Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ১৬

মেজর কারদার পর্ব ১৬

মেজর কারদার পর্ব ১৬
ফিনারা ঝুমুর

এক হাতে ভারী ও ধারালো একখানা কংক্রিটের ইট সহিত বখাটেদের সামনে যমদূত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেজর শীর্ষ কারদার। তার পায়ের কাছে একটু আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে ওদের এক সঙ্গী যার পুরো মুখমণ্ডল মেজরের ইটের উপর্যুপরি আঘাতে অর্ধ-থেতলানো, মগজ আর রক্ত মিলেমিশে এক বীভৎস নরককুণ্ড তৈরি করেছে। সেই মৃত ও রক্তাক্ত দৃশ্য বাকি বখাটেদের গায়ের হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়েছে। এই মেজরের একটু পেছনেই কাদায় রঞ্জিত ভেজা ঘাসের ওপর মারাত্মক আহত হয়ে পড়ে আছে রক্তাক্ত মুসা। ম্যামকে বাঁচাতে গিয়ে বখাটেদের সাথে ধস্তাধস্তিতে পেটের একপাশে ছুরিকাঘাতে সম্পূর্ণ বিক্ষত হয়েছে সে, যন্ত্রণায় ছটফট করছে।

​সামান্য দূরে একটা রাবার গাছের আড়ালে নিজের ছেঁড়া জামাকাপড় বুকে চেপে ধরে থরথর করে কাঁপছে মেঘ। ওর কোমল গালে পশুর হাতের পাঁচ আঙুলের কালশিটে ছাপ স্পষ্ট, ফেটে যাওয়া ঠোঁটের কোণ বেয়ে এখনও তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কাদা আর ঘাসে লেপ্টে থাকা এলোমেলো কুন্তলরাশিতে মেঘকে এই মুহূর্তে চরম বিধ্বস্ত ও শায়িত এক চিলতের মতো দেখাচ্ছে।
​শীর্ষর পুরুষালী চোখে যেন এই দৃশ্য কোনোভাবেই সহ্য হলো না। নিজের ভালোবাসার, নিজের হবু স্ত্রীর এই জঘন্যতম অবস্থা দেখে তার আর্মির সমস্ত হুশ, আইন-কানুন এক নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল। সে ডানহাতে থাকা রক্তমাখা ভারী ইটটা দিয়ে ফের সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত হানল সামনে থাকা আরেক ছেলের মুখপানে। তীব্র আদিম ক্রোধ আর প্রতিশোধপরায়ণতা শীর্ষকে এই মুহূর্তে আস্ত এক উন্মাদ, রক্তপিপাসু জানোয়ারে পরিণত করেছে। রাগে ওর চওড়া ছাতি আর পুরো দেহ থরেবেথরে কাঁপছে।

​“কোন সাহসে হাত দিয়েছিস তোরা ওর গায়ে? কাকে বাজে স্পর্শ করেছিস তোরা, শুয়োরের বাচ্চারা? কাকে? আজ তোদের চিতার আগুন আমি নিজেই জ্বালাবো! তোদের বংশ নির্বংশ করব!”
​বখাটেরা এমনিতেই চোখের সামনে সঙ্গীর ওমন বীভৎস মৃত্যু দেখে প্রাণ হারানোর চরম ভয়ে কাঁপছিল। তার ওপর এই এলাকায় মেজর শীর্ষ কারদারকে কে না চেনে? যেমন ভালোর ভালো, অপরাধীদের কাছে তেমনই সে সাক্ষাৎ কালদূত! নিজেদের পিঠ বাঁচাতে, মরিয়া হয়ে বাকি তিনজন একযোগে শীর্ষকে আক্রমণ করতে বা মারতে উদ্ধৃত হয়েও কোনো কূল-কিনারা করতে পারছে না। মেজরের একেকটা আর্মি বুটের লাথি আর ডিফেন্সের মারের সামনে ওরা খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছে।

