Home তাকদীর তাকদীর পর্ব ১১

তাকদীর পর্ব ১১

তাকদীর পর্ব ১১
নিরুর কল্পনারাজ্য

স্বামীকে ভুল বুঝে থাপ্পড় মারার ফলস্বরূপ আয়রা যখন মধ্যরাতের তাহাজ্জুদে বসে ক্রমাগত তওবাতে নিমজ্জিত ছিলো তখন এমন সময়ে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি; বলাবাহুল্য তার বিবাহিত স্বামী জুনায়েদকে এইক্ষণে দেখে নির্বাক আদলে ক্রন্দনরত চোক্ষে অজ্ঞর ন্যায় চেয়ে রইলো তার পানে। মুখশ্রী জুড়ে বিস্ময়তার চিহ্ন। সে অবশ্যই মোটেই এই পুরুষকে এই মুহূর্তে এখানে আশা করেনি। চোখের পানিগুলো দু’চোখের দীর্ঘপল্লবের ভাঁজেই রয়ে গেলো জমাট হয়ে। পুরুষটি তার অধিক নৈকট্যে। যার দরুণ তার গায়ে থাকা মদের তীব্র ঝাঁঝালো এবং অসহ্য এক ঘ্রাণ নাসারন্ধ্রে এসে বারি খেলো আয়রার। তা ঠাহর করার পরমুহুূর্তেই আয়রার হঠাৎ গা গুলিয়ে ভীষণ করে বমি পেলো।

এতো বাজে দূর্গন্ধ। সে খানিকটা পিছিয়ে এলো। দু’হাতের সাহায্যে মুখখানা চেপে ধরলো আড়াআড়িভাবে। উগলে আসা বমিগুলো ঢোক গিলে নিজেকে সংবরণ করতে চায়লো। ভ্রু’দুটো কুঁচকে গেলো আপনাআপনি। দুহাতের মাঝে আয়রার নারী অবয়বের মুখমন্ডলের অধিকাংশ স্তর ঢেকে থাকার ফলস্বরূপ তার কৃষ্ণগহ্বরের ন্যায় আঁখিজোড়া উন্মুক্ত হলো জুনায়েদের নীল সায়রের ন্যায় নয়ন দুটিতে। জুনায়েদ আবিষ্কার করলো—মেয়েটির আঁখিজোড়া ভীষণ মায়াবি, অন্যরকম এক জাদু রয়েছে তার দু-চোখ মাঝারে। জুনায়েদ আরও আবিষ্কার করলো—তার সম্মুখের উপস্থির রমণীটির আঁখিপল্লব ভীষণ দীর্ঘ এবং ঘন। যা এই মুহূর্তে পানির কারণে ভারী হয়ে রয়েছে। রক্তিম চোখদুটো। জুনায়েদের মনে হলো সে বুঝি কয়েকটি হৃদস্পন্দন মিস করেছে এইক্ষণে! ইশ, চোখদুটোর পানে বুঝি তাকানো অনুচিত ছিলো তার। সে চেয়ে রইলো; কোনো এক সময়চক্রে ফেঁসে গেলো পুরুষটির চোখদুটো। একরাশ মুগ্ধতা জড়িয়ে সে লোচনে। ‘দুনিয়াতে বুঝি নেই তার রুহ; তার সেই মায়বী অথবা জুনায়েদের ভাষ্যমতে কালোজাদুকরনীর চোখদুটোর দখলে।’ হিজাবে আবৃত তার সম্পূর্ণ কায়া। এ’কি অবাককর বিষয় হচ্ছে? জুনায়েদ এমন এক হিজাবীনিকে এতোটা গ্রাহ্যতা কেনো দিচ্ছে? প্রশ্নটির পাল্টা উত্তরে মস্তিষ্ক তাকে জবাব ছুঁড়লো–‘কেননা সে জাদু জানে। কালোজাদু।’ নাহয় এমন পুরুষ কেনোই-বা তার জন্য এতোটা সভ্য হবে? উঁহু! জুনায়েদের মোটেই প্রশ্নটি পছন্দ হলোনা। মস্তিষ্ক এবং মনের তুমুল বিরোধিতায় হার হলো মস্তিষ্কের। জুনায়েদের সেই উত্তরখানা বেশ মনে ধরলো। তাই-তো সে চেয়ে রইলো এই মুহূর্তে দু’হাতের সাহায্যে মুখ ঢেকে রাখা আয়রার পানে। সে অস্ফুটে, তার নেত্রে ডুবে থেকে মদ্যপ অবস্থাতে তাকে বলে বসলো মনে প্রস্ফুটিত সেই বাক্যগুলো,

