অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৯
রিদিতা চৌধুরী
ভোরের প্রথম আলো জানালার পর্দা চিরে রিদির চোখে পড়তেই তার তন্দ্রা ভেঙে গেল। সারাটা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি সে। সৌহার্দ্য রাতে ফিরেছে কি না, তাও জানে না। ঘুমের ঘোর কাটতেই রিদি স্বভাবতই পাশে হাত বাড়াল, কিন্তু বিছানার সেই অংশটুকুতে কেবল হাড়কাঁপানো শূন্যতা আর শীতলতা।
মুহূর্তেই মনে পড়ল, সে তো আজ নিজের ঘরেই আছে—রাতের অভিমানেই তো চলে এসেছিল। রিদির ঠোঁটে এক চিলতে তিক্ত হাসি ফুটে উঠল। বিরবির করে বলল,
—“হনুমান একটা! বউ ছাড়াই দিব্যি রাত কাটিয়ে দিতে পারে, তবুও ভালোবাসা স্বীকার করতে নারাজ!”
রাগে রিদির শরীর যেন জ্বলছে। লোকটার কাণ্ডজ্ঞান বলতে কিছু আছে? সে না হয় একটু অভিমানে রাগ করে চলে এসেছে, কিন্তু মানুষটা একবার এসে কি তার রাগ ভাঙিয়ে দিতে পারত না? অভিমান আর বিরক্তির দলাটা বুকের ভেতর চেপে রিদি দ্রুত তৈরি হয়ে নিল। কলেজে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। কোনোমতে সবাইকে নাস্তা খাইয়েই বের হয়ে যাবে।
রান্নাঘরে পা রাখতেই রিদি দেখল, কোমর বেঁধে কাজ করছে পৃথা। প্রায় সব কাজই শেষ। অবাক হয়ে সে বলল,
—“কখন উঠেছিস? সব দেখি রেডি?”
পৃথা হালকা হেসে উত্তর দিল,
—“হুম। সব সময় তো তুই কিংবা ভাবী উঠে থাকিস। আজ নাহয় আমিই একটু আগেভাগে উঠলাম!”
রিদি আর কথা বাড়াল না। নাস্তাগুলো টেবিলে নিতে গিয়ে দেখল, সবার আগে এসে বসে আছে সৌহার্দ্য। তাকে দেখেই রিদির মেজাজ বিগড়ে গেল, যদিও মুখে কিছু বলল না।
কিন্তু সৌহার্দ্যর চাহনি ছিল বেশ তীক্ষ্ণ। কপাল কুঁচকে সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রিদির দিকে। শেষ পর্যন্ত রিদি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল,
—“এভাবে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছেন কেন? জীবনে কি কোনোদিন মেয়ে মানুষ দেখেননি?”
নিজের বউয়ের এমন রুদ্রমূর্তি দেখে সৌহার্দ্য অবাক। সে বুঝতে পারল, সকাল সকাল রিদি পুরো ‘আগুন’ হয়ে আছে। সৌহার্দ্যও বিরক্তি চেপে পাল্টা জবাব দিল,
—”সমস্যাটা কী তোমার? সকাল সকাল এমন ফায়ার হয়ে আছ কেন? আর নিজের বউকে আমি গিলে খাবো না চিবিয়ে খাবো, সেটা একান্তই আমার ব্যাপার!”
রিদি কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে সরহান চৌধুরীকে নেমে আসতে দেখে সে তার রাগের তেজ আপাতত গিলে নিল।
নাস্তার টেবিলে সবাই এসে জড়ো হয়েছে। পরিবেশটা বেশ জমজমাট। রিদি যেই সবাইকে নাস্তা বেড়ে দিতে যাবে, অমনি সৌহার্দ্যের গম্ভীর স্বর ভেসে এল,
—”তুমি আগে খেয়ে নাও। সবাই যার যার মতো নিয়ে খেতে পারবে, তোমাদের তো কলেজে যেতে দেরি হচ্ছে!”