​“একটা নিরীহ মেয়েকে একা পেয়ে ধর্ষণ করতে খুব ভালো লাগে, তাই না তোদের? দেহের খুব ক্ষুধা চড়েছে হারামজাদাদের? দাঁড়া, আজ তোদের সেই স্থায়ী ক্ষুধা আমি চিরতরে মিটিয়ে দিচ্ছি!”
​কথাটা শেষ হতেই দলের অন্য একটা ছেলের প্যান্টের জিপার ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে, তার গোপনাঙ্গ বরাবর নিজের লোহার মতো শক্ত আর্মিবুট পরিহিত পা দিয়ে সজোরে এক লাথি হাঁকাল শীর্ষ! পৈশাচিক এক যন্ত্রণার আর্তনাদ ছেড়ে ছেলেটা ওখানেই উল্টে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে গেল।​
এমন সময় এত কিছুর মাঝে, সাত জনের বখাটে দলের বাকি যে দুজন বেঁচে ছিল, তাদের একজন আচমকা পেছনের অন্ধকারের আড়াল থেকে এসে শীর্ষর ডান বাহুতে ধারালো ছুরির এক পোচ বসিয়ে দিল! চামড়া চিরে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে আসতেই খ্যাঁপাটে এক বন্য ষাঁড়ে পরিণত হলো মেজর শীর্ষ কারদার। সে নিজের ক্ষতের দিকে না তাকিয়ে এক ঝটকায় উল্টো ঘুরে দাঁড়াল। ছেলেটা মেজরের সেই রক্তচক্ষু দেখে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে পালানোর পূর্বেই, শীর্ষ চিল পাখির মতো ঝাপটে ধরে তার চোয়ালটা নিজের দুই লোহার মতো শক্ত হাত দিয়ে ধরে এক তীব্র মোচড় দিল! কড়কড় করে ঘাড়ের হাড় ভেঙে যাওয়ার বীভৎস শব্দ হলো। ছেলেটার চোখের মণি দুটো উল্টে গেল এবং এক সেকেন্ডের মাথায় সে সেখানেই ইহলোক ত্যাগ করে মাটিতে আছড়ে পড়ল।
চোখের সামনে একের পর এক হাড়কাঁপানো বীভৎস মৃত্যু, রক্তের হোলিখেলা আর নিজের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই কালবৈশাখী ঝড়ের তীব্র মানসিক চাপ সইতে পারল না সতেরো বছরের মেঘালয়া। শরীর আর মনের সমস্ত শক্তি হারিয়ে সেও এক লহমায় সম্পূর্ণ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।

ধুপ করে ভেজা মাটিতে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ হতেই, রক্তমাখা ইট হাতে শীর্ষ ঝট করে পাশ ফিরে তাকাল। তার বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষে খালি হয়ে গেল, যখন সে দেখল তার সাধের ‘ব্ল্যাক বিউটি’ কাদা-মাটি মাখা ঘাসের ওপর নিথর হয়ে পড়ে আছে।
​শীর্ষ হাতের ইটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে পাগলের মতো ছুটে গেল মেঘের কাছে। হাঁটু গেড়ে বসে মেঘের সেই ক্ষতবিক্ষত মাথাটা নিজের বাম বাহুর ওপর তুলে নিল ও। অন্য হাত দিয়ে মেঘের নরম গালে আলতো করে চাপড় মারতে মারতে উন্মাদের মতো চিৎকার করে বলতে লাগল,
​“এই! এই মেয়ে, চোখ খোল! চোখ খোল বলছি তোকে! অজ্ঞান কেন হলি? এই শীর্ষ কারদারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস তোর হয়, আর এই সামান্য কটা কুকুরের মরণ দেখে তুই চোখ বুঁজে ফেললি? চোখ খোল মেঘালয়া, ওদের আসল শাস্তি তো এখনও বাকি! ওদের শেষ দেখবি না তুই? ওরা ওরা তোকে ছোঁয়ার সাহস করেছে–!”

​শীর্ষর বুকটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল, তার প্রাণ ওষ্ঠাগত। মেঘের এই চেতনাহীন দেহের বিধ্বস্ততা, ওর ওই ছিঁড়ে যাওয়া কুর্তি আর উন্মুক্ত অন্তর্বাস মেজরের চোখের ভেতরের আগুনকে এক অদ্ভুত অপরাধবোধে রূপ দিল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে নিজের পরনে থাকা বাংলাদেশ আর্মির খাকি শার্টের বোতামগুলো সপাটে খুলে ফেলল। নিজের খালি গায়ে বৃষ্টির জল মেখে, সেই চওড়া খাকি শার্টটা দিয়ে অত্যন্ত যত্ন ও সম্মানের সাথে মেঘের শরীরের উপরি অংশ সুন্দর করে ঢেকে দিল ও।
​পাশে তখন মুসার চেতনাহীন দেহটা রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। শীর্ষ একহাতে মেঘের পিঠ আর অন্যহাতে হাঁটুর নিচে জড়িয়ে ধরে ওকে পাঁজকোলা করে বুকে তুলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঠিক তখনই, ঝোপঝাড় মাড়িয়ে ভারী বুটের শব্দে একদল সশস্ত্র সেনা সদস্য সেখানে এসে উপস্থিত হলো। মুসার ব্যাকআপ কল পেয়েই তারা ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে গাড়ি নিয়ে ছুটে এসেছে।​স্পটের এই বীভৎস লাশের স্তূপ আর মেজরের রক্তাক্ত শরীর দেখে সেকেন্ড ইন কমান্ড অফিসার স্যালুট ঠুকে আতঙ্কিত সুরে প্রশ্ন করল,

