Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২১

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২১

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২১
মেহজাবিন নাদিয়া

সারিম অরির ছিপছিপে শরীরের ওপর নিজের সমস্ত ভার সঁপে দিয়ে, ওর বুকের ভেতর মুখ গুঁজে এক্কেবারে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সারিমের এই চওড়া কাঁধ আর পাথরের মতো শক্ত শরীরের পুরো ওজনটা সইতে সইতে বেচারি অরির যেন জান যায় যায় অবস্থা! ওর মনে হচ্ছিল, ও কোনো মানুষের নিচে নয়, বরং আস্ত একটা পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে আছে। দীর্ঘক্ষণ একভাবে শুয়ে থাকায় ওর পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছিল, নিশ্বাস নিতেও বেশ কষ্ট হচ্ছিল।
অরি আর সহ্য করতে না পেরে নিজের দুটো হাত দিয়ে সারিমের শক্ত বুকটায় ধাক্কা দিয়ে ওকে দূরে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু ঘুমন্ত সারিমকে নাড়ানো তো দূর, উল্টো ধাক্কা দিতে গিয়ে অরির নিজের হাতের আঙুল আর কবজিতেই বারবার তীব্র ব্যথা লাগছিল।যেন লোহার এক দেয়ালকে সরানোর চেষ্টা করছে! কোনো উপায় না পেয়ে অরি এবার ঘুমন্ত সারিমের কানের কাছে মুখ নিয়ে, বেশ কাতর ভাবে অনুনয়ভরা গলায় ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,

_“সারিম… এই সারিম শুনছেন? প্লিজ একটু সরে ঘুমান না!আমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে।”
সারিম পুরো জাগল না। ও ওভাবেই অরির বুকের ওমে মুখটা আরও একটু ঘষে নিয়ে, চোখ বন্ধ রেখেই অত্যন্ত অলস, বুঁদ হয়ে থাকা জড়ানো গলায় এক শব্দে উত্তর দিল,
_“নাহ…!”
অরি ওর এই একগুঁয়েমি দেখে দমে গেল না। সে আবার সারিমের কাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে, কিছুটা কেঁদে ফেলার মতো গলায় বলল,
_“আরে সরুন না! না বলছেন কেন? আমার সত্যি খুব কষ্ট হচ্ছে তো! দম আটকে আসছে আমার।”
সারিম এবার অরির কোমরটা নিজের এক পা দিয়ে আরও শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল, যেন অরি কোনোভাবেই ওর এই বাহুডোর থেকে পালিয়ে যেতে না পারে। ওভাবেই ঘুমের ঘোরে নাকিসুরে বাচ্চাদের মতো করে বলল,
_“কষ্ট হলে হোক… একটু মানিয়ে নাও, বউ।”
সারিমের এই ‘মানিয়ে নাও’ শব্দটা শোনা মাত্রই অরির এতক্ষণের চেপে রাখা বিরক্তি আর রাগ চড়চড় করে মাথায় চড়ে গেল। সারাদিনের ধকল, তার ওপর এই মরা বাড়ির অদ্ভুত পরিস্থিতি আর এখন এই পুরুষের অবাধ্য আবদার-সব মিলিয়ে, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল অরি। বেশ চড়া এবং বিরক্ত গলায় বলে উঠল,
_“দেখুন, আমার কিন্তু এবার চরম বিরক্ত লাগছে এসব! ইয়ার্কি বন্ধ করুন আর পাশে গিয়ে ঘুমান!”
অরির রাগী সুরে কড়া গলার আওয়াজে সারিমের ঘুমের ঘোরটা যেন এক নিমেষে টুটে গেল।সারিম কোনো কথা না বলে, চোখ না খুলেই, আচমকা অরির সেই নরম উন্মুক্ত বুকের ঠিক মাঝখানে ঘুমের ঘোরেই বেশ জোরে এক কামড় বসিয়ে দিল!

