Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২
আয়েশা শেখ

‘যাকে বিয়ে করতে এসেছে এবং যাকে বিয়ে করেছে দু’জনই পালিয়ে গেলো? প্রফেসরের সিস্টেমে নিশ্চিত ঘাবলা আছে।’
আকাশ কল করার পর বিয়ের আসরে আশেপাশের গুণগুণ করা এমন কথা কানে ভেসে আসতেই মেজাজ দ্বিগুন চওড়া হলো বারিশের। রাগ করে সে কল কেটে দিয়েছে। কিন্তু ওপাশ থেকে আকাশ নাছোড়বান্দার মতো বারবার রিং করেই যাচ্ছে। বিরক্তিতে বারিশ ফোনটাই বন্ধ করে দিল।

গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত মুঠিতে চেপে ধরে সে এক্সিলারেটরে জোরে পাড়া দিল। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি এখন ঝড়ের গতিতে ছুটছে। দাঁতে দাঁত চেপে, স্টিয়ারিংয়ে একটা জোরে থাপ্পড় মেরে বারিশ ক্ষিপ্ত গলায় গর্জনে ফেটে পড়ল,
_​“পুরো পরিবারটাই একটা ফ্রড! আগেরজন তো তাও বিয়ের আগে পালিয়েছে, আর তুমি? নাচতে নাচতে বিয়ের পিরীতে বসে, কবুল বলে, তারপর ঢ্যাং ঢ্যাং করতে করতে পালালে! আই উইল নট স্পেয়ার ইউ, ঝিলমিল! এই অপমানের শেষ আমি দেখেই ছাড়ব!”
গাড়ির স্পিডমিটারের কাঁটা আরও ওপরে উঠছে। বারিশ স্টিয়ারিংয়ে শক্ত চাপ দিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু মাথার ভেতর লোকজনের ফিসফিসানিগুলো কিছুতেই থামছে না।
​ঠিক তখনই হেডলাইটের আলোয় সামনের রাস্তায় পরিচিত অবয়ব ভেসে উঠল। সরু হলো বারিশের চোখ দুটো।
​সঙ্গে সঙ্গে সে ব্রেক কষে গাড়ি থামায়। গাড়িটা ঠিক ঝিলমিলের গা ঘেঁষে থেমে যায়। ​হঠাৎ গাড়ির মুখোমুখি হয়ে ঝিলমিল থমকে দাঁড়াল। কিন্তু বারিশের গাড়িটা চিনতে পেরে তার চোখ জোড়া ভয়ে বড় বড় হয়ে গেল। এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে, সে উল্টো ঘুরে আবার মরিয়া হয়ে দৌড় দিল।

_“ ঝিলমিল!”
​বারিশের গলা দিয়ে একটা হুংকার বেরিয়ে আসে। সে দ্রুত গাড়ির দরজা খুলে বের হয়ে এসে প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায় ঝিলমিলের পিছু নেয়।
_“ পালাবে যখন বিয়ে করলে কেন আমায়? দাড়াও বলছি! ধরতে পারলে ঠ্যাং ভেঙে দেব তোমার!”
বারিশ দৌড়াতে থাকা ঝিলমিলের পিছু ছুটতে ছুটতে বলছে।
_“ বউ সাজার জন্য বিয়ে করেছি, সংসার করার জন্য নয়।”
ঝিলমিল দৌড়াতে দৌড়াতে বলল। ভারী শাড়ী গহনা নিয়ে যতটুকু সম্ভব দৌড়াচ্ছিল। বাড়ির অনেকটা দূরেও সে চলে গিয়েছিল। ভেবেছিল একটা বাস বা ট্রেন পেলেই আপাতত দূরে কোথাও চলে যাবে। স্টেশনের কাছাকাছিও চলে গিয়েছিল সে! কিন্তু যার জন্য পালাচ্ছিল সে-ই এসে সামনে ধরা দিলো।
_“ তুমি কী দাড়াবে? ধরতে পারলে খুব বাজে অবস্থা করব আমি তোমার!”
ঝিলমিল এসব কিছুই শুনছে না। সে নিজের সবটুকু শক্তি ঢেলে দৌড়াচ্ছে। শাড়ী পড়ে দৌড়ানোর কারণে শাড়ীটা খুলে খুলে যাচ্ছিল। সে উচু করে রাখা শাড়ীর কুচি ছেড়ে দু’হাতে বুকে জড়িয়ে দৌড়াতে লাগল। আর ঠিক তখনই বাঁধল বিপত্তি। পায়ের কাছে কাপড়ের ঘের আটকে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পাকা রাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়ল সে।

মেয়েটার এই পতন দেখে বারিশের পায়ের গতি থেমে যায়। ঠোঁটের কোণে বিজয়ী হাসির রেখা ফুটিয়ে সে ধীর পায়ে এগোতে লাগল ঝিলমিলের দিকে। মাটিতে বসে থাকা অবস্থাতেই ঝিলমিল ভয়ে ভয়ে পেছনের দিকে সরতে লাগল, আর বারিশ ঠিক ততটাই নিঃশব্দে এগোতে থাকল। ঝিলমিল আরও পেছায়। লোকটা আরও এগোয়। এভাবে কতক্ষণ চলতে থাকে। তারপর ঝিলমিল আচমকা উঠে আবারও দৌড় লাগানোর প্রস্তুতি নেয়।
_“ আমাকে ধরা এত সহজ ন…আহহহহ!”
এতটুকু বলে বেচারি ঘুরে দৌড় দিতে গিয়ে পথের ধারের এক কারেন্টের খাম্বার সাথে সজোরে ধা’ক্কা খায়। কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশটা যেন তার চোখের সামনে ঘুরতে লাগল, মাথার ভেতরে যেন একঝাঁক ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে উঠল!