“আর ইউ ওকে, স্যার?”
​সৈনিকদের এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না শীর্ষ। তার চোখ তখন কেবল তার বুকে লেপ্টে থাকা মেঘের ওই ফ্যাকাশে মুখের দিকে। সে অত্যন্ত বরফশীতল ও ক্ষিপ্র গলায় তার আন্ডারে থাকা সৈনিকদের আদেশ দিল,
​“মুসাকে এখনই গাড়িতে তোলো, দ্রুত রামু সিএমএইচ-এ অ্যাডমিট করো ওরে। আর এই যে বাস্টার্ডগুলো মাটিতে পড়ে আছে, এদের এমন ব্যবস্থা করো যেন কাল ভোরের সূর্য ওঠার আগে এদের হাড়গোড়েরও কোনো নিশানা এই রামুর মাটিতে না থাকে। আর এ ঘটনা যেন পাবলিকলি লিক না হয়। ক্লিয়ার? ”
​“ইয়েস স্যার!”
​সেনা সদস্যরা ক্ষিপ্রতার সাথে মেজরের কমান্ড পালনে নেমে পড়ল। ওদিকে আর কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে, বুকে জড়িয়ে থাকা আতঙ্কিত ও নিথর মেঘকে শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে শীর্ষ রাবার বাগানের অন্ধকারের বুক চিরে নিজের জিপের দিকে হেঁটে গেল।

গবাদি পশুর এই পরিত্যক্ত আস্তাকুঁড়ে চারপাশটা শুধু স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার আর খড়কুটোর গন্ধ। বাইরে তখনো যেন প্রলয় নেমেছে; বড় বড় গর্জন তুলে তীব্র কালবৈশাখী ঝড় বইছে পুরো রামু উপজেলা জুড়ে। এই ঘন অন্ধকারের মাঝে ঝড়ের তাণ্ডবে রাস্তাঘাট প্রায় বন্ধ, গাছপালা ভেঙে পড়ার শব্দ আসছে দূর থেকে। এমন মরণ-ঝুঁকির মাঝে এই বিধ্বস্ত মেয়েটিকে নিয়ে সেনানিবাসের কোয়ার্টারে ফেরা একপ্রকার অসম্ভব ছিল। তাই পথিমধ্যে এই ফাঁকা, ভাঙাচোরা আস্তাকুঁড়েই মেঘকে নিয়ে সাময়িক ঠাঁই নিয়েছে শীর্ষ।
​ভেতরের এক কোণে থাকা শুকনো খড়ের গাদার ওপর সে মেঘকে শুইয়ে দিয়েছে পরম যত্নে। নিজের খাকি শার্টে মেঘের ক্ষতবিক্ষত শরীরটা ঢেকে দিয়ে ও পাশেই বসে আছে। চোখ দুটো তার নিবদ্ধ বাইরের অন্ধকারের পানে, কান খাড়া করে রাখছে যেকোনো বিপদের আশঙ্কায়। ​হঠাৎ এক তীব্র আলোয় আকাশ চিরে বিজলি চমকে উঠল। সেই ক্ষণিকের আলোয় শীর্ষ তাকাল মেঘের ফ্যাকাশে, নিথর মুখটার দিকে। অন্ধকারের মাঝেও ওই মায়াবী রূপ যেন শীর্ষর চোখে স্পষ্ট ভাসছে। মেঘের সেই বখাটেদের কামড়ে ক্ষত হওয়া কোমল গালের ওপর নিজের ডান হাতের আঙুলগুলো আলতো করে ছোঁয়াল ও। ওর বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল। শীর্ষ আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে একটু ঝুঁকে মেঘের ললাটের অগ্রভাগে নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে দাবাল।