“আআআহহহ…”
সারিমের সেই অতর্কিত ধারালো দাঁতের কামড়ে অরি এক গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠল। ব্যথার তীব্রতায় ওর চোখ দিয়ে জল ছিটকে বেরিয়ে এলো।নিজের দুই হাত দিয়ে সারিমের মাথাটা চেপে ধরল অরি। কামড়ের জায়গাটা যেন এক নিমেষে পুড়ে যাওয়ার মতো জ্বলতে শুরু করেছে।
সারিম এবার অরির বুক থেকে মুখটা সামান্য তুলল।চোখ দুটো আধো-বোজা, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি।সে অরির ফর্সা, যন্ত্রণায় লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে হুমকি দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
_“আরেকবার যদি দূরে সরতে বলেছ চন্দ্রিমা, তবে সে বার শুধু কামড় নয়, ডাইরেক্ট চিবিয়ে খেয়ে ফেলব তোমাকে! তখন আর রক্ষা পাবে না।”
অরি নিজের এক হাত দিয়ে বুকের সেই ব্যথার জায়গাটা চেপে ধরে চোখের জল মুছল।সারিমের এই উগ্র আর পাষাণ রূপ দেখে ভেতরে ভেতরে কাঁপতে কাঁপতে ক্ষোভ মেশানো গলায় বলল,

_“আপনি… আপনি খুব খারাপ!সারিম, বাজে লোক একটা!”
সারিম অরির সেই ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে আবার একটু হাসল।সেই হাসিতে এক অদ্ভুত মাদকতা।সারিম অরির গালের ওপর নিজের বুড়ো আঙুলটা আলতো করে ঘষে দিয়ে বলল,
_“আই নো… তোমার জন্য না হয় একটু বেশিই খারাপ হতে রাজি আছি। সো, চুপচাপ সোজা হয়ে শুয়ে থাকো।”
_“আমি আপনাকে স্বামী মানি না! আপনার কোনো কথাই আমি শুনব না।”
সারিম এবার অরির দিকে আরও একটু ঝুঁকে এলো। ওর চাউনিটা এক নিমেষে এত গম্ভীর আর থমথমে হয়ে গেল যে পুরো ঘরের তাপমাত্রা যেন কমে এলো।সে অরির কানের কাছে নিজের ঠোঁট দুটো ঠেকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা, হিমশীতল গলায় বলল,

_“মানো না তো? ঠিক আছে, তাহলে সেই পরীক্ষাটা বাতিল করে,তোমাকে ফেল করিয়ে দেই? কি বলো!”
সারিমের মুখের এই ‘ফেল করিয়ে দেওয়া’ হুমকিটা শোনা মাত্রই অরির বুকের ভেতরটা ভয়ে ধক করে উঠল।অরি এক নিমেষে একদম চুপ হয়ে গেল।সে নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে রইল।
অরিকে এভাবে ভয়ে কুঁকড়ে চুপ হয়ে যেতে দেখে সারিমের ঠোঁটের কোণে এক বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল।অরির ভয় পাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বেশ মজা পেল।
এরপর সারিম আবার নিজের আগের জায়গায় ফিরে গেল। অরির বুকের সেই তপ্ত, নরম সুবাসিত উপত্যকায় নিজের মুখটা গভীর ভাবে ডুবিয়ে দিল।সারিম অরির বুকের ভেতর মুখ গুঁজে, ওভাবেই বাচ্চাদের মতো করে খেতে খেতে এক পরম সুখে ও শান্তিতে চোখ দুটো বুজে ফেলল।

