Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৮

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৮

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৮
মেহজাবিন নাদিয়া

সারিমের কথা শুনে অরি সশব্দে একটা ঢোক গিলল। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনের গতি যেন চারগুণ বেড়ে গেছে। লোকটার চোখের ওই গাঢ় চাউনি আর ঠোঁটের কোণের বাঁকা হাসি দেখে ও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে নিল-সারিম এবার নির্ঘাত ওকে বাসর করার দাবি তুলবে! এতদিন নানা বাহানায় অরি সারিমকে এড়িয়ে গেছে, কিন্তু আজ এই ঘোর লাগা পরিবেশে, নিজেরই ভুলে ও লোকটার বাঘের খাঁচায় এসে ঢুকেছে। অরি মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে প্রস্তুত করল। রেজাল্টের জন্য না পারতে ও রাজি হয়ে যাবে আজ।আমতা আমতা করে অরি সারিমের শার্টের কলারটা মুঠোয় পুরে মুখ নিচু করে বলল,

_”কী… কী ঘুষ চান?”
অরির ধারণা ভুল প্রমাণ করে সারিম তেমন কিছুই বলল না।সে অরির থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল,
_”গতকাল ওভাবে আমাকে ইগনোর করছিলে কেন?কী হয়েছিল তোমার?”
সারিমের মুখে হুট করে এই প্রশ্ন শুনে অরি মহা ফ্যাসাদে পড়ে গেল! ও যেন আকাশ থেকে পড়ল। ওই আহিলা নামের মেয়েটার মেসেজের কথা ও কোনোভাবেই সারিমকে বলবে না_মনে মনে এই প্রতিজ্ঞা আগেই করে রেখেছে। নিজের আত্মসম্মানে বাধে ওর।অরি মুখটা শক্ত করে অন্যদিকে ঘুরিয়ে জেদি গলায় বলল,
_”বলব না!”
_”বলবে না মানে?” সারিম ভ্রু কুঁচকাল।”
_”বলব না মানে বলব না!”
_”না তোমাকে বলতে হবে”
অরির নিজের জায়গায় অটুট রইল, বলল।
_”বলব না বলছি তো।দরকার পড়লে.. আজ সত্যি সত্যি আপনাকে বাসর করতে দেব, তবুও ওই কথা বলব না। ব্যস!”

সারিম থমকে গেল। ওর চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার জোগাড়।কৌতূহল এবার বহুগুণ বেড়ে গেল সারিমের।ওর বউয়ের মতো জিনের নানি,যে কিনা ছোঁয়া পেলেই ছ্যাদ করে উঠে,সে আজ আগেভাগে রেজাল্টের চক্করে পড়ে বাসর পর্যন্ত সেদে সেদে দিচ্ছে। তবুও মুখ থেকে সেই কথাটা বের করছে না! এর পেছনে যে কত বড় ঝামেলা লুকিয়ে আছে, তা সারিম খুব ভালো করেই বুঝতে পারল। সারিম মনে মনে ঠিক করল-যে করেই হোক, আজ বউয়ের পেটের কথা সে জেনেই ছাড়বে।
ও অরিকে নিজের শক্ত বুকের সাথে আরও তীব্রভাবে চেপে ধরে মাদকতাভরা গলায় বলল,
_”বাসরের অফারটা বেশ লোভনীয়। কিন্তু আফসোস, আমি আগে জবাব চাই। না বললে কিন্তু আমি রেজাল্ট দেখব না।”
অরি রেগেমেগে সারিমের চওড়া কাঁধে ছোট একটা কিল বসিয়ে বলল,

_”আপনার সমস্যাটা কী বলুন তো? আমি বলতে চাচ্ছি না, তবুও জোর করছেন বারবার?”
_”এটাই আমার সমস্যা বউ,” সারিম অরির কোমরে আঙুল দিয়ে সামান্য চাপ দিতেই অরি শিউরে উঠল। সারিম বলল,
_”তোমার পেট থেকে কথা আমি বের করবই।নাকি আমি এখন এখান থেকে উঠে চলে যাব? পরে কিন্তু রেজাল্টের জন্য কেঁদে কুল পেলেও মৃধা আবরার সারিম আর তোমার কথা শুনবে না।”
অরি এবার শেষমেষ রেজাল্টের চরম ভয়ে আর সারিমের অনড় জেদের কাছে হেরে গেল। নিজের ভেতরের জমে থাকা অভিমান আর চেপে রাখতে পারল না ও। চোখ দুটো বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে বলে দিল,
_”আপনার এক্স মেসেজ দিয়েছিল আমাকে!”
সারিম এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো, তারপরই ভাবল অরি হয়তো ওর সাথে মজা করছে বা বানিয়ে বলছে।সারিম ঠোঁট টিপে হেসে বলল,

_”ওহ, আচ্ছা! তারপর?”
অরির গলাটা কিছুটা ধরে এলো। সারিমের এই হালকা মনোভাব ওর বুকের ভেতরটা চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল।অরি চোখ তুলে চশমা ছাড়া সারিমের ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলল,
_”উনি আপনার জীবনে আবার ব্যাক করতে চান। আর আপনিও নাকি চান…”
সারিম এবারও অরির চোখের ভাষা বুঝতে না পেরে রসিকতা করে বলল,
_”ওহ, তাই? তারপর কী বলল তোমার সেই সতীন?”
সারিমের মুখে এমন পরিস্থিতিতে সতীন শব্দটা শুনে আর ওর এই নির্বিকার অবহেলা দেখে অরি নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না।হঠাৎ অরি বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। দুই হাতে মুখ ঢেকে ও সারিমের কোলের ওপরই ভেঙে পড়ল।
সারিম এবার চরমভাবে থতমত খেয়ে গেল।সে আকাশ থেকে পড়ল মাএ মনে হলো। ওর চঞ্চল, জেদি বউটা হুট করে এভাবে বাচ্চাদের মতো ডুকরে কাঁদছে কেন? সারিমের বুকের ভেতরটা মুহূর্তে মোচড় দিয়ে উঠল।চট করে নিজের দুহাতে অরির মুখটা আগলে ধরল।অরির ভেজা গাল দুটো আলতো করে চেপে ধরে ব্যাকুল হয়ে অরির চোখে-গালে চুমু খেতে লাগল। নিজের হাত দিয়ে ওর চোখের নোনা জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,

