তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৬
জেরিন আক্তার
প্রাণেশা আরশাদ খান, নাহার বেগম আর রোকেয়া বেগমের সামনে এসে তির্যক গলায় বলল,
“আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম ভাইয়া একরাতে কি করে সিলেট যাবে? আবার ফোন রেখে গিয়েছে। রুমে ফিরে দেখলাম সবকিছু একই রকম। একটা জামাকাপড়ও সরায়নি। এখন বলছো হসপিটালে। আমায় বলো না ভাইয়ার কি হয়েছে? হসপিটালে কেনো?”
আরশাদ খান কথা ঘোরাতেও পারবেন না এমন করে প্রশ্ন করেছে। কেউই জানতো না এতো সকালে প্রাণেশা উঠে নিচে আসবে। নাহলে কেই বা ওর সামনে সৌরভের কথা বলতে যাবে। আরশাদ একে একে সব বললেন। প্রাণেশা সব শুনে তখনই হসপিটালে যাওয়ার কথা বলল। আরশাদ খান বললেন,
“এখন যাবে? তাও একা?”
প্রাণেশা উত্তরে বলল,
“হ্যা যাবো। ভাইয়াকে না দেখা পর্যন্ত আমার স্বস্তি হচ্ছে না।”
আরশাদ খান বললেন,
“একটু পরে আমরা যাবো। স্নিগ্ধও যাবে। তখন যেও?”
প্রাণেশা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“ঠিক আছে।”
প্রাণেশা উপরে নিজের রুমে চলে এলো। স্নিগ্ধকে শুয়ে থাকতে দেখে ওকে ডাকতে শুরু করলো। স্নিগ্ধ ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“কি হয়েছে এমন করছো কেনো?”
প্রাণেশা বিছানায় বসে বলল,
“হসপিটালে ভাইয়াকে দেখতে যাবো, উঠে রেডি হন।”
স্নিগ্ধ চকিতে মাথাটা তুলল। বলল,
“কিসের হসপিটাল? কেনো?”
প্রাণেশা পাশ থেকে বালিশটা নিয়ে স্নিগ্ধকে বারি মেরে বলল,
“আমি জানি ভাইয়া অসুস্থ। আমার থেকে লুকাতে হবে না। এখন তাড়াতাড়ি উঠে রেডি হবেন? নাকি একাই চলে যাবো?”
স্নিগ্ধ উঠে বসলো। শান্ত দৃষ্টিতে প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে বলল,
“যাচ্ছি। আর শোনো, একটা কথা বলবো?”
“বলুন।”
“তোমার ভাই কি ইভাকে পছন্দ করে নাকি?”
প্রাণেশা দরজা দিকে একবার তাকিয়ে স্নিগ্ধকে বলল,
“ভাইয়া পছন্দ করে না। কিন্তু ইভা পছন্দ করে ভাইয়াকে।”
স্নিগ্ধ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“এই জন্যই তো বলি, মেয়েটা তোমার ভাইকে দেখলে এতো ইমোশনাল হয় কেনো?”
প্রাণেশা কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“ওসব কথা ছেড়ে রেডি হন, নাহলে এখন আমি আপনাকে ইমোশনাল বানাবো।”
সকাল ৮ টার দিকে আরশাদ খান আর আনোয়ার হোসেন, নাহার বেগম চলে গেলেন হসপিটালে সৌরভের জন্য খাবার নিয়ে।
আর বেলা ১০টার দিকে স্নিগ্ধ ,প্রাণেশা আর ইভাকে নিয়ে গেলো হসপিটালে। প্রাণেশা বেশ অস্থির হয়ে আছে।
হসপিটালে পৌঁছে চলে এলো তিনতলায়। সৌরভের কেবিনের সামনে এসে দেখলো আরশাদ খান, নাহার বেগম আর আনোয়ার হোসেন বের হলেন। এরপরে প্রাণেশা ঢুকলো। সৌরভ শুয়ে শুয়ে আপেল খাচ্ছে। সকালে ওর ফোনটা আরশাদ খান নিয়ে এসেছে, সেই ফোনই স্ক্রল করছে।
প্রাণেশা এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল,
“কেমন আছো ভাইয়া?”
