অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৯
ফাহিমা ইসলাম
সময় পৃথিবীর একমাত্র নির্মোহ বিচারক। সে কারও শোকের কাছে থেমে থাকে না, কারও সুখের মোহে ধীরও হয় না। মানুষের হৃদয়ে যতই ক্ষতচিহ্নের মহাকাব্য রচিত হোক, সময় নিঃশব্দে তার ওপর নতুন দিনের আস্তরণ বিছিয়ে দেয়। জীবনের ক্ষত শুকিয়ে এসেছে, সেলাইয়ের দাগ রয়ে গেছে, কিন্তু জীবন আবারও নিজের অবিনাশী ছন্দে চলতে শিখেছে।ছয়টি ঋতুচক্র নয়, মাত্র ছয়টি মাস চলছে জীবনের। তবু এই অর্ধবর্ষ যেন রৌদ্রিকের সমগ্র সত্তাকে নতুন করে জন্ম দিয়েছে। আগে তার বাঁচার কারণ ছিলো একটা, তবে আজ হয়েছে তিনটা। আজ সামান্য একটি হোঁচটের শব্দেও বুকের ভেতর অকারণ আশঙ্কার ঝড় ওঠে। কারণ এখন সে শুধু একজন স্বামী নয়, শুধু একজন পিতা নয়,সে আরও দুটি অনাগত প্রাণের আশ্রয়। একটি সংসারের কেন্দ্রবিন্দু, কয়েকটি স্পন্দিত হৃদয়ের নিরাপদ ছায়াবৃক্ষ সে।
মধ্যাহ্ন এখন নগরীর ব্যস্ততম প্রহর অতিক্রম করছে। বহুতল ভবনের কাঁচে প্রতিফলিত আলোয় শহর নিজের দৈনন্দিন ক্লান্তি বয়ে বেড়াচ্ছে। অথচ সেই কোলাহল থেকে বহু দূরে, কালো রঙের এসইউভিটি ধীরগতিতে হাসপাতালের পার্কিংয়ে এসে থামল। গাড়ি সম্পূর্ণ থামার আগেই রৌদ্রিক ইঞ্জিন বন্ধ করে দ্রুত নেমে এলো। অপর পাশের দরজা নিজ হাতে খুলে অত্যন্ত সতর্কতায় হাত বাড়িয়ে দিল।
“ সাবধানে নামো।”
তূর্ণা অসহায় হেসে মাথা নাড়ল।
“আমি অসুস্থ নই, এমন করেন কেনো?”
রৌদ্রিক ভ্রূ কুঁচকে তাকাল।
“তুমি নও। কিন্তু আমার পৃথিবীটা এখন তোমার ভেতরেই বেড়ে উঠছে। অসাবধান হওয়ার বিলাসিতা আমার নেই।”
বাক্যটি শুনে তূর্ণার চোখ অন্যমনস্ক হয়ে এলো। তূর্ণা আর কিছু বললো না, সত্যি বলতে ভাড়ি শরীর নিয়ে নড়া-চড়া করতে একদমই ভালো লাগে না। তার পেটটা অস্বাভাবিক ভাবে বড় কেনো জানি, ইরাও প্রেগন্যান্ট ছিলো তখন এমনটা লাগেনি। কিন্তু তার বেলায় এত বড় লাগার কারণটা জানা নেই তার, সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় রৌদ্রিক এক মুহূর্তের জন্যও তূর্ণার হাত ছাড়ল না। কোথাও মেঝে সামান্য ভেজা দেখলে আগে নিজে পা রেখে পরীক্ষা করে নিচ্ছে, তারপর তাকে এগোতে দিচ্ছে। তাদের ডক্টরের কেবিন দ্বিতীয় তালায়, লিফ্টের কাজ চলায় সেখানটা বন্ধ আপাতত। উপরে আসা মাত্রই অপেক্ষাকক্ষের শক্ত চেয়ারটি পছন্দ হলো না বলে নিজেই কুশন এনে পিঠে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিল। তূর্ণা বারবার বিব্রত হয়ে নিষেধ করলেও তার মুখের কঠোরতা এক বিন্দুও নরম হলো না।
“খেয়েছ?”