_”তুমি এখনো চোখ খুলছো না কেন? আর কতো? আর কতোদিন এভাবে মরার মতো এই বেডে পড়ে থাকবে তুমি? এতগুলো বছর ধরে এখানে শুয়ে আছ, একটাবারের জন্যও তোমার কোনো রেসপন্স পাচ্ছি না আমি!”
অনুপমার বুক লক্ষ্যহীন ক্ষোভে ওঠানামা করছিল। কিন্তু তার এই তীব্র চিৎকারেও বিছানায় শুয়ে থাকা মধ্যবয়সী মহিলাটির মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। সে যেমন ছিল, তেমনই নিশ্চল, নিস্পন্দ। হসপিটালের সাদা দেয়ালগুলোতে অনুপমার কান্নার মতো শোনানো সেই চিৎকার বাড়ি খেয়ে আবার তার বুকেই আছড়ে পড়ল। ঘরের প্রতিটি কোণ যেন অনুপমার অসহায়ত্বকে ব্যঙ্গ করছিল।
ঠিক তখনই পাশ থেকে ডাক্তার অত্যন্ত মৃদু আর শান্ত গলায় বলে উঠলেন,
_”ম্যাম, প্লিজ… ওনাকে একটু সময় দিন। রোগীর ভেতর থেকে রিকভার করতে কিছুটা সময় দরকার। এমনিতেই উনি দীর্ঘ চৌদ্দ বছর যাবত কোমায় ছিলেন। শরীর আর মস্তিষ্ক—দুটোই এখন ভীষণ ক্লান্ত। হুট করে ওনাকে পুশ করবেন না।”

ডাক্তারের এই সান্ত্বনা অনুপমার জ্বলন্ত আগুনে যেন ঘৃতাহুতি দিল। সে এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের দিকে রক্তচক্ষু মেলে তাকাল। হিংস্র বাঘিনীর মতো গর্জে উঠে বলল,
_”তোরা ডাক্তার কেন হয়েছিস শুনি? এত টাকা ঢালার পরেও তোরা এই মহিলার জ্ঞান ফেরাতে পারছিস না! আমাদের টাকা কি ভেসে এসেছে? চৌদ্দ বছর পর যখন কোমা ভাঙল, তখনো তোদের এই এক অজুহাত-সময় দিন, সময় দিন! তোদের এই অপদার্থতার শেষ কোথায়?”
ডাক্তার কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু অনুপমা তাকে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিল। তার চোখ-মুখ দিয়ে তখন রাগের ফুলকি ছুটছে।
_”আর একটা কথাও বলবে না। জাস্ট গেট আউট! বেরিয়ে যাও এই কেবিন থেকে! তোমাদের মতো অপদার্থ ডাক্তারদের মুখ আমি আর দেখতে চাই না। এক্ষুনি যাও!”
অনুপমার চণ্ডী মূর্তির সামনে ডাক্তার আর দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেলেন না। অত্যন্ত বিব্রত আর ক্ষুণ্ণ মনে তিনি কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
ডাক্তার চলে যেতেই অনুপমা আবার ঘুরে দাঁড়াল সেই নিথর বিছানাটার দিকে। এবার তার গলার আওয়াজ আরও চড়ে গেল, দেয়াল ভেদ করে যাওয়ার মতো তীব্রতায় সে বলল,

_”আমি জানি তুমি শুনতে পাচ্ছো সব!তোমার চোখ না খুললেও মস্তিষ্ক এখন পুরোপুরি সজাগ। তুমি কি শুনতে পাচ্ছো আমার কথা? শুনতে পাচ্ছো?”
একটু থামল অনুপমা। উত্তরের আশায় নয়, বরং তার পরের কথাগুলোর বিষাক্ত হুল ফুটিয়ে দেওয়ার জন্য। সে একটু ঝুঁকে এল মহিলাটির মুখের কাছে। ঠোঁটে এক চিলতে ক্রূর হাসি ফুটিয়ে আবার বলল-
_”তোমার আরিশান… অন্য একজনকে বিয়ে করে নিয়েছে। হ্যাঁ, ঠিকই শুনছ-তোমার সেই চিরকালের জায়গাটা সে আজ অন্য একজনকে দিয়ে দিয়েছে। সে এখন তার নতুন জীবনে, নতুন বউকে নিয়ে ভীষণ সুখে আছে। একবার চিন্তা করে দেখো, তোমার সেই আরিশান-যে কিনা তোমার শত অন্যায়, শত অপরাধ জানার পরেও তোমাকে অন্ধের মতো ভালোবেসেছিল! তোমার পাশে থাকার জন্য, তোমার একটুখানি ভালোবাসা পাওয়ার জন্য যে একদিন তোমার পা অব্দি ধরেছিল… আজ সে অন্য কারোর সঙ্গে সুখে সংসার করছে। তোমার জন্য তার মনে আর কোনো জায়গা নেই!”