সরহান চৌধুরী ছেলের দিকে এক পলক তাকালেন। ইদানীং রিদির প্রতি ছেলের যত্নশীল আচরণগুলো দেখে ওনার বেশ ভালো লাগে। ছেলের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির গলায় বললেন,
—”ভাবছি, তোমার আর অরবানের বিয়ের অনুষ্ঠানটা ঝাকজমাট করে করবো। সামনের মাসে তোমাদের কখন সময় হবে?”
সৌহার্দ্য বাবার দিকে একবার কপাল কুঁচকে তাকাল। তারপর খাবারের প্লেটের দিকে দৃষ্টি রেখে নিরস কণ্ঠে বলল,
—”বারবার বিয়ে করে কী হবে? যেটা আসল কাজ, সেটা তো একবারও করতে পারলাম না! ওটা করতে গেলে তো সাইক্লোন নেমে আসে।”বলেই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
টেবিলে উপস্থিত সবাই যেন হঠাৎ থমকে গেল। চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে এল। সরহান চৌধুরী একটা অস্বস্তিকর কাশি দিলেন। তারপর রাগে গর্জে উঠলেন,
—”তোমার মতো নির্লজ্জ, বেয়াদব ছেলে আমি একটাও দেখিনি! কার মতো যে এত নির্লজ্জ হলে তুমি, বেয়াদব ছেলে!”
সৌহার্দ্য ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে পেছন ফিরে বলল,
—”ছেলে যেহেতু তোমার, তোমার মতোই তো হয়েছি! সত্যি কথাই তো বললাম—তোমাদের কি দাদা-দাদি হওয়ার শখ নেই?”
বলেই সে দাপটের সঙ্গে গটগট করে বেরিয়ে গেল।
সৌহার্দ্যের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে সরহান চৌধুরী বিরবির করে বলে উঠলেন,
—”আমার ছেলে তো হওয়ার কথা ছিল না এমন নির্লজ্জ-বেয়াদব! নিশ্চিত, জন্মের সময় হাসপাতালে নিশ্চয়ই কেউ অদলবদল করে দিয়েছে!”
রিদি টেবিলের কাছে বসে লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে নখ খুঁটছিল। তার মনে হচ্ছিল, এমন নির্লজ্জ মানুষ সে তার জীবনে আগে কখনো দেখেনি। তবুও লজ্জা-শরম ঝেড়ে ফেলে দ্রুত হালকা নাস্তা সেরে সেও বেরিয়ে এল। আজ পৃথা কলেজে যাবে না। শরীরটা ভালো নেই তার।
বাড়ি থেকে বের হতেই রিদি দেখল, সৌহার্দ্য গাড়ির সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে সানগ্লাস, কানে ব্লুটুথ লাগিয়ে সে কারও সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে কথা বলছে। রিদি একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটা রাগী হতে পারে, কিন্তু মাশাআল্লাহ—তার সুদর্শন চেহারা থেকে চোখ ফেরানো দায়।
রিদির দৃষ্টি বুঝতে পেরে সৌহার্দ্য কান থেকে ব্লুটুথটা সরিয়ে নিল। ভ্রু কুঁচকে, বাঁকা চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে বলল,
—”কী হলো? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? তোমার হাজব্যান্ডকে দেখার জন্য সারা জীবন পড়ে আছে, এখন কলেজে দেরি হয়ে যাচ্ছে!”বলেই সে গাড়ির দরজা খুলে দিল।
সৌহার্দ্যের এমন সরাসরি কথায় রিদি থতমত খেয়ে গেল। লোকটার মুখের কোনো লাগাম নেই! আবার না জানি কী বলে বসে—সেই ভয়ে তড়িঘড়ি করে সে গাড়িতে উঠে বসল।
সৌহার্দ্য ড্রাইভিং সিটে বসে নিপুণভাবে রিদির সিটবেল্টটা লাগিয়ে দিল। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার সময় রিদির নজর পড়ল ড্যাশবোর্ডে রাখা সৌহার্দ্যের ফোনের ওপর। আজ অবধি রিদি কখনোই তার ফোনের ধারেকাছে যায়নি। এক অদ্ভুত কৌতূহল আর ইতস্তত বোধ—দুটোর দোলাচলে তার হাত নিশপিশ করছিল ফোনটা একবার ধরার জন্য।