“হ্যাঁ।”
“সবটুকু?”
তূর্ণা মাথা নিচু করে মৃদুস্বরে মিনমিন করে বলল-
“অর্ধেক…”
রৌদ্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠে বিরক্তির চেয়ে উৎকণ্ঠাই বেশি।
“তূর্ণা, নিজের জন্য না হোক… অন্তত আমাদের সন্তানের জন্য ঠিকমতো খাবে। নিজের শরীরটাকে আর অবহেলা কোরো না। এমনি তুমি দূর্বল বেশি, তারউপর এত অনিয়ম করলে হয় নাঢ়
“সন্তানের” শব্দটা উচ্চারণ করার সময়ও সে জানত না, ভাগ্য আজ তার জন্য আরও বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে।
অল্পক্ষণ তাদের সিরিয়াল আসতেই তূর্ণাকে ধরে কেবিনে নিয়ে গেলো রৌদ্রিক। চিকিৎসক নিয়মিত পরীক্ষার সমস্ত প্রতিবেদন হাতে নিয়ে মৃদু হাসলেন।রৌদ্রিকের দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল চিকিৎসকের মুখে। তার বুকের ভেতর অদৃশ্য কোনো অস্থিরতা ক্রমাগত বিস্তার লাভ করছে। ডক্টর তূর্ণার হেল্থ চেক-আপ করার পর
আল্ট্রাসোনোগ্রাম করছেন, Ultrasound Machine স্ক্রিনে বাচ্চার হার্টবিট সহ নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে। রৌদ্রিক স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে, এমন দৃশ্য দ্বিতীয়বারের মতো দেখা সৌভাগ্য হয়েছে তার। রৌদ্রিকের হৃৎস্পন্দন দ্রুত গতিতে চলছে। তূর্ণার নিষ্পলক সেদিকে অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে রয়েছে, রৌদ্রিকের মুখপানে চেয়ে বোঝার চেষ্টা করলো মানুষটা অনুভূতি কেমন? বেবি আবারও নড়তেই তূর্ণা অবাক হয়ে বলে ওঠে-
“ ও..ও নড়ছে, ও কবে আমার কাছে আসবে?”
ডক্টর হাসলেন, তিনি আলতো হেসে বলেন-
“ কেবল তো ২৬ সপ্তাহ চলছে আরও সময় আছে।”
রৌদ্রিক এখন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, তার হাতজোড়া কেমন কাঁপছে। চোখ বন্ধ করে নিজের ভিতরকার উত্তেজনাকে কমিয়ে আনলো। কিছু সময় পর ডক্টর ফাইল বন্ধ করে হাসি মুখে বললেন-
“অভিনন্দন, মিস্টার রৌদ্রিক। মা এবং বাচ্চা সবাই সুস্থ আছে। তবে…”
তিনি সামান্য থামলেন। ডক্টরের তবে শোনার পর থেকেই রৌদ্রিক অস্থির হয়ে উঠলো বাকি অংশটুকু শোনার জন্য। অস্থির চোখে ডক্টরের পানে চেয়ে রইলো সে। ডক্টর তার চোখের চশমাটা ঠিক করে আবার বললেন-
“একজন নয়… আপনাদের ঘরে আসছে দুজন অতিথি। যমজ সন্তান।”
সময় যেন হঠাৎ থেমে গেল।শব্দগুলো বাতাসে ভেসে রইল, অথচ রৌদ্রিকের মস্তিষ্ক সেগুলো গ্রহণ করতে কয়েকটি মুহূর্ত সময় নিলো। দুজন! তার সন্তান।অবিশ্বাসে সে তূর্ণার দিকে তাকাল। তূর্ণাও বিস্ফারিত চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। পরক্ষণেই রৌদ্রিক ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে তূর্ণার সামনে বসে পড়ল। কাঁপতে থাকা দুহাত অত্যন্ত মমতায় তূর্ণার ছয় মাসের স্ফীত উদরের ওপর রেখে দিল। স্পর্শটি এতটাই কোমল, যেন সামান্য চাপেই ভেতরের দুটি প্রাণ ব্যথা পেয়ে যাবে। তার চোখ ভিজে উঠেছে। তার মত গম্ভীর মানুষটির বুক আজ অদ্ভুত এক দুর্বলতায় পূর্ণ। ফিসফিস করে বলল-
“তোমরা… দুজন?”
