মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৭
jannatul firdaus mithila
“ ওর নাম মুখে নিও না ছেলে! ওকে নিয়ে ঘাটাঘাটি করো না। ঐ নামের রহস্য যে বা যারাই উদঘাটন করতে গিয়েছে, তারা কোনদিন ফিরে আসেনি।”
শ্যামপুরুষের কানদুটোতে বোধহয় এখনো বাজছে কথাগুলো! হুট করেই তার সর্বাঙ্গে নামল এক অদ্ভুত অসারতা। চোখদুটো ঠায় আঁটকে আছে টিভির পর্দায়। যেথায় জ্বলজ্বল করছে — রিটায়ার্ড পুলিশ কর্মকর্তার সদ্য আ-ত্ম-ঘাতীর দুঃসংবাদ! যুবক বড্ড অস্থির হলো এপর্যায়ে। অস্থিরতায় হাসফাস করতে লাগল দাঁড়িয়ে থেকে। অবচেতন মনের কোণে উত্থাপিত হলো,
“ কি আছে ঐ ফাইলে? এ ফাইলের জন্যই মাঈনুল সাহেবের সাথে….. ”
বাকিটা আর ভাবতে পারেনি শ্যামসুদর্শন। পরপরই মনে জাগল প্রবল কৌতুহলতা! ফাইলটা একবার খুলে দেখা প্রয়োজন! কি আছে ওতে? কি এমন রহস্য লুকিয়ে আছে ঐ পুরাতন ফাইলের ধুলোপড়া খড়খড়ে পৃষ্ঠার ভাঁজে? রৌদ্র অস্থির! তড়িঘড়ি করে পা বাড়াল হসপিটালের বাইরে। এরইমধ্যে পেছন থেকে ভেসে এলো ওয়াচম্যানের নরম কন্ঠ!
“ ডাক্তার সাহেব?”
সহসা পায়ে রুখ টানল রৌদ্র! তড়াক ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখল — মধ্যবয়স্ক হাফিজ মিয়া কেমন উদ্বেগ নিয়ে ছুটে আসছেন তার নিকট! রৌদ্র গম্ভীর হলো এবার। মধ্যবয়স্ক সন্নিকটে এসে দাঁড়াতেই সে কেমন গমগমে গলায় শুধালো,
“ কি হয়েছে?”
হাফিজ মিয়া হাঁপাচ্ছেন! হাঁপাতে হাঁপাতেই কোনো মতে আওড়ালেন,
“ চইলা যাইতাছেন? আপনের চাচার লগে দেহা করবেন না?”
কপাল গোছায় রৌদ্র! চোখেমুখে একপ্রকার বিরক্তি লেপ্টে কর্কশ কন্ঠে প্রতিত্তোরে বলল,
“ দেখা করব না-কি করব না, সে কৈফিয়তও এবার আপনাকে দিতে হবে? আপনি কে আমার কাছ থেকে কৈফিয়ত চাওয়ার?”
এহেন কথায় যারপরনাই অবাক হলেন হাফিজ মিয়া। লোকটা কেমন অবিশ্বাস্য নেত্রে তাকিয়ে আছে রৌদ্রের পানে। আশ্চর্য! যে ছেলে গত দু’বছরে কোনোদিন বড়দের সম্মান দেখাতে কার্পণ্য করেনি, কখনো কোন বিষয়ে দূরছাই করেনি, সে-ই ছেলেই কি-না আজ ওমন কর্কশ কন্ঠে এহেন রুক্ষ কথাগুলো বলে গেলো? হাফিজ মিয়া বড়ো দুঃখ পেলেন বোধহয়। তক্ষুনি নিজের ছলছলে চোখদুটো আলগোছে নামিয়ে নিলেন জমিন বরাবর। উপচে পড়া কান্নাগুলো গলার কাছে কোনমতে আঁটকে রেখে মোটা কন্ঠে আওড়ালেন তিনি,
“ মাফ করবেন ডাক্তার সাহেব।”
সহসা সম্বিত ফিরল রৌদ্রের। উপলব্ধি হলো নিজের করা কিছুক্ষণ আগের রূঢ় ব্যাবহারগুলো। আর ওমনি এক রাজ্যসম অপরাধীত্বে ছেয়ে গেল তার তন-মন। দিনকে দিন তার কি হচ্ছে? সে-তো আগে এমন ছিলো না! ইদানিং কেন এতো রূঢ় হচ্ছে সে? গম্ভীর পুরুষ তৎক্ষনাৎ খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে ওঠলেন। ইতস্তততায় হাফিজ মিয়াকে কিছু বলতেই যাবে তার আগেই গটগট পায়ে স্থান ত্যাগ করলেন মধ্যবয়স্ক। রৌদ্র কেবল অসহায় দৃষ্টে তাকিয়ে রইল সেদিকে। লোকটাকে আগ বাড়িয়ে ডাকবার খুব একটা উদ্বেগ নেই তার মাঝে!
