠাক করিয়ে আন।”
জিনিয়া আর ছায়মা একসাথে বলে উঠে
__“ তুমি একদম ঠিক বলেছো। বউ সাজবে আর পার্লারে যাবে তা হয়৷ বলো?”
জারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুখ বাঁকায়,
__“আম্মু, এখন আবার পার্লার! এত কেমিকেল এসব মুখে দিতে মন চায় না।”
ফারিয়া বেগম গম্ভীর হয়ে বলেন,
__ “না মানে! মেয়ের বিয়ে, তাও কনের মুখে এই কথা! ওঠ, জিনিয়া আর ছায়মার সাথে পার্লারে যা।”
তারপর আলমারির ড্রয়ার খুলে একটি ছোট্ট বাক্স বের করেন। ভেতরে ঝলমল করছে ডায়মন্ডের কাজ করা সুন্দর চুড়ি। হাতে পরিয়ে দেন জারার।
__“এইটা বিয়ের আগে থেকেই পরবি। মেয়েদের বিয়ের পর সারাজীবন চুড়ি আর নাকে ফুল পরতে হয় — এটা সৌভাগ্যের প্রতীক।”
জারা মৃদু হেসে বলে,
__ “কিন্তু আম্মু, আমার তো নাক ফিটো না।”
ফারিয়া বেগম বলেন,
___ “তাই তো বললাম, পার্লারে গিয়ে নাকটাও ফিটো করে আনবি।”
জারার মুখের হাসি মিলিয়ে যায়।
__“উফফ আম্মু, ব্যথা লাগবে!”
ফারিয়া বেগম হেসে বলেন,
___“বউ হওয়ার আনন্দে সেই ব্যথাও মিষ্টি লাগবে।” তাই জারাকে একপ্রান্তে বাধ্য হয়ে পার্লারে আসতে হয়। জিনিয়া আর ছায়মাও সাথে আসে।মিম বাড়িতে থাকলে অবশ্য সেও আসতো। তারা দুপুরের একটু পর পর বাড়ি থেকে বের হয়। তাদের সাথে জাহির আর জোহান ও আসে।
তখন দুপুরের কড়া রোদ । পার্লারের ভেতরে হালকা সুগন্ধ ছড়ানো। জারা, জিনিয়া আর ছায়মা একসাথে বসে আছে। তাদের মুখে ক্রিম এর-পলেপ, চোখে শসার টুকরো দেওয়া।
জোহান পাশের সোফায় দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে সন্দেহভরা চোখে। সে এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছে না, মেয়েরা এসব দিয়ে কী করে সুন্দর হয়!
ঠিক তখনই একজন মহিলা এসে এক সরু সূচের মতো যন্ত্র দিয়ে জারার নাক ফুটো করতে গেল।জারা আগেই বয়ে সিটিয়ে আছে।জোহান সোফা থেকে মেনে বোনের কাছে এসে দাঁড়ায়। মনোযোগ সহকারে দেখে। একজন মহিলা জারার নাকে যন্ত্র টা ধরে বলে
__“একটু সহ্য করুন ম্যাডাম,” বলতেই চিক করে ব্যথার ঝাঁকুনি লাগে।
__“আহহহহ!” জারা চিৎকার করে উঠে।
এটা শুনে জোহানের চোখ রাঙা হয়ে যায়। মাথা গরম হয়ে যায়। ওর বোনুকে ব্যথা দেয়। কতো বড় সাহস।
__“এই, আমার বোনুকে ব্যথা দিস কেন!” বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক মহিলার চুল টেনে ধরে।
__“ওই ছেলেটা পাগল না কী!” সবাই চেঁচিয়ে উঠে মহিলাটি ।
জাহির ছুটে আসে,
__“জোহান, ছেড়ে দে! ও কাজ করছে!”
কিন্তু জোহান ছাড়ার পাএ নয়। ওরা তার বোনুকে ব্যথা দিয়েছে তাই সেও তাদের শাস্তি দিবে। জিনিয়া ছায়মা হতো ভাগ জোহানের কান্ড দেখে। জারা তো ব্যথায় চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে আছে। পার্লারে অন্যসব কাস্টমার আর স্টাফরা বলছে, কি বিচ্ছু ছেলেরে বাবা?
জোহান মহিলাকে একে বারে নাজেহাল অবস্থা করে।
__“ আজ ওর দাঁত ভেঙ্গে ফেলবে আমি, বাজে মহিলা আমার বোনুকে ব্যথা দিস?” জাহির বহু কষ্টে তাকে শান্ত করে বসায়।
জোহান তখনো ভ্রু কুঁচকে বসে আছে। ঠিক তখন পার্লারের অন্য একজন মেয়ে জারাদের চোখে শসা দিতে আসে।
একজনের চোখে শসা রাখতেই জোহান ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে শসার টুকরোটা তুলে মুখে পুড়ে খেয়ে ফেলে! সবাই স্তব্ধ।
