আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৬
ইসরাত জাহান দ্যুতি
-‘সময়, পরিবেশ, পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে নেয়। তখন বর্তমানকে আমাদের মানিয়ে নিতে হয়, মেনে নিতে হয় পেছনের সময়কে ভুলে।’
-‘বাবার কাছে অতীত আর সন্তান কী করে এক হয়?’ প্রশ্নটা মনে এলেও মুখে উচ্চারণ করল না নাওফিল। নীরবই থাকল। হিসাব মেলাতে ব্যস্ত সে এখনও৷ এই যে অস্ট্রেলিয়া এলেই সে দেখতে পেত, বুঝতে পারত ভদ্রবেশে কিছু মানুষ জেরিন ইসলামের বাড়ির ওপর নজর রাখছে সব সময়। ওই বাড়ি থেকে কে, কখন, কোথায় বের হয়, সেসবও নজরের বাইরে রাখছে না লোকগুলো৷ এই বিষয়গুলি তবে তার সাথে সম্পর্কিত ছিল এতদিন! কিন্তু কেন? সেটার উত্তরও বোধ হয় পেয়ে যাচ্ছে সে৷
-‘টেলর!’ ভারী কণ্ঠটা আরও ভারী শোনাচ্ছে নাওফিলের। শূন্যে চেয়ে বলল সে, ‘আমি যতবার অস্ট্রেলিয়াতে এসেছি, যতদিন থেকেছি, যেখানে যেখানে গিয়েছি, সবটাই তোমার নখদর্পনে ছিল এতকাল। এটা কি ভালো করেছ?’
মুচকি হাসল স্যামুয়েল। ‘তুমি কাদের সন্তান! তাদের পরিচয়ই কি যথেষ্ট নয় তোমাকে খেয়ালে খেয়ালে রাখা?’
-‘ভালো বলেছ।’ স্যামুয়েলের দিকে ফিরে হাসল নাওফিলও। ‘কিন্তু খেয়াল রাখা আর স্টক করার মধ্যে আভিধানিক যে পার্থক্যটা রয়েছে, সেটা আমার আব্বুর সব থেকে নিকটতম বন্ধু অবশ্যই জানে।’ বলা শেষে একটু থামল সে। স্যামুয়েলের শান্ত মুখটা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে আবার মুখ খুলল, ‘আমি তোমার কাছ থেকে এর সঠিক ব্যাখ্যাটা শোনার অপেক্ষায় আছি, টেলর। কিন্তু আমার অপেক্ষার মূল্য না দিলে নিজের মতো করেই ব্যাখ্যাটা ভেবে নিতে হবে।’
-‘আর সেই ভাবনাটা কী? নির্বিকার গলা স্যামুয়েলের।
-‘উডসাইড অ্যানার্জি কোম্পানিতে আমার আব্বুর শেয়ার, বত্রিশটা বছরের মুনাফা, সবটা তার অনুপস্থিতিতে তার সন্তানের প্রাপ্য। তুমি আর তোমার পার্টনারস ভেবেছ আমি বা আমার বড়ো চাচা এক সময় অবশ্যই সে সবকিছুর দাবি জানাব৷ সবটা আদায়ের জন্য আমি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছি কি-না, নিলে কতটা নিতে পারি, কতটা প্রমাণ যোগাড় করতে পারি, কাদের কাদের সহযোগিতা পেতে পারি, অধিকন্তু আমি তোমাদের কোনো প্রতিদ্বন্দীর সঙ্গে মিলে গিয়ে কিছু করার চেষ্টা করি কি-না, এসব ওয়াকিবহাল থাকাটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ। আর এখানে আমার একমাত্র কাছের মানুষ আছেনই জেরিন ইসলাম। তাই সে বেচারিকেও অকারণে দমবন্ধকর জীবন পেতে হলো তোমাদের নজরবন্দি থেকে।’ একবারে কথাগুলো বলে নাওফিল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর স্যামুয়েলের মুখপানে তাকাল৷ তিনি হাসছেন মাথা দোলাতে দোলাতে৷ ওকে কিছু বলতে উদ্যত হতেই নাওফিল ট্রাফিক পুলিশের মতো হাত উঠিয়ে থামতে নির্দেশ দিয়ে কর্কশ গলায় বলল, ‘আমার ভাবনা জানলে৷ এবার আমার সিদ্ধান্তটা জানো৷ তুমি আমার চারিত্রিক গুণাবলির ব্যাপারে সম্পূর্ণ অবগত৷ তবুও স্পষ্টভাবে বলছি, ওই কোম্পানির একটা ডলারের ওপরও আমার লোভ নেই, কোনো দাবি নেই, টেলর৷ আমার পরবর্তী প্রজন্মও কোনো দাবি জানাবে না ইনশা আল্লাহ। আমার সন্তান এলে আমি তাকে জানতেও দেবো না, এক সময় ওর দাদা তার ইলিগ্যাল আর্নিংসে এই দেশে ছোটো এক কোম্পানি গড়েছিল। পরবর্তীতে তা বিশ্বের শীর্ষ কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। তুমি আর তোমার পার্টনারস ভরসা রাখতে পারো আমার কথাই।’
উঠে দাঁড়াল নাওফিল কথা শেষ করেই৷ চারপাশে রাত নেমে এসেছে৷ হাতঘড়িতে সময় দেখল, আটটা বাজতে চলেছে। বেরিয়ে পড়া যায় এখনও৷ স্যামুয়েলের স্বার্থপরতা জানার নিঃশঙ্কোচে তার আতিথেয়তা গ্রহণের কোনো মানেই হয় না। ‘বিদায়, টেলর।’ কথাটা মুখে প্রায় চলেই এলো ওর। সে মুহূর্তে স্যামুয়েলের কথা শুনে থমকে পড়তে হলো ওকে।
-‘ভাই-বোন দুজনের কথার ধরনই দেখি একই।’ মুচকি হাসতে হাসতে বলে উঠলেন স্যামুয়েল।
-‘মারিহামের কথা বলছ?’ বিস্ময়টুকু আড়াল করে জানতে চাইল নাওফিল।
-‘ও ছাড়া আর ক’টা বোন আছে তোমার?’ মশকরার সঙ্গে বললেও নাওফিলের চোখে ফুটে ওঠা উদ্বিগ্ন ভাবটা দেখে স্যামুয়েল হাসি থামালেন। ‘কী হয়েছে, জান? রাগ করার মতো কিছু বলেছি? মজা করে বললাম তো, ছেলে।’
-‘মারিহাম এসেছিল তোমার কাছে। কবে?’ ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল নাওফিল। চাইলেও আর বিস্ময় এবং কৌতূহল আড়াল রাখতে পারল না সে।
-‘তুমি কি জানতে না আমার সঙ্গে ওর দেখা হওয়ার কথা?’ উঠে দাঁড়ালেন স্যামুয়েল। কৌতূহলী হলেন তিনিও। ‘ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে বলেই তো তোমার সঙ্গেও সরাসরি সাক্ষাতের প্রয়োজনবোধ করেছি। তিয়ার ব্যাপারটা না থাকলেও তোমার সঙ্গে দেখা করতাম।’
-‘কেন? মারিহাম নিশ্চয়ই কোনো দায় দাবির জন্য এসেছিল না?’ ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে বলল নাওফিল।
-‘আসলেই না।’ হাসলেন স্যামুয়েল। ‘তোমরা ভাই-বোন দুজনই খুব ইনটেলিজেন্ট আর গ্রেট হার্টেড। তবে অবাক হয়েছিলাম ও আমার অবধি পৌঁছে যাওয়ায়। অথচ ওর পেছনে তেমন ক্ষমতাসীন কেউ ছিল না, যার সাহায্যে নিতে পারে। ছিল কেবল একজন সাধারণ বৃটিশ ভদ্রলোক।’
-‘তুমি আমার সঙ্গে কেন দেখা করার প্রয়োজনবোধ করেছ, তা এখন পুরোপুরি বুঝতে পারছি। আমার মুখে বলা কথাগুলোর প্রমাণ কাগজে কলমে রাখতে চাও, এইতো? মারিহামও সে প্রমাণ তোমাকে দিয়ে গেছে?’