_”কী হলো বউ? এভাবে কাঁদছ কেন সোনা? আমি তো মজা করছিলাম। প্লিজ কাঁদো না!”
অরি নাক টেনে, হেঁচকি তুলল ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
_”আপনি একটা খুব খারাপ লোক! আমি… আমি থাকব না আপনার সঙ্গে। একদম থাকব না!”
অরি ওর সাথে থাকবেনা শুনেই সারিম কেমন অস্থির হয়ে উঠলো।চোখে মুখে স্পষ্ট ঘাবড়ানোর ছাপঁ।সে দুহাতে অরিকে একদম নিজের পাঁজরের সাথে পিষে ফেলার মতো করে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল,
_”জান… আমার জান, শান্ত হও প্লিজ! কী হয়েছে বলবে তো? কে কী বলেছে আমার চন্দ্রিমাকে?”
অরি নিজের চোখের জলটা সারিমের শার্টের হাতায় মুছে ওর চোখের দিকে সোজাসুজি তাকাল।অরির টলটলে চোখের কোণে তখনো পানি টলমল করছে।ও বাচ্চাদের মতো করে বলল,

_”আপনি ওই মেয়েটার কাছে যাবেন না, সারিম।”
_”কোন মেয়ে?” সারিম শান্ত ভঙ্গিতে শুধাল।
_”ওই আহিলা মেয়েটা! ওই যে আপনার এক্স গার্লফ্রেন্ড, ওর কাছে!”
অরি একনাগাড়ে বলে চলল, _”মেয়েটা আমাকে মেসেজে বলেছে-আপনি নাকি ওর কাছে চলে যাবেন আমাকে ফেলে। আপনি নাকি আমাকে প্রয়োজনে ব্যবহার করছেন এতদিন। আপনি আজও ওকেই ভালোবাসেন…”
অরির কথার মাঝপথেই সারিম ওর ঠোঁটের ওপর নিজের একটা আঙুল চেপে ধরে ওকে থামিয়ে দিল। সারিমের চোয়াল এতক্ষনে শক্ত হয়ে উঠল। ভেবেছিল অরি হয়তো ঐ কথাগুলো ওকে জাস্ট ঈর্ষান্বিত করার জন্য বলছে, তাই ও মজা নিচ্ছিল। কিন্তু বউয়ের এই অঝোর ধারায় ঝরে পড়া চোখের পানি আর বুকের ভেতরের কাঁপন দেখে সে এবার শতভাগ নিশ্চিত হয়ে গেল_ওর চন্দ্রিমাকে নিশ্চয়ই কেউ ওদের সম্পর্কের নামে বিষ ঢেলেছে। চরম মিথ্যা বলে ওর সরল বউটার মনটা ভেঙে দিয়েছে।কোন শকুনের নজর পড়ল ওর এই না হওয়া সংসারটার ওপর,তা সারিম মনে মনে ভালো করেই আঁচ করতে পারল।

সারিম অরির মাথায় হাত বুলিয়ে, ওর কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে অত্যন্ত আদুরে ভাবে দৃঢ় গলায় বলল,
_”তোমার কসম, বউ! এই মৃধা আবরার সারিমের জীবনে শুরু থেকে শেষ অব্দি একমাত্র নারী কেবল একজনই ছিল, আছে আর থাকবে-সে হলো অরিয়া ইবনাত অদ্রিজা।এই গোটা মহাবিশ্বে আমার চন্দ্রিমা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো নারী আমার অস্তিত্ব ছোঁয়া তো দূর, আমার কল্পনার জগতেও এক।”
অরি একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। ও বড় বড় চোখ করে সারিমের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সারিমের চোখের গভীরতা ওর গলার ওই অদ্ভুত সততা অরির বুকের সব মেঘ এক নিমেষে কাটিয়ে দিল। সে সারিমের জীবনের প্রথম এবং একমাত্র নারী-এই ধ্রুব সত্যটা ভাবতেই অরির মনের গহীনে এক অদৃশ্য খুশির দোলা নেচে উঠল।অদ্ভুত ভালো লাগায় ওর পুরো শরীর অবশ হয়ে এল।
সারিম অরির কপালে গভীর ভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে ওর মাথাটা আলতো করে টেনে নিজের চওড়া বুকের ওপর চেপে ধরল। অরির চুলে হাত বুলাতে বুলাতে সারিম ঠান্ডা, কঠিন গলায় বলল,
_”যে বা যারা তোমাকে আমার নামে এসব মিথ্যা গুজব শুনিয়েছে, তাদের আমি ছাড়ব না চন্দ্রিমা।তোমার স্বামীর আক্রোশ তারা সইতে পারবে না।”

অরি আর কিছুই বলল না। ওর ভেতরের সব ঝড় তখন শান্ত। ও চুপচাপ সারিমের উষ্ণ বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে ফেলল। সারিমের ভেজা টি-শার্টের ওপর দিয়ে ওর হৃদপিণ্ডের তীব্র ‘ধুকপুক’ শব্দটা অরির কানের পর্দায় এসে এক অদ্ভুত শান্তির সুর তুলছিল।সারিম খেয়াল করল-ওর বউটা কোনো প্রতিবাদ না করে,কোনো তর্ক না করে বিড়ালের বাচ্চার মতো গুটিসুটি মেরে ওর বুকের ভেতর লেপ্টে বসে আছে,সারিমের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মনকাড়া মুচকি হাসি ফুটে উঠল।শিক্ষামন্ত্রী আর যাই হোক, মানুষের মন পড়তে ভুল করে না।সারিম খুব ভালো করেই বুঝতে পারল-ওর এই চন্দ্রিমা নামের বিদ্যাসাগর বউটা মুখে স্বীকার না করলেও, মনে মনে ওকেও ভীষণভাবে ভালোবেসে ফেলেছে!
সারিমের বুক থেকে কিছুক্ষণ পর আস্তে করে মাথা তুলল অরি। ওর চোখে-মুখে এখনো সেই আগের ঘোর লাগা রেশ, কিন্তু তার মাঝেই ধক করে জেগে উঠল ঘুমন্ত আতঙ্কটা। ও সারিমের চোখের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে জিজ্ঞাসা করল,
_”রেজাল্ট… রেজাল্টের কথা যে বললেন এখন তা দেখান?”
অরির কথা শুনে সারিম মুচকি হাসল। পাশ থেকে নিজের ফোনটা তুলে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই ও অরিকে বলল,