​চোখ বন্ধ করে এই গভীর নির্জনতায় সে মেঘের পবিত্র সান্নিধ্য অনুভব করার চেষ্টা করল। এতক্ষণ ধরে শীর্ষর বুকের মাঝে বয়ে চলা খুনের যে দামামা ঝড় উঠছিল, তা এই ছোঁয়ায় মুহূর্তেই এক শান্ত, শীতল রূপ নিল। সে গভীর এক ঘোরের মাঝে মেঘের সারা আননে নিজের ঠোঁট বুলিয়ে দিল, যেন বখাটেদের দেওয়া প্রতিটা নোংরা স্পর্শ সে নিজের ভালোবাসা দিয়ে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে চায়। তারপর মাথাটা মেঘের নিথর বুকের ওপর আলতো করে রেখে, ওকে দুই বাহুর শক্ত বাঁধনে আঁকড়ে ধরে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
​“তোর কিছু হলে আমি এক্কেবারে শেষ হয়ে যেতাম জান! তুই ধর্ষিতা হ বা যাই হ, তুই সমাজ-সংসারের চোখে অপবিত্র হ—তবুও তুই আমার, শুধুই আমার। আজ আজ যদি একটুখানি দেরি হতো, ছুটে গিয়েও যদি তোকে অক্ষত না পেতাম, বিশ্বাস কর আমি মরে যেতাম জান। এই শীর্ষ কারদার স্রেফ মরে যেত।”
​এতটা সময়ের কঠিন ব্যবধানে, নিজের সমস্ত আর্মির অহংকার আর কঠোরতা ভেঙে চুরমার করে দিয়ে দু ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল শীর্ষর চোখ থেকে। সেই জল গিয়ে মিশে গেল মেঘের গলার ভেজা ত্বকে। নিজের জীবনের প্রথম পরাজয়টা আজ সে টের পাচ্ছে। বার বার মেজরের মনে হচ্ছে, সে ব্যর্থ। তার এত বড় গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, এত কড়া নজরদারির পরও সে নিজের মেঘকে সঠিক সিকিউরিটি দিতে পারেনি, এই অপরাধবোধ তাকে ভেতরে ভেতরে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।​সে মেঘের গলার কাছে মুখ গুঁজে আরও একবার গভীর আবেগে, ফিসফিসিয়ে বলল,

​“তোর দেহের প্রতিটা ক্ষত, প্রতিটা কলঙ্কও আমার কাছে স্বর্গের পুষ্পরঞ্জিত মালার মতো পবিত্র রে অবুঝ মেয়ে। তুই যেমনই হোস, যে অবস্থাতেই থাকিস না কেন তুই শুধুই আমার। শুধু আমার—একান্তই আমার!”
মেঘের দেহের মৃদু নড়াচড়া আর ওলটপালট হওয়া শ্বাস টের পেতেই শীর্ষ চট করে ওর বুকের ওপর থেকে মাথা সরিয়ে একটু দূরত্ব বজায় রাখল। ঠিক মিনিট তিনেক পরেই, মেঘের ভারী হয়ে থাকা চোখের পাতা দুটো আধো আধো করে উন্মুক্ত হতে শুরু করল। কিন্তু চোখ মেলতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই ওর দৃষ্টির সামনে প্রকাশিত হলো না।
​ধীরে ধীরে অবচেতন মস্তিষ্ক যখন ওকে রাবার বাগানের সেই নারকীয় ঘটনার কথা একে একে মনে করিয়ে দিতে লাগল, অমনি এক তীব্র আতঙ্কের ভীতি নতুন করে ওর বুকে এসে জেঁকে বসল। ও এক ঝটকায় ধড়ফড়িয়ে খড়ের গাদার ওপর উঠে বসল।

​“আমি–আমি কোথায়? রাইসা! তানিয়া!”
​মেঘের সেই কাঁপাকাঁপা ভীতু গলা কর্ণকুহরে যেতেই, মাটির ওপর অন্ধকারের আড়ালে বসে থাকা শীর্ষ এক শান্ত ও গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
“শান্ত হও। আপাতত আমরা একটা পরিত্যক্ত গরুর আস্তাকুঁড়ে রয়েছি।”
​“মেজর সাহেব?”
​অন্ধকার চিরে এই চিরপরিচিত, ধারালো অথচ ভরসাজনক কণ্ঠস্বর কানে যেতেই মেঘ একদম হতবাক হয়ে গেল। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে সে যেন মনে মনে এই পরিস্থিতির সত্যতা যাচাই করে নিতে চাইল। ওদিকে মেঘের ওই কাঁপানো ঠোঁটে “মেজর সাহেব” সম্বোধনটা শীর্ষর কাছে বরাবরের মতোই বড় শ্রুতিমধুর আর পরম কর্ণশান্তিময় লাগল। কী এক জাদুকরী টান আছে এই দুটো শব্দের মাঝে, তা শীর্ষর জানা নেই। আর জানলেও, এই মুহূর্তে নিজের ভেতরের প্রশান্তির কারণটা সে কোনোভাবেই রোধ করতে চাইত না।
​“হুম, আমি।”

