অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৯ (২)
ফাহিমা ইসলাম
রাত্রি এখন তার সমস্ত শব্দ গুটিয়ে নিয়ে এক গভীর, নীলাভ স্তব্ধতার চাদরে পৃথিবীকে ঢেকে দিয়েছে। দূর আকাশে কৃষ্ণমেঘের বিশাল স্তূপ চাঁদের অস্তিত্বকে নির্বাসিত করেছে বহু আগেই। দ্বিতীয় তলার শোবার ঘরটিতে আলো জ্বলছে মৃদু হলুদাভ। বিছানার মাথার দিকে নরম বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে তূর্ণা। পাশেই রোদেলা নিদ্রামগ্ন, তবে সামনে নরম কোল বালিশ দেওয়া। তূর্ণার সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা শরীরটি যেন প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের সমস্ত শক্তি বিসর্জন দিচ্ছে দুই অনাগত প্রাণের জন্য। উদরটি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই স্ফীত; সেখানে পাশাপাশি বেড়ে উঠছে দুটি ক্ষুদ্র হৃদস্পন্দন, দুটি অদেখা ভবিষ্যৎ।
গর্ভধারণের এই পর্যায়ে তার শরীর যেন আর নিজের কথা শুনতে চায় না। পায়ের পাতায় অস্বাভাবিক ফোলাভাব জমেছে। হাঁটুর নিচে হালকা চাপ পড়লেই ব্যথা বিদ্ধ করে ফেলে। কোমরের অস্থিগুলো প্রতিটি নড়াচড়ায় প্রতিবাদ জানায়। শ্বাস নিতে গেলেও মনে হয় বুকের ভেতর কোথাও অদৃশ্য পাথর চাপা পড়ে আছে। ক্ষুধা লাগে, অথচ খাবারের গন্ধেই বমি বমি ভাব এসে গলা জড়িয়ে ধরে। মাঝরাতে হঠাৎ পায়ের পেশিতে টান ধরে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়। কখনো আবার অকারণেই চোখ ভিজে ওঠে,হরমোনের অস্থিরতা, মাতৃত্বের ভয়, অজানা আশঙ্কা আর সীমাহীন ক্লান্তি একাকার হয়ে যায়। তূর্ণা নিঃশব্দে নিজের উদরের উপর হাত বুলিয়ে দিল। ঠিক তখনই ভেতর থেকে মৃদু দুটি নড়াচড়া অনুভব করল সে। ঠোঁটের কোণে ক্লান্ত অথচ অপরূপ এক মাতৃত্বময় হাসি ফুটে উঠল।
“দুষ্টু দুটো এত নড়ছো কেনো? তোমাদের বোন এখন ঘুমায়, পাপা বাহিরে গেছে একটু।”
কথাগুলো উচ্চারণের শক্তিও যেন খুব বেশি ছিল না। কষ্ট হয় বেশ, তার শরীরের তুলনায় পেটটা বেশ বড়ো, না চাইতেও শুইয়ে পরে পেটের কারণে ওপারের কিছুই দৃশ্যমান হয় না আর। তূর্ণার ভিতরে থাকা দু’জন আবারও জানান দিলো তাদের উপস্থিত। তূর্ণা হাত বুলিয়ে থামতে বলছে, ভিতরে থাকা অস্তিত্ব দু’টো যখন নড়ে, তখন তূর্ণার না চাইতেও শত কষ্টের মাঝে অজানা ভালো লাগা কাজ করে। মনে হয় এইখানেই তার সমস্ত পৃথিবী আবদ্ধ! এর মাঝেই রৌদ্রিক এলো। তার পদচারণা আজও আগের মতোই স্থির, সংযত। মুখাবয়বে কোনো কোমলতা নেই, নেই কোনো অতিরঞ্জিত উদ্বেগ। অথচ তার হাতে ধরা ট্রেটিই বলে দিচ্ছে,এই মানুষটি তার ভালোবাসা ভাষায় নয়, দায়িত্বে প্রকাশ করে। এক হাতে গরম দুধ, অন্য পাশে কিছু ফল কেটে ছোট ছোট টুকরো করে রাখা, আর একটি গরম পানির ব্যাগ। ঘরে ঢুকেই সে একবারও কোনো প্রশ্ন করল না। শুধু তূর্ণার মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। সেই নীরবতাই যেন শব্দের চেয়েও বেশি কিছু বলে দেয়। ট্রি টেবিলে রেখে প্রথমেই সে হাঁটু গেড়ে বসে তূর্ণার পায়ের দিকে হাত বাড়াল। তূর্ণা আঁতকে উঠে পা সরিয়ে নিতে চাইল।
“এই… কী করছেন আবার?”