সে আবার দ্বিতীয়জনের চোখের শসাও খেয়ে নেয়, তারপর বলে,
__“এইটা তো খারাপ না! তোমরা এমন জিনিস চোখে রাখো কেন?”
কেউ ভয়ে কিছু বলে না। যদি আবার কারও চুল টেনে ধরে! এর থেকে দূরে থাকায় ভালো।
জাহির পাশেই বসে আছে, হাতে জিনিয়া আর ছায়মার মোবাইল। পার্লারে ফোন ব্যবহার নিষেধ। জাহির একা পাশে বসে নিজের মোবাইলে কিছু টাইপ করছিলো।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে ওঠে — জাহেদ কল করেছে। জাহির রিসিভ করে বলে,
__ “হ্যাঁ জাহেদ, বলো।”
জাহেদর গলায় টেনশন,
__ “ভাবি কোথায়?”
__“আরে, আটা-ময়দার পলেপ মুখে মেখে বসে আছে, চোখে শসা দিয়ে। কনে-সাজের প্রস্তুতি চলছে ভাই,” হাসতে হাসতে বলে জাহির।
ওপাশ থেকে জাহেদ বলে,
__ “তাড়াতাড়ি নিয়ে আসো। ভাইয়া চিন্তা করছে। এখনই বলছে, ভাবিকে বাড়ি আসতে।”
জাহির একটু হেসে বলে,
___“আচ্ছা, তুমি লাইনে থাকো।”
তারপর ও মাথা তুলে বলে,
__“বুড়ি, আরমান ভাই চিন্তা করছে, বলেছে এখনই ফিরতে।”
জারা বিরক্ত স্বরে বলে,
___“তুমি চুপ করে বসো তো ভাইয়া, উনি সব সময় বারাবাড়ি করেন।”
জাহেদের ফোনটা স্পিকারে দেওয়া ছিলো।
আরমান নিজের কেবিনে বসে শুনছে—তার স্ত্রীর মুখ থেকে বের হওয়া সেই একটিমাত্র বাক্য:“উনি সব সময় বারাবাড়ি করেন।”
আরমানের শরীর জমে যায়।চোখে এক রকম ঠান্ডা আগুন জ্বলে ওঠে। চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
রোহান পাশে বসে ছিলো, চুপচাপ তাকিয়ে থাকে আরমানের মুখের দিকে।আরমান ধীরে ধীরে বলে ওঠে,__“বারাবাড়ি…করি তাই না মানজারা?”
ওর গলায় কোনো চিৎকার নেই, কিন্তু এক ধরনের ভয়ঙ্কর ঠান্ডা ভাব। হাতের কাছে থাকা গ্লাসটা ভেঙে যায়। কাচের পানির গ্লাসটা টেবিল থেকে ধীরে ধীরে মেঝেতে পড়ে গড়িয়ে যায়।
রোহান ভয় পায়,
__“কি করছিস এটা? শান্ত হন।”
কিন্তু আরমান যেন নিজের জগতে ঢুকে গেছে।
ওর চোখের সামনে ভাসছে শুধু সেই একটিমাত্র মুখ — জারা।মাথায় একটাই কথা ঘুরছে—“সে বলে আমি বারাবাড়ি করি?”
জাহেদ এখনো লাইনে। ওর কানেও আসছে আরমানের নিঃশ্বাসের ভারি শব্দ।ও কিছু বলার আগেই কলটা কেটে যায়। আরমান সোফা থেকে উঠে যায়, সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
__“ দরকার নেই আসার.. কারো দরকার নেই আসার! পাষাণ বউ একটা, পাষাণ!”
মারজিয়া বেগম এর ও এখন রাগ উঠে যায় মেয়ের এমন হটকারিতা দেখে।ছেলেটা তাকে দেখতে না পেয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছে আর এই মেয়ে বলছে বারাবাড়ি করে। জাহেদের কাছে থেকে মোবাইল নিয়ে কানে দেন তিনি
__“ জাহির জারা’র কাছে ফোন দেয়! ”
জাহির এসে জারা’র মুখের সামনে মোবাইল ধরে বলে
__“ বুড়ি কথা বল, আম্মু! ”
__“ হ্যাঁ আম্মু বলো!” বলল জারা
মারজিয়া বেগম রাগে গজগজ করতে করতে বলেন
__“ বেয়াদব মেয়ে, ফাটিয়ে একটা চড় মারব। ছেলেটা তোকে বাড়িতে দেখতে না পেয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছে আর তুই বলছিস বারাবাড়ি করে?বাড়ি আয় তাড়াতাড়ি। আজ তোকে যদি আমি থাপ্পড় না মেরেছি তার পর বলিস।”
আরাম মাএ দুই সিড়ি পার হয়। এর মাঝে শাশুড়ীর কথা গুলো কানে আসে। আবার সিড়ি থেকে নেমে এসে ক্ষিপ্ত হয়ে বলে
__“ আমার লক্ষী বউয়ের গায়ে একচুল আঁচড় লাগলে, তাহলে সব কিছু ধ্বংস করে দিব আমি। আমি ছাড়া আমার বউকে কেউ কিছু বলবে না, আমি সেই অধীকার কাউকে দেইনি। ”
তার পর এদিক ওদিক করে কোনো রকম সিড়ি পার হয়ে নিজের রুমে আসে আরমানকে। ওর শরীরের প্রতিটি শিরা টানটান হয়ে আছে। চোখে উদ্বেগ, মুখে অস্থিরতা, আর বুকের ভেতর দপদপ করছে এক অদ্ভুত ভয়—