অনুপমা বুক ভরে শ্বাস নিল। সে আশা করেছিল এই চরম সত্যটা শুনলে হয়তো মহিলাটির পাথুরে শরীরে কোনো কম্পন দেখা দেবে। কিন্তু না, হসপিটালের মনিটরের একঘেয়ে টিক-টিক শব্দ ছাড়া আর কোনো প্রত্যুত্তর এল না।
মহিলাটির এই নীরবতা অনুপমার ভেতরের জেদ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছিল। তার গলার ক্ষোভ এবার রূপ নিল তীব্র আকুতি আর যন্ত্রণায়। সে প্রায় ভেঙে পড়ে বলল,
_”প্লিজ… এবার অন্তত উঠে পড়ো। তোমার এই পড়ে থাকার জন্য, তোমার এই নীরবতার জন্য আমার সারিম আজ অন্য কারো হয়ে গেছে! কি করিনি আমি ওর জন্য? বলো, কী করা বাকি রেখেছি? নিজের আসল পরিচয় বদলেছি, ওর বাড়ির কাজের মেয়ে হয়ে দিনের পর দিন মুখ বুজে খেটেছি। ওর মনে আমার প্রতি একটুখানি ফিলিংস জাগানোর জন্য প্রতিনিয়ত নিজেকে ছোট করেছি, অপমানিত হয়েছি… তবুও তোমার মন গলছে না?”
বাতাসে কেবল অনুপমার ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। কোনো কথা এল না ওপাশ থেকে। কোনো আঙুল নড়ে উঠল না।
অনুপমার ভেতরের সবটুকু ধৈর্য এবার শেষ সীমায় পৌঁছে গেল। তীব্র অভিমানে তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল।সে আর এক মুহূর্তও এখানে থাকবে না।যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই, আচমকা এক চরম আক্রোশে অনুপমা বেডের লোহার রেলিঙে একটা জোরে ধাক্কা দিল। ধাতব শব্দে কেঁপে উঠল পুরো কেবিন।
যেতে যেতে পেছন ফিরে সে তীব্র ঘৃণায় বলে গেল,

_”ঠিক আছে, তুমি থাকো শুয়ে এভাবে মরার মতো! তোমার আরিশান জাহান্নামে যাক, জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাক, আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি আমার সারিমকে একাই জয় করে নেব। নিজের সব অপমান, সব কষ্টের প্রতিশোধ আমি একাই বুঝে নেব। কারো দয়া আমার লাগবে না!”
কথাটা শেষ করেই অনুপমা আর পেছন ফিরে তাকাল না। ঝড়ের বেগে কেবিনের দরজাটা টেনে সে করিডোর দিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেল।
কেবিনটা আবার আগের মতোই নিঝুম হয়ে গেল। শুধু মনিটরের হৃদস্পন্দনের গ্রাফটা এতক্ষণ ধরে চলা উত্তেজনায় সামান্য একটু চঞ্চল ছিল।অনুপমা চলে যাওয়ার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পর… কেবিনের সেই নিথর নীরবতা চিরে বেডে শুয়ে থাকা মহিলাটির বন্ধ চোখের পাতা দুটো সামান্য নড়ে উঠল, যেন ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে থাকা কোনো এক সত্তা ছটফট করে চোখের পর্দা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। হসপিটালের সাদা চাদরের ওপর রাখা তার ডান হাতের অবশ আঙুলগুলো… খুব ধীর গতিতে, এক মিলিমিটার করে নড়ে চাদরটাকে খামচে ধরার চেষ্টা করল। চৌদ্দ বছরের জড়তা ভেঙে এক জীবন্ত প্রতিবাদের ইঙ্গিত দিয়ে চামড়ার নিচে সুপ্ত শিরাগুলো যেন নতুন করে জেগে উঠতে শুরু করল।