— এতো এতো ড্রাগসের নেশাও কখনো এই বেপরোয়া জুনায়েদ শাহরিয়ারকে নেশাক্ত করতে পারেনি; অথচ মেয়ে, তোমার চক্ষুপানে আঁখির মিলন ঘটতেই কেনো এই জুনায়েদ শাহরিয়ার মাতাল হচ্ছে? তোমার নেত্রে নেত্র নিবিষ্ট করার পর কেনোই-বা সে অন্যনারীর পানে নজর রাখতে পারেনা? বলতে পারো আমায়? আছে তোমার কাছে এর জবাব?
অতঃপর সে খানিকটা থামে। থমথমে হয় আয়রার মুখশ্রী। জুনায়েদ মদ্যপ হয়ে এসব কী বলছে? যা বলছে তা কী সে ভেবেচিন্তে বলছে? না-কী সে নেশার ঘোরে কেবল পাগলের প্রলাপ বকে চলেছে। জুনায়েদ ফের সময় নিয়ে ধীরলয়ে ভারী স্বরে মাত্র কয়েকবাক্যে আয়রার চোখদুটোর আখ্যা দিয়ে ফেললো,
— নেশার সর্বোচ্চস্তর যদি হয় হেরোইন,
তবে তার সর্বশেষ স্তর হবে মেয়ে তোমার চোখদুটো!
যার তরে প্রতিক্ষণে বিনাশ ঘটছে এই উন্মাদ বখাটের।
আয়রা চমকে গেলো। আদলে এবার ভর করলো বিস্ময়তা। সে অবাক লোচনে চেয়ে রইলো তার পানে। তার মুখে এমুহূর্তে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের সাক্ষাৎ পাওয়ার ন্যায় বিস্ময়তা। সে খানিকটা কাঁপা সাথে দৃঢ় স্বরে বলে,

— স..সরুন! আপনি নেশাদ্রব্য পান করেছেন?
জুনায়েদ সরে এলো। টনক নড়লো তার। আবারও ফিরে গেলো তার চিরচারিত গাম্ভীর্যতায়। সে ঝটপট উঠে দাঁড়ায়। চোখ নামিয়ে বাইকের চাবিখানা মুঠোয় পুরে। অতঃপর পিছু ফিরে পা বাড়ায় সম্মুখে। তবে থমকায় মেয়েলি কায়ার নরম; স্নিগ্ধ সুরে,
— শুনুন!
ছোট্ট একটি শব্দ—অথচ জুনায়েদের পা দুখানি থমকে দিতে সক্ষম। সে দাঁড়িয়ে পড়ে। ঘাড় ঘুড়িয়ে আয়রার সম্মুখে ফিরে। ট্রাওজারের পকেটে দু’হাত গলিয়ে সটান হয়ে দাঁড়ায়। আয়রা শান্ত ভঙ্গিতে জায়ানামাজ ভাঁজ করে তা হাতে নিয়ে দাঁড়ায়। নতমস্তকে দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ রেখেই বলে,

— আমি ক্ষমা চাইছি!
জুনায়েদ পরখ করে নিলো আয়রার কাচুমাচু হাবভাব। সে বেশ গম্ভীর কন্ঠেই জবাব দিলো,
— ফর হোয়াট?
— সকালের করা আমার কর্মকান্ডের জন্য।
জুনায়েদ এক ভ্রু উঁচায়। শুধায়,
— সত্যিই ক্ষমা চাইছো?
আয়রা ওপর-নিচ মাথা নাড়ে। জুনায়েদ এবার বেশ তীক্ষ্ণ স্বরে বলে,
— চোখে চোখ রেখে কথা বলো।
আয়রা আড়ষ্টতা নিয়েই মাথা তোলে। জুনায়েদের মুখপানে নিবদ্ধ রাখে তার নজর। জুনায়েদ শুধানো,
— কী নাম তোমার?
আয়রা মোটেই অবাক হলোনা। সে আশা করেনা কিছুই এই ব্যক্তির নিকট হতে। সে শান্তভাবে জবাব দিলো,
— ফাহমিদা শেখ আয়রা।
— বয়রা?
জুনায়েদ নাটকীয় ভঙ্গিতে তার জবাব করলো। অথচ সে তো জানেই আয়রার নাম। আয়রার কপালে ভাঁজ পড়লো। লোকটা কী বয়রা নাকি? সে তার নাম দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করলো,
— জ্বী, আয়রা!
জুনায়েদের বেশ মজা লাগলো। সে নিজের হাসিটুকু গিলে ফের শুধালো,
— হু?
আয়রা এবার খানিকটা বিরক্ত হলো। তবু নিজে ধাতস্থ রেখে জবাব করলো,
— জ্বী আয়রা আমার নাম।
জুনায়েদের ইচ্ছে করলো সে উচ্চশব্দে হাসবে। সে আয়রাকে আরও খানিকটা বিরক্ত করার ইচ্ছে পোষণ করলো। নিঃসন্দেহে সে তার মর্জির মালিক। তার ভাবনা যেমন তার কার্যকলাপও ঠিক তেমন। সে বেশ গাঢ় স্বরে জবাব দেয়,

