Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ৩২

দুইজনাতেই পর্ব ৩২

দুইজনাতেই পর্ব ৩২
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

গাছগাছালিতে ঘেরা বড়সড়ো মাঠটায় দ্বিতী এক দিক মুখ করেই দাঁড়ানো। সাক্ষ্য তার কিছুটা দূরত্বেই দাঁড়ানো। অতঃপর ফটোগ্রাফারের নির্দেশ অনুযায়ী ছবি তোলা শেষ হওয়ার পরই সাক্ষ্য হাফ ছেড়ে বাঁচল। কি ঝামেলার কাজ! সাক্ষ্যর মতো গম্ভীর, অনুভূতি লুকিয়ে রাখা মানুষগুলোর জন্য ঝামেলারই কাজ। সাক্ষ্য কিছুটা দূরত্বে দাঁড়াতেই সাম্য বিরস মুখে বলে উঠল,
“ দূর ভাইয়া। তোমরা কি রোবট? নতুন বিয়ে করেছো । অথচ মুখচোখে কোন রোমান্টিকতা নেই। আমি বিয়ে করলে এতক্ষনে বউ কোলে তুলে ছবি তুলতাম। ”
সাক্ষ্য কপাল কুঁচকে তাকাল সাম্যর দিকে। চোখ রাঙ্গাতেই সাম্য চুপ হয়ে অন্যদিকে পা বাড়াল। আর যায় হোক সে বড়ভাইকে একটু হলেও ভয় পায় । সাম্য চলে যেতেই দ্বিতী চেয়ে দেখছিল শুধু সাক্ষ্যর দিকে। রোবট? ওটা তো সাক্ষ্য পরিবারের মানুষজনের সামনে হয়ে যায়। এমনি সময় বউয়ের কাছে তো ঠিকই প্রেমিক পুরুষ হয়ে যায়। দ্বিতী অবশ্য থামল না। আরো বেশ কয়েকটা ছবি তোলার পর ফটোগ্রাফারকে বলে উঠল,

“ উনাকে ছাড়াই তুলুন ভাইয়া। আমি তুলতে রাজি আছি। ”
এইটুকু বলেই হাঁটতে হাঁটতে অন্য জায়গায় গেল। বেশ কয়েকটা ছবিও তুলল। কিন্তু এত উঁচু হিল পরে এতটুকু পথ হেঁটে হেঁটে সে হাঁফিয়ে উঠল যেন। সাক্ষ্য তখন দূর থেকেই হাসল। পা বাড়িয়ে দ্বিতীর সামনে গিয়ে আচমকায় ঝুঁকে বসল দ্বিতীর সামনে। তারপর হাত এগিয়ে দ্বিতীর উঁচু হিলজোড়া খুলে নিয়ে এক হাতে নিল। পরপর আচমকাই কোলে তুলে নিল দ্বিতীকে। পা বাড়াতে বাড়াতে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ ছবি তোলার আর শখ আছে? তুলবেন? ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য হাসল। ওভাবে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটতে গিয়েই খেয়াল হলো তার অজান্তেই ইতোমধ্যে ফটোগ্রাফার দৃশ্যপটটা ক্যাপচার করে নিয়েছে। বর- বউ এই দৃশ্যখানা ক্যাপচার করে বোধহয় তারা নিজেরাও হাসছিল। এতক্ষনে গিয়ে একটা প্রাণবন্ত ছবি তোলা হলো অবশেষে!