ভোরের আলো ফুটতেই পাখির কলকাকলিতে জেগে উঠতে শুরু করেছে ‘সুখ কুঞ্জ’। গ্রামীণ মেঠো পথ ধরে ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি, তবে সর্ষে খেতের ওপাশ থেকে সূর্যটা আড়মোড়া ভেঙে পুব আকাশে উঁকি দিচ্ছে। মরা বাড়ির সেই থমথমে আর গম্ভীর বিষাদের রেশ ধরে রেখেই বাড়ির ভেতর সকালের কাজকর্মের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই ওপর তলার করিডোরে ধীর পায়ে হেঁটে এলো ফুল।গায়ে একটা সুতি ওড়না জড়ানো,চোখে-মুখে একরাশ বিষণ্ণতা স্পষ্ট। ফুল এসে দাঁড়াল সারিমের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটা অজানা যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল তার। দীর্ঘশ্বাস চেপে সে দরজার কাঠের কপাটে আলতো করে তিনবার নক করল,

দরজার ওপার থেকে কোনো সাড়া শব্দ এলো না। আসবেই বা কীভাবে? ঘরের ভেতরে তখনো সারিম অরির নরম বুকের ওপর নিজের সমস্ত ভার সঁপে দিয়ে, এক পরম নিশ্চিন্তে গভীর ঘুমে মগ্ন। অরির শরীরের সেই চেনা, মাতাল করা সুবাসে সারিমের ঘুমটা যেন আরও বেশি গাঢ় হয়ে বসেছে।
তবে দরজায় করা সেই কাঠের খটখট আওয়াজটা অরির কান এড়াতে পারল না। হালকা ঘুমে থাকা অরি দরজার আওয়াজটা শোনা মাত্রই ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকাল। চোখ খোলামাত্রই ও নিজের বুকের ওপর সারিমের সেই ভারী চওড়া অবয়বটা দেখে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সারিমের তপ্ত নিঃশ্বাস তখনো অরির গলায় আছড়ে পড়ছে। তার একটা হাত অরির কোমরটা লতার মতো শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে।
অরি দরজার ওপার থেকে ফুলের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল,

_“সারিম ভাই… দরজাটা খুলুন ”
অরি এবার আর দেরি করা ঠিক মনে করল না।নিজের দুই হাত দিয়ে সারিমের কাঁধটা ধরে মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে অত্যন্ত নিচু আর ব্যস্ত গলায় ফিসফিসিয়ে বলল,
_“এই যে… শুনছেন? উঠুন না প্লিজ! দরজায় কে যেন নক করছে। কেউ এসেছে, প্লিজ একটু সরুন!”
সারিম ঘুমের ঘোরেই একটা অসন্তোষের গোঙানি তুলল। ওর বাহুবন্ধনটা অরিকে আরও একটু নিজের দিকে টানতে চাইল, কিন্তু অরি এবার নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সারিমের সেই শক্ত হাতটা নিজের কোমর থেকে সরিয়ে দিল। অরির এই অনবরত ধাক্কাধাক্কিতে সারিম কিছুটা বিরক্ত হয়ে অরির বুক থেকে নিজের মুখটা সরিয়ে নিল।এরপর সে পাশ ফিরে, বিছানার ওপর একদম উপুড় হয়ে শুয়ে নিজের চওড়া পিঠটা উঁচিয়ে আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। ওর উন্মুক্ত, ফর্সা পিঠে সকালের আবছা আলো পড়ে এক পুরুষালী আভা তৈরি করছিল।
সারিমের সেই লৌহকঠিন বাহুবন্ধন থেকে ছাড়া পেয়ে অরি একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও খাট থেকে নেমে নিজের গায়ের শার্টের বোতামগুলো কোনোমতে হাতড়ে ঠিক করার চেষ্টা করল। কিন্তু বাইরে আবার নক করার শব্দ হতেই অরি আয়নার সামনে যাওয়ার সময় পেল না। তড়িঘড়ি করে, চুলগুলো কোনোমতে হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে ও গিয়ে খট করে দরজার খিলটা খুলে দিল।

