Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১
মুশফিকা রহমান মৈথি

“যে মানুষটা ফেসবুকে সামান্য পোক করায় আমাকে সবার সামনে কান ধরে উঠবস করিয়েছে, তার বউ পালাবে না তো কি আমাদের পালাবে? বেশ হয়েছে। খুব খুশি হয়েছি। আজকে রাতে স্পেশাল দুই রাকায়াত নামাজ পড়বো। আল্লাহ বিচার করেছেন। আর প্রীতি আপাও বেঁচে গেছেন। ওই সিমেন্টের বস্তার সাথে সংসার করা যায় নাকি! আস্তো একটা চলতা ফিরতা বিষফোঁড়া। চোখ দেখেছিস, এমনে সবসময় তাকায় যেন আমি তার কিডনী চুরি করেছি। এমন রাক্ষস প্রজাতির মানুষের সাথে বিয়ে করে সংসার করা অসম্ভব। ঠিক করেছে প্রীতি আপু। প্রেমিকের সাথে পালিয়ে উচিত কাজ করেছে।”

বলেই মুখে আরেকটা নরম তুলতুলে রসগোল্লা পুরলো কাঞ্চন। তার মনোযোগ খাওয়াতে। এদিকে কিছুক্ষণ পূর্বে বিয়ের পিড়ি থেকে বউ পালিয়েছে। বউ পালানোর বিষয়টা উন্মোচিত হতেই বিয়ে বাড়িতে হট্টোগোল শুরু হলো। চাচা-মামাদের হুক্কাহুয়া কানে ভেসে আসছে। কিন্তু কাঞ্চনের তাতে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যাথা নেই। বরং মাত্রাতিরিক্ত খুশি সে। কারণ যার হবু বউ পালিয়েছে সে তার চরম শত্রু। তার বড়ফুপুর বড় ছেলে, নাম সরফরাজ পটনভী স্নিগ্ধ।
জুলফিকার পটনভী অর্থাৎ কাঞ্চনের দাদাজানের পরিবারটা বিশাল বড়। এই পরিবারকে পরিবার কম যদি বলা হতো চীনের গ্রাম তাহলেই ভালো হত। এই পরিবারের শাখা প্রশাখা গুলো লম্বা এবং জটিল। বাংলাদেশের নাগরিক হলেও তাদের পূর্বপুরুষ থাকতেন লখনৌতে। তাও যে সে মানুষ নয় লখনৌয়ের নবাবের বংশধর তারা। রক্তেই নবাবীয়ানা।
জুলফিকার পটনভীর দাদা সামিয়ুল্লাহ পটনভী এসেছিলেন ভারত ভাগের আগে চাকরির সুবাদে। এর পর ভারত ভাগ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সব মিলিয়ে আর লখনৌতে ফেরা হলো না। এই বাংলার টান তাকে যেতে দিলো না। লখনৌতে তার বিশাল আত্মীয়স্বজন থাকা সত্ত্বেও তিনি থেকে গেলেন এখানে। অবশ্য তার কারণ তার স্ত্রী মনোয়ারা খাতুনের কথা ভুললে হবে না। নবাবী বংশধরের মন আঁটকেছিলো এক সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী মেয়েতে।