কথা তখনও ঐ একই রঙের শাড়িটাই পরা। সাম্যর বন্ধু নিহালের সাথে দাঁত বের করে হেসেই কথা বলছিল। নিহাল যে খুব ভালো ছেলে এমন নয়। আবার খুব খারাপ কিছুও কথার চোখে পড়েনি। হেসে বলল,
“ সাম্যর বন্ধু হয়েও যে খুব ভালোভাবে পড়ালেখা করছেন শুনে খুশি হলাম। খুব খারাপ কিছু করেন না শুনেও খুশি হলাম। তবে আমি এসব বিশ্বাস করি না নিহাল ভাই। ”
সাম্য বোধহয় তখনই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল। ভ্রু বাঁকিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
“ এই কাঁথার বাচ্চা কাঁথা! তুই আবারও আমার নাম ধরে বলেছিস। আবারও? তোর সাহস তো কম নয়৷ ”
“ তুমি বয়সে আমার চাইতে খুব একটা বড় নও বলেই মুখে চলে আসে। আরকিছু না। ”
“ আরকিছু টিছু না তো কথা না। মোটকথা তুই আদব কায়দা জানিস না। বড়দের রেসপ্যাক্ট করতে জানিস না। আমি তোর থেকে গুণে গুণে কয় বছরের বড়? বড় তো? আর তুই তো আমার আব্বুর আদর পেয়ে নিজেকে প্রাইম মিনিস্টার ভাবিস। ভাবে তোর পাই পড়ে না মাটিতে। নিজেকে কি ভাবিস তুই হ্যাঁ? কি মনে করিস? ”
কথা মিনমিনে চোখে চাইল। উত্তর করল,

“ কি মনে করি? তোমার সাথে কব বেয়াদবিটা করেছি আমি? কি করেছি? ”
“ বহু কিছু করেছিস। নিহালকে কি বলছিলি? সাম্যর বন্ধু মানে পড়ালেখা করতে পারবে না? দুনিয়াতে খালি তুই একাই পড়ালেখা করস? তুই একাই ভালো রেজাল্ট করিস? মেধাবী বলে তোর অনেক পাওয়ার তাই না? শোনো! তোর মতো পড়লে আমি এতদিনে দেশের জন্য পারমানবিক বোমা বানাইয়া তোরে উড়াইয়া দিতাম। বুঝছস? ”
কথা ছোটশ্বাস ফেলল। বলল,
“ তো পড়ো না কেন? তুমি তো পড়ালেখা করোই না। মাসে তেরোবার বন্ধুদের নিয়ে ট্যুর দাও। পরিবারকে জ্বালাও। ঝামেলা করো। ”
“ বেশ করেছি। তোকে ভাবতে বলেছি আমি? নাকি এটা তোর পরিবার? এটা আমার পরিবার। আমার। তোর এত পরিবারের প্রতি দরদ হলে আজ তো তোর চাচা এল। চলে যাসনি কেন? সেই তো আমাদের ঘাড়েই পড়ে আছিস। ”
কথা ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। চোখ টলমল করল বোধহয়। এই যে বারবার একই খোঁটা এটা শুনতে তার কষ্টই লাগে। কথার মন নরম। সহজেই কান্না আসে এমন মেয়ে সে। তাইতো শুকনো ঢোকন গিলে কান্না আটকাল। বলল,

“ আমার নিজের পরিবার আমাকে গুরুত্ব দিলে আমি তোমাদের এখানে থাকতামই না। ”
“ হু, এইজন্যই তো আমাদের এখানে থেকে আমাদের বদনাম করিস বেয়াদব। ”
“ জ্বী নাহ। তোমাদের নয়। তোমার বদনাম করেছি। হয়েছে? ”
এইটুকু বলেই কথা পা বাড়াল।এই সাম্য তাকে প্রতিটা ক্ষণে কষ্ট দেয় সাম্য কখনো কি বুঝে উঠেছে কথার কতোটা কষ্ট হয়? কখনো টের পেয়েছে এই মেয়েটিই তাকে আড়ালে আবড়ালে খেয়াল করে। ভালোবাসে। অথচ সে মানুষটির কথার আঘাতেই দিনশেষে চূর্ণবিচূর্ণ হতে হয়।