ওর ভাবনার মাঝেই সৌহার্দ্য নিজে থেকেই ফোনটা রিদির দিকে এগিয়ে দিল। রিদি অবাক হলো সৌহার্দ্য তার অনুভূতি গুলো সহজে বুজে যায়! ফোনটা হাতে নিতেই সৌহার্দ্য গমগমে স্বরে বলল,
—”পাসওয়ার্ড—’সৌহার্দ্যের সুইটহার্ট’।”
রিদির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। লোকটা মুখে কড়া কথা বললেও, তার হৃদয়ের পুরোটা জুড়েই যে রিদি আছে, তা আজ আরও স্পষ্ট হলো। কাঁপাকাঁপা হাতে সে মোবাইলের লক খুলতেই হোম স্ক্রিনে ভেসে উঠল এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য—রিদি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আর তার ঠিক পাশেই সৌহার্দ্য ঝুঁকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আগলে রেখেছে সে।
রিদি আড়চোখে একবার সৌহার্দ্যের দিকে তাকাল। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে গাড়ি চালাচ্ছে। চোখেমুখে দৃঢ় গাম্ভীর্য। রিদি কৌতূহল নিয়ে ফোনটা ঘাঁটতে শুরু করল। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল—ফোনে রিদির ছবি ছাড়া আর কিছুই নেই। এমনকি সৌহার্দ্যের নিজেরও কোনো ছবি নেই সেখানে! লোকটার রুক্ষ মেজাজের আড়ালে যে এমন এক অনুরাগী হৃদয় লুকিয়ে আছে, তা রিদির কল্পনারও অতীত।
ফোনটা নামিয়ে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই সৌহার্দ্য তীব্র শব্দে গাড়ির ব্রেক কষল। রিদি জানালার বাইরে তাকাতেই দেখল, তারা কলেজের গেটের সামনে এসে পৌঁছে গেছে।
রিদি গাড়ি থেকে নামার প্রস্তুতি নিতেই সৌহার্দ্য এক ঝটকায় তাকে টেনে নিজের কোলে তুলে নিল। রিদির দুপা আলতো করে জড়িয়ে নিলো সৌহার্দ্যের কোমরের দুই পাশে। গাড়ির সিটটা এক টানে পেছনে হেলিয়ে দিতেই পুরো পরিবেশটা নিমেষে বদলে গেল।
রিদি কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে আমতা আমতা করে বলে উঠল,
— “ডাক্তার সাহেব, এ কী করছেন? কেউ দেখে ফেলবে! প্লিজ, ছেড়ে দিন!”
কিন্তু সৌহার্দ্য যেন বাইরের জগতের সমস্ত হুঁশ হারিয়েছে। সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে রিদিকে নিজের শরীরের আরও কাছে টেনে নিল। রিদির নরম তুলতুলে ওষ্ঠে ডুবিয়ে দিল নিজের গাঢ় বাদামী ওষ্ঠ। রিদি আচমকা এমন তীব্রতায় তাল সামলাতে না পেরে নিজের দুই হাত দিয়ে সৌহার্দ্যের ঘাড়ের শার্টটা শক্ত করে খামচে ধরল।
সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। সৌহার্দ্যের এই উন্মাদনা সময়ের সাথে কমার বদলে যেন আরও তীব্র হয়ে উঠছে। রিদির ফুসফুস তখন বাতাসের জন্য হাহাকার করছে; মেয়েটা কিছুতেই সৌহার্দ্যের প্রবল উত্তেজনার সাথে তাল মেলাতে পারছে না। সৌহার্দ্য এখন পুরোপুরি বেসামাল। রিদির মনে হলো, এই তীব্রতায় সে বুঝি দম বন্ধ হয়ে এখনই মারা যাবে! সে বারবার প্রাণপণে সৌহার্দ্যকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু সৌহার্দ্য যেন পাথরের মূর্তির মতো অনড়। এক চুলও সরাতে পারছে না!