শীর্ষ অন্ধকারে মাথা নেড়ে সায় দিল।
​“কিন্তু, কিন্তু আপনাকে আমি দেখতে পাচ্ছি না কেন? এখানে এত অন্ধকার!”
মেঘ দুই হাত সামনে বাড়িয়ে অন্ধকারের দেয়াল হাতড়ানোর চেষ্টা করল।
​“বাইরে খুব ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। আর এখানে কোনো বিদ্যুৎ নেই।”
​মেঘ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে খড়ের ওপর নিজের হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে গুটিশুটি মেরে বসে রইল। একটু আগে যে মেয়েটি নরপশুদের হাত থেকে বাঁচতে মরিয়া হয়ে দৌড়াচ্ছিল, সেই চঞ্চল মেয়েটির কেন যেন এখন এই হিংস্র মিলিটারির মেজরের কাছে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে।

​হঠাৎ করেই রাবার বাগানের সেই অপবিত্র, নোংরা স্পর্শগুলো সারা কায়ায় লেগে আছে মনে হতেই মেঘের গা রি রি করে উঠল। সে এক তীব্র ঘৃণায় নিজের দুই হাত দিয়ে শরীরের চামড়া ঘষে ঘষে যেন সেই নোংরা দাগগুলো উঠাতে গেল। কিন্তু হাতটা নিজের বাহুর ওপর যেতেই আচমকা চমকে উঠল ও!​কারণ, এখানে ওর নিজের সিল্কের কুর্তির ছেঁড়া কাপড়ের পরিবর্তে অন্য এক রাজকীয় কাপড়ের অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে। কাপড়টা ভীষণ মোলায়েম, আর তা থেকে অদ্ভুত মিষ্টি এক সুবাস ছড়াচ্ছে। মেঘ একটু থমকে গিয়ে নিজের বুকের কাছে হাত রাখতেই বুঝতে পারল এটা ওর নিজের ওড়না বা জামা নয়, বরং আস্ত একটা পুরুষালী শার্টের অস্তিত্ব!

​অন্ধকারের মাঝেই কাপড়ের কলারটা আলতো করে নিজের নাকের কাছে টেনে নিতেই মেঘের বুকের ভেতরটা এক অজানা শিহরণে কেঁপে উঠল। ও এক লহমায় নিশ্চিত হয়ে গেল যে এটা স্বয়ং মেজর শীর্ষ কারদারের গায়ের শার্ট। কারণ, এই কাপড়ের সুতোয় সুতোয় মিশে আছে শীর্ষর সেই চেনা সিগনেচার সুবাস দামি তামাক আর কাঠের কড়া নোটের মিশ্রণে তৈরি ‘টম ফোর্ড টোব্যাকো ভ্যানিল’ পারফিউমের রাজকীয় স্মেল! তার সাথে মেজরের শরীরের পুরুষালী ঘামার্ত স্মেল মিলেমিশে এমন এক তীব্র মায়াবী টান তৈরি করেছে, যা এই দুর্যোগের রাতেও মেঘের অবাধ্য মনকে এক অচেনা ঘোরের মাঝে আচ্ছন্ন করে টানতে লাগল।

এতক্ষণ নিকষ আঁধারে থাকার ফলে হুট করেই চোখের সামনে তীব্র আলোর অস্তিত্ব অনুভব করতেই মেঘের কপালটা কুঁচকে গেল। ও দুই হাত দিয়ে চোখ দুটো আড়াল করে এদিক-ওদিক তাকাতেই দেখল পরিত্যক্ত আস্তাকুঁড়ের এক কোণে পড়ে থাকা একটা বড় কাঠের লাঠির মাথায় শুকনো খড় আর চটের বস্তা পেঁচিয়ে মশাল বানিয়ে আগুন জ্বালিয়েছে শীর্ষ। আগুনের সেই লেলিহান শিখার তাণ্ডবেই সারা ঘরের কাঠে আর মাটির দেয়ালে আলো-ছায়ার এক মায়াবী রশ্মির চলাচল বেড়ে গেছে।
​“তুমি রামুর রাবার বাগানে ভরসন্ধ্যায় একা একা কী করছিলে, মেঘালয়া?”