-‘হ্যাঁ।’ মৃদু হাসি মুছছেই না স্যামুয়েলের মুখ থেকে। বললেন, ‘এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পেছনে জেইনের অবদান সর্বোচ্চ ছিল, এ খবর যে ক’জন জানত তারা বেশিরভাগই এখন কোম্পানির সাথে জড়িত। আর বাকিরা কয়েকজন পৃথিবীর নানান জায়গায় বসবাস করছে। তাদের কারও থেকেই কেবল এ ব্যাপারে সবটা জানা সম্ভব। যেমন বছর কয়েক আগে তুমি জেনেছ জেইনের সেই ভক্তের থেকে, যার সঙ্গে পার্টি করেছিলে তার শিপে।’
-‘কিন্তু মারিহাম কার থেকে জেনেছে?’ বিস্ময় ধীরে ধীরে শুধু বাড়ছেই নাওফিলের।
কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল স্যামুয়েলের। ‘এর মানে…’
-‘এর মানে ওর সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই।’ স্যামুয়েলের কথাটা নাওফিলই বলে দিলো৷ আরও বলল, ‘তুমি পেপার রেডি করে থাকলে নিয়ে আসতে পারো। আমি সিগনেচার করে দেবো। বদলে মারিহামের সাথে তোমার দেখা কবে হয়েছে এবং কী কাজে এসেছিল তোমার কাছে, সব কিছু আমাকে বিস্তারিত জানাবে, টেলর।’
ওর দিকে কতক্ষণ ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকলেন স্যামুয়েল। তার যে ক্ষমতা, কাগজে সই আদায়ের জন্য কোনো শর্ত মানারই দরকার নেই তার। বরং নাওফিলের ঔদ্ধত্যের জন্য শিক্ষা একটা দিতেই পারতেন। কিন্তু না, এমনটা তিনি করবেন না৷ জীবনের একটা সময় পর্যন্ত জায়িনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটেছেন। একে অপরের জন্য ওরা বন্ধুরা যে কোনো পদক্ষেপ নিতে পিছপা হতেন না। এই কোম্পানির পেছনে যে অবদান ছিল জায়িনের, তাও তিনি অস্বীকার করতে পারবেন না কোনোদিন। আর তারই ছেলে হিসেবে নাওফিলের এই দাম্ভিক ব্যক্তিরূপটুকু খুবই যৌক্তিক। বরং সে এমনটা না হলেই মনে হত না জায়িন মাহতাবেরই সন্তান সে।
নাওফিলের ঘাড়ে হাত দিয়ে ওকে বসতে ইশারা করে নিজের জায়গা দখল করে নিলেন। বিনা বাক্যেই নাওফিল বসল তার পাশে পুনরায়। নিভিয়ে রাখা সিগারটা আবার জ্বালালেন স্যামুয়েল। তারপর জিজ্ঞেস করলেন ওকে, ‘তোমাদের যোগাযোগ নেই কতদিন?’