__“তুই বড্ড পাষাণ বউ মানজারা!আমার কষ্টটা তুই একটুও বোঝিস না! ”
রোহান আরমান যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলে
__“জাতে মাতাল, কিন্তু তালে ঠিক। ওর বউকে কেউ কিছু বলতে পারবে না। আবার সেই রাগ করে করে বসে। ”
ফারিয়া বেগম আর জাহেদ হাসেন। তারা যানা আরমানের এই রাগ জারার সামনে টিকবে না। এই ছেলে মাএরা ছাড়া বউ পাগল।জাহেদ তারপর জাহির কে সব খুলে বলে আর তাড়াতাড়ি আসতে বলে তাদের । কিন্তু মারজিয়া বেগম এর চিন্তা হচ্ছে। আবার রাগও হচ্ছে। আবাল মেয়ে জন্ম দিয়েই, যে স্বামীর মন বোঝে না।
__“ আজ শুধু আমার চাঁদ সুন্দরী আসুক বাড়ি তারপর ওর ক্লাস আমি নিব। আমার ফোন তুলে না। ” এই বলে রোহান চলে যায় আরাম রুমের দিকে। জাহেদ পিছন থেকে বলে
__“ আমার বোনকে কিছু বললে খবর আছে তোমার! ”
রোহান জবাব দেয় না। শুধু একটু হাসি দিয়ে উপরে চলে যায়।
জারার মুখের রঙ তখন ফ্যাকাশে। জাহির ফোন কেটে দেওয়ার মুহূর্তেই ওর হৃদয় ধক করে উঠেছিল।জাহেদর কথা — “আরমান ভাই ভাবির চিন্তা করছে,বাড়িতে না দেখে পাগলের মতো করছে।এখন শ্বাস বেরে যাচ্ছে বার বার , ইনহেলার নিতে হচ্ছে…”এই বাক্যটার পর যেন পুরো শরীর কেঁপে ওঠে ওর।
জিনিয়ার ঠোঁট শুকিয়ে যায়। ওর কণ্ঠ আটকে আসে,
___“কী বললে? ইনহেলার… মানে ভাইয়ার আবার শ্বাস কষ্ট শুরু হয়েছে?”
___“ কি..কি হইছে আমার স্বামীজানের?”
জিনিয়া ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে,
___“হ্যাঁ, ভাবি। তুমি জানো না— ভাইয়া কেমন হয় তখন। তোমাদের মাঝে যখন ভুল বোঝাবুঝি হয় তখনও হাসপাতালে ভর্তি ছিলো ভাইয়া। বেশি টেনশন করা, হাইপার হওয়া বারণ । ”
ছায়মা বলে
__“ তুমি কল ধরোনি, তাই ভাইয়ার টেনশন বেড়ে গেছে। হাইপার হয়ে গিয়েছে । মুখে একটাও কথা নেই, শুধু তোমাকেই খুঁজছে।”
জারার বুকের ভেতর কিছু একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। চোখে পানি চলে আসে নিজের অজান্তে।
__“আমি… আমি এমন করতে চাইনি। ওকে কষ্ট দিতে চাইনি,” বলে কান্না ফোটে ওর গলায়।
জিনিয়া জারার কাঁধে হাত রাখে,
__“চলো,এখনই যাই ভাবি। তুমি ভাইয়ার সামনে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
গাড়ি পার্লার থেকে ছাড়তেই জারা জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।পথের প্রতিটি গাছ, আলো, মানুষ—সব ঝাপসা দেখায়। চোখের পানি গড়িয়ে নামছে গালে।
জারার মনের ভেতরে একটাই কথা ঘুরছে—“আমি কী করে ওর সাথে এমন করলাম? ওর রাগের পেছনে তো সবসময় ভালোবাসাই লুকিয়ে থাকে।”
জিনিয়া ধীরে বলে, “ভাবি, ভাইয়া আজ সারা দিন কিছু খায়নি। তুমি কল তুলছো না দেখে অফিস থেকে পাগলের মতো বেরিয়ে আসে, আর তোমাকে খুজতে থাকে। ”
জারার হাত ঠান্ডা হয়ে আসে।
__“ও খায়নি?”
জাহির বলে
__“না। এমনকি ইনহেলার নিতে নিতে বলেছে — ‘আমি আমার বউকে চোখের সামনে দেখতে চাই।’”
জারা মুখে হাত দিয়ে চুপ করে বসে থাকে। চোখ দিয়ে নীরবে ঝরতে থাকে অশ্রু।ও বুঝে গেছে, ওর একটিমাত্র কথা— “উনি সবসময় বারাবাড়ি করেন”— ভেঙে দিয়েছে এক মানুষের শান্তি।
গাড়ি থামতেই জারা এক দৌড়ে নামল। হাতের ব্যাগটাও ভুলে গেল গাড়িতে। মাথার এলোমেলো অবস্থা হিজাবের।বোরকায় ধরে ছোট্টে চলে আসে বাড়ির ভিতরে। ফারিয়া বেগম আর মারজিয়া বেগম তখন ড্রইংরুমে বসা।