শ্যামপুরুষের মুহুর্ত খানেক কাটলো আত্ম-অনুশোচনায়। পরক্ষণেই সে ফের উদ্যোত হলো নিজ গাড়ির পানে এগোতে। গুনে গুনে দু’টো কদম সিঁড়ি বেয়ে নেমেছে যুবক, ঠিক তখনি কোত্থেকে যেন লাগামহীন গতির বিশাল এক ট্রাক এসে আচানক টক্কর দিয়ে বসল সুদর্শনের গাড়িটাকে। মুহুর্তেই দুমড়েমুচড়ে গেল নির্জীব গাড়িটি! বিশাল ট্রাকের সংঘর্ষের অভিমুখে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবার কোনরূপ উপায়ন্তর না পেয়ে, পরিশেষে গাড়িটি গিয়ে ছিটকে পড়ল ফাঁকা কনক্রিটের রাস্তায়।
এহেন অতর্কিত কান্ডে হতভম্ব রৌদ্র! দাঁড়িয়ে আছে ঠায়। ওদিকে ট্রাকের গতি খানিকটা ধীর হয়েছে এপর্যায়ে। তা দেখে শ্যামপুরুষ তক্ষুনি ছুটে আসতে লাগল গাড়ির পানে। তবে কান্ড দেখো! মুখের ওপর রুমাল পেঁচিয়ে রাখা ট্রাক ড্রাইভার ঠিক তখনি তরলে পরিপূর্ণ একখানা কাঁচের বোতল আচানক ছুঁড়ে মা’রল রৌদ্রের দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ির পানে। আর ওমনি অক্ষিপটের সম্মুখে মুহুর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল গাড়িটা! সহসা থমকে গেল রৌদ্র! ছুটতে থাকা পদযুগল তার থেমে গেল মাঝপথেই। ট্রাকচালক থামেনি! উল্টো গতি বাড়াল ইঞ্জিনের। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে পাড়ি দিয়ে বসল ওতোবড় পথটা। রৌদ্রের সেদিকে হুঁশ নেই। সে কেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল জ্বলতে থাকা নিজ গাড়িটার পানে। তার পাদু’টোর শক্ত হাঁটুতে হুট করেই এক আকাশসম ক্লান্তি ভর করল যেন। বেচারা তক্ষুনি কনক্রিটের রাস্তায় ধুপ করে হাঁটু ঠেকাল! তার চোখের সামনে ভস্ম হচ্ছে এক রহস্যময় ফাইলের সকল অজানা তথ্য! ভস্ম হচ্ছে বহুল কাঙ্ক্ষিত “ মির্জা সায়ান মুগ্ধ ” নামের অজানা তথ্য! ভস্ম হচ্ছে আদুরে বোনকে ফিরিয়ে আনার অন্যতম পথ!
মার্বেলের স্বচ্ছ তকতকে মেঝেতে পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে এডউইন! মোটা ব্যান্ডেজ পরা একহাত তার ঝুলে আছে গলার সঙ্গে। মাথায় বাঁধা ব্যান্ডেজের মোটা আস্তরণ। সেথায় ছোপ ছোপ র ক্তে র উপস্থিতি! পাদু’টো সদ্য হাঁটার ক্ষমতা ফিরে পাওয়ায় গম্ভীর মুখো যুবকের সে-কি জোর দেখো! খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হলেও ঠিক ছুটে এসেছে প্যালেসে। গ্রাউন্ড ফ্লোরের লাউঞ্জে তার পা পড়তেই কোত্থেকে যেন ছুটে এলো মিলা। রোধ করল এডউইনের ব্যস্ত পথ! এডউইন বোধহয় খানিকটা বিরক্ত হলো এহেন কান্ডে। সে কেমন তিতিবিরক্ত অভিব্যক্তিতে চোখ তুলে তাকাল তরুণীর মুখপানে। মিলার গৌরবর্ণা ফ্যাকাশে মুখ, সেথায় প্রলেপ বসেছে একরাশ দুঃশ্চিতার। গম্ভীর পুরুষ তা বুঝেও না বোঝার ভান ধরলেন। কন্ঠে একরাশ বিরক্তি ঢেলে শুধালেন,
“ কি সমস্যা তোমার? পথ আটকালে কেনো?”
“ মুনলাইট কোথায় এডউইন?”
কথার পিঠে এহেন বাক্য কর্ণধার হতেই কপাল কুঁচকে গেল এডউইনের। সুদর্শন মুখখানায় লেপ্টে গেল রাগের ছাপ! মুখগহ্বরে ধারালো দাঁতকপাটি একে-অপরের সনে রুষ্টতায় পিষ্ট করে কটমট আওয়াজ তুলল এডউইন! ঝাঁঝাল কন্ঠে আওড়াল,
“ তা জেনে তুমি কি করবে গ্লুপায়া?”
শুকনো ঢোক গিলল মিলা। চিবুক নামালো কন্ঠার কাছে। ইতস্তততায় হাতদুটো অনবরত কচলাতে কচলাতে মিনমিনে স্বরে জবাবে বলল,
“ এমনিই…!”
নাকের পাটা ফুললো এডউইনের। বাড়ল দাঁত কিড়মিড় শব্দ! যুবক আলগোছে ডানে-বামে ঘাড় বাকিয়ে খানিক সর্তক হলো। ঠিক পরমুহূর্তেই রাগ-ক্ষোভে আচানক এক বলিষ্ঠ থাবায় আঁকড়ে ধরল তরুণীর কোমল গ্রীবাদেশ! এহেন অতর্কিত আক্রমণে ভড়কায় মিলা। তড়াক বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে সম্মুখে তাকাতেই দৃশ্যমান হলো, গম্ভীর পুরুষের শক্ত মুখাবয়ব! সহসা আঁতকে উঠে তরুণী। গ্রীবাদেশে শক্তপোক্ত হাতের জোর বাড়তেই খানিক ককিয়ে ওঠে সে, দু’হাতে খামচে ধরে এডউইনের হাতখানা। তবে বালাইষাট! এডউইন আজ বড্ড তেজী। কিছুতেই ছাড়ছেনা বেচারির গ্রীবাদেশ। উল্টো কটমট কন্ঠে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ আই টোল্ড ইউ্য গ্লুপায়া, মুনবার্ডের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকতে! ওকে ওর মতো ছেড়ে দে, নাহলে তোর একদিন আর আমার যতদিন লাগে। মাইন্ড ইট!”