-‘জানো না তুমি?’ গম্ভীরমুখে বলল নাওফিল।
-‘সত্যি বলতে, আমি ওর বেঁচে থাকার খবর জানতাম না। ও আমার সামনে আসার পর বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছিল।’ এটুকু বলে থামতেই নাওফিল শান্ত স্বরে নির্দেশ দিলো, ‘বলতে থাকো।’
-‘তোমার মায়ের একজন ডানহাত ছিল। জাইমা, ভারতীয়। তার কাছ থেকে আমার ব্যাপারে বহু তথ্য পেয়েছে মারিহাম। আমার কাছে কীভাবে পৌঁছনো যাবে, এ ব্যাপারেও আইডিয়া ওকে জাইমাই দিয়েছিল।’
-‘কিন্তু জাইমা জানলেন কীভাবে? তাকে তো আমার মায়ের থেকে সেফ করার জন্য বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’
-‘হ্যাঁ, আয়মানকে কব্জায় আনতে জেইন ওকে ব্যবহার করেছিল। তারপর রেজা বাস্টার্ডটার সাথে বাংলাদেশ শিফট্ করে দিয়েছিল আয়মানের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু ওকে আবার আসতে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। জেইনই নিয়ে এসেছিল আয়মানের হুকুমে৷ তুমি তখন তোমার মায়ের গর্ভে৷ শুধু এই সুযোগে আমার বন্ধুকে খুব জ্বালিয়ে নিতে পেরেছিল ও।’ শেষ কথাটার পর হাসতে হাসতে বললেন, ‘ওদের দুজনের কেমিস্ট্রি খুব থ্রিলিং আর রোমান্টিক ছিল। থ্রিলিং কেন বললাম জানো? কারণ, দুজনই দুজনের জন্য যতটা টক্সিক ছিল ঠিক ততটাই আবার পজেসিভও ছিল।’
বাবা-মা’র বিষয়ে যে কোনো গল্পই নাওফিলের হৃদয়কে আন্দোলিত করে। এখনও করছে খুব। ঠোঁটের কোনে হাসিটা আসতে চেয়েও সামলে নিলো সে। এই মুহূর্তে এ বিষয়টির চেয়ে বেশি জরুরি বোনের ব্যাপারে জানা। তাই প্রসঙ্গ ধরিয়ে দিলো, ‘জাইমাকে কেন আনা হয়েছিল আবার?’
-‘হ্যাঁ বলছি।’ বলে সিগারে একটা টান দিয়ে নিলেন স্যামুয়েল। ‘প্রেগন্যান্ট অবস্থায় তো জেইনকে নাজেহাল করা সম্ভব ছিল শুধু ঘরের মধ্যেই। এদিকে বাইরে বের হওয়া আয়মানের জন্য কঠোর নিষেধ। কড়া সিকিউরিটি রেখেছিল জেইন। কিন্তু আমার বন্ধুকে তো নাজেহাল করা চাই-ই ওর। চোখে চোখেও রাখা চাই। এজন্য বিশ্বস্ত একজনকেই দরকার। তেমনটা ছিল শুধু জাইমাই। আয়মান জানত, জাইমা ওর সামনে এলে নিজেকে রক্ষা করার জন্য ওর যে-কোনো আদেশ মাথা পেতে নেবে। আর হয়েছিলও তাই। একসময় জেইন ওর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল জাইমাকে। পরে জেইনের বিরুদ্ধে তাকে ব্যবহার করে ও। আর এর মাঝেই কোম্পানির কাজ শুরু হয়েছিল। তখনই জাইমা নানাভাবে অবগত হয়েছিল এ ব্যাপারে। কিন্তু মারিহামের সঙ্গে সে কীভাবে যোগাযোগ করতে পেরেছে, তা আমাকে জানায়নি মারিহাম। আমিও অত বিষয়টা নিয়ে জানার চেষ্টা করিনি৷ সেটা আমার প্রয়োজন ছিল না বলে।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৫
-‘কিন্তু তোমার কাছে ও কেন এসেছিল? আর সেটা কবে?’
-‘এসেছিল বছর চার আগে। তোমার সঙ্গে কি চার বছর ধরেই যোগাযোগ নেই? না-কি আরও আগে থেকে?’
জবাবটা দিতে চাইলো না নাওফিল। কারণ, বুঝতে পারছে মারিহাম ওদের ভাই-বোনের সম্পর্কটা নিয়ে বিশেষ কিছু বলেনি স্যামুয়েলকে।