​আচমকা শীর্ষর এমন গম্ভীর ও রাশভারী প্রশ্ন শুনে মেঘ নিজের চোখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল মেজরের দিকে। আগুনের আলোয় ও স্পষ্ট দেখতে পেল শীর্ষর শরীরে এখন আর খাকি শার্টটা নেই । ওর পরনে কেবল একটা ডার্ক গ্রিন কালারের ট্যাঙ্ক টপ আর আর্মি ট্রাউজার। এর বেশি কিছুই নেই। ট্যাঙ্ক টপের ফাঁক গলে শীর্ষের চওড়া ছাতি, সুগঠিত পেশিবহুল দুই বাহু আর খাঁজে খাঁজে থাকা সুঠাম শরীরটা আগুনের আলোয় চকচক করছে। ডান বাহুর সেই চিলতে ক্ষতের রক্ত এখন জমাট বেঁধে কালো হয়ে আছে। মেঘের এমন পুরুষালী অবয়ব দেখে এক লহমায় তীব্র লজ্জা লাগলেও, সন্ধ্যার সেই বীভৎস স্মৃতি মনে আসতেই ও ভেতর ভেতর আবার অস্থির হয়ে পড়ে।​সে মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় উত্তর দিল,
“আমি–আমি ঘুরতে গিয়েছিলাম।”
​“ঘুরতে গিয়েছিলে? ভালো কথা। কিন্তু তোমার ফ্যামিলি কোথায় ছিল? এত বড় একটা বিপদের সম্মুখীন হলে, ওই নরপশুরা তোমার গায়ে হাত তোলার সাহস করল, অথচ তোমার ফ্যামিলির কাউকে আমি কোথাও দেখতে পাইনি, কেন?”

​শীর্ষর প্রতিটি প্রশ্ন যেন একেকটা তীরের মতো এসে বিঁধছে মেঘের বুকে। ও বুঝতে পারল না মেজর কীভাবে ঠিক সময়ে ওখানে পৌঁছাল। সে নিজের নখ খুঁটতে খুঁটতে আমতা আমতা করতে লাগল। মেঘকে ওভাবে চুপ করে থাকতে দেখে শীর্ষ এবার বাঘের মতো ধমকে উঠল,
​“কী হলো? মুখ বন্ধ করে আছো কেন? উত্তর দাও!”
​শীর্ষর সেই বজ্রকঠিন ধমক শুনে মেঘের ভেতরের সতেরো বছরের মেয়েটি ভয়ে কেঁপে উঠল। ও আর কোনো কিছু লুকানোর সাহস পেল না, কাঁপা কাঁপা গলায় এক নিঃশ্বাসে সব সত্যি বলে দিল—কীভাবে ও ফ্যামিলিকে না জানিয়ে, মায়ের বারণ অমান্য করে তাকে মিথ্যে বলে, বাবার অজান্তে বন্ধুদের সাথে ঢাকা থেকে পালিয়ে এসেছে।
যদিও এসব শীর্ষের জানা তবু মেঘের মুখ থেকে ​সবটা শোনা শেষ হতেই শীর্ষ একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠল,
“তুমি কি পাগল, মেঘালয়া? বর্তমান বাংলাদেশের ল অ্যান্ড অর্ডার পরিস্থিতি কেমন, তা তোমার জানা নেই? কোন সাহসে, কীসের ভিত্তিতে একটা মেয়ে হয়ে একা একা ঢাকা থেকে এই চট্টগ্রামে এসেছ? আর কাকে নিয়ে এসেছিলে এই নির্জন বাগানে?”
​“আমার–আমার ফ্রেন্ডসরা ছিল সাথে।”
মেঘের গলা বুজে এল।​শীর্ষ এবার এক চরম তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ওর চোখ দুটোয় তখন জ্বলছে উপহাসের আগুন।

​“ফ্রেন্ডস? তা তোমার সেই সো-কলড মহান বন্ধুরা এখন সবাই কোথায়? বিপদের সময় তারা তোমাকে কোন চুলোয় ফেলে রেখে চলে গেল?”
​মেঘ এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারল না। ওর নিজের বুকের ভেতরটাও এখন এই একই প্রশ্নে তোলপাড় হচ্ছে। রাইসা, ফাতিমা, তানিয়া ওরা কি একবারের জন্যও পেছনে ফিরে তাকায়নি? ওরা কি দেখেনি মেঘ ওদের সাথে নেই? কীভাবে নিজেদের খেয়ালে মেঘকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ফেলে চলে গেল ওরা? মেঘ কোনো ভেবে কূল পায় না। ওর চোখ ফেটে আবার জল আসার উপক্রম হলো।
​শীর্ষ লাঠিটা মাটিতে গুঁজে মেঘের ঠিক মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। আগুনের আলোয় ওর মুখটা এখন এক নিষ্ঠুর শাসকের মতো দেখাচ্ছে। সে কঠিন গলায় বলল,
​“নিজের এই অতিরিক্ত পাকামো আর অবাধ্যতার জন্য আজ নিজের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা হারিয়েছ। এবার বাড়ি ফিরে তোমার ফ্যামিলিকে মুখ দেখাবে কীভাবে? বলতে পারবে তাদের এই সত্যিটা?”
​“ভুল! এক্কেবারে ভুল ভাবছেন আপনি!”
​শীর্ষর মুখ থেকে ‘সব হারিয়েছ’ শব্দটা শোনামাত্রই মেঘের ভেতরের সমস্ত নারীত্ব আর আত্মসম্মান একযোগে চিৎকার করে উঠল। সে নিজের গায়ের সেই খাকি শার্টটা শক্ত মুঠোয় বুকে চেপে ধরে খড়ের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে তীব্র আকুলতায় চেঁচিয়ে উঠল,

