রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬২
মহাসিন
সময় যেন ধীরে ধীরে গলে গিয়ে বিকেলের নরম আলোয় মিশে গেছে। প্রকৃতি তার মৃদুমন্দ বাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। গাছের পাতায় হালকা দোলা লাগছে, আর দূরের আকাশে মেঘের আঁচল লালচে হয়ে উঠেছে।
শাপলা সদর দরজার কলিং বেল চাপ দিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর কবিতা এসে দরজা খুলে দাঁড়াল। তার চোখে একটা চাপা কৌতূহল আর আভাস। চোখ সামান্য সরু করে সে শাপলাকে দেখে বলল,
_ “তা এতক্ষণে রাজরানীর বাসায় আসার সময় হলো? কী ব্যাপার,এত দেরি কেন?”
শাপলা চোখ বড় বড় করে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে সে উত্তর দিল,
_“আপনি কি এমন হয়ে গেছেন যে আমাকে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে?”
কথাটা বলেই শাপলা সোজা ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে এলো। কবিতা দরজা বন্ধ করে তার পিছু নিল। তাদের কথাবার্তা শুনে নীলাঞ্জনা আর কলি দুজনেই নিচে নেমে এলো। কলি শাপলাকে দেখে হেসে বলল,
_“কখন এলি রে?”
_“এই তো মাত্র এলাম।”
কবিতা আবারও না ছাড়িয়ে প্রশ্ন করল,
_“কী হলো বল ? আসতে এত দেরি করলি কেন?”
শাপলা একটু থেমে বলল,
_“রাস্তায় প্রচুর জ্যাম ছিল, তাই দেরি হয়েছে।”
কবিতা হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল,
_“উফ্, এসব কথা বলা বন্ধ কর তো। সবসময় একই কথা রাস্তায় জ্যাম। আমাকে কি একদম বোকা ভাবিস? আমি কি কিছুই বুঝি না? কী গোলমাল পাকাচ্ছিস তুই?”
শাপলা কবিতার কথায় কোনো পাত্তা দিল না। মুখ ঘুরিয়ে হনহন করে ভেতরের দিকে চলে গেল। কবিতা পেছন থেকে উঁচু গলায় বলল,
_ “তোর পাখা গজিয়েছে, তাই এখন উড়ছিস খুব। চিন্তা করিস না, এই পাখা একদিন ভেঙ্গে আস্তে আস্তে নেমে আসবি মাটিতে।”
নীলাঞ্জনা শাপলার এই পরিবর্তন দেখে খুব অবাক হয়ে গেল। একসময় শাপলা এতটা রুক্ষ ছিল না। কবিতা যদি কিছু বলত, জবাব দিতো না। সবার সাথে আড্ডা দিতো। কিন্তু এখন যেন সবকিছুতে তার মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। নীলাঞ্জনা আর কলি দুজনে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে অন্যদিকে চলে গেল।
কবিতা একা দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করতে লাগল, _“আমি তোকে দেখে নেব শাপলা। তুই কোথায় যাস, কী করিস সব আমি বের করব। আমি নিশ্চিত, তুই কোনো না কোনো পাকনামি করতেছিস।”
এই বলে সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল। কলিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ শাপলার ঘর থেকে ফিসফিস করে কথা ভেসে এল। শাপলা কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছে। কবিতা পা টিপে টিপে শাপলার ঘরের দরজার কাছে চলে এলো। দরজায় কান পেতে সে মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল।
শাপলা ফোনে বলছে,
“হ্যাঁ, সবকিছু খুব সাবধানে সামলাতে হবে।”
” ও কিছুতেই পারবে না… আচ্ছা, তাহলে রাখি।” “আর একটা কথা এরকম বারবার আসলে এ বাড়ির লোকজন স/ ন্দেহ করবে। তাই বেশি আসতে পারব না।”
” তোকে সব সামলাতে হবে। আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি কালকে আসব।”
কথা শেষ করে শাপলা ফোন রেখে দিল।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কবিতা তাড়াতাড়ি সরে গিয়ে নিজের ঘরে চলে এলো। ঘরে ঢুকেই সে আবার বিড়বিড় করে বলল,
_ “আমি ঠিক ধরেছি। তুই কিছু একটা করছিস যা সিয়াম জানে না। আমাকে জানতেই হবে।”
এই বলে তার ঠোঁটে একটা চাপা, মুচকি হাসি ফুটে উঠল। বাইরের জানালা দিয়ে বিকেলের শেষ আলো এসে পড়ছে তার মুখে। বাড়ির ভেতরে যেন এক অদৃশ্য রহস্যের সুতো ধীরে ধীরে জড়িয়ে উঠছে।
সময় গড়িয়ে গেছে। সন্ধ্যা সাতটা বাজে। নীলাঞ্জনা ড্রয়িং রুমের সোফায় আরাম করে বসে তার বোনের সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। তার পাশে কলি চুপচাপ বসে আছে।
নীলাঞ্জনা তার বোন কে বলল,
_“তুই এসে আমাকে একবার দেখে যেতে পারিস।”
বোন হেসে উত্তর দিল,
_“তোকে দেখার কী আছে রে?”