​কপালটা ততক্ষণে বেশ ভালোমতোই ফুলে উঠেছে। ঝিলমিল জানত, আজ রাতে তার কপালে আরও দুর্ভোগ আছে। কিন্তু এই কারেন্টের খাম্বাটা যে ঠিক এই সময়েই তার পথ আগলে দাঁড়াবে, তা ভাবেনি। এমনিতেই পেছনে জ্যান্ত এক খাম্বা তাকে তাড়া করে ফিরছে, তার ওপর আবার এই জড় খাম্বার আগমন! ​ফুলে ওঠা কপালে আঙুল বুলিয়ে, যন্ত্রণায় চোখমুখ কুঁচকে পেছনে তাকাতে না তাকাতেই গালে এসে পড়লো বারিশের শক্ত হাতের আঘাত! ঝিলমিলের মাথায় এবার আরেক দফা ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে উঠল। চোখ বন্ধ করে গালে হাত দিয়ে দাড়িয়ে আছে সে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ মেলল। প্রথমে কারেন্টের খাম্বার সাথে কপালে, তারপর জ্যান্ত খাম্বার হাতে গালে! পরপর দুটো আঘাতে অনিচ্ছাকৃতই মেয়েটার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
বারিশ নিজের মাঝারি সাইজের লম্বা চুল গুলো কপাল থেকে সরিয়ে বলল,
_“তুমি কি নিজ দায়িত্বে ভদ্রভাবে গাড়িতে গিয়ে বসবে, নাকি আমি ব্যবস্থা করব?”
​ঝিলমিল অভিমানে আর ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

_ “আমি যাব না। আপনি চলে যান, চাচ্চু! আমি কিছুতেই…”
​বাকি কথাটুকু আর ঝিলমিলের ঠোঁট গলে বেরোনোর সুযোগই পেল না। বারিশ এক ঝটকায় তার পেশিবহুল, শক্তপোক্ত হাত বাড়িয়ে ঝিলমিলকে পাঁজাকোলা করে শূন্যে তুলে নিল। নিমেষেই মেয়েটা আছড়ে পড়ল বারিশের চওড়া কাঁধের ওপর। আচমকা এই ভারসাম্যের পরিবর্তনে নিজেকে সামলাতে প্রথমে অবচেতনভাবেই বারিশের গলা জড়িয়ে ধরল ঝিলমিল। পরক্ষণে ঘোর কাটতেই মাটিতে নামার আকুতি নিয়ে বারিশের পিঠে দুহাতে কি’ল-থা’প্পড় মারতে শুরু করল,
_“চাচ্চু, প্লিজ আমাকে নামিয়ে দিন! আমি যাব না বলছি তো। আমি এই বিয়ে মানি না!”
​বারিশের কানে যেন এই আর্তনাদ পৌঁছালই না। সতেরো বছর বয়সী অবুঝ বিবির সমস্ত আ’ক্রমণ আর হাতের থা’প্পড় মুখ বুজে সহ্য করে সে হনহন করে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ঝিলমিল মরিয়া হয়ে একপর্যায়ে বারিশের শক্ত কাঁধে কা’মড় বসিয়ে দিল। কিন্তু তাতেও ওই পাষাণ পুরুষের কোনো হেলদোল হলো না। গাড়ির দরজা খুলে একপ্রকার জোর করেই তাকে ভেতরে বসিয়ে দরজা লক করে দিল সে।
​গাড়ির ভেতর কিছুক্ষণ অনর্থক চেঁচামেচি করে ক্লান্ত হয়ে শান্ত হলো ঝিলমিল। ভাবল বাড়ি ফিরলে আব্বু নিশ্চয়ই তাকে এই রাগী প্রফেসরের হাত থেকে বাঁচিয়ে নেবেন। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর যখন সে দেখল, গাড়িটা তাদের বাড়ির গেটে না ঢুকে পাশের বাড়ি অর্থাৎ শেহরিয়ার ভিলার রাজকীয় গেট গলে ভেতরে প্রবেশ করছে, তখন তার বুকের ভেতরটা আবার ছ্যাৎ করে উঠল। সে পুনরায় চিৎকার করে উঠল,

