তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৭
জেরিন আক্তার
প্রাণেশা রুম সাজানো দেখে স্নিগ্ধকে কল দিলো। স্নিগ্ধ কল কেটে দিয়ে মেসেজ দিলো,
—২০ মিনিট, আসছি।
স্নিগ্ধ ফিরে এসে দেখে প্রাণেশা রাজিয়া বেগমের সাথে ডাইনিং টেবিলে খাবার গুছিয়ে রাখছে। রাজিয়া বেগম স্নিগ্ধকে বললেন ফ্রেশ হয়ে আসতে। স্নিগ্ধ ফ্রেশ হয়ে এসে খেতে বসলো।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে স্নিগ্ধ ড্রইং রুমে বসে টিভি অন করলো। পাশে সিয়াম বসলো। এদিকে প্রাণেশা রুমে এসে পড়েছে। এরও আধঘন্টা পরে স্নিগ্ধ রুমে এলো। প্রাণেশা সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করছিলো। স্নিগ্ধ এসে রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়ে ওর পাশে এসে বসলো। প্রাণেশা ফোন রেখে স্নিগ্ধকে বলল,
“আপনি রুমটা সাজালেন কখন? আমার সাথেই তো ফিরলেন তাহলে? কখন করলেন এসব?”
স্নিগ্ধ ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি করিনি। তোমার পছন্দ হয়নি? আর আজ কি হবে বুঝতে পারছো না?”
প্রাণেশা লজ্জা পেয়ে স্নিগ্ধর বুকে মুখ লুকিয়ে রইলো। স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ভালোবাসা মানেই তুমি। আর তুমি মানেই আমার পৃথিবী।”
সকাল ৮ টার দিকে স্নিগ্ধর ঘুম ভাঙলো। প্রাণেশা ওর বুকে শুয়ে আছে। ও আরও কাছে টানলো প্রাণেশাকে। খোলা চুলগুলো একদিকে রেখে ওর গলায় চুমু খেয়ে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলো। মাথায় হাতও বুলিয়ে দিচ্ছিলো। প্রাণেশা নড়েচড়ে উঠে বড় করে শ্বাস ছাড়লো। স্নিগ্ধ ওর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কতটা মায়াবী লাগছে ও বলে বোঝাতে পারবে না। একেকসময় ওর মন খারাপ হয় প্রাণেশার জন্য। জন্মের পর থেকে মা নেই। বাবা আর ভাইই তার আসল শক্তি। তার উপরে স্নিগ্ধকে ভালোবেসে সবাইকে কতভাবে বলে মানিয়েছে শুধু স্নিগ্ধর সাথে একটু ভালো থাকার জন্য।
স্নিগ্ধ প্রাণেশা দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“তোমাকে ভালোবেসে খুব যত্নে রাখবো প্রাণ। তোমায় একটুও কষ্ট পেতে দেবো না।”
প্রাণেশার ঘুম ভাঙলো। স্নিগ্ধকে দেখে মুচকি হেসে কমফোর্টারের নিচে চলে গেলো। স্নিগ্ধ বাকা হেসে বলল,
“লজ্জা ভাঙেনি রাতে? নাকি আবারও ভাঙাতে হবে জান?”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর বুকে মুখ গুজে বিড়বিড় করে বলল, “অসভ্য কোথাকার।”
পরক্ষনেই প্রাণেশা উঠে বসলো। এরপরে বিছানায় থেকে নামতে নিলে স্নিগ্ধ ওর হাত ধরে টেনে কাছে এনে বলল,
“আরেকটু থাকো না জান।”
“ছাড়ুন, নিচে যেতে হবে। মা কি করছে দেখে আসি।”
“ঠিক আছে যাও।”
প্রাণেশা ফ্রেশ হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আধভেজা চুলগুলো বেধে মুচকি হেসে রুম থেকে বেরোলো। নিচে এসে কিচেনে ঢুকে রাজিয়া বেগমকে বলল,
“মা কি করছেন?”
রাজিয়া বেগম পেছনে ফিরে কোমরে হাত রেখে বললেন,
“তোমাকে কতবার বলেছি আমাকে আপনি করে বলবে না। আবার আপনি করে বলছো, একটা মাইর দিবো। আমাকে কি পর পর মনে হয়? আপন মনে হয়না?”
