লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২১
নুসাইবা আরা নুরি
সকাল সকাল দরজার তালা খুলে ঘরে ঢুকেছে রোকেয়া।আসলে দেখতে এসেছিলো ইরু এখো বেচে আছে কিনা।ইরু তখন রাতে ইমার রেখে যাওয়া পাউরুটি টা খেয়ে তাই সুয়েছে।তার পুর্ন বিশ্বাস ইমা আবারো সুজোগ পেলে তার জন্য খাবার নিয়ে আসবে।ইরুর বাইরে যাওয়ার মন নেই।শ্রেয়সীর উপর অনেক অভিমান জমেছে তার কথা একটা বার শুনলে কি এমন হতো শ্রেয়সীর।
মন খারাপ হয় ইরুর।ফাহিমের কথা মনে উঠলে বুকের ভিতর কেমন করে উঠে আচ্ছা ওই লোকটা কি কালকেও তার জন্য সেই চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো।তার জন্য অপেক্ষা করে না পেয়ে কি কল দিয়েছিলো।ইরু ভাবনার মাঝেই কেও ইরুর চুল ধরে জোরে টান দেয় ইরু টাল সামলাতে না পেরে খাট থেকে মেঝেতে পড়ে গিয়ে ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠে মুখ উচু করে তাকাতেই।রোকেয়া রাগী কন্ঠে বলে,
-এখোনো মরি*স নাই কেন।কৈ মাছের জান নিয়ে পড়ে আছিস।আমারে জালিয়ে খেলি তুই।মরে গিয়ে একটু শান্তি দিতে পারতিস দেখছিলি তো কত শখ করে আশা করে আটকে রেখে গেছি সকাল সকাল নিরাশ করলি কেন অমা*নুষের বাচ্চা।
কড়া গলায় কিছু গালি মিশ্রিত কথা গুলো বলে ঘর থেকে চলে যায় রোকেয়া।ইরুর ভিষন খারাপ লাগে সকাল সকাল এমন বিশ্রি কথা শুনে।আবার ভালো ও লাগে।নিশ্চয় ইমা আপু তার মাকে খুলে দিতে বলেছে প্রতিবার ই এমন হয়।ইরু জানে এখন বাইরে গিয়ে কোনো ভুল করলেই তার পুঠে মার পড়বে।কারন ইমা আপু দরজা খুলে দিতে বলেছে এটা নিত্য ব্যাপার।
ইরু উঠতে চায়।চুলে ভিষন ব্যাথা।কাল ওষুধ খাওয়ায় জর কমে গেছে ইরুর।ইরু মাঝে মাঝে নিজের মৃত্যু কামনা করে।যদি ইরু সাহসী হতাও তাহলে কবেই সুই*সাইড করতো।তবে ইরু খুব ভীত।ভয় পায় সব কিছুকে সে।ইরু ঘর থেকে বের হয়।জানে এখন ঘর থেকে বের না হলেও তার মা এসে তার গায়ে হাত তুলে বলবে,
-রানী হয়েছিস।তোর ঘরে এসে খাবার দিয়ে যাবো।চাকর আমি।
তারপর ইরুকে আবার মারবে সাথে সারাদিন আবারো না খাইয়ে রাখবে।তাই ইরু আর ভুল করতে চাইনা।উঠে দাঁড়িয়ে ফ্যাকাশে মুখ থেকে চোখের পানি মুছে এলোমেলো চুল গুলো হাত খোপা করে মাথায় কাপড় দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
ভোর রাতে সিয়াম বাড়ি ফিরেছে।কাল অনেক রাত পর্যন্ত তোহা গ্রুপে গল্প করেছে।আইডিটা লগিন করা হয় না বেশি।করলে ধরা খাওয়ার ভয় কারন তার শশুর বাড়ির কেও এসব জানে না।সবাই ই জানে তোহা ইন্টারে ফেল করেছিলো বলে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।কথাটা লজ্জার হলেও এই জন্য কখোনো খোটা শুনতে হয়নি তোহার।সপ্নের মতো শশুর বাড়ি পেয়েছে।
সকালে সিয়াম এসে ঘুমিয়ে পড়েছে তাই তোহা আর ডাকে নি সিয়াম কে।সে ফ্রেশ হয়ে বাইরে এসেছে।রান্না ঘরে গিয়ে সকালের নাস্তা বানাতে বানাতে তোহার মনটা কিঞ্চিত খারাপ হয়ে যায়।তোহা নিজেকে সামলে নিয়ে রান্না মনযোগ দেয়।কিছুক্ষন পর খাদিজা খাতুন রান্না ঘরে এসে তোহার রান্নায় হাত লাগায়।তোহা জানে তার শাশুড়ী তাকে একা কাজ করতে দিবে না।খাদিজা খাতুন কেটে রাখা আলু গুলো ধুতে ধুতে তোহার উদ্দেশ্যে বলে,
-সিয়াম এখন এসেছে??