দ্বিতী পোশাক ছেড়েই ক্লান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে থাকল হাত পা ছড়িয়ে। একটা কামিজ আর প্লাজু পড়েই ওভাবে হাত পা ছড়িয়ে শুঁয়ে ঝিমাতে লাগল মেয়েটা। কতটা ক্লান্ত সে। সারাদিন টই টই করে, আম্মু-আব্বুর সাথে দেখা করে দ্বিতীর একটুও মন খারাপ হয়নি। একটুও না। অথচ এখন সিলংয়ের দিকে তাকাতেই তার মন খারাপ হচ্ছের।কান্না পাচ্ছে ।ইচ্ছে করছে মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে। মায়ের ওমে ছোট্ট ছানার মতো একটা ঘুম দিতে। কিন্তু আম্মু তো এ বাড়ি নেই। এ বাড়িটা তার শ্বশুড়বাড়ি। এখানে চলতে হলে তাকে ভেবেচিন্তে চলতে হয়। অথচ আম্মুর কাছে তে তার কোন ভাবনাচিন্তা করতেই হতো না। শত ভুল করলেও মাফ ! দ্বিতীর মন খারাপি কান্নাটা খুব করে আসতে চাইলেও সে শুকনো ঢোক গিলল। আস্তে আস্তে চুলটা খোলার চেষ্টা করল। মাঝেমাঝেই চুলের টানে মুখচোখ কুঁচকে নিচ্ছিল। ঠিক তখনই সাক্ষ্য এল। দ্বিতীকে বসে বসে চুলের ক্লিপ খুলতে দেখেই ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,

“ কয়টা ক্লিপ গুঁজেছেন চুলে? এত কেন?”
দ্বিতী সরু চাহনিতে তাকিয়েই উত্তর করল,
“ আপনার জন্য। আপনাকে বিয়ে করেছি বলেই তো চুলে ক্লিপ গুঁজতে হলো।”
সাক্ষ্য এগোল। নিজের ব্লেইজারটা খুলে রেখে শার্টের বোতামগুলো একটা একটা করে খুলতে খুলতেই এসে দাঁড়াল দ্বিতীর পেছনে। অতঃপর নিজের শার্টটা খুলে রেখেই উদোম শরীর দাঁড়িয়ে হাত রাখল দ্বিতীর চুলে। ধীরগতিতে হাত চালিয়ে একে একে ক্লিপগুলো রাখল পাশেই। গলা ঝেড়ে বলল,
“ যেভাবে টেনে টেনে চুলের ক্লিপ নিচ্ছিলেন মনে হচ্ছিল আমার শ্বাশুড়ি আম্মুর বহু যত্নে রাখা চুলগুলোর বারোটা বাজিয়ে দিবেন। ”

“ আপনি কি এগারোটা বাজিয়েছেন? ”
সাক্ষ্য পাশ থেকে চিরনি নিল। দ্বিতীর ফুলে উঠা চুলগুলোতে জট বেঁধেছে বোধহয়। পাশ থেকে তেল নিয়ে অদক্ষ হাতে তেল লাগাল বউয়ের চুলে। অতঃপর আঁছড়ে দিল। সুন্দর করেই বলল,
“ আঁই থিংক এগারোটা- বারোটা কিছুই বাজেনি। রাইট? ”
দ্বিতী চাইল। স্বভাবত আম্মু না দিয় দিলে সে তেল দেয় না। তার চুলের যত্নটা তার আম্মুই নিত বেশির ভাগ সময়ে। এখন সাক্ষ্য নিল দেখে বাঁকা চোখে চাইল সে। বলে উঠল,
“ ঐ একই। আমি করলেও এগারোটা বারোটা কিছুই বাজত না। ”
এইটুকু বলেই যখন ঘুরে উঠে দাঁড়াল। ঠিক তখনই সাক্ষ্যর উদোম বক্ষটা সরাসরি চোখে ঠেকল। লোমহীন চওড়া বুকটায় একনজর চোখ আটকাতেই দ্বিতী শুকনো ঢোক গিলল। বলে উঠল,
“ দেখুন, এসব খালি গায়ে টায়ে এসে আমায় আকৃষ্ট করার চেয়ে সরাসরিই বলুন। কি চান? ভালো টালো বাসেন দ্বিতীকে? ”