এহেন কথায় স্থবির হলো মিলা। ছলছলে দৃষ্টে নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল সম্মুখে। গম্ভীর পুরুষ ধীরে ধীরে হাত সরালো তরুণীর গ্রীবাদেশ হতে। খোঁড়ান পায়ে উল্টো ঘুরতেই পেছন থেকে ভেসে এলো মিলার এলোমেলো কন্ঠ!
“ মুনলাইট নিষ্পাপ এডউইন! দুনিয়ার কুট কাঁচালি সম্বন্ধে সে এখনো বড্ড অজ্ঞ। তার মতো নিষ্পাপ মেয়ের জীবনে মনস্টারের মতো হিং স্র মানবের কোনো ঠাঁই নেই! নয়তো একদিন দেখা যাবে, অভিশপ্ত মনস্টারের অভিশপ্ত ছায়ার পদতলে মেয়েটাকে তার প্রাণ হারাতে হচ্ছে! এই ক্রুর সত্যিটা জানার পরও আপনি কিভাবে চাইছেন, মুনলাইট মনস্টারের হোক?”
থমকে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন! শীরঁদাড়া সোজা করে সামান্য ঘাড় বাকিয়ে তাকিয়ে পরক্ষণেই গমগমে গলায় আওড়াল,
“ প্রতিটা মানুষের নিয়তি আগে থেকেই নির্ধারিত গ্লুপায়া! আমরা কেবল কাঠপুতুল!”
ঠোঁটের কোণে আচমকা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো তরুণীর। সিক্ত চোখদুটো অঝোর ধারায় নোনাজল গড়ালেও, তা আগ বাড়িয়ে মুছে দেবার উদ্বেগ দেখালো না মিলা। সে উল্টো কন্ঠে গাম্ভীর্যের ছাপ ফুটিয়ে আওড়াল,
“ অভিশাপকে জোর করে নিয়তি বানাতে চাচ্ছেন এডউইন?”
এপর্যায়ে হুট করেই রহস্যময় বাঁকা হাসল এডউইন! চোখেমুখে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব ঢেলে ইস্পাত-দৃঢ় কন্ঠে শুধালো,
“ যাদের নিয়তি বহু আগে থেকেই জোড়া, তাদের আবার জোর করার কি আছে গ্লুপায়া? যেখানে মনস্তার তার ইউজ করা সামান্য টিস্যুকেও নিজের কাছ ছাড়া করে না, সেখানে সে তার বিবাহিতা স্ত্রীকে কিভাবে নিজের কাছ থেকে দূরে রাখবে? ইজ নট দিস ফানি?”
মুহুর্তেই এক অদৃশ্য বজ্রপাত ঘটল মিলার মাথার ওপর! চোখদুটো বিস্ফোরিত আকারে হঠাৎ ছুঁয়ে গেল কপাল।মুখাবয়বে দেখা দিলো অবিশ্বাসের ছাপ! বেচারির কন্ঠ কাঁপছে এবার। সর্বাঙ্গে বইছে ঝড়! সে কেমন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে থেমে থেমে আওড়াল,
“ ক-কি বললেন? মনস্তার… স্ত্রী…. মুন….”
তরুণী বাক্য বড্ড এলোমেলো! মাঘ মাসের হাড় কাঁপানো ঠান্ডার ন্যায় ক্রমশ জমে যাচ্ছে তার কন্ঠা! এডউইন বাঁকা হাসল ফের। খানিক সময় নিয়ে ফের গমগমে গলায় শুধালো,
“ তাদের দু’জনের মাঝখানে যে আসবে, আই সয়্যার — তাকে আমি নিজ হাতে ছিন্ন ভিন্ন করব। দরকার পড়লে তোকেও!”
রাত ২টো বেজে ৩৫ মিনিট!
পেন্টহাউজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কামরা — দ্য সেভনিয়র রুম! যার আলো আজ জ্বলমলে। বিশাল এ কামরার সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। কক্ষের ঠিক একপাশে বিছিয়ে রাখা একখানা বড়সড় ডেস্ক! যার ওপর বড্ড গুছিয়ে রাখা অসংখ্য কাগজপত্র! বলিষ্ঠ রূঢ় মানব আজ যথেষ্ট মনোযোগী! ডেস্কের গায়ে বিছিয়ে রেখেছেন একখানা মসৃণ পৃষ্ঠা, সেথায় দক্ষ হাতে আচঁড় বসাচ্ছেন পেন্সিলের। আঁকছেন ছক। মাঝেমধ্যে আঙুল দিয়ে নাড়াচ্ছেন ডেস্কের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা গ্লোবটাকে। তার শক্তপোক্ত আঙুলের ভাঁজে আঁটকে রাখা পেন্সিল, মনোযোগে সরু হয়েছে সুদর্শনের দৃষ্টি। ঘাড় সমান বাবরিছাঁটা চুলগুলো আজ উম্মুক্ত! এলোমেলো বেহায়া কায়দায় তারা কেমন ছুঁয়ে দিচ্ছে যুবকের ফর্সা ললাট। ক্ষীণ খাঁজযুক্ত দৃঢ় চোয়ালখানার পেশী টানটান, হালকা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি দেখা দিয়েছে গালের পাশে। আলোর তীর্যক রশ্মি গাল ছুঁতেই তা কেমন ব্লেডের ন্যায় চকচক করছে দেখো! মনোযোগে পিয়ার্সিং করা ঠোঁটের কোণ বারবার কামড়াচ্ছে যুবক।