_”রোল নাম্বার আর রেজিস্ট্রেশন নাম্বারটা দাও তোমার।”
অরি ধকধক করতে থাকা বুক নিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় নিজের রোল আর রেজিস্ট্রেশন নাম্বার বলল। সারিম ফোনের কি-প্যাডে দ্রুত তা টাইপ করে কাউকে একটা টেক্সট করে দিল। অরি একদৃষ্টে সারিমের ফোনের দিকে তাকিয়ে সবটা দেখছিল। ওর হাত-পাগুলো কেমন যেন অসাড় হয়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল রেজাল্টের তীব্র উত্তেজনায় ও এখনই জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে।সারিম অরির নার্ভাসনেসটা মুহূর্তেই ধরে ফেলল। ও একটা মৃদু হেসে অরিকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার জন্য বলল,
_”কুল বউ! এত চিন্তা কিসের? আমি জানি তুমি এমনিতেই এ+ পাবে নিশ্চিত। তাহলে এত ভাবছ কেন?”
অরি তবুও সারিমকে কিছু বলল না। ওর ভেতরের ছটফটানি আর ভয় এত বাড়ছিল যে,পারলে এখনি সারিমের বুকের পাঁজরের ভেতর ঢুকে যেত।অরি কিছু ক্ষণ পর পর খালি সারিমকে যত পারছে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে একদম মিশিয়ে নিচ্ছিল,যেন এই লোকটাই দুনিয়ার সব বিপদ থেকে ওকে আড়াল করতে পারে। সারিম বউয়ের এমন অদ্ভুত কাণ্ড দেখে ভেতরে ভেতরে একটু হাসল এবং পরম মমতায় ওর মাথায় হাত বুলাতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর হুট করেই সারিমের ফোনে একটা নোটিফিকেশন টোন বেজে উঠল।সারিম ফোনটা ওপেন করল। অরিকে একহাতে বুকে চেপে রেখেই ও ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কিন্তু পরমুহূর্তেই… ফোনের দিকে তাকানোর সাথে সাথে সারিমের পুরো মুখটা থমকে গেল! ওর চোখের চঞ্চলতা গায়েব হয়ে সেখানে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমে এল। আস্তে আস্তে, ভীষণ ধীর গতিতে অরির দিকে তাকাল সারিম।
সারিমের চোখের সেই চাউনি দেখেই অরি বুঝে গেল-ওর মনের ভেতর এতক্ষণ ধরে যে কু-ডাকটা ডাকছিল, সেটাই সফল হয়েছে।অরি আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে, লজ্জায় আর অপমানে আস্তে করে সারিমের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল।সারিম অরিকে এমন করতে দেখে একটু চমকাল। ওর নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। এক্ষুনি ও ফোনের স্ক্রিনে এটা কী দেখল? শিক্ষামন্ত্রী মৃধা আবরার সারিমের স্ত্রী,হয়ে তার এই রেজাল্ট!মান সম্মান আর কিছুই রাখলোনা বেচারার বউটা।
সারিম আর দেরি না করে ওই নাম্বারটির মালিককে ডিরেক্ট কল লাগাল। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই সারিম গম্ভীর, ঠান্ডা গলায় বলল,

_”রেজাল্টটা ভালো করে দেখে তারপর বলো। ভুলভাল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছ কেন?”
ওপাশের ব্যক্তিটি সারিমের গলার কঠিন স্বর শুনে ভয় পেয়ে গেল।সে অত্যন্ত বিনীতভাবে বলল,
_”সরি স্যার! আপনি লাইনে থাকুন, আমি পুনরায় চেক করছি।”
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। ওপাশ থেকে আবার আওয়াজ এলো,
_”স্যার, রেজাল্ট একদম ঠিক আছে। সিস্টেমে কোনো ভুল নেই। এটাই ওনার ফাইনাল রেজাল্ট।”
কথাটা শুনতেই সারিমের কান থেকে হাতটা আলগা হয়ে গেল, ফোনটা ধপ করে কোল ঘেঁষে নিচে পড়ে গেল। ও অবিশ্বাস্য চোখে অরির দিকে তাকাল।হাত দিয়ে অরির মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে আনতে চাইল, কিন্তু অরি ওর দিকে ভুলে ও তাকাল না।জেদ ধরে সারিমের বুকেই মুখ গুঁজে পড়ে রইল।
সারিম চরম হতাশ। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরিকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল। ডাইনিং চেয়ার ছেড়ে সারিম ধীর পায়ে বেডরুমে চলে এল। খাটের ওপর অরিকে বসিয়ে দিয়ে ও নিজের থেকে সম্পূর্ণ ছাড়িয়ে নিল। অরি চোরা মুখটা নিচু করে রইল, একবারের জন্যও সে সারিমের চোখের দিকে তাকাচ্ছিল না।সারিম অত্যন্ত গম্ভীর মুখে অরির সামনে বিছানায় বসল। ওর চোখের ধারালো দৃষ্টি অরির ওপর নিবদ্ধ করে জিজ্ঞাসা করল,
_”এটা কি সত্যিই?”