প্রাণেশা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে মা। এবার থেকে তোমাকে তুমি করেই বলবো।”
রাজিয়া বেগম হেসে প্রাণেশা গালে হাত ছুঁইয়ে বললেন,
“এইতো কথা শুনেছে আমার লক্ষী মেয়েটা।”
তিনি প্রাণেশার গালে থেকে হাত সরিয়ে নিতেই তার চোখে পড়লো ওর গলায় দাগ হয়ে আছে। তিনি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,
“গলায় কি হয়েছে?”
প্রাণেশা আমতা আমতা করে বলল,
“ওই এলার্জি ছিলো, চুলকে এমন হয়েছে।”
রাজিয়া বেগম পরক্ষনেই মুচকি মুচকি হাসছিলো। যার তাড়নায় প্রাণেশা অসস্তিতে পড়ে গেলো। দাঁড়িয়েও থাকতে পারছিলো না। এরপরে বাহানা দিয়ে বলল,
“মা আমি দেখে আসি, সুবহা কোথায়।”
রাজিয়া বেগমের উত্তর শোনারও অপেক্ষা করলো না ও, তড়িৎ পায়ে চলে গেলো। রাজিয়া বেগম হেসে বললেন,
“পাগলী একটা।”
সিঁড়ি দিয়ে উপরে এসে সামনেই ধাক্কা খেলো স্নিগ্ধর সাথে। স্নিগ্ধ ওকে ধরে বলল,
“কি হয়েছে কোথায় যাচ্ছো?”
“বজ্জাত লোক আমার গলায় কি করেছেন?”
স্নিগ্ধ ওর গলার দিকে তাকিয়ে বাচ্চাদের মতো ফেস বানিয়ে বলল,
“খুব ব্যাথা পেয়েছো না? সরি।”
প্রাণেশা মুখ ভেঙচি দিয়ে বলল,
“এহ এখন দরদ উতলে উঠছে।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার গলার ক্ষতস্থানে ছোট্ট করে চুমু দিয়ে হেসে বলল,
“আর হবে না জান।”
“ঠিক আছে, এখন নিচে যান।”
“তুমি?”
“আমি একটু সুবহার সাথে কথা বলে আসি।”
“ঠিক আছে।”
প্রাণেশা সুবহার রুমে এসে দেখলো ও ব্যালকনিতে বসে আছে। মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে মন ভালো নেই। প্রাণেশা ওর পাশে বসে মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
“সুবহা! কি হয়েছে তোর? এমন মনমরা হয়ে থাকিস কেনো?”
সুবহা হেসে বলল,
“কই মনমরা হয়ে থাকি? তু্ইও না..”
“তাহলে আগের মতো কথা বলিস না, রুম থেকেও বের হোস না কেনো?”
“তোর যা কথা, রুম থেকে বের তো হই। তু্ই কালকে এলি তারপর আর বের হইনি।”
এই বলেই সুবহা মনে মনে বলল, “প্রাণেশা রে আমি যে আগুনে পুড়ছি সেইটা আমি কাউকে বলতে পারছি না। এমনকি তু্ই যে আমার বেস্টফ্রেন্ড আমি তোকেও বলতে পারছি না।”
বিকেলে….
প্রাণেশা মাত্র ছাদে থেকে জামাকাপড়গুলো নিয়ে এলো। ও সোফায় জামাকাপড়গুলো রেখে ব্যালকনির দিকে যাচ্ছিলো। পেছনে থেকে স্নিগ্ধ ওকে ধরে বলল,
“জান… ”
“হুমম বলুন!”
“এই ৩ দিন ফ্রি আছি। ঘুরতে যাবে আজকে?”
“ঠিক আছে যাবো।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনলো। প্রাণেশার ঠোঁটের দিকে এগোতেই প্রাণেশা স্নিগ্ধকে থামিয়ে বলল,
“এই এই এখন না। পরে।”
“নাহ এখনই। আমার যে প্রেম প্রেম পাচ্ছে।”
“না পরে। এখন নিচে যাবো।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার আরও কাছে এলো। প্রাণেশা পিছিয়ে যেতে যেতে দেয়ালে গিয়ে ঠেকলো। স্নিগ্ধকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“এখন না। কাজ আছে।”
স্নিগ্ধ তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,
“যাও আসতে হবে না আমার কাছে।”
এই বলে গাড়ির চাবি নিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেলো। প্রাণেশা পেছন পেছন ডাকতে ডাকতে গেলো। কিন্তু ততক্ষনে সে নিচে নেমে চলে গিয়েছে। প্রাণেশা সিঁড়ির রেলিং ধরে মুখটা শুকনো করে দাঁড়িয়ে রইলো।
সিয়াম ড্রইং রুমেই ছিলো। প্রাণেশাকে দেখে বলে,
“ভাবি ভাইয়া কোথায় গেলো আর্জেন্ট কাজ নাকি?”