দরজাটা খুলতেই অরির চোখ গিয়ে পড়ল দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ফুলের ওপর। ফুল অরি দরজা খোলার সাথে সাথেই ওর চোখ দুটো কেমন যেন স্থির হয়ে গেল। সে অরির দিকে এক অদ্ভুত, সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
ফুলের বুকের ভেতরটা অরিকে এই অবস্থায় দেখার পর যেন এক নিমেষে দুমড়ে-মুচড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিল! অরির ঠোঁট দুটো সামান্য ফোলা, গাল দুটো ভোরের আলোয় লালচে হয়ে আছে, আর চুলগুলো বড্ড অবিন্যস্ত।দরজার সামান্য ফাঁক গলে ভেতরের খাটের দৃশ্যটা ফুলের চোখে একদম স্পষ্ট ধরা পড়ছিল। সেখানে ওর স্বপ্নের পুরুষ, ওর সারিম ভাই উন্মুক্ত গায়ে বিছানায় উপুড় হয়ে বড্ড আয়েশ করে ঘুমিয়ে আছেন। যে পুরুষকে ফুল আজীবন দূর থেকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার চোখে দেখে এসেছে, সেই পুরুষ আজ অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে ,একই চাদরে এভাবে বিলীন হয়ে আছে এই দৃশ্যটা ফুলের কিশোরী মনের সমস্ত রঙিন কল্পনাকে এক চিলতে কাঁচের মতো টুকরো টুকরো করে দিল।
ফুলকে ওভাবে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে নিজের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে অরি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। ও নিজের গলার স্বর কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করল,

_“কী হয়েছে ফুল? কিছু বলবে?”
ফুল নিজের ভেতরের তীব্র ঈর্ষা আর কান্নার বেগটাকে কোনোমতে গিলে ফেলল। ওর কণ্ঠস্বরটা কেমন যেন চেরা শোনাল।সে অরির দিক থেকে চোখ সরিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,
_“নিচে মা খাবার খেতে ডাকতেছেন আপনাদের। সবাই ডাইনিংয়ে বসছে।জলদি চলে আসবেন।”
অরি একটু জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
_“আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি যাও,আমরা ফ্রেশ হয়ে এক্ষুনি আসছি।”
কথাটা বলেই অরি যেই না লজ্জা আর অস্বস্তি এড়াতে দরজার কপাটটা বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনই ফুল হঠাৎ করে আবার মুখ তুলল।চোখ দুটোতে অদ্ভুত অবজ্ঞা আর তীক্ষ্ণতা মিশ্রিত চাউনি। সে অরির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ গলায় বলে উঠল,

_“নিচে যাওয়ার আগে… আপনার জামাটা একটু ঠিক করে আসবেন।”
কথাটা শেষ করেই ফুল আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। ওর চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই সে ঝটকা মেরে ঘুরে হনহন করে সিঁড়ির দিকে চলে গেল।
ফুলের সেই শেষ কথাটা শুনে অরি আকাশ থেকে পড়ল। ও ভ্রু কুঁচকে নিজের শরীরের দিকে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই লজ্জায়,ওর পুরো ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে উঠল!
তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলতে গিয়ে সে খেয়ালই করেনি-ওর গায়ের শার্টের ওপরের প্রায় তিন-চারটে বোতাম একদম খোলা!সারিমের রাতের সেই হিংস্র কামড় আর টালবাহানায় ওর ভেতরের অন্তর্বাসটা একদম স্পষ্ট আর উন্মুক্ত হয়ে অরির বুকের সুডৌল খাঁজটাকে মেল ধরছিল।শুধু তাই নয়, অন্তর্বাসের এক পাশটা সামান্য সরে গিয়ে সারিমের সেই রাতের ধারালো দাঁতের লালচে কামড়ের দাগটা স্পষ্ট হয়ে জেগে আছে,যা যে কেউ দেখলে এক পলকেই বুঝে নিবে যে গত রাতে এই বন্ধ ঘরের ভেতর কী বয়ে গেছে!
অরি এক হাত দিয়ে নিজের কপালটা চেপে ধরে ঘরের ভেতরের দিকে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।নিজের ওপরই প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল তার। এই লোকটার জন্য আজ ও একটা অন্য মেয়ের সামনে এভাবে লজ্জায় পড়ে গেল!