তার বলিষ্ঠ বাহু দু’টো উম্মুক্ত। পরনে একখানা কালো রঙা ট্যাঙ্ক-টপ, সেই সাথে পরেছে বড্ড ঢিলেঢালা একখানা ঘিয়ে রঙা ট্রাউজার! সৌন্দর্য্যের দিক থেকে সে যেন মানুষ নয়, সাক্ষাৎ গ্রীক দেবতা।
মুগ্ধের আজ বেশ ব্যস্ততা! কুটনৈতিক বুদ্ধি খাঁটিয়ে চোরাচালান নিজ আয়ত্তে আনতে সে-কি দক্ষ ছক আঁকছে সে। মনোযোগে নেই বিন্দুমাত্র হেরফের। তবে এরইমধ্যে ঘটে গেল এক অপ্রত্যাশিত কান্ড! ছকের মসৃণ পৃষ্ঠায় পেন্সিলের তীক্ষ্ণ আগা বেশ ক’বার ঘুরতেই আচানক সেথায় ফুটে উঠল সপ্তদশীর কোমল অধরযুগল! আর ওমনি অভ্যন্তরে ঝটকা খেল মুগ্ধ। সন্দিগ্ধতায় চোখদুটো খানিকটা ক্ষীণ করে ফের কাগজপানে তাকাতেই উধাও হয়ে গেল দৃশ্যপট! রূঢ় মানব কেমন বিরক্ত হয়ে দাঁত ছোঁয়াল ঠোঁটের কোণে। পেন্সিলের গোড়া দিয়ে নিজ ঘাড়টা সামান্য চুলকে, বা-দিকে বাড়াল পা। খানিকটা দুরে দাড়ঁ করিয়ে রাখা ক্যানভাসের গায়ে ঝুলন্ত কাগজগুলো একটা একটা উল্টাতেই আচমকা কাগজগুলোর গায়ে ভেসে উঠল সপ্তদশীর কোমল উদর! ফের ভড়কায় মুগ্ধ! চোখদুটোতে বিভ্রম লেপ্টে খানিক বুঁজে নিয়ে ফের তাকাতেই খেয়াল করল — সে কেমন আলতো করে ধরে রেখেছে সপ্তদশীর মেদহীন মসৃণ উদর ঢাকা কাপড়খানা! যা ধরে রাখার দরুন স্পষ্ট দর্শন মিলেছে মেয়েটার নাভিকমলের। তক্ষুনি কাগজের গা থেকে হাত সরিয়ে, অদূরে ছিটকে গেল বলিষ্ঠ পুরুষ। শক্তপোক্ত কোমরটা তার আচানক স্পর্শ করল ডেস্কের গা! ভড়কানো কন্ঠফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ হোয়াট দ্য ফা’ক আ’ম সিইং?”
তৎক্ষনাৎ উত্তর পেলেন না রূঢ় মানব। কেবল বাড়ল তার হাসফাস! বদনের অস্থিরতা বাড়তেই যুবক চুলোয় চড়ালেন নিজের সকল কাজ-কর্ম। এক আকাশসম বিরক্তিতার সঙ্গে গটগটিয়ে এগোলেন কামরার বা-দিকে। সেথায় বানিয়ে রাখা হয়েছে ছোটখাটো একখানা বার-কাউন্টার! নামীদামী বিদেশি এলকোহলের ডিসপ্লে কালেকশন পরিপূর্ণ। যুবক তড়িঘড়ি করে কাউন্টারে প্রবেশ করল। ডিসপ্লে কালেকশন থেকে বেশ পুরনো দুটো ওয়াইনের বোতল নিয়ে এসে, নিঃশব্দে বসল রাউন্ড টুলের ওপর। কাউন্টার ডেস্কে সাজিয়ে রাখা বেশকিছু স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাস! অথচ শ্যাডো মনস্টার সেসবে ছুঁয়েও দেখলেন না। উল্টো ধারালো দাঁতের শক্তপোক্ত জোরের সাহায্যে এক ঝটকায় খুলে নিলেন বোতলের ক্যাপ। অতঃপর গপগপ করে গিলতে লাগলেন অতিমাত্রার তরল মা দ ক।
মাত্র মিনিট তিনেকের ব্যাবধানে সম্পূর্ণ ওয়াইনের বোতল শূন্য করে থামলেন মাফিয়া বিস্ট! আশ্চর্য! এখনো বিন্দুমাত্র নে শা হয়নি তার। চোখদুটো হয়নি ঝাপ্সা। যুবক বেজায় বিরক্ত এরূপ কান্ডে! তড়িঘড়ি করে অপর বোতলের ক্যাপটাও খুলে ফেলে, চুমুক বসালেন তার আগায়। একইভাবে সম্পূর্ণ বোতলের তরল খালাস করা শেষে মুগ্ধের বোধগম্য হলো — তার আজ নে শা হচ্ছে না! কিন্তু কেনো? কি করলে নে-শা ধরবে?
এহেন চিন্তায় ফের হাসফাস করে ওঠে বেপরোয়া যুবক। তড়াক বসা ছেড়ে উঠে চলে গেল — ডিসপ্লে কালেকশনের সন্নিকটে। ডিসপ্লে শেলফের ঠিক ডান পাশে একখানা ছোটখাটো ড্রয়ার। তা একটানে খুলে ফেলতেই দৃশ্যমান হলো — বেশকিছু অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, তরল ড্রা গ স। মুগ্ধ কোনরূপ কালবিলম্ব না করে তক্ষুনি ড্রয়ার থেকে তুলে আনলো দু’দুটো সিরিঞ্জ! ছোট্ট কাঁচের শিশিতে পরিপূর্ণ থাকা হলদেটে তরলটুকু সিরিঞ্জে টেনে নিয়ে, তা আলগোছে পুশ করল নিজ দেহে!