প্রাণেশা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“তেমন কিছুনা।”
সুবহা নিচে নামছিল। সাথে প্রাণেশাকে নিয়ে নামলো। দুজনে সোফায় বসলো। সিয়াম প্রাণেশাকে বলল,
“ভাবি সৌরভ ভাই কেমন আছে এখন?”
প্রাণেশা বলল,
“ভালো। ভাবছি এখন কল দিবো।”
সিয়াম বলল,
“কল দেন কথা বলি আমরা।”
সুবহা উঠে গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে খাবার বেড়ে নিলো প্লেটে। ওদের সাথে বসে সৌরভের সাথে কথা বলবে না বলেই খেতে বসলো। এছাড়া দুপুরেও খায়নি।
সৌরভ কল ধরতেই প্রাণেশা বলল,
“কি করছো ভাইয়া?”
“শুয়ে মুভি দেখছি। তু্ই কি করছিস?”
“আমিও বসে আছি। শোনো না তোমার সাথে কথা বলবে সিয়াম ভাইয়া। তুমি কেমন আছো বারবার বলছিলো।”
“ওহ দে।”
সিয়াম ফোন নিয়ে বলল,
“ভালো আছেন ভাইয়া?”
“হ্যা ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?”
“ভালো। বিয়ের সময় তো আপনার সাথে ভালোই মজা করেছিলাম। কিন্তু রিসেপশনে আর দেখা হলো না অনেক মন খারাপ ছিলো।”
“ওহ আচ্ছা।”
সিয়াম কথা বলে ফোনটা প্রাণেশার কাছে দিয়ে দিলো। প্রাণেশা রসিকতা করে বলল,
“ইভা কোথায় গো? তোমার সেবা-যত্ন করছে তো?”
কথাটা সুবহার কানে যেতেই ও নিরেট হয়ে কথাগুলো শুনছে। ভাতও গলা দিয়ে নামছে না। এদিকে,
সৌরভ হাসতে হাসতে বলল,
“সামনে যতক্ষণ থাকবে মাথা খেয়ে ফেলে। কবে যে বাড়িতে চলে যাবে আল্লাহ ভালো জানে।”
পাশ থেকে সিয়াম মজা করে বলল,
“ভাই পছন্দ হলে বাড়িতেই রেখে দিন।”
ব্যাস, সুবহা উঠে কিচেনে চলে গেলো। হাত ধুয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো।
সন্ধ্যার পরপরই প্রাণেশা কল দিলো স্নিগ্ধকে। স্নিগ্ধ যে তখন রাগ করেই চলে গিয়েছে এটা বুঝতে বাকি নেই ওর।
রাতের খাবার রান্না করছেন রাজিয়া বেগম। কাজের মহিলা এসে সব করে দিলেও রান্নাটা রাজিয়া বেগম নিজেই করেন। আজকেও তিনি রান্না করছিলেন। প্রাণেশাকেও সেখানেই বসিয়ে নিয়ে কথা বলছিলেন।
এমন সময় এলো স্নিগ্ধ। প্রাণেশাকে একপলক দেখে উপরে চলে এলো। প্রাণেশা ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে মুখ ভেঙচি দিয়ে বসে রইলো। মনে মনে বলল, -শুধু কি উনারই রাগ আছে আমার কি রাগ নেই। অবশ্যই আছে। উনি কি কল ধরেছেন আমার! ধরেনি তো তাহলে আমিও আজ উনার সাথে কথা বলবো না।
উপরে থেকে স্নিগ্ধর ডাক এলো,
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৬
“প্রাণেশা উপরে এসো তো।”
প্রাণেশা ঠাই বসে রইলো। রাজিয়া বেগম বললেন,
“রাগ করেছো নাকি? যাও যাও রাগ করো না মা ডাকছে।”
প্রাণেশা উঠে রাজিয়া বেগমের পাশে থেকে দুটো কাঁচা মরিচ নিয়ে চলে এলো। রাজিয়া বেগম এই দেখে বলে বিড়বিড় করে বলে উঠলেন, “আমার ছেলেকে সোজা করতে প্রাণেশা একাই যথেষ্ট।”