— আচ্ছা।
আচ্ছা? এটা কেমন উত্তর হতে পারে? আয়রার ঠিক বোধগম্য হলোনা। জুনায়েদ পিছু ফিরলো বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। তবে আয়রা ফের তাকে পিছু ডাকলো,
— আমার ক্ষমা কী তবে মঞ্জুর হলো?
জুনায়েদ থেমে গেলো। শুধালো,
— ক্ষমা?
ওপর-নিচ মাথা নাড়লো আয়রা। জবাবে বললো জুনায়েদ,
— ওকে। নট আ বিগ ডিল। অলসো, কিছুক্ষণ আগে যদি কিছু বলে থাকি দ্যান ডোন্ট মাইন্ড ইট এট অল ওকে? নেশার ঘোরে কী কী বলে ফেলেছি..সো, এসব মাথায় নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
সে নিজের অনুভূতিগুলোকে বেশ কৌশলে এড়িয়ে গেলো। আয়রার পাল্টা জবাব,
— এসব না খেলে হয়না?
জুনায়েদ ভ্রু কুঁচকায়। চোখদুটো ছোট করে শুধায়,
— এখন আমার হাফ শোলডারের একটা লিলিপুটের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নিজের লাইফ লিড করতে হবে? ওয়াও, সো কুল!
আয়রা সাথেসাথেই এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ে। জবাবে বলে,

— এসব উশৃঙ্খলতা হতে বের হওয়া উচিত আপনার। আমার কথার অর্থ ছিলো এমনটা।
জুনায়েদ একই স্বরে প্রত্যুত্তর করলো,
— আমাকে উশৃঙ্খল বলছো তবে?
— হ্যাঁ!
আয়রার সোজাসাপ্টা জবাব। অবাক করলো জুনায়েদকে। সাহস তো মন্দ নয় তার। সে শুধায়,
— এতো সাহস তোমার?
— আপনাকে আল্লাহর পথে ফিরে আনতে হলে সাহসের প্রয়োজনীয়তা অধিক।
হেসে উঠলো জুনায়েদ। বললো,
— তুমি আমার পছন্দ জানো? যেখানে তোমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিইনি সেখানে তুমি আমার ওপর এতো অধিকার খাটাও কীভাবে?
আয়রা তবু শান্ত।
— আপনার পছন্দ যতই উগ্র হোক না কেনো এবং আপনি যতই খারাও হোন না কেনো..আপনাকে দ্বীনের পথে আনা আমার কর্তব্য।

তাদের কথোপকথনের মাঝেই আমিরার কান্নার আওয়াজ শোনা গেলো। সে ডুকরে উঠেছে হঠাৎ মধ্যনিদ্রায়। জুনায়েদ-আয়রা নিজেদের কথোপকথন থামিয়ে আমিরার পানে মনোযোগ দিলো। যে আপাতত উঠে বসেছে। আয়রা উদ্বীগ্ন হয়ে তার কাছে যাওয়ার পূর্বে অবাককর এক ঘটনা ঘটে গেলো। জুনায়েদ প্রথমেই; তার আগে ছুটে গেলো আমিরার পানে। কিছু একটা ভেবে আমিরাকে স্পর্শ করার পূর্বে সারা অঙ্গে পারফিউমের ছিঁটে দিলো। বেডসাইড টেবিলেই রাখা ছিলো বলে অসুবিধে হলোনা। অতঃপর সে নিদ্রায় কান্না করতে থাকা আমিরাকে কোলে তুলে নিলো ভীষণ আদুরে ভঙ্গিতে। পিটে রেখে চাপড় দিতে দিতে শান্ত করার চেষ্টা করলো তাকে। যতদূর বুঝতে পারলো, বাচ্চাটা তার বাবাকে চায়ছে। জুনায়েদ তাকে কোলে নিয়ে সারা রুমে হাঁটাহাঁটি আড়ম্ভ করলো। শান্ত করতে বললো,