_“একি! এখানে কেন যাচ্ছেন? আমাদের বাড়ির গেট তো এটা না! এটা তো আপনাদের বাড়ি!”
​গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে বারিশ অত্যন্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় জবাব দিল,
_“আজ থেকে এটাই তোমার একমাত্র বাড়ি।”
​ঝিলমিল আবার ছটফট করে উঠল,
_ “যাব না! নামিয়ে দিন আমাকে। আমি এই বাড়িতে কিছুতেই পা দেব না!”
​এবারও তার কোনো আকুলতা বারিশের কানে স্পর্শ করল না। আগের মতোই ঝিলমিলকে কাঁধে তুলে নিয়ে দীর্ঘ পদক্ষেপে গাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলো সে। লন পেরিয়ে, শেহরিয়ার বাড়ির সদর দরজা পার হয়ে, বিশাল লিভিং রুমের সব পেছনে ফেলে সে সিঁড়ি বেয়ে সোজা নিজের ঘরের দিকে এগোতে লাগল।
এদিকে লিভিং রুমে তখন এক থমথমে পরিবেশ। পুরো শেহরিয়ার বাড়ির লোক চাতকের মতো নতুন বর-বধূর অপেক্ষায় বসে ছিল। স্বয়ং বাড়ির বড় আম্মা, শেহরিয়ার ঝর্ণা বেগম নিজের রাজকীয় সোফাটায় বসে অধীর আগ্রহে ছোট ছেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ছেলেকে ওভাবে রণক্লান্ত ভঙ্গিতে, কাঁধে করে ঝিলমিলকে নিয়ে আসতে দেখেই তিনি ধড়মড় করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ​কিন্তু মুখে কোনো প্রশ্ন উচ্চারিত হওয়ার আগেই তার চোখ চড়কগাছ! বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তিনি ছেলের ঘরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার এই অবাক হওয়ার কারণ ঝিলমিলকে ওভাবে তুলে আনা নয়, তিনি বিস্মিত হলেন পাত্রীর অদলবদল দেখে! তার ছেলে বিয়ে করতে গিয়েছিল অন্য একজনকে, আর ঘরে তুলে নিয়ে এলো সম্পূর্ণ অন্য আরেক মেয়েকে!
​চোখ দুটো বড় বড় করে, অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে নিজের বড় ছেলের বউয়ের দিকে তাকিয়ে ঝর্ণা বেগম প্রায় চিৎকার করে উঠলেন,

_ “ কী হলো এটা? ঝিলমিল এখানে এই বেশে কেন? কার জায়গায় কে এলো?!”
শাশুরির এমন রূপে ভীত হলো শিউলি বেগম। বলল,
_“ আসলে আম্মা, এতক্ষন লুকিয়েছি…দিঘি পা-পালিয়েছে!”
ঝর্ণা আম্মার চোখ এবার আরও বড় হয়ে গেল।
_“ কিহ!”
_“ হ্যাঁ, আম্মা…এজন্যই তখন আপনাকে এতবার কল করছিলাম। দিঘি পালানোর পর চৌধুুরী বাড়ির নূরজাহান আম্মা তরঙ্গের সাথে ঝিলমিলের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন।”
ব্যস! গেল গেল। এ বাড়ির আম্মা এবার গেল। দুলতে লাগল সে। শিউলি বেগম দ্রুত শাশুরিকে আগলে ধরলেন।৷ উপস্থিত সবাই আতঙ্কিত হয়ে গেলেন।
_“ কী শোনালে আমাকে বড় বউ! আমার তরঙ্গের বউ এই ঝিলমিল! এই কেউ বরফ আন, বরফ আন। আমার মাথায় এনে কেউ বরফ দে রে।” শেষ! এতটুকু বলেই জ্ঞান হারালেন আম্মা।
বারিশ দৌড়ে এলো সবার চেচামেচি শুনে। এসে মাকে এমন চেতনাহীন দেখে ডক্টরকে কল করল। কিছুক্ষণ মায়ের পাশে বসে ডক্টরকে বিদায় জানাতে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গেল সে।

তখন থেকে একা একা বসে এসব ভাবছে ঝিলমিল। লোকটা দরজা বাহির থেকে লক করে সেই যে গিয়েছে এখনো আসছে না। ঝিলমিলের পড়নে তার ফোর কোয়ার্টার ঢিলেঢালা লেডিস প্যান্ট আর পাতলা টিশার্ট। অথচ মাথায় জড়িয়ে আছে বিয়ের শাড়ির সেই ভারী, কারুকার্যখচিত লাল ওড়নাটা। সেটাও বড্ড এলোমেলো অবস্থায়। ঘরের মেঝেতে দলা পাকিয়ে পড়ে আছে দামি বেনারসি আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভারী গহনাগুলো। খাটের এককোণে গুটিসুটি মেরে বসে মেঝেতে পড়ে থাকা শাড়িটার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সতেরো বছর বয়সী মেয়েটা। তার মস্তিস্ক এখনো এই আকস্মিক পরিবর্তনটা পুরোপুরি মেনে নিতে পারছে না। ​ঠিক তখনই নিস্তব্ধ ঘরটাতে একটা পুরুষালী শিস বাজার শব্দ ভেসে এলো।
​ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল ঝিলমিলের। সে খানিকটা চমকে দরজার দিকে তাকিয়ে আবারও মেঝের দিকে তাকাল। পকেটে হাত গুঁজে, হেলেদুলে ঘরের ভেতর পা রাখল বারিশ। তার গায়ে এখনো বিয়ের শেরওয়ানি, তবে সামনের ওপরের তিনটে বোতাম বেখেয়ালি ভাবে খোলা। খুব উদাস মনে শিস বাজাতে বাজাতে ভেতরে এলেও, খাটের ওপর ঝিলমিলের এই অদ্ভুত রূপ দেখে বারিশের ঠোঁটের শিস আচমকাই থেমে গেল। ​সে থমকে দাঁড়িয়ে ঝিলমিলকে ওপর-নিচ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করল। নতুন বউকে এমন পোশাকে দেখবে এটা তার কল্পনাতেও ছিল না। শুকনো একটা ঢোক গিলে কিছুটা বিস্ময় নিয়ে বলল,