একে একে দু’টো সিরিঞ্জের সবটুকু তরল ক্রমশ প্রবেশ করল নির্দয় মানবের বলিষ্ঠ দেহে। মুহুর্তেই বেড়ে গেল তার শারীরিক কম্পন! ধড়ফড়িয়ে উঠল হৃৎপিণ্ড। পাহাড়সম দেহটা যা নড়ছে না! যুবক আলগোছে বুঁজে নিলো দু-চোখ। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর খানিকটা স্থির হলো রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ দেহ। পর্দা সরল চোখের ওপর থেকে। পরপরই ফের হতবাক হলো মুগ্ধ। এবারেও মা-তা-ল হয়নি সে! আশ্চর্য, এ আবার কোন রোগ ধরা দিলো তার মধ্যে?
অস্থির হলো মাফিয়া বিস্ট। বাহাতে ঘাড় ডলতে ডলতে কামড়ে ধরল নিজ অধর! চোখদুটো সামান্য বুজঁতেই মানসপটে ভেসে উঠল সপ্তদশী’র নির্মল মুখখানা। তক্ষুনি চোখ মেলে মুগ্ধ। অবোধের ন্যায় অশান্ত হৃৎপিণ্ডটার ওপর খানিক হাত ছুঁইয়ে আনমনে বিড়বিড় করে বলল,
“ তুই আবার কবে থেকে আমার নেশা হতে শুরু করলি সিগনোরা?”
ঢুলু ঢুলু কদম! পাহাড়সম দেহটা নড়বড়ে। একহাতে পরিপূর্ণ লালচে রা-মের বোতল, অন্যহাতে জ্বলন্ত সিগার! রূঢ় মানবের পায়ের গতি নিঃশব্দে এগোচ্ছে সপ্তদশী’র কক্ষের পানে। অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রশস্ত করিডরে নিরবতা বিরাজমান! তা ভেঙেই যুবক আলগোছে এসে দাঁড়াল মাহি’র কক্ষের সম্মুখে। স্বচ্ছ কাঁচের স্লাইডিং দরজাটা ভেতর থেকে লাগানো। তা টের পেতেই ঠোঁট কামড়ে হাসল মুগ্ধ। পরপরই আলতো করে বৃদ্ধা আঙুল ছোঁয়াল দরজার নবের গায়ে, ওমনি সেন্সরযুক্ত নবখানা আপনাআপনি খুলে দিলো দরজার লক। যুবক বড্ড সর্তকতার সঙ্গে দুয়ার খুলে প্রবেশ করল কক্ষে।
পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে আছে কক্ষটি! সিলিংয়ে ঝুলন্ত ঝাড়বাতিটা অফ করে রাখা। বিশাল কক্ষের চারপাশে দেয়ালে ঝুলন্ত ছোট ছোট ল্যানটিনে জ্বলছে মৃদুমন্দ আলো। যুবক এগোচ্ছে! তবে এগোনোর একপর্যায়ে তার হঠাৎ খেয়াল হলো — নিজ আঙুলের ভাঁজে আঁটকে রাখা জ্বলন্ত সিগারের কথা। ওমনি যুবক তড়িঘড়ি করে সিগারটা ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। পায়ের রুক্ষ পৃষ্ঠতলে সিগারটা বেশ রূঢ়তার সঙ্গে মাড়িয়ে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“ পিচ্চি আমার সিগারের ধোঁয়া সহ্য করতে পারেনা! তা কি আর ভুলে গেলে চলে?”
সিগারের জ্বলন্ত আগুনটুকু পরিশেষে নিভে গেল। যুবকও খানিক ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে পায়ে গতি টানল। প্রায় মিনিট পাঁচেকের ব্যবধানে সে এসে দাঁড়াল মখমলি বিছানার সম্মুখে। সপ্তদশী গভীর নিদ্রায় ডুবে আছে। নাকের সরু ছিদ্র দিয়ে ফেলছে ভোস-ভোস শব্দ! যুবকের তখন কি হলো কে জানে! সে কেমন মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় আলগোছে পা ভেঙে বসল মেঝেতে। হাতে থাকা কাঁচের বোতলটা নিঃশব্দে পাশে রেখে, বিছানার কোলে কনুই ঠেকায় রুশদী কিং। অতঃপর কনুইয়ে ভর দিয়ে হাতটা নিজ গালের পাশে চেপে রেখে, গভীর দৃষ্টে তাকাল মেয়েটার ঘুমন্ত মুখপানে। বড্ড সর্তক কন্ঠে বিড়বিড় করে বলল,
“ খুউব শান্তি তাই না বান্দীর মেয়ে? আমার ঘুম কেড়ে নিজে প্রাণভরে ঘুমাচ্ছিস! এতো সুখ তোর কপালে সইবে তো?”
ঘুমন্ত মাহি থোড়াই শুনল কথাগুলো! সে তো মত্ত গভীর নিদ্রায়। তার ঘুমন্ত সুশ্রী মুখ! যার সর্বত্র গভীর দৃষ্টে আকিঁবুকিঁ চালাচ্ছে মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার। আশ্চর্য! যার পদতলে গোটা রুশদী সাম্রাজ্য নত থাকতে বাধ্য, আজ সেই রুশদী কিং কিনা বসে আছে তারই শত্রুর মেয়ের সম্মুখে! তৃষ্ণার্ত চাতকের ন্যায় মেটাচ্ছে নিজের চোখদুটোর তৃষ্ণা। তার বিমুগ্ধ নয়নে নেই বিন্দুমাত্র অনিহা! ঘুমন্ত মাহি’কে অতি-আগ্রহে অবলোকন করতে করতে, সে বারেবারে চুমুক বসাচ্ছে রা-মের বোতলে। মুখভর্তি মাদকীয় তরল নিয়ে ঢোক গিলে পরক্ষণেই কপট বিরক্তভরা কন্ঠে বিড়বিড়িয়ে বলে ওঠে,
“ রোজ পানি দিয়ে স্নান না করে, ম-দ দিয়ে স্নান করছিস না-কি বান্দীর মেয়ে? তোকে দেখলেই এমন নেশা ধরছে কেনো?”