জারাকে চোখে পড়তেই ফারিয়া বেগম হেসে বলেন,
__“মা, এসে গেছিস? আরমান রুমে আছে, তাড়াতাড়ি যা।”
জারার কণ্ঠে কাঁপুনি
__ “আম্মু… ও কেমন আছে?”
ফারিয়া বেগম উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে বলেন, __“চিন্তা করিস না মা, ইনহেলার দিয়েছে, এখন কিছুটা ভালো।”
মারজিয়া বেগম মেয়ের দিকে ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে আছেন। একটা চড় বসিয়ে দিলে শান্তি লাগতো।
জারা কিছু না বলে দৌড়ে রুমের দিকে যায়।
দরজা খুলতেই দেখতে পায়—রুমে নিঃশব্দ ভারী বাতাস। আরমান বেডের কোণে বসে আছে, দু’হাত জোড়া করে হাঁটুর ওপর। পাশে রোহান আর জাহেদ বসা।
জারা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড।
রোহান ও জাহেদ তাকিয়ে দেখে, তারপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়।একটা বোঝাপড়ার হাসি দিয়ে বলে,
__“ভাবি, আমরা বাইরে যাচ্ছি।”দু’জনেই রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
দরজাটা জারা ধীরে ধীরে ভেতর থেকে চাপিয়ে দেয়।ভেতরে শুধু ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ।
জারা এক পা, দুই পা করে এগিয়ে আসে।
নরম কণ্ঠে বলে,
__“স্বামীজান…”
আরমান বুঝে গেছে, ও এসেছে।তবুও তাকায় না।
শরীর স্থির, মুখে কঠিন নীরবতা।জারা আস্তে এগিয়ে এসে বলে,
__“আমি দুঃখিত… সত্যি। আমার ওভাবে বলা উচিত হয়নি।”
আরমান তখন ধীরে উঠে দাঁড়ায়, মুখ ঘুরিয়ে বেলকনির দিকে চলে যায়। জারা পেছন পেছন যায়। বাইরে আকাশে সন্ধ্যার আলো ম্লান হয়ে আসছে।
__“স্বামীজান, একবার শুনবেন না?”
ওর কণ্ঠ কাঁপছে, চোখে পানি চিকচিক করছে।
আরমান হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায়।চোখে কষ্ট আর রাগের মিশ্র আলো।
__“ কি শুনব?তুই আমার চিন্তা নিয়ে হাসিস? বলিস আমি বারাবাড়ি করি?”
জারা অবাক হয়ে তাকায়,
___“আমি মনে করেছে এমনি খুঁজছেন, ওভাবে বোঝাতে চাইনি।”
__“ওভাবে? আমি সারাদিন তোর জন্য পাগলের মতো কাটিয়েছি, একবারও কল করিস নি। আর না মেসেজ? বলেছিলাম তো মিস’কল দিতে !”
জারা চোখে জল টলমল করছে
__“ আমি সারাদিন রুমে আসিনি। ফোন রুমে ছিলো।দুপুরের পর আম্মু আমাকে জোর করে পার্লারে পাঠায়!”
আরমান জারাকে দেখে না। মুখ অন্য দিকে করে রাখে
__“ আমি তো এমন আহামরি কেউ না! আমাকে ছাড়াও তোর চলে!”ওর গলা ভারী হয়ে আসে।
__“আমার এমন পাষাণ বউ দরকার নেই!”
জারা চমকে ওঠে,
__“পা..পা..ষাণ? আমি?”
আরমানের চোখ লাল হয়ে ওঠে,
___“হ্যাঁ, যে বুঝতে পারে না স্বামী কষ্টে আছে, যে ভাবে তার ভালোবাসা বারাবাড়ি— সে পাষাণ ছাড়া কী!”
জারার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
__“আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি… আমি জানতাম না…”
__“তাহলে এখন কেন এসেছিস?”
ওর কণ্ঠে তীব্র ব্যথা।
__“যে বলে আমি বারাবাড়ি করি, সে আবার আমার কাছে কী চায়?”
জারা হাত বাড়িয়ে আরমানের হাত ধরতে চায়।
আরমান ঝট করে হাত সরিয়ে নেয়।
__“দয়া করে রাগ কোরো না…স্বামীজান। ”
জারা ভাঙা গলায় বলে।
আরমান দরজার দিকে ইশারা করে বলে,
_“দয়া করে, এখন যা আমাকে একা থাকতে। তোর মুখটা দেখার মতো মেজাজ নেই।”
জারা কেঁদে ওঠে।
__“স্বামীজান, আমি সত্যিই দুঃখিত। ”
___“ আমি শুধু একা থাকতে চাই।” ধমকে কথা টা বলে আরমান। তারপর দরজা খুলে বাইরে বের করে দেয় ।
জারা দাঁড়িয়ে থাকে দরজার পাশে। তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে টাইলসের মেঝেতে।
চোখে শূন্যতা, ঠোঁটে কাঁপুনি।
বাইরে তখন বাতাস উঠেছে, পর্দাগুলো দুলছে।
বিয়ের কনের জন্য রাখা লাল শাড়িটা হ্যাঙ্গারে দুলছে — যেন তার নিজের কষ্টের প্রতিচ্ছবি।
__“স্বামীজান…”জারা আস্তে ডাক দেয়, কিন্তু কোনো সাড়া মেলে না।দরজার ওপাশে নীরবতা।
জিনিয়া আর ছায়মা দৌড়ে আসে,
__“ভাবি, ভাইয়া রেগে গেছে, তাই এমন করছে। শান্ত হও, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
জারা ভাঙা গলায় বলে,
__“আমি ওর রাগের কারণ হয়ে গেলাম। আমি ওকে খুব কষ্ট দিয়েছি।”
জিনিয়া কাঁধে হাত রাখে,