সৌরভ ঠান্ডা মেজাজে আপেলে কামড় বসিয়ে বলল,
“ভাইকে দেখতে এসেছিস?”
“হুমম। আমাকে কেউ বলেনি তুমি অসুস্থ, আজ সকালে জানতে পেরে চলে এসেছি।”
সৌরভ আপেলে আরও একটা কামড় বসালো। এরপরে জিজ্ঞাসু কণ্ঠে বলল,
“ভাইকে দেখতে এসেছিস কি নিয়ে এসেছিস? খালি হাতে এসেছিস ভাইকে দেখতে! ছিহ! যা কেবিনে থেকে বের হ!”
প্রাণেশা রাগী মুখ করে তাকিয়ে আছে। সৌরভ মুখ বাকিয়ে বলল,
“কিপ্টে কোথাকার।”
সৌরভ প্রাণেশাকে মশকরা করেই কথাগুলো বলল। স্নিগ্ধ কালকে আসার সময় খালি হাতে আসেনি। তবুও ভাই-বোনের মাঝে এইটুকু দুষ্টু-মিষ্টি ঝগড়া স্বাভাবিকই।
ওদের কথার মাঝে রুমে ঢুকলো স্নিগ্ধ আর ইভা। সৌরভ ইভাকে দেখে মনে মনে বলে, “এর আবার আসতে হবে কেনো? সৌরভ তু্ই যতই প্রেম-ভালোবাসা থেকে দূরে থাকতে চাস কিন্তু এরা তোর পিছুই ছাড়ছে না।”
ইভা কাছে এসে সৌরভকে বলল,
“কেমন আছো ভাইয়া?”
সৌরভ হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ভালো। তু্ই?”
“ভালো।”
স্নিগ্ধ হুট্ করে মিথ্যে বাহানা দিয়ে ইভাকে বলল,
“ইভা একটু বাহিরে গিয়ে দেখো তো, একটা ব্যাগ রেখে এসেছি নিয়ে এসো তো।”
“যাচ্ছি।”
ইভা দরজা খুলে চলে যেতেই স্নিগ্ধ সৌরভের কাছে এসে হেসে হেসে বলল,
“ভাইয়া ইভাতো আপনাকে ভালোবাসে আপনার কি ওকে পছন্দ না। ভালোই তো মেয়েটা। আপনার অসুস্থতার জন্য কাঁদে। ভালো না বাসলে কি আর কাঁদে। তাহলে পাত্তা দিচ্ছেন না কেনো?”
সৌরভ হেসে বলল,
“আল্লাহ ভালো জানে।”
ইভা রুমে ঢুকলো। স্নিগ্ধকে বলল,
“ভাইয়া বাহিরে কোনো ব্যাগ নেই তো।”
স্নিগ্ধ পেছন ফিরে বলল,
“ওহ, না থাকলো এসো। হয়তো গাড়িতে।”
প্রাণেশা ইভার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হেসে সৌরভকে কিছু একটা ইশারা করলো। সৌরভ কটমট দৃষ্টিতে তাকাতেই ও আবার অন্যদিকে তাকালো।
দুপুরের দিকে স্নিগ্ধ, প্রাণেশা, ইভা একসাথে ফিরছে। স্নিগ্ধ ড্রাইভ করছে। আর দুজনে ব্যাক সিটে বসেছে। প্রচুর গরম। এরই মধ্যে ইভা প্রাণেশাকে একটু ঘেঁষে ফিসফিস করে বলল,
“সৌরভ ভাইয়ের অসুস্থতার জন্য তোর সাথে ভালো করে কথাই হয়নি। তো তোদের বাসর রাত কেমন কেটেছে রে?”