থামল মুগ্ধ! ফের মুখভর্তি তরল নিয়ে ঢোক গিলল সময় করে। অতঃপর আবারও মেয়েটার পানে তাকাল ক্ষীণ দৃষ্টে। তার অবাধ্য মনে হুট করেই ইচ্ছে জাগল মেয়েটাকে আলতো করে ছুঁয়ে দিতে। যুবক তাই করল। বিছানার কোলে নিজ মাথাটা এলিয়ে দিয়ে, আলগোছে তর্জনী বাড়াল মেয়েটার ঘুমন্ত মুখশ্রীর অভিমুখে। টুকটুকে লাল হয়ে থাকা নাকের ডগাটা আলতো করে ছুঁয়ে দিতেই যেন রাজ্য জয়ের ন্যায় আনন্দ পেলো মুগ্ধ। বাচ্চাদের ন্যায় বিছানার কোলে মুখ লুকিয়ে হেসে কুটোকুটি খেতে লাগল দ্য গ্রেট রুশদী কিং। পরপরই নিষ্পাপ ভঙ্গিতে বাদামি ঠোঁটদুটো উল্টে আওড়াল,
“ ইউ্য আর সো কিউট সিগনোরা! একদম একটা আদুরে বিড়াল ছানার মতো।”
কথাটুকু শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমন্ত সপ্তদশী খানিক নড়ে উঠল। ঘুমের ঘোরে তার হাতটা আচমকা সরে এলো খানিকটা। আনমনে বিছানার বাইরে পড়তে গেলেই রূঢ় মানব তক্ষুনি নিজ রুক্ষ হাতের উল্টোপিঠখানা আলগোছে ঠেকিয়ে দিলো মেয়েটার হাতের নিচে। ঘুমে আচ্ছন্ন সপ্তদশী টেরই পেলো না তা! খানিক নড়েচড়ে আবারও তলিয়ে গেল গভীর নিদ্রায়। যুবক ঠোঁট কামড়ে হাসল! চমৎকার নিরব সে হাসি। ঘাড়টা সামান্য কাত করে নিজ উদ্যোগে নিজের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে আবৃত গালটা আলতো করে ছোঁয়াল সপ্তদশীর হাতের তালুতে। মেয়েটার পানে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থেকে হুট করেই বলে বসল!
“ হুটহাট নিজেকে ভুলে শত্রুর মেয়ের প্রেমে পড়ার স্বভাব আমার নেই সিগনোরা! তবে তুই চাইলে সমাজ, জাত-ধর্ম সবকিছু ভুলে গোটা এক জনমের জন্য,আমি তোর ঐ বিধ্বংসী চোখদুটোর মায়ায় ডুব দিতে পারি! যদি তুই একটাবার চাস তো!”
সপ্তদশী কি শুনল সে কথা? শুনলে থোড়াই বসে থাকত। তাকে ছোঁয়ার অপরাধে এতক্ষণে নিশ্চয়ই রূঢ় মানবকে বলে বসত —
“ দূর হোন আমার চোখের সামনে থেকে অসভ্য লোক!”
ঘামে জবজবে অবস্থা শ্যাডো মনস্টারের পেটানো দেহখানার। সদ্য জিম সেরে বেরিয়েছে বলে কথা! গটগট পায়ে নিজ কক্ষে ঢুকে ক্লজেটের পানে এগোতেই যুবকের কর্ণকুহরে আচমকা ভেসে এলো অতিপরিচিত একখানা কন্ঠ!
“ আপনি আমায় ভুলে গিয়েছেন?”
সহসা থমকে দাঁড়ায় মুগ্ধ। চলতিপথে ঘাড় বাকিয়ে তাকাল পেছনে। ওমনি দেখা গেল — সপ্তদশীকে! যুবক কিয়তক্ষন স্থির দৃষ্টে তার পানে চেয়ে থেকে আচানক গাল বাকিয়ে হাসল। পুরোদমে ফের ক্লজেটের পানে এগোতে এগোতে গমগমে গলায় শুধালো,
“ আবারও আসলি? সারারাত দেখলাম তো তোকে! এতটুকুতেও মন ভরেনি? এখন দিনের বেলাতেও আসা শুরু হয়ে গেল?”