সাক্ষ্য ঠোঁট কামড়ে হাসল। ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কি মনে হচ্ছে আপনার?”
“ মনে হচ্ছে ঘটনা প্রচুর জটিল। তার চেয়েও বড় কথা, সাক্ষ্য এহসান ভেতরের রূপ বাইরে না দেখিয়ে ঢঙ করে। ভাব ধরে তার মতো নাক উঁচু মানুষ বুঝি দুনিয়াতে নেই। ”
সাক্ষ্য হেসে ফেলল এবারে বোধহয়। ওয়াশরুমে যেতে যেতে বলল,
“ ঢংটা বুঝতে শিখুন তাহলে। সাক্ষ্য এহসান এমনিতেও ভেতরের রূপ বাইরে প্রকাশ করতে পারে না। ”
“ আপনার ঢং বুঝতে আমার বয়েই গেছে। ”
দ্বিতী ঐটুকু বলেই বের হলো। দেখা হলো কথার সাথে। ঘড়িতে তখন বোধহয় মাত্র সাড়ে ছয়টা। দ্বিতী আর কথা কিছুটা কথা বলতেই ওখানে হাজির হলো সাম্যও। হাতে একটা সিংগারার প্লেট। পাশেই সস রাখা। সে সস টুকুতে সিংগারা লাগিয়ে কামড় বসাতে বসাতে কপাল কুঁচকে বলল,

“ কথার বাচ্চা, অবশেষে শাড়ি চেঞ্জ করেছিস? এতোটা সময় পর। ”
“ করেছি। ”
“ দ্বিতু সিংগারা খা। নে। ”
দ্বিতী চোখ ছোট ছোট করে চেয়ে বলল,
“ কথারটা? ”
সাম্য মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“ একটার দাম কত জানিস? ১০ টাকা। ও এসব তেলচর্বি খেয়ে এমনিতেই আমার বাপের হাজার হাজার টাকা শেষ করে ডক্টরের পেছনের।এখন আমি আবার ১০ টাকা খরচ করুম ওর পেছনে? তাও আমার বদনাম করে বেড়ানো মেয়ের জন্য? জীবনেও না।”
কথা ওখানে আর দাঁড়াল ও না। সাম্যর সুদর্শন মুখটার দিকে এক পলক চেয়েই পা বাড়াল। দ্বিতীও পিছু পিছু গেল। কণাকে দেখত পেল একপাশটায়। মুখে বেশ হাসি নিয়েই বলে উঠল,
“ নতুন বউ মাথায় এমন তেল চিপচিপে করে তেল দিয়েছো যে? সাক্ষ্য ভাইয়ার সাথে তো এই তেল চিপচিপে মেয়ে একদমই যাচ্ছে না। ”
দ্বিতীর এমনিতেই এই মেয়েকে সহ্য হয় না। তবুও বলল,

“ তোমাকে বোধহয় খুবই ভালো যাবে বলো?”
“ কেন যাবে না? আমি কি দেখতে অসুন্দর নাকি? তুমি জানো? আমি চাইলেই সাক্ষ্য ভাইয়াকে নিয়ে নিতে পারতাম। আমার করতে পারতাম। তোমাকে তো কেবল দয়া করেছি বুঝলে? ”
দ্বিতী হেসে ফেলল। ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসেই জবাব দিল,
“ ওকে ফাইন। ট্রাই করো। যদি তোমার করতে পারো তো আমিও তোমায় অস্কার ছুড়ে দিব। ”
“ এত কনফিডেন্স পাও কি করে হুহ? ”
“ কনফিডেন্স পাওয়ার উৎস আছে বলেই আনুষ্ঠানিক বিয়েতে রাজি হয়েছি, তোমার সাক্ষ্য ভাইয়ার সাথে এক ঘরে থাকতে রাজি হয়েছি ডিয়ার। নয়তো চৌদ্দ বছরেও আমি এই
নাক উঁচু মানুষের সংসার করতাম না।”