নীলাঞ্জনা সামান্য অভিমানের সুরে বলল,
_ “কেন, আমার কথা কি তোর মনে পড়ে না?”
_“পড়ে তো। কিন্তু মাকে বাড়ির কাজে সাহায্য করতে হয় বলে আসতে পারি না,” বোন জবাব দিল।
নীলাঞ্জনা জিজ্ঞাসু হয়ে বলল,
_“কেন? নীলমের বউ কি কোনো কাজ করে না, তুই মাকে সাহায্য করিস কেন?”
বোন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_“আর বলিস না। সে তো কোনো কাজই করে না। মা যদি রান্না করতে বলে, তাহলে বাপের বাড়িতে ফোন করে অভিযোগ করে যে মা নাকি তাকে সারাদিন খা/ টায়। তাই আমিই মাকে সব কাজে সাহায্য করি।”
নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে বলল,
_“নীলম কিছু বলে না?”
_“কিছু বলে না । ও তো একেবারে বউ পাগল। বউয়ের কথায় উঠে বসে। সবসময় বউয়ের আঁচলের তলায় থাকে,” বোন হতাশ স্বরে বলল।
নীলাঞ্জনা মৃদু হেসে বলল,
_“তার মানে বাড়িতে নিত্যনতুন নাটক চলছে তাহলে।”
বোন হেসে উত্তর দিল,
_“আচ্ছা, পরে কথা হবে।” বলেই কল কেটে দিল।
কলি নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বলল,
_ “আপনার বোন আছে?”
নীলাঞ্জনা হাসিমুখে বলল,
_“হ্যাঁ, আমরা দুই বোন আর এক ভাই। ভাইয়ের বিয়ে করছে, আমারও হইছে। শুধু আমার ছোট বোনের এখনো বিয়ে হয়নি।”
হঠাৎ কবিতা ড্রয়িং রুমে এসে ঢুকল। নীলাঞ্জনার পাশে ধপ করে বসে পড়ল। তার চোখে মুখে একটা রহস্যময় ভাব। কবিতা কলি ও নীলাঞ্জনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
_ “একটা কথা বলব, বিশ্বাস করবে তো?”
নীলাঞ্জনা সাগ্রহে বলল,
_ “বলো।”
কবিতা গলা নামিয়ে বলল,
_ “শাপলা কোনো একটা কিছু করছে। আমি নিজের কানে শুনেছি, ও কার সাথে যেন ফিসফিস করে ফোনে কথা বলছে।”
কলি সহজভাবে বলল,
_“কার সাথে আবার কথা বলবে? হয়তো সিয়াম ভাইয়ার সাথে কথা বলছে।”
কবিতা মাথা নেড়ে বলল,
_ “না না। সিয়ামের সাথে কথা বললে এত ফিসফিস করে কেন?”
নীলাঞ্জনা মুচকি হেসে বলল,
_ “আরে পাগল! ওরা তো স্বামী স্ত্রী। ওদের নিজেদের ব্যক্তিগত কথা তো ফিসফিস করেই বলবে। মাইক নিয়ে তো আর বলবে না!”
সিয়াম গোসল করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। তার চুল ভেজা অবস্থায় কপালের ওপর লেপটে আছে। পরনে কালো রঙের ট্রাউজার। শরীর থেকে এখনো সাবানের মৃদু সুবাস ছড়াচ্ছে।
শাপলা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
সিয়ামকে দেখে তার চোখ আটকে গেল। চোখে লজ্জা আর গভীর মিশে এক অপূর্ব আলো ছড়িয়ে পরছে। সিয়াম বুঝতে পারছে, শাপলা তার দিকে তাকিয়ে নিজেকে সা/ ।মলা/ ।তে পারছে না।
সে শাপলার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে নরম সুরে বলল,
_“টেস্ট করতে চাস?”
_“কী?”
সিয়াম ধীর পায়ে তার কা। ছে এগিয়ে এলো। ড্রেসিং টেবিল থেকে একটা বড় চকলেট তুলে নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে এক টুকরো ভেঙে মুখে পুরল। তারপর হাতের বাকি চকলেটটা টেবিলে রেখে শাপলার আরও কা। ছে এসে দাঁড়াল।
সে তার মুখখানি শাপলার খু। ব কা। ছে নিয়ে এলো। আলতো করে চোষা মিষ্টি চকলেটটা শাপলার ঠোঁ। টের কা। ছে ধরে দিল। শাপলা চোখ বন্ধ করে এই মিষ্টি স্বাদ নি। ল।
সিয়াম ফিসফিস করে বলল,
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬১
_“আজ এই চকলেট খেতে দিলাম। খুব তাড়াতাড়ি তোকে আরও মিষ্টি অনেক কিছু দিয়ে আ। দর করব। যে আ। দরে তোর মন ভরে যাবে।”
দুজনের মাঝে এখন শুধু মিষ্টি চকলেটের গন্ধ আর নীরব আবেগের উষ্ণতা।