রৌদ্রিক কোনো উত্তর দিল না।নিঃশব্দে তার দুই হাতের তালু দিয়ে তূর্ণার ফুলে ওঠা পায়ের পাতায় ধীরে ধীরে চাপ দিতে লাগল। চাপ নয়, যেন সমস্ত ক্লান্তি নিজের হাতে টেনে নিলো।
“আর লাগবে না।”
“চুপ করে বসে থাকো।”
গম্ভীর, সংক্ষিপ্ত, স্বরে নির্দেশ দিলো সে। গরম পানির ব্যাগটি তোয়ালে দিয়ে মুড়ে কোমরের পেছনে গুঁজে দিল সে। তারপর খুব সাবধানে তূর্ণার বসার ভঙ্গি বদলে দিল, যাতে উদরের উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।রৌদ্রিকের প্রতিটি স্পর্শে মিশে ছিলো পরিমিতি; এমন এক সতর্কতা, যেন সামান্য অসাবধানতাতেও পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটি আঘাত পেতে পারে। তূর্ণা তার দিকে তাকিয়ে রইল দীর্ঘক্ষণ। রাত বেশ হয়েছে, কোমড়ের ব্যথার কারণপ ঘুমাতে পারছিলো। সে কিছুই বলেনি রৌদ্রিক কিভাবে যেনো বুঝে যায় তার অসুবিধার কথা। তাই তো এই রাতে আবারও উঠে গিয়ে পানও গরম করে এনেছে, সঙ্গে খাবারও এনেছে।
এই মানুষটি কখনো “ভালোবাসি” বলে না। কোখনো অবাক করে ফুল এনে দেয় না। অকারণে প্রশংসা করে না। কিন্তু তার প্রতিটি না বলা কথা বুঝে যায় মানুষটা, কিছু বলার আগেই সেটা উপস্থিত করে দেয় তার নিকট। তূর্ণা ঘুমানোর সময় পাশ ফিরতে না পারলে নিজ হাতে বালিশ গুঁজে দেয়। ঘুম ভেঙে গেলে নিঃশব্দে পানি এগিয়ে দেয়। কিছুখন পর পর অকারণেই জিজ্ঞেস করবে-
“শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে?”
তূর্ণার চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠল। এখন আরও অকারণে কান্না পায়, আবার ভালোও লাগে। কখন কি করতে মন চায় সে নিজেও জানে না। এই দিকে রৌদ্রিক তার কান্না দেখেও কিছু বলল না। শুধু টিস্যু এগিয়ে দিল।
“কাঁদছো কেন?”
“জানি না…”
রৌদ্রিক নিঃশ্বাস ফেলল ধীরস্বরে।
“ডাক্তার বলেছেন, অকারণে কান্না করলে বাচ্চাদেরও প্রভাব পড়ে।”
বাক্যটি শুনে তূর্ণা মৃদু হেসে ফেলল।
“আপনি কখনো একটু মিষ্টি করে কথা বলতে পারেন না?”