এইটুকু বলেই দ্বিতী অন্য পাশে ফিরল। এই মেয়েটাকে তার এখন সহ্য হয় না। কেন জানি বিরক্তিকরই লাগে। একদম নিধির মতো। দ্বিতী পা বাড়ালেও দ্বিতী আর কণার কথোপকোনতন গুলো সাক্ষ্যর নানু শুনছিল দূর থেকে। নিজের নাতনিকে এভাবে বলাতে বোধহয় উনার খারাপই লাগল। দ্বিতীর প্রতি অস্পষ্ট এক রাগ রেখে উনি দ্বিতীকে বললেন রাতের খাবারটা রান্না করতে। বাসাভর্তি মেহমানের জন্য যাতে নতুন বউই রান্না করে। দ্বিতী যে রান্নায় খুব অভিজ্ঞ এমন নয়। টুকটাক যা রেঁধেছে সে মা মেয়ের জন্যই রেঁধেছে। এখনে এতগুলো মানুষের জন্য পারবে? প্রথমদফায় চিন্তায় পড়লেও পরের দফায় জানাল পারবে। করে নিবে রান্নাটা। আর কয়েক মুহূর্ত পর তা শোনার সাক্ষ্য প্রথমেই দ্বিতীকে ডেকে প্রশ্ন ছুড়ল,

“ আপনি রান্না করবেন? পারবেন রান্না করতে? তাও এতগুলো মানুষের জন্য? ”
“ না পারার কি আছে? ডিম ভাজা, নুডুলস, বিরিয়ানি এসব আমি পারি। বাচ্চা নাকি আমি? ”
“ বাচ্চা নন তো? আমার ওয়াইফের খেয়াল রাখা নিশ্চয়ই আমার দায়িত্ব?’
দ্বিতী সঙ্গে সঙ্গেই ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“আকদের পর এতগুলো দিন দায়িত্ব কোথায় ছিল ভাই? কোনদিন তো ফিরেও চাইতে দেখলাম না আপনাকে। ”
“ আপনাকে দেখিয়ে দেখিয়েই চাইতে হবে নাকি?”
“তো লুকিয়ে চুরিয়ে দেখতেন নাকি? চুড়ি নূপূর সব চুরি করে নজরটাও চুরি করেই রাখতেন? ছিঃ ছিঃ! ”
“জ্বী না। নজরটা সরাসরিই রেখেছি। শুধু আপনি টের পাননি। বুঝেছেন? ”
দ্বিতী আর উত্তর করল না। পরমুহূর্তে গেল রান্নাঘরে। টুকটাক যা সাহায্য করার সাজিয়া আফরোজ করলেন। কথাও ওখানেই থাকল। যদিও সে নিজেও রান্না পারে না। তবুওযা যা বলা হচ্ছিল করছিল। আর একটু পরপরই গিয়ে সাক্ষ্যকে বলে আসছিল খবরাখবর। ঠিক এর মধ্যেই সাক্ষ্যর নানু এল। নাকমুখ কুঁচকে বলল,
“ কি রানতাছো মাইয়া? ”
দ্বিতী উত্তর করল,

“জ্বী? সাজি আম্মু বলল বিরিয়ানি রান্না করতে নানি। তাই ওটাই করছি। ”
এবারে কঠোর গলাতে বলা হলো,
“ সাজি আম্মু কি ডাক আবার? এতদিন ডাকছো ভালা কথা। এহন থেকে আম্মু ডাকবা বুঝছো? আর বিরিয়ানি আদৌ পারো? ”
দ্বিতী শুকনে ঢোক গিলল। এতকাল সাজি আম্মু বলতে বলতেই অভ্যস্ত সে। আজ এভাবে বলাতে একটু হলেও খারাপ লাগল বোধহয়।আবার আম্মু সহ্য করতে বলেছে বলে কিছু বললও না। কিছুটা সময় চুপ থেকে বলল,
“ বাসায় তো করতাম আম্মুর আর আমার জন্য। এখানেও পারব অবশ্যই।”
সাক্ষ্যর নানু এবারে তিরস্কার করেই বলল,
“ দেহো পারবা কিনা। তোমার আম্মা নিজেও তো রান্নাবান্না পারত না৷ খাতা কলমে মাস্টারি করে শ্বশুড়বাড়ি আর সামলাতে পারল কই? ”
দ্বিতী বুঝল না। মানে? কি বুঝাল? বলল,
“জ্বী? বুঝিনি নানু। ”