অরি কোনো কথা না বলে শুধু অপরাধীর মতো মাথা নাড়াল। তবে সারিমের দিকে তাকানোর সাহস পেল না।
সারিম দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে বলল,
_”আমার বিশ্বাস হচ্ছে না চন্দ্রিমা! তুমি… তাও এ মাইনাস (A-)? কিভাবে? হাউ ইম্পসিবল!”
অরি এবারও নিশ্চুপ। সারিম এবার ওর দিকে কিছুটা ঝুঁকে এসে জিজ্ঞাসা করল,
_”সারাদিন যে তুমি চশমা চোখে দিয়ে এত পড়াশোনা করতে, ওগুলো কি এটার জন্যই ছিল?”
অরি এবারও কোনো উত্তর দিল না। সারিম অরিকে এভাবে একনাগাড়ে চুপ থাকতে দেখে এবার চরম রেগে গেল। নিজের ভেতরের ইগো আর হতাশা সামলাতে না পেরে খাটের বেডসাইড টেবিলে হাতের সাহায্যে জোরে একটা বাড়ি দিয়ে গর্জে উঠল,
_”আনসার মি, ড্যাম ইট!”
টেবিলের ওপর সারিমের হাতের ওই প্রচণ্ড আওয়াজে অরি কিছুটা কেঁপে উঠল। আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না বেচারি। ভয়ে আর অপমানে ফুঁপিয়ে কেঁদে দিল সে।
অরিকে ওভাবে কাঁদতে দেখে সারিম সাথে সাথেই বিচলিত হয়ে পড়ল। ওর ভেতরের সব রাগ এক নিমেষে কর্পূরের মতো উবে গেল। বুঝতে পারল,ভয়ংকর একটা ভুল করে ফেলেছে। মেয়েটা এমনিতেই নিজের রেজাল্ট নিয়ে ভেঙে পড়েছে, তার ওপর ও একটু বেশিই কড়া কথা বলে ফেলেছে।
সারিম সাথে সাথে অরিকে টেনে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। ওর পিঠে হাত বুলিয়ে অত্যন্ত শান্ত ও ব্যাকুল কণ্ঠে বলল,

_”আই অ্যাম সরি বউ! সোনা, কাঁদে না… তোমার স্বামী ভেরি ভেরি সরি। প্লিজ স্টপ ক্রাইং!”
অরি তবুও সারিমের বুকে মুখ ঘষে ফুঁপিয়ে কেদেই চলেছে। সারিম এবার উপায় না পেয়ে অরির একটা ছোট নরম হাত নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। তারপর অরির ওই হাতটা দিয়ে নিজের গালে, মাথায় মারতে মারতে বলতে লাগল,
_”আমার ভুল হয়ে গেছে চন্দ্রিমা। আর কখনো তোমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলব না, প্রমিস। একদম সরি… তোমার যত ইচ্ছে আমাকে মারো, তবুও কাঁদবে না বউ। তোমার কান্নায় আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে!”
সারিমের পাগলামি আর আকুল কথাগুলো শুনে অরি অবাক হয়ে গেল। ও আলতো করে নিজের কান্না থামিয়ে লোকটার চোখের দিকে ফিরে তাকাল। ওর কান্নাতে এই লোকটার এতটা কষ্ট হয়? এটা ভাবতেই অরির বুকের ভেতর কেমন যেন এক অদ্ভুত, অচেনা ভালো লাগা দোলা দিয়ে গেল।
সারিম অরিকে শান্ত হয়ে ওর দিকে তাকাতে দেখে যেন এতক্ষণে বুকে স্বস্তি ফিরে পেল। ও একটা লম্বা শ্বাস নিল। এরপর বেড থেকে নেমে সোজা মেঝেতে অরির পায়ের নিচে বসে পড়ল। অরির ফর্সা পা দুটো টেনে নিয়ে নিজের কোলের ওপর রাখল। তারপর দুহাতে পা দুটো আলতো করে চেপে ধরে নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল,

_”ভয় পেয়েছিলে?”
অরি চোখ জোড়া পিটপিট করে ছোট করে বলল,
_”খুব বেশি!”
সারিম একটু হাসল।সে হাঁটু গেড়ে ওপরে উঠে এসে অরির কপালে একটা গভীর চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
_”আর হবে না। আমার দ্বারা এমন ভুল আর কখনো হবে না।”
অরি এতে কিছু বলল না। কেবল চশমা ছাড়া চোখ দুটো দিয়ে সারিমের মুখের রেখাগুলো দেখছিল। সারিম এবার একটু শান্ত হতেই ওর ভেতরের সেই আগের প্রশ্নটা আবার চাড়া দিয়ে উঠল। ভ্রু কুঁচকে অরির দিকে তাকাল। চোখে এবার স্পষ্ট সন্দেহ আর অবিশ্বাসের ঝিলিক।
গম্ভীর গলায় শুধাল,
_”তাহলে যে তুমি দিন-রাত এত পড়াশোনা করতে… ওইগুলো কি ছিল?”
অরি এবার একটু ম্লান হাসল। তারপর নিজের নাকটা একটু টেনে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল, যেন ও খুব সাধারণ একটা সত্য প্রকাশ করছে,

_”ওইগুলো তো আমি জাস্ট দেখানোর জন্য পড়তাম। আসলে পড়াশোনার আগা-মাথা আমি কিছুই পারতাম না।পরীক্ষায় ঘুষ দিয়ে অন্যের খাতা দেখে লিখতাম।”
সারিম পুরো হতবাক! ওর মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছিল না।যেন কোনো এলিয়েনের কথা শুনছে।সারিম ঢোক গিলে বলল,
_”তাহলে এসএসসিতে গোল্ডেন এ+ কেমনে পেলে, বউ?”
অরি এবার আর লজ্জা পেল না, বরং বেশ গর্বের সাথেই নিজের দুই কাঁধ ঝাঁকাল। বলল,
_”ঐ বছর ফেসবুকের একটা গ্রুপ ওয়েবসাইট থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। সেখান থেকে অনেক টাকা দিয়ে প্রশ্ন কিনে এনে মুখস্থ করে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আগের বছরের শিক্ষামন্ত্রী অন্য একজন দয়ালু মানুষ ছিল। কিন্তু এবার আপনি শিক্ষামন্ত্রী হওয়াতে… প্রশ্ন পাওয়া তো দূর, নকলের নাম শুনলেই মানুষ ভয়ে হেগে দিত!”
সারিম এবার নিজের মাথায় হাত দিয়ে বিছানার পাশে ধপ করে বসে পড়ল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্য আর চরম বিস্ময়ের হাসি ফুটে উঠল।বিড়বিড় করে বলল,