__“ভাবি, ভাইয়া তোমাকে অনেক ভালোবাসে। ও একটু ঠান্ডা হোক, দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ছায়মা হালকা হাসি দিয়ে বলে,
__“চলো, এখন তোমার রুমে যাই। ফ্রেশ হয়ে নিবে। চোখে পানি রেখে কেউ সুন্দর লাগে না। মুখটা একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ”
জারা চুপচাপ মাথা নাড়ে।ওরা দুজন মিলে জারাকে নিয়ে যায় ওর রুমে। ফ্রেশ হতে বলে চলে চলে যায়। জারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখে—ফোলানো চোখ, কান্নার দাগ, আর গলায় পড়ে থাকা সেই ডায়মন্ডের চুড়ি।
হাত তুলে চুড়িটা স্পর্শ করে, ফিসফিস করে বলে,
___“আপনার রাগগুলো আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে স্বামীজান!…”
তারপর ধীরে ধীরে ওর চোখ বুজে আসে। নিঃশব্দ ঘরটা ভরে ওঠে নরম কান্নার আওয়াজে। জিনিয়া আর ছায়মা জারা’কে ফ্রেশ হতে বলে কিন্তু ফ্রেশ না হয়ে কান্না করছে বালিশে মুখ গুঁজে। পরেন বোরকা আর হিজাবও খুলেনি।
রাত তখন দুইটা ছুঁই–ছুঁই। বাইরে শীতল হাওয়া বইছে, বাড়ির সব লাইট নিভে আছে। পুরো খান বাড়িটা যেন ঘুমিয়ে মরে আছে—শুধু দু’টি ঘর ছাড়া। আরমান আর মানজারা।
একদিকে রাশেদ আর মিম, যারা রাস্তায় ভয়ঙ্কর জ্যামে আটকে এসে বাড়িতে ঢুকেছে অনেক রাত করে। তারা ক্লান্ত, মাথা ঘুরছে, অস্থির; কিন্তু এখন কারো কিছু বলার সময় নেই। সবার দরজা বন্ধ। ফিহার ব্যাপারটা জরুরি—কিন্তু সেটা এখন আর বলা যাবে না।__“সকালে বলবো…”
এই সিদ্ধান্তে দু’জনেই ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
এদিকে বাড়ির অন্য কোণে, সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ঝড় বইতে থাকে। আরমান আর জারার মধ্যে রাত নামার সাথে সাথে জমে ওঠে রাগ, অভিমান, কষ্ট আর ভালোবাসার ভয়ানক টানাপোড়েন।
আরমানের রুম থেকে বের হয়ে আসার পর থেকেই জারা বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছে।এমন ভাবে কাঁদছে যেন তার দমই বন্ধ হয়ে যাবে।
পরনের বোরকা–হিজাবও খুলে না। চুল, নাকফুল, চুড়ি—সব এলোমেলো। চোখ দুটো এত লাল হয়ে আছে যেন কেউ আগুন ধরে দিয়েছে।
ফারিয়া বেগম দু’বার এসে বলে গেছে
—“মা, উঠে খেয়ে নে। খালি পেটে থাকলে শরীর খারাপ করবে! কান্না করিস না আর মা ।”
কিন্তু জারা কিছুই শোনে না। জিদ করে, অভিমান করে, গোটা পৃথিবীর সাথে রাগ করে বালিশে মুখ গুঁজেই রাখে।
এদিকে নিজের রুমে বসে আছে আরমান।
অফিসের শার্ট খুলে ফেলে টি–শার্ট পরে নিয়েছে।
একবার বেলকনিতে যায়—ঠান্ডা বাতাসে শ্বাস নেয়। আবার ফিরে এসে ল্যাপটপ ওপেন করে।
কাজ চেষ্টা করে। আবার মন বসে না।
জারা’র কান্নার শব্দ এখনও মাথায় বাজছে।
সন্ধ্যায় রাগের মাথায় সে যা বলেছে…যেভাবে জারাকে ঘর থেকে বের করেছে…সবই বারবার তার মাথায় ঘুরছে, ছুরির মতো কাঁটছে।
___”আমার এমন পাষাণ বউ চাই না।”
এই বাক্যটা সে বলেছিল ঠিকই, কিন্তু—এখন মনে হচ্ছে যেন নিজের বুক চিরে নিজেকেই আঘাত করেছে। জারার জন্য বুকের ভিতর অস্থির আগুন জ্বলছে। হাসফাস লাগছে। শ্বাস আটকে আসছে। শেষ পর্যন্ত আর সহ্য করতে না পেরে সে জারার রুমের দিকে হাঁটা শুরু করে।
জারার রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে ফোঁপানোর শব্দ ভেসে আসে।
মেয়েটা সত্যিই কাঁদছে…এখনো কাঁদছে…
আরমানের বুক মোচড় দিয়ে উঠে।ধীরে দরজা ঠেলে সে ভেতরে ঢোকে।
বেডের উপর জারা পড়ে আছে— মুখ বালিশে গুঁজে, সারা শরীর কাঁপছে কান্নায়। তার পোশাক এখনও সন্ধ্যারটাই।
আরমান এক মুহূর্ত চেয়ে থাকল—এই অবস্থায় জারাকে দেখে তার গলার স্বরই আটকে গেল।
___“ বউ..বউ…ও বউ! ”
জারা সারা দেয় না। চুপচাপ আগের মতো শুয়ে থাকে। আরমান নরম পায়ে এগিয়ে গিয়ে সে বিছানায় বসে পিছন থেকে জারাকে আস্তে করে জড়িয়ে ধরে। জারা ভয়ে লাফিয়ে উঠে—
__“ছাড়েন…! যান এখান থেকে…”
জারা কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে—কণ্ঠ কাঁপছে, শ্বাস কাঁপছে, গলা ভেঙে গেছে। আরমান বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়।