যাক গে, বিবাহ করে তিনি রয়ে গেলেন বাংলাদেশে আর বাকিরা লখনৌতে। বাংলাকে খুব ভালোবাসলেও নিজের নবাবী রক্ত বা নবাবী নাসল যেন খতম না হয় তাই তিনি নিজের ছেলে মেয়েদের আত্মীয়দের মধ্যেই বিবাহ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই প্রথা এখনোও বিরাজমান। পটনভী পরিবারের ছেলেমেয়েদের বিবাহ তাদেরই কাজিন বর্গীয় মানুষদের সাথেই হয়ে থাকে। কিছু এমন পটনভী আছে যারা আত্মীয়, পরিজনের বহির্গত বিবাহ করেন। কিন্তু সেটা খুব নগন্য।
জুলফিকার পটনভীরা তিন ভাই। তাদের বিশাল বংশ। বিয়ে শাদীগুলো এর ওর ছেলে মেয়ের সাথেই হবার কারণে কে কার মামাতো বোন নাকি চাচাতো বোন তার কোনো হদিস আসলে পাওয়া মুশকিল। পটনভী পরিবারের এই সুবিস্তৃত শাখাপ্রশাখার সুবাদে কাঞ্চনেরা প্রায় চল্লিশজন কাজিন। সেই কাজিনের সম্পর্কগুলো মাঝে মাঝে এতো জটিল এবং দূরবর্তী যে খাতায় টুকতে হয়। তাই সবাই হয় আপু, নয় ভাইয়া।
মুল ঘটনা হলো, জুলফিকার পটনভীর বড় নাতী সরফরাজ পটনভীর আজ বিবাহ ছিলো তারই বড়ভাইয়ের নাতনী প্রীতি পটনভীর সাথে। কিন্তু যেই কনেকে স্টেজে আনার কথা বলা হলো অমনি জানা গেলো কনে নেই! কোথাও নেই। এতে সবার মধ্যে তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও কাঞ্চন শান্ত। তার হেলদোল নেই। সে মনের শখে একটার পর একটা রসগোল্লা খাচ্ছে। সরফরাজ পটনভীর বিয়ের জন্য স্পেশাল করে বানানো রসগোল্লা বলে কথা! কাঞ্চনের কথার মধ্যেই পাশ থেকে পৃথুলা তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠলো,
“মুখ ফুঁটে বলেই ফেল না স্নিগ্ধ ভাইয়ের বউ পালিয়েছে বলে তুই খুশি কারণ সে তোর এককালের কেরাশ!”
কথাটা শুনতেই মুখ খিঁচিয়ে গেলো কাঞ্চনের। ক্রাশ তাও ওই সিমেন্টের বস্তা! কপালে তীব্র ভাঁজ ফেলে কটাক্ষ করে বললো,

“আমি অন্ধ না যে ওই সিমেন্টের বস্তার উপর ক্রাশ খাবো! শোন, আমি প্রীতি আপুর জায়গায় হলে আমিও পালাতাম। আমি দেওয়াল টপকে পালাতাম। ভাই আমার জীবন আমার কাছে খুব প্রিয়!”
“কেন আমার ভাই কি খারাপ নাকি?”
সানিয়া কথাটা বলতেই কাঞ্চন একপ্রকার লাফিয়ে উঠলো,
“খারাপ শুধু খারাপ! পৃথিবীতে একটা খারাপ মানুষ থাকলে সেটা তোর ভাই। শুধু শুধু কি প্রীতি আপু পালিয়েছে। আমি তো জানতাম সে পালাবে। এতো ভালো প্রেমিক থাকলে সিমেন্টের বস্তাকে কে বিয়ে করবে?”
“প্রেমিক? প্রীতি আপুর প্রেমিক ছিলো?”
কথাটা যেন কাজিনমহলে আলোড়ণ তৈরি করলো। প্রীতি পটনভীর মতো হিন্দি সিরিয়ালের আদর্শ মেয়ে টাইপ নারীর যে একটা প্রেমিক থাকতে পারে সেটা যেন কারোর বিশ্বাস হলো না। অঞ্জনা চোখ বড় বড় করে বললো,

“প্রীতি আপুর প্রেমিক ছিলো!”
রিদম বেচারার হাত থেকে রসগোল্লাটাই ফসকে ওর পাঞ্জাবীতে পড়ে গেলো। রসের আঠা গায়ে লাগায় সে মুখ ভসকালো। হাতের কাছে কোনো টিস্যু নেই। তাই একটা ফ্রেশ পানির মুখ খুলে ধুতে লাগলো।
কাঞ্চন চাপাবাজীতে ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করা মানুষ। এটা কাজিনমহলের সবাই জানে অথচ প্রতিবার কাঞ্চনের চাপায় তারা ভাসে। কারণ কাঞ্চন বলেই এমন ভাবে! এই যে প্রীতির প্রেমিকের কথা! এটা আস্তো ঢপ। তাও কাঞ্চন রসালো ভঙ্গিতে বললো,
“আবার জিগায়। প্রীতি আপুর একটা সোনা সোনা প্রেমিক আছে। কি ভালো কি ভালো! আমি তো প্রায় দেখতাম ছাদে কথা বলছে আর হাটছে। ইশ কথা বলার সময় গালগুলো লাল হয়ে থাকতো। আমি তো অবাক হয়েছিলাম যখন দাদাজান প্রীতি আপুর সাথে ওই সিমেন্টের বস্তার বিয়ে ঠিক করলো। ওর প্রেমিকের জন্য আমার খারাপও লাগছিলো! আহারে কি ভালো ছেলে!”
কথাটা শেষ করতেই অনুভূত হলো তীক্ষ্ণ একটা দৃষ্টি তাকে পেছন থেকে দেখছে। গা ছমছমিয়ে উঠলো সেই দৃষ্টির ধারে। সাথে সাথে কথা গিলে পেছনে ঘুরলো সে। কিন্তু পেছনে কেউ ছিলো না। মনের ভুল! হতেই পারে! বিয়ে বাড়িতে কি মানুষের অভাব!
এর মধ্যেই ইকরাম প্রায় ছুটে এলো। ছুটে আসায় সে হাফাচ্ছে। এসেই হা..হা.. করে কিছুক্ষণ বড় বড় করে নিঃশ্বাস ফেললো। এরপর আতংকিত স্বরে বললো,