আরিশান মৃধার রুমে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে জেবা। ওর ঘুমের ভঙ্গিটা বড্ড অদ্ভুত, একদম ছোট ছোট বাচ্চাদের মতো। ঘুমের ঘোরে বিছানাময় জায়গা পরিবর্তন করতে ওর এক মুহূর্তও সময় লাগে না। কখনো বালিশ মাথার নিচে, তো কখনো তা বুকের নিচে চেপে ধরে পুরো খাটের অবস্থা বারোটা বাজিয়ে রাখাটাই যেন ওর চিরাচরিত স্বভাব।
গত রাতে তীব্র পিরিয়ড ক্র্যাম্পের ব্যথায় যখন জেবা ছটফট করছিল,তখন আরিশান মৃধা ওকে কোলে তুলে নিয়েছিলো।প্রায় ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় ধরে লোকটা জেবার শরীরটা বুকে নিয়ে ঘরের এপাশ-ওপাশ হেঁটে বেরিয়েছেন। ওনার বুকের ওম আর নিরাপদ আশ্রয়ে অবশেষে যখন জেবা শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল, তখন ওনি পরম দ্বায়িত্বে ওকে খাটে শুইয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে ওনার নিজের শরীর ও মনের ওপর এক মস্ত বড় ক্লান্তির পাহাড় ভর করেছিল। সব মিলিয়ে ওনি কখন যে খাটের পাশে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে, খাটের ওপর মাথা এলিয়ে দিয়ে জেবাকে পাহারা দিতে দিতে নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছেন, তা ওনার নিজেরও খেয়াল নেই।
এদিকে জেবা নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ঘুমের ঘোরে পুরো খাটে চক্কর কেটে ফেলেছে।ওর একটা পা আরিশান মৃধার মাথার চুলের ওপর ছড়ানো, আর অন্য পা-টা একদম অবলীলায় ওনার ফর্সা গাল এবং ঠোঁটের ওপর চেপে বসে আছে।

ঠিক তখনই আরিশান মৃধার চোখের পাতা দুটো সামান্য কেঁপে উঠল। ওনার অবচেতনে কেমন যেন একটা ভারী আর অদ্ভুত স্পর্শ অনুভূত হচ্ছিল। ওনি ধীরে ধীরে চোখ মেললেন। কিন্তু চোখ মেলা মাত্রই সামনের দৃশ্য দেখে,ওনি এক নিমেষে স্তম্ভিত, পুরোপুরি তাজ্জব বনে গেলেন!
ওনার মুখের ওপর, ঠোঁটের কোণে আর মাথার কাঁচাপাকা চুলের অন্দরে অত্যন্ত আয়েশ করে দুটো ফরসা নরম পা চেপে বসে আছে! আর সেই পায়ের মালকিন তখনো খাটের ওপর মুখ হাঁ করে বাচ্চাদের মতো ঘুমে বিভোর।
আরিশান মৃধা যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বিস্ময় আর ধাক্কার এক শেষ সীমায় গিয়ে ওনার পুরো শরীরটা শক্ত হয়ে গেল। ওনি আরিশান মৃধা! ওনার ব্যক্তিত্ব,ওনার নিজস্ব কিছু কঠিন নিয়মের মেনে চলে।জীবনে অত্যন্ত শুচিবায়ুগ্রস্ত আর নিয়মানুবর্তী একজন মানুষ। ওনার ফেসে কেউ হাত দেবে, ওনার শরীর কেউ ওভাবে স্পর্শ করবে-এটা ওনি জাগ্রত অবস্থায় তো দূর, কল্পনায়ও কখনো সহ্য করতে পারেন না।জীবনে ওনি কেবল একজন নারীকেই ভালোবেসেছিলেন, সে তার প্রয়াত স্ত্রী আনতারা মৃধা। আনতারার মতো অত আদরের, অত সোহাগের মানুষটাও ওনার জীবদ্দশায় কখনো আরিশান মৃধার মাথায় বা মুখে পা ছোঁয়াতে পারেনি, ওনার সেই পৌরুষের দাপটের সামনে সবসময় এক ধরনের সমীহ বজায় রেখে চলেছে।