___“আমার লক্ষী বউটার এতো অভিমান? সন্ধ্যায় বকেছি—এখনো কান্না করছে?”
জারার কন্ঠ স্বর ভারী
__“ আমার অভিমান নিয়ে কার কি এসে যায়?”
আরমান জারাকে নিজের বুকের দিকে আরও টেনে নিয়ে বলে
__“মানজারার স্বামীজান প্রমিজ করছে… আর কখনো বকবে না তাকে।”
জারা কোনো জবাব দেয় না। চুপচাপ।কিন্তু চোখের পানি থামে না কখনোই। আরমান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জারার মাথায় থুতনি রেখে বলে—
___“দিন দিন পাষাণ হয়ে যাচ্ছো তুমি… আমি সারাদিন তোমাকে না দেখে পাগল হয়ে গেছি—
তাও তুমি কিছু টের পাও না।”
এই কথা শুনে জারা আরো ভেঙে পড়ে।
__“আমি তো পাষাণ, তাই না? আমাকে তো কারও দরকার নেই । রুম থেকে বের করে দিলেন। এখন আবার এখানে কেন?”
আরমান আলতো শক্তি দিয়ে জারাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়।জারার চোখ দুটো লাল।
নাকের ডগা লাল।চোখ–মুখ ফুলে আছে কান্নায়।
আরমানের বুক ঠিক তখনই হালকা কেঁপে ওঠে।
সে হাত বাড়িয়ে জারার কপালে চুমু খায়।
চোখের পানি মুছে দেয়।কিন্তু জারা সরে যেতে চায়। আরমান তা হতে দেয় না।সে জারাকে শক্ত করে নিজের বুকে চেপে ধরে।
একটু পরে জারা টের পেল—তার ঘাড়ে, কাঁধে পানি পড়ছে।সে অবাক হয়ে থমকে যায়—
আরমান… কাঁদছে?একটু নড়াচড়া করে সরে আসার জন্য।
তবুও আরমান মাথা তোলে না। বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে রাখে।মৃদু গলায় বলে—
__“বউ…ও লক্ষী বউ…সরি…খুব করে সরি
সোনা…আর বকবো না! ”
জারা আর সহ্য করতে পারে না।সে হাউমাউ করে কান্না করে আরমানকে জড়িয়ে ধরে।
__“আমি বুঝতে পারিনি স্বামীজান,আপনি এতো কষ্ট পেয়েছেন…আমাকে মাফ করে দিন…”
আরমান সাথে সাথে জারার ঠোঁটে আঙুল রেখে বলে
—“চুপ…তুমি কখনোই আমার কাছে ক্ষমা চাইবে না। কখনো না। আমি সবসময় ক্ষমা চাইবো!”
জারা নাক মুছে আরমানের বুকে মুখ লুকিয়ে রাখে।ওদের মান–অভিমান মিলিয়ে জড়িয়ে থাকে তারা কিছুক্ষণ।আরমান জারাকে উঠায়।
__“রাতে কিছু খাওনি কেন?”
জারা নাক টেনে বলে—
__“আপনি বকেছেন… তাই খাইনি।”
আরমান বিরক্ত–মমতায় জড়ানো কণ্ঠে বলে—
__“আমাকে ভালোবাসো না—বোঝলাম।
কিন্তু তোমার ক্ষুধা–পেট–শরীরের কি দোষ?”
জারা মুখ ফুলিয়ে বলে—
___“হ্যাঁ, আমি তো কাউকে ভালোবাসি না…
এইজন্যই তো ব্যথা সহ্য করে নাক ফুটো করলাম? হাতে তার নামে চুড়ি পরলাম কেন—তাও জানি না। কারণ তার ধারনা আমি তাকে ভালোবাসি না।”
আরমান চোখ বড় করে তাকায় জারার দিকে। সত্যিই— জারার নাকে ছোট্ট ডায়মন্ডের নথ।
হাতে চুড়ি। চুল এলোমেলো। কান্নায় ভেজা মুখ—
পুরোটা একেবারে বউ বউ লাগছে। তার বউ। শুধু তার। আরমান থম মেরে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
তারপর খুব ধীরে বলে—
___“তুমি… সত্যি আমার?”
জারা চোখ নামিয়ে ফেলে।হালকা হাসি—হালকা অভিমান—হালকা লজ্জা।এই দৃশ্যটা দেখে আরমান আর থাকতে পারে না। সে জারাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে—একটা লম্বা, শান্ত, তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে—
__“আমার লক্ষী বউ…”
জারা চোখ বন্ধ করে ফেলে। বিলীন হয়ে যায় সেই আলিঙ্গনে। জারা ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে আসতেই দেখে আরমান ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে নরম এক হাসি। কিছুক্ষণ আগের রাগ, কষ্ট—মনে হচ্ছে কোথাও মিলিয়ে গেছে। আরমান আস্তে করে জারার হাত ধরে বলে,