একফোঁটা অশ্রু নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।
“আল্লাহ… আমি কি সত্যিই এতটা সৌভাগ্যবান?”
তূর্ণা কাঁদতে কাঁদতেই মৃদু হেসে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। ডক্টর হেসে ফেললেন, তিনি রৌদ্রিক আর তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ জ্বী মিস্টার, তবে এখন আগের থেকেও বেশি সতর্ক থাকবে হবে। আপনার স্ত্রী এমনি দূর্বল ধাঁচের, তারউপর একসঙ্গে দইজন। তাই ডেলিভারিতে সমস্যা হতে পারে। তাই ওনার খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুতেই দিগুণ যত্ন আর খেয়াল রাখতে হবে। প্রতি দুই সপ্তাহ পর পর রেগুলার চেক-আপ করাবেন।”
রৌদ্রিক সবটা মনোযোগ দিয়ে শুনলো, তার ভিতরকার বাক্যগুলো যেনো ভিতরেই আটকা পরে রয়েছে। একদিকে যেমন আনন্দ হচ্ছে অপর দিকে অজানা ভয় গ্রাস করে নিচ্ছে তাকে। তূর্ণার তো না চাইতেও তার হাত দু’টো বার বার তার স্ফীত পেটের উপর রাখছে, অনুভব করার চেষ্টা করছে ভিতরে বেড়ে ওঠা তার দুটি প্রাণকে। সবচেয়ে বেশি উদীর্ণ হয়ে পরছে রোদেলাকে কথাটা জানানোর জন্য। তার পুতুল শুনলে তো পুরো বাড়ি মাথায় করে ফেলবে। তার একটা বেবি না দু’টো বেবি আসচ্ছে। কিছুসময় পর সবকিছু শুনে রিপোর্ট পেোর নিয়ে বেরিয়ে এলো তারা। রৌদ্রিক একদম নীরব হয়ে গেছে, তূর্ণা অধরভাজ থেকে হাসির রেখা সরছেই না। তূর্ণা রৌদ্রিকের স্তব্ধ মুখপানে চেয়ে বলে ওঠে-
“ তাড়াতাড়ি বাড়ি চলুন বর, পুতুলকে জানাতে হবে তো। এতোক্ষণে ও হয়তো ঘুম থেকে উঠে গেছে, ইসস রিনিকে ফোন দিন না, পুতুলের সঙ্গে একটু কথা বলি।”
রৌদ্রিক কিছু বললো না, গাড়িতে আসতেই সাবধানে তূর্ণাকে নিয়ে বসতেই ড্রাইভার গাড়ি চালাতে শুরু করেছে তাদের গন্তব্যস্থলের দিকে। তূর্ণা কথাই বলে যাচ্ছে, মেয়েটার চিন্তা নেই তার যে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে। সে কিভাবে রোদেলাকে বলবে সেটাই বলতে ব্যস্ত। গাড়ি চলছে অতি সাবধানতার সঙ্গে, রৌদ্রিক এবার মাথা নিচু করেই তূর্ণার উদরে দীর্ঘ একটি চুম্বন এঁকে দিল হঠাৎই। তূর্ণার কথা বন্ধ হয়ে গেছে, সে নিষ্পলক রৌদ্রিকের মুখপানে চেয়ে রইলো। রৌদ্রিক তার হাতটা তূর্ণার স্ফীত উদরের উপর রেখে অত্যন্ত ধীর মোলায়ম স্বরে বলে-
“শোনো ছোট্ট দুজন.. আমি তোমাদের এখনো দেখিনি। তোমাদের মুখ, চোখ, হাসি কিছুই চিনি না। তবুও আজ থেকেই পৃথিবীর প্রতিটি বিপদ আমার আগে তোমাদের কাছে পৌঁছাতে হলে আমাকে অতিক্রম করতে হবে। তোমাদের প্রতিটা কষ্টের ভার আগে পাপা নিবে। তাড়াতাড়ি সুস্থ ভাবে পাপার বুকে এসে পরো, পাপা,তোমাদের বিগ সিস্টার অপেক্ষা করছি তো। তোমাদের মা তো অবুঝ এখনো,পাপার কথা শোনে না একদমই। মা’কে একদম কষ্ট দিও না বেশি, সে খুব ছোট আর অবুঝ।”
তূর্ণা আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। চোখভর্তি জল নিয়ে রৌদ্রিকের কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিস করল-
“এত ভালোবাসেন কেন?”