_“এসব কী পরে আছো?”
​ঝিলমিল কোনো উত্তর দিল না। এমনকি তার দিকে ফিরেও তাকাল না।
_​“এই মেয়ে, তোমাকে বলছি!” এবার বারিশের কণ্ঠস্বর কিছুটা চড়ল। ​তবুও নিস্পৃহ রইল ঝিলমিল। কোনো নড়নচড়ন নেই। যেভাবে জোর খাটিয়ে, এক প্রকার তুলে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে এই বাড়িতে, তাতে মেয়েটা যে বসে বসে চিৎকার করে কাঁদছে না—এটাই অনেক বেশি। কিন্তু বারিশের মতো পুরুষ এই নীরব প্রত্যাখ্যান সহজে মেনে নিতে পারল না। ​সে দ্রুত পায়ে ঝিলমিলের সামনে এসে হাটু গেড়ে বসে। শক্ত হাতে ওর দু-বাহু চেপে ধরে একটা হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল,
_“তোমার সঙ্গে কথা বলছি আমি! কী পড়েছ এগুলো? আর কাপড় নেই?”
​ঝিলমিল এবার চোখ তুলে তাকাল। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগের ‘চাচা’ থেকে আচমকা ‘স্বামী’ বনে যাওয়া পুরুষটার চোখের দিকে সোজা তাকাল সে। বারিশের প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে, তীব্র শক্তিতে নিজের বাহু দুটো ওর বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তার অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল,
_“আমাকে ধরবেন না, চাচ্চু! আপনি আমার চাচ্চু, সেটা ভুলে যাবেন না!”
​কথাটা শুনে বারিশের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। ঝিলমিলের দিকে সামান্য ঝুঁকে, চোখের মণি সরু করে সে ফিসফিসিয়ে বলল,

_“ছিলাম… চাচ্চু ছিলাম! নাও আই’ম ইয়োর হাসব্যান্ড, মিসেস বারিশ।”
শুনেও কেমন গা গুলিয়ে উঠলো ঝিলমিলের। এ লোক তার চাচ্চুর বেস্টফ্রেন্ড! তার প্রতিবেশি। পাশাপাশি বাসা তাদের। বারিশ শুধু তার চাচ্চুর বেসফ্রেন্ড না, তার চাচ্চুর আত্মা বলা যায়। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় তাদের দু’পরিবারের ঘনিষ্ঠতাও অনেক বছর ধরেই প্রবল।
_“ তুমি এমন ভাব করছো যেন আমি তোমাকে জোর করে বিয়ে করেছি? তোমার দাদিমা তোমাকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে!” বারিশ বলল।
_“ আমাকে ঝুলিয়ে দিয়েছে, আামকে? আপনাকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে!” তেঁতে উঠল ঝিলমিল।
_“ আমি কি তোমাকে বিয়ে করতে গিয়েছিলাম?”
_“ আমি কি আপনাকে বিয়ে করার জন্য বউ সেজে বসেছিলাম?” পিঠাপিঠি বলল ঝিলমিল।
_“ হ্যাঁ, এইতো বসে আছো!” বারিশ কপট হেঁসে ঝিলমিলের মাথায় থাকা লাল দোপাট্টার দিকে ইশারা করে বলল।
ঝিলমিল এবার আরো রেগে গেল। এক হাতে বারিশের শেরওয়ানির এক পাশে চেপে ধরে বলল,
_“ এটা কী? আপনিও তো জামাই সেজে বসে আছেন!”
বারিশ খুব উদাস ভঙিতে বলল,

_“ আমি তো তোমার জন্য সাজিনি। কিন্তু তুমি আমার জন্য সেজেছো।”
_“ সাজিনি! সাজানো হয়েছে!” জোর গলায় বলল সে।
_“ যাইহোক, সাজানো হলেও সেটা আমার জন্যেই হয়েছে। কিন্তু আমি তো তোমাকে বিয়ে করতে যাইনি।”
_“ আমিও তো পালিয়ে গিয়েছিলাম! কেন নিয়ে এলেন আমাকে?” ঝিলমিল বলল।
_“ যখন পালিয়েছো তখন আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে! তুমি আমার বউ হয়ে গেছো। বারিশের বউ! আর প্রফেসর ফাইজান বারিশের বউ বিয়ের দিনই পালিয়েছে এটা সবাই জেনে গেলে আমার প্রেস্টিজ যাবে। নাহলে তোমাকে ধরে আনার কোনো ইচ্ছে ছিল না আমার।”
_“ নিজেকে প্রফেসর দাবী করতে লজ্জা করছে না আপনার? সে ভদ্রতা আছে আপনার মধ্যে? কলেজের সবাই যেদিন আপনার আসল মুখোশ জানবে সেদিন দেখব প্রেস্টিজ কীভাবে ধরে রাখেন।”
_“ আমার সেখানে ভালো প্রফেসর হওয়ার ইচ্ছেও নেই। যে কারণে আমি সেখানে গিয়েছিলাম সেটা খুব ভালোই এগোচ্ছে। তুমি বরং তোমার বাবার চিন্তা করো।”
_“ আমার বাবার সাথে আপনার কীসের এত শত্রুতা, হ্যাঁ?”
বারিশ অবাক হওয়ার মতো করে বলল,
_“ শত্রুতা কেন থাকবে? সে আমার একমাত্র শশুর! আমার একটা মাত্র বউয়ের একটা মাত্র বাবা।” ঝিলমিলের থুতনিতে আঙুল বুলিয়ে বলল।
অদ্ভুদ ঠেকল ঝিলমিলের। মুখ ঘুরিয়ে অন্য পাশে নিলো। বারিশ ওর মুখ আবারও নিজের দিকে ঘোরাল। ঝুকে আরও কাছে গেল। চোখ বোলাল আবারও অষ্টাদশীর সর্বাঙ্গে।