হঠাৎ গাড়ির দরজায় কারো করা আঘাতের শব্দে সৌহার্দ্যের ঘোর ভাঙল। সে রিদিকে আলগা করে দিতেই দেখল, রিদির ঠোঁটের একপাশ সামান্য কেটে গিয়ে রক্তিম হয়ে আছে, ফোলা ঠোঁটজোড়া কাঁপছে, আর মেয়েটা তখনো হাঁপাচ্ছে।
নিজের এই অসংযমী আচরণের জন্য সৌহার্দ্যের নিজের ওপরই তখন তীব্র ঘৃণা জন্মেছে। সে রাগে গাড়ির দরজায় একটা সজোরে ঘুষি মারল। তারপর পরম মমতায় রিদির মুখটা নিজের দুই হাতের আজলায় তুলে নিল। যেখানে আঘাত লেগেছে, সেখানে খুব আলতো করে কয়েকটা চুমু খেল সে, যেন নিমিষেই সেই ব্যথা ভুলিয়ে দেওয়ার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
তারপর রিদির কপাল নিজের কপাল দিয়ে ঠেকিয়ে, রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করে উঠল সৌহার্দ্য,
— “সরি… আই এম ভেরি সরি। খুব লেগেছে, বেবি?”
এক মুহূর্ত থেমে, রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের স্বর নামিয়ে আনল সে,
— “কেন তুমি এত নরম, সুইটহার্ট? আমার সামান্য আদরের তীব্রতা সহ্য করতে পারো না?”
রিদি অভিমানে নাক টানতে টানতে কাঁপা গলায় বলল,
— “অসভ্য লোক! এটাকে ‘সামান্য’ বলেন? এই ঠোঁট নিয়ে আমি ক্লাসে যাবো কী করে, বলুন তো?”
সৌহার্দ্য কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। কারণ তখনই গাড়ির কাচে আবারও সজোরে টোকা পড়ার শব্দ ভেসে এল। বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে সে রিদিকে আলতো করে ছেড়ে দিল। খুব যত্ন করে রিদির এলোমেলো হিজাবটা ঠিক করে তাকে পাশের সিটে বসিয়ে দিল। নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সামনে সুজনকে দেখেই তার মাথার ভেতরটা রাগে দপদপ করে উঠল।
সুজন ভ্রু কুঁচকে, বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল,
—”এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি, তুই গাড়ি থেকে নামছিস না কেন?”
সৌহার্দ্য দাঁতে দাঁত চেপে, ঝাঁঝালো গলায় বলল,
—”তোর সমস্যাটা কী, সুজন? আমাকে কি একটু শান্তিতে থাকতে দিবি না?”
সুজন বাঁকা চোখে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
—”আমি আবার কী অশান্তি দিলাম তোকে? আর তোর ঠোঁটে কি লিপস্টিক মেখেছিস নাকি এত লাল…?”
বলতে বলতেই তার নজর পড়ল গাড়ির ভেতরে বসা রিদির দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই সবটা বুঝে গেল সে। ঠোঁট চেপে একগাল দুষ্টু হাসি হেসে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে বলল,
—”ভাই, ইমরান হাশমিও তোর কাছে লজ্জা পাবে রে!”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য গর্জে উঠল,
—”চোখের সামনে থেকে যাবি কি না?”
সুজন দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল। যাওয়ার সময় আড়চোখে একবার রিদির দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে গেল,
—”যাচ্ছি তো! তবে বাচ্চা মেয়ে, তোর মতো গণ্ডারের ধকল সইবার ক্ষমতা বোধহয় ওর এখনো হয়নি!”