__“চলো বউ, তোমাকে নিচে নিয়ে যাই। খাবে!”
জারা কিছু বলার আগেই আরমান হঠাৎ কোলে তুলে নেয় তাকে। জারা লজ্জায় মুখ লাল করে ফেলে,
__“স্বামীজান, নামিয়ে দেন… পরে যাবো।”
আরমান মুচকি হেসে বলে,
__“পরবে না বউ। আমার বউকে কোলে নেওয়ার মতো শক্তি আমার আছে?”
জারা চুপ করে বুকের কাছে মুখ লুকিয়ে নেয়। আরমান তাকে কোলে নিয়ে নিচে এসে ডাইনিং রুমের পাশে চেয়ারে বসায়। তারপর সোজা চলে যায় কিচেনে। জারা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পরে আরমান নিজের হাতে রান্না করা গরম নুডুলস নিয়ে আসে। জারা হা করে তাকিয়ে বলে,
__“আপনি… আপনি রান্না করতে পারেন?”
আরমান হেসে বলে,
__“হুম, পারি কিছুটা।”
জারা কৌতূহলে নুডুলস মুখে দেয়।
__“ম্ম্… দারুন! আপনি তো একদম মাস্টার শেফ!”
আরমানের চোখে নরম হাসি ছড়িয়ে পড়ে।
দুজনে শান্তভাবে খাওয়া শেষ করে। plates গুছিয়ে রাখার পর আরমান হঠাৎ বলে,
__“ লক্ষী বউ, তাড়াতাড়ি বোরকা পরে নিচে এসো।”
জারা অবাক হয়।
__“এতো রাতে বোরকা? কেন?”
আরমান এগিয়ে এসে জারার কপালে নরম চুমু দিয়ে বলে,
__“হাটতে বের হব।”
জারা আরও অবাক হয়,
__“এতো রাতে?”
আরমান চোখ টিপে বলে,
__“আজ আমার বউকে একটু নিজের মতো করে সময় দিতে চাই।”
জারা কিছু না বলে নিজের রুমে গিয়ে বোরকা পরে নিচে আসে। আরমান দরজার কাছে দাঁড়ানো। দুজন বাইরের পিচ ঢালা রাস্তায় হেঁটে বের হয়—রাতের হাওয়া ঠান্ডা, বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়া।
চারপাশ নিস্তব্ধ। রাস্তার লাইটের আলো পড়ে জারার মুখে। আরমান আস্তে করে জারার হাত ধরে।
__“রাগ করেছো?”
জারা লজ্জায় মাথা নিচু করে,
_=“না… আপনিই তো আমার ওপর রাগ করলেন।”
আরমান নরম শ্বাস ফেলে,
__“তোমাকে ছাড়া থাকতে পারি না,লক্ষী বউ। তুমি কষ্ট পেলে আমার বুক ছিঁড়ে যায়।”
জারা চোখ ভিজিয়ে ফেলে,
__“আমিও আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি স্বামীজান…”
আরমান তখন একদম থেমে যায়। তারপর তারিকাভরা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে জারার দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে নেয়। আরমান হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে থেমে যায়। জারাকেও ইশারা করে তাকাতে বলে।
___“দেখো তো, তারাগুলো… কতো সুন্দর। নবীজি আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করতেন। রাতের আকাশ মানুষের মনকে শান্ত করে।”
জারা ধীরে বলে,
__“আপনি পাশে থাকলে সবই শান্ত লাগে…”
আরমান জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
__“ বউ…! ”
__“ হুমমম! ”
__“ একটা ফটাফট চুমু দাও তো!”
জারা তার বাহুতে মৃদু ঘুষি মেরে বলে,
_“ এতো জ্বালান কেন আপনি!”
আরমান হেসে উঠে,
_“জ্বালাতন তো করবোই… তুমি আমার একমাএ লক্ষী বউ ।”
কিছু দূর এগোতেই আরমান থেমে দাঁড়ায়। বাতাসে ওড়ানো পাতাদের শব্দে চারদিক আরও শান্ত মনে হয়।সে নরম গলায় বলে,
__“ একা একা হাটছো কেন। ”
__“ একা কই? আপনি আছেন না! ”
__“ তাহলে আমার হাত দরছো না কেন?”
জারা তার আঙুলের ভেতর নিজ হাত গুটিয়ে রাখে,
__“এই ধরলাম। এবার আপনি ফাঁকি দিলেই মার খাবেন।”
আরমান হাসতে হাসতে বলে,
__“হায়রে, আমার বউ তো দিন দিন সাহসী হয়ে যাচ্ছে!”
হঠাৎ জারা মুখে বাঁকা হাসি এনে বলে,
__“স্বামীজান… আমি যদি হুট করে দৌড়ে পালাই?”
আরমান চোখ সরু করে বলে,
__“ট্রাই করো। আমার থেকে পালাতে
পারবে না ।”