রৌদ্রিক মৃদু হাসল। সেই হাসিতে মৃত্যুকে হারিয়ে ফিরে আসা এক মানুষের প্রজ্ঞা, এক স্বামীর নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং এক নবজাগ্রত পিতার অসীম মমতা একাকার হয়ে আছে।
“কারণ আল্লাহ আমাকে দ্বিতীয়বার জীবন দিয়েছেন। প্রথম জীবনটা আমি নিজের জন্য বেঁচেছিলাম… দ্বিতীয় জীবনটা শুধু তোমাদের চারজনের জন্য।”
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দ্বারপ্রান্তে সময় ধীরে ধীরে নিজের রঙ বদলাতে শুরু করেছে। বাড়ির মানুষেরা বসার ঘরে বসে রয়েছে নিত্যকার নিয়মে। বাহিরে থেকে গাড়ির শব্দ আসতেই বারান্দা থেকে দেখেই দৌড় দিলো রিনি। স্বভাবসিদ্ধ চঞ্চলতায় প্রায় দৌড়ে নেমে এলো নিচে।
“ভাবি এসেছে! ভাইয়া এসেছে!”
তার সেই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বাড়িজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে এলেন জবা সিকদার। পিছনেই রুমা সিকদার, রোমানা সিকদার। ইরা আর শ্রাবণ কয়েকদিনের জন্য তার বাবার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে তাই এই মুহুর্তে তার উপস্থিতি নেই। এইদিকে তূর্ণা গাড়ি থেকে নামার আগেই রৌদ্রিক যথারীতি হাত বাড়িয়ে দিল। রিনি মুখ বাঁকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলল-
“উফফ! ভাইয়া, ভাবিকে হাঁটতেও দেবে না নাকি?”
রৌদ্রিক নির্বিকার।
“না।”
“এত আদর করলে ভাবি কিন্তু আমাদের আর মানুষই মনে করবে না।”
রৌদ্রিক গম্ভীর মুখেই উত্তর দিল
“করুক। তুই মানুষ ছিলি কবে?”
এক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর পুরো উঠোনজুড়ে একসঙ্গে হাসির রোল উঠল। রিনি মুখ বাকলো রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে,রুমা সিকদার হেসে বললেন-
” ওরে বাবা! এই ছেলেটা যে প্রেমও করতে জানে, সেটা তো আগে বুঝিনি! যাক আমাদের ছেলের মনে তবে প্রেম আছে।”
রোমানা সিকদার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে যোগ করলেন—
“আমি তো ভাবছিলাম রৌদ্রিকের বুকের জায়গায় বুঝি পাথর বসানো। এখন দেখি ভেতরে পুরো মাখনের কারখানা!”
তূর্ণা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। রৌদ্রিক বরাবরের মতোই নির্বিকার, হাসি তারও এলো তবুও মুখের গাম্ভীর্য অটুট।
“তোমাদের শেষ হলো?”
রিনি সঙ্গে সঙ্গে বলল
“না। এখনো শুরুই করিনি।”
জবা সিকদার এতক্ষণ নীরব ছিলেন। তার অভিজ্ঞ চোখ এড়ায়নি রৌদ্রিকের মুখের অদ্ভুত প্রশান্তি। এই প্রশান্তি বহু বছর পর তিনি দেখছেন। ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন-
“ডাক্তার কী বললেন?”
এক মুহূর্তের জন্য সবাই থেমে গেল। রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তাকাল। তূর্ণা মৃদু হাসল। অতঃপর অত্যন্ত শান্ত স্বরে বলল-
“মা… আপনাদের জন্য একটা সুখবর আছে।”
রিনি আর স্থির থাকতে পারল না।
“আরে বলো না ভাবি!”