-আজানের একটু আগে আম্মু।এসে খেয়ে ঘুমিয়েছে।ডাকতে মানা করেছে।
-আচ্ছা ডাকার দরকার নেই।তুমি একটু গিয়ে শ্রেয়সী কে ডেকে তোলো।
-আচ্ছা।
তোহা আর দেরি করে না।হাত ধুয়ে মুছে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে যায় শ্রেয়সীর ঘরের উদ্দেশ্যে। শ্রেয়সী ফজরের নামাজের পর আর ঘুমাই নি।পড়তে বসেছে তোহা ঘরে গিয়ে দেখে শ্রেয়সী পড়ছে।তোহা খুশি হয় বেশ।আবার কিছুটা মন খারাপ ও হয়।সকাল থেকেই বারে বারে তোহার মন খারাপ হচ্ছে কারন তোহা নিজেও বুজতে পারছে না।
তোহাকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শ্রেয়সী ডেকে বলে,
-আরে ভাবি তুমি কখন এলে??
শ্রেয়সীর কথায় কিছুটা চমকে উঠে তোহা।নিজেকে সামলিয়ে হেসে ভিতরে ঢুকে।তারপর শ্রেয়সীর পড়ার টেবিলের দিকে এগিয়ে বলে,
-এইতো মাত্র এলাম ননদিনী।গুড মর্নিং।
-গুড মর্নিং ভাবি।
-খাবে না চলো কাল রাতে একবার খাও নি।
-এখোনো খিদে লাগে নাই ভাবি।এতো পরিমান কাল খাইছি।
তোহা হাসে।তারপর শ্রেয়সীর মাথায় গাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে,
-কি কেমন দেখলে ছেলেকে।কাল তো বললে রাতে ভেবে বলবা।
ভাবির কথায় শ্রেয়সী একটু লজ্জা পায়।তারপর বলে,
-যতটুকু তার নামে শুনেছিলাম সব টুকুই মিথ্যা ভাবি।বাস্তবে সম্পুর্ন ভিন্ন একটা চরিত্র।আমি নিজেই লজ্জা পেয়েছি ওনাকে অপমান করার জন্য গতদিন।সত্যিই সে খুবই ভালো মানুষ। আর তার বলা কথা গুলো আসলেই বাস্তব সম্মত।প্রতিটা ডিফেন্স এর মানুষের মুল লক্ষ্য দেশকে রক্ষা করা তাই সেও নিজের কাজ করেছে।আর আমরা ভুল বুজেছি।
শ্রেয়সীর কথায় তোহা একটু সস্তি পায়।তারপর কিছু একটা মনে হতেই মনে মনে বলে,
-আসলেই আমাদের চাকরি জীবন টা এমন।যেখানে আপন ভালোবাসার মানুষ গুলোকে ত্যাগ করতে হয় দেশের জন্য।
তোহাকে অন্যমনষ্ক হয়ে কিছু ভাবতে দেখে শ্রেয়সী বলে,
-কি ভাবছো ভাবি??
-কিছু না ননদিনী।আসলে তোমার বিয়ের পর তুমাকে ছাড়া থাকতে হবে তাই খারাপ লাগছে।
তোহা কথা ঘুরিয়ে কথাটা বলতেই শ্রেয়সীর ও মন খারাপ হয়।পরিবার ছেড়ে অন্য বাড়িতে থাকা কি ভালো লাগে। শ্রেয়সীর মন খারাপ করতে দেখে তোহা বলে,
-নন্দাই কি বলে নাই আর একটু ঘুরাবে তোমাকে।নাকি আমি বলে দিবো।যে আমার ননদিনীর সাথে একটু প্রেম করো বিয়ের আগে।
তোহার কথায় শ্রেয়সী ভীষন লজ্জা পায়।তারপর বলে,
-কি যে বলো না ভাবি।কাল আবার দেখা করবে কি একটা কাজ আছে।ওনার ফ্রেন্ড মানে ওই যে বলছিলাম না ইরুকে পছন্দ করে লয়ার ওনার নাম ফাহিম ওনাকে নিয়ে আসবে সম্ভবত।তোমাকে বাড়িতে ম্যানেজ করতে বলছে।
শ্রেয়সীর কথায় তোহা শ্রেয়সীকে লজ্জা দিতে বলে,
-বাহ বাহ আমার ননদিনী আমার নন্দাই এর সাথে দেখা করার জন্য আমাকে ম্যানেজ করে দিতে বলছে।কি বাত হে।
-যাও লাগবে না।
-আরে রাগ করো কেন আমি বুজছি তো প্রেম প্রেম গন্ধ পাচ্ছি।
-ভাবিইই।