“বড় মামা ডাকছে তোমাকে কাঞ্চন আপু। ভেতরে কেস হয়ে গেছে। প্রীতি আপুর চিঠি পাওয়া গেছে। নানাজান মূর্তির মতো বসে আছেন। তার ফরমান জারি হবে। যাও! যাও! এখন-ই!”
প্রীতি আপুর প্রেমিকের কথাটা একটা ঢপ ছিলো। ফলে কাঞ্চন নিজেও হতভম্ব হয়ে গেলো। প্রীতি আপুর সত্যি প্রেমিক ছিলো! যাক সে এবার মিথ্যা বলে নি।
কিন্তু প্রীতি আপুর প্রেমিক ছিলো কথাটা যতটা তাকে অবাক করলো তার থেকে বেশি অবাক করলো প্রীতি আপুর লেখা চিঠি,
“নয়া দাদাজান,
আমার সালাম লইবেন। আমি জঘন্য একখানা কাজ করিতে যাইতেছি। সেই কাজে আপনি অত্যন্ত আঘাত পাইবেন জানিয়াও আমি এই কাজ করিতেছি। আমাকে ক্ষমা করিবেন। আমি স্নিগ্ধ ভাইয়াকে বিবাহ করিবো না। আমি একজনকে ভালোবাসি। সে একজন সুপুরুষ। আমি অনেকবার বাবাকে বলেছি। তিনি শুনেন নি। তাই আমাকে এই পদক্ষেপ তুলিতে হইতেছে। আমাকে এই কার্যে কাঞ্চন অনেক সহায়তা করিয়াছে। সেই আমাকে সাহস জুগিয়েছে। আমাকে আলোর পথ দেখিয়েছে। ওকে কিন্তু কিছু বলিবেন না। মেয়েটা খুবই ভালো। আমার দোয়া রইলো ওর জন্য। আমার প্রতি ক্ষোভ রাখিবেন না।
ইতি
প্রীতি”

চিঠিটা পড়ে আকাশ থেকে পড়লো কাঞ্চন। প্রীতি আপুর প্রেমিক ছিলো এটাই তো এখন জানলো, ও কিভাবে তাকে সাহগ জুগিয়ে পালাতে সাহায্য করবে? নিজেই তো চলতে গেলে দশবার উষ্টা খায় ও কিভাবে প্রীতি আপুকে আলোর পথ দেখাবে! কাঞ্চন দাদাজানের দিকে তাকিয়ে ভাঙ্গা স্বরে বললো,
“আমি কিছুই করি নি, সত্যি!”
বড় চাচা খ্যাঁকখ্যাক করে উঠলেন,
“মিথ্যে কথা বলিস না কাঞ্চন। সত্যিটা আমরা জানি!”
বড়ফুপুর কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন,
“তুই আমাকে বলতে পারতি। আমি প্রীতির সাথে ছেলেটার বিয়েই ঠিক করতাম না। এমনটা কেন করলি? কি বদনামী হবে বল! আমার ছেলে যার কিনা র‍্যাব মহলে এতো নামডাক। তারই বিয়ের দিন হবুবউ পালালো!”
“ফুপি আমি জানতাম ই না এই বিষয়টা। প্রীতি আপু মিথ্যে লিখেছে।”
“প্রীতি আপু মিথ্যে বলে না তোর মত। আর একটু আগেই তো খাওয়ার টেবিলে বলছিলি তুই সব জানিস। মা ওর মাগুর মাছের কান্নায় গলো না!”