​“আমার—আমার সতীত্ব নষ্ট হয়নি! কিচ্ছু নষ্ট হয়নি আমার! ওই–ওই পুরুষ আমায় বাঁচিয়েছিল! শেষ মুহূর্তে উনি এসে ওই হায়েনাদের হাত থেকে আমায় এক্কেবারে অক্ষত বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছিলেন!”
​কথাটা বলতে বলতেই মেঘের চোখের বারিধারা গাল চুঁয়ে শীর্ষর দেওয়া খাকি শার্টের ওপর টুপটুপ করে পড়তে লাগল। মেঘ যেন পুরোপুরি হাইপার হয়ে যায়। ওর পুরো শরীর কাঁপতে থাকে, নিশ্বাস ভারী হয়ে আসে। কিন্তু মেঘের এই চরম উথাল-পাথাল অবস্থা দেখেও শীর্ষ মুখে কোনো বাড়তি অনুভূতির প্রকাশ ঘটায় না। তার ভেতরের কঠোর মিলিটারির সত্তাটা মনে মনে সায় দেয় এই মানসিক শাস্তিটুকু মেঘের প্রাপ্যই ছিল। নিজের পরিবারের অনুমতি ছাড়া, মাকে মিথ্যে বলে এত দূর একা একা চলে আসাটা যে কতটা মারাত্মক ভুল, তা ওর মগজে চিরতরে ঢুকে যাওয়া উচিত ছিল।

​“আমি পবিত্র! বিশ্বাস করুন আমি পবিত্র!”
মেঘ নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের চুল টানতে থাকে, নখ দিয়ে আননে আঁচড় কাটতে যায় এক উন্মাদ যন্ত্রণায়। ​শীর্ষ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে মেঘের মুখোমুখি খড়ের ওপর বসল। তারপর অত্যন্ত শক্ত অথচ কোমল মুঠোয় মেঘের ছটফট করা দুই হাত নিজের কবজিতে বন্দি করে ওর আত্মঘাতী আঁচড় দেওয়া থেকে বিরত করল। মেঘের চোখের দিকে তাকিয়ে ও বরফশীতল শান্ত গলায় বলল,
​“এই পৃথিবীটা বিশাল, মেঘালয়া। এখানে জনসংখ্যা অধিক, কিন্তু আসল মানুষের সংখ্যা বড্ড নগণ্য। চারপাশে শুধু অমানুষদের রাজত্ব। তাদের অধিকাংশকে যদি পুরুষ ধরা হয়, তবে পাশে থাকা নারীদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। পুরুষদের সহজে চেনা যায়, কারণ ওরা সরাসরি ভক্ষক। আর নারীরা হলো পেছন থেকে বিনষ্টকারী ঠিক যেমন তোমার বান্ধবীরা তোমাকে ফেলে চলে গেছে। তুমি এই পৃথিবীর যেখানেই যাও না কেন, এই ভক্ষক আর বিনষ্টকারীদের পাবেই। তাই যদি এই সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাও, তবে নিজেকে আগে ভেতর থেকে তৈরি করতে হবে। নিজের এই কোমল কায়াকে আত্মরক্ষা করার সমস্ত কূটকৌশল তোমাকে জানতে হবে।”

​মেঘের ছটফটানি শীর্ষর এই ভারী ও বাস্তবসম্মত কথার প্রেক্ষিতেও থামে না। ও তখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছে। শীর্ষ ওর হাত দুটো আলতো করে ছেড়ে দিয়ে ওর চোখের দিকে চাইল।
​“নিজের কাছে তুমি শুদ্ধ মানেই তুমি শুদ্ধ। নিজের বিবেকের কাছে তুমি পবিত্র মানেই তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র নারী। মনে রেখো, এই দুনিয়ায় এসেছ একা, চলেও যেতে হবে একা। সমাজ বা চারপাশের সবাই তোমাকে বিশ্বাস করবে না, আর তাদের বিশ্বাসের সার্টিফিকেটের তোমার কোনো প্রয়োজনও নেই।”
​শীর্ষর এই অদ্ভুত, গভীর আর আশ্বস্ত করা পুরুষালী বাণীগুলো যেন এক তীব্র জাদুর মতো কাজ করল সতেরো বছরের মেয়েটির ওপর। এতক্ষণের জমে থাকা সমস্ত ভয়, লজ্জা আর মানসিক ট্রমা এক নিমেষে বাঁধ ভাঙল। মেঘ নিজের অজান্তেই, এক গভীর অবচেতন টানে শীর্ষর সেই চওড়া, উন্মুক্ত অনাবৃত বুকে নিজের মাথাটা ঠেকিয়ে দিল। ​শীর্ষ একটু থমকে গেল, তারপর পরম স্নেহে ও অধিকারবোধে মেঘের সেই ভেজা রেশমী মাথায় নিজের একখানা হাত রাখল। আর মেজরের সেই স্নেহের স্পর্শ পাওয়ামাত্রই নিজের ভেতরের সর্বশক্তি দিয়ে ডুকরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল মেঘ। শীর্ষর ট্যাঙ্ক টপটা ওর চোখের জলে নিমেষেই ভিজে একাকার হতে লাগল। সে বার বার হাহাকার করে বলতে থাকল,