_“ সব খুলে ফেলেছ… মাথার এটা খোলোনি কেন?” মাথায় থাকা দোপাট্টার দিকে তাকিয়ে বলল।
_“ অনেক চেষ্টা করেছি খোলার।”
বারিশ নিজেই এবার সেটা খোলার জন্য ঝিলমিলের মাথায় হাত লাগাল। বাঁধা দিলো না ঝিলমিল। সে এটা খোলার জন্য অনেক্ষন নিজে নিজেই যুদ্ধ করেছে। বারিশ এটা খুলতে খুলতে ঝিলমিলে দিকে আরও বেশি ঝুকলো। ঝিলমিল যত পেছাচ্চে সে তত ঝুকে যাচ্ছে। অবশেষে খুলতে সক্ষম হয়। কিন্তু তবু বারিশ সেভাবেই থেকে বলল,
_“ আজ আমাদের বাসর রাত।”
হঠাৎ এমন বাক্যে জমে গেল ঝিলমিল। বারিশের দিকে তাকিয়ে থাকল বড় বড় করে। তারপর খানিকটা আতঙ্কিত গলায় বলল,
_“ আপনি ঠিক আছেন তো, বারিশ চাচ্চু?”
_“ হোয়াট দ্য হেল! চাচ্চু বলে মুড নষ্ট করছো কেন?”
_“ কীসের মুড?”
বারিশ কিছু বলল না। সে সোজা চলে গেল ওয়াশরুমে। পোশাক পাল্টে এসে কোনো ভূমিকা ছাড়াই গম্ভীর গলায় বলল,

_ “বই বের করো, পড়তে বসো।”
​ঝিলমিল স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মনে হলো সে বোধহয় ভুল শুনেছে। অবিশ্বাস্য গলায় শুধাল,
_“কী বললেন?”
_​“তোমার না কিছুদিন পর থেকে এক্সাম? পড়তে বসো এক্ষুনি।”
​ঝিলমিলের ভেতরের জেদটা আবার চাড়া দিয়ে উঠল।
_“পারব না! আমাকে দয়া করে আমার বাসায় রেখে আসুন। আব্বু নিশ্চয়ই এতক্ষণে স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন!”
​বারিশের ঠোঁটের কোণে আবার সেই কুটিল হাসিটা ফুটে উঠল। সে শীতল গলায় বলল,
_ “মাত্র তো শুরু! উনার সুস্থ থাকার দিন এবার শেষ।”
​ঝিলমিল এই কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝার আগেই বারিশ তাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। বুকশেলফ থেকে ওর ক্লাসের কয়েকটা মোটা মোটা বই এনে ধপাস করে টেবিলের ওপর রাখল, তারপর সেগুলো ঝিলমিলের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, _“এক্ষুনি পড়তে বসো, নাহলে মারব!”
​ঝিলমিলের চোয়াল ঝুলে গেল। এই লোকটা বলে কী! বাসর রাতে বউকে মারার হুমকি দিচ্ছে? সে ফুঁসে উঠে বলল,
_ “কিহ্! মারবেন মানে? গায়ে হাত তুলবেন আমার?”
_​“বই খোলো!” অত্যন্ত দৃঢ় আর শক্ত গলায় বলল বারিশ।
​ঝিলমিল নড়াচড়া না করে ওভাবেই বসে রইল দেখে বারিশ এবার সিংহের মতো উচ্চস্বরে ধমকে উঠল,
_“খোলো বলছি!”

​হঠাৎ সেই চেনা প্রফেসরের রাগী ধমকে ঝিলমিল ভেতর থেকে কেঁপে উঠল। আর কোনো তর্ক না করে সে কাঁপা কাঁপা হাতে বইয়ের পাতা মেলল। রাগ আর ক্ষোভে সে ইচ্ছে করেই বইয়ের পাতাগুলো এলোমেলোভাবে ওল্টাতে লাগল, যেন খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছে এমন একটা ভান ধরল। বারিশ ওর কাণ্ড দেখেও কিছু বলল না। সে কিছুক্ষণ ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার কী একটা মনে করে রুমের বাইরে চলে গেল।
​বারিশ রুম থেকে বের হতেই ঝিলমিলের দম যেন ফিরে এলো। সুযোগ হাতছাড়া না করে সে তড়িঘড়ি করে বিছানায় পড়ে থাকা নিজের ফোনটা হাতে নিল। বান্ধবী ইরানকে কল দেয় সে। ​ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হতেই ঝিলমিলকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ইরান ঝেঁঝিয়ে উঠল,
_“এই নাটকির নাতি! তুই পালালি কেন শুনি? এত নাটক কই থেকে আসে তোর?”
_“ তখন তো এতো কিছু ভাবিনি! আমি নিজের জালে নিজেই ফেঁশে গেছি! আমায় উদ্ধার কর বইন! আমি কীভাবে চাচ্চুকে বিয়ে করলাম! ওহ মাই গড সে আমার কলেজের স্যার! ছিঃ…ছিঃ! তুই জানিস উনি আমাকে পড়তে বসিয়েছে! বাসর রাতে খাম্বা স্যার আমাকে পড়তে বসিয়েছে!” কেঁদে দিলো ঝিলমিল।