সানিয়া ফট করে বলে ফেললো। কাঞ্চন তার দিকে চোখ গরম করে তাকালো। সানিয়ার এতে কিছুই যায় আসে না। তার বড় ভাই আবিয়াত্তা থাকবে সেটা তো মানা যায় না। এদিকে কাঞ্চন হাঁপিয়ে গেলো বুঝাতে বুঝাতে যে সে মিথ্যে বলেছে। চাচাদের-চাচীদের হাতজোর করে বললো। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করলো না। তার কাহিনী ওই বাঘ এলো বাঘ এলো গল্পের রাখালের মতো হয়ে গেলো। এদিকে চাচারা-মামারা সব ক্ষিপ্ত। ঝাড়ির পর ঝাড়ির প্রজেক্টাইলের মতো আসতে লাগলো। মেজোচাচা তো বলেই ফেললেন,
“স্নিগ্ধ তোকে রিমান্ডে নিবে কিন্তু! সত্যি করে বল প্রীতি এখন কই? ওর সব বান্ধবীর বাড়িতে খোঁজ নিয়েছি। কোনো খোঁজ পাই নি।”
এর মধ্যখানে খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পায়ের উপর পা তুলে বাহাতটা চেয়ারের উপর ঝুলিয়ে রেখে ডানহাতটা নিজের কোলে অলসভঙ্গিতে রেখে বসে আছে সরফরাজ পটনভী স্নিগ্ধ। খুব শান্ত, শীতল দৃষ্টি। তার চোখে মুখে কোনো উৎকুণ্ঠা বা আবেগ নেই। তার মধ্যে কোনো তাগিদা নেই বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ায়। যেন খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা। সে দেখছে কাঞ্চনকে।
কাঞ্চন যখন হাঁপিয়ে উঠলো বোঝাতে বোঝাতে, ঠিক তখনই খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়ালো স্নিগ্ধ। ভারী স্বরে বললো,

“মাথা ধরেছে, আমি বাহিরে যাচ্ছি।”
বড়ফুপু ছেলেকে সান্ত্বনার সুরে বললেন,
“আব্বা তুমি কষ্ট পাইও না।”
কাঞ্চনে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো। কষ্ট পাচ্ছে বলে তো মনে হচ্ছে না। অবশ্য সিমেন্টের বস্তার মনটাও সিমেন্ট। ক্রিমিনালদের সাথে থাকতে থাকতে আবেগ যেন জমাট বেঁধে গেছে। এবার জুলফিকার পটনভীর ভারী স্বরে ঘর কাঁপলো,
“সরফরাজ, তুমি এখানেই থাকো। এখানে তোমার জীবন কেন্দ্রিক কথা হচ্ছে।”
“আমি তো সিদ্ধান্ত দিয়েই দিলাম নানাজান।”
কি সিদ্ধান্ত! এই কৌতুহল অবশ্য হচ্ছিলো কাঞ্চনের। কিন্তু তার আগে সবাইকে সত্যটা বিশ্বাস করাতে হবে। বিশেষ করে দাদাজানকে। কিন্তু তার আগেই দাদাজান বলে উঠলেন,
“তোমার বিয়ে আজকেই হবে সরফরাজ। কাঞ্চনের জন্য যেহেতু এই বিয়েতে ঝামেলা হয়েছে, আমাদের পরিবারে একটা চুনকালির ব্যাপার হয়ে গেছে। তাই শাস্তিস্বরূপ কাঞ্চনের সাথেই তোমার বিয়েটা হবে!”
দাদাজানের ফরমান মানে পাথরের লকির। কাঞ্চনের চোখ বিস্ফারিত হলো। মুখটা পাংশু বর্ণ হয়ে গেলো। কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে যেন। মাথাটা অসার হয়ে গেলো কিছুসময়ের জন্য। নিজেকে সামলালো সে। তারপর দাদাজানের ফরমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলো,
“দাদাজান এটা অন্যায়। আমি মোটেই আপনার নাতীকে বিয়ে করবো না! এমন শাস্তি আপনি দিতে পারেন না আমাকে।”

জুলফিকার পটনভী গুরুত্ব দিলেন না। কাঞ্চনের গলা ধরে এলো,
“আমি প্রীতি আপুকে পালাতে সাহায্য করি নি, বিশ্বাস করুন দাদাজান। আমি এই বিয়ে করবো না। এটা একপ্রকার জোরজবরদস্তি। আমি একজন এডাল্ট। আমি মোটেই এই অন্যায় মানবো না।”
“মানা না মানার পর্যায়ে ব্যাপারটা নেই। তুমি একটা অন্যায় করেছো। সেই শাস্তি তুমি পাচ্ছো! আর এমনিতেও তুমি এখন বিবাহযোগ্য!”
জুলফিকার পটনভীর কাঠিন্যর সামনে কাঞ্চনের প্রতিবাদ টিকলো না। বড়ফুপু বেশ খুশি ই হলেন যেন। তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেলো। কাঞ্চনকে আদুরে স্বরে বললেন,
“তুই আর অমত করিস না। এখানে আমাদের মানসম্মানের ব্যপার। জানাজানির হবার আগে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রাজী হয়ে যা, মা।”
বড়ফুপু যদিও কাঞ্চনকে অসম্ভব ভালোবাসেন। মাতৃহীন এই মেয়েটাকে তিনি নিজের মেয়ের মতো স্নেহ দিয়েছেন। তবুও সেই ভালোবাসার জন্য একটা সিমেন্টের বস্তাকে সে বিয়ে করবে না। আর সিমেন্টের বস্তাটা চুপ করে আছে কেনো! আড়চোখে স্নিগ্ধের দিকে তাকাতেই চোখে পড়লো একটা অদ্ভূত জিনিস। স্নিগ্ধের নির্লিপ্ত ধারালো চোয়ালে একটা সূক্ষ্ণ হাসির রেখা। কিন্তু সেই হাসির অর্থ বোঝার আগেই স্নিগ্ধ তার লম্বা লম্বা পা ফেলে হনহন করে বেরিয়ে গেলো।