​“ওরা আমায় ছুঁয়েছে মেজর সাহেব! ওরা ওই নোংরা হাতগুলো দিয়ে আমায় খুব বাজেভাবে ছুঁয়েছে! আমি– আমি কাল সকালে নিজেকে আয়নার সামনে দেখব কীভাবে? কী কুৎসিত, কী বীভৎস না ছিল সেই দৃশ্যটা! আমি এই মুখ আর কাউকে দেখাতে পারব না–আমায় আমায় আপনি মেরে ফেলুন মেজর সাহেব! আল্লাহর ওয়াস্তে আপনার ওই বন্দুক দিয়ে আমায় মেরে ফেলুন!”
​মেঘের এই বুকফাটা আর্তনাদ শীর্ষর ভেতরের প্রেমিক পুরুষটির হৃদপিণ্ড যেন ছিঁড়ে ফেলল। সে আর কোনো দূরত্ব না রেখে মেঘকে নিজের ইস্পাতকঠিন বুকের মাঝে আরও শক্ত করে চেপে ধরল, যেন পৃথিবীর কোনো অপশক্তি আর কোনোদিন এই মেয়েটিকে স্পর্শ করার দুঃসাহস না পায়। ​সারাটা রাত এভাবেই কেটে গেল। মেজরের চওড়া ছাতিতে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে একসময় ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছে মেঘ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। কিন্তু শীর্ষর চোখের পাতায় ঘুমের কোনো নাগাল পাওয়া গেল না। সে সারা রাত একভাবে জেগে রইল, বাম হাত দিয়ে মেঘের পিঠের ওপর মেজরের সেই খাকি শার্টের আবরণটা টেনে রাখল আর ডান হাত দিয়ে ওর মাথায় বিলি কেটে দিল।

​ভোরের দিকে একসময় মশাল বানিয়ে জ্বালানো সেই আগুনটাও পুরোপুরি নিভে ছাই হয়ে গেল। আস্তাকুঁড়ে আবার আবছা অন্ধকার নেমে এল, তাও নিভল না শীর্ষর চোখের অতন্দ্র পাতা। তার চোখ দুটো অন্ধকারের মাঝেও বাঘের মতো জ্বলজ্বল করতে লাগল।
​বাইরে তখন ঝড়ের তাণ্ডব কমে এসেছে। ঝুম বৃষ্টির শব্দ এখন মৃদু রিমঝিম শব্দে পরিণত হয়েছে। এই শেষ রাতের নিস্তব্ধতা চিরে, কাছে পিঠের কোনো দোকান বা ঘরের এফএম রেডিও হতে বাতাসে ভেসে আসছে এক অতি মনমুগ্ধকর, পুরনো রোমান্টিক গানের প্রতিটি ছন্দ, মায়াবী সুর ও লিরিক্স। সেই গানের সুর যেন এই ভাঙা আস্তাকুঁড়ের গুমোট হাওয়াকে এক লহমায় বদলে দিয়ে, এই দুই চঞ্চল আর কঠোর হৃদয়ের মাঝে লুকিয়ে থাকা আদিম প্রেমিকসত্তাকে এক নতুন ভোরে উজ্জীবিত করার তীব্র তাগাদা নিয়েছে!

মেজর কারদার পর্ব ১৫

~~~হালকা হাওয়ার মতন, চাইছি এসো এখন
করছে তোমায় দেখে, অল্প বেইমানী মন
বাঁধবো তোমার সাথে, আমি আমার জীবন
আমি তোমার কাছেই রাখবো, আজ মনের কথা হাজার
দিয়ে তোমার কাজল আঁকবো,আজ সারা দিনটা আমার~~~

মেজর কারদার পর্ব ১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here