সুজন দৃষ্টিসীমার আড়াল হতেই সৌহার্দ্য আলতো করে গাড়ির দরজাটা খুলে দিল। রিদি নামতে গিয়ে দেখল, সৌহার্দ্য একটা মাস্ক হাতে দাঁড়িয়ে আছে। পরম যত্নে মাস্কটা রিদির মুখে পরিয়ে দিয়ে সে গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। তারপর আদুরে স্বরে বলল,
—”ক্লাস শেষ করে সরাসরি আমার চেম্বারে আসবে, একা যাওয়ার দরকার নেই, ওকে?”
রিদি মাথা নেড়ে সায় দিল। তারপর ধীরে ধীরে কলেজের ফটক পেরিয়ে ভেতরে চলে গেল। সৌহার্দ্যও হাসপাতালের দিকে এগিয়ে গেল।
বিকাল প্রায় চারটে। চারপাশটা গোধূলির ম্লান আলোয় শান্ত হয়ে আসছে। ছাদে বসে আড্ডা দিচ্ছে —রিভা, রিদি আর পৃথা। তবে আজকের আড্ডায় রিভার মনটা মেঘলা হয়ে আছে। আজ সকালেই খন্দকার বাড়ি ছেড়ে রাগ করে চলে এসেছে সে। ঝগড়ার কারণটা তুচ্ছ হলেও রিভার কাছে তা পাহাড়সম। ফারিসের ফোনে একটা অপরিচিত মেয়ের নম্বর দেখে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল তার মনে। ফারিস শতবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে, মেয়েটি এক মন্ত্রীর মেয়ে, যে কিনা সৌহার্দ্যের পিছু লেগে আছে, ওর নাম্বারের জন্য ফারিসকে কল দিচ্ছে। অথচ রিভা কিচ্ছু শুনল না! উল্টো ভেবে নিল, ফারিস নিজের দোষ ঢাকতে তার ভাইকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।
আড্ডার মাঝখানে হুট করে পৃথার নজর গেল রিদির দিকে। রিদির নিচের ঠোঁটটা বেশ খানিকটা ফুলে আছে, আর সামান্য কেটেও গেছে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে পৃথা জিজ্ঞেস করল,
— “কিরে জানু, তোর ঠোঁটটা কাটল কীভাবে? বেশ ফুলে তো আছে!”
রিদি যেন একটু হচকচিয়ে গেল। চোখেমুখে কিছুটা অস্বস্তি আর লজ্জা নিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
— “আরে আর বলিস না! আজ বাগানের পাশে একটা পোকা কামড় দিয়েছে!”
রিভা এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। হঠাৎ রিদির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি হেসে বলল,
— “হুম, বুঝতে পেরেছি! এটা বোধহয় বিশাল বড় একটা পোকা, যার নাম ‘ডাঃ সৌহার্দ্য চৌধুরী’, তাই না ভাবী জান?”
রিভার কথায় পৃথাও খিলখিল করে হেসে উঠল। রিদি থমথমে মুখে বলল,
— “রিভা, তুমি অল্প বয়সেই বড্ড পেকে যাচ্ছ! একদম ঠিক করছো না কিন্তু!”
রিভা প্রতিবাদ করে বলল,
— “একদম না! তোমার থেকে মাত্র দেড় বছরের ছোট আমি, খুব বেশি ছোট তো না, তাই না?”
রিদি আর কোনো কথা বাড়াল না। এই মেয়ের সাথে তর্কে জেতা অসম্ভব। মনে মনে ভাবল, ভাই-বোন দুটো যেন একই ধাতুতে গড়া—একেবারে ঠোঁটকাটা আর নির্লজ্জ!
আড্ডার আমেজটা তখন বেশ জমে উঠেছে। এমন সময় যোহাকে কোলে নিয়ে ছাদে উঠে এল সাথী। রিদিকে দেখেই যোহার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়ে সে রিদির কোলেই আশ্রয় নিল। আধো আধো কণ্ঠে আদুরে স্বরে ডেকে উঠল,
— “তাতি!”