কাঞ্চনের পরণে লাল একটা লেহেঙ্গা। একটু আগে বোনেরা মিলে এই ভারী লেহেঙ্গাটা পরিয়ে গেছে তাকে। কাঞ্চনকে খুব সুন্দর লাগছে। এটার জন্য অবশ্য লেহেঙ্গার ক্রেডিট দিতে হয়। আপাদমস্তক ভারী কারুকাজ। সোনালী সুতোর মিহি কাজ। খুব ভারী দেখালেও লেহেঙ্গাটা একটুও গায়ে কুটকুট করে না। একেবারে দক্ষ কারিগর থেকে অর্ডার করে বানানো। এমন জামা-কাপড় ই পছন্দ কাঞ্চনের। অথচ সে মোটেই এই বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়। দাদাজান তাকে এমন শাস্তি দিচ্ছেন যা সে করেই নি। চাচা-ফুপু-মামারা কেউ বিশ্বাস করতে চাইছেন না। কি যন্ত্রণা!
হঠাৎ বারান্দার দিকে চোখ গেলো। বিশাল বড় থাই গ্লাসের পেছনে ছোট একটা বারান্দা। বারান্দাটা বাড়ির লনের সাইডে। লনের পরেই বাড়ির চারপাশে ঘেরা জেলখানার মতো দেওয়াল। সেই দেওয়াল পার হলেই রাস্তা। এখন লনের ওদিকে কেউ নেই। পালাতে হলে এখনই সুযোগ। একটু পর পৃথুলা আর অঞ্জনা তাকে সাজাতে আসবে। তার আগেই তাকে পালাতে হবে। পালিয়ে কোথায় যাবে জানে না। কিন্তু এখনই পালাতে হবে। ওই সিমেন্টের বস্তাকে সে বিয়ে করবে না। যা ভাবা তাই কাজ। নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে কিছু টাকা পয়সা নিয়ে প্রস্তুত হলো সে পালানোর জন্য। লেহেঙ্গাটা গুটিয়ে আলমারীর সব শাড়ি বের করে একটা বিশাল রুপাঞ্জেল স্টাইলের রশি বানালো সে। ধীরে ধীরে নেমে গেলো লনে। লনের এদিকে মানুষ নেই। আলো জ্বললেও তাকে পালাতে কেউ দেখবে না।

বারান্দা থেকে লনে নেমে রশিটার কিছুটা খুলে দলা পাকিয়ে বগলে নিলো সে। লনটা পার হলেই দেওয়াল। তার পাশে বিশাল আম গাছ। গাছে চড়তে পারে কাঞ্চন। গাছের একটা ডাল চলে গেছে বাহিরে। সেই ডালটাই তার পালানোর একমাত্র উপায়। লেহেঙ্গা গুটিয়ে তরতর করে গাছে উঠলো কাঞ্চন। কিন্তু যেই ডাল থেকে নামবে অমনি দেওয়ালের কাটাতারে জড়িয়ে গেলো কাঞ্চনের লেহেঙ্গা। লেহেঙ্গাটা চেঞ্জ করার দরকার ছিলো। কিন্তু সময় কই ছিলো! এখন সে নড়তেও পাড়ছে না, নামতেও পারছে না। কি জ্বালা!

নিজেকে ছাড়াতে যখন ব্যস্ত তখন ই দেখলো লনের গাছের নিচে বুকের উপর হাতজোড়া গুঁজে ধাঁরালো চোখে তার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসছে সরফরাজ পটনভী। কানে ব্লুটুথ হেডফোন। ভারী গলায় কাউকে বললো,
“আম্মু তোমার বান্দরী এখানে দেওয়ালে ঝুলে আছে। বোধ হয় উড়ার চেষ্টা করছে!”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here