_“ কী! তাই বলে পড়তে বসাল?”
_“ হ্যাঁ! বাসর রাতে সবার জামাই বউকে শাড়ী খুলতে বলে, আর আমার জামাই বলে বই খুলতে এমন খাম্বা স্যার খোদা আমার কপালেই কেন দিলো!”
_“ শাড়ী তো তুমি খুলেই বসে আছো, নতুন করে আর কী খুলতে বলব?”
অকস্মাৎ পুরুষালি কণ্ঠস্বরের গাম্ভীর্যে চমকে ওঠে কিশোরী! তড়িঘড়ি করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিছানার উপর রেখে দেয় ফোন। দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরের ভেতর হেঁটে আসছে সেই রাশভারী পুরুষ।
​ঝিলমিল কোনোমতে নিজের ভেতরের ভীতিটুকু আড়াল করে অবাধ্য গলায় বলল,
_“আমি বাড়ি যাব।”
_​“ বাড়িতেই তো আছো,” যুবকের কণ্ঠস্বর অনুভূতির লেশমাত্রহীন।
​মেয়েটির নজর হঠাৎ লোকটার ডান হাতের দিকে গেল। সে কিছুটা কৌতুহলী ও সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে সুধাল,

_“ওটা কী আপনার হাতে?”
​বারিশ কোনো মৌখিক উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। ধীর পায়ে এগিয়ে এলো বিছানার দিকে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই খাটের পাশে এক হাঁটু মুড়ে বসে সুতি কাপড়ে মোড়ানো বরফের টুকরোটি চেপে ধরল ঝিলমিলের কপালের ঠিক সেই অংশটায়, যা কিছুক্ষণ আগে বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে ধাক্কা খেয়ে ফুলে উঠেছিল। বারিশের হাতের থাপ্পড়ে গালটাও লাল হয়ে আছে।
​ক্ষতের ওপর আচমকা সেই হিমশীতল স্পর্শ লাগতেই যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে তীব্র চিৎকারে ঘর কাঁপিয়ে তুলল বালিকা,
_“আহহহ… আরেহ্… কী করছেন কী! ছাড়ুন আমাকে, আহহহ!”
​ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হয়ে গেল বারিশের। হাতের বরফটা একপাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তিনি চোখের পলকে নিজের চওড়া হাতের তালু দিয়ে মেয়েটির মুখ চেপে ধরল। সেই বলিষ্ঠ বাঁধনের নিচে বাকি চিৎকারটুকু গুমরে মরে গেল।
​সে নিজের মুখটা স্ত্রীর অতি সন্নিকটে এনে দাঁতে দাঁত চেপে অত্যন্ত রুক্ষ ও ধমকের সুরে বলল,
_ “এভাবে চিৎকার করছ কেন? নিচে এখনো বাড়ির বড়রা জেগে আছেন। একদম চুপ! কী ভাববে সবাই?”
ঝিলমিল তার মুখের ওপর থাকা হাতটা সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যন্ত্রণায় চোখমুখ কুঁচকে ঝাঁঝালো গলায় বলল,

_“আপনি এটা আমার মাথায় এভাবে চেপে ধরেছেন কেন?”
​বারিশ সোজা হয়ে দাঁড়াল। অত্যন্ত কর্কশ ও ঠান্ডা গলায় জবাব দিল সে
_ “অনেক শখ হয়েছে ধরার, তাই ধরেছি! ডিজগাস্টিং!”
ঝিলমিল নিজের ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ পেল না। হঠাৎ করেই নিচতলা থেকে ভেসে এলো তার অতি পরিচিত কণ্ঠের ডাক। তার আব্বু ডাকছেন। চেনা গলার আওয়াজ কানে পৌঁছাতেই কিশোরী এক মুহূর্তও দাড়াল না। ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে চলে গেল। বারিশ এই বিচ্ছু মেয়েটিকে কোনোভাবেই আটকে রাখতে পারল না। অগত্যা সেও শান্ত পায়ে তার পিছু পিছু নিচতলার দিকে এগিয়ে গেল।

লিভিং রুমে পা রাখতেই ঝিলমিলকে দেখে আলতাফ চৌধুরী উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,
_“ওভাবে চিৎকার করছিলে কেন মা? কী হয়েছে তোমার? আর এখানে কী হয়েছে?” মেয়ের কপালে আঙ্গুল রাখলেন। তার পাশে তখন আকাশের চোখেও একরাশ সংশয়।
​ঝিলমিল কিছুটা আমতা আমতা করে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল,
_“না, আব্বু… কিছু হয়নি, এমনি…”
​ঝিলমিলের পেছনে সিঁড়ির গোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে বারিশ। তাকে দেখামাত্রই আলতাফ চৌধুরী আশঙ্কায় একপ্রকার তেড়ে গিয়ে জামাতার মুখোমুখি হলেন,
_“এই ছেলে! কী করছিলে তুমি আমার মেয়ের সাথে? ও অমন আর্তচি’ৎকার করছিল কেন?”
​বারিশ প্রথমে আড়চোখে একবার আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝিলমিলের দিকে তাকাল। পরক্ষণেই শ্বশুরের দিকে ফিরে ঠোঁটের তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে অত্যন্ত সহজ গলায় জবাব দিল,
_“আপনি যা ভাবছেন, ঠিক সেটাই।”