তূর্ণা একবার নিজের উদরে হাত রাখল। তূর্ণার মুখে এমন এক আলো ফুটে উঠল, যা মাতৃত্ব ছাড়া আর কোনো অনুভূতি মানুষকে দিতে পারে না।
“রোদেলার সঙ্গে… এবার আরও দুজন আসছে।”
“কীইই?”
রিনির প্রায় চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। রুমা সিকদার দুহাত মুখে চাপা দিলেন। রোমানা সিকদার বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেলেন। জবা সিকদার কিছুই বললেন না। শুধু ধীরে ধীরে তূর্ণার কাছে এগিয়ে এলেন। কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে পুত্রবধূর কপালে চুমু এঁকে দিলেন।তারপর দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আবেগভেজা কণ্ঠে বললেন-
“আলহামদুলিল্লাহ…! হে রব, আমার সংসারটাকে এভাবেই পূর্ণ রেখো।”**
তার চোখ ভিজে উঠেছে। এবার আর তিনি সেই জল লুকানোরও চেষ্টা করলেন না। তূর্ণার তো অবাক তার বিশ্বাসই হচ্ছে না তার শ্বাশুড়ি তার কপালে চুমু দিয়েছে, আবেগে তারও নেত্রকোণে অশ্রু ভীর করেছে। রিনি ইতোমধ্যেই তূর্ণার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে। কান পেতে তূর্ণার উদরের কাছে ফিসফিস করে বলল-
“এই যে ভেতরের দুজন! আমি কিন্তু সবচেয়ে কুল ফুফু। আগে থেকেই বলে রাখলাম!”
রুমা সিকদার সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি তুললেন
“এই মেয়ে! আগে জন্মাক, তারপর ভাগাভাগি করিস। তোর জ্বালায় এরাও সায়রা মতো তোর কোলেই উঠবে না দেখিস। এত চুমু দেয় কেউ?”
“ ও বোঝে না আমার চুমুর মজা কি, যেদিন বুঝবে সেদিন আর চুমু নেওয়ার জন্য লাইন ধরলেও দিবো না।”
রোমানা হেসে বললেন
” হয়েছে থাম বাবা, এই বাড়ির সবচেয়ে আদুরে দুই সদস্য আসতে চলেছে।”
“ এখানে দাঁড়িয়েই কি সব কথা শেষ করবি ভিতরে চল। তোর বাপ-চাচাদের এই খুশির খবরটা দেই।”
বলতে বলতে জবা সিকদার ভিতরে ঢুকে গেলেন। রৌদ্রিক তূর্ণাকে ধরে ভিতরে নিয়ে গেলো। তূর্ণা আশেপাশে রোদেলাকে খুঁজচ্ছে, কিন্তু এখানে নেই রোদেলা। তাই তাড়াতাড়ি উপরে রুমেই চলে গেলো। রুমে প্রবেশ মাত্রই রোদেলা এখনো নিদ্রামগ্ন অবস্থায় দেখতে পেলো। তূর্ণার মনটা মানলো না, ইচ্ছে করছে এখনি রোদেলাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে সবটা বলতে। কিন্তু ভাঙালো না, তূর্ণাকে এইভাবে শুতে দেখে রৌদ্রিক এগিয়ে এসে তূর্ণার পায়ের থাকা জুতাটা খুলে দিলো। অতঃপর পা দু’টো উপরে উঠিয়ে দিলো। তূর্ণার লজ্জা লাগলো, রৌদ্রিক প্রতিদিনই নিয়ম করে তার পায়ের মালিশ করে দেয়। প্রথম প্রথম দিতে চাইতো না কিন্তু রৌদ্রিক তার বারণ কোনোদিনও শোনে না। তাই কিছু বললো না, গায়ে থাকা ঢিলা জামা থাকায় সেটা আর পাল্টানোর প্রয়োজন হলোনা। কিছুখন পর তূর্ণা অনুভব করলো কেউ তার হাত ধুইয়ে দিচ্ছে। হালকা মাথা তুলে দেখতে পেলো রৌদ্রিক তার হাত সহ পা ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিচ্ছে। কিছুখন পর তার মুখ সহ গলাও মুছে দিলো সে। তূর্ণা কিছু বললো না, কারণ তার বলার প্রয়োজন হয় না। মানুষটা নিজ থেকেই নীরবে তার প্রতিটি জিনিসের খেয়াল রাখে সুস্থ হওয়ার পর থেকে আবারও।