— এইতো, এইতো আম্মু! কাঁদেনা..লক্ষী আমার…
এমন আরও গুটিকতক শব্দ সে ব্যবহার করলো। আয়রা বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রইলো। এক্ষুণিই তার সাথে কঠোরভাবে কথা বলা ব্যক্তি এবং আমিরাকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ব্যক্তি দু’টোকে তার এক মনে হলোনা। যেখানে জুনায়েদ এতোটা উগ্র সেখানে আমিরার প্রতি এতোটা মমতা সে আশা করেনা। সে কাছে গেলো জুনায়েদের, বললো,
— আমাকে দিন…
তাকে চুপ করাতে জুনায়েদ অধরযুগলে তর্জনী ছুঁয়ে ইশারা করে চুপ করতে। আমিরা বোধহয় প্রায় ঘুমিয়েছে। সে আবারও তার কার্যে অব্যাহত রইলো। আমিরাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে আড়ম্ভ করলো। আয়রা চেয়ে রইলো তার পানে। এ’কি অবাককর কান্ড!

রুহানি সৈয়দ ঘুম না হওয়ার দরুণ এপাশ-ওপাশ ফিরছে। তার মস্তিষ্কে তার পুত্র জুনায়েদের বিচরণ। সে কেবল ভাবছে–জুনায়েদ যা রাগী পুরুষ, তার করার কথা ছিলো আয়রার থাপ্পড় মারার সাথে সাথে তাকে কটুক্তি শোনানো। অথচ সে তা করেনি। কিছু বলেনি অব্দি। তার এখনো মনে আছে। একবার জুনায়েদকে থাপ্পড় মেরেছিলেন তিনি। এ’কারণে জুনায়েদ তার রুমে এতোটা পরিমাণ ভাঙচুর করেছিলো যে সেসব ঠিক করতে তার পঞ্চাশ হাজার মতো খরচ হয়েছিলো। তখন জুনায়েদ কেবল ষোলো বছরের কিশোর। তাকে শাসন করা তো দূর কিছু বলা অব্দি যায়না। অথচ আয়রার করা এতো বড় অপমানে সে নিশ্চুপ? তবে কী আয়রার সাথে জুনায়েদের বিয়ে করানোটা স্বার্থক হচ্ছে? জুনায়েদ কী ধীরে ধীরে আয়রার প্রতি আসক্ত হচ্ছে?
তিনি নিজমনে বিড়বিড় করলেন,

— আমি জানি জুনায়েদের মতো একজন পুরুষের সাথে আয়রার মতো একজনকে একত্র করেছি আমি কেবল নিজ স্বার্থে, নিজের ছেলের স্বার্থে। তবে আশা করছি যে এর ফল খারাপ হবেনা।
তাছাড়া তিনি আরও এক জিনিস লক্ষ্য করলেন–জুনায়েদ কখনো বাচ্চা পছন্দ করতোনা। জুনায়েদ বাচ্চা দেখলেই সর্বদা বিরক্ত হতো; অযথা সামান্য ভুলেও গায়ে হাত তুলতে পিছুপা হতোনা। একপ্রকার তার এসব কারণেই রুহানি সৈয়দ দ্বিতীয়বার বাচ্চা নেওয়ার সাহস করে উঠতে পারেননি। অথচ আজ সেই ছেলে কি-না আমিরাকে নিজের বাইকে করে বাহিরে নিয়ে গিয়েছে?

তাকদীর পর্ব ১০

কীভাবে সম্ভব যেখানে আমিরা তার নিজের মেয়েও নয়। জুনায়েদের এসব পরিবর্তন রুহানি সৈয়দের রাতের ঘুম হারাম করছে। তিনি আরও একবার এটাতে বিশ্বাস করলেন যে–‘খোদার তাকদীর বলতে কিছু বাস্তবিক-ই হয়।’ তা নাহলে আয়রার ভাগ্য শেষ অব্দি জুনায়েদে এসে উপনীত হলো কেনো? রজনীর শেষ ভাগে সে নিজমনে প্রশান্তির এক হাওয়া অনুভব করলো। জুনায়েদের মতে ছেলের শেষ অব্দি উন্নতি হচ্ছে কিনা।

তাকদীর পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here