তোহা হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।যাওয়ার আগে শ্রেয়সী কে পড়া শেষ এ খাওয়ার জন্য আসতে বললো।শ্রেয়সী আচ্ছা বলে পড়ায় মনযোগ দিলো।পড়াশোনায় গাফিলতি করা যাবে না।সামনে শ্রেয়সীর সপ্ন।তাকে মেডিকেল এ চান্স পেতেই হবে।এখন থেকে ভালো করে পড়লে শ্রেয়সীর ফিউচারে মেডিকেল এ চান্স পাওয়ার আশা থাকবে।
জঙ্গলের ভিতরে মাটির নিচের সেই পাতাল ঘরে বসে আছে আনাম মিয়া।চা খাচ্ছে বিশ্রি শব্দ করে।সামনে হাত পা বাধা অবস্থায় পড়ে আছে একটা ট্রাফিক পুলিশ।এখন সে পুলিশ তার চেনার উপাই নেই।গায়ে শুধুমাত্র একটা সেন্ডো গেঞ্জি বাদে কিছুই নেই।সমস্ত গায়ে লাঠির মারের আঘাত।
আনাম মিয়া আধা কাপ চা খেয়ে বাকি অর্ধেক পুলিশ টির মুখের দিকে ছুড়ে দিলো।গরম চা গায়ে পড়তেই পুলিশ টা ছটফট শুরু করলো।আনাম মিয়া পাশ থেকে রকি বলে ডাক দিতেই ছেলেটা এগিয়ে বলে,
-জি ভাই।
-রা*ম দা ডা নিয়ে আই সকাল সকাল এরে একটু উপরে পাঠানোর জন্য আমার হাত চুলকাচ্ছে।
-আচ্ছা ভাই।
রকি একটা ধারালো রাম*দা আনাম মিয়ার হাতে দিতেই আনাম মিয়া লোকটার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
-তুই নাকি রফিক ভাইয়ের কলার ধরছিলি বাছা*ধন।তোর সাহস দেখে তো আমি অবাক।এবার আমার সাহস দেখবি।
আনাম মিয়ার কথায় লোকটা কাদতে কাদতে গুঙরে বলে,
-ভাই আমাকে ছেড়ে দেন সারাজীবন আপনার গোলাম হয়ে থাকবো ভাই।আমি জানতাম না তাই করেছি নিজের ডিউটি পালন করেছি।প্লিজ ছেড়ে দেন আমার বাচ্চা মেয়ে দুটো আমার অপেক্ষায় বসে আছে প্লিজ ভাই ছাইড়া দেন আমারে।
-আচ্ছা।
লোকটা মাথা উচু করে তাকাতেই কয়েক ফোটা রক্ত এসে পড়লো আনাম মিয়ার সাদা পাঞ্জাবি তে।মুখেও লেগেছে তাজা গরম র*ক্ত।আনাম মিয়া হেসে উঠলো।লোক্টির কাটা মাথা গলা থেকে ছাড়িয়ে পড়ে গেলো।আনাম মিয়া এবার রকির দিকে তাকিয়ে বলল,
-সন্ধার আগে এর সব দামি অর্গান গুলো সরকারি হস্পিটালে পাঠিয়ে দিবি।আর সন্ধার পর ওর বাচ্চা মেয়ে দুইটারে নিয়ে আসবি।কালকের দুইটা কম পড়ছে।
-আচ্ছা ভাই।
আনাম মিয়া আর না দাঁড়িয়ে বেরিয়ে আসে ওখান থেকে।এখন লম্বা একটা গোসল দরকার।নয়তো এসব রক্তের গন্ধ আনাম মিয়ার গায়ে থেকে যাবে না।রক্তের গন্ধ আবার আনাম মিয়া পছন্দ করে না তাই বাড়িতে গিয়ে আগেই গোসল করবে।তারপর বাকি কাজ।কাল আবার মিটিং আছে সংসদে তাই যেতে হবে তাকে আজ বিকালে।
মেহেরাজ তুহিন এর সাথে কথা বলে বুজতে পেরেছে কাহিনী কি।তবে কোনো প্রমান পাচ্ছে না বলেই চুপ চাপ আছে তবে ধোয়াশা হিসেবে যে প্রমান ছিলো সে সব গুপচর গুলো নিখোঁজ। এতে মেহেরাজ বুজেছে বিপক্ষ দল ভীষন চালাক।আর সে তোহাকেও চিনে খুব ধুর্ত আর চালাক।মেহেতাজ জানে তোহা পারবেই এই মিশন কম্পলিট করতে।
মেহেরাজ কাল শ্রেয়সীর থেকে নেওয়া ফেসবুক আইডিতে নক দেই। প্রথমে সালাম দেই তারপর লেখে,
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২০
-আপ্নার কি ঘুম ভেঙেছে ম্যাডাম??
কাল সন্ধাতেই সব কিছু মেহেরাজ ঠিক করে নিয়েছে।যার ফলে সম্পর্কটাও ঠিক হয়ে গেছে।মেহেরাজের ম্যাসেজের পিঠে ওপাশ থেকে সালামের উত্তর ভেসে আসে তারপর লেখে,
-জ্বি আপনার??
-আমার ঘুম না ভাংলে কি আপনার জামাই এর ভুত নক দিলো আপনাকে মিস??