রৌদ্রিক কিছু বললো না, রৌদ্রিক দুধের গ্লাসটা এগিয়ে দিলো। না চাওয়া স্বত্বেও তূর্ণার সেটা খেতে শুরু করলো, কিছুখন পর সেটা খাওয়া শেষ হতেই ফল ধরিয়ে দিলো তাকে। রৌদ্রিক তার ফোলা পা’টা মালিশ করে দিচ্ছে, খাওয়ার মাঝেই তূর্ণার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। খাওয়া বাদ দিয়ে রৌদ্রিকের হাতখানি টেনে নিজের উদরে উপর রাখলো। ঠিক তখনই উদরের ভেতর থেকে একসঙ্গে দুটি ছোট্ট লাথি অনুভূত হলো।রৌদ্রিকের স্থির চোখে প্রথমবারের মতো ক্ষণিক বিস্ময়ের তরঙ্গ দোলা দিল। প্রতিবারই লোকটা এমন বিস্ময় হয়, আরও একবার নড়াচড়া করে উঠলো। তার ঠোঁটের কোণে অতি সূক্ষ্ম, প্রায় অদৃশ্য এক হাসি জন্ম নিল,যে হাসি পৃথিবীর আর কেউ হয়তো দেখতেই পাবে না।
“ তখনও নড়ছিলো, কিন্তু আপনি ছিলেন না।”
রৌদ্রিক বসা থেকে উঠে নিজের কর্ণখানি তূর্ণার স্ফীত উদরের উপর রাখল।সেখান থেকে আরো কয়েকবার তার অস্তিত্ব তাদের উপস্থিতি জানান দিল। তূর্ণার এই দৃশ্যটুকু দেখে মনটা ভালো হয়ে।রোদেলা জেগে থাকলে আরো বেশি ভালো হতো, বাচ্চাটা বেশি খুশি হতো।
“ঘুম আসছে না? খিদে পেয়েছে? তাড়াতাড়ি চলে এসো পাপা আর তোমাদের বিগ সিস্টার ওয়েট করছি আমরা ”
“হ্যাঁ খালি আপনারা বাপ বেটি ওয়েট করছেন আমি তো বানের জলে ভেসে এসেছি। ”
তূর্না কথা শুনে রৌদ্রিক হালকা হাসলো কিছু বলল না। তূর্ণার কি জানি হলো, সারা গা গুলিয়ে এলো। উবড়ে দিলো সবকিছু যা একটু আগে খেয়ে ছিল। সবকিছু উগরে দিয়েছে রোদ্রিকের গায়ের উপর,রৌদ্রিক সেখানেই থাই বসে আছে। তাকে একদমই বিচলিত দেখালো না,আর না তার মুখশ্রীতে কোন বিরক্তিভাব প্রকাশ পেয়েছে। কিছু সময় যেতেই তূর্ণা তার দুর্বল মাথাটা বালিশের সঙ্গে মিশিয়ে দিল। অপরাধী নায়ন রৌদ্রিকের এর মুখ পানে চেয়ে রইল। রৌদ্রিক তার স্থির দৃষ্টি তূর্ণার উপর রেখে শান্ত স্বরে বলে-
” নড়তে হবে না এখানেই বসো। আমি টি-শার্টটা পাল্টে আসচ্ছি।”
বলেই রৌদ্রিক উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল৷ তূর্ণা অপরাধীর ন্যায় বসে রইল। এমনটা যে সে একবার করেছে এমন না,বহুবার এমন শেষ রৌদ্রিকের গা ভাসিয়ে বমি করে দিয়েছে। অথচ মানুষটা একটিবারের জন্য ‘উঁ’ শব্দ করেনি। কিছু সময় পর রৌদ্রিক বেরিয়ে এলো, ভেজা টাওয়াল দিয়ে তূর্ণার মুখটা সুন্দর করে মুছে দিল। এতপর একে একে সব কিছু সেখান থেকে সরালো। সরিয়ে আবারও তূর্ণার মুখ পানে চেয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ খিদে পেয়েছে? খাবার আনবো?”
“ না আমি আর কিছু খাব না। আমি ঘুমাবো আপনি আসুন না প্লিজ! ”
“সত্যি খিদে পায়নি তো? যদি পেয়ে থাকে বল আমি খাবার আনছি, না খেয়ে ঘুমানোর কোন প্রয়োজন নেই।”
“ সত্যি বলছি আমার আর খেতে নেই। আর খেতে নিলেও আর এখন খেতে পারব না। ”
রৌদ্রিক আর কথা বাড়ানো না। সবকিছু সরিয়ে রুমের লাইট অফ করে দিয়ে, শুধু নীল রঙের একটা ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লো মাঝখানে। উনার পাশে বড় একটা কোলবালিশ দেওয়া,রোদেলা কে মাঝখানে না রাখার কারণ এদিক-ওদিক পা দেওয়ার কারণ। এক পাশে মেয়েকে আগলে রেখেছে অন্য হাত দিয়ে স্ত্রীকে আগলে রেখেছে। এমনিও তার রাতটায় ঘুম হয় না,এই ভেবে যে তূর্ণার কখন কি লাগবে।
সূর্য এখন মধ্য গগনে জ্বলজ্বল করছে। চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তার তেজস্বী আলো। রোদেলা ছোট ছোট হাতের মাঝে কয়েকটা প্যাকেট দেখা যাচ্ছে, যেগুলো সে কোন রকমে নিয়ে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করল। তূর্ণা ঘুমিয়ে রয়েছে, পেছনে রৌদ্রিক আরো অনেকগুলো প্যাকেট নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। রোদেলা খাটের উপর বসে পড়েছে উঠে, প্যাকেটের মধ্যে থাকা জিনিস পাতি গুলো খাটের উপর ঢেলে ফেলেছে সে। আনন্দ উচ্ছ্বাসে তার আদুরে মুখশ্রী উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ছোট ছোট হাত দিয়ে সে বাচ্চাদের নানা ধরনের কাপড় গুলো দেখছে। এগুলো সে রিনি সঙ্গে মিলে পছন্দ করে বেবিদের জন্য কিনেছে অনলাইন থেকে। কিছুক্ষণ আগে সব পার্সেল এসেছে।
রোদেলা একে একে সব জামা খুলে দেখছে। রৌদ্রিক কিছু বলছেনা নিঃশব্দে রোদেলার সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। রোদেলা এক একটা জামা দেখছে আর হাসছে,সবগুলোই তার আর রিনির পছন্দের কেনা। দুটো জামা উঠিয়ে তার পাপার দিকে তাক করে বলে-
“ বেবিকে এতা পরাবো, এতাও পরাবো কেমন?”