তূর্ণা ঘুমন্ত রোদেলার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছে, কিছুসময় অতিবাহিত হতেই রোদেলা নড়েচড়ে তার বুকের মধ্যে মিশে যায়। আজ-কাল রোদেলাও বুঝদার হয়েছে, ঘুমের মধ্যেও বোঝার চেষ্টা করে যাতে তূর্ণার গায়ের উপর পা না তুলে দেয়। যদি তার পায়ের কারণে বেবি বা তার মা ব্যথা পায় সেই ভয়ে। রোদেলার কান্ড দেখে হেসে দিলো তূর্ণা, অতঃপর রোদেলার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে-
“ আমার পুতুল তো দুটো বেবির বিগ সিস্টার হবে। তাড়াতাড়ি উঠে পরো দেখি।”
তূর্ণার বলার কিছুসময় পর রোদেলা ঘুম থেকে আড়মোড়া ভেঙে উঠলো। ঘুম জড়ানো নেত্রদ্বয় মেলে তূর্ণাকে দেখলো, অতঃপর তূর্ণার বুকে মুখ গুঁজে ঘুম জড়ালো স্বরে বলে-
“ বেবি কবে আতবে মা?”
” আসবে তো আরও দেরি আছে। তবে রোদেলা একটা বেবি নয় দু’টো বেবির বিগ হবে।”
তূর্ণার কথা শুনের রোদেলা কিছুই বুঝলো না নিষ্পলক তূর্ণার মুখপানে চেয়ে রইলো। তূর্ণা সেটা বুঝতে পেরে আবারও বলে-
“ রোদেলার একটা ভাই/বোন নয় দু’টো বোন-ভাই আসবে।”
রোদেলা কিছুপর পুরো কথাটার মানে বুঝতেই আনন্দে চিৎকার দিয়ে ওঠে। শোয়া থেকে উঠে নরম বিছানায় লাফাতে শুরু করে।
“ তোদেলা দুতো ভাই-বোন আতবে। আমি দুতো বেবির তিতাল হবো।”
তূর্ণা হেসে ফেললো, এতোক্ষণ সে এই হাসিমুখটাই আগে দেখতে চাচ্ছিলো। এবার বসে পরলো, তূর্ণার স্ফীত উদরের উপর হাত রেখে বলে-
” এখানে দুতো বেবি আতে?”
“হুম!”
” ও ওদের তালাতালি আসতে বলো না।”
” বলছি, কিন্তু এখন আসার সময় হয়নি।”
” ওহহ, তালাতালি আতো বেবি। তিতাল আতোল করবো তো এত্তো!”
তাদের কথার মাঝেই সেখানে রৌদ্রিক উপস্থিত হলো। হাতে চিকেন সুপ, রৌদ্রিকের হাতে চিকেন সুপ অনেক দারুন। রোদেলা বা তূর্ণা কেউই মিস দেয় না। রোদেলা রৌদ্রিকে দেখা মাত্রই আনন্দের সঙ্গে বলে-
“ পাপা, পাপা জানো মা’র পেতে দুতো বেবি। আমি দুতো বেবির বিগ তিত্তাল হবো।”
” তাই নাকি? রোদেলার আরও একধাপ উপরে উঠলো।”
”হি হি, বেবিকে তালাতালি আসতে বলো পাপা।”
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৮
“ আসবে আর কয়েকটা মাস ওয়েট করো। এখন আসো গরম গরম সুপ খাবে।”
রোদেলা মাথা দুলালো। রৌদ্রিক তূর্ণা আর রোদেলা সুপ খাইয়ে দিচ্ছে, আর সে কথায় বলায় ব্যস্ত বেবিদের কি বলে ডাকবে, কি পরাবে, তার কোন খেলনা কাকে দিবে সব।