“ বুঝবাও না। বাদ দেও। তুমি যে আমার দাদুভাইয়ের লগে চটাং চটাং কথা বলো এতো চটাং চটাং কথা বলবা না। মাইয়া মাইনষে এমন চটাং চটাং কথা বললে সংসার টিকে না। ”
এইটুকু বলেই ভদ্রমহিলা চলে গেল। দ্বিতীর মুখটা তখন চুপসে এল। তাকে আগে কখনে কেউ এভাবে বলেনি। আদুরর দ্বিতী এতোটা শক্ত আচরণ পেয়ে অভ্যস্ত ও নয়। তাই তো খারাপ লাগছিল। আর তখনই সাক্ষ্যর মা এল। মুখচোখ পরখ করে বলল,
“ আম্মু কিছু বলেছে দ্বিতী? এমন মন খারাপ কেন তোর? মুখ এমন চুপসে গেল যে? ”
দ্বিতী উত্তর করল না। সাক্ষ্যর আম্মু আবারও ডাকল,
“দ্বিতী? কি হয়েছে আম্মু? তোর চোখ এমন করছে কেন? কি হয়েছে? ”
দ্বিতী দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জানাল,
‘কিছু না। আম্মুর জন্য মন কেমন করছে। আমি একটু আম্মুর সাথে কথা বলে আসি? শুধু একটু। ”
এইটুকু বলেই দ্বিতী ঘরে এল দ্রুত। শক্তপোক্ত দ্বিতীর চোখ টলমল করছে কেমন। আম্মু যদি তার সাথেই থাকত সবটা সময়? কত ভালো হতো। অথচ দ্বিতীর আম্মু তো পাশে নেই। নেই৷ দ্বিতী টলমল হয়ে আসা চোখজোড়া নিয়েই মাকে কল করল। প্রথমেই জানাল,

“ আম্মু? ”
ওপাশ থেকে হাসিখুশি গলায় বলা হলো,
“শুনলাম রান্না করছিস দ্বিতী। পারবি এতজনের জন্য রান্না করতে? ”
দ্বিতী উত্তর করে না। কান্না কান্না গলায় শুধু ডাকল,
“আম্মু? ”
দ্বিতীর আম্মু বোধহয় এবারে মেয়ের কন্ঠ বুঝে উঠেই বলল,
“ দ্বিতী? গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেন মা? ”
হিয়া ফুঁপিয়ে উঠল যেন। ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করেই বলল,
“ আম্মু… আই মিস ইয়্যু আম্মু। আই মিস ইয়্যু..”
অদিতি আহমেদ হয়তো মেয়ের কন্ঠস্বর পেয়ে জমে গেলেন কেমন। বুকের ভেতর ব্যথা হলো কেমন। সে ছোট থেকর মেয়েটাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন। সবসময় পেয়েছেও আম্মুকেই। মিস করবে না?দ্বিতী আবারও ডাকল,

“ আম্মু? ”
অদিতি আহমেদ ধীর কন্ঠে বললেন,
“ দ্বিতী? শান্ত হ আম্মু। আমি আসব? আসব এখন? দ্বিতী? ”
দ্বিতীর এতক্ষনে বোধহয় হুশ এল। কান্নাটা আটকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল সে। তারপর ফোন রাখার আগে বলল,
“ না। এখন রাত হয়ে গেছে তো। তুমি বরং কাল এসো আম্মু। ”
এরপরও কিছুটা সময় দ্বিতী বেলকনিতেই কাটাল। গুঁটগুঁটে অন্ধকারে ওভাবে বসে থেকেই নিজেকে বুঝাচ্ছিল। দ্বিতী নিজেকে বুঝ দিকে পারে সবসময়ই। তাই আজ ও নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। আর ঠিক তখনই সাক্ষ্যর কন্ঠ পাওয়া গেল,
“ দ্বিতী?”
দ্বিতী এক মুহূর্তেই থমকাল। কান্না মুঁছে নিয়ে প্রশ্ন করল,
“ কি? ”
“ তৈরি হয়ে নিন। আমরা বের হবো। ”
“ আমি রান্না করছি দেখেন নি? ”
“ দেখেছি। রান্না টান্না করে হাত পা পুড়ানোর থেকে চলুন আমার সাথে ঘুরে আসবেন। ”
“ না। যাব না।”
সাক্ষ্য কপাল কুঁচকাল। তাকিয়ে বলল,