_”তোমার ভেতর এত বড় বড় প্রতিভা লুকিয়ে ছিল বউ, তা আমি আগে কেন জানলাম না!”
অরি সারিমের এই অসহায় অবস্থা দেখে হঠাৎ করেই ওর একদম কাছে সরে এল। খাটের কোণ ঘেঁষে এসে দুই হাত দিয়ে সারিমের টি-শার্টের কলারটা খামচে ধরল। তারপর নিজের মুখটা ওর খুব কাছে নিয়ে অত্যন্ত আদুরে, তেলমাখা গলায় বলল,
_”সারিম, শুনুন না… আমি না আপনার একমাত্র বিবাহিত বউ? আপনার চন্দ্রিমা? আপনার সব, তাই না?”
সারিম একটা ভ্রু উঁচিয়ে, বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল,
_”তো?”
অরির চোখে-মুখে এখন রেজাল্ট পরিবর্তনের ধান্দা চলছে।সে সারিমের কলারটা আরেকটু টেনে ধরে ফিসফিস করে বলল,
_”প্লিজ, আমার জিপিএ-টা একটু বাড়িয়ে দিন না! আমাকে যেকোনোভাবে একটা এ+ পাইয়ে দিন। নাহলে সবার সামনে, বিশেষ করে আপনার বাবার সবার সামনে আমার নাক কাটা যাবে! প্লিজ সারিম!”
সারিমের চোখ দুটো এবার চড়কগাছ হয়ে গেল। ও অরির কপালে একটা হালকা টোকা দিয়ে বলে উঠল,
_”এই মহিলা! তুই তো দেখছি আমাকে আস্ত একটা দুর্নীতিবাজ বানিয়ে ছাড়বি! এ+ দিয়ে তুই করবিটা কী শুনি?”

অরি দমে না গিয়ে সারিমের টি-শার্টের হাতা ধরে একটু টানল। ঠোঁট উল্টে বলল,
_”দেন না সারিম, একটা এ+ই তো চেয়েছি মাত্র। আমি না আপনার বউ হই?”
_”বউ হও আর যাই হও, আমি শিক্ষামন্ত্রী হয়ে এত বড় অনিয়ম আর দুর্নীতি কখনোই করতে পারব না।”
সারিম বেশ শক্ত গলায় জবাব দিল।
অরি মুখ ফুলিয়ে বলল,
_”কেন করতে পারবেন না? আপনার এক ক্লিকেই তো সব সম্ভব!”
_”কারণ আমার ডিকশনারিতে এইসব চুরির জায়গা নেই।”
সারিম অরির চশমাটা নাকের ওপর সোজা করে দিয়ে বলল,
_”এমনিতেই পরীক্ষার সময় তোকে একবার সুযোগ দিয়েছি, আর না। নিজের যোগ্যতায় যা কামিয়েছ, সেটাই খুশি মনে মেনে নাও ললনা।”
অরি এবার রীতিমতো ঘ্যানঘ্যান শুরু করে দিল,
_”আপনি এমন করছেন কেন বলুন তো? দিয়ে দিলে কী এমন ক্ষতি হবে আপনার? আমি শুধু একজনই তো চাচ্ছি!”

_”হ্যাঁ, তুই একজনই তো!” সারিম সোজা হয়ে বসে বলল,
_”তাহলে বাকিরা কী দোষ করেছে? যারা একটা এ+ এর জন্য দিন-রাত এক করে পড়াশোনার পেছনে নিজের জীবন লাগিয়ে দিয়েছে, তাদের সাথে এটা অন্যায় হবে না?”
অরি এবার বেশ যুক্তি দেখানোর ভঙ্গিতে বলল,
_”বাকিরা আর আমি কি এক হলাম নাকি? ওরা তো সাধারণ শিক্ষার্থী মাত্র!”
সারিম হেসেই ফেলল,
_”ও আচ্ছা! তাহলে তুমি কী? এলিয়েন?”
_”আমি এলিয়েন হতে যাব কেন? আমি তো আপনার একমাত্র বউ!”
অরি এবার একটু লাজুক হেসে, চোখ টিপে ফিসফিস করে বলল,
_”বাকিরা কি আমার মতো আপনাকে এন্টারটেইনমেন্ট দিতে পারবে নাকি, বলুন?”
সারিম এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ওর ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি ফুটে উঠল।ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_”কিসের এন্টারটেইনমেন্টের কথা বলছ শুনি, চন্দ্রিমা?”
অরি এবার পুরো লাল হয়ে চোখ দুটো নামিয়ে নিল। আঙুল দিয়ে সারিমের শার্টের একটা কোণা মোচড়াতে মোচড়াতে বলল,

_”ঐ যে… আপনি সারাক্ষণ আমার সাথে ওসব করেন… কী যেন বলে, লুচুগিরি! ওগুলো আর কে করবে শুনি?”
সারিম এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠল।সে অরির কোমরটা টেনে ধরে বলল,
_”ওগুলো তো আমার স্বামী হওয়ার অধিকার! ওগুলো এর মধ্যে কেন ঢোকাচ্ছিস?”
অরি এবার চরম রেগে গেল। লোকটাকে এত করে বোঝানোর পরেও, এই সালার ব্যাটা ওর কথা বুঝেও বুঝতে চাচ্ছে না! এত বড় পজিশনে থেকে বউয়ের জন্য এতটুকু সুপারিশ করতে পারছে না? অরি এক ঝটকায় সারিমের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
_”ঠিক আছে! এটাই মনে রাইখেন আপনি!”
কথাটা বলেই ও গটগট করে দরজার দিকে চলে যেতে নিল। সারিম খাটে হেলান দিয়ে মুচকি হেসে পিছন থেকে জিজ্ঞাসা করল,