​বাসর ঘরের ঝিলমিলের চিৎকার আর বারিশের মুখে এমন দ্বিধাহীন, দ্ব্যর্থবোধক উত্তর! লিভিং রুমে তখন বারিশের বাবা আর বড় ভাইও উপস্থিত ছিলেন। ছেলের এমন বেহায়া ও সোজাসাপ্টা মন্তব্য শুনে দুই পুরুষ অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। ভাগ্যিস ঝর্ণা বেগম তখন নিজের কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, অন্যথায় ছেলের মুখে এমন কথা শুনলে নির্ঘাত তিনি আরেক দফা জ্ঞান হারাতেন!
বারিশের মুখে এমন লাগামহীন প্রত্যুত্তর শুনে আলতাফ চৌধুরী রাগে কাঁপতে কাঁপতে, তার দিকে আঙুল উঁচিয়ে গর্জে উঠলেন,
_“কী বললে তুমি? তোমার সাহস তো কম নয়, বারিশ! আমার অবুঝ মেয়েটার গায়ে হাত তুলতে তোমার একটুও বাধল না? বিয়ের প্রথম রাতেই এই তোমার আসল রূপ? শিক্ষাদানের নামে এই বর্বরতা তুমি নিজের ঘরে করো?”
​বিচলিত হলো না বারিশ। সে নিজের স্বভাবসুলভ উদাসীনতা বজায় রেখে অত্যন্ত নির্বিকার গলায় বলল,
_ “কী এমন করলাম আমি? আপনার মেয়ে নিজ ইচ্ছায় আমাকে বিয়ে করেছে, ওর সাথে যাই করি তাতে আপনার কী?”
​এমন বেপরোয়া কথা শুনে আলতাফ চৌধুরীর রক্ত মাথায় চড়ে গেল। ধমকে উঠলেন,
_“চুপ করো বেয়াদপ! তুমি জানো না ওর এখনো আঠারো বছর হয়নি! একজন শিক্ষক হয়ে এসব বলতে তোমার লজ্জা লাগছে না?”
​বারিশ এবার কিছুটা বাঁকা হাসল। শ্বশুরমশাইয়ের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে অত্যন্ত কর্কশ ও সাফ গলায় জবাব দিল,

_“শিক্ষক? কে শিক্ষক? শিক্ষক আমি কলেজে, বাসায় না! আপনার মতো সব জায়গায় গিয়ে শিক্ষকতা দেখাতে পারব না। যেখানে দেখানো দরকার সেখানেই দেখাব। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ।”
আলতাফ চৌধুরীর সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেল। তিনি আর এক মুহূর্ত কালক্ষেপণ না করে নিজের মেয়ের হাতটা শক্ত করে টেনে ধরে বললেন,
_“ চল মা, এখানে আর এক মুহূর্তও না।”
​কিন্তু ঝিলমিলকে নিয়ে তিনি কদম ফেলার আগেই, অপর পাশ থেকে তার অন্য হাতটি খপ করে ধরে ফেলল বারিশ। তার মুঠো শক্ত হয়ে বসল কিশোরীর কবজিতে। সে শ্বশুরের দিকে সোজা তাকিয়ে অত্যন্ত কঠোর গলায় বলল,
_“হাত ছাড়ুন ওর। ছাড়ুন…”
_​“ছাড়ব না! তুমি ছাড়ো বেয়াদপ!”
_​“আমি কেন ছাড়ব? একটু আগেই তো আপনার মা ওকে আমার হাতে তুলে দিয়েছে! আপনি ছাড়ুন… ছাড়ুন!”
​দুইজনের টানাপোড়েনে মাঝখান থেকে ঝিলমিলের দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে। দুজনেই তাকে নিজ নিজ দিকে টানছেন, যেন এক জীবন্ত পুতুলকে নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছে। যন্ত্রণায় কিশোরীর চোখমুখ কুঁকড়ে গেল।
​আলতাফ চৌধুরী মেয়ের হাত নিজের দিকে আরও একদফা টেনে নিয়ে তীব্র ক্ষোভে বললেন,