প্রাণেশার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। স্নিগ্ধ শুনতে পেয়েও না শোনার ভান করে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছিলো। প্রাণেশাও ফিসফিস করে ঝাড়ি মেরে বলল,
“তোর বুদ্ধি-সুদ্ধি কিচ্ছু হবে না। উনার সামনে কি বলিস?”
ইভা নিজেকে বাহবা দিয়ে বলল,
“আরে আমি দুলাভাইয়ের দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র শালী। আমি এসব বলতেই পারি। তু্ই লজ্জা পেতেই পারিস আমার কি?”
স্নিগ্ধ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“ইভা কি এমন বলেছো যে তোমার বোন লজ্জা পেলো?”
ইভা কিছু বলার আগেই প্রাণেশা বলে উঠল,
“কিচ্ছু বলেনি। আচ্ছা আমার না গলা শুকিয়ে এসেছে, পানি এনে দিননা।”
স্নিগ্ধ গাড়ি থামিয়ে নামলো। প্রাণেশা ইভাকে বলল,
“বাসর নিয়ে তু্ই যদি উনার সামনে আমাকে কোনো প্রশ্ন করেছিস তাহলে তোর খবর আছে।”
ইভা হেসে হেসে বলল,
“বাব্বাহ দুলাভাই তোকে এতো ভালোবাসে যে লজ্জায় লাল হয়ে যাস। আমি তো আরও বলবো।”
“তু্ই বললে আমিও সৌরভ ভাইকে বলে দিবো তু্ই এর আগেও একটা রিলেশন করেছিস তখন ভাইয়া তোকে পছন্দ করবে?”
ইভা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বসে রইলো। স্নিগ্ধ ফিরে এলো। পানি, কোল্ডিংস, চিপস নিয়ে এসেছে। ওরা ভালোই ভালোই বাড়িতে ফিরে এলো। স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে ড্রইং রুমে বসতে না দিয়ে রুমে নিয়ে এলো।
প্রাণেশা শাওয়ার নেওয়ার জন্য জামাকাপড় বের করলো। স্নিগ্ধ শার্ট খুলে বিছানায় বসে একটা রেকর্ড অন করলো। স্নিগ্ধ তখন গাড়িতে থেকে নামার সময় ফোনের রেকর্ড অন করে গিয়েছিলো। বাসর নিয়ে কি কথা হয়েছে সব স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। যা শুনে প্রাণেশা কাছে এসে বলল,
“আমি বলিনি এগুলো।”
স্নিগ্ধ বাঁকা হেসে বলল,
“পাশে বসো।”
“না, শাওয়ার নিবো।”
“আরে একটু বসোই না।”
প্রাণেশা এসে বসতেই স্নিগ্ধ ওর কোলে বসালো। স্নিগ্ধ প্রাণেশার পেটে হাত রেখে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“এতো লজ্জা পাও আমার কাছে আসতে? আমি তোমার স্বামীই তো।”
“এই সরুন তো, শাওয়ার নিবো। পরে শুনবো আপনার কথা।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে কোলে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলল,
“এখনই বলবো কথাগুলো। শাওয়ার নিতে নিতেই বলবো। তবুও শুনতে হবে, পরে হবে না।”
বিকেলে —
প্রাণেশা ড্রইং রুমে বসে ইভার সাথে একটু টিভি দেখছিলো। স্নিগ্ধ নিঃশব্দে এসে পেছনে দাড়ালো। একটু পরপর প্রাণেশার চুল টান দিচ্ছিলো। প্রাণেশা মনে করছিলো হয়তো ইভা এমন করছে। কিন্তু ইভা পেছন ফিরে স্নিগ্ধকে দেখে মুচকি হেসে চলে গেলো। ইভা চলে যাওয়ার পরেও যখন প্রাণেশার চুলে টান লাগছিলো তখনই প্রাণেশা পেছন ফিরে স্নিগ্ধকে দেখে হেসে বলল,
“তাহলে আপনি এতক্ষন ধরে জ্বালাচ্ছেন?”