_”কী মনে রাখব, বউ?”
অরি দরজার হাতল ধরে পিছন ফিরে তাকাওনি, যেতে যেতেই চিবুক শক্ত করে বলল,
_”আর একবার যদি আমাকে ছুঁতে এসেছেন না, মেরে হাত-পা ভেঙে দেব আপনার! জাস্ট গাড়ি বের করুন, আমি এখনই বাড়ি যাব!”
অরির শেষ কথাটা শুনে সারিমের ভেতরের এতক্ষনে পুরুষটা মুহূর্তে দমে গেল পুরোপুরি।বুঝল, এবার ও আসলেই একটু বেশি বেশি করে ফেলেছে। বউ তো ঠিকই বলেছে-ওর বউ আর বাকি সাধারণ শিক্ষার্থীরা কি এক নাকি? বউকে একটা এ+ দেওয়াই যায়, নয়তো দেখা যাবে রাগের চোটে বেচারার আর ইহকালেও বাসর করা হবে না! বাসরহীন জীবন কাটানোর চেয়ে সামান্য একটু সিস্টেম আপগ্রেড করা অনেক ভালো।
সারিম আর এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে খাট থেকে নেমে দ্রুত অরির কাছে চলে এল। পেছন থেকে ওকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল,

_”আচ্ছা বাবা, সরি! রাগ করে না চন্দ্রিমা। ঠিক আছে, তোমার এ+ একদম ১০০% কনফার্ম! আমি নিজেই সার্ভারে বলে দিচ্ছি।”
সারিমের মুখে এই ‘কনফার্ম’ শব্দটা শোনা মাত্রই অরির রাগ ধুলোয় মিশে গেল। খুশিতে চকচক করে ঘুরে তাকাল অরি,
_”সত্যি বলছেন তো?”
_”একদম সত্যি, আমার জান!” সারিম হেসে বলল।
অরি খুশিতে গদগদ হয়ে আবার সারিমকে টেনে নিয়ে আগের জায়গায় ফিরে এল। বিছানায় বসতেই সারিম আর দেরি না করে ধপ করে অরির কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল।চোখ বন্ধ করে একটা তৃপ্তির শ্বাস নিল।
অরিও আজ আর কোনো আপত্তি করল না।পরম যন্তে নিজের ছোট ছোট নরম আঙুলগুলো দিয়ে সারিমের চুলগুলোর মাঝে হাত চালিয়ে দিল,অরি আজ নিজ থেকেই সারিমের মাথা টিপে দিচ্ছে। সারিম তো কোল ঘেঁষে শুয়ে মহা খুশি! বউয়ের কাছ থেকে একটু-আাধটু এমন খাঁটি ভালোবাসা আর আদর পাওয়ার জন্য… শিক্ষামন্ত্রীর চেয়ারে বসে এই ছোটখাটো দুর্নীতি আসলে কিছুই না!

সন্ধ্যা সাতটা বাজে। চারপাশটা নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে গেছে, সাথে জানালার বাইরে ঝিরঝির করে একটানা বৃষ্টি হয়েই চলেছে। জেবা নিজের রুমে একা বসে আছে। একা একা ওর একদম ভালো লাগছে না। সেই সকালবেলা অরিটাকে সারিম কোলে করে নিয়ে কোথায় যে বেরিয়েছে, এখন পর্যন্ত তাদের ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই! স্বামীকে পেয়ে বান্ধবীটা ওকে এভাবে ভুলে গেল-ভাবতেই জেবার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল, রীতিমতো কান্না পেয়ে গেল ওর।
পরক্ষণেই আবার আরিশান মৃধার গম্ভীর মুখটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। জেবা বিছানায় পা গুটিয়ে বসে আপনমনে গাল ফুলিয়ে ভাবতে লাগল,_”এই লোকের হঠাৎ করে বাপ হওয়ার এত ইচ্ছে জেগেছে কেন, আমি তো সেটাই বুঝতে পারছি না!”
লোকটা সকালে যেভাবে আলটিমেটাম দিয়ে গেছে, জেবার মনে হয় না সে চেয়েও এবার পার পাবে। কিন্তু আসল সমস্যা তো অন্য জায়গায়। আচ্ছা, জেবা কীভাবে এখন লোকটাকে বলবে যে ওর বাচ্চা হতে নয়, বরং বাচ্চা ক্যারি করাতে প্রবলেম! এমনটা তো নয় যে জেবা বাচ্চা চায় না। বাচ্চাদের ওরও খুব ভালো লাগে। কিন্তু জেবার মূল সমস্যা হলো ওর অলসতা। নয় মাস পেটে একটা বাচ্চা ক্যারি করতে ওর বড্ড অলস লাগে! পেটে বাচ্চা নিয়ে ও এত নিয়ম-কানুন মেনে চলতে পারবে না। স্রেফ অলসতার কারণে একটা মেয়ে বাচ্চা নিতে চায় না-এটা এই মহাবিশ্বে একমাত্র জেবাকে দিয়েই সম্ভব!