রিদির মনটা যেন আনন্দে ভরে উঠল। যোহাকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পরম মমতায় বলল,
— “ওরে সোনা বাচ্চা আমার! এটা কখন শিখলে তুমি?”
বলেই যোহার নরম তুলতুলে গালে সে টুপ টুপ করে কয়েকটা চুমু খেয়ে ভরিয়ে দিল। আদুরে যোহাকে দেখে রিভা হাত বাড়িয়ে যোহাকে নিজের কোলে তুলে নিল।
সাথী ওদের পাশে বসে রিদির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— “সৌহার্দ্য ভাই এসেছে ফারিস ভাইয়া সহ, আমি ওদের নাস্তা দিয়ে এসেছি!”
ফারিসের আসার খবরটা শোনা মাত্রই রিভার চোখের পলকে রূপ বদলে গেল। অবজ্ঞায় মুখটা বাঁকিয়ে নিল। দাঁতে দাঁত চেপে রাগে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
— “বেঈমান এমপি, আপনাকে আর আপনার ওই ঝাড়া পুরিকে আমি কেটে কুচি কুচি করে ফেলব! আসছে আমার দরদ দেখাতে হুম!”
রিদি বসা থেকে উঠে যেতে যেতে বলল,
— “তোরা বস, আমি ফারিস ভাইয়ের সাথে একটু দেখা করে আসি।”
বলেই সে ড্রয়িং রুমের দিকে পা বাড়াল।
ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করতেই রিদি দেখল, সোফায় সৌহার্দ্য আর ফারিস বসে আছে। ফারিস অকারণে এদিক-ওদিক উঁকিঝুঁকি মারছে; যেন অধীর আগ্রহে নিজের সঙ্গিনীকে খুঁজছে। রিদি সামনে এসে মৃদু হেসে ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “কেমন আছেন ফারিস ভা…”
রিদির কথার মাঝপথেই সৌহার্দ্যের রক্তচক্ষু তার দিকে ধেয়ে এল। গলার স্বরে তীক্ষ্ণ ধমক দিয়ে সৌহার্দ্য বলল,
— “শুধু ‘ভাইয়া’ বলবে! ‘আউট’!”
সৌহার্দ্যের এমন হুটহাট অধিকারবোধ দেখে রিদি তো হতবাক। এই মানুষটার স্বভাবের কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাওয়া তার সাধ্যের বাইরে। এদিকে ফারিস সৌহার্দ্যকে আরও একটু উসকে দেওয়ার জন্য রিদির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে টেনে বলল,
— “রিদি, তুমি আমাকে ‘ফারিস ভাই’ না বলে বরং ‘ভাই..জান’ ডাকতে পারো। কেমন হবে বলো তো, সৌহার্দ্য?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই সৌহার্দ্যের মুখ রাগে টকটকে লাল হয়ে গেল। জ্বলন্ত চোখে ফারিসের দিকে তাকিয়ে সে গর্জে উঠল,
— “ফারিস! একটা বাজে কথা তোর মুখ দিয়ে বের হলে, খুন করে ফেলব তোকে!”
ফারিস পুনরায় রিদির সঙ্গে কথা বলার একটা সুযোগ খুঁজছিল, কিন্তু সৌহার্দ্যের কঠোর দৃষ্টি আর বিরক্তির কাছে সে হার মানল। সৌহার্দ্য রিদিকে ধমক দিয়ে ওপরে পাঠিয়ে দিল।
রিদি চলে যাওয়ার পর ফারিস মনে মনে প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। নিজের মনেই বিড়বিড় করল,
— “পুরো একটা ‘বেজাল প্রোডাক্ট’! একটু দুষ্টুমি করে ওর বউকে বিয়ে করার কথা কী বলেছি, অমনি আমার সাথে কথা বলানো পর্যন্ত বন্ধ করে দিল! এখন আমি আমার বউটাকে খুঁজি কীভাবে?”
অগত্যা, হতাশ হয়ে কোনোমতে মান ভাঙানোর সুরে ফারিস সৌহার্দ্যকে বলল,
— “তোর বোনটাকে একটু ডেকে দে না ভাই প্লিজ?”