স্নিগ্ধ বাচ্চাদের মতো ফেস বানিয়ে বলল,
“বউ একটু ঘরে চলো না।”
“কেনো? কি লাগবে বলুন এনে দিচ্ছি!”
“কিচ্ছু লাগবে না তোমাকে লাগবে।”
“পারবো না। পরে যাবো। এখানে বসুন।”
স্নিগ্ধ ওর পাশে এসে বসলো। তবে ভালো ভাবে বসে রইলো না। প্রাণেশাকে জ্বালাতন করতে শুরু করলো। প্রাণেশা কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“দাঁড়ান মাকে ফোন করে বলছি আপনি জ্বালাচ্ছেন।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে নিজের সাথে চেপে ধরে ঠোঁটে-ঠোঁট মিশিয়ে নিলো। প্রাণেশা স্নিগ্ধকে দূরে সরানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। নিজেদের রুমে হলে কিছুই হতো না। কিন্তু এই ড্রইং রুমে এসব কেউ দেখলে কি মনে করবে। স্নিগ্ধর মাথায়ও একই চিন্তা কেউ দেখলে? ও তখনই ছেড়ে দিলো প্রাণেশাকে। প্রাণেশা স্নিগ্ধর বুকে চাপর মেরে উঠে দাড়ালো। এখানে থাকলে আবার কি করে বসে তাই সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলো। স্নিগ্ধ প্রাণেশার যাওয়ার পানে তাকিয়ে হেসে বলল,
“ফিরতে রাত হবে।”
প্রাণেশা মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বলল, “অসভ্য কোথাকার।”
পরেরদিন সকালেই হসপিটালে থেকে সৌরভকে ডিসচার্জ করে দিলো। সৌরভ সুস্থ প্রায় কিন্তু হাঁটতে গেলে একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটে। ডক্টর বলেছে সপ্তাহ খানিক গেলেই ঠিক হয়ে যাবে।
সৌরভ বাড়িতে আসার কথা শুনে সাঈদ রেজা চৌধুরী আর রাজিয়া বেগম বিকেলে ওকে দেখতে এলেন। সুবহা আসেনি। কত জোর করলো আসার জন্য কিন্তু ও নিজেই এলো না। ও ইচ্ছে করেই এলো না। সৌরভের সামনে দাঁড়ানোর মতো মুখ ওর নেই। ও আগেই বুঝেছিলো ওকে ভালোবাসার কথা বললেও ওর মন গলবে না। কিন্তু না বলেও থাকতে পারছিলো না বিদায় বলে দিলো। কিন্তু শেষে ওকেই কষ্ট পেতে হচ্ছে। থাক না, ও বরং দূর থেকেই ভালোবেসে যাবে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ঠিকই গুমরে মরছে সৌরভের জন্য। কিন্তু সৌরভ কি বুঝতে পারবে ওর কষ্ট?
সন্ধ্যার দিকেই সাঈদ রেজা চৌধুরী আর রাজিয়া বেগম চলে গেলেন।
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৫
পরদিন বিকেলে স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে নিয়ে বাড়িতে যাওয়ার জন্য রওনা হলো। ওদের আসতে আসতে প্রায় সন্ধ্যা ৭ টা বেজে গেলো। প্রাণেশাকে বাড়িতে রেখে স্নিগ্ধ বাহিরে বেরোলো। বলে গেলো একটু পরেই আসবে।
প্রাণেশা রাজিয়া বেগমের সাথে কথা বলে উপরে এলো। সুবহার সাথে টুকটাক কথা বলে নিজের রুমে চলে এলো। ও বেশ অবাক হয়েছে কেননা সুবহা কয়েকদিন ধরে রুম থেকেই বের হচ্ছে না।
যাই হোক প্রাণেশা রুমে ফিরে লাইটটা অন করতেই বিস্মিত চোখে বিছানার দিকে তাকিয়ে রইলো। পুরো বিছানায় গোলাপ ফুলের পাঁপড়ি। একপাশে আবার একগুচ্ছ গোলাপ। ও স্নিগ্ধকে কল দিলো।