অনেকক্ষণ একা একা ভাবাভাবি করার পর জেবার উর্বর মস্তিস্কে এখন আবার একটা নতুন বুদ্ধির উদয় ঘটেছে। ও মনে মনে ঠিক করল, ধুর! বাচ্চা একটা নিয়েই নেবে। নয়তো দেখা যাবে আরিশান মৃধা আবার কখন ওই আনতারা মৃধার কাছে চলে যায়, বলা তো যায় না! পুরুষ মানুষের মন, কখন কোন দিকে ঘোরে! এমনিতেই জেবা কত কষ্ট করে, কত সাধ্য-সাধনা করে এই বুইড়াকে নিজের করে পেয়েছে। এর মধ্যে নতুন সংসারটা এভাবে ভেঙে যদি ওর জামাই ওকে ছেড়ে দেয়, তাহলে এই অগাধ দুঃখ ও কই রাখবে? পদ্মা নদীতে বর্ষা এসে পানি এখন থৈথৈ করছে, জেবার ধারণা-ওর কপালে যদি জামাই-বিচ্ছেদ জোটে, তবে ওই পদ্মা নদীর পানিও জেবার চোখের জল ধরে রাখতে পারবে না। জেবা ওড়নার খুঁতটা দাঁত দিয়ে চেপে ধরে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, _”আরিশান মৃধা, তুমি নিজেকে যতই বাঘ ভাবো না কেন, একদিন যদি তোমাকে নিজের আঙুলের ইশারায় না নাচিয়েছি, তবে আমার নামও জেবা সুলতানা শেখ না!”
জেবা যখন এইসবে গভীর ভাবনার সাগরে ডুব দিয়ে ছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ ওর কানে কিছু একটা পড়ার খসখস করা হালকা আওয়াজ এল। আওয়াজটা ঠিক কিসের, তা দেখার জন্য জেবা কৌতূহল সামলাতে না পেরে রুম ছেড়ে বাইরে বের হলো। করিডোরে এসে এদিক-ওদিক তাকাল, কিন্তু তেমন কিছুই দেখতে পেল না।

আওয়াজের উৎস খুঁজতে ও হেঁটে আরেকটু সামনে এগিয়ে গেল। ঠিক সিঁড়ির কাছাকাছি আসতেই জেবা থমকে দাঁড়াল। নিচের অন্ধকারের দিকে লক্ষ্য করতেই সে বিস্ময়ে জমে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে আনতারা মৃধা! ওনার পরনে একটা ঢিলেঢালা কালো হুডি, মাথায় হুডির ক্যাপটা তোলা, মুখে কালো মাস্ক আর হাতে একটা বড় চটের বাজারের ব্যাগ। ব্যাগটা দেখতে বেশ ভারী মনে হচ্ছে।
জেবা মনে মনে প্রচণ্ড অবাক হলো। এই ঝড়-বৃষ্টির সন্ধ্যাবেলা, তাও সকালের ওই তুলকালাম কাণ্ডের পর ওনি এভাবে চোরের মতো লুকিয়ে কোথাও যাচ্ছেন? জেবার গোয়েন্দা মন চাড়া দিয়ে উঠল। ও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে একদম নিঃশব্দে, চুপিচুপি আনতারা মৃধার পিছু নিল।

আনতারা মৃধা ড্রয়িং রুম পার হয়ে সদর দরজা দিয়ে বাড়ির বাইরের বিশাল লনে এসে দাঁড়ালেন। জেবাও আড়াল ঘেঁষে ওনার পেছনে পেছনে বাইরে চলে এল। বৃষ্টির ছাঁট জেবার গায়ে এসে লাগছিল, কিন্তু ওর সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।জেবা দেখল, আনতারা মৃধা লন পার হয়ে মেইন গেটের বাইরে চলে গেলেন এবং কিছুক্ষণ হেঁটে একটু দূরে রাস্তার ধারে দাঁড়ানো একটা লাল রঙের প্রাইভেট কারের সামনে এসে থামলেন।
জেবা দূর থেকে ওই লাল গাড়িটা দেখামাত্রই চাবুক খাওয়ার মতো শিউরে উঠল। গাড়িটা চিনতে ওর এক সেকেন্ডও দেরি লাগল না। এটা তো ওর বাবার গাড়ি!জেবার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। ওর বাবার সাথে এই ডাইনি আনতারা মৃধার কী সম্পর্ক? ওনারা এই গোপনে, এই বৃষ্টির রাতে কেন দেখা করছেন? জেবা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল-আনতারা মৃধা তড়িঘড়ি করে সেই লাল গাড়ির পেছনের দরজা খুলে ভেতরে উঠে বসলেন। সাথে সাথেই গাড়িটি স্টার্ট নিল এবং বৃষ্টির পিচ্ছিল রাস্তায় ধুলো ও জল উড়িয়ে নিমেষের মধ্যে চোখের আড়াল হয়ে গেল।

আর জেবা ছাতা ছাড়া, ভেজা কাপড়ে রাস্তার ঠিক এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। ওর চোখের সামনে এক লহমায় কী থেকে কী হয়ে গেল, ও কিছুই মাথায় ঢোকাতে পারল না। এক গাঢ় রহস্যের মেঘ যেন ওর চারপাশটাকে ঘিরে ধরল।
রাত তখন প্রায় নয়টা বাজতে চললো। জেবা বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বাইরে বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে ওর মস্তিষ্কে তখনো সেই একই ভাবনা তীব্রভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে-ওর বাবার সাথে আনতারা মৃধার সম্পর্কটা আসলে কী? ও ভালো করেই জানে যে আরিশান মৃধা আর ওর বাবা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সেই সূত্রে আনতারা মৃধার সাথে বাবার একটা চেনা-পরিচয় থাকা খুবই স্বাভাবিক। তবুও জেবার মনে একটা খটকা কোনোভাবেই দূর হচ্ছে না। পরিচয় যদি ভালোই হবে, তবে এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে এভাবে চোরের মতো লুকিয়ে, মুখ মাস্কে ঢেকে দেখা করার কী দরকার ছিল? এর পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে।
জেবার ভাবনার মাঝে ঠিক তখনই আরিশান মৃধা অফিস থেকে মাত্র বাসায় ফিরলেন। পরিশ্রান্ত শরীরে ওনি সরাসরি জেবার রুমে প্রবেশ করেন। রুমে ঢুকেই বউকে ওভাবে খাটের মাঝখানে শুয়ে, আপনমনে আঙুল কামড়াতে কামড়াতে গভীর কিছু একটা ভাবতে দেখে ওনি শক্ত করে ভ্রু কুঁচকালেন। জেবা এতটাই মগ্ন ছিল যে ওনার আসার আওয়াজটুকুও লক্ষ্য করেনি।