সপ্তদশী গাল ফুলোয়। দু’হাত বুকের কাছে বেঁধে নিয়ে কপট মন খারাপের সুরে আওড়াল,
“ আপনি তো আমায় দেখেননি! দেখেছেন ওকে।”
দাঁতের সনে ঠোঁট পিষে হাসল মুগ্ধ। ক্লজেটের দুয়ার খুলে একখানা তোয়ালে বার করে হাতে নিলো। ঠিক তখনি পেছন থেকে একজোড়া তুলতুলে হাত এসে আচানক আঁকড়ে ধরল বলিষ্ঠ পুরুষকে। মুগ্ধ নির্বিকার! ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে ক্লজেটের দুয়ার আঁটকে আলগোছে বুকের কাছ থেকে নামিয়ে দিলো সপ্তদশীর দু’হাত। পরক্ষণে পেছনে ঘুরে নতমুখী মেয়েটার পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভরাট কন্ঠে বলল,
“ বসে থাক! আমি আসছি।”
আড়মোড়া ভাঙছে মাহি! টানছে লম্বা হামি। মখমলি বিছানার কোলে ডুবে থাকলে চোখ খোলা দায় হয়ে পড়ে তার জন্য। আজও তার ব্যাতিক্রম ঘটলো না! মেয়েটা কেমন আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে নিবুনিবু চোখজোড়ার পর্দা সরালো। পরক্ষণেই অস্পষ্ট দৃশ্যপটের সম্মুখে এক অদ্ভুত চেহারা দৃশ্যমান হতেই সামান্য চিৎকার দিয়ে ঘুম ছেড়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে মাহি। এদিকে তার ওমন চিৎকার শুনে হতভম্ব ক্ল্যারা! তক্ষুনি নাটকীয় ভঙ্গিতে চেপে ধরেছে নিজ বুক। মধ্যকার দুরত্ব খানিক বাড়িয়ে মেয়েটার পানে কুঞ্চিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ কি হয়েছে তোমার বেবিগার্ল? এভাবে চিৎকার দিয়ে উঠলে কেনো?”
নিজেকে সামলাতে খানিক বেগ পোহাতে হচ্ছে মাহি’র। এখনো ধড়ফড় করছে তার বুক। ঘুম ভাঙতেই চোখের সামনে ওমন থার্ড জেন্ডার কাউকে দেখলে কে না ভয় পাবে শুনি? মেকআপ দিয়ে মুখের যা হাল করেছে! মাহি অভ্যন্তরে বেশ বিরক্ত হলেও বাইরে থেকে বড্ড স্থির। খানিক সময় নিয়ে ইতস্তত কন্ঠে বলল,
“ ইয়ে না মানে…এমনি! আপনি.. এখানে কেনো?”
গালভর্তি করে হাসল ক্ল্যারা। একহাতে নিজের ববকাট চুলগুলো খানিক বাতাসে উড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে আওড়াল,
“ তোমার মর্নিংটাকে আরেকটু থ্রিলিং করার জন্য এসেছি বেবিগার্ল! কাম.. লেটস গো উইদ মি বেবি!”
কথাটা বলতে দেরি, মাহি’র হাতদুটো টেনে ধরতে দেরি হলোনা ক্ল্যারার! মেয়েটাকে কোনকিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে সে কেমন টানতে টানতে তাকে নিয়ে ছুটে চলল কক্ষের বাইরে। এদিকে মাহি হতবিহ্বল! বারবার ক্ল্যারাকে সর্তক করে বলে যাচ্ছে,
“ আস্তে ছোটো ক্ল্যারা! আমি পড়ে যাব তো।”
শুনল না ক্ল্যারা। মেয়েটাকে নিয়ে পাড়ি দিতে লাগল প্রশস্ত করিডরের পথ। সিঁড়ি বেয়ে টপ ফ্লোরে উঠতে গেলেই মাহি কেমন সন্দিহান গলায় প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ ছাদে নিচ্ছো কেনো?”
তক্ষুনি ঘাড় বাকিয়ে তাকায় ক্ল্যারা। হাসিমুখে দুষ্ট কন্ঠে আওড়াল,
“ বলেছিলাম না? তোমার সকালটা থ্রিলিং করব। আফটার অল রুশদী’স সিগনোরা বলে কথা। ধরে নাও এটা আমার পক্ষ থেকে তোমার জন্য একটা গিফট!”
কথাটা বোধগম্য হলোনা মাহি’র। তবুও সে পা বাড়াল ক্ল্যারার সঙ্গে।
ছুটতে ছুটতে টপ ফ্লোরের অভিমুখে এসে দাঁড়াল ক্ল্যারা এবং মাহি। দু’জনেই বেশ হাঁপাচ্ছে। মাহি চুপচাপ এককোণে দাঁড়িয়ে থাকলেও দুষ্ট ক্ল্যারা তক্ষুনি দরজার আড়ালে গা লুকিয়ে উঁকি দিলো ছাঁদের পানে। যেখানে সুইমিংপুলের শীতল পানির গভীরে সাঁতরাতে মত্ত মাফিয়া মনস্টার। দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে, চিৎ হয়ে সাঁতরাচ্ছেন তিনি। আশেপাশে তেমন একটা ভ্রুক্ষেপহীন নেই তার। ক্ল্যারা ফের মুগ্ধ হলো মনস্টারের ডুবন্ত পেটানো দেহখানার বাহ্যিক সৌন্দর্যে। সে কেমন লাফিয়ে উঠল দাঁড়িয়ে থেকে। তা দেখে বেশ বিরক্ত মাহি। মুখ কুঁচকে বিড়বিড়িয়ে বলল কি যেন! অথচ ক্ল্যারার সেদিকে হুঁশ নেই। সে-তো ব্যস্ত রুশদী কিং-কে চোখ দিয়ে গিলে খেতে। আকর্ষণীয় সুদর্শনের উম্মুক্ত গা দেখে ক্ল্যারা কেমন হুট করেই বলে ওঠে,
“ লুক এট হিম বেবিগার্ল! উফফ…হ্যান্ডসামটা পানিতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। মাই গশশশ…কেউ প্লিজ এসি অন করো। রুশদী’র রূপের আগুনে আমি পুড়ে যাচ্ছি!”
এহেন কথায় থতমত খেয়ে গেল মাহি। তক্ষুনি নিজেও উঁকি দিলো ছাঁদের পানে। আর ওমনি মুগ্ধকে সাঁতরাতে দেখে বিরক্তি বোধহয় আরও বাড়ল তার। সে একপ্রকার বিরক্তি নিয়েই বলল,
“ তো যাও না ক্ল্যারা! নিজে গিয়ে আগুনটা নিভিয়ে দিয়ে আসো।”
“ আই উইশ! আমি যদি পারতাম….!”