“ গেলে কি বিক্রি করে দিব আপনাকে? ”
“কেন? বিক্রি করার খুব ইচ্ছে নাকি?”
“ আপনি বলুন। বিক্রি হওয়ার খুবই ইচ্ছা নাকি?”
দ্বিতী এই পাল্টা প্রশ্নের উত্তরই করল ন। পাশ কাটিয়ে চলে গেল রান্না ঘরে৷ আর তখনই নানু আবারও বলে উঠল,
“ শ্বাশুড়িকে রান্না করতে দিয়ে নিজেেতো ঠিকই টই টই করতে চলে গেলে। এই বুঝি তোমার রান্না পারার নমুনা? ”
দ্বিতী হয়তো সব মিলিয়ে মিনিট দশের মতো গিয়েছে। এইটুকু সময়ের আগে বাকিটুকু তো সেই করল। দ্বিতী তবুও বলে রান্নায় মনোযোগ দিল। শুধু মাত্র মা-মেয়ের জন্য রান্না করা দ্বিতী প্রায় পনেরো বিশজনের রান্না করতে গিয়ে হিমশিম খেল বেশ। ডান হাতে ফোস্কাও পড়েছে তিন তিনটে। তর্জনী আঙ্গুল হতে হাতের তালু অব্দি চিকন ছ্যাঁকা পড়ার মতো দাগ পড়েছে। দ্বিতী বহু কষ্টের পর সবটা শেষ করেই দাঁড়াল। সাক্ষ্য এই নিয়ে তিনবার এসেছে রান্নাঘরে। হয়তো পানির অযুহাতে, নয়তো আম্মুকে ডাকার অযুহাতে। এখন এল কথাকে খোঁজার অযুহাতে। এসেই আম্মু নেই দেখে দাঁড়াল সে। ঘামে ভিজে উঠা দ্বিতীর মুখটার দিকে চেয়ে বলে উঠল,

“ রান্না শেষ? রুমে চলুন তাহলে।”
“ কেমন হয়েছে তা জেনে তারপর যাব। ”
“ ভালোই হবে। চলুন এখন। ”
এইটুকু বলেই দ্বিতীর হাতটা যখন ধরতে নিল ঠিক তখনই দ্বিতী মৃদু আর্তনাদ করে হাত সরিয়ে নিল। সাক্ষ্য বোধহয় প্রথমে বুঝল না। দ্বিতীয় দফায় ভ্রু কুঁচকে চাইতেই বুঝে উঠল। গম্ভীর গলায় বলে উঠল সঙ্গে সঙ্গেই,
“ শেষ? হাত পুড়ানো ডান না? বলেছি না রান্না না করতে? বলেছি কিনা। সবকিছুতে বেশি পাকামো করেন দ্বিতী। সবকিছুতেই এক চামচ বেশি বুঝেন। ”

দুইজনাতেই পর্ব ৩১

“ রান্নার স্বাদ জেনে তারপর যাব। ”
সাক্ষ্য ফের আবারও বলল,
“ রুমে চলুন। ঔষধ লাগিয়ে দিব৷ ”
দ্বিতী যখন তখনো দাঁড়ানো তখন সাক্ষ্য দাঁতে দাঁত চেপেই বলল,
“ যাবেন কিনা? নাকি কোলে করে নিয়ে যাব? ”
সাক্ষ্য এবারে একটা ছোট চামচ নিয়ে অতো বড়ো পাতিল থেকর এক চামচ নিয়ে নিজের মুখে ফুরল। বলল,
“ খুব সুস্বাদু হয়েছে। মিসেস এহসান রান্না করেছে আর তা সুস্বাদু হবে না?এখন চলুন। রান্নার স্বাদ৷ জানা হলো তো? ”

দুইজনাতেই পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here