” আচ্ছা সব পড়িও সমস্যা নেই।”
“পাপা আমাল কেলনা লাগবে এত্তোগুলা।”
“কয়েকদিন আগেই এতগুলো নিয়েছো আবার কি করবে?”
“উফফো পাপা বেবিদের দিতে হবে তো। কত্তো কাজ আমার,তুনি তো বুঝসই না!”
রোদেলা এমনভাবে বলল যেন সকল কাজ তার উপর এসে পড়েছে। রৌদ্রিক মেয়ের এমন ভঙ্গি দেখে হালকা হাসলো, কিছু বলল না।বেবিদের জন্য খেলনা কিনতে কিনতে অর্ধেক রুম ধরিয়ে ফেলেছে। এইদিকে রোদেলা আর রৌদ্রিকের কথার মাঝেই তূর্ণা তন্দ্রা মুক্ত হলো। পিটপিট করে চোখ খুলে রৌদ্রিক আর রোদেলাকে দেখে নিল। তার নজর এলো বিছানার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এতগুলো জামার উপর। বিশাল উদরটা নিয়ে কোনো রকমে উঠে বসলো।অতঃপর রোদেলা আর রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বরে বলে-
“ এতগুলো জামা কিসের জন্য?”
“ বেবিদের জন্য।”
তূর্ণা অবাক নেত্রে চেয়ে রইলো সামনে থাকা অসংখ্য বাচ্চাদের কাপড়ের দিকে। এক একটা একেকটার থেকে দারুন! রোদেলাও রৌদ্রিকের হাতে হাতে ছোট নবজাতকের জামাগুলো দেখতে ব্যস্ত। রোদেলা একটা জামা নিজের গায়ের উপর ঠেকিয়ে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী বলে-
“ পাপা, বেবিরা এত টেনি হয়?”
“ হুম।”
“ আমিও এত্তো টেনি ছিলাম?”
“ হুম, তুমি তো পাপার হাতের সমান ছিলে। হাতে নিলেই মনে হতো পরে যাবে তাই বুকের উপর রাখতাম।”
রোদেলার বিশ্বাস হলো না, সে অ্যালবামে তার ছবি দেখেছে। কিন্তু তার বিশ্বাস হয়না ওতো ছোট বাচ্চাটা সে ছিলো।
“ না আমি তো কত্তো বড়ো, এত ছোট হলে এখন বড়ো হয়েতি কিভাবে?”
“ ছোট টামিতে বেবিরা ছোটই থাকে, তারপর আস্তে আস্তে বড় হয়।”
“ তার মানে মায়ের পেতের বেবিরা এত্তোটুকু?”
সে হাত দিয়ে হালক দেখালে। এইদিকে তূর্ণা নাক ফুলালো, তার ঘুমের সুযোগ নিয়ে বাপ-বেটি কতকিছু করে ফেলেছে। অথচ তাকে কিছুই বলেনি, আর না এখন তাকে পাত্ত দিচ্ছে। তাই অভিমানে বিছানা থেকে নামতে নিলেই একজোড়া হাত তার কব্জি আঁকড়ে ধরে।
” কোথায় যাচ্ছো?”
“ নিচে ছাড়ুন!”
“ নিচে যেতে হবে না,হাঁপিয়ে যাবে।”
” গেলে যাবো তাতে আপনার কি?”
রৌদ্রিক অত্যন্ত নির্বিকার স্বরে বলে,
“ আমারই সব, যেহেতু আমার বউ-বাচ্চা সবই তোমার মধ্যে রয়েছে।”
“ কে আপনার বউ? আমি কারো বউ না!”