সৌহার্দ্য নির্বাক হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একঘেয়ে সুরে বলল,
— “পারব না? কী করছিস তুই ওর সাথে সকাল সকাল? ও রেগে চলে আসল কেন?”
ফারিস মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের সামনে যেন অগোছালো এক পৃথিবী। থমথমে গলায় সে বলে উঠল,
— “কী করব আমি? তোর জন্য তো আমাদের ঝগড়া হলো। ওই মন্ত্রীর মেয়ে মনিকা তোকে সেদিন ওদের বাড়িতে আমার সাথে দেখার পর থেকে এই মেয়ে পাগল করে ফেলছে তোর নাম্বারের জন্য! আর তোর বোন আমার মোবাইলে ওই মেয়ের নাম্বার দেখে ভাবছে আমি পরকীয়া করছি! এমনিতেই এই মেয়ে আমাকে বিশ্বাস করে না, তার মধ্যে এখন এই মেয়ের নাম দেখে একদম ফায়ার!”
সৌহার্দ্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্তির সুরে বলল,
— “অন্য মেয়ের নাম্বার নিজের মোবাইলে সেভ করছিস কেন, ইডিয়ট! দোষ তো তোর। আমার বোন চলে এসে একদম ঠিক করছে! ব্লক করলি না কেন? এখন আমার দোষ দিচ্ছিস?”
ফারিস এবার অসহায় ভঙ্গিতে নাক-মুখ কুঁচকে করুণ স্বরে বলল,
— “এভাবে বলিস না ভাই, তোর পাপ হবে! স্কুল লাইফ থেকে কলেজ পর্যন্ত একটা প্রেমও করতে পারিনি তোর জন্য। মেয়েরা ক্রাশ খেত তোর ওপর। তোর পাত্তা না পেয়ে ঘুরত আমার আর সুজনের পেছনে। তোর মৌমাছিগুলোর জন্য নিজের পছন্দ করা মেয়েগুলো আমাদের প্রেমিকা আছে ভেবে বাঁশ দিয়ে চলে যেত! এখন কত কষ্টে নিজের গায়ে কলঙ্ক মেখে একটা বউ জুটিয়াছি,সেটাও তোর মৌমাছির জন্য রাগ করে আমাকে ছেড়ে চলে এসেছে! তাহলে তুই কীভাবে নির্দোষ হস?”
ফারিসের একের পর এক অযৌক্তিক অভিযোগ আর দীর্ঘশ্বাসে সৌহার্দ্যের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে বিরক্তিতে চোখ সরু করে শীতল স্বরে বলল,
— “আমি ওকে বুঝিয়ে দিয়ে আসব এখন, যা!”
সৌহার্দ্যের এই হুটহাট সিদ্ধান্তে ফারিস চমকে উঠল। আতঙ্কে তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে প্রায় চিৎকার করে বাধা দিয়ে বলল,
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৮
— “একদম না! আমি বউটা না নিয়ে কোথাও যাচ্ছি না! এক রাতের মধু খেয়ে মজা পেয়ে গেছি আজ—”
ফারিস কথাগুলো বলেই থমকে গেল। নিজের মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কথাগুলো সৌহার্দ্যের কানে যেতেই তার গলার ভাষা আটকে গেল। সৌহার্দ্যের সেই অচেনা, পাথুরে শীতল দৃষ্টি দেখে!
সৌহার্দ্য স্থির দৃষ্টিতে ফারিসের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে বিস্ময়, আর সেই বিস্ময়ের আড়ালে একরাশ বিতৃষ্ণা। দীর্ঘ এক মুহূর্ত নীরবতার পর সৌহার্দ্য নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল। গলার স্বরে তীব্র বিরক্তি আর হতাশা ঝরে পড়ল,
— “ঠাডা কি সব সময় আমার রোমান্স টাইমে পড়তে হয়? ছেহ্, বালের জিন্দেগি!”