_“আমার মা দিয়েছে, আমি দিইনি! আমার মেয়েকে আমি তোমার সাথে কখনোই থাকতে দেব না।”
​বারিশের ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। _“আপনার মেয়ে তো থাকবেই, সাথে আপনার মা-ও চলে আসবে। ওই-তো চলেও এসেছে…” বারিশ শেষবাক্য সদর দরজার দিকে তাকিয়ে বলল।
নিজের মাকে ​সদর দরজায় সশরীরে উপস্থিত হতে দেখেই আলতাফ চৌধুরী অবচেতনভাবেই নিজের মেয়ের হাতটি আলগা করে ছেড়ে দিলেন।​বাবার হাত ছুটে যেতেই ঝিলমিল কিছুটা টাল সামলে বারিশের দিকে সরে এলো। নূরজাহান চৌধুরীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আলতাফ চৌধুরীকে দেখছে।
চশমাটা ঠিক করতে করতে তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। তাঁর গম্ভীর, রাজকীয় চালচলনের সামনে ড্রয়িংরুমের বাকি সবাই তখন নিশ্চুপ। তিনি চঞ্চল শেহরিয়ারের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
_“সব আয়োজন করে রাখবেন, কালকে আমরা সবাই আসছি। কোনো ঝামেলা যেন না হয়।”
​চঞ্চল শেহরিয়ার অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানিয়ে বললেন,
_“আপনি একদম নিশ্চিন্তে থাকুন, ঝিলমিল দাদুভাইয়ের কোনো অযত্ন হবে না।”
_​“দাদুভাই নয়, মামুনি!” নূরজাহান চৌধুরী তৎক্ষণাৎ চঞ্চল শেহরিয়ারের সম্বোধনটি শুধরে দিলেন।
তাঁর এই একটিমাত্র শব্দে পরিষ্কার হয়ে গেল যে ঝিলমিল এখন আর এই বাড়ির কেবল নাতনি নয়, সে এখন এই গৃহের বউ। ​কথাটি শেষ করেই তিনি আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। আলতাফ চৌধুরীর বাহু ধরে তাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে লাগলেন। ঝিলমিল শুধু ফ্যালফ্যাল করে তার দাদীমা আর আব্বুর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
​এদিকে আকাশ যাওয়ার আগে তার বন্ধু বারিশকে একপ্রকার জোর করেই টেনে কিছুটা দূরে নিয়ে গেল।

_ “আর যাই হোক, তোর থেকে আমি অন্তত এটা আশা করিনি।”
​_“কী আশা করিসনি?”
_​“একটু আগেও তুই ঝিলমিলকে বিয়ে করবি না বলে চারদিকে লাফাচ্ছিলি। আর ঘরে নিয়ে আসতে না আসতেই একদম ফুল ফর্মে বাসর করা স্টার্ট করে দিলি? ছিঃ! ছিঃ! চাচা শ্বশুর হিসেবে তোকে এসব কথা বলতেও আমার নিজের লজ্জা লাগছে!”
​বারিশ এক মুহূর্তের জন্য আকাশকে দেখল। তারপর খুব বিরক্তি নিয়ে বলল
_“মাথা ঠিক আছে তোর? ওসব কিছুই হয়নি।”
_​“হয়নি মানে? পুরো পাড়ার মানুষ বাসর ঘরের চিৎকার শুনল! আর তুই বলছিস হয়নি?”
​বারিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কুঁচকে বলল,
_“তোর এই নোংরা মাথা একটু সাফ করবি? ও খাম্বার সাথে বারি খেয়ে কপাল ফুলিয়ে এসেছে। আমি জাস্ট বরফ দিতে গিয়েছিলাম আর ও ডাইনোসরদের মতো চিৎকার জুড়ে দিয়েছিল!”
আকাশ চুপ হয়ে গেল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে ঝিলমিলের দিকে তাকাল। মেয়েটা এককোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। ওদের কথা শোনার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, তবে দূরত্বের কারণে বুঝতে পারছে না। আকাশ আলতো হেসে ডেকে বলল,

_“যাও মামুনি, রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ো।”
_​“হ্যাঁ, যাও মামুনি রুমে যাও,” আকাশের দেখাদেখি তার পিঠাপিঠি বারিশও ভেঙানোর মতো করে একদম একই টোনে বলে উঠল।
​বন্ধুর মুখে এই ডাক শুনে আকাশ তৎক্ষণাৎ ভ্রু কুঁচকে সংশোধন করে দিয়ে বলল,
_“তুই মামুনি বলছিস কেন?”
​বারিশ কোনো উত্তর দিল না। সে উলটে আকাশের হাতটা শক্ত করে ধরে সদর দরজার দিকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে ইচ্ছে করেই বেশ উচ্চস্বরে বলল,
_“ওহহ সরি! যাও সোনা রুমে যাও। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ো না যেন, আমি আসছি এক্ষুনি!”

​বারিশের এই মাঝরাতে গলা উঁচিয়ে এত জোরে কথা বলার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বাইরের আলতাফ চৌধুরীকে শোনানো। এবং নিজের সেই উদ্দেশ্যে সে সফলও হলো! গেইটের কাছে পৌঁছানো আলতাফ চৌধুরীর কানে এই ইঙ্গিতপূর্ণ বাক্যটি পৌঁছাতেই তাঁর কান-মাথা গরম হয়ে উঠল। কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কড়া মেজাজের মা নূরজাহান চৌধুরীর কারণে শেষমেশ আর ফিরে এসে ছেলেটাকে কিছু করতে পারলেন না। অগত্যা ক্ষোভ উগরে দিয়েই তাঁকে চলে যেতে হলো।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১

​এদিকে ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে থাকা ঝিলমিল এখনো চোখ পাকিয়ে বারিশের বাইরে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে আছে। অবাক হওয়ার আর নতুন কিছু নেই, এই লোকটা বরাবরই আস্ত অসভ্য আর নির্লজ্জ! সে রুমে যাওয়ার আগে পুরো বাড়িতে চোখ বোলাল যেন কাউকে খুজছে। তবে চোখের সামনে দেখতে না পেয়ে চলে গেল।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here