আর আজ? এই আঠারো-উনিশ বছরের একটা কচি মেয়ে ওনার জীবনের সমস্ত নিয়ম,এক নিমেষে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওনার সহ্যের সীমার বাইরের কাজগুলোও বড্ড অবলীলায় করে বসে আছসে!
কিন্তু সবচেয়ে বড় আশ্চর্য আর বিস্ময়ের বিষয় হলো অন্য জায়গায়। আরিশান মৃধা নিজের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনটা টের পেয়ে নিজেই শিউরে উঠলেন। ওনার তীব্র আত্মসম্মান আর শুচিবায়ুগ্রস্ত মনটা যেখানে এই মুহূর্তে জেবাকে লাথি মেরে সরিয়ে দেওয়ার কথা, সেখানে ওনার অবাধ্য মনটা এক অদ্ভুত মোহে আচ্ছন্ন হয়ে আছে! ওনার মনটা যেন ভেতরে ভেতরে তীব্রভাবে চাচ্ছে জেবার এই নরম পায়ের স্পর্শটা ওভাবেই ওনার গালে, ওনার ঠোঁটে আর চুলে লেগে থাকুক। ওনার মন ওনার নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই এই নিষিদ্ধ স্পর্শটাকে বড্ড সুন্দরভাবে গ্রহণ করে নিচ্ছে, বিন্দুমাত্র বাধা দেওয়ার কোনো তাগিদ অনুভব করছে না ওনার ভেতরের পুরুষ সত্তা।

_‘এসব কী হচ্ছে আমার সঙ্গে?’
আরিশান মৃধা নিজের মনেই এক তীব্র চাবুকের আঘাত অনুভব করলেন। কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঠান্ডা ঘাম ঝরে পড়ল ওনার।নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেন,
_‘তুই কি তোর বিবেক হারিয়ে ফেলেছিস আরিশান? একটা বাচ্চার মতো মেয়ের এই অবাধ্যতাকে তুই এভাবে উপভোগ করছিস? না, এটা হতে পারে না! এটা আর মানা যায় না!’
নিজের ভেতরের তীব্র অপরাধবোধ আর জেবার প্রতি জন্মানো সেই অদ্ভুত, অলিখিত টানটাকে ধামাচাপা দিতে আরিশান মৃধা এবার কঠোর হলেন। ওনার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও, ওনি নিজের মনকে জোর করে শাসন করলেন। অত্যন্ত সাবধানে, যেন জেবার ঘুমটা ভেঙে না যায়, ওনি নিজের কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে জেবার পা দুটো ওনার মুখ আর চুলের ওপর থেকে সরিয়ে খাটের ওপর নামিয়ে রাখলেন।
জেবা পা সরাতেই ঘুমের ঘোরে একটু উঁউঁ শব্দ করে পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।আরিশান মৃধা আর এক সেকেন্ডও সেই খাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ মনে করলেন না।দ্রুত মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ওনার বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে।সোজা পা চালিয়ে বারান্দার দিকে চলে এলেন এবং দরজাটা টেনে দিলেন।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২০

বারান্দার রেলিংটা দু-হাতে শক্ত করে চেপে ধরে ওনি ভোরের হিমশীতল হাওয়া নিজের ফুসফুসে টেনে নিলেন। ওনার চোখ দুটো তখনো এক অজানা আশঙ্কায় আর তীব্র ঝড়ে কাঁপছিল।ওনি বুঝলেন, এই মেয়েটা ধীর ধীরে ওনার সমস্ত লৌহকঠিন দুর্গ ভেঙে ওনার মনের অন্দরে হানা দিচ্ছে, যা ওনার জন্য এক মস্ত বড় বিপদের সংকেত!

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here