আরিশান মৃধা একটু গলা ঝেড়ে মৃদু কাশির আওয়াজ দিতেই জেবা চমকে ওনার দিকে ফিরে তাকাল। আরিশান মৃধাকে ওভাবে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ও চটজলদি শোয়া থেকে উঠে সোজা হয়ে বসল।
আরিশান মৃধা জেবাকে আপাদমস্তক একবার ঠান্ডা চোখে দেখে নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,
_”তোমার এইচএসসির রেজাল্ট কী?”
জেবা হা করে তাকিয়ে থেকে বোকার মতো বলে উঠল,
_”কিসের রেজাল্ট?”
বলার পরমুহূর্তেই ওর মাথায় ধক করে বাড়ি মারল-আজ যে এইচএসসির রেজাল্ট দেওয়ার কথা ছিল! কিন্তু সংসারের তারনায় বেচারি নিজের রেজাল্টের কথা একদম বেমালুম ভুলে বসে আছে! জেবা একটা শুকনো ঢোক গিলে অত্যন্ত অসহায় চোখে আরিশান মৃধার দিকে তাকাল।
আরিশান মৃধা জেবার মুখের ভাব দেখেই বিরক্তি প্রকাশ করে বলে উঠলেন,
_”আজ তোমার রেজাল্ট দিবে, অথচ তুমি তা জানোই না? এর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে লেখাপড়ার প্রতি তোমার মনোযোগ কতটা গভীর!”

জেবা ওড়নার খুঁতটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে আমতা আমতা করে বলল,
_”ইয়ে… আসলে ভুলে গিয়েছিলাম।”
_”তোমার রেজাল্ট কী এসেছে জানো?” আরিশান মৃধা হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে শুধালেন।
জেবা চটপট ডানে-বামে মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বোঝাল।
আরিশান মৃধা একটা গম্ভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
_”তুমি এ-গ্রেড পেয়েছ। এই তোমার লেখাপড়ার নমুনা? ভবিষ্যতে মেডিকেলের আশায় পড়া একজন শিক্ষার্থী কখনোই এত বাজে রেজাল্ট করে না।”
জেবা এবার মুখটা বাঁকিয়ে একটু ঝাঁঝালো গলায় বলল,
_”তো আমি কি আপনাকে কখনো বলেছি যে আমি মেডিকেলে পড়তে চাই? ওটা তো বাবা জোর করত বলে লোক দেখানো পড়তে চেয়েছিলাম। মেডিকেল একটা অত্যন্ত ফালতু সাবজেক্ট, চব্বিশ ঘণ্টা খালি ওই কাটাছেঁড়া আর পড়ালেখা… বড্ড বিরক্তিকর!”
আরিশান মৃধা চরম অবাক হলেন। ওনার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো আরেকটু সরু করে জিজ্ঞাসা করলেন,
_”মেডিকেল ফালতু? কেন, তোমার জীবনে নিজস্ব কোনো লক্ষ্য বা ড্রিম ছিল না?”
জেবা এক মুহূর্তও না ভেবে আরিশান মৃধার চোখের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল,
_”ছিল তো! আপনি ছিলেন আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। আর দেখেন, আমি আমার লক্ষ্য পূরণে শতভাগ সফল হয়ে গেছি!”

আরিশান মৃধা চরম বিরক্ত হয়ে কপালে হাত দিলেন,
_”তোমাকে আমি ক্যারিয়ারের কথা বলছি, তোমার ড্রিমের কথা বলছি জেবা! সিরিয়াস হও!”
জেবা এবার একটু থুতনিতে হাত দিয়ে ভেবে বলল,
_”ক্যারিয়ার? আপাতত আপনার সংসার করছি।দুদিন পর বাচ্চার মা ও হয়ে যাবো। তবে হ্যাঁ, একসময় আমার একটা চায়ের দোকানের বিজনেস দেওয়ার খুব শখ ছিল। দৈনিক যদি দশ হাজার টাকার চাও বেচতাম, তাও তো মাসে তিন লাখ টাকা প্রফিট আসত! মন্দ কী?”
আরিশান মৃধা এবার স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। ওনার রাগী চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল,
_”তুমি কি লাইফে কখনো সিরিয়াস হতে শিখবে না? এবার… জীবনে অন্তত একটা বার একটু সিরিয়াস হতে শেখো, দেখবে তোমার চাওয়াগুলো কীভাবে আস্তে আস্তে তোমার হয়ে যায়।”

জেবা এবার বিছানা থেকে একটু এগিয়ে এসে ওনার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বলল,
_”আপনাকে নিয়ে আমি ভীষণ সিরিয়াস ছিলাম। আর আপনি এখন আমার হয়ে গেছেন, হিসাব একদম বরাবর! এখন অন্য কিছু লাইফে থাকল বা না থাকল-তাতে আমার বিন্দুমাত্র যায় আসে না।”
আরিশান মৃধার এখন তীব্র মন চাচ্ছে নিজের মাথাটা নিজে কোনো শক্ত দেয়ালে ঠুকে ফাটাতে! কোন কুক্ষণে যে ওনার কপালে, এই শেষ বয়সে এসে আল্লাহ এমন একটা অদ্ভুত, অটিস্টিক টাইপ মেয়ে জুটিয়েছেন-তা একমাত্র ওনার ওপরওয়ালাই ভালো জানেন। ওনার গম্ভীর মুখের সব এক্সপ্রেশন যেন জেবার এই চিলআউট স্বভাবের সামনে এসে মার খেয়ে যায়।
জেবা আরিশান মৃধার ওই পাথরের মতো শক্ত আর গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে চোখের পলক ফেলে একটু মুচকি হাসল। ওনার শার্টের একটা বোতামের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করে ফিসফিস করে বলে উঠল,

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৭

_”একটা কথা বলব?
_”বলো।
জেবা মুচকি হেসে লজ্জা মাখানো গলায় বললো।
_”আপনি কিন্তু এই বয়সেও দেখতে অনেক হট আছেন! মানে, হিরোদের মতো লাগে আপনাকে। তা… আমার সাথে এখন যদি একটু ‘কিছুমিছু’ বা রোমান্স করতে চান, আমি কিন্তু একটুও মাইন্ড করব না, একদম বলে দিলাম!”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here