” আমি কি একবারও বলেছি তুমি আমার বউ?”
তূর্ণা তীর্যক দৃষ্টিতে তাকলো রৌদ্রিক নীরব মহাসাগরের ন্যায় মুখপানে। যেনো কিছুই হয়নি এখানে।
“ কি বলতে চাচ্ছেন?”
“ তুমি কি বুঝতে চাচ্ছো?”
“ কিছু না, ছাড়ুন!”
রৌদ্রিক আর তূর্ণার কথার মাঝেই রোদেলা তার আদুরে নেত্রপল্লব জোড়া নাচিয়ে তূর্ণা দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ রাগ করলা মা?”
“ না করিনি, আমি কে, যে রাগ করবো?”
রোদেলা একগাল হেসে আদুরে ভঙ্গিতে বলে-
” তুনি তো আমার সোনা মা! রাগ করে না, আতো আদল করি।”
বলেই রোদেলা উঠে তূর্ণার গ্রীবাদেশ আঁকড়ে ধরে তূর্ণার ললাটে চুমু একে দিয়ে, দুই গালেও একই ভঙ্গিতে চুমু দিলো। অতঃপর আবারও নাক, ঠোঁট, চোখ সব জায়গাতে আদর করে দিতে লাগলো। সবশেষে স্ফীত পেটের উপর পর পর চারটা চুমু দিয়ে বলে-
“ তোমাল,দুতা আর তোমাল দুতা। মা’কে কত্ত দিও না হুম?”
তূর্ণা হেসে ফেলল রোদেলার কথা। আগে নিলো রোদেলা কে, আগের মতো রোদেলা কে আর কোলেও নিতে পারে না। তাই মাঝে মাঝে বড্ড আফসোসও লাগে, রোদেলা তূর্ণাকে টেনে বিছানায় বসালো তারপর আবারও বেবি বাম্পের উপর হাত রাখলো। হাত রাখার কিছুসময় পরই সেখানটা কেমন নড়ে উঠলো। রোদেলা মুখশ্রীতে বিস্ময় তরঙ্গ ছেয়ে পরলো। আনন্দের সঙ্গে উৎসাহিত কণ্ঠস্বরে বলে-
“ বেবি নরে, বেবি নরে পাপা!”
রোদেলার কথার মাঝে আবারও বাচ্চারা হালকা কিক মারবো। এতে করে রোদেলার উচ্ছ্বাস যেন আরো বেড়ে গেল! খুশি তার চোখমুখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
“ পাপা বেবিরা আমাল কাতে আতবে। ওরা আসতে চায়!”
রৌদ্রিক মেয়ের কথা হালকা আসলো অতঃপর শান্ত মোলায়ম স্বরে বলে-
” চাইবে তো, রোদেলা যে তাদের বিগ সিস্টার।”
রোদেলার মনটা আরও বাকবাকুম হয়ে গেল। সে তার সম্পূর্ণ মনোযোগ পেটের উপর দিয়ে রেখেছে।
“ তুবা কাঁদছে কেনো?”
“ জানি না, তখন থেকে কাঁদছে।”
রূপা তার মেয়ে তুবাকে কোলে নিয়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে। তবুও শিশুটির কান্না আটকানোর নাম নেই, তূর্য দ্রুত নিজের হাতটা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে জীবাণু মুক্ত করে নিল। এগিয়ে এসে রুপার কোল থেকে তুবাকে নিজের কোলে তুলে নেয়। তুবাকে নিয়ে বারান্দায় চলে যায় হাঁটতে হাঁটতে।
“ কি হয়েছে তুবার? কাঁদছে কেনো বাবার রাজকন্যা?”
ক্রন্দনরত ফোলা ফোলা নেত্রজোড়া মেলে নিজের পিতার দিকে তাকালো নবজাতক। কান্নার দাপটে মুখ-চোখ লাল করে ফেলেছে। কিছুসময় সেরকমই রইলো,সময় পার হতেই তুবা শান্ত হয়ে এলো৷ অশ্রুসিক্ত চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। পা দু’টো নাড়িয়ে তার আনন্দের কথা জানাচ্ছে। তূর্য হাসলো মেয়ের পানে চেয়ে।
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৯
“ এতো আমার রাজকন্যা কত সুন্দর হাসে। কি বাবা এসে গেছি সোনা।”
পিছনে থেকে রূপা গল ঝেড়ে বলে-
” হ্যাঁ আপনি এইসময় করে আসেন,তাই কান্না জুড়ে দেয় আপনাকে না দেখলে।”