অলক্ষ্যে গাল বাঁকায় মাহি। দু’হাত বুকের কাছে ভাঁজ করে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে আওড়াল,
“ পারবে না কেনো? অবশ্যই পারবে! তুমি চাইলেই পারবে। কেন জানো? আমার মনে হয় তোমাকে আর বিস্টকে নো নো, আই মিন — তোমাকে আর মনস্টারকে পাশাপাশি খুউব ভালো মানাবে। জাস্ট লাইক মেইড ফর ইচ আদার!”
আশ্চর্য হলো ক্ল্যারা। তৎক্ষনাৎ চোখ ঘুরিয়ে তাকাল মেয়েটার পানে। হতবাক কন্ঠে বলল,
“ বেবিগার্ল! তুমি এসব বলছো? রুশদী’স সিগনোরা হওয়া স্বত্বেও এসব বলছো? তোমার জেলাস ফিল হচ্ছে না?”
মুখ কুঁচকে নেয় মাহি। হাত দিয়ে মাছি উড়াবার ভঙ্গি ধরে বলে ওঠে,
“ না তো! কেনো? জেলাস হবার কথা ছিলো না-কি?”
ক্ল্যারার বিচক্ষণী চোখ! তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। অদৃশ্য কিছু পরোখ করে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে শুধালো,
“ উমম! হয়তো। তোমার জায়গায় আমি হলে, এতক্ষণে কেউ আমার রুশদীকে নিয়ে কথা বললে তার চুল ছিঁড়ে ফেলতাম।”
মৃদু হাসল মাহি। ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে চোখদুটো নামিয়ে উল্টোপথে পা বাড়াতেই হুট করে পেছন থেকে ভেসে এলো মুগ্ধের গমগমে কন্ঠ!
“ আবে এই বান্দীর মেয়ে! ঐখানে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে কি দেখছিস? দেখতে ইচ্ছে হলে সামনে আয়। সবটা পরিষ্কার করে দেখিয়ে দেই!”
সহসা আঁতকে উঠে ক্ল্যারা! ভয়ে তৎক্ষনাৎ মাহি’কে রেখেই ছুটে পালালো উল্টোপথে। এদিকে মাহি হতভম্ব। ক্ল্যারা এটা কি করল? তাকে ফাঁসিয়ে রেখে নিজে চলে গেল? এবার কি করবে সে? ভাবতে ভাবতেই বোকা মানবী তক্ষুনি সরে গেল দরজার কাছ থেকে। নতমুখে করিডর দিয়ে হাঁটতে গেলেই আচমকা অবচেতন মনের কোণে উত্থাপিত হলো — কিউটির কথা। দু’টো দিন ধরে দেখছেনা বেচারাকে। কে জানে প্যালেসে সে কেমন আছে!
কিউটির চিন্তায় হুট করেই মনটা বিষন্ন হলো সপ্তদশীর। পায়ে টানল রুখ। মনে মনে ভাবল,
“ বিস্টকে যদি বলি কিউটিকে এনে দেবার কথা, তাহলে কি সে এনে দেবে?”
চিন্তায় হাসফাস করে উঠল মাহি। নত দৃষ্টিযুগল খানিক উঁচাতেই খেয়াল করল — সম্মুখের কক্ষের দুয়ার খোলা। বিস্ট নিশ্চয়ই গোসল সেরে এখানে ঢুকবে। এরূপ ভাবনায় বোকা মানবী চটজলদি পা বাড়ায় সেদিকে। অতঃপর টুপ করে ঢুকে পড়ে কক্ষে!
সদ্য সাঁতরানো শেষে পুল থেকে উঠে এসেছে রূঢ় মানব। কোমর বরাবর পেঁচিয়েছে একখানা সফেদ রঙা তোয়ালে। ভেঁজা চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলিষ্ঠ মানব, গটগট পায়ে ঢুকল নিজ ড্রেসিং রুমে। তবে রুমে ঢুকতেই তার নজর গিয়ে আটকাল অদূরের ডিভানে জড়সড়ভাব নিয়ে বসে থাকা সপ্তদশীর পানে। যুবক একপলক সেদিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরু করল। শক্ত মুখে অভ্যন্তরে বিড়বিড় করে বলল,
“ এই হ্যালুসিনেশন এখনো যায় নি?”
মনে মনে কথাটা আওড়ে পরক্ষণেই যুবক আলগোছে আঁটকে দিলো কক্ষের দুয়ার। অতঃপর মেয়েটাকে একপ্রকার উপেক্ষা করে ধুপধাপ পায়ে এগিয়ে গেল ক্লজেটের সম্মুখে। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে দু’হাতে কোমর থেকে তোয়ালেটা খুলে ফেলতেই আচানক পেছন থেকে ভেসে এলো সপ্তদশীর চিৎকার ধ্বনি!
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৬ (২)
“ আসতাগফিরুল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ! আপনার শাটার বন্ধ করুন অসভ্য, নির্লজ্জ, বেহায়া লোক!”
এহেন চিৎকারে হকচকিয়ে ওঠে মুগ্ধ। তড়িঘড়ি করে হতবুদ্ধির ন্যায় ঘুরে তাকাতেই ফের আরেক চিৎকার দিয়ে পিঠ ঘুরিয়ে উল্টোদিকে তাকায় মাহি। চোখদুটো দু’হাতে আঁটকে রেখে গজগজ করতেই মুগ্ধ কেমন হতভম্ব কন্ঠে বলে ওঠে,
“ হোয়াট দা ফাআআআআআআআক! তুই আমার হ্যালুসিনেশন নাহ?”