জারা দৌড় দিতে যাবে, কিন্তু আরমান এরই মধ্যে কোমর ধরে টেনে নেয়।
__“এক কদমও না। তুমি দৌড় দিলে কুকুর গুলো ভয় হয়ে মরে যাবে, তাই আমার সাথে থাকো।”
জারা আবার মৃদু ঘুষি মারে,
__“আপনাকে কে শিখিয়েছে এসব কথা?”
আরমান গম্ভীর ভান করে বলে,
__“আমি নিজেই অনেক জ্ঞানী! ”
__“ মহা জ্ঞানী মানুষ গো?”
অনেকটা হাঁটার পর আরমান বলে,
__“চলো, এখন বাড়ি ফিরি। তোমাকে ঠান্ডা লাগবে।”
জারা তার কাঁধে মাথা রাখে।
__“স্বামীজান?”
__“হুম?”
__“আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি।”
আরমান থেমে যায়, তারপর ধীরে ধীরে বলে,
__“আমিও, লক্ষী বউ ।তোমাকে ছাড়া আমার জীবন অসম্পূর্ণ।”
রাতের নরম বাতাসের মাঝে দুজন ধীর পায়ে বাড়ি ফিরে। তাদের মাঝে দূরত্বের দেয়াল পুরোপুরি ভেঙে যায়।
সকালের রোদটা নরম, হালকা বাতাসে বাগানের ফুলগুলোর গন্ধ ভেসে আসছে। বাড়ির পেছনের বড় বাগানে সবাই গোল হয়ে বসে আছে—জাহেদ, জিনিয়া, ছায়মা, আরমান,জাহির, রোহান আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে জারা।খরগোশগুলো গা ঘেঁষে লাফাচ্ছে, সবাই মিলে মজা করছে।
সব মিলিয়ে সকালের পরিবেশটা ছিলো বেশ শান্ত, নিশ্চিন্ত।হঠাৎ—দূর থেকে দৌড়ে দৌড়ে মিমকে দেখা যায়।মুখভর্তি আতঙ্ক, শ্বাস কেঁপে যাচ্ছে।বাগানে ঢুকেই সে প্রায় চিৎকার করেই বলে—
— “জাহেদ ভাইয়া!”
সবাই একসাথে তাকায়।জাহেদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।মিম তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলে—
— “ফিহার আজকে বিয়ে…”
সবাই থমকে যায়।
— “বিয়ে?” রোহান অবাক হয়ে বলে।
মিম মাথা নাড়ে, চোখ লাল হয়ে আছে—
— “হ্যাঁ… আজ বিকেলেই। ফিহার বাবা জোর করে… চেয়ারম্যানের ছেলের সাথে বিয়ে দিচ্ছে… টাকা শোধ করতে না পেরে…আমাকে বাবা কাল যায়। ”
জারা বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।ওর মুখ শুকিয়ে যায়। মিম আবার বলে—
— ” ফিহা কাঁদছে… দরজা বন্ধ করে রেখেছে। ওর মা-ও কিছু করতে পারছে না।”
রাশেদ বিস্ময়ে বলে—
— “গতকাল তো বললে কিছু বলোনি…”
মিমের পিছন পিছন রাশেদও আসে।
মিম চোখ মুছে—
— “বলতে চেয়েছিলাম… কিন্তু আমাদের ফিরতে অনেক রাত হয়… রাশেদ, আপনি তো জানেন, বাসায় সবাই ঘুমিয়ে ছিলো। আজ সকালেও কারোর সাথে দেখা মিলছিলো না…”
এবার সবাই জাহেদের দিকে তাকায়।
কারণ—জাহেদ একদমই চুপ।তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।একটা শব্দও বলে না।
আঁচ করা যাচ্ছে—ভেতরে ভেতরে আগুন জ্বলছে।
জারা ভয়ে কেঁপে বলে—
— “ফিহার… সত্যিই আজকে…?”
মিম মাথা নিচু করে—
— “হ্যাঁ জানু… আজকেই। চেয়ারম্যানের লোকেরা দুপুরের মধ্যেই যাবে। ফিহা বলেছে—ও মরবে, কিন্তু ওই বিয়ে করবে না…”
জারা হাত মুখে চেপে ধরে, চোখে পানি জমে ওঠে। আরমান মুখ শক্ত করে বলে—
— “এটা কোনোভাবেই হতে দেওয়া যায় না।”
রোহান দাঁত চেপে বলে—
— “ফিহার বাবাকে আমি ছেড়ে দেবো না।”
সবাই কথা বলছে, চিন্তা করছে, রেগে যাচ্ছে—
কিন্তু একজন… শুধু দাঁড়িয়ে আছে—
জাহেদ। সে ঠিক মানুষের মতো না, বরং কোনো ঝড়ের আগে গাছের নিচ থেকে ধীরে ধীরে হাওয়ার বদলে যাওয়া অনুভূতির মতো।
জিনিয়া আস্তে বলে—
— “এই চুপ থাকা মানে খুব খারাপ… খুব খারাপ কিছু ভাবছে ও…”
মিম উদ্বিগ্ন হয়ে বলে—
— “জাহেদ ভাইয়া… কিছু বলুন… ফিহাকে বাঁচান প্লিজ…”
জাহেদ তখন হঠাৎ মাথা উঠায়।চোখ লাল, মুখ শক্ত—কোনো শব্দ করে না।হঠাৎ পেছনে ঘুরে—
দৌড়াতে শুরু করে।বাড়ির ভেতরকার দিকে।
মিম হতভম্ব—জারা ভয় পেয়ে যায়।
ছায়মা ফিসফিস করে—
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৪
— “ও যেভাবে দৌড়ালো… ও এখনই কিছু করে ফেলবে…”
আরমান রাশেদের দিকে তাকিয়ে বলে—
— “ওকে একা যেতে দিস না। ওর মাথা এখন ঠিক নেই।”
বাগানের বাতাস একদম দিয়ে যায়খরগোশগুলো পর্যন্ত চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।কারণ—জাহেদের এই দৌড় মানে—কোনো কথা নয়। সরাসরি কাজ।আর সেটা আজকে খুব বড় কিছু হতে যাচ্ছে।
